এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২১+২২
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ২১
তানিয়া
নীল চাদোয়া
আকাশ টা কে আজ লাগছে ভালো
মাঝে মাঝে মিটি মিটি তাঁরা গুলো
………….
ল দিয়ে শ্রাবণ
শ্রাবণ বললো,” আমি কি বলেছি আমি তোদের সাথে খেলছি ?আমি কোন খেলা-টেলা খেলতে পারবো না ।”
বলে যেই উঠতে যাবে অমনি সবাই ধরে বসল ।বললো,”না তুমি এখানে বসেছ তার মানে তুমি খেলছিলে ।আর এতক্ষন আমাদের গান তো ঠিকই শুনেছ।
তাহলে এখন তোমার গাইতে হবে কোন না শুনবো না আমরা।”
মেঘলা বলে বসলো ,”ভাবি প্লিজ ভাইয়াকে বলেন আপনি বললে ভাইয়া অবশ্যই গাইবে।”
তানিয়া মুচকি হাসলো।সিয়াম তাকালো মেঘলার দিকে।
শ্রাবণ মেঘলা দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ।মনে মনে বললো,” বোকা মেয়েটা যদি জানতো তাকে ভাবি বলছে আর কাকে ভাই বলছে ! যার বউ মনে করে অন্য কাউকে ভাবি বলছে সেই যে সেই অপরাধীর স্ত্রী সেটা কি মেয়েটা জানে!”
তারপর বললো,” ঠিক আছে আমি গাইছি তবে আমি বাংলা গান তেমন একটা পারিনা ।কিছুদিন আগে এটা শুনেছিলাম এটাই শোনাচ্ছি তোদের।”
মেঘলার দিকে তাকিয়ে…….
লাজে রাঙা হল কনে বৌ গো
মালাবদল হবে এরাতে।
ও তোরা উলু দে রাঙা বর এলো যে
মাথায় টোপর দিয়ে চতুর্দোলাতে
মালাবদল হবে এরাতে
আজি মালাবদল হবে এরাতে।
শাঁখ বাজে সানাই বাজে
ঘোমটা খোলেনা
লজ্জাবতী কনে বৌএর
নোলক দোলে না
ঘোমটা খোলে না
হাতের বাজু দোলে না।
কনে বৌ ঘোমটা খোল
ওদুটি নয়ন তোল
দেখে নে কে এল ছাদনাতলাতে।
মালাবদল হবে এরাতে
খাট দিলাম পালং দিলাম
সাত ভরি সোনা
রায়বাঘিনী ননদী গো খোঁটা দিওনা।
রায়বাঘিনী ননদী গো খোঁটা দিওনা।
কনে বৌ রূপসী
রেখো না উপোসী
খেতে দিও তারে রূপোর থালাতে
মালাবদল হবে এরাতে।
সম্পূর্ণ গানটি শ্রাবণ মেঘলার দিকে তাকিয়ে গাইলো ।তানিয়া শ্রাবণের দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারল শ্রাবণের চোখ দুটো শুধু মেঘলা দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু বোকা মেঘলা শ্রাবণের দৃষ্টি দেখলেও গানের অর্থ বুঝতে পারল না। শুধু ভাবতে লাগলো শ্রাবণ ভাই এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
কিছুক্ষণের মধ্যে মুড়ি মাখা নিয়ে হাজির হলো জমির কাকা ।সবাই মুড়ি মাখা খেতে লাগলো আর গল্প করতে লাগলো।
অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে সবাই নিচে চলে যাবে খাওয়া-দাওয়ার জন্য ।সবাই যেতে লাগলো শ্রাবণ যাবে একটু পরে বললো,” তোরা যা আমি আসছি।”
সবাই সিঁড়ি ভেঙে নিচে চলে এসেছিল ।হঠাৎ মেঘলার মনে পড়লো হাতে করে শ্রাবণের রুম থেকে এন্টি সেপটিক ক্রিমটা সাথে করে নিয়ে চলে এসেছে ।ভাইয়ার তো রাতে লাগতে পারে তাই আবার ক্রিমটি নিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেল মেঘলা ছাদে ।কেউ অবশ্য দেখলো না অন্ধকারে।
শ্রাবণ বন্ধুর সাথে কথা বলছিল আর প্যান্ট চেঞ্জ করার জন্য আলমারি খুজছিল।
আলমারি থেকে একটি ট্রাউজার বের করে পরনের ট্রাউজারটি খুলবে কারণ ট্রিমার দিয়ে সেভ করা ফলে কিছু কিছু ছোট ছোট দাড়ি গোফ পড়েছিল প্যান্টে যা এখন চুলকাচ্ছে। প্যান্টটা একটু কোমর থেকে মাত্রই নামিয়েছে এমন সময় হুর মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো মেঘলা। শ্রাবনের কানে ফোন বন্ধুর সাথে কথা বলছে আরেক হাত দিয়ে প্যান্টের এক সাইড মাত্র একটু নামিয়েছে যার কারণে আন্ডারওয়ার একটি দেখা যাচ্ছে।পড়নে গেনজিও খোলা।পুরো শরীর উপরের অংশ উন্মুক্ত।জিম টাইপ বডি নয় কিন এথলেট দের মতো ন্যাচারাল বডি।বুকটা হালকা লোমশ।
মেঘলা শুকনো ঢোক গিললো।কখনো কোন পুরুষ মানুষ কে এভাবে দেখেনি মেঘলা।
মেঘলা দেখে হা করে তাকিয়ে রইল ।কালো ট্রাউজারের নিচে লাল একটি আন্ডারওয়ার পড়েছে ।আন্ডার ওয়ারের ইলাস্টিকের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে উপরের।
শ্রাবণ সাথে সাথে কোমর থেকে প্যান্ট টেনে তুলে বললো,” তোরা না নিচে চলে গিয়েছিলি ?আবার উপরে এলি কেন ?আর ঘরের ভিতরে নক না করে ঢুকলি কেন?”
মেঘলা উন্মুক্ত বুকে তাকিয়ে বললো ,”ও মা কিছুদিন আগে আপনি না বললেন আপনার রুমে সবাই না বলে নক না করে ঢুকতে পারে আমিও ঢুকতে পারবো ।সেজন্যই তো নক না করে ঢুকলাম ।আর তাছাড়া মাত্রই তো বের হয়েছিলাম।”
শ্রাবণ দেখলো মেঘলার দৃষ্টি ওর বুকের দিকে। শ্রাবণ বললো,” কোন দিকে তাকিয়ে উত্তর দিচ্ছিস? নজর কই তোর।”
মেঘলা বললো,”আপনার চেহারার দিকে।”
বলেই দেখল পাশে চেয়ার একটি প্যান্ট এবং একটি কালো রঙের আন্ডারওয়ার।
মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,”আমি কিচ্ছু দেখিনি বিশ্বাস করুন।”
শ্রাবণ হকচকিয়ে গেল ।ড্যাব ড্যাব করে বুকের থেকে শুরু করে কোমরের আন্ডারওয়্যার পর্যন্ত দেখছে আর বলে কিছু দেখেনি। শ্রাবণ বললো,” কিছু দেখবি মানে ?আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি মেঘলা ?”
মেঘলা বললো ,”আমি কিছুই দেখিনি তাই আপনি লজ্জা পাবেন না ।আর আপনি যে কালো ট্রাউজারে নিচে লাল আন্ডারওয়ার পড়েছেন সেটাও আমি দেখিনি।”
শ্রাবন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘলা দিকে।
বললো,”থাপ্পর খাওয়ার আগে রুম থেকে যা ।বেয়াদব।”দেখার আর কি বা বাকি রেখেছে ? ওইটুকু ও কবে যেনো দেখে ফেলে মনে মনে ভাবলো শ্রাবণ।
মেঘলা সাথে সাথে মলমটি বিছানায় ছুড়ে মা*রল । বললো,” ঠিক আছে যাচ্ছি ।”
বলেই চলে যাবে তখন শ্রাবণ আবার কোমরে হাত দিয়ে প্যান্ট একটু নামাবে তারপর সাথে সাথে আবার মেঘলা উঁকি মেরে বলল ,”ভাইয়া কালোটার সাথে কালো তাই মানায় আর কালো আমার ফেভারিট।”
বলে দৌড়ে নিচে চলে গেল মেঘলা ।কথাগুলো সব শুনল শ্রাবণের বন্ধু মোবাইল ফোনে ওপাশ থেকে ।বলে উঠলো ,”যা পুঁচকি একটা মেয়ে তোর ইজ্জতের ফালুদা করে দিল ?”
এদিকে শ্রাবণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ হয়ে রইল ।মেঘলা কে ও কোন জবাব দিতে পারল না আর বন্ধুকেই বা কি জবাব দিবে।
শ্রাবণের বন্ধু ফোনে হাসতে লাগলো ।শ্রাবণে মুচকি হেসে দিল ।বললো বাদ দে বাচ্চা মেয়ে ।একদম ছোট্ট মেয়ে যা ভাবছিস তা না।
ওপাশ থেকে বন্ধু বললো ,”হুম বাচ্চা তবে কালো যেহেতু পছন্দের কালো টাই পর।আর আমি তো কিছুই ভাবছি না বন্ধু কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে সবকিছু। ছোট একটা পুচকি মেয়ে তোকে ঘোলা পানি খাইয়ে গেল আর আমি তোর চেহারা না দেখেও বুঝতে পারছি তুই লজ্জা পাচ্ছিস আর যেহেতু লজ্জা পাচ্ছিস তাহলে অবশ্যই কিছু আছে ।তুই যতই অস্বীকার করিস। কিন্তু ভুলে যেওনা বন্ধু তানিয়াকে গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে গেছো বিয়ের কথা বলে।”
কথাটি শুনে শ্রাবণের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল ।চিন্তায় পড়ে গেল। বললো ,”আচ্ছা ঠিক আছে খাব খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে ।থাক কালকে কথা হবে।”
পরদিন সকাল ঘুম থেকে উঠেই নিচে হৈ হুল্লো শব্দ পাচ্ছে শ্রাবণ ।তাই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ ট্রেশ হয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে আসছে শ্রাবণ ।কিছুটা নিচে নেমে আসতেই বারান্দার কাছাকাছি এসে দেখল উঠানের চেয়ারে বসে আছে রনি পাশে মেঘলা লামিয়া সিয়াম রাফি ।সবাইকে কিছু একটা বলছে আর হাসাহাসি করছে।
আসমা বেগম এবং সাবিহা সুলতানা একটু পাশের বাড়িতে গিয়েছে সকাল সকাল ঘুরে আসার জন্য ।এদিকে বাড়ি পুরো খালি ।শ্রাবণ কফি খাবে কিন্তু মেঘলার হাসি দেখে শ্রাবণের খুব রাগ চাপল ।তাই নিচে নেমে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে একটি চেয়ার টেনে বসে বললো,” মেঘলা আমার জন্য কফি নিয়ে আয়।”
শ্রাবণের কন্ঠ শুনেই তানিয়া নিজের রুম থেকে বের হয়ে আসলো ।দেখলো শ্রাবণ নিচে চেয়ার পেতে রোদে বসেছে ।তানিয়াও বের হয়ে একটি চেয়ার নিয়ে শ্রাবণের পাশাপাশি বসলো।বললো,” গুড মর্নিং।”শ্রাবণ বললো,”হুম।”
মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” আমি কফি করে আনব ?”
সাথে সাথে লামিয়া বলে উঠলো ,”তুই দাঁড়া আমি করে নিয়ে আসছি ।”
শ্রাবণ লামিয়াকে ধমক দিয়ে বললো,”তোকে আমি উঠতে বলেছি ?যাকে বলেছি সেই নিয়ে আসবে ওর ও তো শিখতে হবে?”
মেঘলা সাথে সাথে বললো,” আমার শিখতে হবে কেন ?আমি তো কফি অতটা খাই না।”
শ্রাবণ আনমনে বলে বসলো ,”শিখতে হবে কারণ আমি খাই ।”
তারপর কিছু একটা মনে করে বললো,” মেহমান আসলে যে কেউ খেতে পারে চা খেতে পারে কফি খেতে পারে তাই শিখতে হবে ।সব সময় কি লামিয়া থাকবে না কি তোর সাথে?”
কথাটা মেঘলা যুক্তিসঙ্গতই মনে হল ।তাই উঠল ।উঠে বললো,” আচ্ছা শুধু এক কাপ কফি বানাবো নাকি সবাই খাবে ?”
রনি বলে বসলো ,”তুমি বানাবে তাহলে আমি খাব ।”
রাফি মনটা খারাপ হয়ে গেল ।রাফি বললো আমিও খাব।
রনি সাথে সাথে বললো,” সে কি তোমার বয়স এত অল্প তুমি কফি খাবে ?তুমি খাবে হরলিক্স।”
সবাই সমস্বরে হেসে দিল ।রাফির মনটা খারাপ হয়ে গেল ।রাফি ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে শ্রাবণের পাশে বসলো ।শ্রাবণ তাকালো আড় চোখে রাফির দিকে ।রাফিও তাকালো ।যেন শ্রাবণ বুঝতে পারছে রাফির মনের অবস্থা কি ! কিন্তু রাফি কি বুঝতে পারছে শ্রাবণে মনে কি চলছে?
১০ মিনিটের মধ্যে কফি তৈরি করে ট্রেতে করে সবার জন্যই নিয়ে আসলো মেঘলা ।সর্বপ্রথম শ্রাবণের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রাবণ কে কফি দিল ট্রে থেকে তুলে নিল তানিয়া এবং রাফি ।এরপরে গেল লামিয়া সিয়াম এবং রনির কাছে ।ওরাও তুলে নিল ।মেঘলা নিজের জন্য একটি বানিয়েছে ।সবাই মিলে কফি খেতে লাগলো ।রনি বললো ,”আজকেও খেলতে এসো মেঘলা।”
যদিও শ্রাবণকে বলা হয়েছে মেঘলার সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে বা মেঘলার কোন বিষয়ে কথা বলতে মানা কিন্তু শ্রাবণ যেন চেয়েও নিজেকে আর কন্ট্রোল করে রাখতে পারল না ।তাই সাথে সাথে বলে উঠলো ,”আমাদের বাড়ির মেয়েরা আসলে বাইরে গিয়ে এভাবে খেলাধুলা করে না ।ছোট ছিল খেলেছে ঠিক আছে কিন্তু এখন বড় হয়েছে। তাই মেঘলা বা লামিয়া খেলতে যাবে না ।তবে বিকালবেলা আমরা ঘুরতে বেরোবো চাইলে তুমিও আসতে পারো।”
রাফি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বললো,” তাই ?কোথায় যাব ভাইয়া ঘুরতে ?”
শ্রাবন সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বললো,” সিয়াম জানে কোথায় নিয়ে যাবে তবে যেখানেই যাব সুন্দর কোন জায়গায় যাব যেয়ে আমরা অনেক ছবি তুলব।”
মেঘলা ও লামিয়া খুশি হয়ে গেল ।বলল ওয়াও এটাও ভালো আইডিয়া ।খেলাধুলাতে সারা জীবন করেছি কিন্তু গ্রামে ঘুরে ঘুরে গ্রামের রাস্তায় কখনো ছবি তোলা হয়নি এখন ছবি তুলব ।আর আমরা দুজন খুব সাজগোজ করে যাব কেমন?”
বলেই মেঘলা হেসে দিলো।মেঘলার টোল পড়া হাসির দিকে তাকিয়ে রইল তিনটি পুরুষ মুগ্ধ নয়নে ।রাফি ,শ্রাবণ এবং রনি।
চলবে_
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ২২
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সবাই রেডি হয়ে নিল বাহিরে যাবে বলে।লামিয়া আজ পরলো বেগুনি রংয়ের একটি জামা।উপরে একটি কালো রংয়ের চাদর।সিয়াম দেখলো। দ্বিতীয় বার তাকালো না।মেঘলা কালো রংয়ের জামা ও কালো রংয়ের চাদর। শ্রাবণ অদ্ভুত ভাবে ললক্ষ করলো।চুল গুলো ছাড়া।তবে কিছু বললো না।আজকেও একটি ভ্যান খবর দেওয়া হয়েছে ভ্যানে করে যাবে সবাই।
ভ্যান বাড়ির কাছে আসতেই সবাই একে একে ভ্যানে উঠতে নিল ঠিক এমন সময় রনি একটি স্কুটি নিয়ে হাজির।
রনি ওর বাবার একটি ছোট স্কুটি আছে ।চালাতে পারে সেটি নিয়ে এসেছে । বললো,” ভ্যানের পিছনে পিছনে যাবে ।”
বিড়ম্বনা হলো মেঘলা বললো,” আমি স্কুটিতে যাব ।”শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হলো কথাটি শুনেই।
সিয়াম স্কুটি চালাতে পারেনা না ।চা না হলে সিয়াম স্কুটি চালিয়ে রনিকে ভ্যানে বসতে বলতো কিন্তু ভ্যানে এর চেয়ে বেশি লোক যাওয়ার ও জায়গা নেই।
তাই সিয়াম বসে রইলো। শ্রাবণ বলে বসলো ,”মেঘলা চুপচাপ ভ্যানে বস স্কুটিতে যেতে হবে না ।”
মেঘলা বললো,” না ভাইয়া আমি কখনো স্কুটিতে চরিনি ।আজকে একটু যাই না ?”
শ্রাবণ তাকিয়ে রইলো মেঘলার দিকে ।তারপর কি মনে করে জানো স্কুটির কাছে এসে রনিকে উদ্দেশ্য করে বললো,” যদি কিছু মনে না করে স্কুটির চাবিটা একটু আমাকে দেবে ?”
রনির সাথে সাথে বললো,” হ্যাঁ ভাইয়া অবশ্যই।”
স্কুটি থেকে নেমে চাবিটি শ্রাবণের হাতে দিয়ে দিল ।রনি ভাবলো হয়তো মেঘলার সাথে একসাথে ভ্যানে করে যাবে কিন্তু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো শ্রাবণ মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,” মেঘলা আয় তোকে স্কুটিতে চড়িয়ে আনি ।”
বলতেই সাথে সাথে মেঘলা খুশিতে দুটি লাফ দিয়ে উঠল ।তানিয়া অবাক হয়ে গেল ।তানিয়া ভেবেছিল ও একা স্কুটিতে যাবে হয়তো তানিয়া নেমে বলবে আমিও যাব কিন্তু হল বিপরীত।
সিয়াম অবাক হয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে ।শ্রাবণ চোখ নামিয়ে ফেললো। বললো,” ছোট বোন বায়না ধরেছে গ্রামে স্কুটি দিয়ে ঘুরবে তাই অন্য একটি ছেলের সাথে ঘুরবে ব্যাপারটা খারাপ দেখায় তাই চাচাতো বড় ভাই হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব।”
রনিকে ও সিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বলল কথাগুলো পরে আবার বললো,” সিয়াম চালাতে পারে না ।না হলে সিয়াম নিজেই নিয়ে যেত যেহেতু সিয়াম পারে না তাই এখন বড় ভাই হিসেবে দায়িত্ব আমি পালন করছি ।কিছু মনে করো না তোমার স্কুটি টা নিলাম।”
সিয়াম কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না ।আর এখানে কিছু বলাও ঠিক হবে না ।রনি অবাক হয়ে গেল কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে চুপ করে রইল।
শ্রাবণ ভ্যানওয়ালা কে বললো,” আঙ্কেল আপনি যান আমি আপনাদের পিছনে পিছনে আসছি ।”
বলে মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,” মেঘলা পিছনে আয়।”
মেঘলা উচ্ছ্বাসিত হয়ে খুশিতে বাইকের কাছে এসে দাঁড়ালো ।ভ্যানওয়ালা ভ্যান ছেড়ে দিল ।তানিয়া র*ক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে রইল স্কুটির দিকে ।রনি ও রাফি এদিকে দুইজনেরই মন খারাপ দুজনে পিছনে পা ঝুলিয়ে বসেছে তাকিয়ে আছে স্কুটির দিকে।
যাকে ভালবাসে যাকে পছন্দ করে সেই মেয়েটিকে অন্য একটি পুরুষের পেছনে স্কুটিতে দেখতে রনিরও ভালো লাগছে না রাফিও ভালো লাগছে না ।দুজন চাতক পাখির মতো পা ঝুলাতে ঝুলাতে দেবদাস এর মত তাকিয়ে রইল চলন্ত স্কুটির দিকে।
বর্তমান যুগের ভ্যান প্যাডেল চালিত নয় ইঞ্জিন চালিত তাই দ্রুতই যাচ্ছে ।শ্রাবণ যেহেতু গ্রামের রাস্তা চিনেনা তাই ভ্যানের পিছনেই ধীরে ধীরে স্কুটি চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাছাড়া মেঘলা কোনদিনও স্কুটিতে চড়েনি গ্রামের রাস্তা ও একটু উঁচু নিচু যদি পড়ে যায় তাই আস্তে করেই চালাচ্ছে।
শ্রাবণ একটু ঘাড় কাত করে মেঘলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটু উচ্চস্বরে বললো,” মেঘলা ?”
মেঘলা পিছন থেকে বললো,”হুম?”
শ্রাবণ বললো,”পিছন থেকে আমাকে ধরে বস না হলে পড়ে যাবি।”
মেঘলা বুঝতে পারল না তাই জিজ্ঞেস করলো,” কিছু বললেন ?” শ্রাবণ আবার বললো,” পিছন থেকে আমাকে ভালো করে ধরে বস না হলে পড়ে যাবি ।”
মেঘলা একটু লজ্জা পাচ্ছিল কিন্তু আসলে বসতে কষ্ট হচ্ছিল তাই আমতা আমতা করল কিছুক্ষণ ।কিন্তু যেই স্কুটির চাকার নিচে ছোট্ট একটু মাটি পড়ায় স্কুটি কেঁপে উঠল ওমনি মেঘলা দুই হাত দিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণকে।
দৃশ্যটি ভ্যানে বসে দেখছে তিন জোড়া জ্বলন্ত চোখ ।তানিয়া রাফি এবং রনি ।রাফির মন খারাপ হচ্ছে তাও মনকে সান্তনা দিতে পারছে রাফির আপন বড় ভাই কিন্তু রনি ও তানিয়ার ক্ষেত্রে মনে মনে সান্তনা দেওয়ার মত কোন ভাষা নেই।
মেঘলা শ্রাবণ কে এভাবে জড়িয়ে ধরায় শ্রাবণের যেন হৃদয় স্পন্দন কয়েকটি থেমে গেল ।যেন সময় থমকে গেল ।আর একটু হলে যেন স্কুটি নিয়ে পড়ে যেত তবে নিজেকে সামলে নিল ।মেঘলা ধীরে ধীরে শ্রাবণে কে একটু আলগা করে ধরল। প্রথমে পড়ে যাওয়ার ভয়ে দুই হাত দিয়ে শ্রাবণকে বুকে পেটে খামচে ধরে ছিল কিন্তু এখন একটু হালকা করে কাঁধে ধরল।
এভাবে কিছুক্ষণ চালিয়ে ওরা সুন্দর একটি খোলামেলা জায়গায় এসে পৌঁছালো ।এখানে একদিকে পদ্মা নদীর পাড় দেখা যায় আরেকদিকে বিস্তৃত ক্ষেত খোলা। ছবি তোলার জন্য খুবই সুন্দর জায়গা ।পদ্মা নদীর ঢেউ মৃদুমন্দ বাতাসের সাথে ধীরে ধীরে তীরে আছড়ে পড়তে লাগলো।সবাই নামলো মেঘলা ও স্কুটি থেকে নেমে সাথে সাথে ভ্যানের কাছে চলে আসলো ।শ্রাবণ স্কুটি সুন্দর করে সাইড করে রেখে এসে সবার সাথে যুক্ত হল ।সবাই ঘুরছে ফিরছে ছবি তুলছে শ্রাবণ দাঁড়িয়ে আছে ।সাথে তানিয়াও তবে শ্রাবণের চোখ শুধুমাত্র মেঘলার দিকে। তানিয়া সবকিছু খেয়াল করছে । বললো,” বাবা আসবে দুদিন পর। শ্রাবণ বললো,” আচ্ছা ।”
“আসলে বাবা ফ্রি হলে তোমার বাবার সাথে কথা বলবে।”বললো তানিয়া।
শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকালো তানিয়ার দিকে তবে এই মুহূর্তে এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না ।এমন সময় লামিয়া ডাক দিল গ্রুপ ছবি তোলার জন্য ।সিয়ামের হাতে ক্যামেরা ছিল তবে এবার ক্যামেরাটা ভ্যানওয়ালার হাতে দিলো ।শিখিয়ে দিল কিভাবে ছবি তুলতে হবে ।
সবাই সমবেত হয়ে দাঁড়ালো পিছনে নদী দেখা যাচ্ছে আশেপাশে বিস্তৃত শুধু ক্ষেত খোলা।
সিয়াম এবং তানিয়া পরে আসায় শ্রাবণের পাশে তানিয়া দাঁড়ালো ।তবে শ্রাবণের আরেক পাশে মেঘলা। মেঘলার সামনে রাফি পাশে রনি ।তার পাশে লামিয়া এবং সিয়াম।
এভাবে কয়েকটি ছবি-টবি তুলতেই সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায় ।এখন ওরা ব্যাক করবে।
সবাই পূর্বের মতোই ভ্যানে উঠল ।তবে তানিয়া বলে বসলো ,”আমি তোমার পিছনে বসছি ।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে গেল ।মেঘলা স্কুটির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ।মেঘলা বললো,” ঠিক আছে আপনি বসুন আমি চলে যাচ্ছি ভ্যানে।”
বলেই মেঘলা ভ্যানে গিয়ে বসবে অমনি শ্রাবণ বলে বসলো ,”না যেতে হবে না ।এটা গ্রাম তানিয়া ।এখানে তোমার আমার এমন কোন সম্পর্ক নেই মানুষ দেখলে নানান কথা উঠাবে ।মেঘলা তো আমার চাচাতো বোন তাই কেউ কিছু বলতে পারবেনা।”
মেঘলা অবাক হয়ে গেল । তানিয়া অপমানিত হলো ।আর দারোলোনা। গিয়ে ভ্যানে বসলো ।তানিয়া রাগ যেন আর নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারছে না ।এইভাবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারছে না তানিয়া।
মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” ভাইয়া না হয় তানিয়া আপুই …….আর কিছু বলতে পারল না মেঘলা । শ্রাবণ বললো,” তোকে বলেছি চুপচাপ বাইকে উঠে বস মানে উঠে বস ।কোন কথা শুনতে চাই না ।”
ভ্যান চলছে আপন গতিতে। রাস্তায় শ্রাবণের ফোন আসায় একটু পিছিয়ে গেছে ওরা। ভ্যান দেখা যাচ্ছে না।
সবাই সুন্দর করে ফিরে এলো বাড়ির কাছাকাছি।
ভ্যান থেকে নেমে সবাই বাড়ির ভিতরে দৌড় দিল সন্ধ্যা হয়ে আসছে ।ঠান্ডা লাগছে এদিকে রাস্তায় একটু ফোন আসার কারনে স্কুটি আসতে দেরি হচ্ছে বিধায় রনি দাঁড়িয়ে আছে দরজায় ।স্কুটি আসলেই তবে যাবে।
সবাই ভেতরে যাওয়া ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই মেঘলা এবং শ্রাবণ দরজার কাছাকাছি আসতেই দেখল রনি দাঁড়িয়ে আছে ।মেঘলা স্কুটি থেকে নামলো ।নেমে রনির কাছে এসে বললো,” অনেক ভালো লেগেছে ঘুরে ।ধন্যবাদ তুমি স্কুটি নিয়ে এসেছিলে ।তাই আমি জীবনে প্রথমবার স্কুটিতে চড়তে পারলাম ।”রনি ও হালকা মুচকি হাসলো ।তবে যদি মেঘলা কে নিয়ে ঘুরতে পারতো তাহলে হয়তো রনির বেশি ভালো লাগতো ।তাই বললো,”আচ্ছা ঠিক আছে ।ইটস ওকে ।”
“কোন এক সময় আমি তোমাকে ঘুরাবো ।”মনে মনে বললো রনি।
রনি ঠিক আছে বলেই শ্রাবণের কাছ থেকে চাবি নিয়ে বিদায় দিয়ে স্কুটি নিয়ে চলে গেল।
সাথে সাথে শ্রাবণ ভিতরে ঢুকতেই দেখল শহিদুল খান দাঁড়িয়ে আছে উঠানে। কিছুক্ষণ আগে এসেছে শ্রাবণকে দেখে বললো,” কিরে কোথায় ছিলি?”
শ্রাবণ এগিয়ে এসে বললো,” তুমি কখন এলে বাবা ?”
শহিদুল খান বললো,” এই তো কিছুক্ষণ আগে ।কোথায় গিয়েছিলি ?”
ঠিক এমন সময় মেঘলা ঢুকলো ।মেঘলা ঢুকে শহিদুল খান কে দেখে বললো,” বড় আব্বু ?”
বলে দৌড়ে এগিয়ে এলো।
শহিদুল খান দুজনকে একসাথে দেখে অবাক হয়ে তাকালেন শ্রাবনের দিকে ।তারপর মেঘলা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,” কোথায় গিয়েছিলে ?”
মেঘলা বললো,” ভাইয়া আজ আমাদের সবাইকে ঘুরাতে নিয়ে গিয়েছিল ।”
শহিদুল খান আবারো তাকিয়ে রইলেন শ্রাবনের দিকে। শ্রাবণ তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে।
রাত ৯ টা বাজে।আজ শহীদুল খান এবং সাজ্জাদ খান আসায় নতুন করে আরো দু এক পদ চড়িয়েছেন যেহেতু দুই ভাই বাসি কিছু খেতে পারে না তাই ।সবাই খেতে আসলো। ডিসেম্বরের শীতে সবাই কাঁপছে ।শ্রাবণ এখনো উপর থেকে নামেনি ।তাই শহিদুল খান মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললেন ,”শ্রাবণ ভাইয়া নামেনি ওকে একটু ডেকে নিয়ে আসো তো আম্মু?”
মেঘলা দৌড়ে দৌড়ে শিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল ।রুমের কাছে আসতেই দেখলো দরজা চাপানো।নক করলো দরজা । বললো,” ভাইয়া আসবো?”
শ্রাবণ ওর বড় ব্যাগে করেই মেঘলা জন্য ছোট্ট কথা বলা পুতুলটি নিয়ে এসেছিল ।কি মনে করে যেন আজ দিতে ইচ্ছা হল ।তাই বললো,”ভিতরে আয়।”
মেঘলা ঢুকেই বললো বড় আব্বু ডাকে। শ্রাবণ বললো,” আচ্ছা এক মিনিট দাঁড়া ।”
বলেই ব্যাগ থেকে একটি প্যাকেট বের করে মেঘলার হাতে দিয়ে বললো,” এটি নে।তোর জন্য।”
মেঘলা সাথে সাথে হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,” এটি কি ?”
জিজ্ঞেস করে আর ধৈর্য্য হলো না উত্তরের অপেক্ষা করার।নিজেই প্যাকেটটি খুলে দেখতে লাগলো।খুলেই বোকা হয়ে গেল মেঘলা দেখলো কথা বলা পুতুল ।ছোটবেলা থেকেই মেঘলার এই ধরনের পুতুলগুলো খুব পছন্দ কিন্তু কেন যেন কেনা হয়ে ওঠেনি।
মেঘলা খুশিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে সাথে সাথে পুতুলটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে পুতুলের গালে এখানে ওখানে চু*মু খেতে লাগলো ।শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘলা চঞ্চলতার দিকে।
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১২৩+১২৪
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৪৮+১৪৯+১৫০
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৯
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪৪
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৫৮+১৫৯
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৫৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮০
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৮
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২৭+২৮
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২৫+২৬