প্রেমবসন্ত_২ ।৩০।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
কায়নাত লজ্জায় লাল টমেটোর মতো আঁকার ধারণ করল।লাগাম ছাড়া এমন একটা কথা অর্ণ কী করে বলতে পারল?শরীর শিরশির করছে তার অর্ণর স্পর্শ পেয়ে।এবার আরও একটা আশ্চর্যজনক কান্ড ঘটিয়ে বসল অর্ণ।কায়নাতের কানের লতিতে ঠোঁট স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলল,
“আমার কিন্তু দশটা বাচ্চাই চাই।”
শরীর সহ জমে এলো এবার।কী লজ্জা!কী লজ্জা!
যে লোকটার গাম্ভীর্য দেখে এসেছে এতদিন,আজ সেই লোক তাকে নিজের বাহুর মধ্যে আবদ্ধ করে এহেন ধরনের লাগাম ছাড়া কথা বলছে।অর্ণকে বড্ড নির্লজ্জ স্বামী বলে মনে হলো কায়নাতের।কথা হলো না আর দুজনের মধ্যে।আঁধার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে তাদের চোখের ঘুমও গভীর হলো।আদৌ কি দুজনের ঘুম গভীর হয়েছে নাকি শুধু সপ্তদশীর?অর্ণ চৌধুরী তখন বিছানায় আধ-শোয়া হয়ে শুয়ে আছে চুপচাপ।দেহের সাথে লেপ্টে তার তার বউ।বাচ্চা বউ!অর্ণর চোখে আজ ঘুম নেই এক ফোঁটা।কায়নাতকে বিয়ে করার পর প্রত্যেক রাত প্রায় এভাবেই কেটেছে।সেই ছোট্ট কিশোরীর প্রথম লাজুক দৃষ্টি,খিলখিলিয়ে হাসা,ছোট্ট গায়ে গাঢ় বেগুনি রঙের শাড়ি,অঙ্গ ভর্তি গয়না।বড্ড লোভ জেগেছিল একটাবার নিজের চোখের সামনে বসিয়ে রেখে পলকহীন দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকতে।লোভ জেগেছিল বুকের পাঁজরে ঠাঁই দিতে।কিন্তু আদৌ কি এসব সম্ভব ছিল?কায়নাত বয়সে তার থেকে অনেক ছোট।হাঁটু সমান একটা মেয়েকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মেনে নেয়া যে বড্ড কষ্টকর ছিল তার জন্য।তখন সে তাগড়া এক যুবক।দশ বছরের বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরের বধূ বলে মেনে নেয়া অসম্ভব ছিল সেই সময়টাতে।অথচ আজ এতগুলো বছর পরও সেই কিশোরী তার স্ত্রী।তার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে রয়ে গেছে তারই পাঁজরে।
অর্ণ ঠোঁট চেপে তাকাল কায়নাতের ঘুমন্ত মুখের দিকে।মুখের সামনে চলে আসা চুল গুলো খুব যত্ন করে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে।একদম বাচ্চা একটা মেয়ে।এই মেয়েটাই তার বিয়ে করা বউ,ভাবা যায়?
অর্ণ দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখল। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারে নুয়ে পড়ছে। ঘুমন্ত কায়নাতের মুখটা চাঁদের আলোয় আরও কোমল লাগছে। নিষ্পাপ। অচেনা এক শান্তি আর অস্বস্তির মিশেল।
এই মুখটার সাথে তার জীবনের কতটা জড়িয়ে গেছে, সেটা ভাবলেই কেমন অস্বস্তি হয় তার। সময় যেন ওদের দুজনকে একসাথে বেঁধে ফেলেছে—ইচ্ছের চেয়ে দায় দিয়ে, ভালোবাসার চেয়ে অভ্যাস দিয়ে।
অর্ণ জানে, এই সম্পর্কের শুরুটা কোনো গল্পের মতো ছিল না। ছিল পরিবারের সিদ্ধান্ত,আর নিজের না-বলা প্রতিবাদ। সে কখনও চায়নি এত ছোট একটা মেয়ের কাঁধে সংসারের ভার তুলে দিতে। চায়নি নিজের নামের পাশে এমন এক দায় জুড়ে দিতে, যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারেনি তখন।
কিন্তু সময় কাউকে অপেক্ষা করতে শেখায় না। সময় শুধু চালিয়ে নিয়ে যায়।
কায়নাত ধীরে ঘুমের ঘোরে নড়ল। অর্ণ একটুও নড়ল না। যেন তার সামান্য নড়াচড়াতেই ভেঙে যাবে এই নীরবতা। এই নীরবতাই আজ তার একমাত্র আশ্রয়। এখানে সে প্রশ্ন করতে পারে, নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে।
সে কী কখনও সত্যিই স্বামী হতে পেরেছে?
নাকি শুধু পাহারাদার হয়ে থেকেছে একটা জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে?
অর্ণ জানে, কায়নাত বড় হয়েছে। হাসতে শিখেছে, কাঁদতে শিখেছে, অভিমান করতে শিখেছে। অথচ সে নিজেই এখন অব্দি বুঝতে পারেনি,আদৌ এই সম্পর্কের সঠিক নাম কী!
চাঁদের আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ধীরে সরে যাচ্ছে। রাত ফুরোচ্ছে। অর্ণ চোখ বন্ধ করল।
ভেতরে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে—ভালোবাসা যদি দায় থেকে জন্ম নেয়,তাহলে সেই ভালোবাসা কি মুক্তি দিতে পারে?নাকি সারাজীবন শুধু প্রশ্ন হয়েই থেকে যায়?
__
চাঁদের আলো টিপটিপ করে সকলের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে চুপিসারে।নিশা আজ জারার সাথে আদিকে নিয়ে শুয়েছিল রাতে।জারার রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাস আছে ছোট থেকেই।আজও অস্থির মন স্থির করতে বই হাতে নিয়েছিল দাদার কাছ থেকে বই এনে।আদি বিছানার মধ্যখানে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে।নিশা বারান্দার সামনে চেয়ারে পা উঠিয়ে বসে আছে চুল খুলে দিয়ে।ঠান্ডা বাতাস তার মুখমণ্ডল ছুঁয়ে যাচ্ছে।জারা আড়চোখে তাকাল তার দিকে।বয়সে নিশা তার থেকে কিছুটা ছোট।চার ভাইয়ের বড্ড আদুরের বোন নুসরাত আর নিশা।জারা তাদের সম্পর্ক জানে।খালাতো দুই বোনকে কোনোদিন বুঝতে দেয়নি তারা তাদের আসল বোন নয়।বরং খুব যত্ন করে বুকে আগলে নিয়ে বড় করেছে তাদের।
নিশা গাল ফুলিয়ে ফোনের দিকে তাকাল।ফের জারার দিকে তাকাতেই চোখা-চোখী হলো তাদের।জারা বই রেখে এগিয়ে এসে তার পাশের চেয়ারে বসল পা উঠিয়ে।হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলল,
“স্বার্থ ভাইকে তুমি খুব ভালোবাসো তাই না?”
নিশা চমকে উঠল জারার কথা শুনে।সে তো কাউকে বলেনি এই কথা।তবু জারা কী করে জেনে গেল?জারা বোধহয় নিশার মনের কথাটা পড়ে ফেলল চট করে।ঠোঁট টিপে বলল,
“সত্যি বলতে কী জানো?স্বার্থ ভাইও কিন্তু তোমায় ভীষণ ভালোবাসে।ভালোবেসে তার ভালোবাসার মানুষটার নাম দিয়েছে “সোনাপাখি”।তার একান্ত নিশু।ভাবছ আমি জানলাম কী করে?”
নিশা ঠোঁট টিপে মাথা নাড়ায়।জারা বলে,
“আমি ভালোবাসার দৃষ্টি বুঝি।এইযে শেহের ভাই নুসরাত আপুকে ভালোবাসে,এটাও কিন্তু আমি জানি।”
নিশা আশ্চর্য হয়ে বলল,
“তুমি দেখি সবার মন পড়তে পারো গো।”
জারা খিলখিল করে হেসে উঠল।তার মনে হলো বাগানে বসে বসে তার দিকে কেউ একজন তাকিয়ে আছে।তবু মনের ভুল মনে করে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“তেমন কিছুই নয়।তোমাদের দেখলে আমার ভালোলাগে।বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বড্ড খারাপ।যার যায় একমাত্র সেই বোঝে সেই দহন।”
“তুমি ভাইয়াকে খুব ভালোবাসতে তাই না?”
“কিজানী!ভালোবাসা ছিল কিনা বলতে পারছি না,তবে খানিক টান তো অবশ্যই ছিল।”
“আফসোস হয়?”
“উহুম!তাকে হারিয়ে ফেলার আফসোস আমার নেই।আফসোস হচ্ছে একটা পরিবার হারিয়ে ফেলার।”
নিশা ধীরে বলল,
“পরিবার হারানোটা কেন এত কষ্টের?”
জারা চোখ নামিয়ে হাঁটুর উপর চিবুক ঠেকাল। চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
“কারণ মানুষ চলে গেলে শূন্যতা থাকে,কিন্তু পরিবার চলে গেলে নিজের একটা পরিচয় ভেঙে যায়।”
নিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুমি খুব শক্ত,জারা আপু।”
জারা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে অভ্যাস।
“এটা তোমার ভুল ধারণা,তবে শক্ত না হলে একা একটা জীবন পাড়ি দেয়া অসম্ভব!জীবন কাউকে জিজ্ঞেস করে না—তুমি প্রস্তুত কিনা।”
নিশা আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদটা আধখানা মেঘে ঢাকা।দৃষ্টি সেদিকে রেখে বলল,
“তাহলে ভালোবাসা?”কথাটা বেরিয়ে গেল অজান্তেই।
জারা নিশার দিকে তাকাল।
“ভালোবাসা টিকে থাকার জিনিস নয়।মানুষ বদলে যায়, সম্পর্ক ভাঙে, তবু ভালোবাসা কোথাও না কোথাও থেকে যায়—নাম বদলে, রূপ বদলে।ভালোবাসা হলো মায়ায় জড়িয়ে থাকা একটা পবিত্র বন্ধন।”
নিশার চোখ ভিজে উঠল। সে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“সব ভালোবাসার শেষ কী কষ্টেই?”
“নাহ!কিছু ভালোবাসার তুলনা করা বোকামি।”
ভেতর থেকে আদির নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।গভীর ঘুম। নিষ্পাপ। নিশা একবার দরজার দিকে তাকাল, তারপর আবার জারার দিকে।
“তুমি এখন কী চাও, আপু?”
জারা একটু ভেবে নিল।
“শান্তি,আর এইটুকু বিশ্বাস।সব ভাঙা জিনিস একদিন না একদিন ঠিক হয়ে যায়। পুরোটা না হোক, অন্তত চলার মতো।”
নিশা মাথা নাড়ল।
“আমি তোমার মতো হতে চাই।”
জারা হেসে ফেলল।
“আমার মতো নয়,নিজের মতো হও। নিজের মতো থাকাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির বিষয়।”
জারার কথা শেষ হতেই হঠাৎ নিশার ফোন বেজে উঠল শব্দ করে।সেই শব্দে ঘুম ভাঙল আদির।কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ছোট বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল সে।নিশা তাড়াতাড়ি বিছানায় গিয়ে বুকে আগলে নিয়ে ফোনের দিকে তাকাল।এত রাতে শেহেরের কল দেখে অবাক হলো একটু।কল রিসিভ করে কানে দিতেই ওপাশ থেকে শেহের বলল,
“ঘুমিয়ে গেছিস?”
নিশা বলল,
“ঘুমাইনি।হঠাৎ এত রাতে কল করলে যে?”
“অফিস থেকে ফিরেছি খানিকক্ষণ আগে।আজ আদির সাথে কথা হয়নি।”
নিশা ঠোঁট কামড়ে ঘুমন্ত আদির দিকে তাকাল।তার নিজেরও বড্ড খারাপ লাগে শেহেরকে দেখলে।বোনের মনটা যে কেন এত শক্ত আল্লাহ জানে!সে ভিডিও কল করে আদির দিকে ব্যাক ক্যামেরা ধরল।শেহের সবে গোসল সেরে এসে ভেজা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছে।নিশা বলল,
“নিশ্চয়ই এখনও খাওনি তাই না?”
শেহের বলল,
“অফিসেই হালকা পাতলা খেয়েছিলাম।আদি খেয়েছে?”
“হ্যা।”
“আর ওর মা?”
“সবাই খেয়েছে।শুনলাম তুমি নাকি কানাডা ব্যাক করতে চাইছ?”
শেহের কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাবে বলল,
“শিওর নই,তবে ভাবছি।”
“বাইরে গিয়ে করবেটা কী?”
“দেশে থেকেই কি করছি?”
“বিয়ে তাহলে করবে না?”
“তোর বোনকে বল।”
নিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।একটা মানুষ কী করে এত ভালোবাসতে পারে?শেহেরকে না দেখলে সে কখনও বুঝতেই পারত না।বুঝতেই পারত না শুদ্ধ পুরুষদের ভালোবাসা কেমন হয়।
নিশা ফোনটা কানে চেপে ধরেই রইল। ওপাশে শেহেরের নিঃশ্বাসের শব্দটা কেমন ক্লান্ত শোনাচ্ছে। দিনের শেষে মানুষের কণ্ঠে যে ক্লান্তি জমে থাকে, সেটা নিশা চেনে। খুব চেনে।নিশা আদির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“দেখ আদি,তোর বাবা কল করেছে।”
প্রথম বার না উঠলেও দ্বিতীয়বার আদির চোখ খুলল।পিটপিট করে তাকাতেই নিশা মুখের সামনে ফোন ধরল।আদি ফোনে শেহেরকে দেখেই কেঁদে উঠল শব্দ করে।শেহের হতভম্ব হয়ে বলল,
“হলো কী ওর?”
নিশা কিছু বলার আগেই আদি নিশার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে শেহেরকে বলল,
“মা আমায় মেরেছে।মা একটুও ভালোবাসে না।তুমি এসে আমায় নিয়ে যাও।”
শেহের গম্ভীর হয়ে নিশাকে জিজ্ঞেস করল নুসরাত কেন মেরেছে!নিশা সব খুলে বলার পর শেহের খানিকক্ষণ কথা বলে কল কেটে দিল।আজ সারাটাদিন আদির মন ভার।মায়ের হাতে মার খেয়ে তার মন খারাপ হয়েছে।
__
শীত আর গ্রীষ্মের মাঝামাঝি ভোরটা গ্রামের বুকে নামে খুব নিঃশব্দে। না কনকনে ঠান্ডা, না তপ্ত গরম।হালকা এক অনিশ্চিত আবহাওয়া চারপাশ জুড়ে থাকে। ভোরের বাতাসে এখনও শীতের শেষ নিশ্বাস লেগে আছে, আবার গ্রীষ্মের আগমনী বার্তাও টের পাওয়া যায় মাটির সুভাসে।
খেতের ধারে শিশির ভেজা ঘাসগুলো তখনও ঝিলমিল করছিল। ধানের পাতায় জমে থাকা জলবিন্দু ভোরের আলোয় কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে।
মেঠোপথে দু-একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে। হাঁটার তালে ধুলো ওঠে না, মাটিটা তখনও স্যাঁতসেঁতে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যটা উঁকি দিতে চায়, পুরোটা উঠে আসতে সময় নেয়।ভোরটা যেন ইচ্ছে করেই দীর্ঘ হয়।রেখা বেগম মাথায় আঁচল চেপে বড় বাগান ঝাড়ু দিচ্ছেন এই সময়ে।বহু বছর আগে আজগর চৌধুরী বড় ছেলের বউ করে নিয়ে এসেছিলেন এই বাড়ি।দিন গুলো মধুর মতো মিষ্টি ছিল।নতুন বউ হলেও সেই সময় থেকেই পুরো বাড়ির দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি মুরগির খোঁপ খুলে দিয়ে চাল ছিটিয়ে দিলেন।ফারিহা সদর দরজা দিয়ে বের হলো হাতে তাজবীহ নিয়ে।শাশুড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই খানিক অবাক হলো সে।জিজ্ঞেস করল,
“আম্মা,আপনি রাতে ঘুমাননি?”
রেখা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
“ঘুমিয়েছিলাম।তবে বেশ রাত করে শুয়েছি।”
“কেন?”
“জয়ার জন্য একটা জামা সেলাই করেছি কাল।সেই বিয়ের অনেক আগে একটা জামা বানিয়েছিলাম।ওটা নাকি ওর ভীষণ ভালো লেগেছে।”
“তাই বলে ঘুম নষ্ট করে এসব করবেন?”
“বোকা মেয়ে!আমায় নিয়ে না ভেবে এখন নিজের কথা ভাবো।শোনো,যা খেতে ইচ্ছে করে সব আমায় বলবে।”
ফারিহা হেসে মাথা নাড়ল।এমন সময় বাড়ি থেকে বের হলো জয়া।কোমর সমান ভেজা চুল ছেড়ে দিয়ে হেলে-দুলে তাদের নিকটে এগিয়ে এলো।রেখা বেগম জয়ার হাল দেখে কিছু বললেন না।কাজের কথা বলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন।ফারিহা কপাল কুঁচকে জয়াকে নিয়ে বাগানে যেতে যেতে বলল,
“নতুন বউয়ের মুখে লাজ নেই কেন?”
জয়া চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“লাজ দিয়ে কী হবে গো?”
“খুশির সংবাদ কবে শুনছি?”
“কীসের খুশি?”
ফারিহা জয়ার কানে কানে কিছু একটা বলতেই জয়া নাক ছিঁটকে বলল,
“তোমাদের সাথে কথা বলাই বেকার।যা-তা!”
“আচ্ছা হয়েছে।তোমার কলেজের কী অবস্থা?পড়াশোনা করার ইচ্ছে নেই বুঝি?”
“তা আছে।আপাতত বাড়ি খালি হোক,তারপর থেকে কলেজে যাব।”
“বেশ।”
বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ির প্রাণ উজ্জ্বল হলো।কাজের ব্যস্ততায় ব্যস্ত হলো সকলে।দুপুরে হুজুররা আসবেন।আজগর চৌধুরী এতিম খানায় খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।
প্রেম দুই ভাইয়ের সাথে নাস্তা খেতে বসেছে।কায়নাত তাদের খাবার বেড়ে দিচ্ছিল।অর্ণ বসেছে আদির সাথে।আদি আজও মন খারাপ করে বসে বসে জুস খাচ্ছে।আজ কায়নাত হাঁসের মাংস রান্না করেছিল ঝাল ঝাল করে।অর্ণ ঝাল খেতে না পেরে বারে বারে টিস্যু দিয়ে নাক মুছছে।প্রেম আবার ঝাল খেতে পারে ভালো।প্রেম খাবার শেষ করে আবার ভাত নিবে বলে ভাবল।হঠাৎ কায়নাতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি খুব ভালো রান্না করেন ভাবি।ইচ্ছে করছে সারাদিন ভরে খাই।”
কায়নাত খুশি হয়ে প্রেমের প্লেটে ভাত বেড়ে দিয়ে বলল,
“আপনার যা খেতে ইচ্ছে করবে আমায় বলবেন।আমি পারলে রান্না করে খাওয়াব।”
“আপনার হাতে জাদু আছে জাদু।”
কায়নাত প্রসংসায় ফুলে উঠল নিমিষেই।প্রেম মুচকি হেসে অর্ণর দিকে তাকাতেই হাস্যজ্বল মুখখানা চুপসে গেল।থমথমে মুখে হাসার চেষ্টা করেও আর হাসি বের করতে পারল না ঠোঁটে।শুষ্ক ঢোক গিলে খাওয়ায় মনোযোগী হলে কায়নাত অর্ণকে বলল,
“আপনি খাচ্ছেন না কেন?খাবার ভালো হয়নি?”
অর্ণ চোখ কটমট করে নাক টেনে বলল,
“আমি এত ঝাল খাই?”
বলতে বলতে কায়নাতের শাড়ির আঁচল টেনে নাক মুছে বলল,
“গরুর মতো শুধু মরিচ দিয়েছ এখানে?বেয়াদব মহিলা, এত ঝাল কে খায়?”
কায়নাত তাড়াতাড়ি পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার খেয়াল ছিল না।আপনি বরং অন্য তরকারি দিয়ে খান।”
অর্ণ মুখ কুঁচকে কায়নাতের রান্না করা তরকারি দিয়েই খাবার শেষ করল।বুক জ্বলছে তার।চোখ মুখ লাল হয়ে এসেছে ঝালে।রান্নাঘরে তখন কেউ নেই।বাগানে গেছেন বাড়ির অর্ধেক মানুষ।বাইরে বেসিনের পানির লাইন বন্ধ করেছে হাসান।সেখানে একটু সমস্যা হয়েছে।কায়নাত বলল রান্নাঘরে হ্যান্ডওয়াশ রাখা হয়েছে।সে প্রেমকে বলল হাত দিয়ে খাবার নিতে।তারপর পিছু ছুটল অর্ণর।অর্ণ রান্না ঘরে এসে হাত ধুইয়ে খানিকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।কায়নাত ভীতু হয়ে বলল,
“বেশি ঝাল হয়েছে?বুকে বেশি ব্যথা করছে?”
অর্ণ কপাল কুঁচকে কায়নাতের ভীতু আনন দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“can you give me some sweets?”
কায়নাত ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে ফ্রিজ খুলে সেখান থেকে মিষ্টি বের করে একটা ছোট বাটিতে অর্ণর জন্য মিষ্টি বের করল।অর্ণ চোখ ছোট ছোট করে তার কান্ড দেখতে ব্যস্ত।
কায়নাত মিষ্টির বাটিটা দুহাতে এগিয়ে দিতেই অর্ণ মুখটা কুঁচকে নিল। বাটিটা হাতে নিয়ে পাশের তাকের উপর রেখে দিল অনাগ্রহে।
কায়নাত কিছু বলার আগেই আচমকা অর্ণ কাছে টেনে নিল তাকে। কোমরে আলতো কিন্তু দৃঢ় এক বন্ধন। মুহূর্তের মধ্যে দূরত্বটা মিলিয়ে গেল।
কায়নাত চমকে উঠল। চোখ তুলে তাকানোর সুযোগও পেল না। অর্ণ খুব কাছে এসে দাঁড়াল—এতটাই কাছে যে নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পাওয়া যাচ্ছিল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার ভঙ্গিতে, আছে অদ্ভুত এক নীরব অধিকারবোধ।
ঠোঁটের কাছাকাছি এসে অর্ণ থেমে গেল এক সেকেন্ড।হুট করেই দানবের মতো অধর চাপল অধরে।
কায়নাতের বুক ধক করে উঠল। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতে গেলেও সেই সুযোগ হলো না। হাত দুটো অনিশ্চিতভাবে অর্ণর বুকের কাছে এসে থেমে গেল—সরাবে, না ধরে রাখবে, বুঝে উঠতে পারল না।কিছু সময় পর অর্ণ সরে এলো এক পা।ভেজা অধর মুছে মিষ্টির বাটি হাতে নিয়ে কায়নাতের হতভম্ব,বিস্ময়ে ভরা মুখখানা দেখে একটু মিষ্টি মুখে নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।কায়নাত এতোক্ষণ দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল।অর্ণ প্রস্থান করতেই লম্বা শ্বাস টেনে আঁচল টেনে মুখ ঢাকল লজ্জায়।কী হলো খানিকক্ষণ আগে?
কায়নাত বেশ কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। রান্নাঘরের চেনা জায়গাটা হঠাৎ অচেনা মনে হতে লাগল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে, যেন শব্দ হলেই কেউ শুনে ফেলবে। আঁচলটা আরও শক্ত করে টেনে নিল মুখের উপর। লজ্জায় কান পর্যন্ত জ্বলে উঠেছে।কায়নাত বুঝতে পারছে, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি রয়ে গেছে।তাকে ঘিরে ধরেছে একরাশ অপ্রস্তুত লজ্জা।
নিজের হাতের দিকে তাকাল সে। হাত দুটো কেমন অচেনা লাগছে। এই হাতেই তো প্রতিদিন সংসারের কাজ, রান্না, সেবা সব করে। অথচ একটু আগেই এই হাত দুটো কী করবে, কী করবে না সেটা ঠিক করতে পারেনি সে।চুলের গোছাটা ঠিক করতে গিয়ে আঙুল কেঁপে উঠল।
ঠোঁটে লেগে থাকা হালকা লিপস্টিক লেপ্টে গেছে ঠোঁটের ছোঁয়ায়।সে আঁচল টেনে ঠোঁটের কাছে এনেও মুছল না।মুছে ফেললে তো অর্ণর স্পর্শও মুছে ফেলা হবে।তার প্রথম ঠোঁটের ছোঁয়া মুছে যাবে।
ড্রয়িংরুমে তখন জয়া উপস্থিত হয়েছে।অর্ণ রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে ওদের নিকট এগিয়ে এলো।
চোখ কটমট করে সবাইকে দেখছে। হঠাৎ তার ঠোঁটে লেগে থাকা হালকা লিপস্টিকটাকে চোখ কুঁচকে দেখে ফেলল জয়া।জয়া অবাক হয়ে তাকাল। মুখের ভাবের সঙ্গে চোখও বড় হয়ে গেছে। প্রেমও অস্বাভাবিকভাবে থমকে আছে। অর্ণ নিজেই কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল—এক ধরনের জিজ্ঞাসু ভঙ্গি।প্রেম ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল।
জয়া চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অবশেষে বলল,
“আপনি…মানে আপনি ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়েছেন?”
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবেন।রেসপন্স বেশি হলে পর্ব আরও বড় করে দেয়ার চেষ্টা করব।আজকের পর্ব কেমন ছিল?😩)
প্রেমবসন্ত বই অর্ডার করেছেন?প্রি-অর্ডার থাকবে পুরো জানুয়ারি।আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে বই অর্ডার করুন শীঘ্রই।
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫