অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৫ এর বর্ধিতাংশ)
সোফিয়া_সাফা
ফুল উদ্যানের ঘরে পা রাখতেই দেখল ঘরটা শূন্য। তবে ওয়াশরুম থেকে ভেসে আসা পানির শব্দ জানান দিচ্ছে লোকটা ভেতরেই আছে। সে চাইল এই সুযোগে চায়ের কাপটা রেখেই দ্রুত সটকে পড়তে। কিন্তু ভাগ্য আজ তার সহায় হলো না। কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে যেই না ঘুরল, অমনি উদ্যান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। ফুল তাকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু উদ্যান শক্ত প্রাচীর হয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল। কয়েকবার ডানে-বামে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ফুল খানিকটা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল, “সরে দাঁড়ান। উর্বী আপুকে বলে এসেছি ২ মিনিটে চলে আসবো।”
উদ্যান আচানক ফুলের চুলে থাকা ক্লাচার টা খুলে ফেলল। বাঁধনহারা কালো মেঘের মতো মসৃণ চুলগুলো মুহূর্তেই ফুলের পিঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। উদ্যান আরও কাছে এগিয়ে এল। ফুলের কানের পাশ দিয়ে হাত গলিয়ে তাকে নিজের নিবিড় সান্নিধ্যে টেনে নিল সে। ঘাড়ের ভাঁজে মুখ গুঁজে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস টেনে মাতাল কণ্ঠে শুধাল, “গায়ে কী মাখো পেটাল, এমন ঘ্রাণ আসে কোত্থেকে?”
ফুল চোখ বুজে ক্ষীণ স্বরে মিনতি করল, “ছাড়ুন প্লিজ। দরজা খোলা আছে।”
“কতো অপেক্ষা করাবে আর আমাকে? বুঝতে পারছো না কতোটা প্রয়োজন তোমাকে?”
ফুল নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর গলায় বলল, “আমি তো চেয়েই ছিলাম প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে। আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে চাই।”
“অতিরিক্ততা কখনোই ভালো নয় পেটাল। বেশি অপেক্ষা করিয়ে কাছে এলে কিন্তু সামলাতে পারবে না আমাকে।”
“আর মাত্র কয়েকটা দিন সবুর করুন।”
উদ্যান কথা না বাড়িয়ে ফুলের ওষ্ঠাধরে শুষ্ক চুম্বন এঁকে দিল। তারপর চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আয়েশ করে খাটের ওপর বসল। চুমুক দিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল, “আমার কোন খাবারে এলার্জি আছে, কোন খাবার খেতে পারিনা তা তুমি জানো কীভাবে?”
ফুল একটু ভাব নিয়ে বলল, “আমাকে একসময় নিজের পার্সোনাল মেইড বানিয়ে রেখে ছিলেন মিস্টার মাস্টার। ভুলে যাবেন না।”
উদ্যান স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ফুলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি আমাকে মিস্টার বা মাস্টার বলে ডাকবে না পেটাল।”
ফুল তখন ব্যস্ত ছিল নিজের অবাধ্য চুলগুলো আবার ক্লাচারে বন্দি করতে। সে না তাকিয়েই পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “তো কী বলে ডাকবো? মনস্টার নাকি দানব?”
“দেখো আমি মজা করছি না। তোমার অ্যাড্রেস করার স্টাইল ভালো লাগেনা আমার। তাই নিজের ভালো লাগাতে পরিনত করতে চাইছি। তাছাড়াও তোমার ডাক শুনে কেমন যেন পরপর লাগে। আবেশকে যেমন ‘তুমি’ করে বলো আমাকেও তো বলতে পারো। দূরত্ব কমাতে চাওয়ার কোনো চেষ্টাই নেই তোমার মধ্যে।”
“আপনাকে ‘তুমি’ করে বলা সম্ভব নয় মিস্টার মনস্টার।”
উদ্যান ছোট ছোট চোখে তাকাল। মেয়েটা যে তাকে ইচ্ছে করেই বিরক্ত করতে চাইছে, সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। তাই সে চাপা গলায় সতর্ক করল, “দেখো, রাগিও না আমায়।”
ফুল এবার ভয় পাওয়ার ভান করে বলল, “ও বাবা রেগে যাচ্ছেন বুঝি? রাগের কী আছে বলুন, আপনি বয়সে হোক বা উচ্চতায় ঢেড় বড় আমার থেকে। আমি আর কীভাবে আপনাকে ডাকতে পারি আপনিই বলুন।”
“এইজ অর হাইট ডাজ’ন্ট ম্যাটার, পেটাল। তুমি আমার ওয়াইফ। ‘তুমি’ করে না-ই বা বললে অ্যাটলিস্ট নাম ধরে তো ডাকতেই পারো, তাইনা?”
“ওসব বিদেশী কালচার মাস্টার। আমাদের দেশে স্বামীর নাম ধরে ডাকলে লোকজন অনায়েসেই বেয়াদবের তকমা লাগিয়ে দেবে।”
উদ্যান চট করে চায়ের কাপটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে ফুলের দিকে অগ্রসর হতে হতে বলল, “তুমি আমার চেয়ে অন্যদের কথার বেশি পরোয়া করো দেখছি।”
ফুল থতমত খেয়ে গেল, “হঠাৎ কী হলো আপনার? আমার… সম্মোধন করা নিয়ে কেন পড়লেন?”
“তোমার ডাকার স্টাইলে মনে হচ্ছে আবেশ তোমার বেশি আপন। তাই আমি চাইছি ওর থেকে এগিয়ে থাকতে, তুমি ওর নামের সাথে ভাই যোগ করে ডাকো। তাই আমাকে শুধু নাম ধরে ডাকবে। কী ডাকবে তো?”
ফুল ভয়ে ভয়ে সায় জানিয়ে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু উদ্যান ততক্ষণে তার দুই বাহু শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। এক ঝটকায় তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল সে। ফুলের তুলতুলে গালে নিজের খসখসে আঙুলের ডগা বুলিয়ে নেশালো কণ্ঠে বলল, “ডাকো তবে, নাম ধরে ডাকো।”
ফুল সম্মোহনী কণ্ঠে ঠোঁট নাড়ল, “উদ্যান…।”
বলাই সার! মুহূর্তের মধ্যে উদ্যানের চেহারার ভঙ্গি বদলে গেল। সে ক্রুদ্ধভাবে ফুলের দুই গাল চেপে ধরল। চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে বলল, “আমার নাম তেহজিব খানজাদা। আমাকে তেহজিব কিংবা ‘তেহ’ বলে ডাকবে। আর কখনো ভুলেও ওই নামটা উচ্চারণ করবে না।”
উদ্যানের আঙুলের নির্দয় চাপে ফুলের মনে হলো তার গালের হাড় বুঝি এখনই গুঁড়িয়ে যাবে। সে যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠে উদ্যানের হাত সরানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠল। উদ্যান ছাড়ল না, বরং আরও চাপ বাড়িয়ে দিয়ে আওড়াল, “ডাকো।”
তীব্র যন্ত্রণায় চোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হলো ফুলের। সে অস্ফুট স্বরে কোনোমতে উচ্চারণ করল, “তেহ…জিব…।”
কাঙ্ক্ষিত নামটা শুনতেই উদ্যান ঝট করে হাত সরিয়ে নিল। ফুলের লাল হয়ে যাওয়া গাল চোখে পড়তেই নিজের হাতের দিকে তাকাল সে। ফুল উল্টো ঘুরে প্রস্থান করতে নিলে উদ্যান দ্রুত গতিতে ফুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। খটখটে স্বরে আওড়াল, “সরি পেটাল, তোমাকে হার্ট করার ইনটেনশন ছিল না আমার।”
ফুল উদ্যানের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। গালদুটো তখনও ব্যাথায় টনটন করছে। কান জোড়ায় ঝিম ধরে গেছে। ফুল তাকে এড়িয়ে চলে যেতে চাইল কিন্তু উদ্যান নাছোড়বান্দা। ফুলের কবজি আলতো করে ধরে কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নমনীয় করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, “ক্ষমা করে দাও।”
ফুল সন্তর্পণে চোখের কোণে জমা জলটুকু মুছে নিয়ে ধরা গলায় বলল, “মামি আর মা আপনাকে ওই নামেই উল্লেখ করতো। তাই আমিও সেই নামেই ডেকে অভ্যস্ত।”
উদ্যান চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কিন্তু আমি ওই নাম শুনে অভ্যস্ত নই পেটাল। আমি তেহজিব, সেই নামেই ডাকবে।”
“সামান্য নামে কী আসে যায়? মামি আর মাও তো আপনাকে ওই নামেই ডাকে সবসময়। তখন কিছু বলেন না কেন?”
উদ্যানের চোখ মুহূর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। চাপা গলায় বলল, “কই আমি তো কখনো খেয়াল করিনি। হ্যাঁ একবার করেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল ভুল করে ডেকে ফেলেছে।”
“আপনিই এবার ভেবে দেখুন চারপাশের মানুষগুলোর প্রতি আপনি ঠিক কতোটা উদাসীন।”
উদ্যান কথা বাড়াতে চাইল না। “বাদ দাও ওসব। আই এম এক্সট্রিমলি সরি।” বিড়বিড় করতে করতে উদ্যান ফুলের মুখখানা দুহাতে তুলে ধরল।
টপাটপ চুমু বসিয়ে দিল ফুলের দু গালে। ফুল আর রাগ ধরে থাকতে পারল না। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “ঠিক আছে, এবার অন্তত যেতে দিন আমাকে।”
উদ্যান পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াতেই ফুল রুম ত্যাগ করল। উদ্যান তার চলে যাওয়ার পানে ভাবলেশহীন চোখে চেয়ে রইল।
↓
পরদিন বিকেল বেলা। আবেশ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে যখন সে ভাবনার নদীতে গা ভাসিয়ে ছিল, ঠিক তখনই একাধিক পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে উঠল সে। হাতের অর্ধেকটা সিগারেট ফেলে দিয়ে সে রুমে ফিরে আসতেই দেখল ফুল এসেছে। সঙ্গে উর্বী, মেহেক আর উদ্যানও আছে।
“চলো আবেশ ভাই আমরা বাইরে ঘুরতে যাবো।” ফুলের উচ্ছ্বসিত আহ্বানে আবেশ ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। তারপর অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে বলল, “হাতমুখ ধুয়ে আসছি। তোরা হাঁটা ধর।”
গাড়ির কাছে পৌঁছে আবেশ দেখল; ফুল, উর্বী আর মেহেক ইতিমধ্যেই পেছনের সিটে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। অগত্যা তাকে উদ্যানের পাশের সামনের সিটেই বসতে হলো। উদ্যান মিনিট বিশেক ড্রাইভ করে গাড়িটা বিশাল এক পার্কের সামনে থামাল। এত বড় খোলা আকাশ দেখে উর্বী খুশিতে আত্মহারা হয়ে দৌড়ে গিয়ে একটা দোলনায় চড়ে বসল। বাকিরাও চলে গেল তার পিছু পিছু। ফুল উর্বীর পেছনে এসে দোলনায় দোল দিতে লাগল।
মেহেক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আবেশের মুখভঙ্গি লক্ষ্য করছিল। আবেশকে আজ এতোটা স্বতঃস্ফূর্ত দেখে তার মনের কোণে কষ্টের এক চিলতে মেঘ জমে উঠল। সে যা মাসেও করতে পারেনি, ফুল তা মাত্র কয়েক দিনেই করে দেখাল! নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মেহেক বিড়বিড় করল, “ফুলের বিরহেই যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তখন এতে অবাক হওয়ারই বা কী আছে।”
উর্বী দোল খেতে খেতেই হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “ফুল, দেখো! হাওয়াই মিঠাই!”
“তুমি খাবে?” ফুলের প্রশ্নে উর্বী একটু থমকে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই।”
ফুল উর্বীর কানে কানে ফিসফিস করে দুষ্টুমি মাখা স্বরে বলল, “তাতে কী? মনস্টার আছে না? চলো।”
কথাটা উদ্যান শুনতে না পেলেও ফুলের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে ঠিকই বুঝে নিল ফুল কী বলেছে।
ফুল সবার কাছে এসে বলল, “আবেশ ভাই, মেহেক… আর এই যে আপনি…” উদ্যানের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল সে, “সবাই মিলে হাওয়াই মিঠাই খাওয়া যাক?”
উদ্যান বুকে হাত গুটিয়ে চিরচেনা গম্ভীর গলায় বলল, “আর এই যে আমি কী হুম? ভালোভাবে বলো আগে তারপর খাওয়া যাবে।”
ফুল গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “সম্মানিত তেহজিব খানজাদা মহোদয়, গিয়ে ধন্য করুন আমাদেরকে।”
উদ্যান হাত নেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতেই ফুল উর্বীকে নিয়ে মিঠাইওয়ালার দিকে হাঁটা ধরল। উদ্যান এক পলক আবেশের দিকে তাকিয়ে তাদের অনুসরণ করল। মেহেক দেখল আবেশ জড় বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
“আবেশ ভাই, চলো।” মেহেকের ডাকে আবেশ নিশ্চল পদক্ষেপে এগিয়ে গেল। মেহেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আবেশ কেমন যেন অদ্ভুত চোখে একবার দেখে নিল তাকে। মেহেকের মনে হলো আবেশ তাকে কোনো এক অজানা কারণে সহ্য করতে পারছে না।
ফুল একে একে সবার হাতে রঙিন হাওয়াই মিঠাই ধরিয়ে দিল। আবেশের দিকে বাড়িয়ে দিতেই সে নিরুত্তাপ গলায় বলল, “টাকা আনতে মনে ছিল না।”
ফুল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে মিঠাইওয়ালার হাতে দুশো টাকার নোট ধরিয়ে দিল। ফুল আবারও সাধতে গেল ঠিকই কিন্তু আবেশের পাথুরে চেহারার দিকে তাকিয়ে আর সাহস পেল না। সেটাও উর্বীর হাতে গছিয়ে দিয়ে বলল, “এটাও তুমিই খেয়ে নাও।”
মেহেক পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করে নিজের টাও উর্বীকে দিয়ে দিল; উর্বী ‘না’ করল না। আবেশ হনহনিয়ে গাড়ির দিকে চলে গেল, মেহেকও ম্লান মুখে তার পিছু নিল। ফুল কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ল। একই সাথে খারাপও লাগল তার। অস্বস্তি কাটাতে সে উদ্যানের দিকে ফিরে মিষ্টি হেসে বলল, “ধন্যবাদ ফর হাওয়াই মিঠাই, আর… ওদের ব্যবহারে কিছু মনে করবেন না।”
উদ্যান কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল, “হাহ! কী মনে করবো? এমন ভান করলো যেন আমার কাছে কোনো ভাবেই দায়বদ্ধ নয় ওরা। অথচ আমারই বাড়িতে দিন কাটাচ্ছে। আবেশের কথা আর কিইবা বলবো? শালা অকৃতজ্ঞ।”
ফুলের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। “কী বললেন?”
উদ্যান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল, “অবাক হচ্ছো কেন? নিজে যখন ভাই ভাই ডেকে দম ফুরিয়ে ফেলো তখন কিছু হয়না আর আমি শালা বললেই দোষ?”
ফুল ফিক করে হেসে ফেলল। উদ্যান খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাতে লাগল। নাক কুঁচকে সংশয়ের সুরে শুধাল, “আমি কি ভুল কিছু বলে ফেললাম? বউয়ের ভাই কি ‘শালা’ হয় না?”
পাশে থাকা উর্বী মাথা নেড়ে সায় দিল, “হ্যাঁ, শালাই হয়।”
উদ্যান এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বুক ফুলিয়ে বলল, “যাক, জীবনের বেশির ভাগ সময় মেক্সিকোতে কাটিয়েও সম্পর্কের নামগুলো ঠিকঠাক মনে রাখতে পেরেছি। আর এই যে তুমি—হি হি করছ কেন শুনি?”
ফুল ঠোঁট চেপে হাসি আটকে নিল। একপা সামনে বাড়িয়ে আবারও উদ্যানের দিকে ফিরল সে। প্রথমে একটু ইতস্তত বোধ করলেও পরক্ষণেই উদ্যানের সামনে হাত পাতল সে। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “হোয়াট?”
ফুল আমতা আমতা করে বলল, “কিছু টাকা লাগবে।”
“টাকা দিয়ে কী করবে?”
“আজ আবেশ ভাইয়ের জন্মদিন। একটু সেলিব্রেট করতাম আর একটা গিফট কিনতাম।”
উদ্যান বিনাবাক্যে মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে এগিয়ে দিল। ফুল কার্ডটা না নিয়ে বলল, “ক্যাশ দিলে ভালো হয়। আসলে কার্ড ব্যবহার করতে গেলে আবেশ ভাই বুঝে যাবে এগুলো আপনার টাকার।”
উদ্যানের মেজাজ কিছুটা চড়ল। “হ্যাঁ তো! আমার টাকা দিয়েই যখন করবে তখন বুঝে গেলে কী এমন অনিষ্ট হয়ে যাবে?”
ফুল দোনোমোনো করে নিচু স্বরে বলল, “দেখলেন না মাত্রই কেমন ব্যবহার করল! হয়তো নিতে চাইবে না।”
উদ্যান বিরক্তিতে নিজের মুখ টিপে ধরল। তারপর মানিব্যাগে যত ক্যাশ ছিল, সবটাই ফুলের হাতে গুঁজে দিল। ফুল তড়িঘড়ি করে টাকাগুলো পার্সের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। মুখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “বাড়িতে ফিরে আপনার সব পাওনা মিটিয়ে দেব।”
উদ্যান তার কথা শুনেও না শোনার ভান করে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়িটা এবার গিয়ে থামল এক বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টের সামনে। আবেশ প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। মেহেক, ফুল আর উর্বী তিনজনে মিলে উদ্যান আর আবেশকে একটা টেবিলে বসিয়ে রেখে কাউন্টারে গেল খাবার অর্ডার করতে।
আবেশের সম্পূর্ণ মনোযোগ ফোনের স্ক্রিনেই নিবদ্ধ ছিল। উদ্যান ভীষণ একঘেয়েমি বোধ করতে লাগল। সে চারপাশটা একবার দেখে নিল, ফুল নিজের কাজে ব্যস্ত। এই সুযোগে লোকচক্ষুর আড়ালে সে ধীরপায়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।
মিনিট কয়েক পরেই ফুল একটা বাটারস্কচ বার্থডে কেক এনে আবেশের সামনে রাখল। কেক দেখে অবাক চোখে তাকাল আবেশ। পরক্ষণেই মেহেক আর ফুল সমস্বরে গেয়ে উঠল,
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার আবেশ ভাই,
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
মেনি মেনি রিটার্নস অব দ্য ডে, আবেশ ভাই।”
ফুলকে হাসতে দেখে আবেশের মুখ অনায়াসে আলোকিত হয়ে উঠল। একই সঙ্গে ফুল তার জন্মদিন মনে রেখেছে, যেখানে তার নিজেরই এই ব্যাপারে হুঁশ ছিল না; ভাবনাটা তার হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টির মতো প্রশান্তি এনে দিল। আবেশ মুগ্ধ কণ্ঠে শুধাল, “তোর মনে আছে ফুল?”
মেহেকের মুখটা চুপসে গেল। ফুল হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। তার চোখ তখন অন্য কাউকে খুঁজছে। উদ্যানকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সে বিচলিত কণ্ঠে বলল, “উনি কোথায়?”
আবেশের হৃদয়ে জমে ওঠা ভালোলাগা টুকু নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। মেহেক শুষ্ক গলায় বলল, “আশেপাশেই আছে হয়তো কোথাও।”
উর্বী তখন অধৈর্য হয়ে সামান্য লাফিয়ে উঠে বলল, “চলো, চলো! তাড়াতাড়ি কেক কেটে ফেলি।”
ফুল মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল, “না উর্বী আপু। ওনাকে রেখে কেক কেটে ফেললে একদম ভালো দেখাবে না। তোমরা বসো, আমি গিয়ে ওনাকে খুঁজে আনছি।”
ফুল যেই না পা বাড়াল, অমনি উদ্যান কোত্থেকে উদয় হয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল। কিছু একটা চিবোতে চিবোতে বলল, “এসে গেছি, এসে গেছি! আর খুঁজতে যেতে হবেনা।”
উদ্যানের চিবানোর ভঙ্গি দেখে ফুলের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। “কী খাচ্ছেন?”
উদ্যান চিবোনো থামিয়ে ঠোঁট নাড়ল, “চুইংগাম, খাবে নাকি?”
ফুল হকচকিয়ে গেল। দ্রুত নিজেকে সামলে টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “না, ধন্যবাদ। আপনিই খান।”
আবেশের কেক কাটার ইচ্ছা ধূলোয় মিশে গেলেও ফুলের মন খারাপ হয়ে যাবে ভেবে সরাসরি ‘না’ করে দিতে পারল না। ফোনটা অযত্নে টেবিলের ওপর রেখে প্রশ্ন করল, “কেকটা কে অর্ডার করেছে?”
ফুল ফটাফট জবাব দিল, “আমি কিনেছি আবেশ ভাই, কেন তোমার পছন্দ হয়নি?”
আবেশ মাথা নেড়ে বলল, “খুব পছন্দ হয়েছে। ধন্যবাদ ফুল, আমার জন্মদিন মনে রাখার জন্য।”
শেষের কথাটা সে বেশ জোর দিয়ে উদ্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। উদ্যান অবশ্য কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাল না, শুধু অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল।
“কেক কখন কাটা হবে?” উর্বীর কণ্ঠে এবার স্পষ্ট বিরক্তি ঝরে পড়ল।
ফুল দ্রুত কেক কাটার ছুরিটা আবেশের সামনে এগিয়ে দিল। আবেশ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। একটুকরো কেক কেটে নিয়ে ফুলের ঠোঁটের সামনে ধরতেই চারপাশের মহল বদলে গেল। ফুল দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে ঘাড় বাকিয়ে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখল, দানবটা বিশ্লেষণী দৃষ্টে তাদের কর্মকাণ্ডই অনুধাবন করছে।
ফুলের চোখে ফুটে ওঠা অস্বস্তি আবেশের চোখে ধরা পড়ল। সে হঠাৎ একগাল হেসে কেকটুকু নিজের মুখে পুরে নিল। যদিও সে কোনোপ্রকার স্বাদ অনুভব করতে পারল না তবুও মুখে মেকি তৃপ্তি ফুটিয়ে বলল, “ইটস ডিলিশাস! হ্যাপি বার্থডে টু মি! চটপট উইশ করে নিই।”
হাতদুটো একত্র করে চোখ বন্ধ করল আবেশ। বিড়বিড়িয়ে কোনো একটা উইশ করে চোখ খুলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “বাড়িতে যাওয়া যাক? মম নিশ্চয়ই আজ স্পেশাল কিছু রান্না করবে আমার জন্য।”
মেহেকের চোখে বিস্ময় জেগে উঠল। আবেশ যেন একযুগ পর মায়ের কথা স্মরণ করেছে বলে মনে হলো। ফোনটা মুঠোয় পুরে দরজার অভিমুখে রওনা হলো আবেশ। মেহেকও তার অনুগামী হলো সঙ্গে সঙ্গেই।
সবাই চলে গেলেও উর্বী কেক না খেয়ে যেতে রাজি হলো না। ফুল ছুরি দিয়ে কেক কেটে একটা বড় টুকরো বের করে হাতে ধরিয়ে দিতেই উর্বীর চোখ ঝিলমিলিয়ে উঠল।
আবেশের বাড়িতে ফেরার তাড়া থাকলেও ফুলের কথায় উদ্যান তাদের নিয়ে একটা মিউজিক স্টোরে ঢুকল।
কেউ অবশ্য ফুলকে কোনো প্রশ্ন করল না। বলাবাহুল্য প্রত্যেকে নিজ নিজ ভাবনার জগতে বিচরণ করছে। ফুল একাই দোকানে ঘুরে ঘুরে একটা চমৎকার গিটার পছন্দ করল। দ্রুত বিল মিটিয়ে সে গিটারটা আবেশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, “আবেশ ভাই, এই নাও! এটা আমার তরফ থেকে তোমার জন্মদিনের উপহার।”
আবেশের ধ্যানমগ্নতায় ছেদ ঘটে। ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকে গিটারের দিকে। শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, “এত টাকা তুই কোথায় পেয়েছিস ফুল?”
“ছিল আমার কাছে। তোমার পছন্দ হয়েছি কিনা তা জানতে চাইবো না। কাউকে কিছু দিলে নিজের পছন্দে দিতে হয়। খুব বেশি অপছন্দ হলে পরে এসে চেঞ্জ করে নিয়ে যেও।”
আবেশের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। বোধবুদ্ধি সব যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। বুঝতে উঠে পারল না এই মুহূর্তে তার ঠিক কী বলা উচিত। তার স্থবিরতা দেখে ফুল একটু আদুরে গলায় বলল, “আরে ধরো না এটা, খুব ভারী। হাত ব্যাথা হয়ে গেল।”
আবেশ ধরতে গিয়েও ধরল না সেটা। চোখ নামিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “আমি নিতে পারব না ফুল। এমনিতেই অনেক ঋণী হয়ে আছি। আরও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিসনা।”
ফুলের হাসি মিলিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই আফসোস হতে লাগল আবেশের। সে কষ্ট দিতে চায়নি ফুলকে। আরও কোমল ভাবে প্রত্যাখ্যান করার ভাষা জানা ছিল না তার। ফুল একটু সময় নিয়ে কাঁপা স্বরে বলল, “তুমি নিশ্চিন্তে নিতে পারো আবেশ ভাই। এটা আমি তোমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছি। কারো কাছে ঋণী হবে না তুমি। বিশ্বাস করতে পারো আমায়।”
আবেশ কিছু বলতে উদ্যত হতেই ফুল ব্যথিত কণ্ঠে উগড়ে দিল, “আমি তৃতীয় বার আর নিতে বলবো না তোমায়। তাই এবার নাকচ করার আগে ভেবে নাও।”
ফুলকে ফিরিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারল না আবেশ। মেয়েটার চোখে ইতোমধ্যেই অশ্রুকণা জমেছে। সে পারবে না তার চোখের জলের কারণ হতে। অবশেষে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের প্রিয় মানুষটার থেকে উপহারটা নিয়েই নিল। ফলস্বরূপ একচিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল ফুলের ঠোঁটের কোণে।
বাড়িতে ফেরার পথটুকু কেটে গেল নির্বিঘ্নেই। গাড়ি থেকে নেমে উদ্যান কারো জন্য অপেক্ষা করল না, দীর্ঘ কদমে হেঁটে ওপরে চলে গেল। ফুল, মেহেক আর উর্বী পাশাপাশি হেঁটে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। ড্রয়িংরুমের কাছাকাছি আসতেই ফুল নিচু গলায় মেহেকের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ মেহেক। আজ যে আবেশ ভাইয়ের জন্মদিন, সেটা সময়মতো মনে করিয়ে না দিলে খুব খারাপ হতো।”
মেহেক একটা দীর্ঘশ্বাস শ্বাস ফেলে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি আবেশ ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষেই এসেছো।”
ফুল নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির পায়ে হাঁটতে লাগল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে এল, “আমি জানতাম আগস্টের পনেরো তারিখে আবেশ ভাইয়ের জন্মদিন। কিন্তু এবার জন্মদিন তো দূরের কথা এখন যে আগস্ট মাস চলছে সেটাও মনে ছিল না।”
মেহেক তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “যাক, তোমার গিফট দেওয়ার আইডিয়া টা দারুণ ছিল।”
“আগে থেকে প্ল্যান না থাকায় একটু বিড়ম্বনায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবে তুমি কিন্তু তোমার কিনে রাখা গিফট টা তাকে দিতে ভুলো না।”
মেহেক আলতো করে মাথা নাড়ল। কথা বলতে বলতে তারা উর্বীকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। আবেশ তাদের পিছু পিছু সিঁড়ি পর্যন্ত এসেছিল ঠিকই কিন্তু ওপরে ওঠার শক্তি পেল না। তাদের কথোপকথন শুনে কেমন যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। ধপ করে সে ড্রইংরুমের সোফায় গা এলিয়ে দিল।
↓
উদ্যান শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরে দেখল ফুল তার বিছানার ওপর বসে আছে। সে আবারও ওয়াশরুমে গিয়ে তোয়ালে এনে চুল মুছতে লাগল। ফুল গোপনে তপ্ত শ্বাস ফেলে একটা ক্ষুদ্র জিনিস বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে বলল, “এটা আপনি নিয়ে নিন। আশা করি এতে আপনার আজকের পাওনা মিটে যাবে।”
উদ্যানের ললাটে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই তার চোখ আটকে গেল। একটি ধবধবে শ্বেতপাথরের আংটি, যার ওপর হীরা খচিত সূক্ষ্ম ফুলের নিপুণ কারুকাজ। উদ্যান প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল। “তুমি ওটা আমাকে দিয়ে দিচ্ছ?”
ফুল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। উদ্যান তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “যদি দিতেই হয় তাহলে ওর পেছনে আমার যত টাকা অপচয় হয়েছে সব ফিরিয়ে দিতে বলো গিয়ে।”
ফুলের মেজাজ এবার চড়ে গেল। সে কড়া গলায় বলল, “দেখুন, একদম ছোটলোক গিরি দেখাবেন না। নিউজে দেখেছি আপনি অনেক দাতব্য সংস্থায় দান করেছেন। এতো ছোট মন নিয়ে দান করেছেন, বিষয়টা ভাবিয়ে তুলছে আমায়।”
উদ্যান প্রত্যুত্তরে তাকে শাসিয়ে বলল, “ছোটলোকি তুমি দেখাচ্ছো! ওটা নিয়ে এক্ষুনি বের হও।”
“এতো রুক্ষ ভাষায় কথা বলার কী আছে? ভালোভাবে বললেই তো হয় যে আপনি নিজেই আবেশ ভাইকে ওটা গিফট করতে চাইছেন।”
উদ্যানের চাউনি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “আমি ওকে গিফট করতে চাইছি? হাউ রিডিকিউলাস!”
আংটিটা নিয়ে গিয়ে ফুল উদ্যানের মুঠোয় জোর করে পুরে দিল। একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি জানি তাকে গিফট করার কোনো ইচ্ছা নেই আপনার। সেই জন্যই আপনার পাওনাটা আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিলাম।”
ফুল প্রস্থান করার জন্য পা বাড়াল। উদ্যান হাতের আঙুলগুলো মেলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আংটিটার কারুকাজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তৎক্ষনাৎ মানসপটে হানা দিল এক পুরোনো ঘটনার অপভ্রংশ। অবচেতন মনেই ডেকে উঠল, “পেটাল, তোমাকে এটা কে দিয়েছিল জানো?”
অকস্মাৎ এই প্রশ্নে ফুল থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে সহজ গলায় বলল, “জানবো না কেন? মা দিয়েছে।”
উদ্যান মাথা নেড়ে দ্বিমত পোষণ করল। শীতল কণ্ঠে বলল, “ভুল জানো তুমি।”
ফুলের চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। “তবে কে দিয়েছে?”
“দাদাভাই দিয়েছিলেন।”
ফুল আকাশ থেকে পড়ল। “তিনি কীভাবে দিয়েছেন? আমি ছোটো থাকতেই তো তিনি মা’রা গেছেন।”
উদ্যানের মুখটা কেমন যেন পাংশুটে হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটা।
অতীত…
“দাদাভাই, আপনি আমার চেয়েও ওই ডাইনী টাকে বেশি স্নেহ করেন তাইনা?” কিশোর উদ্যানের সোজাসুজি প্রশ্নে দাদাভাই চমকে উঠলেন। চোখেমুখে ধমকের রেশ ফুটে উঠলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। শান্ত গলায় বললেন, “দাদাভাই, উপহার দিয়ে কখনো স্নেহের গভীরতা মাপা যায়না। তাছাড়া এই সামান্য বিষয় নিয়ে মনঃক্ষুণ্ন করা তোমার সাজেনা। ভুলে যেওনা চারপাশে যা কিছু দেখতে পাচ্ছো তা শুধুমাত্র তোমার। আর ডাইনীর অর্থ জানো তুমি?”
উদ্যান মাথা নেড়ে তড়িৎ বেগে জবাব দিল, “হ্যাঁ, এটার মানে খারাপ মেয়ে।”
দাদাভাই উদ্যানকে টেনে নিজের পাশে বসালেন। পরম মমতায় বললেন, “না দাদাভাই, এটার মানে আরও খারাপ। খারাপের চেয়েও খারাপ। ছোট বাচ্চাদের সাথে ফেরেশতারা থাকে, তাদের উদ্দেশ্যে এমন কটু কথা বলতে হয় না।”
উদ্যানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ফুঁসে উঠে বলল, “আপনার কাছে তো আপনার মেয়েও খারাপ নয়। শুধু খারাপ ছিল… আমার মা।”
“ভুলে যেওনা উদ্যান, সে তোমার মা হওয়ার আগে এই বাড়ির বউ হয়েছে। আমি নিজে তাকে পছন্দ করে এনেছিলাম।”
“কেন এনেছিলেন তাকে? আর কেনোই বা কখনো তার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখিনি কাউকে? কেন সবাই তাকে খারাপ বলতো?”
দাদাভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সব জেনেশুনেও কেন আজ অবুঝের মতো প্রশ্ন করছ?”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন এক নারী, যার কোলে একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। পরনে গোলাপি রঙের বেবি ফ্রক। মাথার চুলগুলোয় দুটো ঝুটি বেঁধে রাখা। ছোট ছোট আদুরে পাজোড়ায় নূপুর পরানো। তার হাতে ঝিলিক দিচ্ছে একটা চকচকে বস্তু।
“বাবা, আমি ভেবেছিলাম গিফট বক্সে হয়তো কোনো খেলনা আছে। খুলে দেখলাম আংটি! আপনি ওকে আংটি দিলেন কেন? এসব পরার বয়স হয়েছে ওর? সাইজ দেখেছেন আংটির?”
দাদাভাই লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। নাতনির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন, “খেলনা কি আমার নাতনির কম আছে নাকি? আমি চেয়েছি আমার নাতনিকে খাঁটি হীরা উপহার দিতে, যা সে আজীবন যত্ন করে আগলে রাখবে।” তিনি ছোট্ট ফুলের দিকে তাকিয়ে শুধালেন, “কী দিদিভাই, পছন্দ হয়েছে তো?”
ছোট্ট ফুল কী বুঝল কে জানে; দু আঙুলে আংটিটা ধরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তার হাসির রিনিঝিনি শব্দে পুরো বাড়িটাও যেন একবার নেচে উঠল। ফুলের মা প্রথমে উদ্যানকে খেয়াল না করলেও দাদাভাই সরে যেতেই তাদের চোখাচোখি হয়ে গেল। শুকনো ঢোক গিলে তিনি অন্যদিকে পা বাড়াতে চাইলেন তখনই ঘটল অঘটন। ফুল আংটিটা আচমকা মুখে ঢুকিয়ে নিল। আংটিটা গিয়ে আটকালো ফুলের গলায়।
মুহূর্তেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গিয়ে কান্না আর আহাজারির শব্দে ভারী হয়ে উঠল। উদ্যান শুধু নির্বাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল মেয়েটা কীভাবে সবাইকে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। এতোটা পেরেশান কাউকে সে তার মায়ের মৃ’ত্যুতেও হতে দেখেনি।
বর্তমান…
“এই যে, কোথায় হারিয়ে গেলেন?” ফুলের ডাকে উদ্যান বর্তমানে ফিরে এল। চোখ বুজে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে অবিশ্বাস্য এক প্রস্তাব দিল, “রিংটা তুমি আমায় পরিয়ে দেবে, পেটাল?”
ফুলের মুখ হা হয়ে গেল। “আপনি তো পুরো ঘটনাটা বললেন না।”
“দাদাভাই দিয়েছিলেন এটা তোমায়। তখন রিং পরার বয়স হয়নি তোমার তাই অ্যাডাল্ট সাইজের বানিয়েছিলেন।”
ফুল বুঝতে পেরে মৃদুস্বরে ‘ও’ বলল। আংটিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, “আপনার আঙুলে এটা লাগবে বলে তো মনে হয় না।”
“চেষ্টা করে দেখো।”
ফুল বেশ কসরত করে উদ্যানের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে আংটিটা ঢোকাতে সক্ষম হলো। উদ্যান একদৃষ্টে ফুলের প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ্য করছিল। আংটিটা পরানো শেষ হলে সে নিচু গলায় শুধাল, “তোমার খারাপ লাগছে না এটা হারিয়ে ফেলে?”
ফুল হাসল। স্নিগ্ধ স্বরে বলল, “হারিয়ে কোথায় ফেললাম? আপনার কাছে থাকা মানেই তো আমার কাছে থাকা। বরং আপনি এটা পরেছেন দেখে আমি খুশি হয়েছি।”
ফুল রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর উদ্যান আংটিটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “এটা আসলে তোমার ছিল না পেটাল, এটা অন্য কারো পাওনা ছিল। তার অবর্তমানে আজ এটা তার প্রকৃত মালিকের কাছেই ফিরে এসেছে।”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৬৫০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১