Golpo romantic golpo অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২

অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২ পর্ব ৪


অ্যারেঞ্জম্যারেজ২ — ৪ পর্ব

অবন্তিকা_তৃপ্তি

আজ শোয়েবের পরিবার তিতলিদের বাড়ি আসবে, পাকা কথা বলার জন্যে। আর এই বিষয়টা তিতলি মাত্রই ওর মায়ের কাছ থেকে জেনেছে। তিতলি তো শুনে আহাম্মক হয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পরপর একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল———‘পাকা দেখা? বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলা হয়েছে নাকি অলরেডি?’

পায়রা ড্রইং রুমের সোফার টেবিলে কোন ফুলদানিটা বেশি শোভা দিবে, আপাতত সেটাই দেখছিলেন। তিতলির কথায় ব্যস্ততা দেখিয়ে জবাব দিলেন————‘এখনো তেমন তারিখ ভাবা হয়নি। তবে সম্ভবত এই মাসেই আকদ করা হবে। বিয়েটা এখনও ভাবা হয়নি।’

‘আকদ আর বিয়ে কি এক না?’ —- তিতলি বোকার মতো প্রশ্ন করে বসে।

পায়রা ফুলদানি ততক্ষণে সিলেক্ট করা শেষ। সোফার কুশন বদলাতে বদলাতে জবাব দিলেন——-‘এক আবার এক না। আক্দ মানে তুমি এ বাড়িতেই থাকছো: শুধু বিয়েটা হয়ে থাকবে। আর বিয়ে মানে অনুষ্ঠান করে তুলে দেওয়া হবে ও বাড়ি।’

তিতলি শুনে সাথেসাথেই বলল———-‘তাহলে আকদই থাকুক; বিয়েটা আমার পড়াশোনা শেষ হলেই করি?’

পায়রা তাকালেন এতক্ষণে মেয়ের দিকে। তিতলির গোলগাল মায়াবী মুখটা দেখে উনার কেন যেন ভীষন আদর-আদর লাগলো। পায়রা চোখ-মুখ নরম করে মেয়েকে ডাকলেন——-‘এদিকে এসো।’

তিতলি ভ্রু বাকালো, পরপর চুপচাপ মায়ের পাশটায় গিয়ে সোফায় বসলো। পায়রা মেয়ের থুতনি চেপে ধরে মেয়ের মুখটা নিজের দিকে তুললেন। তিতলি চুপচাপ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়। পায়রা মৃদু স্বরে বললেন———‘শোয়েবকে ভালো লেগেছে?’

তিতলি মায়ের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকে; একসময় নিভু স্বরে জবাব দিল———‘খারাপ না সে।’

পায়রা আশ্বস্ত হলেন। পরপর মেয়ের হাতটা ধরে নিজের কোলে রেখে জিজ্ঞেস করলেন———‘বিয়ে করবে তাকে? ফ্যামিলিটা একদম ছোট। শ্বশুর-শাশুড়ি নেই। শুধু একজন ননাস আছেন। তুমি কেমন; কেমন একাকী থেকেছ আমি জানি। জানি বলেই এমন একটা সিঙ্গেল ফ্যামিলিতে তোমাকে দিতে চাচ্ছি। বড় বা যৌথ পরিবার তোমার জন্যে না, বুঝো এটা?’

তিতলি মাথা নড়ালো, অর্থাৎ বুঝে ও। পায়রা বললেন আবার————-‘ননাস ভালো; কথাবার্তা বেশ মার্জিত। তবে সমস্যাটা হচ্ছে ডিভোর্স হয়েছে উনার একবার। এখন শোয়েবের দেখাশোনা উনিই করেন।’

‘ডিভোর্স! কেন ডিভোর্স হয়েছে?’ —— তিতলি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে বসল।

পায়রা গম্বীর স্বরে জবাবটাও দিলেন———‘এটা ওদের পার্সোনাল ব্যাপার। আমি জিজ্ঞেস করিনি। তুমিও করবে না। আমি তোমার শিখিয়েছি, মানুষের পার্সোনাল লাইফ, ওদের প্রাইভেসিকে রেসপেক্ট করতে। রাইট?’

তিতলি মুখের কথা গলাধঃকরণ করে তোতাপাখির মতো ঘনঘন মাথা নাড়ল। পায়রাকে তিতলি ছোটবেলা থেকে এক প্রশ্ন দুবার করার সাহস পায়নি।

কারণ— ওর মা বেশ গম্ভীর; এবং ভীষণ অল্প কথা বলেন। এবং তিতলির দায়িত্ব সেই অল্প কথাই অল্পতে চট করে বুঝে ফেলা।

পায়রা মেয়ের কানের পেছনে গুঁজে রাখা চুল সামনে এনে রাখলেন। তারপর বললেন———‘চুল কানের পেছনে গুজবে না, সামনে এনে রাখলে ভালো দেখায়। আর এখন রুমে যাবে; ফ্রেশ হবে, আমি জামা রেখে এসেছি পরে টুকটাক মেকআপ করবে। যেহেতু আজ শুধু দেখতে আসবে: তাই ক্লিন মেকআপ করবে। অতিরিক্ত করলে ক্ষেত দেখাবে। বুঝেছ আমার কথা?’

আবার মায়ের সেই ফ্যাশন সেন্স নিয়ে বাণী-বুলি। তিতলি ভীষণ বিরক্ত হয়ে এসবে। ওর জীবনের প্রতিটা ব্যাপারে মায়ের এভাবে অধিকার খাটানোতে মাঝেমধ্যে তিতলির ভীষন সাফোকেশন হয়। নিজের মর্জিমত ও কোনো জামা পড়তে পারেনা, মেকআপ করতে পারে না— কিছু না। মায়ের কাছে তিতলি একটা পুতুল স্রেফ; যাকে পায়রা নিজের হাতে সাজাতেই বেশি পছন্দ করেন।

তিতলি রুমে এসে দেখে একটা হালকা বেবি কটন পিঙ্ক রঙের থ্রি পিস রাখা বিছানার উপর, ম্যাচ করে কানের দুলও রাখা, সাথে মেকআপ আইটেম অব্দি বের করে রেখেছেন। তিতলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা।
——————————-
দুপুর ২:৩০ মিনিট। সূর্য ঠিক তখন মাথার উপরে!

শোয়েব আজকেই প্রথমবারের মতো তিতলিদের বাড়ি এসেছে। তিতলি এখনও মুখের লিপলাইনার ঠিক করছে। ড্রইং রুম থেকে হই-হল্লোর কানে আসছে। শোয়েবের কথা তেমন শোনা যাচ্ছে না। শুধু তিতলির বাবা-মা আর একজন মহিলার কথা শোনা যাচ্ছে। তিতলির মনোযোগ আজ কেন যেন বারবার শোয়েবের কথা শোনতে ব্যস্ত হচ্ছে— সেটা তিতলি নিজেও জানে না।

তিতলি লিপলাইনার ঠিক করতে ব্যস্ত যখন, পায়রা নক করে রুমে ঢুকলেন। তিতলি মা-কে দেখে তড়িগড়ি করে পেছন ফিরলো। পায়রা এসে তিতলির সামনে দাড়িয়ে ওকে আগাগোড়া দেখলেন। পরপর তিতলির চুল দেখে বড্ড অসন্তোষ দেখিয়ে বললেন———-‘চুলটা খোলা রাখো না কেন তুমি? এত সুন্দর চুল: বেঁধে রাখো কেন? চিরুনি দাও আমাকে।’

তিতলির মুখটা ভোতা হয়ে গেল একদম। ও চুপচাপ মায়ের কাছে চিরুনি দিল। পায়রা মেয়ের চুল খুলে সুন্দর করে খোলা রেখে ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখলেন। সামনের বেবি হেয়ার কোপওয়ের উপর রেখে দিলেন, সাথে বললেন———‘বেবি হেয়ার কানের পেছনে গুজবে না। এগুলো এভাবেই চোখের দুপাশে যেন থাকে: বুঝেছো?’

তিতলির ভীষন বিরক্ত লাগছিল, তবুও ও বরাবরের মতো যন্ত্রের মতো মাথা দুপাশে হেলাল। পায়রা তিতলিকে ভালো করে দেখে একটা পারফিউম হাতে নিয়ে সেটা স্প্রে করলেন তিতলির গায়ে, তিতলি স্রেফ একটা পুতুলের মতো দাড়িয়ে রইলো।

পায়রা মেয়েকে দেখলেন এবার। পরপর মৃদু হাসলেন,———-‘সুন্দর দেখাচ্ছে। চলো।’

তিতলি মায়ের সাথে পা মেলাল। শোয়েব মাথা নিচু করে বসেছিল, ওর সামনে ওর আপু-তিতলির বাবা কথা বলছেন। শোয়েব স্রেফ শ্রোতা ওদের মাঝে।

হঠাৎ শোয়েবের নাকে একটা মেয়েলি মিষ্টি ঘ্রাণ এসে ঠেকল। শোয়েব আস্তে করে মাথাটা তুলে সামনে তাকাল। শোয়েবের চোখটা আবেশিত হলো ঠিক তখুনি। শোয়েব মুগ্ধ চোখে তাকিয়েই রইলো সামনে, চোখটা আর সরাতেও পারলো না চাইতেও।

কারণ সামনে, তিতলি। মাথাটা নিচু করে আড়চোখে শোয়েবকে দেখতে দেখতেই এগুচ্ছে। শোয়েবের সামনে এসে দাঁড়াতেই শোয়েব বুঝতে পারে— ওর আশেপাশে বড়রা আছে। বেচারা সাথেসাথেই গলা খাকারি দিয়ে চোখ সরিয়ে আবার মাথাটা নামিয়ে নিলো।

পায়রা তিতলিকে বলেন——-‘সালাম দাও।’

তিতলি মুখে সালাম করল। সায়মা তিতলিকে দেখে হেসে বললেন———‘আসো তিতলি। তুমি বাস্তবে ছবির থেকেও অনেক সুন্দর। আমার পাশে বসো এসে।’

তিতলি মৃদু হাসল বদলে; চুপচাপ সায়মার পাশটায় গিয়ে বসলো। সায়মা তিতলির হাতটা ধরল, হেসে বলল————‘পুরো নাম কি তোমার?’

তিতলি জবাব দিল———‘আফরিন হায়াত তিতলি।’

‘দুটো নামই সুন্দর।’ —- সায়মা বলল। তিতলি হাসলো জবাবে স্রেফ। শোয়েব মাথাটা নিচু করেই ছিলো। সায়মা ওকে ডাকল———‘শোয়েব. . আমাদের ঊষার মেয়েটার নামও না আফরিন?’

শোয়েব এ যাত্রায় মাথাটা তুলে তাকাল। তিতলিও তাকিয়েছে সবেই। দুজনের চোখে চোখ মিলল। তিতলির বোধ হলো— ওর ওই এক চোখের তাকানোতে তিতলির সমস্ত আত্মা অব্দি কেপে উঠেছে। তিতলির চোখে শোয়েবকে কেন যেন অসম্ভব সুন্দর; সুদর্শন লাগছে। উজ্জল ফর্সা গায়ে কালো পাঞ্জাবি এতটা দারুণ মানাচ্ছে: যে বারবার বেহায়ার মতো তিতলি তাকাচ্ছে ওর দিকে। অথচ মেয়ে হয়ে তিতলি লজ্জা ভুলে শোয়েবের দিকে তাকালেও: শোয়েব ওর দিকে তেমন একটা তাকাচ্ছে না। আর তাকালেও চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বারবার। লজ্জা পাচ্ছে নাকি? তিতলি ভ্রু বাকায়; এর আবার লজ্জা. হাঁহ.!

লজ্জারাও লজ্জা পাবে শুনলে যে— ডক্টর শোয়েব মুনতাসিরেরও লজ্জাবোধ আছে!

তিতলির বাবা, আসাদ কথা তুলেন এইবার——-‘ছেলে-মেয়ে একটু কথা বলে নিক নিজেদের মধ্যে। আমরা এই ফাকে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা সেড়ে ফেলি; কি বলেন!’

সায়মাও সায় দিলেন——-‘হু হু সমস্যা নেই আংকেল। ওরা এমনিতেও বোর হচ্ছে অনেক এখানে।’

পায়রা কথা বলেন——-‘তিতলি শোয়েবকে ট্যারেস দেখিয়ে আনো যাও।’

তিতলি কথামত মাথা নড়ালো। উঠে দাড়িয়ে সামনের দিকে এগুলে; শোয়েবও পাঞ্জাবি ঠিকঠাক করে উঠে তিতলির পেছনে পেছনে এগিয়ে গেল।

ট্যারেসে এসে তিতলি রেলিং ঘেষে দাঁড়াল: শোয়েবের দিকে একবার তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। সেটা দেখে আবার শোয়েব টিটকারি করল———-‘এত লাজুক! এত লজ্জা? আমার জানামতে তুমি তো বাঘিনী। আজকের এই লজ্জালু চেহারায় তোমাকে মানাচ্ছে না তিতলি। আমি শকড হচ্ছি হনেস্টলি।’

তিতলিও এমন ত্যারা ত্যাড়া কথা শুনে বিদ্রুপ করে বললো————‘আমি নাহয় মেয়ে হয়ে লজ্জা ভাব নিচ্ছি। আপনি ক্যান ড্রইং রুমে লজ্জায় মরে যাচ্ছিলেন, এমন ভাব দেখাচ্ছিলেন? আপনি লাজুক? অসভ্যের হদ্দ একটা।’

শেষের কথাটা তিতলি নিচু স্বরে বলেছে: শোয়েব শুনলে রেগে যাবে তাই। শোয়েব তিতলির কথা শুনে আশ্চর্য হলো———-‘আমি? আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম? কবে, কখন?’

তিতলি শুনে বলল———-‘নিচে, সবার সামনে। মাথাটা নিচু করে বসেছিলেন কেন?’

শোয়েব শুনে কিছুক্ষণ তিতলির রোদে লাল মুখটার দিকে স্থির তাকিয়ে রইল। তিতলির নাকের উপর ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে। চুল এলো হাওয়ায় দুলে-দুলে উঠছে। শোয়েব সেটা দেখতে দেখতে নিঃশব্দ হেসে বললো————‘তুমি সবার সামনেই আমাকে চেকআউট করছিলে নাকি?’

তিতলি সাথেসাথে বোকার মতো তাকাল——-‘মানে?’

শোয়েব হাসলো। এসে তিতলির পাশে রেলিংয়ে গা ঘেষে দাড়িয়ে তিতলির বোকা-বোকা মুখটার দিকে মৃদু হেসে বলল———-‘মানেটা হচ্ছে. . তোমার রাগ হচ্ছিলে আমি মাথা নিচু করে থেকে তোমাকে না দেখায়। তুমি এক্সপেক্ট করছিলে— আজকের দিনে এত সেজে এসেছো আমার সামনে; আমার তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত ছিলো। মানে হচ্ছে এটাই।’

তিতলি ধরা পরে গেছে। ও সাথেসাথেই ছিটকে সরে গিয়ে মুখ এদিক-ওদিকে লুকিয়ে রেখে মিনমিন করে বলল————‘মোটেও না।আমি এমন ভাবিইনি। সব আপনার ফ্যান্টাসি এসব।’

শোয়েব হাসলো। পরপর মুগ্ধ প্রেমিকের মতো তিতলির মুখের দিকে চেয়ে থেকে একসময় বলে উঠে————‘তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে, তিতলি।’

তিতলি শোয়েবের মুখের দিকে তাকাল অবাক হয়ে: শোয়েব আবারও বলল———‘এ কথা সবার সামনে বলতে পারতাম না। তাই এখানে একা থাকায় বললাম। ইউ আর লুকিন বিউটিফুল।’

শোয়েব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তিতলির দিলে, তিতলির বুক কাঁপছে, ও তাকায় শোয়েবের দিকে। দুজনের চোখে-চোখ মেলে।

চলবে

কেমন লাগল, অবশ্যই জানাবেন: এখন থেকে আমরা মেইন প্লটে ঢুকব।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply