সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_১০
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আকসার দ্বিতীয় নাম্বার থেকে মেজবাহ ওকে এখনো অবধি ব্লক করেনি। বরং, সেভাবেই ফেলে রেখেছে।
বিয়ের সপ্তাহখানেক কেটে গেছে ওদের। ক্যালেন্ডারের পাতায় গুনে গুনে তারিখের হিসাবটা মনে রাখছে আকসা। দিন কিভাবে কেটে যায়! অথচ মেজবাহ’র সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।
আকসা মাঝেমধ্যে মেসেজ দেয় মেজবাহকে। এমন না যে, লোকটা একেবারে ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বরং আকসা যদি মেসেজ করে, “কেমন আছেন?” তার দুই-তিনদিন পরে মেজবাহ সেই মেসেজের রিপ্লাই করবে। বলবে, “আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুমি?”
ব্যস এটুকুই। সবসময় এমন রিপ্লাই-ই আসে। এর ব্যতিক্রম কখনো ঘটে না। আকসা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এসবে। ও জানে, মেজবাহ এই জবাব-ই দেবে, দু-তিনদিন পরেই রিপ্লাই করবে। তবু ও অপেক্ষা করে। আশায় থাকে, এই বুঝি মেজবাহ রিপ্লাই দিলো বলে৷ হয়তো কখনো ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে।
আকসা অনেক সময় বিভিন্ন দরকারেও মেজবাহকে মেসেজ দেয়। এই যেমন গতকাল মেসেজ করেছিল। মেজবাহ’র পরিবারের কেউ তাকে কলে পাচ্ছে না। বোধহয় ব্যস্ত ছিল। আকসাকে ওর শাশুড়ি বলেছিলেন, যেন মেজবাহকে একটা মেসেজ দিয়ে রাখে যে, ব্যস্ততা কমলেই মামনিকে একটা কল দিতে।
আকসা সেই মোতাবেক গতকাল সকালে মেজবাহ’কে মেসেজ করেছিল, “আপনি ব্যস্ততা কাটিয়ে প্লিজ আপনার মামনিকে আগে একটা কল দিবেন।”
মেসেজটা করার পরে আকসা আর হোয়াটসঅ্যাপে ঢোকেনি। আজ ওর ভার্সিটিতে ক্লাস ছিল। দুপুর দেড়টার দিকে ক্লাস শেষ করে সবে শ্বশুরবাড়িতে এসেছে। ড্রয়িংরুমে আসা মাত্র দেখলো, মিহি আর জেমি আপু সবার সাথে বসে আছেন সোফায়। আকসা দ্রুত ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হয়ে আগে জেমি আপুর ছেলে আয়ানকে কোলে নিলো। আয়ান আবার বড্ড তার মামির নেওটা। যেদিন তার মামি তাকে প্রথম কোলে নিয়েছিল, সেদিন থেকেই সে বেশ মামি-ভক্ত। মামিকে পেলে মায়ের কোলেও থাকতে চায় না। আকসা তৎক্ষনাৎ তাহসিনকে দোকানে পাঠিয়েছে আয়ানের জন্য চকলেট কিনে আনতে। আয়ান তার মামিকে দেখলে চকলেটের আবদার করবেই।
জেমি আপুর হাসবেন্ড দেশের বাইরে থেকে আসছেন আগামী সপ্তাহে। সেটা নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছে সবার সাথে। জেমি আপু নিমন্ত্রণ জানাতে এসেছেন সবাইকে। তার স্বামী আফসান শিকদার যেদিন দেশের বাইরে থেকে আসবেন, সেদিন সবাইকে তার শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে।
ইশা বেগম বললেন, “আমরা অবশ্যই যাবো মা। আফসানের সাথে কতকাল হলো দেখা হয় না। ছেলেটা দেশের বাইরে গেছে তো সেই বছরখানেক হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে যদিও ফোনে কথা হয়। কিন্তু ফোনে কথা বলা আর সামনাসামনি দেখা হওয়া কি এক হলো? এই-যে দেখ, তোর ভাইটা। তার দেখা-সাক্ষাৎ তো বছরে একদিনও পাওয়া যায় না। বিয়ে করেই কি এক জরুরি মিশনের কথা বলে চলে গেল, এরপর মিশন শেষ হয়েছে, ছুটি পাচ্ছে; তবু নাকি সে ফিরবে না। তার নাকি অনেক কাজ। এখন ছুটি নিতে চায় না।”
“ভাই!”
জেমি আপুর হঠাৎ কি যেন মনে হলো। সে বললো, “ভালো কথা মনে করিয়েছো মামি। ভাইয়ের সাথে আমার শেষ কথা হয়েছে দু’দিন আগে। এরপর আর ওর সাথে কথা হয়নি। ওর সাথে এখন কথা বলা খুব জরুরি। কিন্তু ওকে তো ফোনেই পাচ্ছি না।”
“ওকে তো আমরাও কেউ ফোনে পাচ্ছি না। আকসা মেসেজ দিয়ে রেখেছে। মেসেজও সিন করছে না।”
জেমি আপু একটু আড়চোখে দেখলেন আকসাকে। তারপর হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। বিরবির করে কি যেন বললেন। আকসা ব্যাপারটা খেয়াল করলো। তবে কিছু বললো না।
.
.
বাইরে হৈ-হট্টগোল চলছে অনেক। আকসা কিছুক্ষণ হলো ঘরে এসে বসেছে। ভার্সিটি থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় সবার সাথে বসে দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি ওর। তাই ওর শাশুড়ি এসে খাবার দিয়ে গেছেন ঘরে। আকসা ধীরেসুস্থে খাচ্ছিল আর ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করছিল। তখনই টুংটাং মেসেজ নোটিফিকেশন আসলো। আকসা নোটিফিকেশন চেক করতেই দেখলো, মেজবাহ মেসেজের রিপ্লাই করেছে! তা-ও এতো দ্রুত! ও চটজলদি হোয়াটসঅ্যাপে গেল। কনভারসেশনে ঢুকতেই দেখলো, মেজবাহ রিপ্লাইতে লিখেছে— “ওকে।”
শুধুমাত্র ‘ওকে!’ — এর বেশিকিছু নয়। মেজবাহ অনলাইনে-ই ছিল। আকসা পুনরায় মেসেজ করলো, “কোথায় ছিলেন আপনি?”
“কেন?”
দুই মিনিট পরে মেসেজের রিপ্লাইতে জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো মেজবাহ। অর্থাৎ লোকটা জানতে চাইছে, আকসা এই প্রশ্ন করছে কেন! আকসা কিছু মুহূর্ত স্তম্ভিত রইলো। নিজেকে থিতু করে ধীরেসুস্থে ঢোক গিলে রিপ্লাই করলো, “অন্য সময় তো তবু দিনে একবার হলেও বাসার সবার সাথে কথা বলেন। অথচ আজ দু’দিন হলো আপনি কারো কল ধরছেন না৷ সবাই খুব চিন্তা করছিল। আম্মা তো রীতিমতো হয়রান হয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে বারবার করে বলছিলেন, যেন আপনাকে মেসেজ দিয়ে রাখি।”
“ওহ আচ্ছা!”
আবারও একইরকম জবাব! লোকটা কি এসবের বাইরে আর কোনো কথা বলতে পারে না? অথচ বিয়ের পূর্বের কিছুদিন কথাবার্তা শুনে মনে হতো, যেন মুখে মধু ঝরে। অথচ এখন! এখন দশটা কথা বললে একটা জবাবও ঠিকমতো আসে না৷ আকসা রীতিমতো উদগ্রীব পাগল হয়ে যাচ্ছে৷ এমন আচরণ কেন করা হচ্ছে ওর সাথে? এমন না যে, আকসাকে কখনো একটা কটু কথা বলেছে বা ওর সাথে বাজে আচরণ করেছে। কখনো ওকে অপমানও করেনি। তবু আকসা মেজবাহ’র এই নির্লিপ্ত আচরণে ভেতরে ভেতরে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আকসা উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলো, “আপনি কি খুব বেশি ব্যস্ত মেজবাহ?”
“নোপ।”
“তাহলে এমন ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন কেন? এমন কেন আপনি?”
“আমি এমনই।”
“আমি শুধুমাত্র আম্মার জন্যই মেসেজ করেছিলাম আপনাকে। উনি টেনশন করছিলেন। অথচ আপনার কোনো প্রতিক্রিয়া-ই নেই!”
“একটা কথা বলো তো আকসা।”
এতোক্ষণে, এতগুলো দিন পর মেজবাহ আকসার নামটা উচ্চারণ করলো। আকসার মন ক্রমাগত অস্থির হয়েই চলেছে। ও নিজের নামটা মেজবাহ’র মুখে শুনে একটু নড়েচড়ে বসে বললো, “জি।”
“এবার মামনির জন্য না-হয় বুঝলাম, তবে সবসময় তুমি আমাকে মেসেজ করো কেন? মানুষ যে ডিস্টার্ব ফিল করতে পারে, এটাও তো বোঝা উচিত।”
আকসা হতভম্ব হলো। ডিস্টার্ব! ও মেজবাহকে ডিস্টার্ব করে! আকসার হৃদয় বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এতো ঠান্ডা মাথায়, ভদ্রভাবেও যে কেউ অপমান করতে; সেটা ধারণায় ছিল না আকসার। ওর গলা ব্যাথা করছে। চোখ জ্বালাপোড়া করছে। আকসা নিজেকে যথেষ্ট সামলে নিয়ে ফ্যাকাশে মুখে জবাব দিলো, “আর করবো না ডিস্টার্ব।”
“ওকে।”
আকসা হঠাৎ কি মনে করে যেন পুনরায় বললো, “শেষ একটা কথা বলি মেজবাহ?”
“ইয়াহ, বলো।”
“আপনি কি একা থাকার প্ল্যানিং করেছেন? মানে আপনি একা থাকতে চাইছেন?”
“ইজ দিস এনি অফ ইয়োর কনসার্ন?”
কড়া জবাবটা পেয়েও আকসা থামলো না। ও আরো শক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “শেষবার তো। আর ডিস্টার্ব করবো না। বলুন আগে!”
এবার ওপাশ থেকে ছোট্ট করে জবাব এলো— “ইয়াহ।”
আকসার মনে যা চলছে, সেটা শুধু ও-ই ভালো জানে৷ ও ঠোঁট টিপে হাসি আঁটকে লিখলো, “আপনি তো মানুষ তাইনা? তাহলে আপনি সারাজীবন একা থাকবেন কীভাবে? আপনার ইচ্ছা করবে না?”
“মানে?”
মেজবাহ বোধহয় ইতিমধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে ভ্রু কুঁচকে ফেলেছে। আকসা কল্পনা করে মৃদু হাসলো। ও আবারও বললো, “মানে বলছিলাম, প্রত্যেক মানুষের-ই তো স্বাভাবিকভাবেই জৈবিক চাহিদা থাকে। আপনারও নিশ্চয়ই আছে। তাহলে বউ ছাড়া কীভাবে একা থাকবেন আপনি? আপনার চাহিদা নেই কোনো?”
“আমার এসবের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
আকসা বোধহয় জানতো, এমন জবাব-ই আসবে। ও মুহূর্তের মধ্যে টাইপিং করলো, “তাহলে কি আপনি গে?”
মেসেজটা সিন হলো। নীল টীকাচিহ্ন ওঠামাত্র-ই আকসা তড়িৎগতিতে ডানপাশের ওপরের দিকের থ্রি ডটে ক্লিক করে মেজবাহকে ব্লক করে দিলো! যাক বাবা! অবশেষে শান্তি পাওয়া গেল। এতো ঠান্ডা মাথায় করা অপমানের বিপরীতে সামান্য কিছু তো ফিরিয়ে দেওয়া-ই যায়। মেজবাহ ইফতেখারকে খুব ভালো করে চেনে আকসা। এই সামান্য কথায়ও যে তার মন-মস্তিষ্ক কিভাবে দিনের পর দিন জ্বলেপুড়ে ছারখার হতে থাকবে; সেটাও এই মুহূর্তে ও খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে। মৃদু হাসলো আকসা। এতোক্ষণ জ্বলতে থাকা হৃদয় শান্ত হয়েছে ওর। মেজবাহ’র সাথে আর কখনো কথা হবে না ওর, তবে এটুকু ওকে যেই প্রশান্তি দেবে; তার সাথে কয়েক জনম কথা না বলার যেই যন্ত্রণা সেটার পার্থক্যও আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আকসার আর কিছুই যায় আসবে না। ও মিনিট পনেরো ঘরের মধ্যে আনন্দে নাচানাচি করে এরপর বাইরে বের হলো। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলো সবাই খুব সিরিয়াস হয়ে কি যেন বলাবলি করছে। আকসা প্রথমে বুঝতে পারলো না, কি কথা হচ্ছে। হঠাৎ মিহি উঠে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো, “ভাইয়া বাসায় ফিরছে ভাবী! আগামী সপ্তাহে ফিরছে!”
মিহি খুশিতে একটা চিৎকার দিলো। এদিকে প্রথমে মস্তিষ্কে ঢোকাতে না পারলেও কিছু মুহূর্ত পরে উপলব্ধি করতেই আকসা চমকে উঠলো। মেজবাহ ফিরছে মানে! তা-ও আগামী সপ্তাহে-ই!
চলবে
বি:দ্র: আমি অসুস্থ অনেক বেশি। আশা করি, ছোট পর্বের জন্য অভিযোগ করবেন না। অনেক কষ্টে এটুকু লিখেছি।
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
সীমান্তরেখা গল্পের লিংক
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৯