আদিলমির্জাসবিলাভড
— ২০
পরমুহূর্তেই আদিলের মৃদু হাসির শব্দে কাঁপে তার দৃশ্যমান, চওড়া বুক। ওই বুকে রোযার পিঠ স্পর্শ করায় স্পষ্ট অনুভব করে কম্পন। ও এলোমেলো ভাবে মুষড়ে ওঠে। কনুই দিয়ে ধারালো এক গুতো মার তে চাইলেও পারে না। আদিল চোখের পলকে থাবা দিয়ে ধরে কনুই খানা। পুনরায় মুঠোবন্দী করে হাতটা। পূর্বের চেয়ে দৃঢ়। তার ধূসর চোখে ভাসে কৌতূহলের ঝড়।
অতিমাত্রায় রাগলে রোযার শরীর কাঁপে। ঠোঁট কাঁপে তিরতির করে। চোখ লাল হয়ে কোণ ভিজে ওঠে। কথা বলতে নিলে দম আটকে আসে, বাক্য জড়িয়ে যায়। এইমুহূর্তেও ওর ওমন করুণ অবস্থা হয়ে আছে। রীতিমতো হাঁসফাঁস করছে গ লা কা টা মুরগির মতো। নিজেকে ওমন দানবীয় মুষ্টি থেকে মুক্ত করার জন্য ব্যথাও গায়ে মাখছে না। দিশেহারা হয়ে মুষড়ে যাচ্ছে সমানে। হঠাৎ সজোরে কনুই ছুটিয়ে পুনরায় আক্র মণ করল। রাগে কণ্ঠ কাঁপল ভূমিকম্পের মতো –
‘স ন্ত্রাসের পাশাপাশি আপনি একটা ল ম্পটও।’
কথাটুকু পড়তেই আশপাশের আবহাওয়া থমথমে হয়ে আসে কেমন। ছাঁদের দরজার বাইরে দাঁড়ানো শান্ত, এলেনের চোখের পাপড়ি সমানে কাঁপে। কাঁপে শান্তর পি স্তল ধরা হাতটা। ওর মনে হয়, পৃথিবীর বুকে এই নারী প্রথম এবং শেষ যে এসব বলেকয়েও এখনো পৃথিবীর বুকে দিব্যি শ্বাস নিচ্ছে! শুধু শ্বাস নিচ্ছে না! নাকের ডগায় ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে বেশ। এলেন আড়চোখে ভেতরে তাকাতে চাইলে, শান্তও দু-কদম এগিয়ে মাথাটা বাড়িয়ে দিলো ভেতরে। মুহূর্তে ও ভয়ংক রেগে পি স্তল তাঁক করে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল সতর্ক ভঙ্গিতে –
‘বস!’
শান্তর দৌড়ে ঢোকা দেখে এলেনও দ্রুতো কদমে ঢুকলো। সামনের দৃশ্য দেখে চোখ কপালে উঠে আসার মতো অবস্থা যে….
সূর্যটা তখনো ডোবার মুহূর্তে আছে। র ক্তিম আলোয় রেঙেছে চারপাশটা। রোযা দাঁড়িয়ে আছে পুল ল্যাডারের পাশে। ওর হাতে পি স্তল। পুল ল্যাডারের পাশে রাখা আদিলের পি স্তলটাই সুযোগ বুঝে তুলে নিয়েছে। আপাতত কাঁপতে কাঁপতে পি স্তল দু-হাতে ধরে তাঁক করে রেখেছে আদিল মির্জার ঠিক বুক বরাবর। র ক্তিম চোখজোড়া দিয়ে আ গুন বেরুচ্ছে ঝরঝর করে। যেন যেকোনো সময় স্যুট করে দেবে! শান্তর চোয়াল শক্ত হয় অমনি। কঠিন হয়ে আসে দৃষ্টি। রূঢ় স্বরে শাসায় পেছন থেকে –
‘পুট ডাউন ইউর গান। ওর..ওর আই’ল শ্যুট….’
ওমন হু মকি শুনে রোযা রাগে দিশেহারা হয়ে পড়ে উল্টো। পি স্তল নামানো তো দূরের বিষয়, তখুনি ধারালো চোখে চেয়ে—সেকেন্ডের মধ্যে ট্রিগার প্রেস করে দেয় শান্তর দিকে। তীব্র শব্দে, এলোমেলো ভঙ্গিতে গু লি ছুটে গিয়ে বিঁধে দেয়ালে। গু লিটা ছুঁড়ে কেঁপে ওঠে রোযা নিজেই। বড়ো করে ঢোক গিলে দু-পা পিছিয়ে আসে কেমন। হাত কাঁপলেও দাঁতে দাঁত পিষে শান্তকে চোখ রাঙিয়ে বলতে থাকে –
‘শাট-আপ। নাহলে আমি আগে তোকে শ্যু ট করব ল ম্পটের হেল্পার। আমাকে অসহায় পেয়ে এমন করছিস না? তোদের আমি….’
শান্তর মুখটা হা হয়ে আসে। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারে না। কিছুক্ষণের জন্য যেন প্যারালাইজড রোগী হয়ে গিয়েছে। অবিশ্বাস নিয়ে যখন তাকায় আদিলের দিকে। আদিলকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসতে দেখে আরও বেয়াকুব হয়ে যায়। এলেন আলগোছে টেনে ধরে শান্তর শার্ট। ওই টানে সমানে পিছিয়ে যায় ছেলেটা। নেমে আসে পি স্তল তাঁক করে রাখা হাতটা। ওরা হতবিহ্বল, ওরা বিষ্ময়ে বাকরূদ্ধ যে!
নীরবতা চিঁড়ল আদিলের শব্দ করা হাসির ধ্বনিতে। দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ওই হাসির সুর তিরস্কারের মতো শোনাল। রোযার তাঁক করা পিস্তলের সামনেই আমোদে কদম বাড়াতে থাকল ধীরে ধীরে। রোযা ঘাবড়ে গেলো এতে। এক কদম পিছুতে চাইলে লম্বা প্যান্টের ল্যান্থের সাথে প্যাঁচিয়ে প্রায় পড়তে নিলো। তবে পড়ল না। নিজেকে সামলে নিয়ে পুনরায় পিস্ত ল তাঁক করে ধরল দ্রুতো। হু মকির সুরে বলল –
‘এগুলে কিন্তু আমি শ্যু ট করে ফেলব।’
বজ্রকণ্ঠের ওমন ফাঁকা হু মকির সামনে আদিল হেসেই গেলো। ভাসা ভাসা চোখে অন্যরকম আগ্রহ। ন গ্ন পায়ের কদম একই গতিতে বাড়াতে বাড়াতে ভীষণ শান্ত তবে গভীর গলায় আদেশের মতো করে বলল –
‘শ্যু ট মি…রোজজ-আহ….’
এমন প্রত্যুত্তর যে রোযা আশা করেনি। আশ্চর্যে চোখদুটো বড়ো হয় আসে। কপালের মধ্যিখানে ভাঁজ পড়ে গুটিকয়েক। ইতস্ততভাবে কণ্ঠে আরও জোর ঢেলে বলে –
‘মজা করছি না কিন্তু আমি আদিল মির্জা। গু লি করে ফেলব।’
আদিল ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছে প্রায় কাছাকাছি। কৌতূহল হয়েই নির্বিকার মুখে যেসব কথাগুলো বলে তা শুনে রোযার রীতিমতো গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে –
‘তাই না? আমি খুব ভয় পাচ্ছি। প্লিইইজ, ডোন্ট ডু ইট? কী চাও তুমি, বলো? আমি সব দেবো তাও আমাকে ছেড়ে দাও। মে রোও না…’
শান্ত ফিক করে হেসে ফেলল। বেচারার শরীর কাঁপছে রীতিমতো। ঠোঁটে ঠোঁট টিপল এলেনও।
‘আপনি…আপনি একটা….’
রোযা রাগে-দুঃখে আওড়াতে আওড়াতে কয়েক কদম দ্রুতো পেছোয়। কম্পিত হাতে পুনরায় গু লি ছোড়ে, তবে অন্যদিকে। তীব্র ভয়েও চোখ মেলে থাকে, শুধুমাত্র দেখতে চায় আদিল মির্জার ভয়ার্ত মুখ খানা। একজন মানুষ গু লি ছুড়ছে, যেকোনো সময় শরীরে লাগতে পারে…এমতাবস্থায় নিশ্চয়ই ভয় পাবে? অথবা ছোটো একটা রিয়াকশন তো দেবে? অথচ ভয় তো দূরের বিষয়! চোখের পলকও পড়ে না লোকটার। সরে না ঠোঁটের ওই বাজে হাসিটা। থামে না ওই দানবের মতো পায়ের একেকটা বাড়ানো কদম। উল্টো তার খুব কাছে এসে যাচ্ছে যে! রোযা দিশেহারা হয়। ভয়ে শরীর আঁটসাঁট হয়ে যায়। আদিল কদম বাড়ালে, চকিতে রোযা আরেক কদম পেছাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে পুলে। তীব্র শব্দের পাশাপাশি পরিষ্কার নীলচে পানি ঝলকে ওঠে। পুলে পড়ে ও হাপুসহুপুস করল কিছুক্ষণ। ভীষণ গাঢ় যে! ভেসে উঠতে সময় লাগল ওর। নাকমুখে পানি ঢুকেছে। সমানে কাশতে কাশতে মুখের সামনে থেকে চুল সরালো কোনোরকমে। রোযা সাঁতার পারে। তাও চমৎকার কৌশলে। কিন্তু এমতাবস্থায় সবটা গোল মাল হয়ে যাচ্ছে। শূন্য হচ্ছে মস্তিষ্ক! একহাতে তখনো ধরে রেখেছে পি স্তল। ওটা আদিলের দিকে তাঁক করল। তাকাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।
আদিল এসে দাঁড়িয়েছে পুল ল্যাডারের পাশে। নিশ্চুপ হয়ে নির্নিমেষ চেয়ে থাকে পুলে থাকা রোযার দিকে। ব্রাউন রঙের লম্বা চুলগুলো ভাসছে পানির ওপর। পরিষ্কার পানিতে দেখা যাচ্ছে সবটাই। আদিলের সাদা শার্ট ভিজে মিশে আছে শরীরে। অস্পষ্ট হলেও ফিনফিনে পাতলা শুভ্র রঙা শার্ট প্রায় ট্রান্সপারেন্ট। দেখা যাচ্ছে ধবধবে ফর্সা গায়ের রং। ওই দৃষ্টির সম্মুখে রোযা নিজের অবস্থা বুঝতে পারে। মুহূর্তে দু-হাতে নিজেকে ঢাকতে ব্যস্ত হয়। আদিল তাকাল ডান দিকে। শান্ত আর এলেন ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে ফের। আদিল ফিরে তাকাল। রোযা আশেপাশে তাকাচ্ছে। পুল ল্যাডার ব্যতীত ওঠার আর কোনো রাস্তা নেই। অথচ ওখানটাতেই আদিল! রোযা এগুতে পারছে না। অসহায় হয়ে শুধু চেয়েই আছে সতর্ক চোখে।
তার সতর্ক দৃষ্টির সামনেই আদিল রোব খুলে উদোম শরীরে ঝাপিয়ে পড়ে পুলে। রোযা চমকে সীৎকার করে উঠতেও পারে না। এক ডুব দিয়ে আদিল ঠিক ওর ভীষণ কাছে এসে পড়ে। যতটা কাছে এলে নিশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করা যায়। রোযা আতঙ্কে পিছিয়ে মিশে যায় পুলের দেয়ালে। পি স্তলটা তাঁক করতে চায়। কিন্তু পারে না। আদিল দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলে চোখের পলকে। তার প্রশস্ত, উন্মুক্ত বুক প্রায় ছুঁইছুঁই। রোযার কালো মণিতে চেয়ে বেশ শান্তভাবেই হাত বাড়িয়ে ডোবায় রোযার পি স্তল ধরা হাতটায়। সহজেই নিয়ে নেয় পিস্ত লটা। পরমুহূর্তেই পিস্ত লের মাথাটা ডোবায় রোযার নরম পেটে। প্রায় নাকে নাক ছুঁইছুঁই করে আওড়ায় –
‘গু লি করি, হুম? তোমার সাহস ছোটাই তবে? চো পাটা বন্ধ করে দিই?’
পি স্তলের শীতল স্পর্শে রোযা ভয়ে মিইয়ে যায়। নাকের পাটা ফুসে ওঠে। পরপর গু লির ভয়ংকর শব্দে কেঁপে ওঠে থরথর করে। আদিল গু লিটা ছুঁড়েছে অদূরে। ভাঙচুরের মৃদু শব্দ হয়েছে এতে। রোযা চোখমুখ খিঁচে বলে –
‘কেনো? আম–আমি সৎভাবে, নিষ্ঠার সাথে আমার দায়িত্ব পালন করে এসেছি এতোগুলো বছর ধরে। কখনো কোনো রুলস ভঙ্গ করিনি। আমার সর্বোচ্চ দিয়ে প্রিন্সেসের টেক কেয়ার করেছি। তাহলে কেনো আমার সাথে এমন করছেন?’
আদিল তাকাল রোযার বন্ধ চোখের পাতায়। চুল থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে। তিরতির করে কাঁপছে লোভনীয় গোলাপি ঠোঁটজোড়া। ঠোঁটে চেয়েই আদিল মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে আওড়ায় –
‘You don’t even realize how badly you’ve messed up, Rose-a…’
ওমন কণ্ঠে, উপস্থিতিতে রোযার গা কাঁটা দিয়ে উঠল। ঝিমঝিম করল মাথার ভেতরটা। সরে যেতে চেয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে ফেলল চটজলদি। ভেজা ঘাড়টা ঠিক আদিলের মুখের সামনে। তার পাঁচটা আঙুলের ছাপ এখনো ফর্সা চামড়ায় স্পষ্ট। আদিল হাত বাড়াল। সে-রাতের ন্যায় থাবা দিয়ে ধরল রোযার গলা। তবে শক্ত করে নয়। ধরার মধ্যে অদৃশ্য এক কোমলতা আছে। রোযা চোখ রাঙাল। ছোটাতে চাইল তার গলা চেপে ধরা হাতটা। দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায় নিজ মনে, চ ড় মে রেছি বেশ করেছি। চ ড় খাওয়ার মতো কাজ করলে আর কী করার? তবে মুখে রোযা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলো –
‘আপনি আমাকে চ ড় মারুন। শোধবোধ!’
‘আমি মেয়েদের গায়ে হাত তুলি না।’
রোযা আপনমনে বিড়বিড় করে ভেঙাল, ‘মেয়েদের গায়ে হাত তুলে না! অসভ্য, নির্লজ্জের মতো ঠিকই ধরাধরি করতে পারে।’
মুখে বলল, ‘আপনি না পারলে আপনার গার্ডসদের বলুন।’
‘হু ডেয়ারস?’
রোযা বোঝে না। দৃষ্টি তুলে তাকায়। আদিল কথা ঘোরায় –
‘চ ড় আমি খেয়েছি। আমার গার্ডস না!’
রোযার কণ্ঠ অসহায় হয়ে আসে, ‘আপনি কী চাচ্ছেন বলুন তো?’
কী চাই আদিলের? যা চাই, তা তো তার সামনেই। এক ইঞ্চি দূরে মাত্র। আদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছাড়ল গলা। সরে এলো। মুহূর্তে রোযা শ্বাস ফেলল। ধড়ফড়িয়ে পুল ল্যাডার বেয়ে ওপরে উঠে গেলো। আদিল বলল –
‘রোবটা পরো।’
রোযা নিজের পরিস্থিতি বুঝতে পারে। সাদা পরেছে সে! সবটাই, সি থ্রু প্রায়! তাই কথা না বাড়িয়ে রোবটা দ্রুতো গায়ে জড়িয়ে নেয় আষ্ঠেপৃষ্ঠে। আদিল আওয়াজ তোলে –
‘শান্ত!’
শান্ত ভেতরে আসে। বলে, ‘জি বস।’
‘পৌঁছে দে।’
শান্ত পূর্বের ন্যায় ভীষণ কোমল স্বরে হাতের ইশারা করে বলে, ‘প্লিজ ম্যাডাম…’
রোযা ভীষণ ক্লান্ত! চোখ রাঙানো ছাড়া কিছু বলার শক্তিই নেই ওর। আর কোনোকিছুর পরোয়া করতে ইচ্ছে করছে না। সে শুধু বাসায় পৌঁছাতে চায়। বাবা-মাকে দেখতে চায়। তাই আর একটা শব্দও করে না। শান্তর সাথে সোজা নেমে আসে। আগেপাছে কোথাও আর তাকায় না। সেভাবেই উঠে বসে গাড়িতে। গাড়িটা চলতে শুরু করলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। প্রাণখোলা শ্বাস নেয়।
—
আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম কেউই যে আর বসে থাকতে পারছেন না। চিন্তায় চিন্তায় আজ সারাটাদিন কাটিয়েছেন। বারবার অসহায় চোখে শুধু দরজার দিকে চেয়েছিলেন দুজন। রাজুও যে দরজা খুলে বাইরেটা দেখছে এই আশায়, এই বুঝি ওর আপু বাড়ি ফিরল! কিন্তু না! সূর্য ডুবে রাত নেমেছে রোযার এখনো ফেরার নাম গন্ধ নেই। গতকালের পরে যে ওর সাথে কারোরই কথা হয়নি! আজিজুল সাহেব অস্থির হয়ে বললেন –
‘বাড়ির সামনে যাই তবে? ঢুকতে না পারলেও খোঁজ তো নিতে পারব?’
নিপা বেগম সামান্য দ্বিধা করছেন। কারণ সকালের ছেলেগুলো ভীষণ সুন্দর ভাবে তাদের বুঝিয়ে গিয়েছে। আশ্বস্ত করেছে রোযা রাতে ফিরে আসবে যেমনটা রোজ আসে। রোযার প্রায়শই ফিরতে দশটা-এগারোটা বাজতো। এখনো ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছোঁয়নি যে! তাই তিনি অপেক্ষা করতে চাইছেন নয়টা – দশটা পর্যন্ত। স্ত্রীর না বলা কথা আজিজুল সাহেবও বুঝলেন। কিন্তু মন মানতে নারাজ! মেয়েটার জন্য ছটফট করছেন। বাজে চিন্তাভাবনার মাত্রা প্রতি সেকেন্ডে বেড়ে যাচ্ছে।
যখন দুজন অস্থির, ওসময়ে কলিংবেল বেজে উঠল। ছুটে গেলেন নিপা বেগম। পিছু ছুটল রাজুও। সোফার হাতল ধরে উঠে দাঁড়িয়েছেন আজিজুল সাহেবও। দরজা খুলতেই রোযাকে দেখে ভদ্রমহিলা স্বস্তির শ্বাস ফেলতে নিয়েও পারলেন না মেয়ের অবস্থা দেখে। রোযা দ্রুতো ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়েই জড়িয়ে ধরল নিপা বেগমকে। প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে থাকল।
‘কী হয়েছে রে? এমন লাগছে কেনো তোকে?’
আজিজুল সাহেব আঁতকে ওঠেন, ‘ভেজা কেনো তুমি, মা? কী পরেছো এটা?’
রোযা নিজেকে সামলে নেয়। মোটেও বাবা-মাকে চিন্তায় ফেলা যাবে না। এসব জানতে পারলে দিশেহারা হয়ে পড়বেনভীষণ সেন্সিটিভ, ভীতু মানুষ তারা। তাদের পেরেশানিতে ফেলতে চায় রোয়া। অগত্যা ইচ্ছে না হলেও হাসল। প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে বেশ অভিনয় করে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বলল –
‘আমার শাড়িটা নষ্ট হয়ে যায়। আর ও বাড়িতে তো মহিলা মানুষ নেই। কাপড়চোপড় মহিলাদের কোথায় পাবো? তাই বাদ কিছু একটা পরেছিলাম। ফেরার আগে ছাঁদে গিয়েছিলাম একটা কাজে। আমি তো জানতাম না ওখানে সুইমিংপুল আছে। খেয়াল না করায় পড়ে যাই। তাই দ্রুতো ফিরে এসেছি।’
বিশ্বাস করলেন আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম। দুজন সরল মানুষ। মেয়ে যা বলেন তাদের জন্য তাই সই। উল্টো এসবে মাথা না ঘামিয়ে দ্রুতো মেয়েকে রুমে পাঠালেন গোসল করতে। রোযা রুমে এসে প্রথমেই গোসলে ঢোকে। গোসল সেরে বেরুতেই অনেকটা হালকা অনুভব হয়। বুকের ভার ভার ভাবটা কমে এসেছে। দমবন্ধ অনুভূতিটা আর হচ্ছে না। নিপা বেগম তখুনি এলেন প্লেটে ভাত-তরকারি সাজিয়ে। পাশে বসে যখন নিজ হাতে নলা তুললেন মেয়ের মুখে, কজ একদম বাধ্য মেয়ের মতো রোযা খেয়ে নিলো চুপচাপ। খাওয়াতে খাওয়াতে নিপা বেগম বললেন গতকাল রাতের কথা –
‘আমরা তো তোকে ছাড়া ফিরবোই না। তখুনি এলেন আদিল মির্জা। বাব্বাহ, কী ভয়ে পেয়েছিলাম জানিস? ওমন মস্তবড়ো লোক…তারওপর কণ্ঠ, চোখ… কথা বলার ধরন অন্যরকম প্রেসার দেয়। পেছনে একগাদা বডিগার্ডস! তোর বাবা আর আমি তো থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম।’
রোযা আস্তে করে প্রশ্ন করে, ‘কী বলেছে এসে?’
‘ওহ হ্যাঁ, আমরা তো তোকে ছাড়া আসতেই চাচ্ছিলাম না। তখন আদিল মির্জা এসে বললেন, তার মেয়ের আজ জন্মদিন। মেয়ে উপহার হিসেবে তোকে চেয়েছে। তাই তুই আজ থাকবি। তোর বাবা এরপরও রাজি হচ্ছিলো না জানিস? অথচ ওমন মান্যগণ্য লোককে না করার সাধ্যি আমাদের আছে? তাই বাধ্য হয়েই তাদের গাড়ি করে আমাদের ফিরতে হয়েছে।’
রোযার কানে ভাসে একটি বাক্য! তার মেয়ে উপহার হিসেবে তোকে চেয়েছে! রোযা হৃদিকে ভালোভাবে চেনে। এমন আবদার বাচ্চাটা করতে পারে। ওর দ্বারা সম্ভব! কিন্তু রোযা যে আর জড়াতে চায় না। আর ও বাসায় যেতে চায় না। সে কাজটা এযাত্রায় পুরোপুরি ছেড়ে দিতে চায়। ভবিষ্যতে কী হবে জানা নেই! কীভাবে থাকবে হৃদিকে ছাড়া জানা নেই! তবে সে আর মির্জা বাড়িতে প্রবেশ করবে না। এতটুকু স্বীদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।
‘কিছু হয়েছে, মা? চিন্তিত লাগছে তোকে!’
নিপা বেগমের চিন্তিত কণ্ঠে রোযা প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে হাসে। মুখ বাড়িয়ে টুপ করে চুমু খায় মায়ের কপালে। বলে –
‘ঘুম হয়নি ভালোভাবে। লম্বা একটা ঘুম দিলে সব ঠিক হবে। আর আমার ফোনটা কোথায়? দিয়ে যাও। জিহাদ এসেছিল? ওর কোনো খবর আছে?’
নিপা বেগম সামান্য অসন্তুষ্ট হলেন। একপল মেয়ের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করলেন, ‘ছেলেটা কদিন ধরে অদ্ভুত আচরণ করছে। কোনো সমস্যা হলো কি-না? ঝগড়া করেছিস তোরা?’
রোযা জবাব দেয় না। চায় জানালার বাইরে। অগত্যা ফাঁকা প্লেট হাতে বেরিয়ে গেলেন নিপা বেগম। পরপরই ফিরে এলেন ফোন হাতে। বললেন,
‘ঘুমিয়ে পড় তবে!’
মা যেতেই রোযা দরজা লাগিয়ে এসে বসল বিছানায়। স্ক্রিনে ভাসছে জিহাদের অজস্র কল-মেসেজেস। সারাদিন ধরেই সম্ভবত কল, মেসেজ করে গিয়েছে। আপাতত এসব দেখার ধৈর্য্য রোযার নেই। মানসিক ভাবে ক্লান্ত। ফোনটা পাশে ফেলে কম্ফোর্টারে ডুবে ঘুমের রাজ্যে হারাল। যা হবে আগামীকাল দেখা যাবে।
মূলত রোযার ইচ্ছে আছে, আগামীকাল জিহাদের বাড়ি যাওয়ার। ওর ব্যাপারটা কী ভালোভাবে দেখা দরকার। রোযার অন্তর যেহেতু কু-ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাহলে নিশ্চয়ই ঝামেলা একটা আছে! এখন ঝামেলাটা পজিটিভ নাকি নেগেটিভ তা তো ওখানে গেলেই সবটা জানা যাবে। প্রয়োজনে রোযা ওর বাবা-মাকে কল করবে। সবকিছু যদি ভালো হয়, তার ধারণা যদি ভুল হয়ে থাকে —তাহলে আর দেরি নয়। কদিনের মধ্যেই বিয়েটা করে ফেলবে।
চলবে ~~~
® #নাবিলা_ইষ্ক।
[ কী, বলবো নাকি দশ হাজার লাইক না হলে নেক্সট পর্ব দেবো না? হা হা হা! মজা করছি। ভালোবাসারা আমার, অগ্রীম নতুন বছরের শুভেচ্ছা। নেক্সট ইয়ার আমরা মিলেমিশে যেন আনন্দে কাটাতে পারি, কেমন? এভাবেই ভালোবেসে যাবেন আর আমিও যাবো, হ্যাঁ? প্রমিইইজ?
আর…পূর্বের পর্বের চেয়ে আজকের পর্বটা সম্ভবত ছোটো হয়ে গেলো। তবে চিন্তা নেই। সামনে দারুণ কিছু সিন আছে। অপেক্ষা করুন, হ্যাঁ? আর খাপছাড়া হলো কি-না জানিয়েন। সবশেষে ভালোবাসিইই। হ্যাপি নিউ ইয়ার মাই
লাভস। ]
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৫
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১