#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(২৫)
নৌমির মুখে এমন কথা শুনে তাজের আম্মু তাজ্জব বনে গেলেন। নির্বাক হয়ে চেয়ে আছেন কেবল। নৌমি মামির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে নাচিয়ে আওড়াল,
” কি হলো মামি? কথা বলছো না কেনো?”
তাজের আব্বু মিটিমিটি হাসছেন। নৌমির দুষ্টুমিগুলো ওনার কাছে বরাবরই বেশি ভালো লাগে। এই বাড়িতে মেয়ের তুলনায় ছেলের সংখ্যা বেশি। ছেলেরা বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকে। তিনবেলা খাওয়ার সময় ছাড়া তাদের দেখা পাওয়া মুসকিল। বাড়িটা সবসময় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। নৌমি আসলে এই বাড়ির পরিবেশটা একটু বদলাবে। মনে হবে কেউ না কেউ আছে বাড়িতে। তাজের আব্বু মনে করেন,
” নৌমির নিকট এই বাড়ির প্রাণভোমরা আছে। চঞ্চল মেয়েটার চাঞ্চল্যের সামনে এই বাড়ির ভুতুড়ে স্বভাব অচিরেই ঘুচে যাবে।”
তবে ওনার ভাবনার সত্যতা ঠিক কতটুকু তা কে জানে! নৌমি মনে প্রাণে চাই এই বাড়ির মানুষগুলো ভালো থাকুক। মামা-মামীরা, তাজ, রাফি, রাদ সবাই ভালো থাকুক। সবার মনের ইচ্ছে পূরণ হোক। কিন্তু তাজ কি চাই?
তাজের আব্বু মৃদুস্বরে বললেন,
” কি ব্যাপার তাজের আম্মু? কথা বলছো না কেনো তুমি?”
তাজের আম্মু নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,
” ও কি আমাকে কথা বলার অবস্থায় রেখেছে!”
তাজের আব্বু এবার শব্দ করে হাসলেন। নৌমি মুচকি মুচকি হাসছে আর দু’জনকে দেখছে। তাজের আম্মু গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
” এই নৌমি, তোর কি মনে হয় না তাজ আমাদের থেকে কিছু লুকাচ্ছে?”
নৌমি ভ্রু কুঁচকে চাইল মামির পানে। পরপর মামার দিকে তাকাল। মুহুর্তের মধ্যেই মামার মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল। নৌমির মনের ঘরে চিন্তা ঢুকতে বেশি সময় লাগল না৷ নৌমির মেজাজ খারাপ হলো। এ কোন মসিবতে পড়ল। সে নিজেও তাজের ব্যাপারে চিন্তিত। ছেলেটা কোনো এক ঝামেলায় আঁটকে পড়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে৷ কিন্তু জোর করে কারো মনের কথা মুখে আনা সম্ভব না৷ আর সেটা যদি তাজ হয় তাহলে তো আরও সম্ভব না।
নৌমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
” তোমার কি মনে হয়?”
“আমি জানি না। আমি রাতে দু’বার তাজের রুমে গেলাম। ঘর পুরো অগোছালো। জিজ্ঞেস করলাম এতবার কিন্তু কিছুই বলল না। সকাল থেকে খেলোও না কিছু।”
তাজের আব্বুর চিন্তিত চেহারায় চিন্তার ছাপ আরও গাঢ় হলো। নৌমি বিজ্ঞ চোখে দেখল দু’জনকে৷ ভাবসাবে বুঝালো সে খুব চিন্তামগ্ন। তাজের আব্বুর কণ্ঠস্বর ভার। বললেন,
” গতকাল রাতে তাজকে দেখলাম তোদের বাসায় গেল। তোকে কিছু বলেছে?”
নৌমি মুচকি হেসে বলল,
” হ্যাঁ, বলেছে তো। আমাদের নিয়ে ঘুরতে যাবে বলল। শুভ্র ভাইয়ারা আজ আসলে আলোচনা হবে তারপর আমরা সবাই ঘুরতে যাব। তুমি যাবে, মামা?”
তাজের আব্বুর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল৷ নিজের বয়স, অসুস্থতা সবকিছুর কথা ভেবে শান্ত গলায় বললেন,
” আমার কি সে বয়স আছে রে!”
“ওমা! নেই কেনো? তুমি যদি মন থেকে চাও তাহলে এখনও পুরো বাংলাদেশ ঘুরতে পারো। চলো না মামা, সবাই মিলে ঘুরে আসি। মামি তুমিও যাবে।”
তাজের আব্বু সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
” না না, আমরা যাবো না। তোরা ঘুরে এলেই আমাদের মনে শান্তি লাগবে৷ তোদের হাসিখুশি দেখলেই আমাদের ভালো লাগে।”
নৌমি খানিক ভেবে ধীর গলায় বলল,
” তাহলে তোমার ছেলেকে বলবে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যেতে।”
“এই না বললি ও তোদের নিয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু সেসব তো পুরোনো কথা। আজকাল যা ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। এরপর এসে যদি বলে যেতে পারব না। তখন কি হবে? শুভ্র ভাইয়া তো কিছুই চিনে না। আমি, আন্নি, রাফি আমরাই বা কি চিনি বলো! মামা, তুমি বললে ভাইয়া না করতে পারবে না। তুমি একবার বললেই হবে।”
“ঠিক আছে, বলব। এখন আমার একটা কথা শুন।”
নৌমি মনোযোগের সহিত চাইল। বলল,
“শুনছি, বলো।”
“শুভ্ররা শুনেছি এবার বেশি ছুটি নিয়ে আসেনি। তুই তাজের সাথে কথা বল। তোদের সিদ্ধান্ত মতো দিন তারিখ ঠিক করে তোদের আংটি বদলটা করে রাখি। তারপর শুভ্ররা আবার ছুটি নিয়ে এলে বড়ো করে অনুষ্ঠান করা যাবে। আমার শরীরের অবস্থা ভালো না। তাজ কি চাইতেছে কি জানি। যা বলছি তাতেই আচ্ছা আচ্ছা করছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তুই তাজের সাথে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলবি। তোদের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত।”
নৌমি ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলল। আস্তে করে বলল,
” ঠিক আছে।”
হঠাৎ দরজা থেকে সালাম দিল শুভ্র। সঙ্গে সুমি, শুভ্রর আব্বু, আম্মু সবাই। ওদের দেখেই ছুটে গেল নৌমি। আদুরে গলায় বলতে লাগল,
” জানো, তোমাদের কত মিস করেছি আমি। সেই কখন থেকে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি।”
শুভ্র এক গাল হেসে বলল,
” আমি জানতাম তোমাকে এই বাড়িতে পাবোই পাবো।”
সুমিরা ভেতরে চলে গেলেও শুভ্র এখনও দাঁড়িয়ে আছে। নৌমি শুভ্র’র দিকে তাকিয়ে ভ্রু গুটাল। খানিক চিন্তিত স্বরে আওড়াল,
“ভাইয়া, তোমার কপাল কাটলো কিভাবে?”
শুভ্র তৎক্ষনাৎ কপালে হাত রাখল। চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
” রাতের অন্ধকারে কোথাও লেগেছে হয়তো। খেয়াল করিনি।”
“এতটা কেটে গেছে আর তুমি খেয়াল করলে না!”
এমন সময় তাজ এসেছে। সদর দরজার ভেতরে আসতেই শুভ্র আর নৌমিকে কথা বলতে দেখল। এক পলক তাকিয়ে দেখল। নৌমিকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শুভ্র সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
” কেমন আছিস ভাই?”
“আলহামদুলিল্লাহ। তুই?”
“আলহামদুলিল্লাহ। কোথাও গিয়েছিলি নাকি?”
“না যাব।”
তাজ আর কথা বাড়াল না। দীর্ঘ পা ফেলে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ফিরে আসলো মিনিট দুয়েক পর। ততক্ষণে শুভ্র সোফার কাছে চলে গিয়েছে। তবে নৌমি এখনও এখানেই দাঁড়ানো। তাজ কাছাকাছি আসতেই নৌমি জানতে চাইল,
” কোথায় যাচ্ছো?”
“বাইরে।”
“তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কেনো যাচ্ছো?”
“কাজ আছে। কেনো?”
নৌমি সোফায় বসা মানুষগুলোর দিকে এক নজর দেখে বিড়বিড় করে বলল,
” তোমার সাথে আমার দরকারী কথা আছে। ৫ মিনিট সময় হবে?”
তাজের গুরুগম্ভীর জবাব,
” এখন সময় নেই।”
তাজ পা বাড়াল দরজার দিকে। নৌমি হুট করে বলে উঠল,
” বিয়ের পর সময় হবে তোমার? “
“কিসের বিয়ে?”
” শুনেছিলাম, ভাবি আসলে ভাই বদলে যায়। অথচ আমি দেখছি ভাবি আসার আগেই আমার ভাই বদলে যাচ্ছে। আমাকে দুই আনার দামও দিচ্ছে না।”
তাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” দাম কেনো দিবো তোকে? শুভ্র’র সাথে তো কত রংঢং করে কথা বলছিলি। আমি আসতেই মুখ গোমড়া করে ফেললি।”
নৌমি ঝটপট নিজের দুগালে হাত রাখল৷ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আওড়াল,
” কোথায় মুখ গোমড়া করলাম? মিথ্যা অপবাদ দিবে না একদম। তাছাড়া শুভ্র ভাইয়ারা কতদিন পর এলো। তাই কথা বলছিলাম।”
“বল না যা। আমি কি বারণ করেছি? কিন্তু আমার কথা হলো, আমাকে দেখে মুখ ফোলাবি কেনো!”
“ইসস! আমি কতবার বলব? কিভাবে বললে বিশ্বাস করবে তুমি?”
“আমার বিশ্বাস করতে হবে না। ভালো লাগছে না আমার। যা ওদের সাথে গল্প কর গিয়ে।”
নৌমি কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাজ চলে গেল।
★
তাজ সহ আরও কয়েকজন বন্ধ বসে আছে। তাজের মুখে এক আকাশ অভিমান। মুখ ফুটে কিছু বলছে না ঠিকই কিন্তু ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।
শান্ত জিজ্ঞেস করল,
” নিলুর সাথে যোগাযোগ বন্ধ শুনলাম।”
তাজের নিরেট জবাব,
“তোকে কে বলল?”
সাদ জবাব দিল তৎক্ষনাৎ,
“নিলুই বলেছে। আর কে বলবে!”
শান্ত আবার বলল,
” কি হয়েছে?”
তাজের সরল জবাব,
” আমি খুব করে চাই তোরা আমার পার্সোনাল বিষয়টাকে পার্সোনালই রাখতে দে। এই বিষয়ে কথা বলিস না তোরা।”
“পার্সোনাল রাখতে দিব কিভাবে বল। সে, তুই দুজনেই আমাদের বন্ধু। শুধুমাত্র বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড হলে হয়তো বা বিষয়টাতে কথা বলতাম না কিন্তু সে আমাদের পরিচিত। আর কি পরিমাণ পাগল তাও তুই জানিস। তুই কল ধরতেছিস না বলে আমাদের হাজার খানেক কল দিয়ে ফেলেছে।”
“তো কি করব আমি?”
” ওর সাথে একটু কথা বল।”
” কথা বলে সমাধান করার মতো বিষয় এটা না। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে ঠিক করা সম্ভব না।”
” ঠিক বেঠিক আমরা জানি না। তোদের মধ্যে কি হয়েছে আমরা সেটাও জানি না। কিন্তু ওর জ্বালা আমাদের সহ্য হচ্ছে না। তাই আমরা চাই তুই ওর সাথে একবার কথা বল।”
তাজের তীব্র অনিচ্ছা স্বত্তেও রাজি হলো। বিরক্ত নিয়ে শান্তর ফোন থেকে কল করল নিলুকে। সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল নিলু।
” হ্যালো শান্ত, তাজ কি বলল?”
“আমি তাজ বলছি।”
নিলু একটু থমকালো। থতমত খেয়ে ডাকল,
“তাজ।”
মেয়েটার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে তাজের আজ মায়া লাগছে না। একবারও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না,
” কাঁদছো কেনো?”
বরং কর্কশ গলায় আওড়াল,
” কি সমস্যা তোমার?”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাজ।”
“আবার সেই পুরোনো নাটক। এসব অভিনয় গতকাল দেখা শেষ৷ নতুন কিছু থাকলে বলো।”
” তোমাকে কল দিতে পারছি না আমি। তুমি হয়তো আমার নাম্বারটা ব্লক করে রেখেছো। আনব্লক করে দাও প্লিজ।”
” শুকরিয়া আদায় করো, না করা স্বত্তেও আমি আবারও তোমার সাথে কথা বলছি। “
“তাজ।”
তাজ চিৎকার করল,
“একদম নাটক করবে না। তোমার নাটক সব বন্ধ দরজার ওপারে। বাবার সামনে তোমার চেহারা বদলে যায়। কি বুঝাও আমাকে! আমি বুঝিনা কিছুই?”
মিনিট দশেক দু’জনের মধ্যে তর্ক বিতর্ক চলল। এরপর রাগে কল কেটে দিল তাজ। শান্ত, মাহি, সাদ সবাই হতবাক হয়ে চেয়ে আছে৷ তাজ খুব শান্তশিষ্ট একটা ছেলে৷ অযথা এভাবে রিয়েক্ট করা তার স্বভাবে নেই। দু’দিন আগ পর্যন্ত নিলুকে বিয়ে করার জন্য কত কষ্ট করছিল৷ সকাল থেকে চাকরির খোঁজ নেওয়া, ইন্টারভিউ দেওয়া। দিনরাত এক করে পড়াশোনা করা। অন্তহীন দুশ্চিন্তা করা। আর সেই ছেলে কিনা নিলুর সাথে এভাবে রিয়েক্ট করছে।
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২২+বর্ধিতাংশ
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫