Golpo romantic golpo প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫


#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

(০৫)

নৌমি দু’হাতে নিজের দুগালে হাত রেখে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,

” ভাবির সাথে ঝ* গড়া করেছো, তাই না?”

তাজ অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল,

” না। “

“আমার সামনে অন্ততঃ মিথ্যে বলো না৷ তোমাকে আমি খুব ভালোমতো চিনি। কথা না বাড়িয়ে মূল পয়েন্টে আসো। কি নিয়ে ঝগড়া করেছো বলো।”

তাজ খুব ভালো করেই জানে আর যাই হোক নৌমির থেকে কথা লুকানো তার পক্ষে অসম্ভব। তাজ ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,

” ওর বাসায় বিয়ের জন্য প্রেশার দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত বউ দেখানোর নাম করে পাত্রপক্ষ নিয়ে আসছে। সেই রাগ আমার উপর দেখাচ্ছে। এখন আমি কি করব?”

নৌমি খানিক ভেবে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

” আমি কি মেজো মামার সাথে কথা বলবো?”

“কি বিষয়ে?”

“তুমি যে ভাবিকে পছন্দ করো, তাকে বিয়ে করতে চাও সে বিষয়ে।”

“একদম না। ভুলেও যেন আব্বুর কানে এসব কথা না যায়।”

” তাহলে করবো টা কি? যেকোনো সমস্যার কোনো না কোনো সমাধান নিশ্চয় আছে।”

তাজ শক্ত গলায় বলল,

“বেকারত্বের সহজ কোনো সমাধান নেই আর এ সমাজে বেকারের কোনো মূল্যও নেই। আজ আমার একটা চাকরি থাকলে সবার সামনে নিজের অভিমত প্রকার করতে পারতাম, মনের কথা জানাতে পারতাম৷ “

নৌমি আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠল,

” ওলে বাবা! আমার ভাই দেখা যাচ্ছে আজ অনেক বেশি সিরিয়াস।”

“ফাজলামো করবি না। যা এখান থেকে।”

নৌমি শান্ত গলায় বলল,

“একদিন তোমার বেকারত্বের সমাপ্তি ঘটবে, এই বাড়ির মুখ উজ্জ্বল করে সেদিন তুমি সফলতার হাসি হাসবে। অপরিমিত জীবনের ব্যর্থতা ভুলে নতুন অভিলাষে জীবন সাজাবে। দেখবে একদিন তোমার সব হবে।”

তাজ তখনও গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। নৌমি ফের বলল,

” যাও দিলাম দোয়া করে, এখন চাকরি আসবে উড়ে উড়ে।”

তাজ নৌমির দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো। নৌমি এমন এক মেয়ে যার ম্যাচিউরিটি দেখলে যেমন অবাক হবে সবাই তেমন তার বাচ্চামি স্বভাবেও অবাক হতে বাধ্য। একটা মানুষকে কাঁদিয়ে সেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে তাকে হাসানোর অদৃশ্য ক্ষমতা আছে এই মেয়ের মাঝে। তাজের হাসি মুখ দেখেই নৌমি চেয়ার থেকে উঠে তাজের সামনে দাঁড়ালো। তাজের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

” এইযে তোমার মন ভালো করে দিলাম, এখন আমাকে কিছু দিতে হবে না?”

তাজ বলল,

” কি চাই?”

নৌমি মাথা চুলকে খানিক ভেবে নির্ভেজালভাবে হেসে বলল,

” তোমার চাকরি হলে প্রথমমাসের বেতনের অর্ধেক টাকা আমাকে দিতে হবে।”

তাজ আগপাছ না ভেবেই বলে দিল,

“ঠিক আছে।”

“মনে থাকবে তো?”

“থাকবে।”

“প্রমিস করো।”

তাজ পুডিং এর বাটি বিছানায় রেখে শক্ত হাতে নৌমির দুগাল চেপে বলল,

“তোর গাল ছুঁয়ে প্রমিস করলাম, আমি বেতন পেলে সর্বপ্রথম তোর ভাগ বুঝিয়ে দিব।”

গাল ছাড়তেই নৌমি গালে ঘষতে ঘষতে বলল,

” আমাকে মে*রে প্রমিস করেছো, ভুলে গেলে তোমার খবরই আছে৷ “

নৌমি পুডিং এর বাটি নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাজ ডাকল,

“খাওয়া শেষ হয় নি তো!”

“আর খেতে হবে না। তুমি এখন ভাবিকে কল দেও।”

তাজ ফোন হাতে নিল, কল দিবে কি দিবে না ভাবতে ভাবতে অবশেষে কল দিল। কিন্তু ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো না। দ্বিতীয়, তৃতীয়বার দেয়ার পর অবশেষে কল রিসিভ হলো। কল রিসিভ করেই নিলু শান্ত গলায় বলল,

” কিছু বলবে?”

তাজ তপ্ত স্বরে বলে উঠল,

” সরি, তখন মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”

” সমস্যা নেই, বুঝতে পেরেছি।”

” রেগে আছো?”

“না। রাগ করার বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে আমি রাগ করি না।”

তাজ হঠাৎ ই প্রশ্ন করল,

“বিয়ে করবা?”

নিলু চমকে উঠে শুধালো,

” কি বললে?”

“বললাম বিয়ে করবে কি না। “

“হঠাৎ বিয়ের চিন্তা কিভাবে আসলো?”

“না মানে মুসকান বলল।”

“বাই দ্য ওয়ে, মুসকান কে?”

তাজ নিলুকে খেপানোর জন্য বলল,

” আমার প্রেমিকা।”

নিলু মৃদু হেসে বলল,

” ভালো। তাহলে আমাকে কল দিলে কেনো?”

“প্রেমিকা বলেছে হবু বউকে কল দিতে তাই দিলাম।”

“ওহ৷ তারমানে তোমার মন চাই নি? প্রেমিকা বলেছে বলে কল দিলে?”

“মন সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবে মন যার নিয়ন্ত্রণেই থাকুক না কেনো প্রেমিকার কথা কখনো অমান্য করতে পারে না। “

” মন আর প্রেমিকার চিন্তা থেকে বেড়িয়ে এসে বলো মুসকান কে?”

“আরে পাগল, নৌমির নাম মুসকান এটা কি তুমি জানো না?”

“সবসময় নৌমি নামে চিনি, হুট করে মুসকান বললে কিভাবে চিনবো? তা নৌমি কি বলল।”

“ও বলছে কাউকে না জানিয়ে তোমাকে বিয়ে করে ফেলতে।”

“এটা অসম্ভব। “

“সবকিছুকে অসম্ভব বললে কিভাবে হবে! আমার চাকরি নেই, বাসায় তোমার কথা বলার পরিস্থিতি নেই। এমতাবস্থায় তুমি চাইলে আমি কাউকে না জানিয়ে তোমাকে বিয়ে করতে পারি৷ আমি টিউশন পড়িয়ে যে টাকা ইনকাম করি সে টাকায় আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে তোমাকে রাখতে পারবো। কিছুদিন একটু কষ্ট করতে হবে কিন্তু তারপর আমি নিজেকে গুছিয়ে, চাকরি নিয়ে বাসায় তোমার কথা বলে দিব। এই বিষয়ে মুসকান আমাদের সাহায্য করবে।

তাহলে তোমার আব্বুর এত কথাও শুনতে হবে না আর প্রতিনিয়ত বিয়ে বিয়ে করে আমার মাথা ব্যথাও তুলতে হবে না। “

নিলু কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে তারপর বলল,

” আমি ভেবে জানাবো তোমাকে, বাই। “

“আচ্ছা, বাই।”

মাসখানেক কেটে গেছে। নৌমির প্রথমবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাজ আর নিলুর সম্পর্কও মোটামুটি ঠিকঠাক তবে দুজনের কথাবার্তা খুব কম হয়। তাজ টিউশন আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, খুব প্রয়োজন ছাড়া এদিকসেদিক সময় নষ্ট করে না। আন্নি দশম শ্রেণির স্টুডেন্ট, সামনেই টেস্ট পরীক্ষা । তাজ সময় পেলে নৌমিদের বাসায় এসে আন্নিকে পড়ায় নয়তো কল দিয়ে বললে আন্নি বই খাতা নিয়ে তাজদের বাসায় যায়। পাশাপাশি বাসা হওয়াতে খুব একটা সমস্যা হয় না।

তাজ সন্ধ্যার পরপরই আন্নিকে পড়ানোর জন্য নৌমিদের বাসায় আসছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল, নৌমি সোফায় মাথা উল্টে শুয়ে আছে। আজ নৌমির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল, দু’দিন খেয়ে না খেয়ে পড়েও আজ জঘন্যতম পরীক্ষা দিয়ে আসছে। সেই শোকেই উল্টে পড়ে আছে। তাজ এগিয়ে এসে নৌমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

” কি ব্যাপার মিস ব্রিলিয়ান্ট! পরীক্ষার রেশ কাটে নি এখনও?”

নৌমি চমকে উঠল। উঠে বসতে বসতে আর্তনাদ করল,

” ভাইরে আমি শেষ। ভর্তির সময় আমাকে কোন মগায় পায়ছিল! সেই মগা আমাকে পুরোপুরি মগা বানিয়ে ছেড়ে দিল।”

তাজ মৃদু হেসে বলল,

” আগেই বলেছিলাম, বার বার বুঝিয়েছিলাম। আমি যে ভোগান্তি ভুগেছি আমি চাই নি তুই সেই কষ্ট উপলব্ধি কর। ভালো হয়েছে, এখন ঘরে উল্টে না থেকে যা বানরের মতো গাছে গাছে ঘুরে বেড়া। “

নৌমি ওষ্ঠ উল্টালো। তাজ আবারও প্রশ্ন করল,

” পাশ করবি তো?”

” আর পাশ! যা পড়ে গেছি সব ভুলে গেছি। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি সবাই একে অন্যের খাতায় তাকিয়ে আছে। কিছু তো দেখতে পারিই নি উল্টো স্যার আমার খাতা নিয়ে ৩০ মিনিট আঁটকে রেখেছে।”

“তারপর? “

“যা পেরেছি লিখে রেখে আসছি৷ স্যার/ ম্যাডামের দয়া মায়া হলে যদি পাশ নাম্বার টা দেন।”

” কয়টা পরীক্ষা বাকি?”

“আরও ২ টা।”

“মন দিয়ে পড়িস।”

নৌমি মনমরা হয়ে বলল,

“আচ্ছা। “

তাজ পেছন থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করে বলল,

” এই নে তোর জন্য নিয়ে আসছি।”

“কি এতে?”

“তোর পছন্দের হালিম।”

নৌমি খুশিতে লাফিয়ে উঠল। পরীক্ষার ক্লেশ মুহুর্তেই ভুলে গেল। হালিম হাতে নিয়ে আবেগ জড়িত কন্ঠে বলে উঠল,

” তুমি আমার জন্য হালিম নিয়ে আসছো?”

” কি করব, টিউশনে যাওয়ার সময় দেখলাম তুই পরীক্ষা দিয়ে প্রায় কেঁদে কেঁদে বাসায় ফিরছিস। ভাবলাম, পরীক্ষা ভালো করা তো সম্ভব না যদি হালিমের ভরসায় মনটা একটু ভালো হয়। “

” থ্যাংক ইউ, তামজিদ ভাইয়া।”

“ওয়েলকাম। হালিম খেয়ে রেস্ট নিয়ে সামনের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নে।”

“আচ্ছা। “

তাজ আন্নিকে পড়াতে চলে গেছে। নৌমি মনোযোগ দিয়ে হালিম খাচ্ছে। খাওয়ার মাঝখানে নৌমির বাটন ফোন বেজে উঠল। ফোনের দিকে তাকিয়েই নাম্বার টা চিনতে পারল। এটা শুভ্রর নাম্বার, সবার সামনে ভিডিও কলে টুকটাক কথা হলেও বেশ কিছুদিন যাবৎ নৌমির বাটন ফোনেও মাঝে মাঝে কল দেয়। নৌমির ইচ্ছে হলে রিসিভ করে না হয় করে না। এখন হালিম খাচ্ছে বলে মনটা একটু ভালো তাই কল রিসিভ করল। শুভ্র মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,

” পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”

“তুমি এতক্ষণে পরীক্ষার খোঁজ নিতে আসছো! পরীক্ষা দিয়ে আমার মন ১০০ খন্ড হয়ে গেছিল সেই মন তামজিদ ভাইয়া জোরাও দিয়ে দিয়েছে। আর তুমি এতক্ষণে আসলে!”

শুভ্র চোখ মুখ কিঞ্চিৎ শক্ত হলো। কাটকাট গলায় প্রশ্ন করল,

” তামজিদ জোরা দিয়ে দিয়েছে মানে?”

” ভাইয়া আমার জন্য হালিম নিয়ে আসছে আর হালিম খেয়েই আমার মন পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। “

শুভ্র ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

” হালিম ছাড়া তোমার আর কি পছন্দ? “

” আমি জানি না। ঘুরতে গেলে তামজিদ ভাইয়ার সাথে যায়, ভাইয়া যেগুলো ভালো বলে আমি সেগুলোই খায়।”

“আমি দেশে আসলে, আমার সাথে ঘুরবে না?”

“অবশ্যই ঘুরবো। তুমি, আমি, তামজিদ ভাইয়া, সুমি, রাদ, রাফি সবাই একসঙ্গে ঘুরতে যাব তখন অনেক বেশি মজা হবে। “

“আমি ঐটা বলছি না। “

” তাহলে কোনটা বলছো? আমার হালিম ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এখন কথা বলার সময় নেই, টা টা। “

শুভ্র কিছু বলার আগেই নৌমি কল কেটে দিয়েছে। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট পর আইসক্রিম খেতে খেতে রাদ আসছে। নৌমিকে দেখেই ঠাট্টার স্বরে ডাকল,

“ভাবি।”

নৌমি রাগে ফোঁস করে বলল,

” কে তোর ভাবি?”

“তুমি।”

“আমি তোর কোন জন্মের ভাবি?”

“এই জন্মের। তাজ ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলে তুমি আমাদের ভাবি হবে না?”

নৌমি হাসতে হাসতে বলল,

” আহ! কি অসাধারণ স্বপ্ন তোদের! “

“কিসের স্বপ্ন?”

রাদ এসে সোফায় বসলো। নৌমি রাদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

” যদি এমন হয়, তোদের তাজ ভাই হুট করে একটা মেয়ে নিয়ে বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে তখন তোর কেমন লাগবে?”

রাদ চিন্তিত স্বরে বলল,

” একটা মেয়ে ভাইয়ার সাথে কেনো আসবে?”

“ধর তারা দু’জন দু’জনকে পছন্দ করে, বিয়েও…”

বলতেই তাজ দৌড়ে এসে নৌমির মুখ চেপে ধরেছে। রাদ অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে। তাজ রাগে কটমট করে বলল,

” আমাকে না ফাঁসানো পর্যন্ত তোর মনে শান্তি হচ্ছে না, তাই না?”

নৌমি বিড়বিড় করে বলল,

” রাদের অনুভূতি জানার চেষ্টা করছিলাম।”

” এই অনুভূতি প্রকাশক মানব একটু বাদেই বাড়িতে বোম্ব ব্লাস্ট করবে।”

নৌমি কিঞ্চিৎ হেসে বলল,

” এইটুকু কলিজা নিয়ে বেঁচে আছো কিভাবে?”

পাশ থেকে রাদ হেসে বলল,

” তোমার ইয়া বড় কলিজার জোরে।”

রাদ আর নৌমি হাসতে হাসতে হাতে হাত মেলালো। তাজ অকস্মাৎ রাদের কান চেপে ধরে রাগী স্বরে বলল,

” বাসায় চল এখনি। “

“ছাড়ো, যাচ্ছি।”

নৌমি পেছন থেকে চেঁচাল,

” রাদকে মারছো কেন? ও তো সত্যি কথায় বলেছে।”

নৌমির কথায় তাজ তেমন একটা পাত্তা দিল না। কলিজায় হাজার জোর থাকলেও নৌমির সাথে নিলুর বিষয়ে ঝ*গড়া লাগার মতো জোর তাজের নেই। নিলুর সাথে ৩-৪ দিন যাবৎ যোগাযোগ হচ্ছে না এই টেনশনে আছে । নিলুর আচার-আচরণের হঠাৎ পরিবর্তন নিয়ে শঙ্কিত তাজ।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply