মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৩৮
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
আবরারের কান্নায় মুহূর্তটা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে কুহেলির নিজেই হাত কেঁপে উঠল। তবুও কুহেলি নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে এক হাত আবরারের পিঠে রাখল,আর অন্য হাতটা ওর চুলের ভাঁজে বুলিয়ে দিতে লাগল।তারপর কাঁপা কন্ঠে বললো,
আবরার কী হয়েছে আপনার?এভাবে কাঁদছেন কেন?দেখুন, আপনার তো এভাবে কান্না করা মানায় না। আপনি তো.. একজন মাফিয়া। সব সময় আপনাকে সেই কঠিন চোখ, সেই রুক্ষ বিহেভিয়ার মানায় এভাবে ভেঙে পড়া না।
কথাগুলো বললেও কুহেলির মন অস্থির। সে কখনো ভাবেনি আবরারকে এই ভাবে দেখবে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই এমন কিছু হলো, যা সে কোনোভাবেই আন্দাজ করতে পারেনি।
আবরার হঠাৎই কুহেলি কে ছেড়ে দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে গেল।কুহেলি চমকে উঠল, তার হাত দুটো হাওয়ায় ঝুলে রইল।সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই
আবরার ধীরে ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
কুহেলির শ্বাস আটকে গেল।তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
এরপর আবরার দু’হাত বাড়িয়ে কুহেলির পা দুটো জড়িয়ে ধরল এত দ্রুত, এত আকস্মিক যে কুহেলির শরীর স্তব্ধ হয়ে গেল।তবুও নিজেকে সামলে কাঁপা কন্ঠে বললো,
আ… আবরার! আ… পনি কী করছেন?
নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কুহেলি হকচকিয়ে উঠল।
ছাড়ুন! এভাবে পা ধরছেন কেন?
তার কণ্ঠে ভয়, বিস্ময়, আর এক অদ্ভুত অসহায়তা মিলেমিশে আছে।কিন্তু আবরার যেন শুনতেই পাচ্ছে না।যেন তার ভিতরের সব শক্ত, কঠোর দেওয়াল ভেঙে পড়ে গেছে এক মুহূর্তেই।
আবরার ধীরে মাথা তুলল।কুহেলির দিকে তার সেই দৃষ্টি সাধারণ দিনের মতো কঠিন নয়,রাগে টানটান নয় বরং পুরোপুরি ভাঙা,অসহায়,নরম।
এই মানুষটার চোখে আজ দৃঢ়তার কোনো ছাপ নেই।যেন সব শক্তির মুখোশ খুলে পড়েছে।
কুহেলি এক মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল।এমন চোখ সে কখনো দেখেনি আবরারের যেন পাহাড় ভেঙে গেছে ভেতরে ভেতরে।
সে কাঁপা, কাতর কণ্ঠে বলল,
প্লিজ… ছাড়ুন না আমাকে। এভাবে… আমার খারাপ লাগছে…!
আবরারের হাত কাঁপল।তার শক্ত করে ধরা হাত হঠাৎই ঢিলে হয়ে এল যেন নিজের ইচ্ছাশক্তিকেও ধরে রাখতে পারছে না।কুহেলি সুযোগ পেয়ে দ্রুত সরে গেল।
এক মুহূর্তেই ধপ!আবরার সোজা ফ্লোরে বসে পড়ল।এমনভাবে, যেন ভেতরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
কুহেলি থমকে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ।তারপর ধীরে,খুব ধীরে আবরারের পাশে ফ্লোরে বসে পড়ল।কুহেলির শ্বাস ছোট ছোট, চোখে আতঙ্ক আর উদ্বেগের মিশেল।
কি হয়েছে আপনার, আবরার?
কুহেলির কণ্ঠে অস্থিরতা স্পষ্ট।
আপনি এরকম করছেন কেন? আজ আপনাকে খুব অচেনা লাগছে।আপনি…আমার চেনা আবরার না। অন্য আবরার মনে হচ্ছে!
আবরার ধীরে মাথা তুলল।তার গভীর লাল, টকটকে মনিওয়ালা চোখদুটোর দিকে তাকাতেই কুহেলির বুক কেঁপে উঠল।সেই চোখ যেন আগুনও নয়, রাগও নয় বরং এমন এক অচিন ভাষা,
যা বোঝার ক্ষমতা কুহেলির আজ নেই।চোখ দুটো যেন প্রচণ্ড ঝড়ের পর অবশিষ্ট রক্তিম ধ্বংসস্তূপ
গভীর, তীক্ষ্ণ, আর অসহায়ভাবে কঠিন।
কুহেলি তাকিয়ে আছে, কিন্তু কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।আবরারের এই চোখ এ যেন এক অপরিচিত মানুষ।
একটু পরে আবরার খুব ধীরে, ভারী গলায় বলল জানো পাখি..!আর দশটা বাচ্চার মতো আমারো সপ্ন ছিলো।ভাবতাম বড় হয়ে আমি একজন ব্যবসায়ী হবো।বাবা যেমন সৎ পথে উপার্জন করতেন আমিও করবো..!কিন্তু সব চাওয়াই কি আর পূর্ণতা পায়?সব স্বপ্নই কি হাতের মুঠোয় আসে?আবরারের কণ্ঠে হাহাকার মিশে গেল।
আমার বাবা যদি অসৎ পথে উপার্জন করতেন তাহলে বাবার অনেক টাকা থাকতো!অনেক ক্ষমতা থাকতো
থেমে গেল সে।
কিন্তু না…!আবরারের চোখে কাঁচের মতো ঝিলিক উঠল।বাবা একটা টাকাও অসৎ পথে উপার্জন করে নি!
তারপর আবরার হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তার মুখে এমন এক বিষাদের ছাপ,যা কুহেলির বুককে হঠাৎ চাপা ব্যথায় ভরে দিল।আবরার খুব ধীরে বলল,এই নিয়ে মিসেস কামেনী খানের আর বাবার মাঝে অনেক ঝামেলা হতো..!কুহেলি সঙ্গে সঙ্গে তাকালো চোখে গভীর প্রশ্ন।আবরারের ঠোঁট বাঁধনহারা কষ্টে কেঁপে উঠল।
আনফরচুনেটলি..!
সে কণ্ঠ নামিয়ে বলল, সেই কামিনী খান আমার মা..!বেলকনি মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল।কুহেলি শূন্য দৃষ্টিতে আবরারের দিকে তাকিয়ে রইল।এই
মানুষটা এতটা ভাঙা ব্যথা নিজের ভেতরে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল?
আবরার দূরে কোথাও তাকাল তার চোখ যেন অতীতের অন্ধকারে ফিরে গেল।
তখন আমার বয়স কতোই বা ছিলো..!তার কণ্ঠ শিশু-আবরারের মতো দুর্বল শোনাল।মাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছি ছয় বছর বয়স।ধীরে ধীরে এমনই চলতে লাগল!
স্মৃতির ঝড় তাকে আছড়ে মারছে,
কুহেলি বুঝতে পারল।
বাবা সারাদিন বাইরে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন।কিন্তু ঘরে ফিরলেই সেই মহিলা
আবরারের চোখে ঘৃণা ও ব্যথার ছায়া একসাথে ভাসল।মিসেস কামেনী চৌধুরী আর তার বাবার
তাদের ঝগড়া, চিৎকার, জিনিসপত্র ভাঙচুর
ঘরটা যেন যুদ্ধক্ষেত্র।
কুহেলি নিঃশব্দে শুনে যাচ্ছে,
শ্বাসও যেন আটকে আছে।
বাবা সবসময় চাইতেন আমাকে এসব থেকে দূরে রাখতে।তার চেষ্টা ছিল আমাকে শান্তিতে ঘুম পাড়ানোর..!কিন্তু তবুও আমি জেগে যেতাম।
আর যখন দেখতাম তাদের ঝগড়া,জিনিস ভাঙার শব্দ চিৎকার!
আবরার থেমে গেল, গিলে নিলো একটা ভারী স্মৃতি।তারপর ভারি কন্ঠে বললো,
ভয়ে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিতাম।কম্বলের নিচে মাথা লুকিয়ে রাখতাম,ভাবতাম শব্দগুলো থেমে যাবে কিন্তু থামতো না।
আবরারের চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে উঠল
অতীত যেন তাকে জাপটে ধরছে।
এভাবে চলতে থাকে কয়েক মাস ধরে।
তার কণ্ঠে ভাঙা ক্লান্তি।একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি—ওই মহিলা বাড়িতে একটা অচেনা মানুষ এনেছে।
কুহেলি হকচকিয়ে তাকালো।আবরার থেমে বুকে জমে থাকা শ্বাস ছাড়ল।
আমাকে দেখেই সে তাড়াহুড়া করে অন্য রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত।আমি দরজায় ধাক্কা দিতাম…কান্না করতাম…!
মা…মা…বলে ডাকতাম..!
তার কণ্ঠ ক্রমশ ফিসফিসে হয়ে এল।
কিন্তু ঐ মহিলার মন গলেনি সে লিপ্ত হয় পরকীয়া তে!
কুহেলির বুক মোচড় দিয়ে উঠল।
একটি ছয় বছরের বাচ্চা নিজের ঘরেই বন্দি।
আবরার সামনে তাকাল—চোখের গভীরে এক অব্যক্ত অন্ধকার।
যে লোকগুলো আসতো তারা ওই মহিলাকে অনেক টাকা দিত।আমি বুঝতাম না তখন শুধু দেখতাম দরজা বন্ধ, আলো নিভে, আর অচেনা মানুষের গলা..!
তার হাতটি কাঁপল।
কুহেলি নিঃশব্দে তার হাত চেপে ধরল।
লোকগুলো চলে গেলে..!আবরারের গলা আরও ভারী হলো,সে আমাকে রুম থেকে বের করত।
কিন্তু কোলে নিতো না সান্ত্বনা দিত না..!
তার চোখে ভয়ের অদ্ভুত ছাপ ভেসে উঠল।
বরং ভয় দেখাতো।বলতো যদি আমি বাবাকে কিছু বলি,তাহলে নাকি সে বাবা’কে মেরে ফেলবে।
কুহেলি নিঃশব্দে শ্বাস নিল!
এতটাই নিচে নামতে পারে একজন মানুষ?
আবরার কথার মাঝেই থেমে গেল তার বুক যেন ভারে আটকে আছে।
আমিও ভয়ে চুপ থাকলাম, পাখি..!তার গলা গভীর, ভারী।পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় লোভ হলো টাকার লোভ।এই লোভ মানুষকে এমন নিচে নামিয়ে দেয়,যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না..!
কুহেলি নিঃশব্দে শুনে যাচ্ছে তাকে যেন আর নিজের শ্বাসও শোনা যাচ্ছে না।
আবরার ধীরে বলল এভাবে চলতে থাকল মাসের পর মাস।আমি তখন সাত বছরে পা দিলাম।একদিন বাবা হঠাৎ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন।বাবাল শরীরটা নাকি খুব খারাপ লাগছিল।
কুহেলি দ্রুত চোখ তুলে তাকাল।
আবরার শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল সেই দিনের সিন টা যেন তার চোখে জীবন্ত।বাবা ঘরে ঢুকেই সব দেখে ফেললেন।দরজা অল্প ফাঁক ছিল আর বাবার মাথায় যেন আগুন ধরল।
তার গলা কেঁপে উঠল।একজন মানুষ,যে সবসময় সৎ পথে চলেছে,যে নিজের পরিবারকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে সে যখন নিজের ঘরে এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখল..!
আবরার থামল কয়েক সেকেন্ড।
বাবার মাথা ঠিক থাকা সম্ভব ছিলো না, পাখি।
কী করবে, কী বলবে—সে বুঝে উঠতেই পারছিল না।যার সঙ্গে বিয়ে, যার কাছে সব বিশ্বাস তারই এমন পতন!নিজের স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে দেখে কোনো মানুষের মাথাই ঠান্ডা থাকে না পাখি!আমার
বাবাও পারেনি।
কুহেলির শ্বাস আটকে গেল।সে আবরারের হাত শক্ত করে ধরল যেন তাকে অতীতের অন্ধকার থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছে।
আবরার আস্তে বলল,
সেই দিনটাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম ঝড়
কুহেলি অনুভব করছিল আবরারের কণ্ঠ বদলে যাচ্ছে।আগের সেই দৃঢ়, শক্ত মানুষটি নয় আজ যেন এক আহত শিশুর মতো কথা বলছে।
আবরার ধীরে বলল,
বাবা সেদিন নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো, পাখি।ওই মহিলা যে কাজগুলো করত সেগুলো যে কোনো মানুষকেই পাগল করে দিতে পারে..!
কুহেলি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
বাবা যখন রাগে ফুলদানিটা তুললো ঠিক তখনই আরেকজন ঢুকে পড়ল ঘরে মহিলার জমজ বোন, আজমীর দিওয়ানা।দুই বোনই দেখতে এতটাই একরকম ছিলো যে ছোটবেলায় আমিও অনেক সময় বুঝে উঠতে পারতাম না কোন টা কে!
আবরার গলা আরও নিচু করল।
বাবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজমীর দেওয়ানা পিছন থেকে বাবার ওপর আঘাত করল।এত দ্রুত, এত হঠাৎ যে বাবা দাঁড়াতেই পারলেন না।
কুহেলির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
আবরার শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে বলল,
আমি তো তখন ছোট মাত্র সাত।চিৎকার করে দৌড়ে গেলাম।কামিনী খানের পা ধরে কাঁদতে লাগলাম—বাবা কে আর আঘাত নিষেধ করো প্লিজ…!কিন্তু ঐ মহিলা আমার অনুরোধ শুনল না।
বরং উল্টো আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
আমি পড়ে গেলাম, হাঁটু ছড়ে গেল কিন্তু তাও বাবাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম।
কুহেলি চোখের জল চেপে ধরল।
আবরারের চোখ তখন অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
সেই দিন আমার পৃথিবীটা ভেঙে গেল বাবা আমার চোখের সামনেই পড়ে রইলেন!
আমি তখন এতটা ছোট কিছু বুঝতাম না,কিন্তু বাবাকে ঐভাবে পড়ে যেতে দেখে ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।মনে হচ্ছিল আমার পুরো পৃথিবীটাই যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়লো।কী করবো, কোথায় যাব কিছুই বুঝিনি।শুধু মনে হচ্ছিল, আমাকে কিছু একটা করতে হবে বাবাকে বাঁচাতে না পারলেও অন্তত নিজের ভেতরের আগুনটাকে থামাতে হবে।
রাগে, ভয়ে, আতঙ্কে আমি হাতের কাছের জিনিসটা তুলে ফেলি আর কামিনী চৌধুরীর মাথায় আঘাত করি। আমার বয়স তখন সাত এই বয়সের একটা বাচ্চা এমন কিছু করবে, তা আজমীর দেওয়ানা কল্পনাও করতে পারেনি। সে থমকে যায়, কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে যায়।
তারপরই সে আমার দিকে এগিয়ে আসে চোখে ঠাণ্ডা আগ্রাসন। আমি বুঝে গেলাম, দেরি করলে আর বাঁচবো না। তাই এক মুহূর্তও চিন্তা না করে দরজার দিকে ছুটি। পুরো গায়ে তখনো ঐ মহিলার রক্ত লেগে আছে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু দৌড় থামাইনি।
বাড়ির সিঁড়ি পেরিয়ে, উঠান পেরিয়ে, অন্ধকার গলিটা ধরে দৌড়াচ্ছিলাম শুধু বাঁচার জন্য।
পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম কামিনী চৌধুরীর চিৎকার—দাঁড়া তুই! কোথায় পালাচ্ছে!?
কিন্তু রাতের অন্ধকারে সে আমাকে হারিয়ে ফেলে।
আমি অনেকক্ষণ দৌড়ে একটা জায়গায় থেমে যাই আমাদের বাড়ির ঠিক পিছনের ঝোপের কাছে। শরীর কাঁপছিল, বুক ধড়ফড় করছিল। কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই সেখানেই লুকিয়ে বসে থাকি। ঠাণ্ডা জমিন,কাঁটা-ঝোপ, পোকা আর মাকড়সার কামড় কোনও কিছুই তখন আমাকে ভয় দেখাতে পারেনি বাবাকে হারানোর ভয়টার পাশে।
সারা রাত সেই ঝোপে কাটিয়েছি।পোকামাকড় বারবার কামড়াচ্ছিল হাত, পা, গলা সব ফুলে উঠছিল। আমার গায়ের রঙ এমনিতেই উজ্জ্বল ছিল কিন্তু সেই রাতের কামড় আর ফোলাগুলো আমাকে আরও কাহিল বানিয়ে দেয়।
ভোরের দিকে ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চোখ মেলেছিলাম। রাতভর ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকার পর মাথাটা ভার হয়ে গেছে, শরীরও ব্যথায় টনটন করছে।দূর থেকে হঠাৎ সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো তীক্ষ্ণ, কাঁপা কাঁপা, ভোরের নিস্তব্ধতায় আরও জোরে শোনাচ্ছিল।
আমি পাতা সরিয়ে তাকাতেই দেখলাম আমাদের বাড়ির সামনে একটা পুলিশের গাড়ি থামলো। কয়েকজন পুলিশ নেমে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ভয়ে না বরং সেই ভয়ের পাশে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা।
তারপর কয়েক মুহূর্তেই সেই দৃশ্য চোখে পড়লো আজমীর দেওয়ানা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।কিন্তু সেই কান্না ছিলো একেবারেই অভিনয়।আমি ছোট হলেও মানুষ চেনার ক্ষমতা তখনই জন্ম নিয়ে ফেলেছিলো।
আজমীর দেওয়ানা কাঁদো কাঁদো গলায় পুলিশকে বলছে
স্যার.. স্যার, আবরার ও-ই করেছে! আমার বোন আর তার স্বামী দু’জনকেই মেরে ফেলেছে ও!
কথাগুলো শুনে মনে হলো মাথার ওপর হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে পড়লো।আমি স্তব্ধ হয়ে কেবল চেয়ে থাকলাম এত বড় মিথ্যে! আর সেই মিথ্যের পেছনে লুকিয়ে তাদের অপরাধ,তাদের লোভ,তাদের নোংরা অতীত।
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।কিন্তু চোখের ভেতরে তখন আর পানি ছিল না ছিল শুধু আগুন।
ভিতরে ভিতরে নিজের সঙ্গে একটা প্রতিজ্ঞা জেগে উঠলো,
আমি তোর প্রত্যেকটা অন্যায়ের বিচার করবো। তুই আমার বাবা কে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছো। কিন্তু আমি তোকে শান্তিতে থাকতে দেব না।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো,যদি তখনই পুলিশের সামনে যাই! কিন্তু আমি জানতাম তারা আমাকে দোষী প্রমাণ করার জন্য সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে। আমি বাচ্চা, কেউই আমার কথা বিশ্বাস করবে না। তারা চায় আমি ধরা পড়ি, যেন সত্য চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
তাই এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম না আর।ঝোপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, রক্তে ভেজা জামাটা শরীরে লেগে থাকা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম।ঘর নেই, পরিবার নেই, কোথায় যাচ্ছি তাও জানি না তবুও হাঁটছিলাম।
কারণ এই হাঁটাটা ছিলো শুধু পালানো না
বরং শক্ত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমার ভেতরে দুটো আগুন জ্বলছে।
একটা আগুন বাবাকে হারানোর বেদনায়।
আরেকটা আগুন প্রতিশোধের আগুন।
আর অদ্ভুতভাবে, আমার নিঃস্ব শরীরের মাঝেও সামান্য একটা তৃপ্তি ছিল!
আমি অন্তত এক জনকে থামাতে পেরেছি।
যে বাবাকে ধ্বংস করেছিল সে আমার হাতেই শেষ হয়েছে।
কিন্তু আরেকজন এখনো বেঁচে আছে।তাকে একবারে মারবো না তিলে তিলে মারবো!বলেই প্রতিজ্ঞা করলাম!
চলবে...!!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৮+স্পেশাল
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৩
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫১(সমাপ্ত)