অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৫১
তানিশা সুলতানা
নওয়ান বলেছিলো “যেদিন আমি থাকবো না সেইদিন বুঝবে গোটা দুনিয়ায় আমি ছাড়া তোমার কেউ ছিলো না”
যেদিন হাত বাড়ালে আমায় পাবে না সেইদিন অনুভব করবে কি ছিলাম আমি।
মাত্র তিন ঘন্টায় নুপুর এই কথার সত্যতা প্রমাণ পেয়ে গেছে। নওয়ানকে পুলিশ নিয়ে গেছে তিন ঘন্টা হবে। তালুকদার বাড়ির কেউ তাকে কিছু বলেনি। একবার প্রশ্নও করে নি “কেনো করলে এমনটা?”
অবশ্য বলবে কি করে?
পুলিশ যখন নওয়ান এর হাতে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। তখন সে হুঙ্কার দিয়ে বলে গেছে
“আমার চাঁদের যদি কিছু হয়, তাকে যদি একটাও প্রশ্ন করা হয়। তাহলে নওয়ান তালুকদার আগুন জ্বালিয়ে দেবে এই বাড়িতে।।
তারপরেও নুপুর কি কেউ কিছু বলবে? কারো সাহসই হবে না।
পুলিশও তাকে নিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছিলো না। হ্যান্ডকাফ পড়াতে গিয়ে তাদের হাত কাঁপছিলো। ঘেমে নেয়ে একাকার। তখন তাদের আশ্বাস দিয়ে নওয়ান বলে
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আর পাঁচটা অপরাধীর মতো খুবই সামান্য একজন মানুষ। অন্যায় করেছি শাস্তি দেবেন।
অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চাইলে ইউনিফর্ম খুলে ফেলুন।
তারপরেই পুলিশরা একটু সাহস পায়। এবং নওয়ানকে নিয়ে যায়।
তাদের পেছন পেছন স্নেহা চলে যায়। কেউ তাকে আটকাতে পারেনি। পুলিশের গাড়ির পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে হাজির হয় থানায়। তবে ভেতরে ঢুকতে পারে না। থানার গেইটের সামনেই থামানো হয় তাকে। আটকে দেওয়া হয় লোহার শিকল।
চিৎকার করে পুলিশদের ডাকতে থাকে স্নেহা। গেইট খুলে তাকে ভেতরে নেওয়ার অনুরোধ করে।।কিন্তু তার অনুরোধ পুলিশদের হৃদয় গলাতে সক্ষম হয় না।
নওয়ানকে নিয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পরে আমিনা বেগম সেন্সলেস হয়ে যায়। মুখে পানি ছিটিয়ে, হাজারবার ডাকাডাকি করেও তার জ্ঞান ফেরানো যায় না। হাত-পা ক্রমশই ঠান্ডা হয়ে আসছে। অবশেষে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাশেদুল এবং মীরা ধরাধরি করে নিয়ে যায়।
নায়েব তালুকদার ভীষণ শান্ত। হয়তো মনে মনে কিছু একটা পরিকল্পনা করে চলেছে। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে নূপুর কে দেখছে।
সবিতা বোধহয় খুব খুশি হয়েছে। মনের সুখে খাচ্ছে। পোলাও রোস্ট টিকিয়া এবং গরুর মাংস দিয়ে খুব সুন্দর করে প্লেট সাজিয়েছে। মজনু তালুকদার দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করছে। এই মুহূর্তে নুপুর কে খু/ন করে দিতে পারলে সে শান্তি পেতো। এক রতি মেয়ে তার মত পুরনো রাজনীতিবিদকে গোল খাইয়ে দিল। এক্কেবারে মেইন পয়েন্টে আঘাত করল।
এতকিছুর মধ্যে নিরবের কোনো খোঁজ নেই। এই ছেলেটাকে ঠিকঠাক দেখা যায় না। কোথায় থাকে সেটাও বোধহয় কেউ জানে না।
নুপুর সকলের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে নওয়ানের কক্ষে চলে যায়। নিজেকে খুব স্ট্রং ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরলেও সেটা অতটাও স্টং নয়। এই যে এখন তার কান্না পাচ্ছে, হাত পা কাঁপছে, বুকের ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে সবটা স্বপ্ন। ঘুম ভেঙে যাবে আর চোখ খুলে দেখবে নওয়ান তার সামনে। কয়েকবার চোখ বন্ধ করে চোখ খুলেও দেখে এটা স্বপ্ন নয়।
ড্রেসিং টেবিলের উপরে সিগারেটের প্যাকেট রাখা। তারই পাশে নীল রঙের একটা ডাইরি। এই ডায়েরী খানা নুপুর চেনে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে চোখ খুলে দেখতো নওয়ান কিছু লিখছে। তবে কি সে আগে থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিলো “এমন দিন আসবে?”
হয়তো করেছিলো।
নুপুর ডাইরি খানা হাতে নেয়।
প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই দেখতে পায় তার এক খানা ফটো। প্রথম যেদিন নওয়ান তার গালে সিগারেট ঠেঁসে ধরেছিলো সেইদিনের ফটো খানা।
ডান পাশের গালে ক্ষত চিহ্ন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ফটোর নিচে লেখা
“আমার ধ্বংস কারী।
তুমি এসো না আমার মনে
ভালোবাসায় বড্ড ভয় আমার
চাই না তোমায় পেতে”
মাঝ খানের পৃষ্ঠা গুলো এড়িয়ে একদম শেষ পৃষ্ঠায় চলে যায়৷ সেখানে লেখা ছিলো
“তুমি আমায় শাস্তি দিতে চাও
নিজের মুখে বলতে। তোমার জন্য গোটা দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে পারি। সামান্য নিজেকে ধ্বংস করতে পারতাম না?
নুপুর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। ডাইরি খানা বন্ধ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। গোটা বাড়ি স্তব্ধ। কোথাও কেউ নেই।
বড্ড বিষন্ন লাগছে নুপুরের। সে বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যায়।
এই মধ্যরাতে মানুষ তো দূর রাস্তা ঘাটে একটা পশুরও দেখা নেই। ঐতো ব্রিজের ওপাশে নিজের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। যেখানে মা-বাবা ভাই সবাই রয়েছে। কিন্তু ওই বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে না নুপুরের। সে উল্টো পথে হাঁটতে থাকে।
আনুর বাড়ির সামনে গিয়ে পা থামে। ওই তো কবর দেখা যাচ্ছে। হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে কবরের পাশে।
মানুষ মরে গেলে ৪০ দিন তার কবরের পাশে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এমনটাই বিশ্বাস করে আসে মানুষজন।
নুপুর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় আনুর কবরের সামনে। হাঁটু মোড়ে বসে পড়ে
দীর্ঘ শেষ বলে।
” গোটা দুনিয়া জানবে আমি খারাপ। বড্ড পাষাণ। নিজের স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।
কিন্তু কেউ ভাববে না আমার ঠিক কতটা কষ্ট হয়েছে।
আনু তোর মৃত্যু আমি পারি না৷ ওই মেয়েগুলোকে ভুলতে পারি না। কিভাবে ক্ষমা করতাম?
কিভাবেই বা সবটা ভুলে সংসার করতাম?
তুই আমায় ক্ষমা করতে পারতিস?
পারতিস না।
একনগরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো জানা নেই স্নেহার। তবে সে থানার সামনে থেকে সরবে না। নওয়ানকে একা ফেলে সে কি করে যাবে?
কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে।
এসি পি আশিক কয়েকবার দূর থেকে দেখে গিয়েছে এবং ভোর রাতের দিকে কাছে এসে বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ করে। নওয়ানের কোনো ক্ষতি করবে না এটাও কথা দিয়েছে।
কিন্তু মেয়েটা শুনবে না।
সে এসিপিকে বলে
“হয় ওনাকে ছেড়ে দিন।
নয়তো আমাকে ওনার কাছে রেখে দিন।
আমি যে ওনাকে না দেখে থাকতে পারিনা।
কি ছিল স্নেহার এই কথায় জানা নেই। তবে এসিপির চোখে পানি চলে আসে।
সে ওকে ভেতরে আসতে বলে।
নওয়ান এবং বল্টুকে এক জেলে রাখা হয়েছে। এসিপির অফিস রুম থেকে ওদের দেখা যায়। আশিক স্নেহাকে নিজের অফিসে বসায়। একটু পানি খেতে বলে। তবে স্নেহা খায় না। সে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নওয়ানের দিকে।
বল্টু বলে ওঠে
“ভাই আপনাকে একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না
আপনার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভুল ছিলো ভাবিকে ভালোবাসা। আপনি তাকে এতো ভালোবাসলেন অথচ সে বিপক্ষ দলের মানুষের হাত মিলিয়ে আপনাকে ফাঁসালো।
নওয়ান শুকনো ঠোঁট মেলে হাসে। জবাবে বলে
“তাকে ভালোবাসাটা ভুল ছিল না। বরং সুন্দর একটা অধ্যায় ছিলো।
আমার চাঁদ পবিত্র।
রাগ হলো বল্টুর। সে অন্য দিকে চলে যেতে যেতে বলে
” ধ্বংস হয়ে যাচ্ছেন আপনি।
এতোটাও অন্ধ হওয়া ঠিক নয়।
এবারে জবাব দেয় না নওয়ান। সে তাকিয়ে থাকে স্নেহার মুখপানে। তার মনে হচ্ছিলো নুপুর আসবে। স্নেহা যেখানে বসে আছে নুপুর ঠিক সেখানেই বসবে। স্নেহা যেভাবে অসহায় দৃষ্টিতে তার মুখপানে তাকিয়ে আছে নুপুরও ঠিক একই ভাবে তাকিয়ে থাকবে।
আফসোস নিয়ে বলবে
“বড্ড ভুল করে ফেললাম আমি।
না বুঝে দুঃখ দিলাম আপনাকে।
ক্ষমা করুন আমায়। আর সবটা আগের মত ঠিকঠাক করুন।
আনু হারিয়ে যাওয়ার পর ঠিক যেভাবে বলেছিলো
“নওয়ান চাইলেই সবটা ঠিক হবে”
কতটা ভরসা এবং বিশ্বাস ছিল সেই কথায়।
আরও একবার নুপুর ভরসা করুক তাকে। ভালোবেসে আগলে রাখুক নিজের বুকে। হারাতে না দিক নওয়ান তালুকদারকে।
তবে এমনটা হবে না। বোকার স্বর্গে বসবাস করছে নওয়ান তালুকদার। ধোঁয়াশার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে
“যার জন্য দুনিয়া ছাড়তে প্রস্তুত তার চোখে একটু ভালোবাসা দেখে যাওয়ার তৃষ্ণা মিটলো না।
তাকে পেয়েও পেলাম না।
শরীর তো চাইলেই পাওয়া যায়
আমার প্রয়োজন ছিল মনটা।
নিজের বাড়িতে ফিরে আসে নুপুর। ড্রয়িং রুমে বসে মা খাতা দেখছে। কালকে ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অতি দ্রুত রেজাল্ট ঘোষণা করা হবে। দুদিনের মধ্যে সবগুলো খাতা দেখে মার্ক নোট করে রাখতে হবে। নাসির বোধহয় কিচেনে। বরাবরই মায়ের কাজের প্রেসার বেড়ে গেলে বাবাই রান্নাবান্নার দায়িত্বটা নিয়ে নেয়। এবারেও তার ব্যতিক্রম নয়।
নুপুর গিয়ে মায়ের পাশে বসে। নিজের ক্লান্ত মাথা খানা মায়ের কাঁধে এলিয়ে দেয়। ধরে আসা স্বরে সুধায়
“আমি কি ঠিক করেছি আম্মু?
নাকি কোন ভুল করে ফেললাম।
সোনিয়া খাতা কলম রেখে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“একদম ঠিক করেছো।
খারাপ মানুষরা বরাবরই এমন। তাদের চোখ মুখ ভর্তি মায়া থাকে। যেই ভুলক্রমে একটু তাকাবে সেই ফেঁসে যাবে।
সেই মায়া কে নিজে দূর্বলতা ভেবে পিছিয়ে যারা যাবে তারাই বোকা। আর আমার মেয়ে বোকা হতেই পারে না।
মায়া কাটাতে শেখো।
পরবর্তীতে আর কিছু বলার সাহস নুপুরের হয় না। মা বুঝবে না।
তোর বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট করছে। এটা কখনোই মা জানতে পারবে না। ওই খারাপ মানুষটার মায়া ভরা মুখখানা এক পলক দেখার জন্য কলিজা কাঁপছে এটাও মা অনুভব করতে পারবে না।
মায়েরা সব বুঝে।
শুধু নুপুরের মনটা বোঝেনা।
ভাবতে ভাবতেই নিজ কক্ষে চলে যায়।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৬+২৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব (২৪+২৫)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২০
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২