#পদ্মপ্রিয়া
#পর্ব_২১
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়, এখন আগের চেয়ে বৃষ্টি একটু বেশিই হচ্ছে। শহরের রাস্তায় পানি জমে যায়। গাড়ির পরিবর্তে নৌকা চালালে বেশি ভালো হবে বোধহয়। নিজের বিশাল গাড়িটি নিয়ে ডুবে যাওয়া রাস্তার সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে বাড়িতে ফিরেছে ফয়েজ। গেইট পেরিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে অনেকটা ভিজে গেছে। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো বড় বড়, এজন্য ভিজতে সময় লাগেনি। বারান্দায় কাঠের দরজার পরিবর্তে থাই দেওয়া। দরজাটা টেনে আটকে দিতে মেঝেতে ফোল্ডিং টেবিল পেতে বসে রয়েছে সাহারা। আশেপাশে খাতাপত্র ছড়ানো। পড়ালেখা করছে কম বৃষ্টি দেখছে বেশি। বউয়ের এমন হাবভাব দেখে থমকে দাঁড়ায় ফয়েজ। মেয়েটা আজকাল কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। আগের মতো অতিরিক্ত কথা বলছে না। কোন রাগ করলো নাতো? হতেও পারে, পোশাক পরিবর্তন করে সে এসে সাহারার পাশে বসে। ঘাড় ফেরায় সাহারা, সে ফয়েজ কে আসতে দেখেছে। আবার বইয়ের পাতায় চোখ দেয়। ফয়েজ জিজ্ঞেস করে,’মন খারাপ?’
সাহারা হাইলাইটার পেন দিয়ে পড়া মার্ক করতে করতে বলে,’যার এতো ভালো হাজবেন্ড আছে, তার কি মন খারাপ হয়?’
ফয়েজ কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে না। পরিস্থিতি তাকে চুপ করিয়ে দিলো যেন। বিয়ের পর এখন পর্যন্ত কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি ওদের। ফয়েজ কখনো গোলাপ ফুল এনে দিয়ে প্রেম নিবেদন করেনি। স্ত্রীর প্রতি সব দায়িত্ব সে অবহেলা করে গেছে। বিষয়টা নিয়ে এখন হুটহাট মন খারাপ হয় সাহারার। এ কেমন স্বামী তার ঘাড়ে এসে পড়লো। ভালো লাগে না কিছু। এখন আবার এসে জিজ্ঞেস করছে মন খারাপ? কথাটা মনে মনে ব্যাঙ্গ করে বলে সে। ইচ্ছে করছে বই দিয়ে বারি মেরে মাথা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু আজ বান্দার হলো কি? হঠাৎ পাশে এসে বসলো, আবার মনের খবরাখবর নিচ্ছে। ফয়েজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,’আজ তাহলে পরীক্ষা শেষ হলো?’
‘হ্যাঁ হয়েছে।’
‘পরীক্ষা কেমন হয়েছে? কোন সাবজেক্টে ফেল আসবে না তো?’
মেজাজ চটে গেল সাহারার,’আমাকে গাধা স্টুডেন্ট মনে হয় আপনার? এখন পর্যন্ত কোন বিষয়ে, কোন ক্লাসে ফেইল করিনি।’
ফয়েজ অবুঝের ন্যায় বলে,’না মানে বিয়ের পর অনেক মেয়েদের ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যায় তো তাই বলছিলাম।’
সাহারা দ্রুত টেবিল ফোল্ড করে রাখলো। বই খাতা গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো,’বাসায় এসেই মাথা খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন! এতো দিন তো আমার পড়াশোনার ব্যাপারে উঁকি দিতে দেখিনি আজ হঠাৎ মত বদলালো?’
ফয়েজ ওর সাথে উঠে দাঁড়ায়, পকেটে হাত গুজে বুক টান করে দাঁড়িয়ে বলে,’এতদিন পড়াশোনার জন্য স্পেস দিয়েছি এখন পরীক্ষা শেষ তাই জিজ্ঞেস করছি।’
রুষ্ট চোখে তাকায় সাহারা। তবে মুখে হাসি,’হায় আল্লাহ, আপনি তো মহৎ কাজ করে ফেলেছেন। এজন্য পুরষ্কার পাওয়া দরকার। আসুন আপনাকে পুরুষ্কৃত করি।’
ফয়েজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারান্দার দরজা খুলে ওকে ধাক্কা মেরে বারান্দায় পাঠিয়ে দরজা আটকে দিলো। এমন কাজে হতভম্ব ফয়েজ। ওর বারান্দা ছাদ খোলা, বেশ বড়সড়। বৃষ্টির তোড়ে চোখ খুলে রাখা দায়। সে জোরে জোরে দরজায় আঘাত করে সাহারা কে ডাকতে লাগলো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সাহারা বিছানায় বসে হাসতে লাগলো। বললো,’বেশ হয়েছে, এর চেয়ে বড় পুরস্কার হয়না। এখন কিছুক্ষণ ভিজো দেখবে ঘাড় থেকে ভুত নেমে গেছে।’
পা দোলাতে দোলাতে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে ফয়েজের ফোন দেখতে পেলো। সন্দেহ বাতিক মন আজ কিছু দেখতে চাইলো। স্বামী কি অন্য কারো সাথে প্রেম করছে? কিন্তু কল লিস্ট দেখে সন্দেহ হলো না। কি মনে করে গ্যালারি ওপেন করতেই মুখটা আপনাআপনিই হা হয়ে গেল। সাহারার ছবি দিয়ে ভর্তি গ্যালারি। কখনো টেবিলে বসে পড়ছে তো কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। আবার ওর ঘুমন্ত ছবিও তুলে রেখেছে। বাপের বাড়ি শ্বশুর বাড়ির সব ছবিই আছে।
এই হাদারাম ছবি তুলতেও জানে!! ফোন রেখে সে দৌড়ে দরজা খুলে দিলো। ফয়েজ দরজায় হাত রেখে মাথা ভেতরে ঝোকায়। চুল থেকে পানি ঝরছে এখনও। সাহারা মৃদু ধমক দেয়,’আপনার সাহস হয় কি করে লুকিয়ে আমার ছবি তোলার? আচ্ছা বাজে ছেলে আপনি। না জানি আর কার কার ছবি তুলেছেন ছিঃ ছিঃ।’
ফয়েজ কেমন হাঁপিয়ে গেছে,’আমার তো আরো দু’টো বউ আছে, ওদের ছবিও তুলেছি। গ্যালারি ভালো করে চেক করো। তুমি যে এতো বোকা ভাবিনি। ভালো করে না দেখেই চলে এসেছ?’
সাহারা এবার হাসে, ফয়েজের কথাগুলো অবিশ্বাস্য। তবে মজা করে বলেছে এও জানে সে। বলে,’এজন্য আরো পুরষ্কার পাওয়া দরকার আপনার।’
ফয়েজের বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলো, এবার আর তাকে সরানো গেল না। কেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফয়েজ মৃদু হেসে বলে,’আমার সাথে তোমাকেও পুরষ্কৃত করা হোক। স্বামীর কৃতিত্ব তো বউ এর হয় তাই না?’
ফয়েজ বারান্দায় পা বাড়ায় সাথে সাহারা কেও টেনে নেয়। সাহারা হইহই করে ওঠে,’আমার ঠান্ডার ধাঁচ আছে, দু’দিন বাদে জান্নাতের আকদ হবে। তখন বিছানায় পড়ে থাকব।’
‘সমস্যা নেই, স্বামী হিসেবে নাহয় সেবা টুকু আমিই করলাম। মাথায় জলপট্টি দেওয়া থেকে চুমু খাওয়া সব তো আমাকেই করতে হবে।’
বৃষ্টির ঝাপটা মুখে এসে লাগছে সাহারার, চোখ বুজে আসছে বারবার। বিষ্ময় ঠিকঠাক ধরা দিলো না চোখে। যথাসম্ভব স্থির নয়নে তাকানোর চেষ্টা করলো। সে ফুরসৎ মিললো কই, মুহুর্তেই পিঠ ঠেকলো রেলিং এ। দেখলো ফয়েজ কেমন মিটিমিটি হাসছে। সাহারা থমকে গিয়ে দু’পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। এই নিরামিষ স্বামীর মতলব ভালো ঠেকছে না আজ।
—————
আজমাঈনের দেওয়া ছোট্ট চিরকুট খানা গত চারদিনে চারশ বারের বেশি দেখেছে নূর। কেন দেখেছে, কিসের টানে তা নূর নিজেও জানে না। তবে লেখাটা ওকে আকর্ষণ করছে খুব। দিনের বেশিরভাগ সময় কাগজটা হাতে রাখে ও। আজ অফ পিরিয়ডে একা একা বসে রয়েছে নূর। আগামী শুক্রবার তার আকদের দিন ধার্য করা হয়েছে। অপ্রস্তুত নূর খবরটা শোনামাত্র বিষ্ময় বিমূঢ় হয়ে যায়। এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে সম্ভব? তাছাড়া আজমাঈন তো সবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে আগে নিজেকে তৈরি করুক তারপর নাহয় বিয়ের কথা ভাবা যাবে।
তবে এই ব্যাপারে রাশেদ সাহেব উস্তাজার সাথে আলাপ আলোচনা করেছেন। মূলত উস্তাজা বলেছেন বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে। আপাতত আকদ করা হোক, নূরকে তার বাপের বাড়িতে রাখা হোক। যাতে ছেলে মেয়ে দুজন দুজনকে ভালো ভাবে বোঝার জন্য সময় পায়। তারপর নাহয় নূরকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো যাবে, আইন মতে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করার পর নাহয় শ্বশুর বাড়ি যাবে। উস্তাজা কে নিজের চেয়েও বেশি বিচক্ষণ মনে করে রাশেদ সাহেব। তাই ওনার পরামর্শ মতো আকদ করার অনুমতি দিয়েছেন। বিয়ের আশা দিয়ে বেশিদিন অপেক্ষা করানো ভালো নয়। এজন্য উস্তাজা সব ভেবেই একথা বলেছেন।
নূরের ফোন বাজে, আব্বু ফোন করেছে। তবে যে খবরটা দিলো তা শুনে নূরের শরীর কেঁপে উঠলো। এখন সে কিভাবে বাইরে যাবে? নিজের অস্বস্তি লুকানোর জন্য সে বই খাতা গোছাতে শুরু করলো। হাত মোজা পরতে গেলে চিরকুট টা পড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে নেওয়ার আগেই অন্য একটি মেয়ে সেটি কুড়িয়ে নিলো। ততক্ষণে আরো তিন-চার জন এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটা বেশ জোরে জোরেই লেখা পড়লো। সবাই মুচকি হাসলো, এখানে মোটেও জোরে হাসাহাসি করা যাবে না। নূরের বিয়ে ঠিক হয়েছে এটা কারো জানতে বাকি নেই। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তারা এই বিয়ে নিয়ে মজা করতে লাগল। একজন বললো,’কি সুন্দর চিঠি, হাতের লেখাও সুন্দর। তোমার ভাগ্য ভালো রেহনুমা।’
নূর আমতা আমতা করে বললো,’ওটা দিয়ে দাও।’
‘দেব, আগে আমাদের ছবি দেখাও।’
নূর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলে,’আমার কাছে নেই।’ দ্রুত হাত মোজা পরে নেয়। নেকাব ঠিকমতো বাঁধতে বাঁধতে বলে,’আমাকে যেতে হবে।’
মেয়েটা ওর হাত টেনে ধরে বলে,’তুমি খুব কম কথা বলো। এই নাও তোমার চিরকুট। কালকে আসার সময় ছবি নিয়ে এসো নাহলে ছাড়ব না। রাত পর্যন্ত এখানেই আটকে রাখব।’
সবাইকে হাসাহাসি করতে দেখে সে দ্রুত বেরিয়ে এলো। আজমাঈন এখন কেনো এসেছে? এই ছেলের সাথে এখন কথা বলতে হবে? বিচ্ছিরি ব্যাপার স্যাপার। তবে বাইরে আসতেই ওর এই বিচ্ছিরি ব্যাপার কেটে গেল। কেননা আজমাঈন নয় বরং আইশা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ কেমন গুম মেরে আছে, হয়তো কিছুক্ষণ বাদেই বৃষ্টি নামবে। আইশা দ্রুত নূরের কাছে এসে ওর হাত ধরে। বলে,’কেমন আছো?’
মেয়েটা হাসিখুশি এবং মিশুক প্রকৃতির, এর আগে নূরকে সাহায্য করেছিল। তাই কথা বলতে তেমন দ্বিধা হলো না। সে সহাস্যে বলে উঠলো,’আলহামদুলিল্লাহ! তুমি?’
আইশা মাথা নেড়ে বলে,’আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। চলো চলো?’
নূর ঘাবড়ে যায়,’কোথায় যাব?’
‘চিন্তা করো না তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাব না। আসলে আম্মু বলেছে কিছু গোল্ড কিনার জন্য। এজন্য তোমাকে লাগবে।’
‘আমি!!’
আইশা আশ্বাস দিয়ে বলে,’তোমার আব্বু পারমিশন দিয়েছে। আর দু’দিন বাকি, সময় খুব কম। চলো চলো।’
নূর ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে, হঠাৎ করেই এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিল আব্বু! তার উপর বসেছে আজমাঈনের পাশে। যথাসম্ভব জানালার ধারে বসার চেষ্টা করলো সে। আজমাঈনের হাতের সেলাই খুলেছে আজ। খুব সাবধানে ড্রাইভ করছে সে। পেছনে নিশ্চিন্তে বসে আছে আইশা। নূর কথা বলবে না জানা কথা। আইশা বলে ওঠে,’আপুকে বলেছ ভাইয়া? না বললে কেলেঙ্কারি বেঁধে যাবে। এমনিতেই আম্মু কে বোঝাতে আব্বুর প্রেসার ফল করেছে আর আপু একবার রাগ করলে তোমার বিয়েই ক্যান্সেল।’
আজমাঈনের বলতে ইচ্ছে করলো, মগের মুল্লুক নাকি। দুনিয়া উল্টে গেলেও বিয়ে আটকানো যাবে না। তানাজ আইশার বড় বোন, তবে বয়সে আজমাঈনের চেয়ে তিন বছরের ছোট। বছর দুয়েক হলো বিয়ে হয়েছে এবং তিন মাসের প্রেগন্যান্ট। ডক্টর জার্নি করতে না করেছে বিধায় আসতে পারেনি। বিয়েতেও হয়তো উপস্থিত থাকতে পারবে না তবে ওর স্বামী থাকবে। এ বিষয়ে বোনের সাথে কথা হয়েছে আজমাঈনের। একদম ছোট পরিসরে আকদ হবে, খুব বেশি মানুষের উপস্থিতি থাকবে না। বড় মামা, বাবা এবং ফয়েজের বাড়ির লোকজন যাবে। আজমাঈন জবাবে বললো,’এতো মাইকিং করার দরকার নেই, তোর কিপটে বাপের বুকে ব্যথা বাড়বে।’
আইশা উচ্চস্বরে হাসে। দুই ভাইবোনের কথোপকথনে মনোযোগ দেয়না নূর। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু আধটু ভাবছে। আজ সকালে মাদ্রাসায় আসার পথে ভাবি পথ আগে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণত নূর সকালে হালকা খাবার খেতে পছন্দ করে। তবে আজ অনুপমা নূরের জন্য গরুর মাংসের ভুনা খিচুড়ি রান্না করেছিল, যা ও পছন্দ করে। নূরের পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে বলেছে,’দুদিন পর শ্বশুর বাড়িতে যাবে, তখন তো মন খুলে কিছু বলতেও পারবে না। তুমি যা চুপচাপ স্বভাবের। বাপের বাড়ি থেকে ভালো করে খেয়ে যাও।’
অনুপমা জোর করে রসিকতা করার চেষ্টা করছে তা চট করে ধরে ফেলে নূর। মাথা তুলে একবার রেহানা কে দেখে নেয়। তিনিও বেশ অবাক হয়েছে। যে অনুপমা জন্মের পর থেকে মেয়েটাকে দু’চোখে সহ্য করতে পারত না মান সম্মান খোয়া যাবে বলে। আজ সেই অনুপমা নূরের পছন্দ অনুযায়ী রান্না করেছে! ভাবা যায়!
তাছাড়া সাইমন কিছু গিফট দিয়েছে, বোনের বিয়ে হয়ে যাবে এজন্য। সবকিছু নূরের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কেন যেন। এ সকল ভাবনা চিন্তা করতে করতে গাড়ি থেমে গেল। নূর চমকে উঠে সামনের দিকে তাকায়। আইশা দৌড়ে এসে দরজা খুলে নূরকে বের করে। নূর ব্যাগটা গাড়িতেই রেখে আসে। ওরা একটা গোল্ডের দোকানে এসেছে। আজমাঈন চাইলেই ঢাকা থেকে নিতে পারতো, কিন্তু নূরকে এতদূর নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এই দোকানের আউটলেট ঢাকায় আছে, আজ নূরের পছন্দ মতো ডিজাইন চয়েজ করে ঢাকা থেকে নিয়ে নেবে।
কিন্তু বেচারি নূর পছন্দ করবে কি, ওদের এমন কাজে নিজেকে মানিয়ে নিতেই পারছে না। চুড়ি গুলো হাতে পরে বসে রইল সে। ডিজাইন পছন্দ করা দূরে থাক, সে মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাওয়ার। আইশা আজমাঈনকে বললো, ‘তুমি এখান থেকে বের হও তো? তোমার জন্য আপু ঠিকঠাক ডিজাইন দেখছে না। চুড়ি গুলো না নিলে আম্মু তোমাকে ছাড়বে না বলে দিলাম।’
আজমাঈন রিল্যাক্স হয়ে বলে,’ওকে ওকে, আমি যাচ্ছি। তোরা থাক।’
আজমাঈন চলে যাওয়ার পর আইশা নূরকে জিজ্ঞেস করে,’তোমার বোরকার সাইজ কত?’
নূর ঘাড় ঘুরিয়ে আইশার দিকে তাকায়। বলে,’কেন?’
‘বলো না প্লিজ!! তোমাকে একটা ম্যাজিক দেখাব।’
নূর বলে,’৫৪।’
আইশা এক প্রকার লাফিয়ে ওঠে, অতঃপর এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করে বলে,’ভাইয়া কেমন আন্দাজে কিনে ফেলেছে। অবশ্য আন্দাজে না। তোমাকে একটা ভিডিও দেখাই।’
আইশা নিজের ফোন বের করে একটা ভিডিও ওপেন করলো। বোরকার শোরুমে দাঁড়িয়ে আছে আজমাঈন, ওর সামনে বিশাল আয়না। দু’পাশে দুজন লোক দাঁড়ানো। আজমাঈন হাত দিয়ে তার বুক পর্যন্ত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আরেকজন ফিতা দিয়ে বুক পর্যন্ত উচ্চতা মাপছে। নূর বললো,’এসব কি করছে?’
‘ভাইয়া তো তোমার বোরকার সাইজ জানে না, উচ্চতায় কত ফিট তাও জানে না। তাই দোকানে গিয়ে বুক বরাবর দেখিয়েছে ওরা সে অনুযায়ী উচ্চতা মেপে বোরকা দিয়েছে। দারুন ব্যাপার তাই না? আমি তো লুকিয়ে ভিডিও করে ফেলেছি।’
আইশা খিলখিল করে হেসে উঠলো, কিন্তু নূর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ভাই বোন দু’জনেই পাগল নাকি। এসব কথা বলতে এতটুকুও লজ্জা লাগছে না মেয়েটার! এদের সাথে আর থাকা যাবে না। সে মিনমিন করে বললো,’আমি বাড়ি যাব, আর কতক্ষন লাগবে?’
আইশা হাসি থামিয়ে দিলো,’তুমি বোধহয় মজা করা পছন্দ কর না তাই না? কোন ব্যাপার না, আমার সাথে থাকতে থাকতে শিখে যাবে। তবে এখন আমি চুপ। তুমি প্লিজ কিছু সিম্পল গয়নার ডিজাইন চুজ করো। নাহলে ভাইয়া আমাকে কোরবানি করে দিবে আসন্ন ঈদ-উল-আযহা তে।’
শেষের কথা কেমন কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে মেয়েটা। নূরের একটু মায়া হলো। ভাবল, যত তাড়াতাড়ি সে চুজ করবে তত তাড়াতাড়ি তার ছুটি। সে পাতার মতো ঝুলানো মোটিফ, হালকা জালি কাজ আর ঝরনা স্টাইলের লুকের তুর্কিস স্টাইল নেকলেস দেখিয়ে দিলো। হাল্কা ডিজাইনের ভেতর এটা দেখতে সুন্দর। আর কিছু চিকন চুড়ি সিলেক্ট করে বললো,’আর কিছু নিব না, গয়না পরতে ভালো লাগে না আমার।’
‘তা বললে তো হবে না, তুমি হলে বাড়ির একমাত্র বউ। আম্মু একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের। নিজে পছন্দ করে কিনলেও সারাদিন সবাইকে জিজ্ঞেস করবে ভালো হয়েছে কিনা। এজন্য তোমাকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।’
নূর দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’আমি আসি তাহলে?’
আইশা বলে উঠে,’পাগল হয়ে গেলে নাকি? একাই চলে যাবে?’
‘আমি যেতে পারব।’
‘ওইযে বললাম না ভাইয়া আমাকে তাহলে,,!’ ইশারায় ফের কোরবানি দেওয়ার পদ্ধতি বুঝিয়ে দিলো। হতাশ হয়ে মাথা নাড়ায় নূর। ওরা শুধু ডিজাইন চুজ করেছে। ঢাকার আউটলেট থেকে নিয়ে নেবে আজমাঈন। দু’জনেই দোকান থেকে বাইরে এসে দাঁড়ায়। আজমাঈনের গাড়ি নেই সেখানে। আইশা বলে,’শিকদার সাহেবের ছেলেটা কোথায় গেলো?’
নূরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,’আমরা শিকদার গোষ্ঠী তো, মাঝে মাঝে আব্বুকে শিকদার সাহেব বলে ডাকি। আমার ভাইয়া আজমাঈন শিকদার ও তাই বলে।’
নূরে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। আইশা আসলেই বেশি কথা বলে। তবে নূর এটা বুঝলো যে ওই বাড়িতে তাকে এক প্রকার যুদ্ধ করে থাকতে হবে। নিজের এমন অভ্যাসে ও নিজেই বিরক্ত বোধ করছে। ওরা সবাই কি সুন্দর হাসি ঠাট্টা করে বেড়ায়।
আজমাঈন মিনিট দশেক পর এলো। গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে আইশাকে কাছে ডাকলো,’তুই এই দোকানে বসে এসির ঠান্ডা বাতাস খা। আমি নূরকে নামিয়ে দিচ্ছি।’
আইশা ভ্রু নাচিয়ে বলে,’কি ব্যাপার শিকদার সাহেবের বড় ছেলে!! তুমি তো প্রেম করা শিখে গেছো!!’
আজমাঈন আঙ্গুল তুলে বলে,’বড় ভাই হই তোর, একটু সম্মান রাখ। যা ভাগ এখান থেকে।’
আইশা নূরের কাছে ফিরে এলো। বললো,’আপু তুমি বাড়ি চলে যাও, ভাইয়া দিয়ে আসবে। আমার আরো কিছু ডিজাইন দেখা দরকার আপুর জন্য। তোমাকে এখুনি বাসায় দিয়ে আসতে বলেছে আঙ্কেল।’
আজ এতো বিপদ কেন আসছে? নূর খেই হারালো। আইশার চালে পথভ্রষ্ট হলো সে। অগত্যা গাড়িতে উঠতেই হলো। তবে আজমাঈন তার সাথে কোন কথা বলে না। ও চায় না নূরের অস্বস্তি হোক, শুধু কিছুটা সময় একান্ত কাটাতে চেয়েছে। পাশে বসে আছে এটাই অনেক। মাঝ রাস্তায় বৃষ্টি শুরু হলো। জানালার কাঁচ নামানো, ভারি বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা পড়তেই হাত মোজা খানিকটা ভিজে গেল। নূর তাড়াহুড়ো করে মোজা খুলতে গিয়েও থেমে গেল। মাথা তুলে আজমাঈন কে একবার দেখে নিয়ে চট করে হাত সরিয়ে ফেললো। মেয়েটার এমন কান্ড কারখানা দেখে না হেসে পারলো না আজমাঈন। কথা না বলে থাকতে পারলো না,’জাস্ট রিল্যাক্স! আমি তাকাব না।’
সে গাড়ির কাঁচ তুলে দিয়ে বলে,’সময় না আসা পর্যন্ত আমি তোমাকে দেখব না কথা দিলাম। তবে সময় আসার পর কি হবে?’
কথাটা বলে নিজের ভুল বুঝতে পারলো সে। কথাটা বলা মোটেও ঠিক হয়নি। এমনিতেই ভয়ে সিটিয়ে থাকে মেয়েটা। নিজের কথা ঘুরিয়ে সে বলে,’আ’ম সরি!!’
তারপর আবার নিরবতা নেমে আসে, ওয়াইপারের আওয়াজ টাও কানে আসে না। আজমাঈন বৃষ্টিদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় গাড়ি নিয়ে। বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে ছাতাটা এগিয়ে দেয় নূরের দিকে। নূরও হাত বাড়িয়ে ছাতা নেয়। তবে আরেকটা কাজ করে বসলো আজমাঈন, পেছনের সিট থেকে টেনে আনলো পদ্ম ফুলের মস্ত বড় তোড়া। এখনও পানি ঝরছে ফুল থেকে। নূরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘ফুল দিলে না করতে নেই, কেননা ফুল সৌন্দর্য এবং সুবাস বহন করে।’
মনের দ্বিধা কাটিয়ে ফুলগুলো নিয়ে দ্রুত প্রস্থান করে নূর। ত্রস্ত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকে, বোরকার নিচের অংশ ভিজে গেছে। পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় কাটিয়ে সে দ্রুত সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যায়। দরজা ঠাস করে বন্ধ করে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে। আরেকটু হলেই দম বন্ধ হয়ে যেত বুঝি। বোরকা খুলে গোসল করে নেয় সে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। জ্বর আসবে নাকি? সেদিন রাতে ছাদে ভিজে দু’দিন জ্বরে ভুগেছে। তবে তীব্র জ্বর ছিল না বিধায় কাউকে বুঝতে দেয়নি। এবার তো শুধু ভেজার কারণে নয়, ভয়েও জ্বর উঠে যাবে বোধহয়। চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকাতে শুকাতে পদ্মফুল গুলোর দিকে চোখ যায়। কিছু একটা মনে পড়তেই হেয়ার ড্রায়ার ফেলে রেখে সেদিকে যায়। নেড়েচেড়ে ফুলগুলো ভালো করে দেখে। যা ভেবেছে ঠিক তাই, এবারও একটা চিরকুট রাখা। প্লাস্টিকের কাগজে মোড়ানো, ছেলের বুদ্ধি আছে। নূর কাগজ খুলে দেখলো, হাতের লেখা ওর চেনা।
“The flowers blushed at your touch. Yet they are less beautiful than your eyes.
See you on Friday.”
লাইনগুলোর মাধুর্যতা কাটাতে নূরের বেশ সময় লাগলো। সে অনেকক্ষণ কাগজটা হাতে নিয়ে বসে রইল। ভেজা চুল বেয়ে পানি পড়ে ফ্লোর ভাসলো তবুও নূরের ধ্যান ভাঙল না। সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,’ইয়া আল্লাহ! আমি সাহস সঞ্চয় করতে পারছি না। তার এতো চাওয়া পাওয়া আমি কিভাবে পূরণ করব? অন্ধকার জীবনের সময় কাটিয়ে আলোতে যেতে বড্ড ভয় করছে। আলোর ঝলকানিতে না জানি সব জ্বলে যায়।’
চলবে,,,,,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া গল্পের লিংক
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৯