ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা [১৩] (কট ম্যারেজ স্পেশাল)
[ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত ]
খুব দারুণ ভাবে দিন কাটছে মৃত্তিকার। ওদের বাড়ির পিছনে ফসলের বিশাল জমি। ফসল এখনও লাগায়নি। পুরো জমি জুড়ে দূর্বা ঘাস ছড়িয়ে আছে। ছোট ছোট বুনো ফুল ফুটে প্রচণ্ড সুন্দর দেখাচ্ছে জায়গাটা। মাওই মা দের গরু সেখানে ঘাস চিবুচ্ছে। এখানে আসার পর দুটো দিন কেটেছে দারুণ ভাবে। এখানকার সবাই অনেক ভালো। সবার সাথে দ্রুত মিশে যেতে পেরেছে মৃত্তিকা।
নাস্তা করার পর জাহানারার বারো বছরের বোন ইশাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে মৃত্তিকা। আশপাশটা ঘুরে দেখেছে পুরো সকাল। এখানে বড় বড় স্কুল-কলেজ আছে। দালানকোঠা খুব কম৷ সাধারণত টিনের বাড়িই বেশি এদিকটায়। সবার ঘরেই গরু আছে, গোলা ভরা ধান আছে। সবাই খুব সুখী। কেবল মৃত্তিকার মাঝে মাঝে দম আটকে আসে। সব কিছু বৃথা মনে হয়। একজন অপরিচিত ছেলের জন্য মৃত্তিকাকে চলে আসতে হয়েছে। বিয়েটা হবে কিনা কে জানে? বাবা-মায়ের এত ভোগান্তি মৃত্তিকা মেনে নিতে পারছে না। রাতে এক চোট কেঁদেছে সে। কেন এত জ্বালা হৃদয়ে। ইয়াসিনকে ভুলতে পারেনি ঠিকমতো, এরই মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া, আফিমের এই ঝামেলায় জড়িয়ে পরা। সব অনর্থক, অহেতুক। জীবনটা তো সুন্দর হতে পারতো। একটু জাঁকজমকপূর্ণ হলে কি এমন ক্ষতি হতো?
দুপুরে মাওইমা ঘুমিয়েছে। খাওয়াদাওয়ার পর কতকগুলো থালা-বাসন পরে আছে কলপাড়ে। জাহানারা মৃত্তিকাকে ডেকে থালাবাসন গুলো ধুতে বলেছে। মৃত্তিকা না করেনি। কলপাড়ে গিয়ে থালাবাসন ধুয়েছে, ইরহামের ধুলো লাগা কাপড় গুলো ধুয়ে দড়িতে মেলে দিয়েছে। টুকটাক কাজ সে নিজ ইচ্ছেতেই করে। জাহানারা কখনো নিজের কাজ গুলো গছিয়ে দেয় মৃত্তিকার কাঁধে। মৃত্তিকার বিয়েটা এখনো ভাঙেনি। সাকিবের পরিবার সময় নিয়েছে কিছুটা। তবে বাড়ির সকলে ধরে নিয়েছে এ বিয়েটা আর হবে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো মা-বাবাই সন্তানকে বিয়ে দেবে না।
পাশের গ্রামের এক মেয়ের বিয়ে। মৃত্তিকা চেনে না তাকে। তবে জাহানারার পরিচিত এক বোনের বিয়ে। মাওইমা জানিয়েছেন মৃত্তিকাকে যেতেই হবে। ইশার সাথে কাল সকালে যাবে, একেবারে কনের বিদায়ের পরেই আসবে। সারাদিন গ্রামের বিয়ে দেখবে, আনন্দ করবে, নাচ গান দেখবে। তবেই না গ্রামে আসার আসল আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। সারাদিন বাড়িতে থেকে মৃত্তিকার বিরক্তি ধরে যাবে ভেবে মাওইমা মৃত্তিকাতে তোষামোদ করলেন যাবার জন্য।
কথা মতোই সকালে ইশা আর মৃত্তিকা বেরিয়ে পরেছে। হাঁটার পথ, যানবাহন চলে না এদিকে। মৃত্তিকা আর ইশা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিয়েছে পাশের গ্রামে। দু ধারে ক্ষেত, মাঝের আইল দিয়ে চলেছে ওরা। মৃত্তিকা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অবলোকন করে গ্রামীণ দৃশ্য। পিচ ঢালা রাস্তার উপরে শস্যদানা ছড়িয়ে আছে, রৌদ্রের তাপে তা চকচকে হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। মৃদু বাতাসে দুলছে ওড়নার প্রান্ত। ইশা হেঁটে যাচ্ছে আগে, পেছনে যাচ্ছে মৃত্তিকা।
বিয়ে বাড়ির আয়োজনে কোনো ত্রুটি নেই। কলা গাছ দিয়ে গেট বানিয়েছে, প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। আশপাশ পরিস্কার, ঝকঝকে। আশপাশের সব মহিলারা হাতে হাতে কাজ করছে একসাথে। উঠোনে মাংস, মশলাদি, সবজি সব কেটে রেখেছে। মৃত্তিকা আর ইশা বউয়ের সাথেই আড্ডা দিল অনেকক্ষণ। দুপুরের লাঞ্চ করার পর মৃত্তিকা একটি গাউন পড়েছে। সাদা রঙের অনেক ঘের দিয়ে তৈরি গাউন। গাউনের নিচের অংশে গোল্ডেন সুতো আর স্টোনের কাজ করা, ওড়নাটা জর্জেটের। মৃত্তিকা আর ইশা সারাদিন আনন্দ করে, ঘুরে বেড়ায়, বড়দের সাথে কাজ করে। সন্ধ্যায় বরপক্ষ আসে। ইশা বাকি বাচ্চাদের সাথে গেট ধরে। বরপক্ষের সাথে দুষ্টুমি করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। মৃত্তিকা দেখে সব।
সন্ধ্যায় আরো একবার খাবার দেওয়া হয় মৃত্তিকাদের। পরোটা আর মাংস খেয়ে মৃত্তিকা কলপাড়ে আসে। কলপাড়ের চারদিকে আর উপরে টিন দিয়ে বেড়া দেয়া। টিউবয়েল চেপে পানি আনতে হয়। ওদিকে প্যান্ডেলে বরপক্ষ আর কনে পক্ষের লোকজন বসে আছে। বক্স বাজছে খুব জোরে। কলপাড়ে এসে মৃত্তিকা হাত ধুতে ধুতে গানের তালে তালে গেয়ে ওঠে। সাবান দিয়ে হাত ঘষে হাত-পা সহ ধুয়ে নেয়। সে অমনোযোগী হয়ে পরে কিছু সময়ের জন্য। সহসা পেছন থেকে একটি গম্ভীর, পুরুষালি কণ্ঠ শুনতে পায় মৃত্তিকা। চমকে ওঠে সে, ধরফর করে বুক। সাথে সাথে পিছু ফিরে সবুজাভ, তীক্ষ্ণ চোখের পুরুষকে দেখে মৃত্তিকা থমকে তাকায়। গা অসাড় হয়ে আসে মেয়েটার, হৃদপিণ্ডে ক্রমাগত তোলপাড় শুরু হয়। নিজ চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ বুজে নেয় মৃত্তিকা। বড় শ্বাস ফেলে ফের তাকিয়ে সম্মুখের হেলমেট পড়া দানবীয় দেহের মানুষটাকে দেখে টাল হারায় মৃত্তিকা। দু পা পেছাতে গিয়ে কলপাড়ের শ্যাওলাটে, পিচ্ছিল সিমেন্টে স্লিপ খেয়ে পরে যেতে নেয়। পেছনে ঝুঁকে যায় তার দে।। অস্ফুটে “আহ্” জাতীয় শব্দ করে সে। তৎক্ষনাৎ পুরুষালি, শক্ত-পোক্ত হাত চেপে ধরে মৃত্তিকার পাতলা কোমর। মৃত্তিকা সাথে সাথে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে সম্মুখের মানুষটি টিনের বেড়া আটকে দেয় লোহার শিকলে। মৃত্তিকা ভয়ে জমে যায়। সেই চোখে পুনরায় চোখ পরে মৃত্তিকার। অসম্ভব তেজ, হিংস্রতা মিশে আছে আফিমের চোখে। মুখ দেখতে না পেলেও আফিমকে চিনতে একটুও বেগ পেতে হয় না মৃত্তিকার। হালকা সবুজাভ চোখ তার চেনাজা শুধু আফিমেরই আছে। এই মানুষটাই কেবল এত ভয়ঙ্কর ভাবে তাকাতে পারে, ব্যগ্র হয়ে তাকে টেনে নিতে পারে নিজ বাহুডোরে। মৃত্তিকা দ্রুত ঝুঁকে পড়া দেহ সোজা করে। ঠেলে দেয় আফিমের বুক। বাজখাঁই স্বরে বলে,
“- আপনি কিভাবে এসেছেন? কেন এসেছেন? সরে দাঁড়ান, দুরত্ব বজায় রাখুন”।
আফিম হাসে গাঢ় ভাবে৷ যদিও হেলমেটের আড়ালের সূক্ষ্ম হাসি দেখা যায় না। কিন্তু আফিমের চোখের গভীরতা, তার হাসিকেও ছাপিয়ে যায়। চোখ জোড়াও যেন সমান তালে হাসছে। কি ভয়ানক!
“- মৃত্তওও, আমাকে হারানোর খেলায় তুমি হেরে যাচ্ছো”।
মৃত্তিকা থম মেরে যায়। লাইট জ্বলছে, তবুও কিছুটা অন্ধকার হয়ে গেছে জায়গাটা। টিনের বেড়ার ছোট্ট ফুটো দিয়ে আলো আসছে। আফিম আটকে দিয়েছে দরজাটা। দাঁড়িয়ে আছে সামনেই। বের হবার রাস্তা নেই। ভয়ে হাত-পা নাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
“- আমায় যেতে দিন”।
আফিম এগিয়ে আসে দু পা। মৃত্তর একদম নিকটে এসে দাঁড়ায় সে। কর্কশ, আগ্রাসী কণ্ঠে বলে,
“- তোকে বলেছি না তোকে দেখতে আসবো? বলেছিলাম কি না? তারপরেও পালালি কেন? আমার চোখ দুটোকে তৃষ্ণায় ছটফট করতে দিলি কেন”?
“- দয়া করে ছেড়ে দিন। কেউ এসে পরলে ক্ষতি হয়ে যাবে”।
“- এই ভয় আগে কেন পাসনি? দুটো দিন কুত্তার মতো ছুটেছি, তোর হদিশ পেতে। আমাকে তোর কুত্তা মনে হয়? জবাব দে”।
আফিম ছুঁলো না মেয়েটাকে। তবুও তার আক্রমণাত্মক কণ্ঠে খেই হারায় মৃত্তিকা। এঁটে যায় সে টিনের বেড়ার সাথে। অসহায়, ছলছল চোখে দেখে আফিমকে।
“- একদম ওভাবে তাকাবি না, কাঁদবি না। কান্না দেখতে আসিনি, উত্তর দে। শহর ছেড়ে এখানে এসে ঘাপটি মেরেছিস কেন? ভেবেছিস আমি তোর নাগাল পাবো না?”
ক্যার ক্যার করে শব্দ হয় দরজায়। দরজার ওপাশ থেকে তখনই কারা যেন চেঁচিয়ে ওঠে। তাদের উচ্চ, আগ্রাসী কণ্ঠে মৃত্তিকা আরো ভয়ে গুটিয়ে যায়। একজন মহিলা বলছে,
“- আমি নিজের চোখে দেখছি কলপাড়ে একটা মাইয়া ছিল। ওই মাইয়া বাইর না হইতেই আরেকটা পোলা ঢুইকা দরজা লাগাই দিছে। দুইজন এখন ভিতরেই আছে”।
আকস্মিক এ কথা শুনে মৃত্তিকার মরি মরি অবস্থা হয়। দরজার ও পাশে কতজন আছে জানে না মৃত্তিকা। তবে ধারণা করতে পারছে কিছুক্ষণের মধ্যেই মহিলা এবং পুরুষের দলবল ঝাঁপিয়ে পরবে দরজার উপর। মৃত্তিকা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। আফিম খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ করে সবটা। সে বেড়ায় আটকানো লোহার শিকল খুলতে নিতেই বাঁধ সাধে মৃত্তিকা,
“- খুলবেন না, সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে”।
আফিম শীতল কণ্ঠে বলে,
“- লুকিয়ে থাকলে আরো উল্টাপাল্টা ভাববে”।
একজন বয়স্ক লোকের কণ্ঠ শোনা গেল।
“- ভেতরে কে কে আছো, বাইর হও। নষ্টামি ছুটাই দিমু আজকে। ওই তোরা লাঠি নিয়া আয়”।
ঢুকরে কেঁদে ওঠে মৃত্তিকা। ঝরঝর করে কাঁদতে আরম্ভ করে। বলে,
“-, এখন কি হবে? ওরা আমাদের মিথ্যে অপবাদ দেবে। কেন করলেন আপনি? কেন আটকালেন আমায়”?
“- কিছু হবে না, আমি দেখছি”।
হেলমেট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে আফিম। সবাই এক সাথে চেঁচিয়ে ওঠে। বলে,
“- মেয়েটারে বাইর করো, কি অবস্থায় আছে কে জানে”?
আফিম হাত উঁচিয়ে বলে,
“- ওর গায়ে কেউ টাচ করবেন না। ভদ্র ভাবে কথা বলুন”।
বয়স্ক একটি লোক, পরনে লুঙি আর ঢিলে শার্ট। সে অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে বলে,
“- নষ্টামি করতে লজ্জা লাগে না? আবার বড় বড় কথা। মাইয়াটারে ধইরা আন”।
দুটি মোটাসোটা মহিলা ঢুকে যায় কলপাড়ে। মৃত্তিকাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে বাইরে। আফিম চাইলেও আটকাতে পারে না তাদের। একে তো তারা মহিলা, তার উপর এখানে আফিমের কোনো আধিপত্য খাটবে না। এত গুলো মানুষের সাথে লড়াই করার জোর তার নেই। মৃত্তিকা কিছুতেই আসতে চায় না। ক্রন্দনরত ভাঙা কণ্ঠে বারবার অনুনয় করে বলে,
“- আল্লাহর দোহাই লাগে, ছেড়ে দিন আমাকে। আমি ওরকম মেয়ে না, বিশ্বাস করুন। আমার গায়ে কাঁদা ছুঁড়বেন না দয়া করে”।
একজন মহিলা বলে ওঠে,
“- আমি কান পাইতা শুনছি, ভেতর থিকা ওইসব শব্দ আইতাছিল। মাইয়া কানতাছিল। ছিঃ আমার কইতেও শরম করে।”
লজ্জায়, অপমানে মৃত্তিকা নুইয়ে পরে। কান ঝা ঝা করে ওঠে মেয়েটার। মাটি ফাঁক করে ঢুকে পরতে ইচ্ছে করে। আরেকজন মহিলা বলে,
“- হ, মতিনের মা আমারে কইছে যে ভিতর থিকা পোলা আর মাইয়ার অশলীল শব্দ আইতাছে, শুইনাই আমি দৌড়াই আইছি”।
ওদের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে মৃত্তিকা হতভম্ব হয়ে যায়। ঘৃণায়, অপমানে গা দুলে ওঠে মেয়েটার। ওদের হাত থেকে ছাড়া পেতে অনুনয় করে সে। ওরা টেনে ধরে মৃত্তিকার ওড়না। ফলশ্রুতিতে ওড়নায় থাকা সেফটিপিনে কেটে ছুঁড়ে যায় মৃত্তিকার কাঁধ। জ্বলন হয় শরীরে। যতটা কষ্ট শরীরে হয়, তার চেয়েও মনে বেশি জ্বালাপোড়া করে। মিথ্যে, নোংরা শব্দগুলো কানে বারি খায়। আফিম গর্জে উঠে বলে,
“- মিথ্যে বলেন কেন? আমাদের মধ্যে তেমন কিছুই হয়নি। শুধু শুধু নিজের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দেবেন না”।
এক লোক বলে,
“- বড় বড় কথা কইয়া লাভ নাই। দামড়া পোলা মাইয়া একসাথে কলপাড়ের দরজা আটকাইয়া কি করে আমরা জানি না ভাবছো? তোমরা দরজা লাগাইছিলা ক্যান?”
আফিম কিছু একটা ভেবে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“- আমরা স্বামী-স্ত্রী। আপনারা ভুল ভাবছেন”।
তখনই ভিড়ের মাঝ থেকে ইশা বলে ওঠে,
“- মৃত্তিকা আপু, তুমি না অবিবাহিত। ও কি বলছে এসব? তুমি বিয়ে করলে কবে”?
থমকে যায় সকলে। এক বয়স্ক লোক হুংকার ছেড়ে বলে,
“- এই পোলা মাইয়ার বিয়া দেওন লাগবো। কাজীরে ডাকো। বিয়া বাড়িতে আইসা এইসব নোংরামি চলবো না”।
মৃত্তিকা চিৎকার করে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলে গেছে মেয়েটার। বজ্র কণ্ঠে বলে,
“- না, আপনারা এমন করতে পারেন না। আমি কিছুতেই বিয়ে করবো না”।
কেউ শোনে না মৃত্তিকার আহত কণ্ঠ। আফিমকে কয়েকটা ছেলে টেনে নিয়ে যায়। মৃত্তিকার মাথায় ওড়না পড়িয়ে নিয়ে যায় ঘরে। ভিড়ের মাঝে মৃত্তিকা কেঁদে ওঠে। কাজী আসে হন্তদন্ত হয়ে। এসেই সূরা, দোয়া পাঠ করে। দুজনকে পাশে বসিয়ে প্রথমে আফিমকেই কবুল বলার তাগাদা দেয়। আফিম শূন্য দৃষ্টিতে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। মেয়েটা মোটেই তাকে স্বামী হিসেবে চায় না। সেও চায়নি এভাবে বিয়েটা হোক। বিয়ে করার জন্য এতদিন আকুপাকু করছিল, আজ যখন না চাইতেও সেই সুযোগ হাজির হয়েছে, তখন আফিমের সংকোচ হচ্ছে। কবুল বলতে সময় নিচ্ছে আফিম। ওদিকে সবার উদ্ভট কথা কানে বাজছে। পরক্ষণেই আফিম ভাবল, সে গুণ্ডা, বখাটে। অন্যান্যদের মতো সহজ, সাবলীল ভাবে বিয়ে হলে তার বিশেষত্ব হারিয়ে যেত। তার সাথে বাকিদের আর ফারাক থাকবে না। এরকমই ঠিক আছে, তাকে এভাবেই মানায়। আফিম কোনোভাবেই ঝামেলাহীনভাবে বিয়ে করতে পারে না। সে যেহেতু মাস্তান, সবেতেই গ্যাঞ্জাম থাকতে হবে।
মৃত্তিকাকে রীতিমতো জোর করেই কবুল বলানো হয়েছে। তিনবার আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল বলে মুখে কুলুপ এঁটেছে সে। একটা কথাও বলেনি আর। মৃত্তিকা আর আফিমকে ফুলের মালা পড়ানো হয়েছে। চাঁদপানা মুখ খানা আঁধারে ঢেকে গিয়েছে মৃত্তিকার। ফ্যাকাসে বদনে ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে সবাইকে। ওরা এত নিষ্ঠুর কেন হলো? কেন এমন ছলনা করল এভাবে, চরিত্রের দিকে আঙুল তুলল? মৃত্তিকা তো অমন খারাপ মেয়ে নয়।
পাটির আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আফিম আর মৃত্তিকা। দুজনই বিধ্বস্ত এবং চুপচাপ। মৃত্তিকার ঘাড় জ্বালা করছে। তবুও নিগূঢ় হয়ে পথের পানে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বিরামহীন। পাশেই আফিম হাঁটছে। দৃষ্টি তার মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকার ওড়নার সেফটিপিন কোথায় হারিয়েছে কে জানে? জর্জেটের ওড়না কাঁধ বেয়ে গলে যাচ্ছে নিচে। অলসতায় ওড়নাটি খানিক বাদে রাস্তায় লুটিয়ে পরে। মৃত্তিকার খেয়াল নেই। থাকলে হয়তো ঝট করে তুলে নিতো ওড়নাটা। নিতান্তই অবহেলায়, অনাদরে ওড়না উড়ে যেতেই আফিমের নজর পরে মৃত্তিকার দিকে। উদাম বুক দেখে ছেলেটা ভড়কে যায় তৎক্ষনাৎ। সবেগে পিছিয়ে এসে তুলে নেয় কাপড়টি। ফের এগিয়ে মৃত্তিকার কাঁধের দু পাশে এঁটে দেয়। ধ্যানচ্যুত হয় মৃত্তিকা। ফ্যালফ্যাল করে তাকায় আফিমের দিকে। তাকে এতটা নিকটে দেখে শ্বাস আটকে আসে মেয়েটার। ছটফট করে দূরে সরে দাঁড়ায়। আচমকা সে চেপে ধরে আফিমের শার্টের কলার। আক্রমণাত্মক কণ্ঠে রুক্ষ স্বরে বলে ওঠে,
“- আপনি, আপনি সব করেছেন তাই না? এটাই তো চেয়েছিলেন? এসবের জন্যই তো এতদিন পিছু লেগে ছিলেন। পূর্ণ হয়েছে ইচ্ছে? এবার ছাড়ুন আমায়, মুক্তি দিন”।
আফিম গা দুলিয়ে হাসে। তার হাসির ঝংকারে মৃত্তিকার হাত খসে পরে শার্ট থেকে। আফিম মৃত্তিকার থুতনিতে দু আঙুল ঠেকিয়ে উঁচু করে মেয়েটার নত মুখ। কানের কাছে ঠোঁট ঠেকিয়ে আলতো, ফিসফিস করে বলে,
“- আই ডিডন্ট জাস্ট ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ মৃত্ত, আই অলসো ওয়ান্টেড টু টাচ ইউ ডিপলি অ্যাজ ওয়েল। টেল মি, ইজ দেয়ার এনি ওয়ে”?
ছলকে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। বিস্ময়ে সরে আসতে নিলে হেলে পরে সে৷ আফিম খুব তাড়াহুড়ো করে পাজোকোলে তুলে নেয় মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার মাথাটা নিজ বুকের মাঝে জাপটে ধরে। ঘন, লম্বা কেশ উড়তে থাকে বাতাসের দাপটে। মৃত্তিকা দু হাতে কিল বসায় আফিমের মুখে। দুর্বল হাতে বারবার ধাক্কা দেয় বুকে, মাথা তুলতে বৃথা চেষ্টা করে। আফিম হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“- মৃত্ত, তুমি প্রতিদিন কাঁদবে, ঠিক আছে? তোমার চোখের পানিতে ভিজে জবজবে হওয়া মুখটা দেখবো বলেই আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। নইলে শাফায়াত আফিম মির্জা বিয়েতে একদমই বিশ্বাসী না।”
বাইকে চড়ে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরতে লেগেছে চার ঘন্টা। আফিম যদিও মৃত্তিকাকে বলেছিল জাহানারাদের বাড়িতে ফিরতে, কিন্তু মৃত্তিকা শোনেনি। বাড়ি ফেরার পথ তার বন্ধ। ভাবির কানে খবরটা তখনই পৌঁছেছে। নিশ্চয় সে গালাগাল সাজিয়ে রেখেছে। ফেরা মাত্রই অসংখ্য কটু কথা শোনাবে তাকে, চরিত্রের দিকে আঙুল তুলবে। মৃত্তিকার আর এসব সহ্য হচ্ছে না। এই নোংরা কথাগুলো কাঁটার মতো বিঁধছে দেহে। আফিম খুব ভালো রাইডার। কিছুটা ধীরেসুস্থেই রাইড করেছে বাইকটা। এবার সিদ্ধান্ত নেবার পালা মৃত্তিকা কোথায় যাবে।
মৃত্তিকাদের বাড়ির মোড়টায় আসতেই চেঁচিয়ে ওঠে মৃত্তিকা। আফিমের কাঁধ খামচে ধরে বলে,
“- আমি বাড়ি ফিরবো না”।
মিটিমিটি হাসে আফিম। মিছে গম্ভীরতা দেখিয়ে বলে,
“- কোথায় যাবে তাহলে”?
“- জানি না, তবে বাড়ি ফিরবো না। আর কোনো অকথ্য ভাষা শুনতে পারবো না। সবাই আমাকে ভুল বুঝবে। যদি ভুল না বুঝতো, এতক্ষণে কল করতো। জানতে চাইতো আমি কেমন আছি”।
ছলছল করে উঠল মৃত্তিকার চোখ। ঠোঁট ভেঙে এলো। ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“- কেউ বিশ্বাস করবে না আমাকে। কেউ না”।
আফিম ক্লান্ত চোখে পরখ করে মেয়েটিকে। একটু হেসে বাইক স্টার্ট দেয়। সাথে সাথে মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করে,
“- কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন”?
“- মির্জা ভিলায়”।
কিছুক্ষণ বাদে মির্জা ভিলায় পৌঁছায় ওরা। রাজপ্রাসাদের মতো বিরাট বাড়িটাকে দেখে থ বনে যায় মৃত্তিকা। বিশাল বড় গেট পেরিয়ে ঢুকতেই দু পাশে বিভিন্নো ফুল গাছের সারি দেখে পুলকিত হয় মৃত্তিকার হৃদয়। মির্জা ভিলা প্রথম দেখেছে সে। এ বাড়ির সাথে আফিমকে ঠিক যায় না। সে মধ্যবিত্ত ছেলেদের সাথে বেশি মেশে, রাস্তায় সর্বদা সাদামাটা ভাবে পাওয়া যায় তাকে। অথচ মির্জা ভিলার সদস্য হিসেবে তার আরো আভিজাত্যপূর্ণ, চাকচিক্যময় জীবন পার করার কথা।
দারোয়ান ওদের দেখেই গেট খুলে দিয়েছে। বাড়িতে আলো জ্বলছে ঠিকই কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। আফিমে পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। তার পিছু পিছু ঢোকে মৃত্তিকা। পুরো বাড়ি আর সিঁড়িগুলোতে চোখ বুলিয়ে মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- আমি বাড়ি যাবো”।
আফিম ভ্রূ কুঁচকে বলে,
“- বউ তুমি আমার, আমার বাড়িতেই থাকতে হবে তোমাকে”।
ঢোগ গেলে মৃত্তিকা। আপাদমস্তক মুড়িয়ে বলে,
“- আমার এখানে আসা উচিত হয়নি। আপনার সাথে আমি কিছুতেই সংসার করতে পারবো না”।
“- নিজের ইচ্ছেতে এসেছো, যেতে হবে আমার মর্জিতে। রাত অলমোস্ট দেড়টা বাজে মৃত্ত, জেদ করো না”।
দমে যায় মৃত্ত। আফিম নিজের ঘরে আসে। ঘরে একটা নরম তুলতুলে বিছানা আছে, কাউচ আছে, টি টেবিল, কাবার্ড আর ড্রেসিং টেবিল আছে। ফুলদানি, পেইন্ট করা ফ্রেম দেয়াল জুড়ে লাগানো। সুন্দর,পরিপাটি ঘর। একটুও নোংরা নেই কোনো ফাঁকে। মৃত্তিকা আধো আধো স্বরে বলে,
“- আর কেউ নেই এখানে”?
আফিম কাবার্ডের ড্রয়ারে নিজের ফোন, ওয়ালেট, ওয়াচ রাখতে রাখতে ফিরে বলে,
“- বাবা আছে হয়তো, নাও থাকতে পারে।”
“- আপনারা দুজনই থাকেন”?
“- দুজন সার্ভেন্ট আছে, ওরা রাতে থাকে না। কাজবাজ করে চলে যায়”।
মৃত্তিকা ভয়ে কেঁপে ওঠে। তারা দুজন এ বাড়িতে একা থাকবে? আফিম যদি সুযোগ নিতে আসে? যদি অসভ্যতামো করতে আসে? কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে? পরক্ষণেই মৃত্তিকা ভাবে, ছুঁতে আসলেও বা কি করার? ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তারা স্বামী-স্ত্রী। তারা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ হলেও কারো কিছু বলার থাকতে পারে না। এখানে অভিযোগ কিংবা প্রতিবাদ করার অধিকার নেই। ভাবতেই গাই গুই করে ওঠে মৃত্তিকা। অস্থির স্বরে বলে,
“- আমাকে দিয়ে আসুন, আমি থাকবো না৷ আমার ভালো লাগছে না এখানে, খারাপ লাগছে”।
আফিম এগিয়ে আসে সবেগে। নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ছুঁয়ে দেয় মৃত্তিকার ললাটে। জ্বর নেই বুঝতে পেরে বলে,
“- খিদে পেয়েছে? কিছু খাবে”?
মৃত্তিকা উপেক্ষা করে আফিমের আগ্রহ, উৎকণ্ঠা আর দায়িত্ব। নতজানু কণ্ঠে অনুরোধ করে বলে,
“- আমার ভালো লাগছে না, সত্যি বলছি। নাটক করছি না, বিশ্বাস করুন”।
আফিম দমে কিছু সময়ের জন্য। গভীর নয়নে মৃত্তিকার দিকে চেয়ে থাকে। মৃত্তিকার মুখ ঘামে ভিজেছে, বোধহয় ভয়ও পাচ্ছে সম্মুখের সুদর্শন পুরুষটিকে। আফিম হাসে গাঢ় চোখে। অস্থির হয়ে ওঠে মৃত্তিকা। পালাবার পায়তারা করতে থাকে। আফিম মৃত্তিকার চিবুক ছুঁয়ে মোহগ্রস্ত, নেশাতুর কণ্ঠে বলে,
“- আজকের রাতটুকু আমায় দাও, আমার গোটা জীবন তোমায় দিতে প্রস্তুত”।
মাদকতা মেশানো গভীর কণ্ঠ। গা দুলে ওঠে মেয়েটার। তিরতির করে কেঁপে ওঠে অধরযুগল। ঘন নেত্রপল্লব ঝাপটায় কয়েকবার। মাথা উঁচু করে পাহাড়ের মতো দানব দেহটি দেখে সে। নিঃসন্দেহে আফিম সুন্দর। সবচে সুন্দর তার ধারাল, তীক্ষ্ণ চোখ। এক মুহুর্তের জন্য আবেশিত হয়ে পরে মৃত্তিকা। আশপাশের সবকিছু ভুলে বশিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকে আফিমের পানে। তার কথার মর্মার্থ বুঝে দুর্বল দেহখানি সতেজ হয়ে ওঠে। আফিম এক হাত গলিয়ে দেয় মৃত্তিকার গালে। মসৃণ, মোলায়েম ত্বকে হাত ছোঁয়াতেই আফিমের গা ছনছন করে ওঠে। সংযম হারাতে বসে। দ্রুত সরে যায় সে। মাথা চুলকে বলে,
“- তুমি বসো, আমি দেখছি খাবার কিছু আছে কিনা”।
মৃত্তিকা যেতে দেয় না আফিমকে। বুক ভরে শ্বাস টেনে বলে,
“- আমার কিছু বলার আছে”।
থেমে যায় আফিমের পদযুগল। স্থির হয়ে দাঁড়ায়। হাত-পা ঝারা দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলে,
“- বলো?”
অতীতকে ঘাঁটতে গিয়ে মৃত্তিকার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আসে। আফিম একবার বলেছিল তার গায়েও কলঙ্ক আছে। আফিম কি জানে না পুরুষের গায়ে কলঙ্ক লাগতে পারে না, পুরুষের কোনো খুঁত থাকে না? কলঙ্ক কেবল নারীদের জন্যই, সব দোষ-ত্রুটি নারীদের মাঝেই নিহিত। জানলে কি বলতো?
“- আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি”।
তার বাক্যে ভুল শব্দ শুনে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আফিম বলে,
“- উঁহু, বলো ভালোবাসতে।”
অবাক হয় মৃত্তিকা। আফিম বলে ওঠে,
“- ইয়াসিনকে তুমি প্রচণ্ড ঘৃণা করো। যখন ঘৃণা আসে, তখন ভালোবাসা থাকে না”।
“- আপনি কি করে জানেন”?
“- জেনেছি”।
“- বলুন, কিভাবে জেনেছেন? ইয়াসিন আপনাকে বলেছে”?
“- মাথা খারাপ, ওকে সামনে পেলে পিস পিস করে কাটবো। লুইচ্চা কোথাকার, নুন্টু কেটে দেবো ও যদি আমার সামনে আসে”।
তব্দা খায় মৃত্তিকা। বিভ্রান্তিতে ছেয়ে যায় হৃদয়। বলে,
“- এ মাসে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। আপনার কি মনে হয় না ইয়াসিনের মতো ছেলের সাথে চলাফেরা করে আমি আমার সতীত্ব হারিয়েছি”?
মৃত্তিকার এ কথায় তাজ্জ্বব বনে যায় আফিম। মৃত্তিকা এ ধরণের কথাও বলতে পারে? তার বউ তো স্বল্পভাষী। তার দেহ-মনে মন্দ বলে কিচ্ছুটি নেই। নিজেকে কলুষিত করার প্রয়াস চালাচ্ছে মেয়েটা?
“- চড় মেরে তোমার ফাইজলামি আমি ছুটিয়ে দেবো মৃত্ত। ভুল ভাল বকছো কেন? দেখি কাছে আসো, মাথায় পানি দিয়ে দিই। অতিরিক্ত শক পেয়ে তোমার ব্রেইন খুলে পরে যাচ্ছে”।
এ সময়েও আফিমের এহেন হাসি আর রসিকতা শুনে গোজ গোজ করে মৃত্তিকা। কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
“- আমি মজা করছি না”।
আফিম গম্ভীর হয়ে বলে,
“- আমিও মজা করছি না। কোনোদিন কারো সাথে সম্পর্কে জড়াইনি। নারীদের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ছিল এতকাল। ইদানিং সে বিতৃষ্ণা তৃষ্ণায় পরিণত হয়েছে তোমাকে দেখে। শোনো, আমি তোমায় যতটুকু জানি, তুমি নিজেও তোমাকে ততটুকু জানো না”।
মৃত্তিকা নাক টানে। আফিম সিগারেটের প্যাকেট বের করে। লাইটার দিয়ে সিগারেট জ্বালায় সে। বিরাট থাই গ্লাসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়। মৃত্তিকার চিবুক ঠেকে বুকে। আফিম সিগারেটে সুখ টান দিতেই মৃত্তিকা বরাবরের মতোই বুকের ওড়না নাকে-মুখে চেপে ধরে। আফিম আলতো হাসে তাতে। মাদক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“- তোমায় বিয়ে করতে চাওয়ার আরেকটা রিজন কি জানো? আমি সিগারেট ধরালে তুমি নাক কুঁচকে ফেল, ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকো, বিরক্ত হও। এই সিন টুকু আমার জোশশ লাগে। তোমায় জ্বালাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে মৃত্ত”।
থেমে পুনরায় আওড়ায়,
“- তুমি এত আদুরে কেন বলো তো? তোমার মুখে এত মায়া কেন? সৃষ্টিকর্তা তোমায় সৌন্দর্য ঢেলে দিতে আরেকটু কার্পন্য করলে কি এমন ক্ষতি হতো বলো”?
মৃত্তিকা লজ্জা পায় খুব। ফোলা গাল দুটো রক্তিম হয়ে ওঠে মেয়েটার। হাস ফাঁস করে বলে,
“- কি সব বলছেন”?
আফিম থেমে বলে,
“- তুমি ঘুমোও”।
“- আর আপনি”?
“- আমার ঘুম হবে না”।
“- কষ্ট পেলাম আমি, ঝড় আমার উপর দিয়ে বয়ে গেল। আপনার ঘুম আসবে না কেন”?
আফিম আঙুলের ভাঁজে রাখা সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলে,
“- তুমি বুঝবে না”।
প্রতিবাদ করে মৃত্তিকা বলে,
“- বললেই বুঝবো”।
আফিম বাঁকা হেঁসে প্রত্যুত্তরে বলে,
“- আজ আমাদের ফার্স্ট নাইট। ঘরে আগুন সুন্দরী বউ রেখে কোনো স্বামীই ঘুমোতে পারবে না। যদিও বা পারে তাহলে বুঝতে হবে হয় তার যৌন সমস্যা আছে, নয়তো সে গে”।
থতমত খায় মৃত্তিকা। আফিমের মুখে এরকম কথা শুনে সে শঙ্কিত কণ্ঠে বলে,
“- আপনি অন্য রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ুন, নইলে আমাকে অন্য রুম দেখিয়ে দিন”।
“- আমি তোমায় ছোঁবো না, যতদিন না তুমি চাও। ঘুমোও, আমি এখানেই আছি”।
কেন যেন ভরসা পায় মৃত্তিকা। আফিমকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। মনে হয় ছেলেটা তার কথা রাখবে। কিন্তু আদৌ আফিম সিদ্ধান্তে অটল থাকবে? নাকি সংযম ভুলে পুরুষত্ব দেখাতে আসবে? এলেও তো বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা মৃত্তিকার নেই। মৃত্তিকা কম্ফোর্টার টেনে শুয়ে পরে। আফিম এক নজর দেখে ফের থাই গ্লাস দিয়ে শহরের সব বিল্ডিং গুলো দেখে। দেয়াল ঘেঁষে রাখা গিটার টা আনমনেই হাতে তুলে নেয় ছেলেটা। তারে আঙুল বুলিয়ে এক সময় ছন্দ তোলে গানে। চমৎকার গভীর কণ্ঠে গেয়ে ওঠে সেদিনের সেই গান।
“- ইচ্ছে যত, উড়িয়ে দেবো, হঠাৎ দমকা হাওয়াতে।
দস্যু হয়ে তারা, ভাঙবে যে পাহারা, জাগাবে তোমায় রাতে,
“বলো না বলো শুনতে কি চাও? বলো না বলো শুনতে কি পাওওও? বলো না বলো আজকে আমায়”।
মৃত্তিকার কানে পৌঁছায় গানটুকু। গানের সুরটা আরামদায়ক। আফিমের কণ্ঠ মারাত্মক সুন্দর। গানটা তার কণ্ঠে অদ্ভুত ভাবে মানিয়েছে। তাকে থামতে দেখে মৃত্তিকা বলে বসে,
“- থামলেন কেন”?
আফিম মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে ফিক করে হেসে ওঠে। বলে,
“- গানের অর্থ বুঝেছো”?
মৃত্তিকা অবুঝের ন্যায় মাথা ঝাকায়। গানটা নিজ মনে আওড়াতেই কঠিন কয়েকটি শব্দ মাথায় এঁটে যায়। হা করে সে তাকিয়ে থাকে আফিমের দিকে। রেগে লাল হয়ে বলে,
“- ঘুমোচ্ছি আমি, আপনি আর গান গাইবেন না”।
আফিম মজা করে বলে,
“- কেন? রাত জাগবে না, দস্যু হতে দেবে না? পাহারা ভাঙতে অনুমতি নেই”?
মৃত্তিকা মুখ ঢেকে ফেলে কমফোর্টার দিয়ে। মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। কখন ঘুমে চোখ লেগে যায় বুঝতেও পারে না সে।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ গত পর্ব গুলোর রিচ দেখে আর লেখার ইচ্ছে নেই। আমাকে আপনারা গালি দিন, তবুও বলবো আমি হতাশ। আর গোপালগঞ্জের ভাষা জানি না বলে নিজ মতো লিখেছি। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৬
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮