Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)


কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৪৫)
[ পেজের রিচের অবস্থা ভালো না। কাইন্ডলি, একটু রেসপন্স করবেন সবাই!🙏]

আইরিন কাঁদছে। চোখের জলে গালে বন্যা ছুটেছে প্রায়। এমনিই মেয়েটা ক্যাটক্যাটে ফরসা। নাক থেকে সারামুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে আরো। মেয়ের লাগাতার ফোঁপানোর শব্দে মহাবিরক্ত হলেন রোকসানা। চ সূচক শব্দ করে বললেন,
“ কেন কাঁদছো তুমি? তখন সবার সামনে আমার নাক যা কাটার কেটে এখন এসব চোখের জল নাকের জল এক করার মানে কী?”
আইরিন হেঁচকি তুলে বলল,
“ মাম্মা তুমি আমাকে বোঝো না। একটুও বোঝো না।”
“ আমি বুঝতে চাইও না। তুমি আজ যা বেহায়াপনাটা দেখালে,লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম আমি। সার্থর থেকে তোমাকে আমি দূরে থাকতে বলেছিলাম। সেখানে তুমি ওকে ভাত-ডাল বেড়ে বেড়ে খাওয়াচ্ছো! আবার ওর কোলেও উঠতে চাচ্ছিলে? শেম অন ইউ আইরিন। আমি যাস্ট ভাবতে পারছি না।”
আইরিনের কণ্ঠে অটল জেদ,
“ আমি কেন ওনার থেকে দূরে থাকব? আই লাভ হিম মাম্মা, আমি বলেছি তোমাকে।”
রোকসানা চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,
“ আমিও তোমাকে বলেছি, ও বিবাহিত। কোনোদিন ওর সাথে তোমার কিছু হবে না।”

“ মাম্মা তুমি তো নিজেই দেখতে পাচ্ছো ওরা আলাদা থাকে। যে যার মতো। তাহলে কীসের বিয়ে,কীসের বিবাহিত!”
রোকসানা অতীষ্ঠ হয়ে বললেন,
“ ফর গড শেইক আইরিন আর কোনো নির্লজ্জতার পরিচয় দিও না। ওরা আইনত স্বামী স্ত্রী। বিয়েটা ফ্রড হোক যাই হোক সার্থ ক্যান্সেল করেছে কী? করেনি। কাবিননামা নামক বস্তুটা এখনো ওর কাছেই আছে। তাই তুমি যা কিছু করছো এগুলো খুব নোংরা লাগছে দেখতে। ধীরে ধীরে মানুষ তোমাকে চরিত্রহীনার আখ্যান দেবে আইরিন।
আচ্ছা,ধরো তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম সার্থর তুশির ওপর ইন্টরেস্ট নেই। কিন্তু কত দিন?
তুশি দেখতে সুন্দরী। সারাদিন সার্থর সামনে ঘুরে বেড়ায়। আমি নিজে ওদের চোখাচোখি দেখেছি। সার্থ যে পরবর্তীতে কোনোদিন তুশির ওপর গলে যাবে না,তার কী গ্যারান্টি? আজ তোমার জেদ অনুযায়ী আমি তোমাকে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম,কিন্তু সার্থ তুশির ওপর ঘুরে গেল তখন কী করবে?”

“ এর মানে তুমি আমার জন্যে কিছু করবে না,মাম্মাম?”
“ করতাম,যদি সার্থ স্টিল নাও ব্যাচেলর থাকতো। এখন আর কিছু করার নেই।”
আইরিন শক্ত গলায় বলল,
“ আমি কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ব না মাম্মাম।”
রোকসানার গলা সুদ্ধ তেতো হয়ে বসল। বীতস্পৃহ হয়ে বললেন,
“ তোমার যা ইচ্ছে তুমি করো।”
ঘর থেকে বের হতে নিলেই পেছন হতে চ্যাঁচিয়ে উঠল আইরিন,
“ আমি ওনাকে ছাড়া মরে যাব মাম্মাম।”
রোকসানা চোখ বুজে শ্বাস নিলেন। কঠোর ভাষায় বললেন,
“ এসব বলে লাভ নেই। সার্থর জন্যে সুইসাইড করবে,এতটাও ন্যাকা তুমি নও আমি জানি।”
তারপর বেরিয়ে গেলেন তিনি। আইরিন রাগে বালিশটা ছুড়ে মারল ফ্লোরে।


ইউশা এসাইনমেন্ট করছিল। তুশি পা টিপে টিপে এসেই পেছন থেকে চোখজোড়া চেপে ধরল ওর। লেখা থামিয়ে হাসল মেয়েটা। ফটাফট বলল,
“ আমার ঘরে চাঁদ এসেছে।”
তুশি চোখ ছেড়ে,ঘুরে এসে বিছানায় বসল। মুখ গোঁজ করে বলল,
“ তাও তো আমি এলাম। তুমি তো এখন আর আসোই না।”
“ কী করব বলো! এত্তগুলো এসাইনমেন্ট দিয়েছে। লিখতে লিখতে আঙুল ব্যথা করছে এখন। এজন্যেই বলি,আমার ঘরে শিফট হয়ে যাও। সারাদিন একসাথে থাকব। আর আলাদা করে ওপর নিচ করতে হবে না।”
তুশি সরল গলায় বলল,
“ উম,আমার ওই ঘরটার ওপরে ভীষণ মায়া পড়ে গেছে। নিজের হাতে গোছগাছ করেছি তো। তবে আমিত মাঝেমধ্যে এসে থাকব বলেছি।”
ইউশা বলল,
“ মিন্তু বলল,মায়ের সাথে তোমার সব মিটে গেছে।”
“ হুঁ। ভাবলাম ছোট্ট একটা জীবন,রাগ করেই কাটিয়ে দিলে ভালোবাসব কখন!”
ইউশা স্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“ এইত! লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা।”
তুশি হাসল। পরপরই সচকিতে বলল,
“ তোমার জন্যে একটা জিনিস আছে দাঁড়াও।”
ওরনার ভাঁজ হতে বেলির গাজরাটা বের করে টেবিলে রাখল সে। খুব আনন্দ নিয়ে বলল,
“ অয়ন ভাই এনেছেন, তোমার জন্যে।”
ইউশার চকচকে মুখখানা অমনি মলিন হয়ে গেল। বিমর্ষ চোখে সতেজ ফুলের গাজরাটাকে দেখল এক পল! ও জানে এই ফুল ওর নয়। ওর জন্যে অয়ন ভাই আনেনি। জোর করে হাসল তাও। তুশি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কী হয়েছে? খুশি হওনি?”
টেনেটুনে গলার স্বর ধরে রাখল ইউশা,
“ কেন হব না। হয়েছি,ভীষণ খুশি হয়েছি।”
তুশি উঠে এসে কাঁধে হাত রাখল,
“ কী হয়েছে তোমার ইউশা! মুখটা এমন বিষণ্ণ কেন? আর সেদিন যে বললে,আমাদের ভালোবাসার মানুষ আমাদের ভালোবাসে না! কেন বলেছিলে এখনো কিন্তু বললে না আমাকে। তোমাকে তো অয়ন ভাই ভালোবাসেন। তাহলে? ওনার সাথে কি ঝগড়া হয়েছে!”
“ আরে না না। ঝগড়া কেন হবে? আমরা এখন ওসব ঝগড়াঝাটিরও উর্ধ্বে চলে গেছি তুশি। কতটা উর্ধ্বে তুমি নিজেও জানো না। আর,আর ওই কথাটা তো আমি তোমার জন্যে বলেছিলাম। তোমার দুঃখকে আমি নিজের দুঃখ ভাবি যে তাই।”
তুশি এত কথার মারপ্যাঁচ ধরতে পারল না। সরল বিশ্বাসে মাথা ঝাঁকাল।
পরপরই বলল,“ দেখেছ, অয়ন ভাই তোমার পছন্দ-অপছন্দের কতত খেয়াল রাখেন। ঠিক মনে করে ফুল এনে আমাকে দিয়ে পাঠাল।”

ইউশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুল মুড়িয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলো। তুশির মাথায় হুট করে একটা কিছু খটখট করে ওঠে। টেবিলের কাঠ নখ দিয়ে খুটতে খুটতে উশখুশ করল বেচারি। অয়নের কিছু কথাবার্তায় আজকাল ওর ভীষণ অস্বস্তি হয়। ওই যে সেদিন বলল,তোমার জন্য সব পারব। তারপর ওর হাসির প্রশংসাও কেমন করে করল তখন! আজ আবার বলল- আমাদের মাঝে ধন্যবাদ কীসের? তুশির যে একদম এগুলো গায়ে লাগেনি তা না! শুধু বড়ো ভাই ভেবে এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু এসব তুশি ইউশাকে কী করে বলবে! দুজনের অত সুন্দর সম্পর্কটাতে একটা অহেতুক ভেজাল হবে না?
ইউশা খেয়াল করতেই বলল,
“ কিছু বলতে চাইছো মনে হয়!”
“ হু? না কিছু না। আমি আসি,তুমি লেখো।”
তুশি যেতে নিলেই ইউশা ডাকল,
“ শোনো তুশি।”
ফিরল ও।
“ কাল কত তারিখ জানো?”
তুশি একটু ভেবে বলল,
“ সেপ্টেম্বরের চার। কেন?”
ইউশার ঠোঁট মৃদূ হাসি,
“ কাল মেজো ভাইয়ার জন্মদিন!”
তুশির চোখের দৃষ্টি থমকে গেল। দু সেকেন্ড পর ছোট্ট করে বলল,
“ ওহ।”
“ উইশ করবে না?”
“ না। আমার উইশের জন্যে কি আর উনি বসে থাকবেন।”
তুশি বেরিয়ে যায়। ইউশা ফোস করে শ্বাস ফেলে নজর ফেরায় খাতাতে। কিন্তু কিছু যাতনার দাবদাহে ভেতরটা চৌচির হয়ে খাক হলো তার। টের পেলো বুকের কোথাও খুব সূক্ষ্ম ব্যথা কিলবিল করে ঘুরছে। ড্রয়ার খুলে ফুলের গাজরা তুলে বাইরে আনল সে। চোখের ভেতর জ্বলেপুড়ে এক ঝটকা বর্ষা ছুড়ল সহসা। টুপ করে দু ফোঁটা ছিটকে পড়ল পৃষ্ঠায়। ইউশা তড়িঘড়ি করে সেই জল মুছে ফুলটা ছুড়ে মারল ডাস্টবিনে। এই মায়া সে বাড়াবে না। শক্ত হবে,খুব শক্ত। যতটা শক্ত হলে অয়নের সংসার দেখলেও ওর হৃদয় কখনো ছিঁড়ে না যায়!


সার্থ সুধীর পায়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছে। থুত্নীতে আঙুল ডলতে ডলতে হাঁটছে এদিক ওদিক। হঠাৎ থামল। ঠোঁট কামড়ে ভাবল,
“ সত্যিই কি অয়ন তুশিকে পছন্দ করে?”
পরপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ নো ওয়ে। তা কেন হবে? অয়ন জানে তুশির সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল৷ ও এসব কক্ষনো করবে না। হতে পারে কাজিন সিস্টার ভেবে ফুল এনে দিয়েছে। এটা আর এমন কী ব্যাপার? আমিও ইউশাকে অনেক কিছু কিনে দিই। হয়ত বা অয়নও তুশিকে সেভাবেই ট্রীট করে,যেভাবে আমি ইউশাকে করি।
তাহলে কি তুশি ওকে পছন্দ করে?”
ভাবতেই সার্থর বুকে দুম করে লাগল কিছু একটা। কেমন ব্যগ্র চিত্তে ভাবল,
“ বুলশীট, শী লাইক্স মি! ওইদিন তো খাতায় আমার কথাই লিখেছিল। সাথে কী একটা উদ্ভট নাম দিয়েছে – বিটকেল! হোয়াট’স কাইন্ড অফ নেইম ইজ দ্যাট। কী মানে এই নামের?
ওই চোর যখন দিয়েছে, মানেটা নির্ঘাত খুব খারাপ কিছুই হবে। চোরটা আমার সম্পর্কে কী জানে যে এই এত বাজে নাম দিলো? ও জানে ইউনিভার্সিটিতে কত মেয়ে আমার এ্যাটেনশান পাওয়ার জন্যে কত কী করতো? ডিপার্টমেন্টের কত মেয়ে – সার্থ আই লাভ ইউ বলে মুখে ফ্যানা তুলেছিল,কোনো ধারণা আছে ওর? যেখানে আমি সারাজীবন মেয়েদের পাত্তা না দিয়ে এলাম,সেখানে ওই চোর এখন আমাকে এ্যাটিটিউড দেখাচ্ছে। ভাইয়া ডাকছে, আবার দুপুরে ভ্যাঙালও! দিনের পর দিন সাহস বেড়েই যাচ্ছে শুধু। যেই শুনেছে ও চাচ্চুর মেয়ে,প্রিন্সেস ডায়না ভাবছে নিজেকে।”

ফের হাঁটা ধরল সার্থ। পরপরই থামল আবার। সতর্ক চোখে ভাবল,
“ ওয়েট আ মিনিট! আচ্ছা আমার কেন এত রাগ হয়? অয়নকে তুশির আশেপাশে দেখলে মেজাজ এত বিগড়ে যায় কেন?
এটা কি শুধু অয়নের পাশে দেখলে হয়,নাকি অন্য কারো সাথেও! আমি কি তাহলে সত্যিই জেলাস?
না,আমি তো এরকম ছিলাম না। আম সৈয়দ সার্থ আবরার, এত সিলি ব্যাপার নিয়ে আমি কেন জেলাস হব? তাহলে এতক্ষণ এতগুলো কথা বললাম কেন? গড! আই হ্যাভ টু চেক মাই সেল্ফ।”
তৎপর হাতে ফোন তুলল সার্থ। ব্যস্তভাবে ডায়াল করল কাউকে। কানে গুঁজেই বলল,
“ হ্যালো, দেশে এসেছিস?”


হাসনা আজ এশার নামাজে দেরি করে দাঁড়িয়েছিলেন। জায়নামাজ গুছিয়ে উঠলেন সবে,আচমকা তুশি ভোদৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। চ্যাঁচিয়ে ডাকল,
“ দাদিইই.??”
হঠাৎ ব্যাপারটায় চমকে আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি,
“ ও মা গো ক্যাডা!”
তুশি শ্বাস টানছে। এরকম
হাঁপাতে দেখে বললেন,
“ গলায় অজগর ডুকছেনি? এমন করোস ক্যা?”
“ ওহ হো দাদি, আই নিড ইউ। ইউ হেল্প মি অর নো হেল্প মি?”
হাসনা ক্লান্ত গলায় বললেন,
“ আল্লাহর ওয়াস্তে মাইনা নিছিলাম এই বাড়িত আইসা তোর ইংজিরির ভূত নামছে। কিন্তু নাহ,অহনও নামেনাই।”
তুশির চোখ পড়ল দেওয়ালঘড়িতে। সাড়ে এগারটা বাজে। অমনি অধৈর্য হয়ে বলল,
“ আরে দাদি এত কথা বোলো না। বোসো এখানে।”
দুহাত ধরে দাদিকে খাটে বসিয়ে, সুই-সুতার সাথে একটা কাপড় দিয়ে বলল,
“ দাদি, আমাদের বালিশে কী যেন একটা সেলাইয়ের ফোর করেছিলে। ওটা অনেক সুন্দর। আমাকে জলদি জলদি করে একটু শিখিয়ে দাও তো।”
“ এডি শিক্কা কী করবি?”
“ লাগবে দাদি, কথা না বলে দাও।”
“ তুই পারবি না বু। অনেক খাটনি। সুই ঢুকপো হাতে। আমারে দে, আমি করি।”
“ উহু,এটা আমাকেই করতে হবে দাদি। আমার একটা বিশেষ দিন আজ। তুমি শেখাও। আর সুতা কীভাবে গাঁথতে হয় তাও শেখাও।”
হাসনা নাতনির জেদ সম্পর্কে জানেন। তাই কথা না বাড়িয়ে ব্যস্ত হলেন কাজে।
তুশি সবটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। কাজ শেষেই সুই-সুতা টেনে নিয়ে বলল,
“ ওকে থ্যাংকিউ!”
তারপর ছুটে বেরিয়ে গেল ফের। হাসনা কিছুই বুঝলেন না। মেয়েটা এত দুরন্ত। দু দণ্ড পাশে এসে বসারও ফুরসত নেই। তাও গাল ভরে হাসলেন তিনি। সেই চোর তুশি আজ কত বদলে গেছে। সেলাইও শিখছে এসে?


সার্থর ঘুম ভাঙল সকালে। শনিবার হওয়ায় আজ থানার চাপ নেই। কিন্তু একটা বিশেষ কাজ আছে ওর। একেবারে ঝকঝকে শার্ট-প্যান্ট তৈরি হয়ে বের হলো তাই। দরজা টেনে খুলতেই কিছু একটা ঝুপ করে ওপর থেকে খসে পড়ল ঘাড়ে। সহসা একটু থমকাল ছেলেটা। চোখ নামিয়ে,কপাল কুঁচকে চাইল। কাঁধের ওপর একটা সফেদ রুমাল লেগে আছে।
সার্থ অবাক হয়। রুমাল হাতে নিয়ে ছাদের দিকটা এক পল মাথা তুলে দেখে। এই জিনিস এখানে কোত্থেকে এলো? ওইপাশ উল্টাতেই বিভ্রান্ত চোখমুখ অমনি টানটান হয়ে বসল।
খুব ভাঙা ভাঙা হাতে ক্যাপিটাল ইংরেজিতে লেখা- “ শুভ জন্মদিন!”
পুরোটা সুতো দিয়ে বোনা। আঁকাবাঁকা ফোর। পাশে দুটো গোলাপও এঁকেছে। সার্থ গালের ভেতর জিভ নেড়ে কী যেন ভাবল। পরপরই রুমালটাকে পাশের বড়ো ফুলদানিটার ওপর রেখে দিলো আবার। ঘরের ভেতর ঢুকেই ধরাম করে আটকে দিল দরজাটা। পিলারের এপাশে থাকা তুশি ছলকে উঠল শব্দে। উঁকি দিলো ঘাড় নামিয়ে। রুমাল বড়ো ফুলদানির ওই নকল ফুলের ডালে ঝুলছে। অমনি মেয়েটার সারামুখ ভীষণ বিবশ ব্যথায় নীল হয়ে গেল। খণ্ড হলো বুকের ধার।
আর্ত চোখে শত ফুটো হওয়া আঙুলটা তুলে দেখল এক পল। কাল সারারাত জেগে ও এটা সেলাই করে বানিয়েছে। কতবার সুই ঢুকেছে চামড়ায়। এক ফোঁটাও ঘুমায়নি বলে এখনো মাথার এক পাশ টনটন করছে ব্যথাতে। অথচ উনি খুশি তো দূর,সাথেও রাখলেন না। এভাবে ফেলে দিলেন!
অবশ্য যে মানুষ ব্রান্ডেড জিনিসপত্র ছাড়া ব্যবহার করে না,তার কাছে ওই সামান্য একটুকরো কাপড়ের রুমাল কী আর রেখে দেয়ার জিনিস! ও একটু বেশিই আশা করে ফেলল বুঝি?
তুশি মন খারাপ করে চুপচাপ নিচে নেমে এলো।
ঠিক তার দু সেকেন্ড পরেই খুব আস্তে করে দরজা খুলল সার্থ। নিচে চেয়ে দেখল,চলে যাচ্ছে তুশি। অমনি তাড়াহুড়ো করে রুমাল হাতে নিয়ে ফের মেলল সে। লেখাটা আবার পড়ে নিঃশব্দে ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল।
এরমধ্যেই তারস্বরে ফোন বাজল ওর। সার্থ তড়িঘড়ি করে রুমাল পকেটে ভরে। ফোন বের করতেই স্ক্রিনে লেখা উঠল –
“ জামিল…”

চলবে….

কাছেআসারমৌসুম

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৪৫_এর বাকি অংশ)

সার্থ সদর দরজা ছুঁয়ে দেখল দরজা চাপানো। ঠেলল দুহাতে। অমনি এক ঝটকা জরি মাথা আর শার্টের ওপর পড়ল।
শ্বাস ফেলারও সময় পেলো না,সামনে থেকে কতগুলো কণ্ঠ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
“ হ্যাপি বার্থডে!”
সার্থ আশ্চর্য হলো খুব। দু ঘন্টা আগে দেখে যাওয়া বসার ঘরে এখন রং-বেরঙের বেলুন ঝুলছে। সিঁড়ির নিচের বড়ো দেওয়ালটায় ব্যানার টাঙানো একটা। খুব আহামরি চকমকে জরি দিয়ে লেখা- হ্যাপি বার্থডে সার্থ ভাইয়া!”
সাথে শওকত বাদে প্রত্যেকেই আছেন।
বাড়ির সবাই খুব সুন্দর করে সেজেছে। তনিমাও শাড়ি পরে তৈরি। টেবিলের বড়সড় কেকটা রেহনূমার বানানো, সার্থ জানে। উজ্জ্বল মুখে প্রত্যেককে একবার করে দেখল সে। বাড়ির সকলে ওর জন্মদিন মনে রাখে। উইশ করে, উপহার দেয়। ওকে অনুভব করায় ও বিশেষ কেউ। কিন্তু এত মানুষের আড়ালে ও একজনকে খুব করে খোঁজে। তার ভারি হাতটা মাথার ওপর চায়। বিবেক বাধ সাধলেও, সন্তানের মনতো আর মানে না!
সার্থ জানে বাবা এখানে নেই। থাকবেনও না। হয়ত অফিসে,বা ঘরের খিল টেনে বসে থাকবেন। কোনো জন্মদিনেই স্বশরীরে থাকেন না তিনি। অবশ্য ভালোই হলো! একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচল সার্থ। সবাইকে কেক খাওয়াতে গেলে ওনাকেও খাওয়াতে হবে। ও তা চায় না। চোখে চোখ রাখতেও ওর লজ্জা হয়! ভীষণ লজ্জা!
আর ঠিক এ কারণে জন্মদিন ওর ভালো লাগে না। যে জন্মদিনে বাবা-মাকে দুপাশে নিয়ে কেক কাটা যায় না,সেই জন্মদিন ওর কাছে আনন্দের কম,শোকের বেশি। কিন্তু বাড়ির সবার খুশি আর,ছোটো ভাইবোনদের উল্লাসে তো বাধা দেয়া যায় না। সার্থ ঢোক গিলে ঠোঁটে হাসি টানল।
এক পা ভেতরে বাড়াতেই আচমকা পার্টি পপার ফাটাল মিন্তু।
জামিল পেছনেই ঢুকছিল তখন। হঠাৎ শব্দে ভীষণ ভয় পেলো ছেলেটা। একেবারে কেঁপে টেপে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দরজার কাঠ চেপে ধরল। অমনি হুহা করে হেসে ফেলল সবাই।
সার্থ শ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে বলল,
“ এত বছর বিদেশে থেকেও স্বভাব গেল না। ভীতু ভীতুই আছিস।”
জামিল বুকে হাত দিয়ে শ্বাস নেয়।
বলে,
“ আমি ভীতু না। শুধু একটু চমকে গেছি। সাইন্স বলে সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ বিষয়েও যারা নিজের প্রতিক্রিয়া সঠিক ভাবে ব্যক্ত করে তারা সুস্থ মানুষ। কিন্তু তুই অসুস্থ,কারণ তোর মনের অর্ধেক কথা থাকে তোর ইউনিফর্মের তলায়।”

এর মাঝেই তনিমা অবাক হয়ে বললেন,
“ ওমা,জামিল না?
কতদিন পর দেখলাম তোমাকে। এসো বাবা,ভেতরে এসো।”
সাইফুল বললেন,
“ জামিল! হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ। আগে জানাওনি কেন আসবে?”
“ জানালে তো এভাবে অবাক হতেন না আঙ্কেল। সাইন্স বলে মানুষকে মাঝেমধ্যে এভাবে চমকে দিতে হয়। তাহলেই বোঝা যায় কে আপনাকে কতটুকু মনে রাখল।”
বলতে বলতে জামিল বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেল। গুরুজনদের সবাইকে সালাম করল এক এক করে। অয়নের সাথে করমোর্দন সারল,বুকে বুক মেশাল। দুবাহু ধরে বলল
“ সেবার দেখলাম দাঁড়িও হয়নি,আজ একেবারে পেডিয়াট্রিসিয়ান হা?”
অয়ন হাসল। বলল,
“ তুমি বুঝি একইরকম আছো?”
ইউনিভার্সিটির দিনগুলোয় সার্থদের বাড়িতে জামিলের খুব যাতায়াত ছিল। সেজন্যে সবাই দারুণ পরিচিত ওর। এই যে সকলেই কেমন দেখেই খুশি হয়ে গেছে!”

সার্থ এসে সোফায় বসল। এক পল দেখল চারিপাশ। নীরব, তীক্ষ্ণ চোখ ঘুরিয়ে খুঁজল বোধ হয় কাউকে। ঘামে চটচট করছিল শরীর। এয়ারপোর্টের রাস্তায় যা জ্যাম।
ক্লান্ত গলায় বলল,
“ মা, পানি দাও তো।”
তনিমা কথা বলায় ব্যস্ত ছিলেন। শুনতে পাননি। তুশি সবে এসে দাঁড়িয়েছিল পেছনে।
পানির কথা শুনেই ছুটে গেল অমনি। পরিষ্কার ঝকঝকে গ্লাসটা ভরে এনে চাপা কণ্ঠে ইউশাকে বলল,
“ ওনাকে দিয়ে এসো।”
“ তুমি যাও না।”
“ উহু, তুমি যাও।”
ইউশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গ্লাস নেয়। এসে সার্থর সামনে রাখতেই ও ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা খেয়ে ফেলল।
তুশির মায়া লাগল খুব। আহারে,বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে বোধ হয়। ও হাত-মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে ইউশাকে ইশারায় বলল,
“আরেক গ্লাস দেবো?”
ইউশা বলল,
“ ভাইয়া আরেক গ্লাস দেবো?”
সার্থ মাথা নাড়ল। বোঝাল -না। ইউশা যেতেই সোফায় হাত ছড়িয়ে আরাম করে বসল সে। পরপর কোথাও একটা চেয়ে ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল। ওর ঠিক নাক বরাবর কাচের বিরাট সোকেজ বসানো। স্বচ্ছ গ্লাসে পেছনে থাকা তুশিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পানিটা যে ওই এনে দিয়েছে,ইউশাকে হাত নেড়ে নেড়ে ইশারায় যা বলেছে সব দেখেছে সার্থ।
কিন্তু এবারেও ধরা দিলো না। হাসিটা মূহুর্তে গায়েব করে গম্ভীর হয়ে রইল।
অয়ন এলো তখনই।
গিফটের একটা মাঝারি সাইজের বাক্স দিয়ে বলল,
“ ভাইয়া,তোমার গিফট।”
সার্থ হাসল। হাতে নিয়ে বলল,
“ থ্যাংকিউ।”
এরপর ইউশা এলো। ঘড়ি দিয়েছে সে। মিন্তুও একটা কার্ড আর চকলেট দিলো। জয়নব টাকা দিলেন। তনিমা রীতিমতো মমতায় কপালে চুমু খেলেন ছেলের। রেহণুমা- সাইফুল ব্রান্ডেড পাঞ্জাবি উপহার দিয়েছেন। এরপরই দুরন্ত পায়ে সেখানে হাজির হলো আইরিন। পরনে জর্জেটের শাড়ি। খোপা করা চুলে ফুল গুজেছে। সেজেছেও খুব! ওকে দেখেই ইউশা চোখ কুঁচকে ফেলল। বিড়বিড় করে বলল,
“ বিয়ের দাওয়াতে এসেছে নাকি!”
হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটা ছুটে গেল ঠিক সার্থর পানে। বড়সড় শপিং ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ হ্যাপি বার্থডে। এটা আপনার। ”
সার্থ নিলো। ছোট করে ঐ একই শব্দ বলল তাকেও
“ থ্যাংকিউ।”
আইরিন অনুরোধ করল,
“ প্লিজ পরবেন। অনেক খুঁজে কিনেছি।”
সৌজন্যেতায় হাসল সার্থ।
কিন্তু তুশির মুখের সবটুকু প্রজ্জ্বলতা উবে গেল অমনি। সবাই কত দামি দামি উপহার দিচ্ছে। আর ও! ওর বানানো রুমালের দাম বোধ হয় বিশ টাকাও হবে না। তাহলে কেনই বা ওটাকে নিজের কাছে রাখবেন তিনি! ভালোই করেছেন ফেলে দিয়ে। অমন সস্তা জিনিস কি আর ওনার সাথে যায়?
নিজেকে বুঝ দিলেও তুশির মন মানল না। বুকের ভেতরটা ব্যথায় টলমল করে উঠল। চিবুক নামিয়ে চোখের জল মুছে নিলো আস্তে। রোকসানা মেয়ের কাণ্ডে ক্লান্ত,বিরক্ত। নাসীরকে কিছু বলতেও পারছেন না। তাহলেই মেয়ের ওপর চড়াও হয়ে বিদেশে নিয়ে যাবে। মেয়েটার মানসিক অবস্থা আরো খারাপ হবে তখন। কিন্তু কী যে করবেন তিনি!

জামিল কে তনিমা নাস্তা শরবত দিয়েছেন। কতগুলো বছর পর ছেলেটা এলো।
এখন অস্ট্রেলিয়ায় পাকাপোক্ত সে। একটা বড়ো কোম্পানিতে কর্মরত, ভালো বেতন,দেখতেও দারুণ।
জয়নব বললেন,” তা তোমার বাবা মা ভালো আছে তো?”
“ হ্যাঁ দাদু। আলহামদুলিল্লাহ, ওনারা মাঝেমধ্যেই আপনাদের কথা বলে।”
“ আমাদেরও মনে পড়ে। একবার যে সেই পিকনিক হলো,ওটাই শেষবার দেখা।”
মিন্তু বলল,
“ অস্ট্রেলিয়া কেমন ভাইয়া? ওখানেও কি বাংলাদেশের মতো জ্যাম থাকে? ওখানকার বাবা-মাও কি ফেইল করলে কথা শোনায়?”
শেষ কথাটায় সবাই হুহা করে হেসে উঠল।
হাসল জামিলও। মিন্তুর গাল টেনে বলল,
“ তোমাকে এইটুকু দেখেছিলাম। কত বড়ো হয়ে গেছ।
আচ্ছা ইউশা, ইউশা কোথায়? এই তিনজনের মাঝে ইউশা কে?”
তিনজন বলতে -তুশি,ইউশা আর আইরিনকে বুঝিয়েছে ও।
অয়ন বলল,
“ এই যে,আমাদের ইউশা।”
বলতে বলতে হাসিমুখে একটা হাত দিয়ে ইউশার কাঁধ আকড়ে ধরল সে। বুকের ভেতরটা ঝুপ করে কেঁপে উঠল মেয়েটার। আস্তে করে হাতটা নামিয়ে দিয়ে সরে গেল। অয়নের উচ্ছ্বলতা কমে গেল অমনি। ইউশাটা এখনো রেগে আছে?
ইউশা হাসল ঠোঁট টেনে। বলল,
“ কেমন আছেন ভাইয়া?”
জামিল দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ তুমি ইউশা? মাই গড! চেনাই যাচ্ছে না।”
“ আচ্ছা তাহলে উনি,উনি কে?”
আঙুল তাক হওয়ায় তুশি একটু নড়েচড়ে উঠল। ইউশা বলল,
“ ও আমার টুইনস। আমার বোন ইনায়া।”
জামিলের বিস্ময় আকাশ ছাড়াল এবার।
“ মানে আঙ্কেলের সেই চুরি হয়ে যাওয়া মেয়েটা? হাউ মিরাকল। ওনাকে কী করে পেলেন,কীভাবে পেলেন! সার্থ তুই তো কিছু বললি না রে ব্যাটা।”
সার্থ চুপ। সাইফুল মাথা নাড়লেন। বললেন,
“ সে অনেক লম্বা কাহিনী বাবা। খাও,আস্তেধীরে সব বলব।”
জামিলের ধৈর্য নেই। একেবারে উঠে তুশির পানে এগিয়ে গেল সে। মেয়েটা গুটিয়ে বসল অমনি। এই লোক আবার ওর দিকে আসছে কেন?
জামিল হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ হাই, আমি জামিল হাসান। নাইস টু মিট উইথ ইউ।”
তুশি খুব ঘাবড়ে গেল। বুঝতে পারল না হাত মেলাবে কিনা। কিন্তু একটা লোক সবার সামনে হাত বাড়িয়ে আছে,না মেলালে খারাপ দেখায় না?
সংকোচে চুপসে থাকা হাতটা কোনোরকম তুলল,আচমকা ঝট করে জামিলের কব্জি ঠেলে সরিয়ে দিলো সার্থ।
পুরু কণ্ঠে বলল,
“ তোকে চাচ্চু খাবার শেষ করতে বলল না? খা আগে। তারপর অন্যসব।”
রীতিমতো ছেলেটাকে টেনে এনে আগের জায়গায় দুম করে ফেলল সে। সোফায় ধপ করে বসে পড়ল জামিল। চেয়ে রইল হতবুদ্ধি হয়ে।
রেহণুমা বললেন,
“ ও সার্থ,কেকটা কাট বাবা। সেই কোন সকালে বানিয়েছিলাম। ক্রিম গলে যাবে।”
পরপরই সবাই টেবিল ঘিরে দাঁড়াল। ইউশা তুশিকে টেনে বলল,
“ চলো,ভাইয়ার পাশে দাঁড়াবে।”
“ আমি? না না।”
“ চুপ। এসো তো।”
তুশি এক পা বাড়াতেই,তড়িঘড়ি করে সার্থর বা পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল আইরিন। অন্যপাশটা দখল করল মিন্তু। তুশি থেমে গেল অমনি। ইউশার হাতটা ছাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ ওনার পাশে আমার জন্যে কোনো জায়গা নেই। আমি এখানেই ঠিক আছি। তুমি যাও।”
ইউশার খারাপ লাগল খুব। সাথে ভীষণ রাগ হলো আইরিনের ওপর। কেমন গায়ে পড়া মেয়ে দ্যাখো,অসহ্য!
“ তাহলে আমিও এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব।”
সার্থ মিন্তুর কব্জি ধরে কেক কাটে। সবাই হাত তালি দেয়। অয়ন বিরস চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে চোখ তুলে দেখে ইউশার মেদুর মুখটা। কী আশ্চর্য! ইউশা ওর সাথে কথা বলে না,রাগ করে আছে এসবে ওর এত বুক জ্বলছে কেন? এই যে সবার উচ্ছ্বাস,উল্লাস এসবে কেন ওর মন বসছে না?

সার্থ কেক নিয়ে সবার আগে রেহণূমাকে খাওয়াল। জিজ্ঞেস করল,
“ কেমন? আমার ছোটো মা বানিয়েছে।”
ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন। দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন ওকে। আইরিন এক টুকরো কেক তুলেই বলল,
“ ভাইয়া, হাঁ করো।”
তুশি পরনের কামিজ হাতের মুঠোয় খামচে ধরল অমনি। রাগে দাঁত পিষছে,অথচ যখন-তখন চোখে জল আসবে ভাব। কটমটিয়ে বলল,
“ এই ডাইনিটার সব চুলে একদিন ছিঁড়ে ফেলব আমি।”
তারপর মনে মনে বলল,
“ প্লিজ কেক খাবেন না,বিটকেল। প্লিজ!”
কিন্তু ওর অনুরোধ সার্থ শুনল না। আইরিনের হাতে নিসঙ্কোচে কেক খেলো সে। মেয়েটা পৈশাচিক আনন্দে লুটপাট হয়ে যায়। তুশির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। চোখের আনন্দ দিয়ে বোঝায়- দেখো তুশি,তুমি সার্থর নামে মাত্র বউ হয়েও ওকে কেক খাওয়ানো তো দূর,সামান্য পাশেও দাঁড়াতে পারলে না। সেখানে আমি সব পেরেছি,সব।”

তুশির বুক মুচড়ে উঠল। দুঃখে নিঃশেষ হলো অন্তঃপট। ভেঙে আসা ঠোঁট দুটো টিপে কেবলই চুপ করে রইল।

শওকত ওপরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলেন। সার্থ সবাইকে ঘুরে ঘুরে কেক খাইয়ে দিচ্ছে। ভদ্রলোকের চোখ ছলছল করে উঠল। এখানে তো আজ ওনারও থাকার কথা। নিজ হাতে সার্থকে কেক খাওয়ানোর কথা। শুভ জন্মদিন বলে বুকে টেনে নেয়ার কথা। কিন্তু পারছেন না! যেখানে ছেলেটা ওনাকে দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়,সেখানে এসব যে বহুদূরের ব্যাপার। বাবা হওয়া সত্ত্বেও এটুকু অধিকার তার নেই। তনিমা তখনই তাকালেন এদিকে। স্বামী-স্ত্রীর চোখাচোখি হলো। শওকত চেয়ে থাকতে পারলেন না। মাথা নুইয়ে ফের ঢুকে গেলেন ঘরে। তনিমার কষ্ট হয়! দুঃখ লাগে! কিন্তু কিছু বলতেও পারেন না। ছেলেটা এমনিই নিজেকে গুটিয়ে রাখে,বাবার সাথে মেলামেশা নিয়ে জোরাজোরি করলে হিতে-বিপরীত হয় যদি?

বিষণ্ণ তুশির কানের কাছে ইউশা ফিসফিস করে বলল,
“ তুশি,ভাইয়া!”
চট করে নত চোখ তুলে চাইল সে। কেক নিয়ে এদিকেই আসছে সার্থ,দৃষ্টি তার দিকে। অমনি মেয়েটা শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল।
পিঠ বেয়ে নামল ভীষণ শীতল স্রোত।
উনি বুঝি ওকে কেক খাওয়াতে আসছেন? হায় আল্লাহ,তুশির কপালে এত সুখ? এটুকু যে ও প্রত্যাশাই করেনি। উনি কেক খাইয়ে দেবেন,খুশিতে তুশি জ্ঞান হারাবে না তো!
তুশির ছটফটে চিত্তের মাঝে সার্থ সামনে এসে দাঁড়াল। চিকণ চোখে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। পরপরই হাতের কেক তুলে ইউশার সামনে ধরল সে। ইউশা নিজেই উত্তেজনায় ভাসছিল,ভাইয়া তুশিকে কেক খাওয়াবে ভেবে। হঠাৎ ব্যাপারটায় ভ্যাবাচেকা খেল। একটুক্ষণ থমকে থেকে হাঁ করল চুপচাপ। সার্থ ওর মুখে কেক ঠুসে দিয়ে ফের চলে যায়। যেন দ্বায় সারলো। একবার তাকালোও না কোনোদিকে। অবহেলায় তুশির ভেতরটা এবার চুরমার হয়ে গেল। এতক্ষণ জ্বলতে থাকা কোটরদুটোয় এক ফালি জল ছুটে এলো বন্যার মতো। ও আর দাঁড়াল না। বোজা গলায় বলল,
“ আমি একটু আসছি।”
তারপর দ্রুত পায়ে কোথাও একটা চলে গেল তুশি। ইউশা আহত শ্বাস ফেলল। কী যে হচ্ছে! কেন হচ্ছে! ভাইয়া কেন এরকম করছেন? তুশি কত কষ্ট পেলো, ইস!

রান্নাঘর ফাঁকা। আসমা সহ সবাই ওখানে। একটা শূন্য জায়গা পেতেই তুশির চোখের জল বাধ ভেঙে দেয়। কলকলে ঝর্ণা হয়ে গাল বেয়ে নামে।
এত অবহেলা! এতটা? বাড়ির সবাইকে কেক খাওয়াল,শুধু ও বাদে। ও বুঝি মানুষ নয়? ওকে বুঝি গোণায় রাখা যায় না? একটা কুকুর পুষলেও মানুষ তাকে যত্ন করে। সেখানে ওই মানুষটা কেন এত অবজ্ঞা করছে ওকে?
তুশি ফুঁপিয়ে উঠল।
আচমকা কেউ দরজা থেকে বলল,
“ আসতে পারি?”
ধড়ফড় করে চোখ মুছে, ফিরে চাইল তুশি। জামিলকে দেখে বলল,
“ আসু,আসুন।”
জামিল স্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“ আরে আপনি! আমি আসলে পানি খেতে এসেছিলাম। টেবিলে দেখলাম জগ খালি পড়ে আছে। সবাই ব্যস্ত,ভাবলাম নিজেই খেয়ে যাই।”
“ আমি,আমি দিচ্ছি।”
তুশি ফিল্টার থেকে গ্লাসে পানি ভরে এগিয়ে দিলো। জামিল খেলো দু ঢোক। বলল পরপর,
“ আমি কিন্তু আপনাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছি জানেন। ব্যাপারটা কেমন সিনেম্যাটিক। ছোটোবেলার হারানো মেয়ে বড়ো হয়ে ফেরত আসা। আমি কোনোদিন রিয়েল লাইফে এরকম কিছু দেখিনি।”
তুশি চুপ। ও নিজেই বলল,
“ তা আপনি এখন কী করছেন?”
“ দাঁড়িয়ে আছি।”
জামিল হেসে ফেলল।
“ আমি সে কথা বলিনি মিস। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনার পড়াশোনার কথা।”
“ ওহ,ক্লাস ফোরে পড়ছি।”
জামিল তব্দা খেল,
“ এ্যাহ? মজা করছেন তাই না। ভেরি নাইস। সাইন্স বলছে, আপনার সাথে আমার খুব জমবে। আমিও ভীষণ মজা করি।”
তুশি ছোটো করে বলল,
“ ভালো।”
জামিল ফোন বের করল।
“ আপনার ইনস্টা আইডিটা বলুন তো।”
“ ওসব আমার নেই।”
“ ফেসবুক?”
“ না।”
“ হোয়াটসঅ্যাপ?”
তুশি বিরক্ত চোখে বলল,
“ নেই।”
“ ইম্প্রেসিভ! এই যুগে এসে আপনার এসব নেই? কী সিম্পল আপনি। সাইন্স বলে এরকম সিম্পল, সাদামাটা মেয়েই তো সবাই চায় তার লাইফে।”
তুশির এবার মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। এ দুনিয়ায় একটু একা একা কাঁদারও জায়গা নেই। কোত্থেকে উড়ে এসে খেজুরে আলাপ জুড়েছে দেখো। বেশি খ্যাপালে ও কিন্তু মাড়ির ওপর ঘা বসিয়ে দেবে।
জামিল বলল,
“ আপনি কিন্তু মাশআল্লাহ ভীষণ সুন্দরী!”
তুশি কিছু বলল না।
ও নিজেই বলল,
“ সোশ্যাল মিডিয়ায় যেহেতু নেই, সাইন্স বলছে নিশ্চয়ই সিঙ্গেলই ঘুরছেন। বিয়ে নিয়ে কী প্ল্যান আপনার? না মানে,আমার জন্যেও মেয়ে খুঁজছে তো।”
তুশি নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“ কী বলতে চাইছেন বলুন তো!”
জামিল হাঁ করতে নিলো,আচমকা চিতার গতিতে এসেই ওর ঘাড়টা পেছন থেকে খপ করে চেপে ধরল সার্থ। জামিল ভড়কে গেল। কিছু বলতেও পারল না,ঘাড়টা ধরে টেনেটুনে বাইরে নিয়ে গেল সে।
তুশি আহাম্মক বনে রইল। পরপর ছুটে এলো দোর অবধি। উনি এভাবে নিয়ে গেলেন কেন? এখন আবার একটা ঝামেলা না বাঁধলেই হলো।

সার্থ আড়ালে এসেই দুহাতে জামিলের কলার চেপে ধরল। রাগে আগুন হয়ে বলল,
“ তোকে শুধু ফ্লার্ট করতে বলেছিলাম। তুই বিয়ের কথা বললি কেন?”
জামিল চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“ এভাবেই তো ফ্লার্ট করে ভাই। যাতে সব রিয়েল রিয়েল লাগে। কেন, এ্যাক্টিং ভালো হয়নি?”
সার্থ এবার ছেড়ে দিলো ওকে। মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“ ফালতু এ্যাক্টিং। এই যোগ্যতা নিয়ে ইউনিভার্সিটির লাভার বয় ছিলি?”
“ আমার কী দোষ! তুই-তো বললি যেন কোনোভাবেই বোঝা না যায়। আমি তো সেভাবেই আগাচ্ছিলাম। শুধু শুধু আমার শার্টের আয়রনটা খেয়ে দিলো। এজন্যেই মানুষের উপকার করতে নেই।”
“ তোর অকাজের উপকার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রথম দেখাতেই বিয়ে নিয়ে আলাপ করছিস! ডাফার কোথাকার।”

জামিল ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল। সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“ আমাকে একটা কথা বল তো,তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন? আচ্ছা ওয়েট, তোর বিয়ের দিন যে বউ রিপ্লেস হয়ে গেছিল,আমাকে যে জানিয়েছিলি একটা চোর মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে, তোর সেই বউ কোথায়? উম,মামা সেই মেয়েই এই তুশি তাই না?”
সার্থ চুপ। ওর নীরবতাতেই জামিল নিশ্চিত হয়ে গেল। আর্তনাদ করে বলল,
“ ও মাই গড! এ দেখি কাকতালীয়ের ওপর কাকতালীয়। মানে সেই বিয়ে হওয়া চোর মেয়েই তোর কাজিন? তাহলে এইজন্যেই তুই আমাকে বলেছিলি ওর সাথে ফ্ল্যার্ট করতে,যাতে নিজেকে যাচাই করতে পারিস? হু হু, নাউ আ’ম টোটালি কনফার্ম দ্যাট, ইউ আর ফিনিশড মামা,ইউ আর ফিনিশড!”

সার্থ কপাল গোছাল,
“ মানে!”
“ মানেটা তুই এখনো বুঝতে পারছিস না? তোর রাগই তো তোর সবথেকে বড়ো প্রমাণ ভাই। এই যে ওর হাত ধরতে গেলাম,তুই সেটা নিতে পারলি না। বিয়ের কথা বলাতেও আমাকে ওখান থেকে টেনে নিয়ে এলি! এইসব কিছুতেই তো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তুই ওর প্রেমে পড়ে গেছিস।”
সার্থর চোখের চাউনি থেমে গেল। মনে দ্বিধা, মাথায় প্রশ্ন, সত্যিই কি ও শেষমেশ তুশির প্রেমে পড়ল?
জামিল ওর কাঁধে হাত রাখল তখনই। মাথা নাঁচিয়ে সুরে সুরে গাইল,
“ ওরে বাঁচাও এবার সুন্দরী চোর মনের ঘরে ঢুকেছে।
পুলিশ চোরের প্রেমে পড়েছে,
ও দারোগা, পুলিশ চোরের প্রেমে পড়েছে।”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply