Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৪


মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৪

#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

পর্ব (৩৪)

ওয়াসিফ প্রথমে খবরটি শাহেনূর কে জানিয়েছে। ছেলের মুখ থেকে এমন একটা খুশির খবরে শাহেনূর হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলো, চৈতন্য ফিরতেই টের পায় তার হাত পা সামান্য কাঁপছে, আহ! ঠিক কতগুলো বছর পর এমন একটা খুশির খবর এলো তার নিকট? পর মুহুর্তে আবার কিছুটা ভয় ভয়ও পায়, মেয়েটার শারিরীক অবস্থা তো ওতোটাও ভালো নয়, কিভাবে পারবে ও এতোগুলা দিন নিজেকে আগলে রেখে বাচ্চাটার যত্ন নিতে? তাকায় ছেলের দিকে, বলে।

‘ আমার খুশি লাগছে বাবা, ভীষণ খুশি আমি। কিন্তু আবার ভয় ও হচ্ছে ‘

‘ ভয়ের কিছু নেই আম্মা, আমি আছি,তোমরা তিন তিনটে মা আছো বাড়িতে, লোপা আছে, লুইপা আছে। সবাই মিলে পারবো না বলো একটা প্রাণ দুনিয়ায় আনতে, যদি আল্লাহ চায়’

‘ অবশ্যই পারবো’

‘ এই বাচ্চাটা হয়তো ওর জন্য বিশাল রহমাত হয়ে আসবে আম্মা, সবকিছুর আগে আমার প্রয়োজোন ওর সুস্থতা’

‘ কিন্তু তুই যে বললি ওকে নিয়ে ঢাকায় যাবি’

‘ হ্যা বলেছিলাম, যাওয়া হচ্ছে না। যখন বলেছিলাম তখন তো এই খবরটি নিজেও জানতাম না, এই মুহূর্তে ওকে নিয়ে দূরে যেতে চাইছিনা, ওকে এখানে রেখেই মানাতে হবে’

শাহেনূর ছেলের মনোবল দেখে নিজেও ভীষণ শক্ত থাকে। রাত অনেক হয়েছে, এবাড়ির বাকি সদস্যরা যার যার ঘরে। আপাতত খবরটা কাউকে না জানিয়ে আগামীকাল সবাই কে জানাবে বলে শাহেনূর, ওয়াসিফ মিলে সিদ্ধান্ত নেয়। শাহেনূর বলে।

‘ ধারা কে বুঝিয়ে শুনিয়ে কয়টা খাইয়ে দিয়েছি, ওর কাছে লুইপা আছে, গল্পের বই পড়ে শোনাচ্ছে। তুই এই ফাঁকে কয়টা খেয়ে যা, আমি টেবিলে ভাত দিচ্ছি, আয়’

____________

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে ওয়াসিফ যখন ভেতরে ঢোকে তখন লুইপা ভাইকে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসে। ধারাও চুপচাপ তাকিয়ে দেখে ওয়াসিফ কে। আস্তে করে লুইপার দিকে তাকিয়ে বলে।

‘ গল্প তো শেষ হলোনা, আপনি উঠে যাচ্ছেন কেনো’?

লুইপা তখন বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে, বলে।

‘ বাকি গল্প ভাইয়া শোনাবে, আমি এখন যাই’

ধারার ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়, চেচিয়ে উঠে বলে।

‘ এখনই বসবেন, এই মেয়ে বসুন, পুরোটা গল্প শেষ করে তারপর উঠবেন’

লুইপা ধমক খেয়ে তাকায় ওয়াসিফের দিকে, ওয়াসিফ ইশারায় বোঝায় আরেকটু বসে যা। লুইপা বসে, ওয়াসিফ হেটে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আবার ও বইটা খুলে পড়া শুরু করে। ধারা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে লুইপার দিকে। লুইপা বই থেকে চোখ উঠিয়ে তাকাতেই দুইবোনের দৃষ্টি মিললো। লুইপা বলে।

‘ কি দেখিস’?

ধারা ওভাবেই স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলে।

‘ দেখি, আপনার কতো সুখ, শাড়িটাড়ি পরেন। আমার আবার মনে ওতো সুখ নেই, শাড়ি চুড়ি পরিনা’

লুইপা আস্তে করে জিজ্ঞেস করে।

‘ তুই পরবি? পরিয়ে দেবো শাড়ি’

ধারা কিছু সময় ভেবে বলে ‘ আপনি কি ভালো শাড়ি পরাতে পারেন’?

‘ পারিতো, তুই পরবি’?

‘ কিন্তু আমার তো শাড়ি নেই ‘

‘ আছে তো’

‘ কোথায় ‘?

লুইপা আলমারি দেখিয়ে বলে ‘ ঐখানে ‘

‘ ঐখানে যা আছে তা কি আমার’?

‘ হ্যা তোর ই তো’

‘ আচ্ছা এনে পরিয়ে দিন একটা, আপনার মতো সুন্দর করে পরিয়ে দেবেন। আপনার মতো না হলে খবর আছে’

লুইপা উঠে গিয়ে শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট বের করে রাখে ওর সামনে। শাড়ি চার/পাঁচটা দেখিয়ে বলে।

‘ কোনটা পরবি’?

‘ একটাও না’

‘ তাহলে কোনটা’?

‘ আপনার গায়েরটা’

লুইপা চোখে ঘনঘন পলক ফেলে বলে।

‘ এটা তো পুরাতন, এখান থেকে নতুন একটা পরিয়ে দি’?

ধারা চেতে ওঠে, ‘ বলেছিনা আপনার টা মানে আপনার টাই’

‘ আচ্ছা ‘

লুইপা, ধারার শাড়ি গুলোর মধ্যে থেকে একটা সুতি শাড়ি নিজে পরে, ওর গায়ের শাড়িটা খুলে বলে।

‘ এদিকে আয়, পরিয়ে দি’

ধারা ওঠেনা, বলে।

‘ আপনার গায়ের লাল খয়েরী শাড়িটা ভালো লাগছে, আমি এখন এটা পরবো, এটা খুলুন’

লুইপা তাকিয়ে আছে ধারার মুখের দিকে, এই মেয়ে মাঝরাতে ওর সঙ্গে কি শুরু করেছে? ও হ্যা তে না বলা মানে চেতিয়ে দেওয়া। যেটা লুইপা কখনো করবেনা। ধৈর্য্য ধরে আবারও শাড়ি পাল্টে মনে মনে বললো, আল্লাহ রহম করো।

‘ এই যে লাল খয়েরী শাড়িটা ‘

ধারা এবার উঠে গিয়ে দাড়ায় সুন্দর মতো, ‘ দিন পরিয়ে দিন’

লুইপা পটু হাতে মিনিট দশেকের মধ্যে ওকে সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলে।

‘ সুন্দর হয়েছে’?

ধারা নিজেকে কতক্ষণ দেখে তারপর দেখে লুইপাকে, বলে।

‘ আমাকে খোপা করে দিন, আর আমার গহনা কোথায়? ‘

লুইপা কোনো কথা খরচ না করে চুলগুলো আঁচড়ে ঢিলেঢালা ওর মতো করে একটা খোপা করে দিলো। ধারা’র গহনা কোথায়? বিয়েতে বড়ো মা ওকে কি দিয়েছে এই বিষয় কিছু জানেনা। লুইপা বলে।

‘ আপাতত গহনা আমার গুলো পড়’

লুইপা হাতের চুড়ি জোড়া খুলতে গেলে ধারা বলে।

‘ আপনার গহনা কেনো আমি পড়বো? আমার কিছু নেই? আমার গহনা কোথায় ‘?

লুইপা পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। এর মধ্যে ওয়াসিফ ঢোকে ঘরে। একটু আগে দেখে গেলো এরা বই পড়াপড়ি করছিলো এর মধ্যে শাড়ি কখন পরলো? ওয়াসিফ কে দেখে ধারা বলে।

‘ বিয়ের সময় আমাকে কি কোনো গহনাগাঁটি দেননি নাকি? আমার গহনা কই? আমি কি পরবো এখন’?

লুইপা এসে দাঁড়ায় ওয়াসিফের মুখোমুখি, ফিসফিস করে বলে ‘ এক শাড়ি পরবে বলে আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে, আমি এখন যাই, বাকিটা তুমি সামলে ওঠো ভাইয়া’

পেছন থেকে ধারা তেতে উঠে বলে ‘ এই মহিলা, আপনি আমার স্বামীকে কি বলছেন? কি খারাপ বুদ্ধি দিচ্ছেন?’

লুইপা আর দাঁড়ায় না, এক ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ধারা জিজ্ঞেস করে ওয়াসিফ কে।

‘ কি বললো আপনাকে? নিশ্চয় আমার নামে বাজে কিছু বলেছে’?

ওয়াসিফ ঘুরে দাড়িয়ে ঘরের দরজা আটে, এরপর বলে।

‘ না, ওরা কখনো ই তোর নামে বাজে কিছু বলেনা, ওরা তোর আপনজন, তোকে নিয়ে বাজে কথা কেনো বলবে’?

ওয়াসিফ এগিয়ে গিয়ে নিজের শক্ত পুরুষালি হাত দুটোর মুঠোয় লাউয়ের ডগার ন্যায় সরু কোমল হাত দুটো চেপে রেখে বলে।

‘ ওদের সঙ্গে এভাবে আপনাআপনি করে কথা বলিস কেনো? ওরা তো এবাড়ির মানুষ, তোর আপন মানুষ ‘

‘ কেমন আপন? আপনার মতো আপন’?

‘ হু, আমার মতো আপন’

‘ না, ওরা আপনার মতো আপন না। ওরা আপন হলে আপনার মতো আমাকে বাচিয়ে আনেনি কেনো? ওরা কেনো গেলোনা আমাকে বাঁচাতে? ওরা কিভাবে আপন মানুষ হয়’?

‘ ওরা তোর জন্য দোয়া করেছে, ওদের ক্ষমতা ছিলোনা তোকে খুঁজে আনার, ওরাও তোর আপনজন’

‘ আমি জানি, ওদের মধ্যে কেউ আমার মা, কেউ আমার বড়ো মা, কেউ আমার বোন, কিন্তু আমার সবথেকে আপনজন আপনি ‘

‘ আমি যে তোর সবথেকে আপনজন একথা তোকে কে বললো’?

ধারা কতক্ষণ চেয়ে থাকে ওয়াসিফের দিকে, আচমকা ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঝাপসা কিছু কল্পনা। নিজের মস্তিষ্কের উপর চাপ দিয়ে কিছু মনে করতে গেলেই ও দিশেহারা হয়ে ওঠে, সব কেনো পরিষ্কার হয়না, ঝাপসা দেখে কেনো সব? ওয়াসিফ ওর অস্থিরতা টের পেয়ে আগলে রেখে বলে।

‘ আচ্ছা আমিই তোর আপনজন, চল তোকে গহনা বুঝে দি, পরবি ঐগুলা, আয়’

সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে ওকে যে মানুষটা আগলে রেখেছিলো, সেই মানুষটা ওয়াসিফ। চোখের সামনে নরপশু গুলো যে মানুষটাকে পিটিয়ে বারবার বেহুশ করেছিলো সেই মানুষটা ওয়াসিফ, রক্তাক্ত, আর জখম হওয়া শরীর সেদিন ধারা দেখেছিলো দুচোখ ভরে। উনিশ বছরের কোমল প্রাণ মানতে পারেনি, সইতে পারেনি ওমন ভয়াবহ দৃশ্য গুলো। মানসিক ভাবে ভারসাম্য হারিয়ে সেইদিন গুলোর পর ওয়াসিফ ব্যতীত কাউকে ওর পাশ ঘেঁষতে দেয়না। ঐদিন থেকে ওর মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে, পৃথিবীতে এই একটি মানুষ ব্যতীত ওর আপন কেউ নেই। আশেপাশে আর কাউকে দেখলে ওর বড্ড বিরক্ত লাগে, সহ্য করতে পারে না। মনে হয় সব বিষাক্ত।

ওয়াসিফ আলমারি’র ভেতরের একটা ড্রয়ার খুলে এক জোড়া চুড়ি, চেইন আর কানের দুল বের করে দিতেই ধারা জিজ্ঞেস করে।

‘ এগুলো কি আমার’?

‘ হু’

‘ কে দিয়েছে? আপনি কিনেছেন’?

‘ নাহ, আম্মা দিয়েছে তোকে, বিয়ের সময় তো আমার দেওয়া শাড়িটাও পরলিনা, গহনাও না। এখন ইচ্ছে হয়েছে এখন পড়’

ধারা গহনা গুলো হাতে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে বলে।

‘ আমাদের বিয়ে কবে হয়েছিলো’?

‘ ২০১৬ সালের জানুয়ারির ২১ তারিখ ‘

ধারা চোখ তুলে চাইলো একবার ওয়াসিফের দিকে, ফের জিজ্ঞেস করলো।

‘ আজ কয় তারিখ’?

‘ ২০১৮ সালের ২রা মার্চ ‘

‘ আমাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন হলো’?

‘ দুই বছর একমাস নয়দিন’

ধারা কতক্ষণ ভেবে বললো।

‘ তাহলে তো অনেক দিন হয়ে গেছে ‘

‘ হু’

‘ আমাদের কোনো বাচ্চা নেই কেনো’?

আচমকা এমন কথায় ওয়াসিফ স্থির চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধারা ধীর কন্ঠে বলতে থাকে।

‘ ঐ বইতে যে গল্পটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন উনি, ওখানে পারমিতা নামের মেয়েটির ফুটফুটে একটা মেয়ে বাচ্চা হয়েছে, কিন্তু জানেন পারমিতার শশুরবাড়ির কেউ খুশিনা, এমনকি পারমিতার স্বামী ও না। এরপর বছর দুই পর পারমিতার আবারও একটা ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চা হলো, এরপর আবারও আরেকটা মেয়ে হলো। এভাবে চারটে মেয়ে হলো। চার নাম্বার মেয়েটি হলে পারমিতার ও অভিমান হয়, সেই অভিমান থেকে মেয়েটির নাম রেখে দিলো অভাগী। ‘

ওয়াসিফ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো গল্প, হঠাৎ ধারার মুখ বন্ধ হতে ওয়াসিফ বলে।

‘ তারপর ‘?

‘ তারপর আর জানি না, বাকি গল্পটুকু শেষ হয়নি, উনি তো চলে গেলেন’

‘ কি উনি উনি বলিস, ওটা লুইপা, তোর আপা হয়’ কথাটা বলতে বলতে ওয়াসিফ খাটের উপর থেকে বইটা হাতে তুলে নেয়। ধারার দিকে তাকিয়ে বলে।

‘ বাকিটুকু আমি পড়ে শুনাই’?

ধারা ভীষণ খুশি হয়, এগিয়ে বসে ওয়াসিফের বুকের কাছে। ওয়াসিফ ওকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে খাটের মাথায় হেলান দিয়ে বসে।

‘ বইটির শেষ কাহিনিতে ছিলো, একে একে পারমিতার চারটি কন্যা হওয়ার পর মানসিক এবং সাংসারিক ভাবে ভীষণ চাপ এবং হতাশার মধ্যে ছিলো পারমিতা, শশুরবাড়ির সকলের কটূক্তি, স্বামীর অবহেলা হয়ে উঠেছিলো নিত্যদিনকার সঙ্গী। এরপর না চাইতেও পারমিতা আবার গর্ভবতী হয়, এবং গল্পের শেষ পাতায় স্পষ্ট করে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন এক নির্মম দৃশ্য। পারমিতার ৫ম সন্তানটি ছিলো পুত্র সন্তান। যাকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলো সৃষ্টি কর্তার কাছে। অবশেষে উপরওয়ালা পারমিতাকে পুত্র সন্তান দিলেও পারমিতা সেই পুত্রকে বুকে আগলে নেওয়ার আগেই আতুর ঘরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।’

এই নির্মম দৃশ্য টুকু,লেখা টুকু সম্পূর্ণ লুকিয়ে গিয়ে ওয়াসিফ নিজের মতো করে মুমতাহিনা কে পড়ে শোনালো।

‘ অবশেষে পারমিতার একটি পুত্র সন্তান হয়, পারমিতার দুঃখ ঘুচে অবশেষে চারটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তান নিয়ে পারমিতার ভরা সংসার হয়, পারমিতার জীবন পরিপূর্ণ ও সুখের হয়’

ওয়াসিফের মুখে গল্পের শেষ কাহিনি টুকু শুনে ধারার মন এক নিমিষেই ভালো হয়ে যায়। চোখের সামনে ভাসে, চারটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তান কে নিয়ে পরিপূর্ণ পারমিতার সংসারের দৃশ্য।

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply