অ্যারেঞ্জম্যারেজ২ — দ্বিতীয় পর্ব
অবন্তিকা_তৃপ্তি
~ ‘কিরে শোয়েব বাবা, ভালো আছো? হুনলাম তুমি তিতলিরে নাকি বিয়া করবা? কি কও এগুলা বাবা? ওই মেয়ের তো চাল-চলন বালা না। জলদি মানা কইরা দাও বিয়াতে বাবা। হুনছো নি আমার কথাটা?’
একটা ভাঙা-ভাঙা বৃদ্ধ বয়সী কণ্ঠ শোয়েবকে কথাগুলো বলতেই শোয়েব সাথেসাথে ভ্রু কুচকে ফেললো। এতক্ষণ একটা প্রেসক্রিপশন রেডি করছিল। শোয়েব প্রেসক্রিপশনে সিগনেচার করে সেটা বন্ধ করে ইজি চেয়ারটায় হেলান দিল।
পরপর ফোনের ওপাশের মেয়েটার উদ্দেশ্যে চুড়ান্ত বিরক্ত হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
‘স্টপ ইট তিতলি। এসব ফাতরামো মজা আমার সাথে করলে নেক্সট টাইম সামনে পেলে খবর করে দিব তোমার।’
‘আস্তাগফিরুল্লাহ! বুঝে গেছে।’
তিতলি সাথেসাথে কলটা কেটে দিল। ফোন কেটে বেচারি আহাম্মক হয়ে রোবটের মতো হা হয়ে বসে রইল।
আচ্ছা. .লোকটা ওর কণ্ঠ বুঝল কি করে? অত্যন্ত সেয়ানা লোক বটে। তিতলি বিয়ে ভাঙাটা যতটা সহজ মনে করেছিল, এই লোককে দেখে এখন সেটা ততটা সহজ মনে তো হচ্ছে না। আজ তো দেখা হবে, না জানি কেমন বাঁশটা দেয়।
না, না! প্ল্যান করতে হবে আরও, কঠিন প্ল্যান!
ফোনটার দিকে শোয়েব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। মাথা ধরে যাচ্ছে, ও ফোনটা রেখে দিয়ে ইজি চেয়ারটায় হেলান দিয়ে মাথাটা এলিয়ে দিল। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল,
শোয়েব শুনতে পায়—-‘আসব?’
ফারদিনের কণ্ঠ। শোয়েব চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলে——-‘আয়।’
ফারদিন কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে বলল———-‘মাথার ব্যথা বেড়েছে নাকি?’
শোয়েব চোখ ডলে ডলে চেয়ারে আবার সোজা হয়ে বসে বলল———‘না, একটা নতুন মাথা ব্যথা নিয়েছি লাইফে। সেটারই ইমপ্যাক্ট।’
ফারদিন হেসে ফেলে——-‘আপু কি আবার মেয়ে দেখিয়েছে?’
শোয়েব মাথা নাড়ল। ফারদিন হাসল——-‘আপুর যা অবস্থা তোকে বিয়ে দিয়েই ছাড়বেই এবার। এখনের মেয়েটা কে?’
শোয়েব ছোট একটা শ্বাস ফেলে: এ যাত্রায় ল্যাপটপের উপর কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে বলল———-‘এইবারের মেয়েটা আমার হবু স্ত্রী।’
ফারদিন অবাক হয়ে গেল পুরো——-‘মানে? এবার বিয়েটা তুই আসলেই করছিস? কাহিনি কি; খুলে বল।’
শোয়েব যতটুকু সম্ভব বলল। ফারদিন শুনে আশ্চর্য হয়ে বলল————‘একটা কলেজ গোইং মেয়েকে তুই বিয়ে করবি? বয়স ডিফারেন্সটা বেশি হয়ে গেল না?’
শোয়েব ফারদিনের দিকে এবার ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। সাফাই গাওয়ার উদ্দেশ্যে চোখ-মুখ কঠিন করে বলল———-‘মোটেও বয়স বেশি না। ওটুকু ব্যবধান পারফেক্ট। আর হাজবেন্ডদের বয়স বেশি হওয়া ভালো, এসব মেয়েদের ফাতরামি তাহলে সোজা করা যায়।’
‘মানে? কি করেছে তোর হবু স্ত্রী?’ —- ফারদিন কিছুই বুঝতে পারছে না।
শোয়েব কাঠকাঠ কণ্ঠে জবাব দিল———‘যাই করুক, এসব ওর-আমার ব্যাপার। তবে সবকথার এক কথা, বিয়েটা ও আমাকেই করছে।’
ফারদিন হাসল——-‘ওকে ওকে। বিয়েতে দাওয়াত দিস অন্তত।’
শোয়েব মাথা নাড়লো স্রেফ। ফারদিন শোয়েবের দিকে এরপর কেমন চোখে চেয়ে থাকে। ও ভেতরে ভেতরে দারুণ আশ্চর্য হচ্ছে— শোয়েবের মতো ম্যাচিউর ছেলে কি না কলেজ গয়িং ইমম্যাচিওর মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল? অসম্ভব ব্যাপারই বটে!
——————————
পায়রানিবাস. .
তিতলি এইমুহূর্তে নিজের মায়ের সামনে গালটা ফুলিয়ে দাড়িয়ে আছে। পায়রা বেগম তিতলির সামনে দুটো ড্রেস এনে রাখলেন। জিজ্ঞেস করলেন———‘দেখো তো কোনটা পড়বে?’
তিতলি ড্রেসটার দিকে তাকালোও না। বিরক্ত হয়ে বলল——-‘আচ্ছা আম্মু, আমাকে এত দ্রুত বিয়ে দিয়ে তোমাদের মাথার বোঝা হালকা করতে চাইছো তোমরা,তাইনা?’
পায়রা মেয়ের জন্যে কানের দুল বের করে দিচ্ছিলেন; উনি মেয়ের ছেলেমানুষি কথা শুনে ওর দিকে তাকালেন———‘এটা কি ধরনের কথা তিতলি? তুমি আমাদের বোঝা? মা-বাবার কাছে সন্তান বোঝা হয়?’
তিতলি এবার থমথমে কণ্ঠে বলল———‘দেখো. . আম্মু তুমি পিএইচডি করেছো; এত ভালো ভার্সিটিতে পড়াও, আব্বু আর্মিতে ছিলেন। তোমাদের পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ড কত ভালো। আর আমাকে কিনা কলেজে থাকতেই বিয়ে দিয়ে পড়াশোনা অফ করে দিতে চাচ্ছো?’
পায়রা ছোট করে শ্বাস ফেললেন। কানের দুলদুটো বের করে বিছানার উপর রেখে তিতলির সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিতলির গাল ফুলে আছে অভিমানে। পায়রা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—-‘ব্যাপারটা এটা না। আমার বিয়ে কলেজে থাকাকালীন হয়েছে। তোমাকেও বিয়ের পর পড়াশোনা করাবে ওরা বলেছে এবং আমি পারসোনালি পাত্রের বোনের সাথে এটা নিয়ে ডিসকাস করেছি।’
তিতলি এবার কথা তুলে———-‘পাত্রের বোন বলেছে পড়াবে, পাত্র তো বলেনি, রাইট? আর, তোমার কাছে মনে হচ্ছে না এই পাত্রের মধ্যে কিছু না কিছু গণ্ডগোল আছে?’
পায়রা মেয়ের কথাতে হতাশ। তিতলির ড্রেসটা আয়রন করতে বসলেন; সেভাবেই জবাব দিলেন———-‘যতটুকু শুনেছি ছেলেটা ভীষণ ডিসেন্ট, পড়ালেখা জানা ভদ্র ছেলে; দারুণ দেখতেও। আর তোমার যদি কোনো ডাউট থাকে তাহলে আজকে তো দেখা করতে যাচ্ছ; জিজ্ঞেস করে নিবে নিজে থেকে।’
‘আমি জিজ্ঞেস করব?’ ——আশ্চর্য হয়ে বলল তিতলি, মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ওই লোকটার সাথে কথা বললে লোকটা তিতলির চোখ দেখে গড়গড় করে নিজের সাইকোলজির জ্ঞান ঝাড়তে বসে যায়, চুড়ান্ত বোরিং বিরক্তিকর জ্ঞান সেসব। তিতলির ব্যক্তিগতভাবে এসব নার্ড ছেলদের অত্যন্ত বিরক্ত লাগে। এরা নিজেদের সবজান্তা মনে করে, আর তিতলিদের মনে করে বোকারাম গাধা।
পায়রা আয়রন শেষে জামা এনে তিতলির হাতে ধরিয়ে দিলেন, এবার গম্ভীর স্বরে বললেন————‘জামাটা পরে আসো। আর হ্যাঁ, আমার কানে যেন ভুলেও না আসে, তুমি পাত্রের সাথে বেয়াদবি বা উল্টাপালটা আচরণ করেছ। মনে থাকে যেন কথাটা!’
তিতলি মা-কে বড্ড ভয় পায়, ছোট থেকেই। তাই এইমুহূর্তে পায়রার এমন গম্ভীর স্বরে কথা শুনে ও স্রেফ তোতাপাখির মতো দুপাশে মাথা দুলাল।
তিতলি রেডি হওয়া শেষ প্রায়। পায়রা এবার নিজের রুম থেকে এলেন——-‘শেষ তোমার?শোয়েব নিচে গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আছে।’
তিতলি চুলটা খোপা করেছিল। পায়রা ওকে দেখে বললেন———-‘চুলটা খোলা রাখো। আর রেড লিপস্টিক কেন দিয়েছ? ছেলে ভাববে তোমার ফ্যাশন সেন্স নেই। নুড কোনো লিপস্টিক দাও। আর পারফিউম দিয়ো। ভদ্র এবং পরিপাটি থাকবে ওর সামনে। ছেলে যেন তোমার নামে নেগেটিভ কিছু মাথায় না আনে, মনে থাকবে?’
তিতলি এবারেও তোতাপাখির মতো শুধু মাথা নাড়ালো। পায়রা আশ্বস্ত হলেন এবার।
রেডি শেষে; ফ্যাশন সেন্স নিয়ে মায়ের এপ্রুভাল পাওয়ার পরে তিতলি একটা পার্স নিয়ে নিচে নামলো। নিচে এসে দেখে শোয়েব গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে, ফোনে কিছু একটা করছে। গায়ে নেভি সাদা টিশার্ট, জিন্স প্যান্ট। টিশার্টের উপর লেদার জ্যাকেট একটা। এই গরমে জ্যাকেট কেন পড়েছে? অবশ্য শীতও পড়ছে ইদানিং। লোকের শীতটা কি বেশি লাগে?
তিতলি ধীর পায়ে শোয়েবের সামনে গিয়ে গলাটা খাকারি দিল——‘উহুম, উহুম।’
শোয়েব ফোন থেকে চোখ তুলে সরাসরি তিতলির দিকে তাকাল। তিতলি মাথাটা নামিয়ে ওর পায়ের দিকে চেয়ে আছে। বেচারি নার্ভাস রীতিমত; হাত দিয়ে খামচাচ্ছে শুধু পার্সটা।
শোয়েব ওকে দেখে আর একটাও কথা বললো না, স্রেফ তিতলির দিকের গাড়ির দরজা খুলে দিল——-‘উঠো।’
তিতলি মাথা তুলে তাকাল। উঠো? আর কিছু না? ওকে কেমন দেখাচ্ছে কমপ্লিমেন্ট দিবে না? ফালতু লোক একটা। বয়স্ক পুরুষরা এমন নিরামিষ হয় সবসময়, তিতলি জানে এটা।
ও থমথমে মুখে উঠে বসলো ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটাতে।শোয়েব দরজাটা লাগিয়ে ড্রাইভিং সিট এ গিয়ে বসলো।
আধা ঘণ্টা ধরে গাড়িটা চলছেই শুধু। শোয়েব, নিরামিষের মতো স্রেফ ড্রাইভিং করেই যাচ্ছে। তিতলি পাশে বসে আছে, এই লোক কি সেটা ভুলে গেছে। তিতলির এ যাত্রায় মন চাইল— এই লোকের মাথাটা ফাটিয়ে দিবে পার্স দিয়ে। তবে পার্স দিয়ে মাথা ফাটানো যায়না বলে ও হুতুম পেচার মতো পাশে বসে রইল।
ওরা জ্যামে আটকেছে। তিতলি আরও বিরক্ত হচ্ছে এখন। এই লোকের সাথে বসে-বসে ওর মাথাটা ঝিম ধরে যাচ্ছে। এতটা, ঠিক এতটা নিরামিষ কেউ হয়? ফালতু একটা।
তিতলি এবার না পেরে চুড়ান্ত বিরক্ত হয়ে তাকাল শোয়েবের দিকে————‘আচ্ছা, আপনি কি আমাকে কি রাস্তা দেখাতে এনেছেন? সেদিন তো দেখে আপনাকে এতটা চুপচাপ লাগেনি। গাড়িতে কোনো গান চালান অন্তত; বিরক্তিতে আমার মাথা ধরে যাচ্ছে।’
গড়গড় করে এতোগুলো কথা বলার পর তিতলি দমটা ফেলল। শ্বাস আটকে চোখ ছোটছোট করে শোয়েবের দিকে তাকিয়ে রইল। নাকটা বারবার ফুলছে রাগের চাপে। শোয়েব এবার স্বাভাবিক; নির্বিকার চোখে তিতলির দিকে তাকালো, তারথেকেও নির্বিকার কণ্ঠে বলল————-‘কথা বলব? ওকে ফাইন, বলি তাহলে। সকালে এ ধরনের প্রাংক কল দিয়েছিলে কেন? সাহসটা বেশি বেড়েছে, না? আর কল দিয়ে এসব কি কথা বলছিলে? খুবই লেইম-ফাতরা কথা ওগুলো। কি ভেবেছিলে, আমি বিয়ে ভেঙ্গে দিব। বোকা নাকি আমি? এবার বলো, কল দিয়েছেলে কেন? মাথায় কোন ভূতটা চড়েছিলো, একেবারে নামিয়ে দিব আমি, ডোন্ট ওরি।’
তিতলি আহাম্মক হয়ে শোয়েবের এতগুলো কথা শুধু শুনেই গেল। পরপর মুখটা চোরের মতো লুকিয়ে নিয়ে জানালার দিকে ঠেসে বসে বিড়বিড় করলো———-‘আপনার কথা বলার দরকার নাই;আপনি চুপই থাকেন, ওটাই মানায় আপনাকে।’
শোয়েব তাকিয়ে দেখলো তিতলিকে, পরপর কেন যেন তিতলির ওভাবে বিড়বিড় করে চোরের মতো কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে হেসে ফেলে নিঃশব্দে। ও মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা কোনঠাসা তিতলিটার দিকে— মেয়েটা দারুণ ইন্টারেস্টিং চরিত্র।
শোয়েব নিঃশব্দে ঠোঁটে মুচকি হেসে তিতলির দিকে শুধু চেয়েই রইলো; যা তিতলি জানতেই পারলো না। মেয়েটা তখনও কোনঠাসা হয়ে জানালার দিকে চেয়ে আছে।
চলবে
রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করবেন। রেগুলার দিচ্ছি তো এটা, আশা করছি সবাই জানাবেন কেমন লাগছে। আর আমি তো আপনার কমেন্টের রিপ্লাই দিবই।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২ পর্ব ১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৬
-
ডেনিম জ্যাকেট স্পয়লার (বিবাহ পরবর্তী)
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৭