পদ্মপ্রিয়া
পর্ব_৯
ঈশিতারহমানসানজিদা
বিয়েতে অনেক কিছু দরকার, গতকাল সাহারা আর নূর মিলে সবকিছুর লিস্ট বানিয়েছে। তবে এখন দোকান থেকেই সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে, ওদের কষ্ট করে লিস্ট খোঁজার প্রয়োজন নেই। নূরের যা পছন্দ হচ্ছে সাহারাকে দেখিয়ে দিচ্ছে আর সাহারা সেগুলো নামিয়ে দেখাতে বলছে। ফয়েজ একটু দূরে বসে রয়েছে। গালে হাত দিয়ে দেখছে সবকিছু। আজমাঈন কে সে দেখতে পাচ্ছে না, অনুভব কে সাথে নিয়ে সে হাওয়া হয়ে গেছে। তবে কিছুক্ষণ বাদেই ওদের দেখতে পেল। আজমাঈন অনুভবের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে এলো। দুজনে আইসক্রিম খাচ্ছে। ফয়েজ দাঁত খিচিয়ে বলে,’মেয়েলি স্বভাব গেল না তোর? আমাকে একা রেখে কোথায় গিয়েছিলি?’
‘আমি নিয়ে গিয়েছি হবু দুলাভাই। আইসক্রিম টা হেব্বি খেতে, আপনি খাবেন?’
‘এসব খাই না আমি।’
‘আমার ফুপি কিন্তু খুব পছন্দ করে, দাদু ফুপির জন্য নিয়ে আসে। আমাদের ফ্রিজ ভর্তি আইসক্রিম। কিন্তু এখন তো খেতে পারবে না। আজ সারাদিন নেকাব ই তুলবে না। আপনারা আছেন এজন্য তো আরো সতর্ক হয়ে গেছে।’
আজমাঈন প্রশ্ন করে,’তোমার ফুপি এমন চুপচাপ স্বভাবের? বাড়িতেও এমন থাকে সবসময়?’
অনুভব হেসে বলে,’আরেহ, ফুপি তো নিজের কথা নিজেই শোনে না।’
ওরা দুজনেই ‘কিহ’ বলে উঠলো। অনুভব বোকা মার্কা হেসে বলে,’আসলে, আস্তে কথা বলে। আমার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। ওইযে দেখুন।’ নূরের দিকে ইশারা করলো,’যা যা পছন্দ হচ্ছে আপুর কানে কানে বলছে আর আপু দেখতেছে। এখন ফুপি যদি দোকানি কে শাড়ি দেখাতে বলে সে শুনতেই পাবে না।’
আজমাঈন মাথা দুলিয়ে ফয়েজের দিকে তাকায়, ‘ভেবেছিলাম মেয়েদের কেনাকাটার মধ্যে যাব না। এখন দেখছি যেতেই হবে। ফয়েজ ওঠ এবার, হবু বউয়ের সাথে তো এখনো কথাই বললি না। দেখি চল, তোর বউ আবার আস্তে কথা বলে কিনা।’
‘আপুর মুখ তো নয় যেন জাপানের বুলেট ট্রেন। এখন হয়তো ভদ্রতার খাতিরে চুপচাপ আছে। কিন্তু আমার আপু খুব ভালো মানুষ।’
আজমাঈনের ইশারায় কাজ হলো না, ফয়েজ উঠলো না। এজন্য টেনে ধরে নিয়ে সাহারার পাশে বসিয়ে দিলো। হঠাৎ পাশে বসতেই সাহারা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘আল্লাহ!’ ফয়েজ কে দেখে বুকে থুতু দিয়ে গোলগাল চোখে তাকায়। আশ্চর্য মানুষ, নূর মাথা কাত করে ওদের দেখলো। এই ছেলে দুটো অদ্ভুত, কথা নেই বার্তা নেই হুটহাট চলে আসে। আজমাঈন বলে, ‘রিল্যাক্স!! ও কোন ভুত নয় যে এতো ভয় পেতে হবে। আসলে হবু বউয়ের শাড়ি চয়েজ করতে হবে তো। তাই নিয়ে এলাম।’
‘আমার শাড়ি তো জান্নাত পছন্দ করে দিবে, ওর চয়েজ খুব ভালো।’ সাহারার আলাভোলা চেহারার দিকে চোখ পড়লো ফয়েজের। এর আগে এভাবে দেখা হয়নি, মেয়েটা সুন্দর। চেহারায় মায়াবী ভাব আছে। আচমকা আজমাঈন বলে উঠলো,’জান্নাত কে?’
অনুভব মাথা নেড়ে আপন ভঙিমায় বললো,’আমার ফুপি, রেহনুমা জান্নাত নূর। নামটা দাদু রেখেছে।’
আজমাঈন নূরের দিকে তাকায়, ততক্ষণে নূর মাথা নিচু করে ফেলেছে। হাতে রেশম সুতার তৈরি লাল রঙের শাড়ি। এটাই নেড়েচেড়ে দেখছিল সে। ভারি পছন্দ হয়েছে। বিয়ের শাড়ি লাল না হলে চলে? আমরা বাঙালি, বাঙালিদের বিয়েতে লাল শাড়ি থাকা আবশ্যক। তা না হলে এটাকে বিয়ে বলে গন্য করা যায়? নূর শাড়িটা সাহারার হাতে দিয়ে ট্রায়াল দিতে বললো। একজন মেয়ে স্টাফ এসে সাহারাকে শাড়ি পড়িয়ে দিচ্ছিলো। মেয়েটার দক্ষ হাত, কেমন চটপটে শাড়ি পড়িয়ে দিলো। নূর এগিয়ে এসে লাল ওড়না দিয়ে ঘোমড়া টেনে দিলো। অনুভব দৌড়ে এলো,’ওয়াও আপু তোমাকে হেব্বি লাগছে, একটা ছবি তুলি দাঁড়াও।’
সাহারা ওর কান টেনে ধরে,’হেব্বি লাগছে কেমন ভাষা হ্যাঁ? বারণ করেছি না?’
‘ওকে ওকে, সুন্দর লাগছে। খুব সুন্দর লাগছে।’ ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে বলে,’ফুপি এই শাড়িতে তোমাকেও সুন্দর মানাবে। বাসায় গিয়ে ট্রায়াল দিও। এখানে তো দিবে না।’
নূরের কেমন লজ্জা লাগলো, ওদের সামনে কথাগুলো বলায় নুইয়ে পড়লো। সাহারা হেসে বলে, ‘হয়েছে!! তোকে ট্রায়াল দিতে হবে না। একেবারে বিয়ের সময় পড়িস।’
শাড়ির এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পর ওরা সবাই মিলে গোল্ড শপে গেল। মূলত সাহারার জন্য গহনার সেট কিনবে। ফয়েজের মা বলেছে তাদের অনেক গহনা আছে, কিছু নতুন গড়িয়েছে। বাড়ির বউয়ের জন্য তিনি পছন্দ করে কিনেছেন। এজন্য এখন ওর পক্ষ থেকে গহনা কিনবে না। তবে রাশেদ সাহেবের পক্ষ থেকে নূর বিল পে করবে। এজন্য একটা গহনার সেট দেখছিল সে। পছন্দ হয়েছে খুব, তাই যাচাই বাছাই করে নিচ্ছিলো। দোকানে বেশ ভিড়। নূরের মতো অনেকেই বোরকা পরে এসেছে। এরই মধ্যে একজন স্টাফ এসে ঘোষণা করলো কেউ যেন দোকানের বাহিরে না যায়। কেননা দোকান থেকে কেউ একটা নেকলেস চুরি করেছে। ওনাদের ধারণা চোর এখনও বাইরে যেতে পারেনি। তাই সবাইকে চেক করা হবে। একটা ছেলে এসে নূরের সামনে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় বলে,’আপনি সাইডে আসুন, ওখানে বোরখা পরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ওই লাইনে গিয়ে দাঁড়াবেন।’
সাহারা হতবাক, নূর ওর হাত শক্ত করে ধরে আছে। এতে ছেলেটি আরো বিরক্ত হলো,’কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না? সবাইকে চেক করা হবে চলুন?’ ছেলটির ধমকে কেঁপে উঠল নূর। সাহারা এবার চটে গেল,’সমস্যা কি আপনার হ্যাঁ? আমাদের দেখে কি চোর মনে হয়?’
‘চোরকে দেখে কখনোই চোর মনে হয় না ম্যাডাম, কিন্তু তবুও সে চোর। আর এসব চোর বেশিরভাগ বোরকা পরে আসে তো, বোঝা মুশকিল। এজন্য আগে বোরকা পরা মেয়েদের চেক করা হবে।’
নূরের মনে হলো কেউ ওর কানে সীসা ঢেলে দিয়েছে। শরীর কাঁপতে শুরু করলো। কিন্তু সাহারা তো থামার পাত্রী নয়। তার কন্ঠস্বর উঁচু হয়,’সব মেয়েদের সাথে ওকে মেলাতে আসবেন না। বিপদে পড়ে যাবেন। ও তেমন মেয়ে নয়, যাবে না ও।’
‘দেখুন ম্যাডাম, আমাদের কাজ করতে দিন। চুরি না করলে তো ভয় পাওয়ার কথা নয়। অথচ উনি রিতিমত কাঁপছেন।’
‘এই ছেলে, তোমার মুখ আমি ভেঙে দিব বেয়াদব। এখানে গয়না কিনতে এসেছি, নিজেদের টাকায় কিনব। এভাবে অপমান করছ কেন? অসভ্য বেয়াদব।’
এক প্রকার হট্টগোল বেঁধে গেছে। নূর এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কেঁদে ফেলে, শব্দ শোনা যাচ্ছে না তবে হেঁচকি তুলে ফেলেছে কাঁদতে কাঁদতে। অনুভব শুরুতেই দৌড়ে বাইরে চলে গিয়েছিল। কেননা আজমাঈন ও ফয়েজ বাইরে ছিলো। বিষয়টা ওদের জানাতেই আজমাঈনের চোখমুখ শক্ত হয়ে যায় রাগে। সবার আগে দৌড়ে যায় সে। সাহারা তখনও ছেলেটাকে ধমকে যাচ্ছে এবং সে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
‘দেখুন ম্যাডাম আপনারা এমন করলে আমরা জোর করতে বাধ্য হব। তখন বলতে আসবেন না গাঁয়ে হাত কেন দিচ্ছি!’
কথা শেষ হতেই ওর কলার শক্ত হাতে চেপে ধরে আজমাঈন,’কি বললি? গায়ে হাত দিবি? দিয়ে দেখা, তোর কত বড় কলিজা আমিও দেখব।’
জোরে চেপে ধরায় ছেলেটা কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়লো। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। আজমাঈন গর্জে উঠলো,’ও তোদের দোকানসহ কিনে নিতে পারে, সে ক্ষমতা ওর নিজেরই আছে। আর তুই ওকে চোর বলে অপমান করছিস?’
ফয়েজ গিয়ে ওর হাত ধরে বলে,’আজমাঈন ছাড়, এখানে সিনক্রিয়েট করার দরকার নেই। তারচেয়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বললে ভালো হবে।’
সাহারা তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে,’কেন ছাড়বে? ওকে ছাড়বেন না। কয়েক ঘা বসিয়ে দিন। আস্ত বেয়াদব ছেলে, ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। তখন থেকে কিসব যা তা বলছে।’ সাহারা ও তেড়ে এলো কাছে। ফয়েজ এবার ওর হাত টেনে ধরলো। টান দিয়ে নিজের পাশে এনে বলে,’কোন কথা নয়, এখানে অনেক মানুষ আছে।’
সাহারা রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফয়েজ টেনে ছাড়িয়ে আনে আজমাঈনকে। তারপর গলা উঁচিয়ে ম্যানেজার কে ডাকে। বলে,’আমরা এখানে বিয়ের কেনাকাটা করতে এসেছি। সেখানে এমন ব্যবহার মোটেও কাম্য নয়। এজন্য আমরা মান হানির মামলা করতে পারি জানেন?’
ম্যানেজার মাথা নিচু করে বলে,’আমরা দুঃখিত স্যার, আসলে আমরা মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে এখানে, আর বোরকা কে পুঁজি করে গয়না চুরি করে। আমরা তো জানি না কে ভালো কে খারাপ, তাই সবাইকে চেক করি। কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়। ওইযে বলে না একজনের জন্য সবার নাম পড়ে যায়। আমাদের লোকের কথার টোন হয়তো ভালো ছিলো না, আমি তো ছিলাম না তাই জানিনা। ও এখুনি ক্ষমা চাইবে।’
তবে এতে আজমাঈনের রাগ কমে না। ভারি হয় তার স্বর,’এজন্য একটা মেয়েকে এভাবে হ্যারাস করবে?
বোরকা গায়ে জড়িয়েছে দেখে তাকে আগে টানা হেঁচড়া করবে? এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসেন গিয়ে।’
‘সরি স্যার, ও ক্ষমা চাইবে।’ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই সে এগিয়ে এলো। সাহারা ঝাড়ি মেরে বললো,’ক্ষমা চাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, আমি ক্ষমা করব না। প্রশ্নই আসে না। যেভাবে কথা বলছিলো মনে হচ্ছিল আমারা রাস্তা থেকে উঠে এসেছি।’
সাহারার উচ্চবাক্য দেখে ফয়েজ আবার ওকে টেনে আনে। এতে বেশ বিরক্ত হয় সাহারা। বলে,’আপনার সমস্যা কি মশাই? কোথায় আমাকে সাপোর্ট করবেন তা না করে তখন থেকে হাত ধরে টানাটানি করছেন।’
‘এজন্যই বাচ্চা মেয়েদের বিয়ে করতে নেই, এখন এটাকে ম্যানার শেখাতে শেখাতে আমার জীবন পার হয়ে যাবে।’
সাহারা হাত ছাড়িয়ে বলে,’আমি তো খুব নাচ করছিলাম বিয়ে করার জন্য।’
সাহারা দ্রুত নূরের পাশে যায়। হাত ধরে বলে,’কাঁদিস না পাখি, তুই কাঁদছিস জানতে পারলে দাদু পাগল হয়ে যাবে। আমরা এখানে আর থাকব না। চল চলে যাই।’
নূর নিজেকে সামলে বলে,’গয়না প্যাকিং করা হয়ে গেছে আমি বিল পে করে আসছি।’
সবার সামনে দিয়ে হেটে গিয়ে বিল পে করলো। তার পর বাইরে বেরিয়ে এলো। সে এখন একটু আগের ঘটনা মানতে পারছে না। আজকাল পর্দা করা এতোটা দৃষ্টিকটু হয়ে গেছে!! বাইরে না আসলে তো জানতেই পারতো না। ছেলেটা যদি একটু বুঝিয়ে বলতো তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান হতো। তা না করে কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে কথা বললো। মনে হচ্ছিল যে সব বোরকা পরা মেয়েরা খারাপ। যদি কেউ ইচ্ছা করে নিজেকে আড়াল করে রাখে তাহলে এতে কার কি সমস্যা। সবার স্বাধীনতা আছে, যার যেমন ইচ্ছে তেমন চলবে। শালীনতার একটা ব্যাপার আছে তো। আজ প্রথম এমন ঘটনার মুখোমুখি হলো সে।
চুপচাপ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাহারা এসে কাঁধে হাত রাখতেই বলে উঠলো,’বাসায় যাব মাম্মাম, তুমি যাবে?’
‘সারাদিন না খেয়ে আছিস, ওনারা বলছেন খেয়ে যেতে। সন্ধ্যা হয়ে এলো তো।’
‘আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘কেবিন বুক করেছে সেখানে আমি তুই আর অনুভব ছাড়া কেউ থাকবে না। একটু শান্ত হ, এভাবে মন মরা হয়ে থাকলে আমার ভালো লাগে বল? এসব দাদূ জানতে পারলে কি হবে বলতো?’
নূর মাথা ঝাঁকায়। সাহারা বলে,’তোকে ড্রাইভ করতে হবে না, তুই চুপচাপ বসে থাক।’
নূর ফ্রন্ট সিটে বসে পড়লো। মন ওর প্রচন্ড খারাপ। যা দেখে সকলের কম বেশি খারাপ লাগছে। কেনাকাটা কিছু বাকি রয়েছে এখনও, তবে এই মুহূর্তে কারো ঘুরার ইচ্ছে নেই। সাহারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। অনুভব বললো,’চলো আপু বাসায় ফিরে যাই, ফুপির মন ভালো হবে তাহলে।’
‘দাদুভাইকে কিছু বলা যাবে না, শুনলে রাগ করবে খুব। এই শপে এসেও ঝামেলা করতে পারে। তুই তো তাকে চিনিস।’
রেস্টুরেন্টের ভেতর এবং বাহির দুটোই সুন্দর, বিশেষ করে বাগানটা। ছোট্ট একটি সরোবর আছে, কৃত্রিম ঝর্ণা বেয়ে নেমে আসা বারি সরোবরে এসে মিশছে। রঙ বেরঙের আলোতে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। নূর একপাশে বসে রয়েছে, কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে বসেছে। কিছু ছেলেমেয়ে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। নূর উদাস মনে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। বিকেল নেমেছে, নূরকে হাজার বলেও কিছু খাওয়ানো যায়নি। এজন্য বাকিরাও তেমন কিছু খায়নি, অনুভব খিদে সহ্য করতে পারে না বিধায় খেয়ে নিয়েছে। বাকিরা কোল্ড ড্রিঙ্কস ব্যতীত কিছুই খায়নি।
আপাতত নূরকে ওরা একা ছেড়ে দিয়েছে। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে নূরের দিকে খেয়াল রাখছে। সাহারার দৃষ্টি শান্ত, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,’ওর কপাল খারাপ, এজন্য সব খারাপ ওর সাথেই হয়।’
ফয়েজ পকেটে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজমাঈন সিঁড়িতে বসে আছে, ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রেখেছে সাহারা। সারা দিন ঘোরা ফেরার পর একটু শান্ত হয়ে বসেছে সবাই। ফয়েজ বললো, ‘তোমাদের সমস্যা ঠিক ধরতে পারছি না, সেদিন তোমার মা বললো নূর বিবাহিত। পারিবারিক ঝামেলা কি তোমাদের?’
সাহারা মাথা নিচু করলো,’আমাদের পরিবার থেকে অনেক কিছু লুকানো হয়েছে। মা ভেবেছিল সবকিছু জানলে হয়তো এই বিয়ে ক্যান্সেল হয়ে যাবে। তবে আমার মনে হচ্ছে সবকিছু জানানো দরকার, অন্তত আপনাকে জানানো উচিত। আমার জন্মের পর নূরের জন্ম। বাবা মা খুব একটা খুশি ছিলো না, এখনও নূরকে কারো সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে তাদের লজ্জা লাগে। মানুষ হাসাহাসি করে, দাদু মণি কে নিয়ে আরো বেশি উপহাস করে। এজন্য দায়ভার জান্নাত কেই বহন করতে হয়। ওকে দাদুভাই ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছে। এজন্য তিনি ছাড়া ও কারো সাথে কম্ফোর্ট ফিল করে না। এমনকি কোথাও যেতে চায় না। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে পর্দা করা শুরু করলো। এজন্য দরকার ব্যতীত কথা বলে না। দাদুভাই ওকে ব্যবসায় নিয়ে গেল যাতে ও একটু স্বাভাবিক হয়। কিন্তু কোন পরিবর্তন হলো না। একটু অন্যরকম আরকি। এসব কথা আপনার পরিবার কে জানানো দরকার। দাদুভাই জানাতে চেয়েছিল কিন্তু মা হুট করে মিথ্যা বলায় খুব রেগে গিয়েছিলেন। এখন আপনার পরিবার দাদুভাইকে খারাপ ভাববে তা আমি চাইনা।’
ফয়েজ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো,’আমার পরিবারকে সব বলেছি, তারা তোমার দাদুকে ভালো করে চেনেন। এসব নিয়ে কোন সমস্যা হবে না।’
আজমাঈন উঠে চলে গেল। এবার সাহারা একটু সহজ হলো, ওরা সরোবরের ধার ঘেষে হাঁটতে হাঁটতে অনেক্ষণ কথা বললো। ফয়েজের ভালো লাগলো হবু বউয়ের সাথে সময় কাটিয়ে। ভেবেছিল হয়তো মেয়েটার ভেতরে বাচ্চামো স্বভাব আছে কিন্তু সেরকম নয় সাহারা। যথেষ্ট ম্যাচিউর সে।
অনুভব দৌড়ে এলো নূরের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে নূরের হাতের ফুলগুলো দিয়ে বললো,’ধরো ধরো! তোমার জন্য কত কষ্ট করে নিয়ে এলাম।’
হতচকিত হয়ে তাকায় নূর, দেখলো কতগুলো পদ্মফুল। এখনও পানি ঝরছে ফুল থেকে। পরনের বোরকা ভিজে গেল খানিকটা। চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’ইশশ কি করলে তুমি? ভিজে গেলাম তো।’
‘তোমার ভালো লাগেনি? তোমার পছন্দ তো!’
চোখের উপর পর্দা ফেলানো, তাই চোখের চাহনি দেখা গেল না। তাহলে অন্তত বোঝা যেত যে নূর আদৌও খুশি হয়েছে কিনা। তবে এবার ওর মন কিছুটা ভালো হলো। ফুলগুলো তে হাত বুলিয়ে বললো,’সুন্দর! এই অসময়ে কোথায় পেলে?’
‘অতো প্রশ্ন করো না, ভালো লেগেছে এটাই অনেক।’
নূর মাথা ঝাঁকায়। বলে,’আচ্ছা ঠিক আছে। বাসায় যাব, ক্লান্ত লাগছে খুব।’
যাত্রাপথে আজমাঈন যুক্ত হলো। সে আজ বাসায় যাবে না। বন্ধুর সঙ্গি হবে। গাড়ি ভর্তি প্যাকেট, তার মধ্যে কোনরকমে জায়গা করে বসলো তিনজন। নূরকে ড্রাইভ করতে দিলো না সাহারা। সে দায়িত্ব আজমাঈন নিলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজলো।
অনুপমা অপেক্ষা করছিল ওদের জন্য। ফয়েজ কে দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে এগিয়ে আসে। খাতির যত্ন করে ওদের দু’জনের। নূর আগে রাশেদ সাহেবের সাথে দেখা করে তারপর রুমে যায়।
রাশেদ সাহেব ফয়েজ কে জরুরি তলব করেন। যেহেতু আজমাঈন সাথে আছে তাই সেও গেল। রাশেদ সাহেবের রিডিং রুমটা বেশ সুন্দর। কিছু উপন্যাসের বই আর হাদিসের বই দিয়ে সাজানো। ওরা এসে বসলো। রাশেদ সাহেব ধীরে ধীরে বই থেকে চোখ তুললেন। বলেন,’তোমাকে একটা কথা জানানোর জন্য ডেকেছি। আশা রাখব আমার কথায় দ্বিমত করবে না। এই বিয়েতে আমি উপস্থিত থাকব, কিন্তু আমার ছোট মেয়ে উপস্থিত থাকতে পারবে না। আমি চাই না ও থাকুক। আর সেদিন তোমাদের মিথ্যা বলা হয়েছিল এজন্য আমি দুঃখিত।’
চলবে,,,,,,,,,,
গরম এবং লোডশেডিং,,,, সবার কি অবস্থা??? রিচেক দিতে পারিনি। বানান ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন। গরমে রিচেক দিতে ইচ্ছে করছে না।
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩
-
পদ্মপ্রিয়া গল্পের লিংক
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭