Golpo কষ্টের গল্প পদ্মপ্রিয়া

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২২


#পদ্মপ্রিয়া

#পর্ব_২২

#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা

আজমাঈনের ঘুম ভাঙে অ্যালার্মের শব্দে, ফোনের অ্যালার্ম যথেষ্ট নয় বিধায় অ্যালার্ম ঘড়ি দু’টো কিনে এনেছে সে। যার শব্দে শুধু আজমাঈন নয় বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে যায়। পাশের বাসার আঙ্কেল পর্যন্ত চিল্লাচিল্লি করে। আজমল শিকদার গিয়ে ছেলের হয়ে সাফাই গেয়ে আসেন। তার ছেলে বিয়ে করার জন্য কি কি ত্যাগ করছেন তা ইতিমধ্যে পুরো পাড়া বলে বেড়িয়েছেন তিনি। মাইকিং করতে পারলে বেশ ভালো হতো। ফজরের নামাজ শেষ করার পর ইমাম সাহেবের নিকট এক ঘন্টা সময় ব্যয় করে সূরা পড়ে সে, সাথে কোরআন পড়ার সব নিয়ম শেখে। সকালে যখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এসে আজমাঈন কে পড়তে দেখে তখন খিলখিল করে হাসে। এত বড় একটা ছেলে পড়তে এসেছে। অবশ্য ছোট বাচ্চারা তো বুঝদার নয়। মুখ টিপে হাসে তারা, আজমাঈনের ইজ্জত মান সব শেষ। ছোটবেলায় ভালো করে পড়লেই হতো। এখন বড় হয়ে সবার হাসির পাত্র হতে হচ্ছে।

এছাড়া তো আর উপায় নেই, সেই চোখজোড়া ওকে ঘুমাতে দেয়না এখনও। ভোর ভোর চোখ লেগে আসে। তারপর ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। আজ অ্যালার্ম বাজার পর ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে আজমাঈন। তাড়াতাড়ি বন্ধ করতেই পাশের বাড়ির আব্দুল আঙ্কেলের কন্ঠস্বর ভেসে আসে,’বলি বিয়ে কি তুই একাই করছিস নাকি পুরো মহল্লা সহ করছিস? তোর বাপের চোপার ঠেলায় দিনের বেলা টেকা যায় না আর তুই ভোর বেলায় ঢোল বাজাস। নামাজ তো আমরাও পড়ি নাকি!’

বলতে বলতে তিনি টুপি মাথায় দিয়ে জায়নামাজ বগলের নিচে চেপে ধরে হনহন করে মসজিদের দিকে ছোটেন। আজমাঈন ধীরে সুস্থে উঠে বসে, বাকি চার ওয়াক্ত পড়তে সমস্যা হয়না তবে ফজরের সময় ঘুম ভাঙতেই চায় না। মসজিদের ইমাম বলেছেন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। আজমাঈনের এই পরিবর্তনে প্রশংসা করেছেন খুব, নিজেকে ধরে রাখতে বলেছে। সবে তো শুরু।

নামাজে যাওয়ার জন্য কতগুলো পাঞ্জাবি কিনেছে, সুতি কাপড়ের। পড়লে আরাম পাওয়া যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি ঠিক করতে করতে দেখলো পাজামায় পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে গেছে। পুরুষদের টাকনুর উপর পর্যন্ত পোশাক পরতে হয়। আজমাঈন বড্ড বিরক্ত হয়। আগামীকাল গিয়ে সবগুলো ছোট করে আনতে হবে। কোনমতে পাজামা ভাজ করে পরে বাপের সাথে বেরিয়ে গেল সে। যতই ঘুমঘুম চোখে থাকুক না কেন, যখন সেজদায় লুটিয়ে পড়ে তখন শান্তি অনুভব করে সে। মনে হয় শীতল ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে হৃদয়ে। মনটাও হাল্কা হয়ে যায়। সারাদিন টাও ফুরফুরে মেজাজে কাটে।

আব্দুল আঙ্কেল ইমাম সাহেবের পেছনের কাতারে দাঁড়িয়েছেন। আজমাঈনের আসতে দেরি হওয়ায় সে শেষ কাতারে দাঁড়িয়েছে। তবে জামাত শুরু হওয়ার আগে আসতে পেরেছে এই অনেক। নামাজ শেষে এক এক করে সবাই বিদায় নিলো। আজমাঈন একপাশে চুপচাপ বসে আছে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ঢুলছে। আজ ঘুম কাটছে না যেন। আধঘন্টাও ঘুমায়নি রাতে। আজ আবার হোটেলের কাজ দেখতে যাবে। কাজ প্রায় শেষের পথে, লাস্ট ফিনিশিং দেখতে যাওয়া দরকার। আজ বুধবার, আগামীকাল ঈদ-উল-আযহা। বিয়ের চক্করে এখনো গরু কেনা হয়নি। কত কাজ বাকি আছে, যাকাত দেওয়ার কাপড়গুলো তাহমিনা আগেই কিনে ফেলেছেন। আজ পড়া হবেনা। হয়তো সামনের দু-তিন দিন পড়তে পারবে না। তাছাড়া ইমাম সাহেব ঈদের পর ছুটিতে যাবেন। এতসব ভাবনার মাঝেও আজমাঈন ঢুলছে। আজমল শিকদার এসে ছেলের পাশে বসেন। ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে বলেন,’ওঠ, তোর সাথে ঘুরে ঘুরে গরুটা কেনা হলো না। সব ভালো ভালো গরু বেচা হয়ে গেছে। এখন কি পাব কে জানে?’

আজমাঈন হাই তুলে বলে,’বিকেলে যাব, এখন বাড়ি গিয়ে ঘুমাব তারপর হোটেল দেখতে যাব। তারপর গরু কিনতে যাব।’

আজমল শিকদার কিছু বলার আগেই আব্দুল আঙ্কেল এসে হাজির হলেন। দু’পা ভাঁজ করে বসে বলেন,’তোমরা বাপ ছেলে যা শুরু করছো, মহল্লার সবাই তো খালি তোমাদের গুণগান গাইছে।’ আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে বলে,’তুই হতচ্ছাড়া অ্যালার্ম দিস না, আমি প্রতিদিন তোকে ডেকে দিব। তা গরু কত দিয়ে কিনবি এবার?’

আজমাঈন বলে উঠলো,’দেখি হাঁটে গিয়ে। আপনার মতো সুন্দর দেখতে একটা কিনব।’

কথাটা বলে আজমাঈন বুঝতে পারলো যে কত ভুল করে বসেছে সে। এই ক্যাটক্যাটে লোকটা এখন চিল্লাবে। সে নিজের কথা সংশোধন করে বলে, ‘আপনার পছন্দ মত আরকি, গতবার তো আমাদের গরুটা আপনার পছন্দ হয়নি তাই ভাবলাম এবার আপনাকে সাথে নিয়েই যাব।’

আব্দুল আঙ্কেল দাঁত বের করে হাসলেন,’আগের বারের গরুটার পেটটা বেশি ফোলা ছিল। দেখেই বুঝেছি যে ওষুধ খাওয়াইছে। এবার ভালো দেখেই কিনে দিব। বলছিস যখন যেতে অসুবিধা নাই।’

আজমাঈন দ্রুত উঠে বেড়িয়ে এলো, বাপের জন্য অপেক্ষা করলো না। গত দু’দিন ধরে রোজা রাখছে সে। আজও রোজা আছে, বাসায় এসে শার্ট প্যান্ট পরে নিলো। এখন আর ঘুম আসছে না। ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বের হলো, ঢাকা শহরে জ্যাম লেগেছে। এখনও অনেকে বাড়ি যাচ্ছে, স্বর্ণের দোকানে যেতে হবে। গতকাল পছন্দ করা ডিজাইন গুলো কিনবে। তারপর হোটেলে যাবে। সব ঠিকঠাক থাকলে বিকেলে গরু কিনতে যাবে।

তবে আজমাঈনের কাজগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হলো। প্রায় সব কর্মচারির ছুটি হয়ে গিয়েছে। যে কয়েকজন ছিল আজ সবাইকে ছুটির দিয়ে এসেছে। আজমল শিকদার গরুর হাঁটে যেতে পারেন না। একটু হাটলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। আইশা গো ধরেছে এবার সে যাবে। পিংক কালারের সুন্দর একটা কামিজ পরে সে রেডি হয়ে বসেছে। আজমাঈন যোহরের নামাজ পড়ে এসে হট্টগোল বাঁধিয়ে দিলো। আইশা কে ডেকে চেঁচিয়ে বললো,’ওই শিকদার সাহেবের ছোট মেয়ে তাড়াতাড়ি বের হ, নাহলে আঙ্কেল চলে আসবে।’

আব্দুল আঙ্কেল হলো একটা আতঙ্ক, আইশা তাই মনে করে। ভাইয়ের রুম থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে ছুটে বের হয় সে। গাড়ি বড় রাস্তায় যেতেই হাঁফ ছাড়ল। বললো,’আমারা কি গরুর শো রুমে যাচ্ছি ভাইয়া?’

রোজা অবস্থায় কন্ট্রোল করলো আজমাঈন। নিজেকে শান্ত রেখে বললো,’তোর বাপে শো রুম খুলে বসে আছে। যাবি, এসির বাতাস খাবি আর গরু কিনে চলে আসবি।’

আইশা মুখ বাঁকায়,’যুগ পাল্টেছে ভাই, শো রুম হলে তো অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ একটু চুপ থেকে বলে, ‘আমি নূর আপুকে ভিডিও কল দিচ্ছি, জিজ্ঞেস করব কোন গরুটা কিনলে ভালো হবে কেমন?’

গাড়ি তখন সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। আজমাঈন চমকে উঠে বলে,’ওর নাম্বার নিয়ে এসেছিস?’

আইশা দুষ্টু হেসে বলে,’তাও তোমার আগে, তুমি এতদিন কি করলে বলো।’

আজমাঈন আর কথা বাড়ায় না, এই মেয়েটা এখন ওকে লজ্জা দিবে। তাই মুখটা বন্ধ করে গরুর হাটে যায়।

আইশা এদিক ওদিক দেখছে আর ভিডিও করছে। জীবনে প্রথম গরুর হাটে এসেছে, স্মৃতি রাখতে হবে তো। মাঝে মাঝে গরুর গাঁয়ে হাত বোলাচ্ছে। তবে সব গরু তো আর নিরব প্রকৃতির নয়। মাথা ঝাড়া দিতেই আইশা লাফিয়ে ভাইয়ের হাত জড়িয়ে ধরল। আজমাঈন মেজাজ দেখিয়ে বলে,’এতো লাফালাফি করছিস কেন? চুপচাপ থাক, আগে গরু পছন্দ করতে দে। তারপর ছবি ভিডিও সব করিস।’

আইশা মুখটা গোমড়া করে আজমাঈনের পিছু পিছু ঘুরতে লাগলো। আজমাঈন পছন্দ মতো গরু দেখছে। দামাদামি করছে, মাথাটা ঘুরছে ওর। রোজা রেখে আজ কত কিছু করতে হচ্ছে। আগেও রোজা রেখছে, তবে খুব কম। অবশেষে পছন্দ মতো একটা গরু মিললো। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক করে লোকজন দিয়ে গাড়িতে তুললো। আইশার খুশি আর ধরে না। বলে,’ভাইয়া, আমি একটা সেলফি তুলব?’

আজমাঈনের ঘাম ছুটে গেছে, এই গরুটা মহা বজ্জাত। এখনি সবার অবস্থা নাজেহাল করে দিয়েছে। এর উপর বোনের বায়নার শেষ নেই। নেহায়েৎ ছোট বোনটাকে একটু বেশি স্নেহ করে কিনা। নাহলে এতক্ষণে কানের নিচে দিতো একটা। রাগটা সামলে বললো,’বাড়িতে গিয়ে তুলিস।’

বাড়িতে গিয়ে আরেক কান্ড বেঁধে গেছে। বেসামাল গরু শান্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিন চারজন লোক মিলেও শান্ত করতে পারছে না। আইশা নাচতে গিয়েছিল সেলফি তুলতে। তখনই লাফালাফি করে দড়ি ছিঁড়ে ফেলেছে। ভাগ্যিস ছুটতে পারেনি। নাহলে পুরো মহল্লা দৌড়ানো লাগত। আজমল শিকদার তেড়ে এসে বলেন,’তুই এক পাগলা ঘোড়া, কিনেছিস পাগলা গরু। আল্লাহ, আমি কোথায় যাব। এখন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে লোক ঠিক করতে হবে।’

আজমাঈন রুমে চলে গেল, এখন এখানে থাকলে তর্কাতর্কি বাঁধবে একটা। ইফতারের সময় হয়ে যাচ্ছে। তাহমিনা ছেলের জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছেন।

ছেলে মেয়ে আর স্বামীকে সামলাতে গিয়ে তার মাথা ঘোরে। যেমন স্বামী তেমন ছেলে। কেউ কারো থেকে কম না।

দু’দিন ধরে বড় মেয়েকে ফোন করছেন, বাড়িতে আসতে বলতেছেন। তানাজের শ্বশুর বাড়িতেও কোরবানি দিবে। ঈদের দিন বিকেলে আসবে সে।

——–

ঈদের দিন সকাল বেলা, ফজরের নামাজ আদায় করে গোসল সেরে সবাই নামাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুভব একবার নূরের কাছে সালামি চেয়ে গেছে নূরের কাছে। সে নামাজ পড়ে এসে সালামি নিবে। নূর চুপচাপ বসে আছে, ওর সামনে তিনটা গাউন রাখা। যেমন পোশাক নূর পরে, ঠিক তেমন। দেখে মনে হচ্ছে খুব দামি এগুলো। গতকাল অনুপমা এসে দিয়ে গেছে, তার ভাষ্যমতে নূরের বিয়ে হয়ে যাবে তাই ওর ভাই গিফট করেছে। ভাইয়ের এমন হাবভাব ভালো ঠেকছে না নূরের। নিশ্চয়ই কোন বদ মতলব আছে। এ বিষয়ে রাশেদ সাহেব কে কিছুই বলেনি নূর। এই খুশির দিনে ঝগড়াঝাঁটি না করাই শ্রেয়। ও গোসল করে নামাজ পড়ে তারপর রান্না ঘরে যায়। গতকাল রাতে কয়েক পদের সেমাই রান্না করে ফ্রিজে রেখেছিল। ইউটিউব দেখে দেখে শিখেছে। এখন স্ন্যাকস বানাবে। বাড়িতে মেহমান আসবে, নূর শুনেছে আজমাঈনদের বাসা থেকে কয়েকজন আসবে। তবে কারা আসবে তা নূর জানে না। নতুন আত্মীয় হবে, যাওয়া আসা থাকতে হবে তো। তাছাড়া ফয়েজের বাড়ি থেকেও সবাই আসবে।

অনুপমা আগে থেকেই রান্নাঘরে ছিলো। নূর আসতেই বলে উঠলো,’বাহ!! চমৎকার দেখাচ্ছে তোমাকে। তোমার ভাইয়ের চয়েজ ভালো জানতাম না তো। আমার জন্যই ভালো কিছু কিনতে পারে না।’

নূর মাথা নিচু করে হাসে। বলে,’আমি কি কি করব ভাবি?’

‘তুমি আবার কি করবে? আমরা সবাই তো আছি।’

‘অনেক মেহমান আসবে শুনলাম, তাই আমিও এলাম।’

‘তোমার হাতের লাচ্ছি, বোরহানি ভালো হয়। ওগুলোই করো। সেমাই তো কালকে রান্না করেছো।’

মাথা দুলিয়ে নূর হাত লাগায়। তবে ভাই ভাবির এই অমোঘ পরিবর্তনে বারবার চমকে যাচ্ছে সে। যদি কখনো সাইমন ওর ব্যাবসার ভাগ চায় বা ওর সাথে কাজ করতে চায় তখন কি করে না করবে? বাবার মনে দুঃখ দিয়ে সে যে কিছুই করতে পারবে না।

রাশেদ সাহেব নিজ টাকায় কোরবানি দিচ্ছেন, সাইমন এবার কুলিয়ে উঠতে পারেনি। নামাজ শেষে ওনারা পশু কোরবানি দেওয়ার জায়গায় চলে গেছেন। অনুভব ও সেখানে গেছে। তাই নূর নিশ্চিন্তে নিজের রুমে গিয়ে বসলো। ফোনে নোটিফিকেশন এসেছে কতগুলো। তার মধ্যে একটা আইশা। ওদের গরুর ছবি দিয়েছে এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আরেকজন শুভেচ্ছা জানিয়েছে, সেই ব্যক্তি হলো আজমাঈন। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার টা আইশার থেকেই নিয়েছে। ডার্ক গ্রিন কালারের শার্ট, চোখে সানগ্লাস পরে তার প্রিয় ব্ল্যাক মার্সিডিজের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ছবিটি প্রোফাইলে দেওয়া। প্রোফাইল ছবি ওপেন করতেই দেখলো নূর। তবে মেসেজ সিন করে রেখে দিলো, ছেলেটা আরো পাঁচ ঘন্টা আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এত দেরিতে নূর রিপ্লাই করলে কি ভাববে? এই ভেবে রিপ্লাই করা হলো না ওর। চুপচাপ ফোন রেখে উঠে গেল। পিন করলো আর ফোন ধরবে না। যদি আবার কল করে বসে তখন কি হবে!!

তবে আজমাঈন যে অঘটন আরেকটা ঘটিয়ে ফেলবে তা কে জানত! এতে অবশ্য ছেলেটার কোন দোষ নেই। ঈদের নামাজ শেষ করে এসেছে গরু নিতে। আইশা আবার ড্যাং ড্যাং করে গেছে সেলফি তুলতে। গতকাল তুলতে পারেনি। কে জানতো যে গতকালের মতো আবারও দড়ি ছিঁড়ে যাবে। এবার দু’টো দড়িই ছিঁড়ে গেছে। আইশা পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। আজমাঈন ছুটে গেল বোনকে বাঁচাতে। ওর সাথে থাকা লোকজন ও ছুটলো। আজমাঈন আগে গিয়ে দড়ি ধরল, একা দামাল গরু সামলানো দায়। গরুটা এমন লাফ মারলো যে ছেলেটা উল্টে পড়ে গেল। অন্য দড়িটা পায়ে পেঁচিয়ে গিয়েছিল বিধায় তাল সামলাতে পারেনি। হাতের দড়িটা তো ছুটে গেছেই, উল্টে পড়ে গিয়ে পা কেটে ফেলেছে। মুহুর্তেই সাদা পাজামা লাল হয়ে গেছে। আইশা চিল্লিয়ে উঠলো। মহল্লার সব মানুষ এক হয়ে গেছে। গরু টাকে কোনমতে ধরে বেঁধে কোরবানি দিতে নিয়ে গিয়েছে।

আর আজমাঈন কে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগের বার তো তিনটে সেলাই পড়েছিল। হাতের ঘা এখনও শুকায় নি। এবার পাঁচটা সেলাই পড়লো। ব্যান্ডেজ করার পর, ব্যথার ইঞ্জেকশন দেওয়া হলো। তারপর বাড়িতে ফিরিয়ে আনলো। পুরোটা সময় আজমল শিকদার অস্থির হয়ে ছিলেন। ছেলের কিছু হলে ওনার দম বন্ধ হয়ে আসে। আজ বলতে গেলে অল্পের ভেতর দিয়ে গেছে। কোনমতে যদি গুঁতো খেতো তাহলে অবস্থা আরো খারাপ হতো। বাড়িতে আসার পর থেকে তাহমিনা গুনগুন করে কাঁদছেন। খুশির দিনে কি অঘটন ঘটে গেল। বড় মেয়ে তানাজ পর্যন্ত ছুটে এসেছে ভাইকে দেখতে। ফয়েজ পথে আছে। বন্ধুর এমন খবর শুনে ভয় পেয়ে তখনই রওনা দিয়েছে সে। তানাজ মা’কে মৃদু ধমকে উঠে, ‘আহ আম্মু!! এভাবে কাঁদছ কেন? ভাইয়ার তেমন কিছু হয়নি। সামান্য কেটে গেছে।’

‘বড় কিছু হতে পারত তো, দুই ভাইবোন গতকাল থেকে গরুটার পেছনে পড়ে আছে। কত করে বললাম কাছে যাস না। কে শোনে কার কথা। এখন শুয়ে বসে থাক।’

মায়ের চিন্তা করাটা স্বাভাবিক, তবে অতিরিক্ত চিন্তা যেন না করে সেজন্য তানাজ বলে,’আল্লাহর রহমতে কিছু তো হয়নি আম্মু। কান্নাকাটি না করে সবার জন্য খাবার বাড়ো, কেউই খায়নি। ভাইয়া ওষুধ খাবে তো।’

ওদের কথার মাঝে ফয়েজ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। আজমাঈন টান হয়ে শুয়ে আছে। অবশ ছাড়ছে এখন, একটু একটু ব্যাথা করছে এখন। ইঞ্জেকশন দেওয়ায় ব্যথা বাড়ছে না। ফয়েজ ওর পাশে বসে বললো,’গরুর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলি নাকি? বেশি কিছু হয়েছে?’

তানাজ বললো,’কেটে গেছে, পাঁচটা সেলাই লেগেছে।’

ফয়েজের মাথায় হাত,’ক’দিন আগেই তো হাতে তিনটা পড়লো, এখন আবার পাঁচটা জোগাড় করলি। হয়েছে কি তোর?’

আইশা রুমে এসে বললো,’আঙ্কেল আঙ্কেল, ভাইয়া আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিল। তারপর দড়িতে পা পেঁচিয়ে উল্টে পড়ে গেছে।’

ফয়েজ চোখ গরম করে বলে,’তুই আঙ্কেল বলছিস কাকে?’

আইশা হেঁসে বলে,’আমাদের সম্পর্ক চেঞ্জ হচ্ছে না কাল? তুমি তো আমার আঙ্কেল হয়ে যাচ্ছ। তাই ভাবলাম এখন থেকেই প্র্যাকটিস করি।’

ফয়েজের মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। একথা তো আগে ভাবেনি। রাগি চোখে উঠে দাঁড়াতেই আইশা দৌড়ে পালায়। তানাজ হাসতে হাসতে বলে,’ভালো সম্পর্ক তৈরি হলো বলো ভাইয়া। ওইযে একটা গান আছে না, সম্পর্ক বদলে গেল একটি পলকে। তোমাদের অবস্থা তাই হয়েছে। দুই বন্ধু ছিলে এতদিন। এখন ভাইয়া তোমাকে আঙ্কেল ডাকবে।’

আজমাঈন নিজেও হেঁসে ফেললো, ফয়েজের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। মুখটা গোমড়া করে বলে উঠলো, ‘হাসবি না বলে দিলাম, তাহলে মুখ সেলাই করে দিব।’

আজমল শিকদার ওষুধের প্যাকেট হাতে নিয়ে ভেতরে এলেন। সবাইকে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে দেখে বলেন,’খুব খুশি লাছে তাই না? ওদিকে ডাক্তারের পিছনে কতগুলো টাকা গেল। বিকেলে যে বেয়াই বাড়িতে যাওয়ার কথা তাও যাওয়া হবে না। কালকে তো বিয়ে আছে।’

ফয়েজ হঠাৎ নড়েচড়ে বসলো। বললো, ‘আজমাঈনের এই অবস্থা, কালকে কি বিয়েটা হবে? নাকি ক্যান্সেল করবেন আঙ্কেল?’

আজমাঈন এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠে বলে,’না,,,,,।’

সবাই কেমন অদ্ভুত চোখে তাকায় আজমাঈনের দিকে। ছেলের অবস্থা কাহিল অথচ বিয়ে পেছাতে চাইছে না। এই খোঁড়া পা নিয়ে যাবে বিয়ে করতে?

চলবে,,,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply