একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব_১০
শ্রাবণ সবার সামনে ড্রয়িং রুমে মেঘলাকে না নামিয়ে সোজা নিয়ে যাচ্ছে উপরে। সাজ্জাদ হোসেন সাথে সাথে জিজ্ঞেস করল ,”কি হয়েছে ওর ?এভাবে কোলে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস ?”
শ্রাবণ বললো,” উপরে নিয়ে যাচ্ছি ।ভয়ের কিছু নেই একটু পায়ে ব্যথা পেয়েছি আর কিছুই না।”
তাকিয়ে দেখলো,” পায়ে যে গাছের ডাল দিয়ে খোঁচা লেগেছিল সেখান থেকে ছুলে গিয়ে একটু একটু করে রক্ত বের হচ্ছে ।সাজ্জাদ খান বললেন বারবার এই পায়ের মধ্যে কেন ব্যথা পাচ্ছো মামুনি? কি করে পড়ে গেলে তুমি?”
তানিয়া সবার সামনে বলে উঠলো ,”উপরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ?সোফার রুমে বসাও ?”
শ্রাবণ বললো ,”না রুমে নিয়ে যেতে হবে ।এখানে নামানো যাবে না।”
বলেই শ্রাবণ মেঘলাকে নিয়ে উপরে মেঘলা রুমের দিকে যেতে লাগলো ।মেঘলা রুম পর্যন্ত এসেই দেখলো মেঘলার রুম চাপানো ।দেখে রাফির দিকে তাকালো ।রাফি দরজা খুলে দিল।
দরজা খোলার সাথে সাথে রুমে নিয়ে বিছানায় সুন্দর করে আস্তে ধীরে বসিয়ে দিল শ্রাবণ মেঘলা কে।তারপর সাথে সাথে আলমারি খুলে একটি প্লাজো এবং একটি টি শার্ট বের করে সামনে এনে ধরল মেঘলার।
মেঘলা ভয়ে যেন এখনো কাঁপছিল ।কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে থাকলো শ্রাবণের দিকে ।তারপর বললো,” কি ?”
শ্রাবণ বললো,” ড্রেস নে চেঞ্জ করে নে।”
তারপর রাফির দিকে তাকিয়ে বললো,” রাফি যা আমার রুম থেকে অয়েন্টমেন্ট আর ফার্স্টএইড বক্সটা নিয়ে আয় ।আলমারিতে আছে।”
রাফি সাথে সাথে বের হয়ে চলে গেল ফার্স্ট এইড বক্স আর অয়েন্টমেন্ট আনতে
মেঘলা অবাক হয়ে গেল ড্রেস দেখে।এদিকে মেঘলা ব্যাথা পাচ্ছে আর শ্রাবণ ভাই বলছে ড্রেস পড়তে। মেঘলা অবাক হয়ে বললো,” ড্রেস চেঞ্জ করতে হবে কেন ?”
শ্রাবণ একটু মাথা চুলকে বললো,” তোর কোমরের দিকে জামা একটি অংশ ছিড়ে গিয়েছে ।”
সাথে সাথে মেঘলা কোমরের দিকে তাকালো ।দেখল পুরো কোমর উন্মুক্ত হয়ে আছে।জামা ছিঁড়ে গেছে।সাথে সাথে মেঘলা সেখানে হাত দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করতে লাগলো ।লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। শ্রাবণ বললো,” ঢাকতে হবে না যা দেখার দেখা হয়ে গেছে।
এখন তাড়াতাড়ি ড্রেস করে নে সবাই উপরে চলে আসবে তাড়াতাড়ি।”
মেঘলা ড্রেস হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল ।পায়ে ব্যথা পাচ্ছে উঠতে পারবেনা তাই শ্রাবণ বললো,” আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি দরজা চাপিয়ে দিয়ে।তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নে।”
বলে শ্রাবণ দরজায় কাছে গিয়ে দরজা চাপিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
দুই মিনিটে মধ্যেই মেঘলার ড্রেস চেঞ্জ হয়ে গেল ।সবাই সাথে সাথে চলে এলো উপরে কি হয়েছে দেখার জন্য ।রাফিও চলে এলো ফ্রাস্টএইড বক্স নিয়ে। শ্রাবণ বললো,” তেমন কিছুই না পেয়ারা গাছে উঠেছিল পেয়ারা পারতে ডালের সাথে খোঁচা খেয়ে একটু ব্যথা পেয়েছে।”
শহিদুল খান এবং সাজ্জাদ খান একটু চিন্তামুক্ত হলেন ।সাবিহা সুলতানা গরম পানি নিয়ে আসলেন গরম পানি দিয়ে পা পরিষ্কার করে ছ্যাকা দিয়ে দিলে ব্যথা কমে যাবে।
শ্রাবণ দরজা খুলে দেখলো ড্রেস চেঞ্জ হয়ে গেছে ।সবাই সাথে সাথে রুমে ঢুকলো ।শ্রাবণ হাঁটু ভেঙ্গে মেঘলার পায়ের কাছে বসে রাফির হাত থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটি নিয়ে ধীরে ধীরে র*ক্তগুলো গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলো।
পরিষ্কার করা হয়ে গেলে শুকনো গজ দিয়ে সুন্দর করে মুছে সেখানে মলম লাগিয়ে সুন্দর করে ব্যান্ডেজ করে দিতে লাগলো ।শহিদুল খান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দৃশ্যটির দিকে ।নওরিন আফরোজ সাবিহা সুলতানা সাজ্জাদ খান সবাই এক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে দেখছে।তানিয়া রাগি চোখে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে।
পরক্ষণে সাজ্জাদ খান ভাবল ছিঃ এইসব কি ভাবছে ?শ্রাবন জানিয়ে দিয়েছে এই সম্পর্ক শ্রাবণ চায় না ছয় বছর আগেই ।তাই এসব নিয়ে আর ভাবতে চায় না সাজ্জাদ খান ।থাকুক শুধু ভাই বোন হয়ে থাকুক। এছাড়া মেঘলা তো আর জানে না তাই এ নিয়ে কোন টেনশন নেই।
তানিয়া সবার সামনে বলে ফেললো,”এত বড় মেয়ে গাছে উঠেছিলে কেন গাছে যখন ঠিকমতো উঠতে পারো না ?এইতো পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে ।সে আবার সবাইকে টেনশন দিচ্ছ ?”
সাথে সাথে তানিয়ার দিকে তাকালো মেঘলা ।এবার যেন শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হলো ।বাড়ির মেয়ের ব্যাপারে তানিয়ার হস্তক্ষেপ পছন্দ হচ্ছে না।তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,” ওকি ইচ্ছে করে পড়েছে নাকি ?আর গাছে উঠে পেয়ারা খেতেই পারে ।আমিও খেয়েছি।বাংলাদেশের জন্য এটা খুব নরমাল বিষয়।এটা তেমন কোন ব্যাপার না। বাচ্চা মেয়ে খেলাধুলা করবে গাছে উঠবে সবকিছুই করবে ।ওর বয়স তো আর তোমার আমার মত এত হয়ে যায়নি।”
অন্য কেউ আর কিছুই বলল না যেহেতু শ্রাবণ প্রতিবাদ করেছে ।না হলে বাড়ির মেয়েকে নিয়ে এসব কথাবার্তা বলা কারো পছন্দ হচ্ছিল না ।শ্রাবণ উঠে দাঁড়ালো ।দাঁড়িয়ে বললো,” ঠিক আছে ব্যথার ওষুধ খা ওষুধ খেলে ব্যথা কমে যাবে।”
তানিয়ার দিকে তাকিয়ে শ্রাবণ বললো ,”মেঘলা বাচ্চা মেয়ে ও খেলবে দৌড়াবে গাছে উঠবে ব্যথা পাবে এটাই স্বাভাবিক ।এটা নিয়ে এত ভাবনার কিছু নেই ।”
বলেই রুম থেকে হনহুনিয়ে বের হয়ে গেলো শ্রাবণ।
তানিয়া বুঝতে পারেনি শ্রাবণ এই নরমাল কথা এইভাবে প্রতিবাদ করবে ।তাই তানিয়া চুপচাপ বের হয়ে গেল।
আসমা বেগম ও সাবিহা সুলতানা চুপ করে রইলো ।সাবিহা সুলতানা মানতে পারছে না আউট সাইডের একজন এসে তার মেয়ের ব্যাপারে এসব কথা বলবে ।এদিকে আসমা বেগমের অবস্থা ও সেইন।তানিয়াকে তার এখন সহ্য হচ্ছে না। মনে মনে ঠিক করে নিলেন ছেলের সাথে কথা বলবে ।মেহমান মেহমান এর মত থাকবে বাড়ির কোন সদস্য বা কোন ব্যাপারে যেন নাক না গলায় ।ছেলেকে জানিয়ে দিতে হবে শুধুমাত্র ছেলের দিকে তাকিয়েই এখনো পর্যন্ত একটি কথা বলেনি আসমা বেগম।
এদিকে রাফি রাগে ফুঁসছে ।মনে মনে খুব পুষছে ।কেন মেঘলাকে নিয়ে বারবার তানিয়া এসব ধরনের কথা বলে ?গতকাল ঘুরতে যাওয়ার সময়ও বলেছে আজকেও বলেছে ।এরপর যদি বলে তানিয়াকে এতগুলো কথা শুনিয়ে দিবে রাফি মনে মনে ভাবল।
সাবিহা সুলতানা মেঘলার কাছে এসে বললো,” শুয়ে থাক কিছুক্ষণ ।উঠিস না ।ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে ব্যথা কমে যাবে ।”
বলেই মেঘলার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়ে আসমা বেগমের সাথে বের হয়ে গেল ।সবাই ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হয়ে গেলে একা শুয়ে রইলো মেঘলা।
ভাবতে লাগলো কিছুক্ষণ আগের কথা ।যখন পড়েছিল মনে হলো যেন এক মুহূর্তে যেন নিচে পড়ে যাবে কিন্তু শ্রাবণ ভাই ওকে ধরে ফেলেছিল। ও কোন কিছু না ভেবে ভয়ে চোটে শ্রাবণের গলায় মুখ গুঁজে দিয়েছিল ।কিন্তু ভিতরে ভিতরে ওর কেমন ফিল হচ্ছিল বুঝাতে পারবে না মেঘলা।
সিয়াম ভাইকে ধরলে তো এমন ফিল হয় না যেমন শ্রাবণ ভাইকে ধরার পর ফিল হয়েছিল ।কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে ।বুকে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল মেঘলার ।কিন্তু বুঝতে পারছে না কিছু কেন এমন হয়েছিল।
শ্রাবণ দ্রুত পায়ে হেঁটে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল ।পিছনে যে তানিয়া এসেছিল খেয়াল করেনি বা খেয়াল করতে চাইনি ।পিঠ দেয়ালে লাগিয়েই দেয়ালে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল ।ভাবতে লাগলো কিছুক্ষণ আগের কথা ।মেঘলা যখন ওকে জোরে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে দিয়েছিল এমন অদ্ভুত কেন অনুভূতি হয়েছিল শ্রাবণের?
কেন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল বুকের ভিতর যেন কয়েকটা স্পন্দন থেমে গিয়েছে ।মনে হচ্ছিল সময়টা থেমে গিয়েছে ।মেঘলার উষ্ণ গরম নিঃশ্বাস যখন শ্রাবণের গলায় আছড়ে পড়ছিল কেমন যেন শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল শ্রাবণের শিড়দাঁড়া বেয়ে।
চলবে__
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব_১১
ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। হালকা শীতের ছোঁয়ায় বাতাসে একরকম নরম কাঁপুনি, কুয়াশা ভেজা সকালে চারপাশ যেন কুয়াশায় মোড়ানো।আবছা আলোয় চারিদিক মুগ্ধতা ছড়াচছে। ঘাসের ডগায় শিশির জমে মুক্তোর মতো ঝলমল করছে।বাতাসে শিউলি ফুলের মৃদু গন্ধ আর ঠান্ডা কুয়াশার স্পর্শ। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। তবুও সব কিছু সুগন্ধিময় করে তুলেছে।
মেঘলা ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে পা রাখে। খালি পায়ে ঠান্ডা মাটি ছুঁতেই শরীরের ভেতর একটা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে যায় মেঘলার। ঠোঁট দুটো কাঁপছে।শিউলি গাছটার নিচে রাতের ঝরে-পড়া সাদা ফুলগুলো ছড়িয়ে আছে।কি এখন মোহনীয় রুপে ঢেকে আছে চারপাশ।কিছু ফুল মুখ নিচু করে কিছু আবার কমলা ডাঁটা উঁচিয়ে যেন মেঘলার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেঘলা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো গাছের নীচে।কোমর ভেঙে বসে, একটার পর একটা শিউলি ফুল কুড়াতে থাকে। আঙুলে লেগে থাকে শিশিরের জল ফুলের পাপড়িতে ভোরের বিন্দু বিন্দু শিশির কণা।মেঘলা আপু মনে শিউলি ফুল কুড়াচছে।দূরে কোথাও একটা পাখি ডাক দেয়, কুয়াশার আড়াল থেকে সূর্য উঠবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মেঘলা গ্রামের মেয়ে ।গ্রামে বড় হয়েছে ।শীতের সকালে এইভাবে সূর্য ওঠার আগেই শিউলি ফুল তোলা যেন ওর নিত্যনৈমিত্তিক একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একটি একটি করে অনেকগুলো ফুল দিয়ে ওড়নার আঁচলটি ভরিয়ে ফেলল ।মেঘলা ফুলের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল ।এই ফুল দিয়ে মেঘলা এখন মালা তৈরি করবে ।দুটো হাতের জন্য তৈরি করবে একটি গলার জন্য একটি চুল খোপা করে বা বেনি করে সেখানে দেওয়ার জন্য ।এটি যেন মেঘলার খুবই পছন্দের একটি কাজ।
বাড়ির কেউ জানে না মেঘলা উঠে এখানে ফুল কুড়াতে এসেছে ।যদি শুনে এই পা নিয়ে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছে তাহলে বকুনি একটিও মাটিতে পড়বে না। তাই মেঘলা ফুল কুড়াতে আর সময় নষ্ট না করে পাশে গিয়ে একটি ছোট্ট বেঞ্চিতে বসে পড়লো ।সেখানে সুই সুতা ছিল আগে থেকেই ।মেঘলা একটি একটি করে সুতার ভিতর ফুলগুলো বুনতে লাগলো ।একটু একটু করে সেই ফুলগুলো হয়ে গেল সুন্দর মালা।
এভাবে হাতের গলার খোপার জন্য মালা তৈরি করে নিল মেঘলা ।তারপর সুন্দর করে খোলা চুল গুলো একটি খোপা করে নিল।
একটি মালা গলায় পড়লো ।মেঘলা দুটো ছোট ছোট মালা পরলো হাতে ।একটি মালা ঝুলিয়ে দিল খোপার সাথে ।তারপর মেঘলা নিজেকে দেখার জন্য আর যেন তর সইছিলো না। ধীরে ধীরে মৃদু পায়ে যেনো কেও টের না পায় এমন ভাবে হেঁটে এসে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে লাগলো।
মেঘলা জানলো না বা দেখল না মেঘলার অগোচরে এই মনোহর দৃশ্যটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমগ ধোঁয়া ওঠা কফির সাথে অবলোকন করছিল শ্রাবণ।
শ্রাবণ গতকাল থেকে ঠিকমত ঘুমাতে পারছিল না ।চেষ্টা করছিল বিছানার এপাশ-পাশ করছিল ।প্রায় সাড়ে চারটা পর্যন্ত জেগে যখন দেখলো আর ঘুম আসছে না তখন ভাবল এক মগ কফি তৈরি পান করে তারপর না হয় সকালের দিকে একটু ঘুমাবে।
কফি নিয়ে সদ্যই বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল শ্রাবণ ।তখনই দেখলো সামনে এই মনমুগ্ধকর দৃশ্যটি।
একটি মেয়ে সকালের নরম উষ্ণ আলোয় শিশির ভেজা কুয়াশায় হেঁটে হেঁটে শিউলি ফুল তুলতেও বুঝি এত সুন্দর লাগতে পারে এই প্রথম দেখল শ্রাবণ।
এলোমেলো অগোছালো চুল মেঘলার ।সকালে উঠে যেন চুলে চিরুনি ও দেয় নি কোনমতে উঠে তাড়াহুড়া করে শিউলি ফুল তুলতে গিয়েছিল।
ফুলের গহনা পড়ে যখন ভিতরে প্রবেশ করবে মেঘলা শ্রাবণ তাড়াহুড়া করে বারান্দা থেকেই ছুট লাগালো রুমের বাইরে সিঁড়ির কাছে।
মেঘলা বাড়ির দরজা লাগিয়ে মৃদু পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে সিঁড়ির কাছে আসতেই দেখা হয়ে গেল শ্রাবণের সাথে ।শ্রাবণের হাতে কফির মগ দেখে মেঘলা বুঝতে পারলো হয়তো শ্রাবণ ভাইয়া ঘুমায়নি তাই কফির জন্য নিচে নামছিলো।
মেঘলা ঠোট শুকিয়ে গেল ।মেঘলা কে এমন অবস্থায় শ্রাবণ ভাইয়া দেখে ফেলেছে যেন একটু লজ্জা পেল মেঘলা ।যদিও জানে না ফুল কুড়ানো থেকে শুরু করে ফুলেল গহনায় সজ্জিত হতে দেথেছে শ্রাবণ। মেঘলা সাথে সাথে চোখ দুটো নামিয়ে ফেলল।
শ্রাবণ এক পা দু পা করে সিঁড়ি বেয়ে নামছে ।তবে চোখ দুটো নিবদ্ধ মেঘলার দিকে ।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মেঘলার সদ্য বাধা খোপা ,তাতে গুঁজে দেওয়া শিউলি ফুলের মালা ।হাতে দুটো বালার মত শিউলি ফুলের মালা ।গলায় একটি শিউলি ফুলের মালা। কোন সো*না রুপা হিরে জহরত মনি দিয়ে তো সজ্জিত নয় মেঘলা ,শুধু ফুলেল গহনা তাতেই যেন মনমুগ্ধকর লাগছে।
মেঘলার কাছাকাছি আসতেই শ্রাবণ মেঘলার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে জিজ্ঞেস করলো,” কোথায় গিয়েছিলি?”
যদিও আওয়াজটা খুব ধীরে ধীরে ছিল তবুও গমগমে পুরুষালি স্বর।মেঘলার হৃদয়টা যেন কেঁপে উঠল ।মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে যেন পৃথিবীতে আর কারো কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু সামনে দাঁড়ানো এই এক মানব। শ্রাবণ ভাই।
মেঘলা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে ।চোখে চোখ পড়তেই শ্রাবন অদ্ভুত নরম দৃষ্টিতে তাকালে মেঘলার দিকে।
এমন কেন অনুভূতি হচ্ছে সব গতকাল থেকেই ?যেমন এখন হচ্ছে হৃদয় দোলা লাগছে ।শিউলি ফুলের সুগন্ধি নাকে ভেসে আসছে ।পরিবেশটা কেমন মাতাল মাতাল লাগছে শ্রাবণ এর কাছে।
এরকম কুয়াশা ভেজা ভোরে উষ্ণ নরম আলোয় আলোকিত যখন পৃথিবী ,সদ্য কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দেওয়া কোন মেয়ে যদি ফুলেল গহনায় সজ্জিত হয়ে শিউলি ফুলেল মাতাল করা গন্ধে কোন পুরুষের সামনে এসে দাঁড়ায় ,কোন পুরুষের সাধ্য আছে কি সেই মেয়েকে উপেক্ষা করার?
এই মুহূর্ত এই সময় এই সামনে দাঁড়ানো শিউলি ফুলের গহনায় সজ্জিত এই কিশোরীকেও উপেক্ষা করতে পারছে না শ্রাবণ চোখ দুটো নিবদ্ধ হয়ে আছে শুধু মেঘলার দিকে মেঘলার খোপায় মেঘলার হাতে শিউলি ফুলের কাঁকন মেঘলা গলায় শিউলি ফুলের মালা সবকিছু কেমন যেন মাতাল মাতাল লাগছে শ্রাবণ এর কাছে।
শ্রাবনের ঘোর কা*টল মেঘলার উত্তরে। মেঘলা বললো,”ভাইয়া আমি তো সব সময় শীতের দিনে শিউলি ফুল কুড়াতে যেতাম গ্রামে। তাই আজকেও গিয়েছিলাম ওই শিউলি ফুল গাছ তলায়। এই যে দেখেন শিউলি ফুলে মালা তৈরি করে নিয়ে এসেছি ।কিন্তু আপনি প্লিজ কাউকে বলবেন না আমি একা একা বাইরে গিয়েছিলাম ।এই পা নিয়ে আমি গিয়েছি শুনলে মা রাগ করবে।”
শ্রাবণ আর কোন প্রশ্ন করল না ।শ্রাবণ দেখেছে কি করেছে মেঘলা তাই আর কোন সময়ও ব্যয় করল না ।বললো ,”হুম ।”
হুম বলে কফির মগ টি রাখার জন্য নিচে চলে গেল শ্রাবণ ।এই মুহূর্তে আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না শ্রাবণ।নিজের অবস্থান নিজের সবকিছু যেন ভুলে গিয়েছিল শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য।
মেঘলা অবাক হয়ে দেখল শ্রাবণের চলে যাওয়া কফির মগ নিয়ে রান্না ঘরের দিকে ।তাই মেঘলাও ধীরে ধীরে হেঁটে উপরে গিয়ে নিজের রুমে ভিতরে প্রবেশ করলো। শ্রাবণ আড় চোখে তাকিয়ে দেখলো মেঘলা নিজের রুমে ঢুকলো।
সকাল দশটা ।আজ উঠতে সবার একটু দেরি হয়ে গিয়েছে ।ভোর রাতে দিকে প্রচুর কুয়াশা পড়েছিল যার কারণে শীতটা একটু বেশি তাই সবাই একটু লেট করে উঠেছে।
শ্রাবণ সিঁড়ি বেয়ে নামছে ।দেখলো নীচে তানিয়া অপেক্ষা করছে শ্রাবণের জন্য।মেঘলা এবং রাফি এক জায়গায় বসে কিছু একটা করছে। এখন আর মেঘলার শরীরের শিউলি ফুলের গহনাগুলো নেই ।কেউ দেখেও নি শুধু এই মনমুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল শ্রাবণ।
সিয়াম ভার্সিটি গিয়েছে লামিয়া কলেজে গিয়েছে।
মেঘলা এসএসসি পরীক্ষা গ্রামের স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করা তাই পরীক্ষার সময় গ্রামে যাবে ।রাফির পরীক্ষা শেষ ।ডিসেম্বর মাস চলছে তাই স্কুলে যাওয়া নিয়ে কোন ঝামেলা নেই।
শ্রাবণ নামতে নামতে হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠল ।সবাই ফোনে রিংটোন শুনে সাথে সাথে তাকালো সিঁড়ির দিকে । দেখলো শ্রাবণের মোবাইলে ফোন এসেছে ।
শ্রাবণ দাঁড়িয়ে ফোনে স্ক্রিনে দেখলো আননোন নাম্বার ।ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বললো,” আসসালামুয়ালাইকুম আমি আপনাদের পারিবারিক উকিল আজিজুল হক বলছি।”
শ্রাবণের পা জোড়া থেমে গেল ।দাঁড়িয়ে গেল সিঁড়িতে ।ফোনে শুধু বললো,” জি ।”
চোখ জোড়া নিবদ্ধ হয়ে আছে এখনো ড্রয়িং রুমে মেঘলা ও রাফির দিকে ।ওপাশ থেকে আজিজুল হক বললেন,” জি কাগজপত্র আমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট কে দিয়ে তৈরি করিয়ে রাখছি আজকে দিতে পারবো না তবে আগামীকাল পাবেন ।আজকে আমি একটু পারিবারিক কাজে বাহিরে আছি যদি আপনার কোন কিছু সংযোজন করতে হয় বা কোন শর্ত রাখতে হয় আপনি রাখতে পারেন। যদি কোনদিনও পাওনা রিলেটেড কিছু থাকে যদি কিছু এড করা প্রয়োজন হয় আমাকে কাইন্ডলি ইমেইল করে পাঠিয়ে দিবেন ।আজকে পাঠালেই হবে ।আগামীকালকের মধ্যে সব প্রসেসিং শেষ হয়ে যাবে সিগনেচার করলেই কাজ হয়ে যাবে।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে জানতে চাইলো ,”দেনা পাওনা বলতে ?”
আজিজুল হক বললেন ,”যে আসলে দেনা পাওনা বলতে আপনি যখন বিয়ে করেছিলেন তখন অবশ্যই একটি মোহরানা ধার্য করা হয়েছিল ।তাই আপনি যখন তালাক করবেন আপনার স্ত্রীকে অবশ্যই সেই মোহরানা পরিশোধ করে আপনাকে তালাকটা সম্পাদন করতে হবে।”
শ্রাবণ বললো,” জি আমার আসলে মনে নেই ।আমার খেয়াল নেই কত টাকা দেন মোহর ধার্য করেছিলাম ।আপনার কি জানা আছে ?”
আজিজুল হক কাবিনের কাগজটি হাতে নিয়ে বসেছিলেন ।বললেন,” জি হ্যাঁ ১০ লক্ষ টাকা কাবিন করেছিলেন ।সে টাকাটা দিয়ে আপনাকে মোহরানা পরিশোধ করে তালাকটি সম্পাদন করতে হবে।”
শ্রাবণ জি আচ্ছা বলে ফোন রেখে আবারো তাকিয়ে রইল সামনে রাফি এবং মেঘলার হাস্যকৌতুক করার দৃশ্যটির দিকে।
সবাই একসাথে নাস্তা খেতে বসলেও মেঘলা বসলো না ।যার কারণে রাফিও নিজের প্লেটটি নিয়ে ড্রয়িং রুমে মেঘলার সাথে সোফায় বসে খেতে লাগলো ।শ্রাবণ খেতে বসেছে পাশে তানিয়া ।সাবিহা সুলতানা এবং আসমা বেগম খাবার সার্ভ করছে ।শহিদুল খান সাজ্জাদ খান আজ সকাল সকাল বের হয়ে গেছেন।
শ্রাবণ নাস্তা খাচ্ছে কিন্তু মনোযোগ সম্পুর্ন রাফি এবং মেঘলার দিকে ।বারবার অবাধ্য চোখ দুটো সেখানে চলে যাচ্ছে কেন শ্রাবণ বুঝতে পারেনা ।
খাওয়া শেষ করে তানিয়ার উদ্দেশ্যে বললো,” তুমি সারাদিন বাড়িতে না থেকে বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে পারো ।এখানে তোমার রিলেটিভ রা ও তো আছে ।চাইলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারো ।”
তানিয়া বললো,” না প্রয়োজন হবে না ।দুইদিন আগে পরে এমনি সবাই চলে আসবে ।”
সাবিহা সুলতানা এবং আসমা বেগম অবাক হলেন দুদিন আগে পরে এমনি চলে আসবে বলতে কি বুঝালো তানিয়া?
শ্রাবণ বাড়িতে এখনো কাউকে কিছু জানয়ইনি তাই কথা আর বাড়াতে চাইল না।
বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে ।”
আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ।বলে খাওয়া শেষ করে বাড়ির বাহিরে যাবে ঠিক এমন সময় রাফি ও মেঘলার দিকে চোখ পড়তেই শ্রাবণ রাফিকে ডাকলো ।রাফি সাথে সাথে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” ভাইয়া ডেকেছো?”
শ্রাবণ বললো ,”একটু আমার সাথে আয় বাহিরে মোড়ের দোকানে যাব।”
রাফির এই মুহূর্তে উঠতে ইচ্ছা করছিল না কিন্তু ভাইয়া বলেছে তাই মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললো,”তুমি বসো আমি একটু ভাইয়ার সাথে বাহিরে যাচ্ছি ।”
বলেই শ্রাবনের সাথে বাহিরে চলে গেল ।মেঘলা তাকালো দরজার দিকে। তানিয়া চেয়ারে বসেই রইলো।মোড়ের দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট সি*গারেট কিনলে শ্রাবণ।
রাফির হাতে কয়েকটি আইসক্রিম এবং চকলেট দিল বললো,” বাড়িতে গিয়ে সবাই ভাগ করে খাবি।”
অনেকদিন ধরেই রাফির মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল ।তাই জিজ্ঞেস করে বসলো ,”ভাইয়া তুমি কি তানিয়া আপুকে বিয়ে করবে ?ভালোবাসো?”
শ্রাবণ অবাক হয়ে গেল রাফির প্রশ্নে ।মাথা নিচু করে তাকালো রাফির দিকে ।তারপর রাফির গাল টিপে বললো ,”তুই ভালোবাসার কি বুঝিস ?”
রাফি আহ করে চিৎকার দিয়ে বললো,” বুঝি আমি।হাত সরাও ।আমি একটি মুভিতে দেখেছিলাম চোখ বন্ধ করে তুমি যার চেহারা দেখবে তাকে তুমি সত্যি সত্যি ভালোবাসো।”
শ্রাবণ বললো,” ওরে বাবা ! এই বয়সে এত পাকা পাকা মুভি দেখিস ?বাবাকে বলতে হয় তাহলে!”
রাফি বললো,” জানো ভাইয়া আমি চোখ বন্ধ করে মেঘলাকে দেখি ।মেঘলাকে অনেক ভালোবাসি তো তাই ।আচ্ছা তুমি চোখ বন্ধ করে কি তানিয়া আপুকে দেখো?”
শরাবণের কদম থমকে গেল ।বাড়ির দরজার বাহিরে শিউলি গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল শ্রাবণ। রাফির দিকে তাকিয়ে বললো,” কোনদিনও ট্রাই করে দেখিনি।”
রাফি বললো,” চলো আমরা ট্রাই করি ।আমিও চোখ বন্ধ করে দেখব মেঘলাকে ।আর তুমিও চোখ বন্ধ করে দেখবে তানিয়া আপুকে ।দেখতে পারো কিনা ট্রাই করো না ভাইয়া প্লিজ ।”
শ্রাবণ বাধ্য হয়ে রাফির কথা শুনে চোখ বন্ধ করলো ।রাফি ও চোখ বন্ধ করে রইল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ শ্রাবণ চোখ খুলে ফেলল।
খুলে দেখলো রাফি চোখ বন্ধ করে মুচকি মুচকি হাসছে ।শ্রাবণ বললো,”রাফি তোর ভালোবাসার তো জোর অনেক রে।”
শ্রাবণের কথায় রাফি চোখ খুলে ফেললো। তারপর বললো,” কি করে বুঝলে ?”
শ্রাবণ বললো ,”এই দেখ না চোখ বন্ধ করলাম নিজের ভালোবাসাকে দেখার জন্য অথচ চোখ বন্ধ করে আমিও মেঘলাকে দেখে ফেললাম ।দেখলাম চোখ বন্ধ করে তুই মেঘলা কে দেখছিস আর মুচকি মুচকি হাসছিস ।তাহলে বুঝ তোর ভালোবাসা কত জোর বড় ভাইয়ের চোখেও ভাসে?”
শ্রাবণের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল রাফি। চোখ বন্ধ করে বুঝি অন্যের ভালবাসাও দেখা যায় ?এমনও কি হয় ?মুভিতে তো এরকম দেখেনি!
বলেই শ্রাবণ হাঁটা শুরু করলো ।ঠোঁট বেঁকে একটু মুচকি হাসলো।দেখেছে বৈ কি মেঘলা কে ।শিউলি ফুলের গহনায় সজ্জিত।
চলবে__
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১১৮+১১৯
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৩
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮২
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৩
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪১
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৫+১৬
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি গল্পের লিংক
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ২৩+২৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৫