Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪১)

সোফিয়া_সাফা

ওয়াশরুমের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে অনিলা ঝাকুনি খেয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ফুলের পিছু পিছু সেও রুমে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু কথা বলার নুন্যতম সুযোগটুকুও পায়নি। তার আগেই ফুল কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেছে।

ফুলের ফ্যাকাশে মুখ দেখে অনিলা আঁতকে উঠল। “এই মাঝরাতে তুমি শাওয়ার নিলে? ব্যান্ডেজটা ভিজিয়ে ফেলোনি তো?”

​বলতে বলতেই অনিলা ব্যস্ত হয়ে ফুলের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ফুলের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মিলল না; সে নির্বিকার। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে দেখে অনিলা বিচলিত হয়ে তাকে ধরে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল। ফুলের তপ্ত ত্বকে হাত রাখতেই সে হড়কে উঠল; মেয়েটার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর!

“একি! তোমার দেখছি ফিভার হয়েছে। তবুও শাওয়ার নিতে গেলে কেন?”

ফুল বিনাবাক্যে ক্লান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। অনিলা তড়িঘড়ি করে ফুলের শিয়রে বসল। দেখল, জ্বরের ঘোরে ফুলের মুখাবয়ব রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে, দুচোখে রাজ্যের অবসাদ। গালজোড়া ফুলে গিয়ে অন্য আকৃতি ধারণ করেছে। অনিলা তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। তৎপর কণ্ঠে বলল, “আমি অনিকে বলে এখনই ডাক্তার ডাকছি।”

ফুল শুনলো কিনা কে জানে। সে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল। অনিলা তার সম্মতির অপেক্ষায় না থেকে দরজার অভিমুখে রওনা হলো তক্ষুনি হুড়মুড়িয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল রিদম। এক নিঃশ্বাসেই যেন সবগুলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে এসেছে সে। যার দরুন হাপাচ্ছে খুব। এমন বিধ্বস্থ অবস্থায় রিদমকে হঠাৎ সামনে দেখে অনিলা ধরফরিয়ে কয়েকপা পিছিয়ে গেল। যখন বুঝতে পারল এটা রিদম তখন সে বুকে থুতু দিয়ে শক্ত গলায় বলল, “তুমি আচমকা কোথা থেকে হাজির হলে?”

রিদম বুকভরে দম নিল। তারপর বলল, “বোকাফুলের থেকে ইনফরমেশন কালেক্ট করতে এসেছি। অনুমতি ছাড়া ঢুকে গেলে ঝামেলায় পড়ে যাব। এক কাজ করো, ওকে একটু এখানে আসতে বলো।”

অনিলা ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল, “কিসের ইনফরমেশন?”

রিদম দুহাত মেলে দরজার দুদিকের ফ্রেম ধরে ছিল। এহেন প্রশ্নে তার হাতের মুষ্টি দৃঢ় হলো। এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সময় বা মানসিকতা; কোনোটাই এখন তার নেই। সে উন্মুখ হয়ে বলল, “ওকে ডেকে আনো, যখন ওকে জিজ্ঞেস করবো তখনই জানতে পারবে।”

“ও এখানে এসে দাঁড়ানোর মতো কন্ডিশনে নেই। জ্বরে প্রায় সেন্সলেস হয়ে পড়েছে।”

রিদমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। অস্থিরতায় দরজার কপাটে একটা জোরালো ঘুষি মেরে বসল সে। সেই শব্দে অনিলা কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই হট্টগোল শুনে বাকিরা কৌতূহলী হয়ে রিদমের পেছনে এসে ভিড় করল।
​সোহম অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে তোর? হঠাৎ এমন উইয়ার্ড বিহেভ করছিস কেন?”

সোহমের প্রশ্নে রিদম ঘাড় বাঁকিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। সবাই উপস্থিত থাকলেও সেখানে উদ্যান আর মেলো অনুপস্থিত।

​“তেহ কোথায়?” রিদম দাঁতে দাঁত চেপে জানতে চাইল।

লুহান শান্ত স্বরে বলল, “ফ্রেশ হতে গেছে। র’ক্তাক্ত শার্ট পরে আর কতক্ষণ থাকবে? ঝামেলা যেন শেষই হচ্ছেনা। ভেবেছিলাম তোকে ছাড়িয়ে এনে একটু রেস্ট নিতে পারবো, কিন্তু তোর আচরণ দেখে তাও পারব কিনা সন্দেহ হচ্ছে।”

রিদম তার কথা কানেই তুলল না। সবাইকে পাশ কাটিয়ে উদ্যানের রুমের দরজায় নক করল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। উদ্যান হয়তো শাওয়ার নিতে ঢুকেছে, এখনই বের হওয়ার সম্ভাবনা কম।

অনিলা কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অনির কাছে গেল। তার শার্টের হাতা টেনে ধরে নিচু গলায় বলল, “ফুল খুব অসুস্থ অনি। প্লিজ, আগে ওর জন্য ডাক্তার ডাকো।”

অনি একপলক অনিলার উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল। তখনই রিদম উদ্ভ্রান্তের মতো অনিলার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এসে রুদ্ধস্বরে বলল, “তেহুর কাছ থেকে পারমিশন নিতে গেলে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাবে। তুমি গিয়ে বোকাফুলকে বলো ও যেই মেয়েটার কথা তেহকে বলেছে আমি সেই মেয়েটার বিষয়ে ওর সাথে কথা বলতে চাই। আমাকে ঢোকার পারমিশন দিতে।”

রিদমের সংকীর্ণতা দেখে অনিলা শুকনো ঢোক গিলল। বুঝতে পারল রিদম খুব সিরিয়াস, বয়ে চলা প্রতিটা সেকেন্ডই তার কাছে খুব মূল্যবান। তাই সে আর পাল্টা প্রশ্ন না করে দ্রুত পায়ে রুমে ঢুকে গেল।

ফুল তখন অবিন্যস্ত ভঙ্গিমায় বিছানায় লুটিয়ে ছিল। হট শাওয়ার নিলেও ব্যান্ডেজ ভেজায়নি সে। শুধু শরীরে লেগে থাকা ধুলোবালি ক্লিন করার পর পোশাক চেঞ্জ করে নিয়েছে।
নাক-কান দিয়ে যেন আগুনের হলকা বের হচ্ছে তার। পুরো শরীর জ্বালাপোড়া করছে। তবুও অভিমানী ফুল দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে নিচ্ছে। যেই লোক বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য করারা বদলে বিদ্রূপ করে, সেই লোকটার কাছে সে নিজের অসুস্থতার কথা বলতেও চায় না।

“ফুল শুনছো আমার কথা? তুমি কি তেহকে কোনো মেয়ের কথা বলেছিলে?”

অনিলার জিজ্ঞাসায় ফুল আধো বোজা চোখে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো জ্বরের তাপে ঘোলাটে দেখাচ্ছে। শরীরের অশান্তিতে সে স্থির থাকতে পারছে না। তবুও ঠোঁট নাড়ল, “হ্যাঁ… বলেছিলাম তো, তুমি তাকে বলে দিও সে যদি মেয়েটাকে সাহায্য না করে তাহলে যেন আমার চোখের সামনেও না আসে।”

ফুলের কথাগুলো মারাত্মকভাবে জড়িয়ে গেল। কিছুই বোধগম্য হলো না অনিলার।
“আমি তোমার কথা বুঝতে পারলাম না। রিদম বলেছে সে মেয়েটার ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়, তাকে কি ভেতরে আসতে বলবো?”

কথাটা কর্ণগোচর হতেই ফুল উঠে বসতে চাইল। অনিলা তার দেহভঙ্গি অনুমান করে তাকে উঠিয়ে বসাল। ফুল এবার নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, “হ্যাঁ আসতে বলো তাকে।”

অনিলা ফুলকে হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রেখে রিদমকে নিয়ে এল। রুমে ঢুকেই ফুলের রক্তাভ চেহারা আর অবসন্ন দেহভঙ্গি দেখে রিদম পেছন ফিরে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অনিকে বলল, “অনি, ওর জন্য ডাক্তার ডাক।”

তারপর ফুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। ব্যস্ত হয়ে বলল, “তুমি কি উর্বীকে দেখেছো সেখানে? সত্যি দেখেছো?”

​ফুল বহু কষ্টে চোখের পাতা মেলল। তার ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে হয়ে কাঁপছে। সে টেনে টেনে বলল, “আমি নাম জানি না তার। কিন্তু… সেই মেয়েটাই আমাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছিল।”

রিদম পুরোপুরি নিশ্চিত হলো। “হ্যাঁ তোমাকে যে সাহায্য করেছিল তার নামই উর্বী। মেয়েটাকে তুমি কোথায় দেখেছিলে?”

“সেই প্রাসাদের নিচে… গুপ্ত কুঠুরি আছে। জায়গাটা অনেক ভয়ঙ্কর আর স্যাঁতসেঁতে। আপনারা… আপনারা দয়া করে তাকে উদ্ধার করে আনুন।”

ফুলের কথাগুলো বারবার আটকে যাচ্ছিল তবুও কোনোমতে রিদম কথাগুলো আয়ত্তে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ ওকে যেকোনো উপায়ে খুঁজে বের করে আনবো আমি। তুমি চিন্তা কোরো না।”

কথাটা শুনে ফুল স্বস্তি পেলে। অবশেষে কেউ একজন তার কথায় গুরুত্ব দিয়েছে। সে খাটের বাইরে পা রাখতে চাইল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমিও যাবো তাকে সাহায্য করতে… তাকে কথা দিয়েছিলাম… বের করে আনবো তাকে।”

রিদমের চোখের পাতা কাঁপল। গলার কাছে নিঃশ্বাস আটকে এলো। সে হাত বাড়িয়ে ফুলকে বাধা দিতে গিয়েও থমকে গেল। “তুমি এ অবস্থায় যেতে পারবে না।”

ফুল শুনল না। খাটের বাইরে পা রাখা মাত্রই উদ্যানের আগমন ঘটল। তার উপস্থিতিতে রুমের বাতাস যেন এক লহমায় ভারী হয়ে উঠল। সে দরজায় দাঁড়িয়ে রিদমকে লক্ষ্য করে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “হোয়াট আর ইউ ডুইং হেয়ার?”

রিদম চমকে তাকাল সেদিকে। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে উদ্যান তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে যাচ্ছিস?”

রিদম মুখ তুলে তাকাল। শাওয়ার নেওয়ার ফলে উদ্যানের চোখ লাল দেখাচ্ছে। ঘাড় ছুইছুই ভেজা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে কপালের উপরিভাগে। রিদম সংক্ষেপে বলল, “আমি উর্বীর ব্যাপারে জানতে এসেছিলাম।”

উদ্যান পরনের ধূসর রঙের শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে উচ্চারণ করল, “পারমিশন?”

রিদম ভয় পেল না। আজ যেন তার ভয়ডর, চিন্তাচেতনা সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। সে অবিচল কণ্ঠে বলল, “পারমিশন ছাড়া ঢুকিনি তেহ, তোর বউয়ের থেকে পারমিশন নিয়েই ঢুকেছি।”

উদ্যান এক ঝটকায় রিদমের টি-শার্টের বুকের অংশ খামচে ধরল। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “তোর কি মনে হচ্ছে না তুই মেয়েটাকে নিয়ে বেশি বেশিই মাথা ঘামাচ্ছিস?”

উর্বীর প্রসঙ্গ আসতেই রিদম বাচবিচার ভুলে গেল। সে সম্পূর্ণ বেখেয়ালে উদ্যানকে ধাক্কা মেরে দিল। চেঁচিয়ে বলল, “আমি মাথা ঘামাচ্ছি, তাতে তোর কী? তুই নাক গলাচ্ছিস কেন? ওর কিছু হয়ে গেলেও তো তোর কিছু যাবে আসবে না। তুই তো ওর ওপর রেগে আছিস, কারণ ও তোর টেরিটোরিতে অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তোর বউকে তোর সৎভাইয়ের হাতেও তুলে দিয়েছিল। রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি রেগে নেই তেহ, একটুও না। বরং খুব কষ্ট হচ্ছে আমার; কলিজাটা পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা করছে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিই!”

রিদমের এই তীব্র আর্তনাদ শুনে বাকিরা হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকে পড়ল। উদ্যান কোনো পাল্টা আঘাত করল না, বরং শান্ত কিন্তু ভয়ংকর চোখে রিদমের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের গুমোট পরিবেশ দেখে সোহম আর অনি দ্রুত রিদমকে জাপটে ধরল এবং একপ্রকার টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। লুহান দরজায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; অপেক্ষায় ছিল যে কখন উদ্যান তাকে লাঠি আনার হুকুম দেবে। কিন্তু আজকের সমীকরণটা ঠিক মিলল না। উদ্যান খুব ধীরভঙ্গিতে খাটের ওপর বসে পড়ল। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। একদম নিস্পৃহ কণ্ঠে সে বলল, “তুইও আমার পারমিশন ছাড়াই ভেতরে ঢুকে গেছিস লুহান।”

লুহান মাথা নিচু করে উল্টো ঘুরে বেরিয়ে যেতে নিল। যাওয়ার সময় তার কানে এল উদ্যানের শীতল কণ্ঠস্বর, “রুড যেখানে যেতে চাইছে সেখানে যেতে দে ওকে। দরকার হলে তোরাও সঙ্গে যা। জাস্ট মেক শিওর ফিরে এসে যেন ও আমার মুখোমুখি না হয়।”

লুহান নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু অনিলাও ধীর পায়ে রুম ছাড়ল।

ফুল এতক্ষণ হেডবোর্ড আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীর কাঁপছিল, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল, তবুও সে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি।

উদ্যান হাঁটুতে কনুই রেখে একভাবে বসে আছে। চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তে শার্টের ঘাড়ের অংশ ভিজে যাচ্ছে। ফুল কসরত করে খাটের ওপর গুছিয়ে বসল। উদ্যান আর তার মাঝের দূরত্ব অনেক। ফুল বসে আছে হেডবোর্ড ঘেঁষে আর উদ্যান ফুটবোর্ডের নিকটে। তীব্র ব্যথায় মাথাটা চেপে ধরল ফুল। তারপর উদ্যানের দিকে না তাকিয়েই বিদ্রূপের সুরে বিড়বিড় করল, “যাক, অন্তত রিদম স্যারের বুকে হৃৎপিণ্ড আছে।”

সঙ্গে সঙ্গেই উদ্যান সরু চোখে তার দিকে তাকাল। “কী বললে তুমি?”

কেঁপে উঠল ফুল। ওমন গম্ভীর কণ্ঠ শুনে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। সে আমতাআমতা করে বলল, “বলতে চাইলাম, সে অনেক পরোপকারী, দয়ালু। আমি যতটা ভেবেছিলাম ততটাও খারাপ হয়তো নন।”

“এটাকে পরোপকার বলে?”

“হ্যাঁ অবশ্যই বলে। বিপদগামী মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো পরোপকার।”

“জি না পেটাল, এটাকে নিজের সর্বনাশ করা বলে।”

ফুল ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “মানে?”

“অনি যেমন আবেগের বশে নিজের সর্বনাশ করেছে, আজ রিদমও ঠিক সেই পথেই পা বাড়াল।”

​ফুল বিরক্ত হয়ে চোখ ওল্টাল। “আপনি স্রেফ রাগের বশে এসব বলছেন। অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম আপনি কেন উর্বী ম্যামকে সাহায্য করতে চাননি।”

উদ্যানের চোয়াল শক্ত হলো। সে এক দৃষ্টিতে ফুলের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। “কী বুঝেছো তুমি?”

ফুল ঠোঁট প্রসারিত করে বলল, “উর্বী ম্যাম আমাকে আবেশ ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল সেই জন্যই আপনি রেগে আছেন তাইনা?”

উদ্যান মুখ বাকাল, “হ্যাঁ সেটাই, যেটাকে তুমি সাহায্য বলে মনে করছো সেটাই আদতে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল।”

উদ্যান কথাগুলো বলতে বলতেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালো। ঠিক তখনই সে পিঠে এক পশমি উষ্ণতার ছোঁয়া পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, ফুল হাঁটু ভাঁজ করে বিছানায় বসে নিজের ওড়না দিয়ে তার ভেজা মাথা মুছে দিচ্ছে। উদ্যান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ফুল আপনমনে বলতে লাগল, “রিদম স্যার কেন এমন করলেন জানিনা। আপনার নিশ্চয়ই তার কথায় খারাপ লেগেছে?”

উদ্যান চট করে ফুলের হাত ধরে ফেলল। অনুভব করল তার শরীর আগুনের মতো গরম। তবুও তার শরীরটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। কর্কশ গলায় বলল, “সহানুভূতি দেখাতে আসবে না আমায়। আমি পছন্দ করি না এসব, আর রইল খারাপ লাগার কথা। জেনে রাখো, কোনো কিছুতেই খারাপ লাগে না আমার। উল্টো আমি সবকিছু নিজের ভালো লাগাতে পরিনত করতে পারি।”

অকস্মাৎ আক্রমণে ফুল অনেকটা দূরে ছিটকে পড়ল। এক কথায় সে নিচে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে। উদ্যানের রুক্ষ আর অসংলগ্ন আচরণে ফুল ভারী কষ্ট পেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসল। কান্না চেপে রেখে বলল, “আমি সহানুভূতি দেখাচ্ছি না, ভালোবাসা দেখাচ্ছি। যদি আমার ভালোবাসা সহ্য করার ক্ষমতাই না থাকে তাহলে স্বীকার করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন কেন?”

উদ্যান চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিল। তারপর ফুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে সেই পেন্ডেন্টটা বের করল। খানিকটা ঝুকে কোনোমতে পরিয়ে দিল সেটা। উদ্যানের স্পর্শ পেতেই ফুলের বুকের ভেতর ঝড় উঠল। বিছানার সাথে হাত ঠেকিয়ে ঢলে পড়তে লাগল পেছনের দিকে। কিন্তু বিছানায় পিঠ ঠেকানোর আগেই উদ্যান ক্ষিপ্রতার সাথে ফুলের ঘাড়ের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিল। এক হ্যাঁচকা টানে টেনে নিল তার পুরো শরীরটা। ফুলের কাঁপা কাঁপা ঠোঁট জোড়া নজরে আসতেই উদ্যানের মতিভ্রম হলো। এক গভীর ঘোরের বশে, নেশাতুর কণ্ঠে সে হিসহিসিয়ে উঠল, “কিয়েরো উন বেসো।”

ফুলের পুরো শরীর এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল। সেই কম্পন থামার আগেই উদ্যান নিজের ঠোঁটের নিচে পিষে ধরল তার ফিনফিনে অধর যুগল। মুহূর্তের ব্যবধানে উদ্যান তার লালিত সংযম চতুর্থবারের মতো ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। জ্বরে তপ্ত ফুলের শরীরটা শক্তিহীন হয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়তে চাইলেও উদ্যানের বলিষ্ঠ হাত তাকে স্থির করে রাখল। ঠিক সেই মোহাবিষ্ট মুহূর্তে কারো পায়ের আওয়াজে উদ্যান দমে গেল। মুখ তুলে পেছনে তাকানোর পরমুহূর্তেই একজন মহিলা ডাক্তার এসে হাজির হলেন। তাকে দেখে উদ্যান ভ্রু কুচকে তাকাল। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, “কী চাই?”

ডাক্তার মাথা নিচু করে বললেন, “অনি স্যার পাঠালেন, মিস্ট্রেসার চিকিৎসার জন্য।”

উদ্যান তখনও সেই পৈশাচিক ঘোরের মাঝেই বিচরণ করছিল সে কোনো কিছু না ভেবেই বলল, “প্রয়োজন নেই, লিভ।”

ডাক্তার কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলেন। উদ্যান পুনরায় মুখ ঘোরাতেই ফুলের ধবধবে ফর্সা গলা নজরে এল। সে যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নিল; উদ্যানের ঘন ঘন চুমুর ছোঁয়ায় ভিজে উঠল ফুলের ঘাড়, গলা আর বুকের উপরিভাগ। সে এতটাই উন্মত্ত হয়ে পড়েছিল যে ফুলের চেহারার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করল না। ফুলের চেহারা তখন নজরে এল যখন সে ফুলের ঠোঁটে চুমু খেতে গেল। ফুলের বন্ধ চোখের পাতা আর নিথর দেহভঙ্গি দেখে তার হুশ ফিরল। ফুল যে গভীর জ্বরে আর অবসাদে চেতনা হারিয়ে ফেলেছে, তা বুঝতে পেরেই তার মেজাজ সপ্তম আকাশে চড়ল।
​“পেটাল, চোখ খোলো! বাসর কি করতে দেবে না আমায়? আচ্ছা, তুমি এত ঘন ঘন বেহুঁশ হও কী করে? ক্লান্ত লাগে না তোমার? আমার তো ইচ্ছা করছে এই অচৈতন্য অবস্থাতেই সবকিছু সেরে ফেলি।”

উদ্যান ঠাস করে ফুলের শরীর টা বিছানায় ফেলে দিল। ফলস্বরূপ ফুলের আলুলায়িত চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পুরো মুখ ঢেকে ফেলল। উদ্যান এবার পুরোপুরি ফুলের ওপর ঝুঁকে এল। আঙুল দিয়ে আগোছালো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে বলল, “মাই ডিয়ার ওয়াইফি, সেরে ফেলব নাকি বাসর? ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব নাকি তোমার সব অহংকার? তুমি না বলেছিলে; শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কলঙ্কহীন থাকবে? লাগিয়ে দেব নাকি আমার নামের সেই গাঢ় কলঙ্ক?”

বলতে বলতেই উদ্যান ফুলের ঠোঁট সজোরে আঁকড়ে ধরল। বেশ কিছুক্ষণ সেই নিথর শরীরে নিজের অধিকার খাটিয়ে সে উঠে বসল। কিয়ৎক্ষণ ফুলের সেই পাথরের মতো পড়ে থাকা দেহটার দিকে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করল, “নাহ! এভাবে মজা হবে না। মজা তো তখন হবে যখন তুমি সজ্ঞানে নিজেকে আমার কাছে বিলিয়ে দেবে। সেই দিনটা খুব বেশি দূরে নেই পেটাল। আই এম ভেরি এক্সাইটেড!”

​সে পকেট থেকে ফোন বের করে ডাক্তারের নম্বরে কল লাগাল। উদ্যানের আদেশ পাওয়ামাত্রই সেই ডাক্তার আবার ফিরে এলেন। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ফুলের চেক-আপ করে তিনি বললেন, “মিস্ট্রেসা মাথায় আঘাত পেয়েছেন, তাই এই মুহূর্তে মাথায় পানি দেওয়া বা স্পঞ্জিং করানো ঠিক হবে না।”

​বলতে বলতেই ডাক্তার ফুলের ওড়নাটা একটু সরিয়ে দিতে চাইলেন। উদ্যান মুহূর্তেই বাজপাখির মতো গর্জে উঠল, “এসব কী করছেন আপনি?”

​ডাক্তার ঘাবড়ে গিয়ে তোতলাতে লাগলেন, “আমি… আমি জাস্ট ওনার গায়ের বাড়তি কাপড়টা সরিয়ে দিতে চাইছিলাম… যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।”

উদ্যান তর্জনী উঁচিয়ে ঠান্ডা গলায় সাবধান করল, “ওর কাপড়ে হাত দিলে, সেই হাত নিয়ে এই রুম থেকে বেরোতে পারবেন না।”

ডাক্তার ভয়ে শুকনো ঢোক গিললেন। দ্রুত থার্মোমিটার দেখে বললেন, “সরি মাস্টার, আমি জ্বর মেপে দেখেছি; ১০৩°।”

উদ্যান নির্লিপ্ত সুরে বলল, “খুব বেশি নয়, তবুও কেন সেন্স হারায়? সেন্স হারানোর প্রবণতা কমানোর কোনো মেডিসিন নেই?”

“তেমন কোনো স্পেসিফিক মেডিসিন নেই মাস্টার, মনে হচ্ছে মিস্ট্রেসা অনেকক্ষণ ধরে কিছুই খায়নি সেই জন্যই তার শরীর দূর্বল হয়ে পড়েছে।”

উদ্যানের মনে পড়ল ফুল পুরো একদিন না খেয়ে আছে। সে মাথা নেড়ে সায় দিল, “হ্যাঁ, খায়নি বেশ অনেকক্ষণ হয়েছে। সেন্স ফিরতে সাহায্য করবে এমন কিছু দিন।”

ডাক্তার তার ব্রিফকেস থেকে স্যালাইনের সরঞ্জাম বের করলেন। ফুলের হাতের শিরায় নিডলটা পুশ করতে করতে বললেন, “এটা নরমাল স্যালাইন, দ্রুত এনার্জি পেতে সাহায্য করবে। আমি কিছু এক্সট্রা মেডিসিন দিয়ে যাচ্ছি, ওনার জ্ঞান ফিরলে খাইয়ে দেবেন।”

উদ্যান মাথা নাড়ল। ডাক্তার বিদায় হতেই উদ্যান ফুলের পাশে এসে বসল। এদিক ওদিক তাকিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে ফুলের ওড়নাটা সরিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। ফুলের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কামাতুর কণ্ঠে বলল, “বুক ভরে নিঃশ্বাস নাও পেটাল। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো, আই এম ওয়েটিং ফর ইউ।”

বলতে বলতেই উদ্যান ফুলের পাশে শুয়ে পড়ল। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে নিজের কপাল ফুলের তপ্ত কপালে ঠেকাল। তারপর ঘর কাঁপিয়ে তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে আদেশ দিল, “অ্যালেক্স, ক্লোজ দ্য ডোর! ডোন্ট ওপেন ইট আনটিল আই টেল ইউ টু!”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ২৪০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply