সাজেক ★কাসালং বনভূমি অঞ্চল★বাংলাদেশ
ধরনীতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি নামার প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে গেছে।
দিনের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাসালং অরণ্যের উপর নেমে এসেছে এক অপার্থিব অন্ধকার।গুমোট মেঘে ঢেকে থাকা ভারী কালো আকাশটা হঠাৎই বিদ্যুতের ঝলকে ফেটে উঠল।
বজ্র গর্জনে থরথর করে কেঁপে উঠল অরণ্যের বুকে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য প্রাণী।সেই সাথে ডেকে উঠলো ভয়ানক শব্দে।যেনো অগ্রিম কোনো পূর্বাভাস তাদের ইন্দ্রিয়ে আঘাত করেছে।সকল জন্তু সমস্বরে কেমন চিৎকার করে আতঙ্কিত আর্তনাদ ভরা স্বরে ডাকতে লাগলো।প্রাণী গুলোর চিৎকার অরণ্যের গভীরে প্রতিধ্বনি তুললো নিদারুণ ভাবে।
হঠাৎই ঘন বৃষ্টির তীক্ষ্ণ তাণ্ডব শুরু হলো।ঝরঝর ধারায় বর্ষণ এমনভাবে পড়তে লাগল যেন আকাশ নিজ হাতে মাটিকে পিষে ফেলতে চাইছে।শালবৃক্ষের মোটা ডাল আর জারুলের কচি কিশলয় বজ্রোচ্ছ্বাসে দুলে উঠে গাছ থেকে ভেঙে আছড়ে পড়তে লাগল ভেজা ভূমির ওপর।গহীন অরণ্য জুড়ে ঝড়ো সমীরণ এমন হুংকারে দাপিয়ে বেড়াতে লাগেলো যেন প্রকৃতি বন্য প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয়েছে আজ।
ঝড়ের দাপটে নিশাচর পাখিরা এক অদ্ভুত চিৎকার তুলে পাখা ঝাপটাল।অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়ার্ত তান্ডব থেকে রক্ষা পেতে কোথাও পালাতে চাইছে তারা। কিন্তু ধরণী আজ যেন নির্মম।পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমুন্নত শিরে।
কাসালং অরণ্যের শেষ মাথায় জীর্ণ ভঙ্গিতে নুইয়ে আছে দুইতলা বিশিষ্ট পরিত্যক্ত ফরেস্ট হাউজ।একসময় এটি ঝকঝকে ফরেস্ট বাংলো ছিল।এখানে থাকতেন এক ফরেস্ট অফিসার, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান।
কিন্তু এক ভোরে পত্রিকার শিরোনামে উঠে আসে বিভীষিকাময় এক সংবাদ।যেই সংবাদে স্তব্ধ হয় পুরো সাজেক।খবরের পাতায় হেডলাইন ভেসে উঠে―
“কাসালং ফরেস্ট বাংলো থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চারটি মরদেহ ।আপাতত পরিচয় মিলছে না।ধারণা করা হচ্ছে ফরেস্ট অফিসার এবং তার পরিবারের সকলের দেহ এগুলো।
মৃতদেহগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে ফরেনসিক টিম কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্টই বের করতে পারেনি সেই পঁচা গলিত দেহ গুলো থেকে সেসময়।কিন্তু সত্যিই কি তারা পারেনি?
নাকি কেউ চেয়েছিল ঘাতকদের পরিচয় চিরদিন গোপন থাকুক?কিন্তু কেনো?
এই নিগূঢ় রহস্য আজও অমীমাংসিত।
সেই ঘটনার পর থেকে এই ফরেস্ট বাংলো তে মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।মোটা টাকার বিনিময়েও কাউকে নিয়োগ করা যায়নি।সময়ের তাগিদে বন্ধ হয়ে যায় এই অঞ্চলের বন রক্ষণাবেক্ষণ।
তবে কেউ কেউ এই অরণ্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাইকিং এর জন্য আসতো।কিন্তু বিপত্তি বাধলো তখন ,যখন হাইকিং করতে আসা পর্যটকেরা জানালো
“রাতে এখানে নর-নারী ও শিশুদের কান্না ভেসে আসে।
তাদের ভাষ্যমতে অরণ্য আজও সেই মৃত্যুর স্মৃতি বয়ে বেড়ায়।
এরপর অরণ্য টি সাধারণ মানুষের জন্য একেবারে ভ্রমন নিষেধ করা হয়।
বছরের পর বছর অযত্নে ,অবহেলায় ভেঙে পড়েছে ফরেস্ট বাংলো টি।দেয়ালে স্যাতস্যাতে শেওলার স্তর, ছাদের ভাঙা কংক্রিটের ভেতর থেকে বের হয়ে থাকা মরিচা ধরা রড আর পরগাছায় জড়িয়ে মৃত্যুপুরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠামোটা।চারপাশের শাল গাছ গুলো আরো আকাশ ছুঁয়েছে।দিনের আলো কম পৌঁছায় এখানে।বাড়িটির চারপাশে সাপ খোপ আর হিংস্র প্রাণীর বসবাস।
ঠিক সেই ভুতুড়ে বাড়ি থেকেই হঠাৎ আজ ভেসে এলো এক হৃদয়-বিদারক গোঙানি।হঠাৎ শুনলে মনে হবে কোনো আহত চিতা গর্জন করে ব্যথা নাশের চেষ্টা চালাচ্ছে।কিন্তু সত্যিকারের অর্থে এখানে কোনো চিতা নয়…
এখানে আজ এক মানুষ বন্দি।
ফরেস্ট হাউজের নিচতলার ঘরে মরিচা ধরা ফ্যানের হুকে ঝুলছে মোটা দড়ি।সেই দড়িতে দু’পা শক্ত করে বাঁধা, উল্টো ঝুলছে একজন যুবক।যুবকের পুরো শরীর ক্ষত-বিক্ষত।চোখের চারপাশে কালো রক্তাক্ত জখম।উদোম বুক জুড়ে ছোপ ছোপ রক্ত ও নীলচে আঘাতের দাগ।
যেন কেউ তাকে লাল রঙের নিষ্ঠুর হোলি খেলায় অংশ নিতে বাধ্য করেছে।যুবকের প্রশস্ত, পেশীবহুল বাহুগুলো পিছনে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে।পরনে শুধু কালো জিন্স। পা দুটো খালি।সেই পায়ের তলায় জমাট বাঁধা রক্ত।যেনো পা জোড়াতে কোনো হিংস্র হৃদয় হীন মানব মনের খায়েশ মিটিয়ে পিটিয়েছে।
যুবকের আর্মি কাটিংয়ের ছোট চুল বেয়ে রক্ত তীব্র ধারায় গড়িয়ে পড়ছে ভেজা সাদা নোংরা মেঝেতে।
ধীরে ধীরে বৃষ্টির প্রচণ্ডতা বাড়তেই ফাটল ধরা ছাদ বেয়ে ঠান্ডা পানি ঝরতে লাগল তার ওপর।
রক্তের সাথে মিশে সেই পানি গড়িয়ে পড়ছে দড়ির নিচ দিয়ে।যুবকের শরীর নিংড়ে সেই জল আর রঞ্জিত ধারা মিলেমিশে মেঝেতে তৈরি করছে লোহিত স্রোত।
বরফ সম ঠাণ্ডা বৃষ্টির জলের স্পর্শ তরতাজা ক্ষতের ওপর পড়তেই গলার সমস্ত শক্তি খাটিয়ে চিৎকার করে উঠল যুবক।
সেই চিৎকারের প্রতিধ্বনি যেন অরণ্য জুড়ে বজ্রপাতের মতো বিকট শব্দ তুললো।মনে হলো প্রকৃতির বিপক্ষে হুংকার তুলেছে যুবক।নিষ্ঠুর প্রকৃতি বুঝলো বোধ করি তা।নিমিষের ব্যবধানে প্রকৃতি থমকে গেল।
বর্ষণ ধীরে ধীরে স্তব্ধ হলো সেই সাথে নিশ্চুপ হলো এলোমেলো শক্তিশালী সমীরণ।মানুষটির ব্যথা উপেক্ষা করে প্রকৃতি আর কষ্ট উগলাতে পারলো না।
সব কিছু যখন নিশ্চুপ, স্তব্ধ, নির্ভার ঠিক সেই সময় ভেজা মাটিতে ছপছপ শব্দ তুলে এগিয়ে এলো এক আগন্তুক।
বিদ্যুত চমকের নীল আলোয় আগন্তুকের মুখোশধারী চোখজোড়া দেখা গেল।চোখ জোড়া কেমন নিষ্ঠুর, নির্দয়, কুটিল।
আগন্তুকের মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাক।চুল পর্যন্ত রেইনকোটের ভেতর লুকানো।শুধু অন্ধকার নিশীথে তার আগমন স্পষ্ট।আগন্তুক দাম্ভিক ভয়ানক পদচ্ছাপে ঝুলন্ত দেহের কাছে এগিয়ে এলো। এসে বীভৎস হাসি দিল।
তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে যুবকের রক্ত মাখা থুতনি শক্ত করে চেপে ধরে মাথা কাত করে প্রশ্ন করল—
“কেমন লাগছে মেজর রণ?নিশ্চয় ভালো তাই না?জামাই আদর বেশ করে করেছে আমার লোকেরা।তোমাকে এভাবে দেখে বড্ড আনন্দ হচ্ছে।কোথায় গেলো তোমার সিংহের ন্যয় তর্জন গর্জন?এতো দ্রুত ধরাশায়ী হলে?
চোয়ালের অসহনীয় ব্যথায় আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো আর্মি ইন্টেলিজেন্স কমান্ডো ইউনিটের আন্ডারকভার অফিসার মেজর ইবতেহান রণ।
রণ’র করুন আর্তনাদ শুনে কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো আগন্তুক।শূন্য কক্ষের বদ্ধ দেয়ালে হাসির ধ্বনী প্রতিধ্বনিত হলো।কি বিশ্রি সেই হাসি।এরপর রণ’র সামনের চুল গুলো মুঠ পাকিয়ে ধরে দাঁত চেপে চেপে বলে উঠলো
“বর্ডারে বেশ উপদ্রব করেছিস তুই সালা।ভেবেছিলাম তোকে হাতে পেতে বেশ সময় লাগবে আমার।কিন্তু এতো দ্রুত তোকে হাতের মুঠোয় পাবো এটা ভাবতে পারিনি।খেলাটা ঠিক জমলো না।বুঝলি?তোর সাথে আমি লম্বা সময় নিয়ে চোর পুলিশ খেলতে চেয়েছিলাম।বাট তোর বোকামি সব বানচাল করলো শুয়োরের বাচ্চা।
কথা গুলো শেষ করে আগন্তুক নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নির্মমভাবে মেজরের বুকে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল।
প্রতিটি আঘাতে রণের ভারী শরীরটা পেন্ডুলামের মতো দুলে উঠল।
শব্দ করে আর্তনাদ করার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললো রণ।তার নাক মুখ দিয়ে লোহিত ধারা গড়াচ্ছে।এই বুঝি মৃত্যু এসে আলিঙ্গন করে তাকে।
মেজরের নিশ্চুপ অবস্থান সহ্য হলো না মানুষটির।সে গলা বাড়িয়ে পাশে থাকা সঙ্গিদের নির্দেশ করলো
“এই দড়ি কেটে দে।অনেক দোল খেয়েছে।এবার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন।
আদেশ পাওয়া মাত্র হাতের ধারালো ছুড়ি দিয়ে এক পোচে দড়ি কেটে ফেললো উপস্থিত এক নির্দয় লোক।মুহূর্তেই সশব্দে মাটিতে পরে গেল রণ।মাথাটা ফেটে গেলো শক্ত মেঝেতে বাড়ি খেয়ে।দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো।চোখ খোলে রাখা দায়।জ্ঞান খোয়ানোর আগে ভাঙা গলায় রণ বহু কষ্টে বলে উঠলো
“আমি একা মরবো না।তোরাও মরবি।আমি সমস্ত ইনফরমেশন আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি হেড অফিসে।আর আমার ধরা পড়াটা জাস্ট অ্যা ট্র্যাপ।ইটস কল্ড হানি ট্র্যাপ।
বলেই রক্তাক্ত দাঁত বের করে হা হা করে হেসে উঠলো সে।
তার হাসি শেষ হতেই চারপাশ থেকে ভেসে এলো মিলিটারি বুটের শব্দ।ফরেস্ট হাউজ ঘিরে ফেললো আর্মি বহর।স্নাইপার শট এ বিদ্ধ করা হলো উপস্থিত দুই হিট ম্যান কে।এহেন বেকায়দা অবস্থায় ঘাবড়ে গেলো আগন্তুক।কোনো কিছু বুঝে উঠবার আগেই দুজন কমান্ডো বন্দুক হাতে এগিয়ে এসে আগন্তুকের কপাল বরাবর তাক করলো।এরপর আগত মেজরের উদ্দেশ্যে ব্লুটুথ ডিভাইস এ বলে উঠলো
“target secured sir…
বাইরে থেকে মেজর দূর্জয় মাহমুদ বন্দুক হাতে দৌড়ে এসে ভারী গলায় বলে উঠলো
“মিলিটারি কমান্ড,ডোন্ট মুভ।ইউ আর কামিং উইথ আস।
শক্ত হ্যান্ডকাফে আটক করা হলো আগন্তুক কে।তাকে গাড়িতে তুলে মিলিটারি সেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে দূর্জয় দৌড়ে গেলো রণ’র পানে।এরপর সোলজার দের উত্তেজিত গলায় আদেশ করলো
“মেজর রণকে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নেবার ব্যবস্থা করুন।ফাস্ট।
চারিদিকে ফজরের আজান পড়ছে।এমন সময় ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে বসলেন রেহনুমা বেগম ।এরপর হাউমাউ করে কেঁদে নিজের ছোট ছেলের নাম ধরে ডেকে উঠলেন।রেহনুমার স্বামী আদনান মির্জা লাফিয়ে বসে স্ত্রীর হাত চেপে আতঙ্কিত হয়ে শুধালেন
“কি হয়েছে রেহনুমা?খারাপ স্বপ্ন দেখেছো?
কান্নার গতি বাড়িয়ে রেহনুমা বলে উঠলো
“ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে রণ’র বাবা।আমি আমার ছেলের চিৎকার শুনেছি।আমার ছেলে ভালো নেই।
স্ত্রীর কথায় আঁতকে উঠলেন ভদ্রলোক।এরপর ফোন হাতে নিয়ে ঝটপট ডায়াল করলেন রণ’র নম্বর।ফোন সুইচড অফ।সংযোগ করা গেলো না।অবশ্য এ নতুন কিছু নয়।ছেলে স্বেচ্ছায় যোগাযোগ না করলে তারা কখনোই ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না।রণ’র সমস্ত ইনফরমেশন সিকিউর্ড।চাইলেই তার সাথে দেখা বা কথা বলা কিচ্ছুটি করা যায় না।বছরে এক দু’বার ছুটিতে এলে তখনই তার দেখা পাওয়া যায়।এবার প্রায় সাত মাস হয়ে গেছে ছেলে বাড়িতে আসেনি।মাস দুয়েক আগে একবার ফোনে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো।তাও তিন মিনিটের জন্য।রেহনুমাই ছেলের সাথে কথা বলেছিলো সেই তিন মিনিট।আদরের ছোট ছেলে কিনা!প্রতিবার রেহনুমার একটাই প্রশ্ন থাকে ছেলের প্রতি
“তুই বেঁচে ফিরবি তো মায়ের কোলে বাবা?
হাতের ফোনটা আলগোছে বালিশের তলায় রেখে আদনান মির্জা স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে বলে উঠলেন
“তোমার ছেলের কিছুই হয়নি রেহনুমা।ও ভালো আছে।ওর সঙ্গে আমাদের দোয়া আছে।দেশের মানুষের জন্য ও কাজ করে।ওর কিচ্ছু হতে পারে না।তুমি শান্ত হও।দেখবে কয়েকদিন বাদেই ও বাড়ি ফিরে আসবে।যাও নামাজ পড়ে ছেলের জন্য দোয়া করো।
স্বামীর শান্তনায় থামলেন রেহনুমা।এরপর ধীর গলায় স্বামীর প্রতি অভিযোগ জানিয়ে বলে উঠলেন
“তুমি ওকে মিলিটারি হবার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলে তাই না?তোমার জন্য ছেলেটা আজ আমার ঘর ছাড়া,পরিবার ছাড়া।আমার বুক খালি শুধুমাত্র তোমার জন্য।তোমাকে আমি কখনোই ক্ষমা করবো না রণ’র বাবা।
অভিযোগ শেষ করে বিছানা ত্যাগ করলেন রেহনুমা।এরপর ফ্রেস হয়ে ওযু করে বসে গেলেন জায়নামাজে।
স্ত্রীর অভিযোগে স্তব্ধ বসে রইলেন আদনান মির্জা।সন্তানের চিন্তায় তার হৃদয় তোলপাড় হলো।ভদ্রলোক নিজেকে নিজেই শুধালেন
“আদৌ বেঁচে আছে তো ছেলেটা?
পূব আকাশে ভোরের আলো না ফুটতেই বিছানা ছাড়লো মির্জা বাড়ির একমাত্র কনিষ্ঠা মৌন।ভালো নাম মৌনতা সাবেরি।মির্জা বাড়ির প্রাণ সে।সেই সাথে সকলের চোখের মণি।পড়াশোনায় একদম ঘিলুহীন।ইতোমধ্যে দু’দুবার ম্যাট্রিক ফেইল করা হয়ে গেছে তার।এতে অবশ্য তার কোন দুঃখ নেই।তার মতে পড়াশোনা সকলের জন্য নয়।মেয়েটা বড্ড ঢ়িন্ঙি আর চঞ্চল।পাড়ার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে তার সখ্যতা।এর গাছের আম, ওর গাছের জাম চুরি করে পেড়ে খাওয়াই তার প্রধান কাজ।এতেও ক্ষান্ত নয় এই মৌনতা সাবেরি।মানুষের উঠতি গাছপালা ভাঙার মাঝে তার পৈশাচিক আনন্দ।মির্জা দেওয়ান সাহেবের ভয়ে কেউ বিচার পর্যন্ত নিয়ে আসার সাহস পায় না।কারন নাতনির কোনো দোষ তার চোখে পড়েনা।কিন্তু গ্রামের সমস্ত অপকর্মের পিছনে তার নাতনীরই হাত।
কাঁথা মুড়ি দিয়ে হাই তুলতে তুলতে দাঁড়ালো মৌন।সারা রাত বেশ জোরে বৃষ্টি হয়েছে।উঠানের আম গাছ গুলো থেকে নিশ্চিত বড় বড় আম গুলো পড়েছে।কাঁচা আম লবন মরিচের গুঁড়ো দিয়ে চিবিয়ে খেতে ভীষন মজা।কাজের মেয়ে চামেলির হাতটা বড্ড লম্বা।সকলের আগে ঘুম থেকে উঠে গেলে সেই সব কুড়িয়ে নেবে।না না এ কিছুতেই হতে দেয়া যায় না।চামেলির আগে উঠে সব আম নিজের ঘরে আনা চাই।
যেই কক্ষের দরজা খোলে বাইরে বেরুতে চাইলো মৌন অমনি তার মা শায়লা বেগম এসে দরজার সামনে দাঁড়ালেন।এরপর বিস্ময়ে অবাক হয়ে বললেন
“সূর্য আজ কোন দিক দিয়ে উঠতে চলেছে?এতো আচানক দৃশ্য রে মৌন।চোখে কি ভুল দেখছি নাকি?
মৌনতা চমকে চোখ বড় করে দাঁড়িয়ে রইলো তার অগ্নিমূর্তি ধারন করা মায়ের হঠাৎ আগমনে।কিন্তু শায়লা নাছোড়বান্দা।সে দাঁত মুখ কামড়ে বলে উঠলো
“আম পড়েছে কিনা?আম কেউ নিয়ে গেলো কি না ?তার জন্য তোর ঘুম হচ্ছে না।এদিকে পরীক্ষায় দুবার ফেইল মেরে তোর ঘুম কি করে হয় হারামজাদী?
বলেই মেয়ের চুল চেপে ধরে বসালেন দু তিন ঘা।এরপর গাল টেনে বলে উঠলেন
“এবারই শেষ বার।যদি ফেইল করেছিস না?কাজের ছেলে আক্কাস এর সাথে তোর বিয়ে দেবো।তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল।কেমন গন্ধ আক্কাসের শরীরে জানিস তো নাকি?
বলেই ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দরজা বাইরে থেকে আটকে গজগজ করতে করতে রান্না ঘরে পা বাড়ালেন শায়লা বেগম।তিনি পেটে আরো দুটো ছেলে ধরেছেন।তারা ভালো রেজাল্ট করে চাকরি করছে শহরে।এই গন্ড মূর্খ বোকা মেয়েটা তার মতো চতুর মেয়ে লোকের পেট থেকে কি করে পয়দা হলো তিনি খোঁজে পেলেন না।মনে আশা করেছিলেন ছেলে দুটোর মতো মেয়েটাকে নিয়েও ভাবি মহলে বুক উঁচু করে হাঁটবেন।কিন্তু মেয়ের কাণ্ডে বুক উঁচু তো দূর মুখ লুকিয়ে ও সমাজে চলা যাচ্ছে না।মেয়ে পুরো বংশের মুখে একদম খাবলা খাবলা গোবর লেপে দিয়েছে।
রান্না ঘরে আজ রেহনুমা এলেন না।নামাজ শেষে তিনি কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাজেই ঘুমিয়ে গেলেন।বড় জার রান্না ঘরে না আসার হেতু বুঝতে পেরে একাই চুলা ধরালেন শায়লা।এরপর চামেলির সহায়তা নিয়ে একে একে বানাতে লাগলেন যার যার পছন্দ সই নাস্তা।
সকাল আটটার পর খোলা হলো মৌনতার কক্ষের দরজা।টেবিলে বইয়ের উপর মুখ গুজে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে মেয়েটা।শায়লার রাগ সপ্তম আকাশ স্পর্শ করলো।কিন্তু এবার আর মেয়েকে মারলেন না।শুধু হুংকার ছেড়ে ডেকে বলে উঠলেন
“মুখ হাত ধুয়ে নাস্তা সেরে বাইরের দুনিয়া চেয়ে দেখুন মহারাণী।পুরো পৃথিবী অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে এপর্যন্ত।শুধু আপনিই অপদার্থের ন্যয় লেটে রয়েছেন।
এক সপ্তাহ পর হসপিটাল থেকে রিলিজ করা হলো মেজর রণ’কে।তার দুটো হাতই কঠিন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মচকে গেছে।দু হাতেই স্লিং লাগানো।তার সার্বক্ষণিক দেখা শোনার জন্য নিয়োজিত আছে স্পেশাল আর্মি সোলজার পার্সন।মুখ দিয়ে শব্দ বের করার আগেই সামনে হাজির সব কিছু।
নিজ বেডে বসে রেস্ট করছে রণ।এমন সময় সেখানে এলো দূর্জয়।একটা আপেল নিয়ে রণ’র মুখের সামনে এগিয়ে বলে উঠলো
“চক্র টার পরিচয় পাওয়া গেছে।ভাড়াটে কিলার দের ঝঞ্ঝাট হীন বর্ডার পাড় করে দেয়াই এদের মূল লক্ষ্য।বাহারুল লোকটা মুখ খুলেছে।আপাতত জেলে আছে।কোর্টের রায় এখনো হয়নি।তবে বেশ কঠিন সাজা হবে।তোকে খুন করতে চেয়েছিলো এটা আমি রিপোর্ট করে দিয়েছি তোর কন্ডিশন সহ।
দুর্জয়ের মুখে বাহারুল সম্পর্কে কথা গুলো শুনে নিশ্চুপ আপেল চিবুতে লাগলো রণ।তার মনে হচ্ছে বাহারুল নাম মাত্র গুটি এখানে।এর পিছনে আরো ক্ষমতাধর কারোর হাত রয়েছে।যিনি বাহারুল কে সামনে এনে নিজে অন্তর্ধানে থাকতে চাইছে।
রণ কে নিশ্চুপ দেখে দূর্জয় শুধালো
“কথা বলছিস না যে?
রণ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে উঠলো
“আমার হাত ঠিক হবে কবে?
“আরো দিন পনেরো পরে।
“আমি বাড়ি যেতে চাই।ছুটির এপ্লাই কর।
“কত দিন?
“মাস পাঁচেক।
“ইন্টেলিজেন্স কমান্ডোর ছুটি এতো লম্বা হয়না ভণ্ডু।মিশন শেষ করার সুবাদে রিকভারি লিভ হিসেবে তুমি সর্বোচ্চ এক মাসের ছুটি কাটাতে পারবে।
“এতগুলো মার খেলাম তার জন্য সরকারের কোন দায় নেই আমার উপর?
“এতগুলো টাকা যে পকেটে ভরবে তার বেলায় ?
আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে উঠে দাঁড়ালো রণ।আয়নায় নিজেকে একটু পরখ করলো।চোখে মুখে হাজারো কাঁটা কাটি দাগ।ঠোঁটের কোণেও গভীর জখম।শ্যাম বর্ণের মুখটা আরেকটু কালচে লাগছে।শরীর পুড়ে তামাটে রঙ ধারণ করেছে।শক্ত চোয়ালটা আজ দুর্বল ।চোখে কোনো হিংস্রতা নেই।বাদামি ঠোঁট দুটো বড্ড শুষ্ক।বাঁকা ভ্রু জোড়ার সমস্ত সৌন্দর্য বিলীন হয়েছে।তীক্ষ্ণ নাকটা ব্যান্ডেজে ঢাকা।বাহারুল ঘুসি মেরে চ্যাপ্টা করে দিয়েছে।নিজের চেহারার এহেন দুর্দশা দেখে আয়না থেকে সরে দাঁড়ালো রণ।এরপর ড্রয়ার থেকে নিজের বাটন ফোনটা বের করে সুইচড অন করলো। ডায়াল করলো রেহনুমার নম্বরে।
ফোন কেটে যাবে এমন মুহূর্তে রিসিভ হলো ফোনটা।হ্যালো বলবার আগেই একটা চপল মিহি কন্ঠ ভেসে এলো
“বড় মা ডক্টরের কাছে গিয়েছে।ফোনটা বাড়িতে রেখে গিয়েছে।আপনি ডিম ওয়ালা আংকেল?ডিমের টাকা বড় আব্বুর দোকান থেকে নিতে বলেছে আপনাকে।এ মাসে বড় আম্মু আর হাঁসের ডিম নেবেন না।বুঝেছেন?
এক দমে কথাগুলো বলে থামলো মৌনতা।এরপর পুনরায় বললো
“শুনতে পাচ্ছেন?কথা বলছেন না কেনো আংকেল?
রণ নিশ্চুপ থেকে ঠোঁট কামড়ে ধরলো।এরপর রাশ ভারী গলায় বললো
“কেউ ফোন করলে আগে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতে হয় বোকা চৌধুরী।এরপর কথা বলতে হয়।আমি তোর ডিম ওয়ালা আংকেল নই।আমি রণ।
রণ’র নাম শুনে শক্ত হয়ে চোখ বড় করে দাঁড়িয়ে রইলো মৌন।ভয়ে তার গলা শুকিয়ে উঠছে।বাকি প্রশ্ন কি কি করতে হবে সব গুলিয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে লাগলো।এরপর চট করে বলে উঠলো
“বড় মা এলে ফোন করতে বলবো।রাখছি কেমন?
বলেই লাইন কেটে দিতে উদ্যত হলো মৌন।এপাশ থেকে ঠান্ডা হুমকি ছুঁড়লো রণ
“লাইন কাটলে তোকেও কেঁটে দুভাগ করে ফেলবো মৌন।আমার কাছে এখনো চার মিনিট বাইশ সেকেন্ড সময় আছে।বাকি মিনিটস গুলো তুই কথা বলবি আমার সাথে।যদি মিনিটস গুলো ওয়েস্ট হয়।বাসায় ফিরে জাস্ট আছড়ে মেরে ফেলবো ।গট ইট?
চলবে
সূচনা_পর্ব
ভালোবাসার_সমরাঙ্গন
সারিকা_হোসাইন
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩১