#নদীর_ওপারে_সুখ
#সিমরান_মিমি
#পর্ব_০৮
•
“ আমি কি আসবো? ”
দুপুরের কাঠপোড়া রোদে জনজীবন চৌচির। ইদানীং আবহাওয়ার ভাব বোঝা বড়ই মুশকিল। শেষ রাত থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত শীত। এরপর আসরের আজান পর্যন্ত মনে হয় ঋতুতে গ্রীষ্ম চলছে৷ এমন দাবানলের মতো গরম অতিষ্ঠ করে তুলেছে মানুষকে। রাতের তাপমাত্রা আবার ভিন্ন। বলা যায় নাতিশীতোষ্ণ।
অনামিকার মেজাজ রুক্ষ। এক সপ্তাহ আগের এসাইনমেন্ট এখনো সম্পূর্ণ করতে পারেনি সে। এর একমাত্র কারন পান্না। মেয়েটা এতো প্রশ্ন করে যে, সে হাপিয়ে ওঠে৷ ঘড়িতে প্রায় দেড়’টা বাজে। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আরো আধ ঘন্টা চলে যাবে পান্নার। এর মধ্যেই সমস্ত’টা গুছিয়ে ফেলতে হবে। হঠাৎ তার কলম থেমে গেলো। ভ্রুঁ যুগল খানিক বাকিয়ে দরজার দিকে তাকালো। লিখন বুকে হাত বেঁধে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। অনামিকা অনুভব করলো তার হৃদয়টা কেঁপে উঠেছে। সে বিশ্বাস করতে পারলো না। প্রগাঢ় সন্দেহ নিয়ে বললো,
“ রুমে ঢোকার জন্য তুমি আমার কাছে অনুমতি চাইছো? ”
“উঁহু, অনামী। তোর কাছে কেনোই বা অনুমতি চাইবো? আমি তো আমাদের নিভি ম্যামের কাছে অনুমতির প্রত্যাশা করছি। ”
লিখনের চোখ হাঁসছে। তা দেখে কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারলো না অনামিকা। সে টেবিল ছেড়ে বিছানার কাছে গেলো। নিভি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। চেষ্টা করছে না হাসার।
“ নিভি, লিখন ভাই এটা কেন বললো? ”
“ আপু, উনি গতকাল এখানে এসেছিলেন। আমি বলেছি, আপনি নেই। পরে আসতে। তাই এখন অনুমতি নেওয়ার বাহানা করছে। ”
শুনে অনামিকা হেসে ফেললো। পুণরায় পড়ার টেবিলে বসতে বসতে বললো,
“ আসো, আর বাহানা করো না। ”
“যদি মাননীয়া অনুমতি দেন, তবেই আসবো। ”
কি অদ্ভুত রকমের মজা! নিভি প্রতিবারের ন্যায় মৃদু হাসলো। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে বললো,
“ আপনি আসুন। ”
অবশেষে ঘরে পা রাখলো লিখন। পকেটে হাত দিয়ে চারপাশে ঘুরে ঘুরে এটা ওটা হাতে নিয়ে দেখলো। প্রথমে অনামিকার এসাইনমেন্ট নিয়ে নানা কথা বললো। এরপর হঠাৎ বিষয় বদলে সরাসরি নিভি’র উদ্দেশ্যে বললো,
“ তোমার রেজাল্ট তো দারুণ ছিলো। তা এইচএসসি কি এ বছর দিবা? নাকি সামনের বছর। ”
“ জি, রেজিস্ট্রেশন করে এসেছি। ফর্ম ফিল আপের সময় হলে গ্রামে যেতে হবে আবার। ”
“ তাহলে পড়ছো না কেন? সারাক্ষণ’ই তো নাকের ডগায় আত্মসম্মান নিয়ে ঘোরো। এইচএসসি’র পর আবার ভার্সিটি এডমিশন। এতো কিছু সামলাবে কিভাবে? ”
লিখনের ব্যবহার খোঁচা মূলক হলেও এগুলোতে বিরক্ত হয় না নিভি। সে গত দেড়দিনেই তার স্বভাব বুঝে ফেলেছে। কিন্তু খারাপ লাগছে। পরীক্ষার কথা স্মরণ হতেই প্রিয় বইগুলো হারানোর কষ্ট তাঁজা হয়ে উঠছে। হাতে আছে মাত্র নয়শো টাকা। খুব দ্রুত বই কিনতে হবে। তাদের দুজনের কথার মাঝে হঠাৎ অনামিকা কৌতুহলী হলো। বললো,
“ সত্যিই তো। নিভি, তুমি কি বই নিয়ে আসোনি? কই ব্যাগে তো দেখলাম না। ”
নিভি ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে ফেললো। মনমরা হয়ে বললো,
“ নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি। দুটো ব্যাগ সামলাতে পারিনি। ”
“ ইশশ! ”
অনামিকা করুণ স্বরে কিছু বলে ওঠার আগেই লিখন তাকে থামিয়ে দিলো। প্রসঙ্গ বদলে ঝরঝরে কন্ঠে বললো,
“ বইয়ের কথা নাহয় বাদ। কিন্তু আপনি তো গত রাতে খেলেন না। সকালেও খাবার টেবিলে দেখিনি। দুপুরে কি দেখা যাবে? ”
আবারো অসস্তিতে পড়লো নিভি। মিনমিনে স্বরে বললো,
“ আমি খেয়েছি নানুর সাথে। ”
“কখন? ”
“ সকালে, নানুর রুমে বসে। ”
“ বাহ! ডাইনিং টেবিলে লক ডাউন চলছে নাকি? ”
বিরক্ত হয়ে লিখনকে থামিয়ে দিলো অনামিকা। বললো,
“ আহহা লিখন ভাই, ওকে জ্বালাচ্ছো কেন? বেচারী দু-চার দিন থাকুক, এরপর তো সবার সঙ্গে মিশবে। ”
“ ও মিশেই আছে বেনামি। ঝগড়া ঝামেলা সব তোর বড় ভাইয়ের সাথে। ”
“ কোথায় ঝগড়া? নিভি তো সকালেই ক্ষমা চেয়েছিলো ভাইয়ার কাছে। ”
“ তো? হিমাদ্রি ভাই কি চেয়েছে? ”
অবাক হতে হতে হেসে ফেললো অনামিকা। আশ্চর্যের সুরে বললো,
“ হিমাদ্রি ভাইয়া নিভি’র কাছে ক্ষমা চাইবে? এটা তুমি আশা করছো? হা, তাহলেই হলো। ”
অনামিকা এবং লিখনের মধ্যে যখন হিমাদ্রির ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপার নিয়ে তর্ক তুঙ্গে। ঠিক তখনই গম্ভীর হয়ে উঠলো নিভি। বিনয়ের সঙ্গে দুজনকে থামিয়ে শীতল কন্ঠে বললো,
“ আমি চাই না আপনারা গতরাতের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করুন। ঘটনাগুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। দয়া করে, আর ঘাটাবেন না। ”
লিখন এবং অনামিকা একে অপরের দিকে তাকালো। পরক্ষণেই দুষ্টুমি করে অনামিকা বললো,
“ দেখেছো? নিভি তোমার থেকে কতটা বুদ্ধিমতী। ”
দুপুর দুটো বাজতেই আগের দিনের ন্যায় ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়ি টং টং করে বেজে উঠলো। এখন খাবারের সময়। সিঁড়ি দিয়ে প্রত্যেকের নামার আওয়াজ আসছে। তার কিছু মুহুর্ত পর’ই সেই চেনা আওয়াজ। হিমাদ্রি মাহমুদ চৌঁধুরী ড্রয়িংরুমে বসে পায়েচারি করতে করতে ডাকছেন,
“ সিনিওরা, দ্রুত এসো৷ খিদে পেয়েছে। ”
সিনিওরা মাহমুদ বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালেন। এরই মধ্যে খপ করে তার হাত ধরে ফেললো নিভি। মন সায় দিচ্ছে না বলতে। তবুও থেমে থেমে অনুরোধের সুরে বললো,
“ নানু, আপনি আর আমি এখানে বসেই খাই? ঠিক সকালের মতো৷ ”
“ না নানুভাই, দুপুরে হিমাদ্রির সঙ্গে না বসলে ও খাবে না। তুমি আমার সঙ্গেই চলো। কেউ কিচ্ছু বলবে না। আসো। ”
কেউ কিচ্ছু বলবে না, তা নিভি জানে। তবুও, চক্ষুলজ্জার তো একটা বিষয় আছে। গতদিন বদমেজাজি লোকটার সামনে বসে এক বেলা খেয়েছে বলে এতো কথা। এরপর আবারো তার সামনে খাবার গিলবে কিভাবে নিভি? কিন্তু কেউই তার এই অসস্তির কথা বুঝলো না। অগত্যা বাধ্য হয়ে নানুর পিছু এগিয়ে গেলো। ডাইনিং টেবিলের এক তৃতীয়াংশ চেয়ার দখল হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। বাকি আছে মাত্র দুটো। প্রথমটা হিমাদ্রি মাহমুদের পাশে, দ্বিতীয়টা লিখন মাহমুদের পাশে। সম্ভবত এ দুটো বড় মামী এবং ছোট মামীর চেয়ার। নিভি সেখানে বসতে জড়তা অনুভব করলো। সে দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবে। অনামিকা কয়েকবার ইশারা করলো বসার জন্য। শেষমেশ সকল জল্পনা,কল্পনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে লিখনের পাশে বসে পড়লো।
“ আরেহ বাহ! আমি তো ভেবেছিলাম, সিদ্ধান্ত নিতে নিতে তোমার সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে। ”
নিভি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। লোকটার নজর সেই থেকে তার উপর ছিলো, ভেবেই অসস্তি হতে লাগলো।
নিভি লজ্জা পেলে মাথা তুলনামূলক আরো নুইয়ে ফেলে। ওড়না টেনে কপাল অবধি ঘোমটা দেয়। আর সহজে কথা বলে না। এমন অবস্থায় তার চোখ-মুখ দেখতে অন্যজনকে রীতিমতো উঁকি মারতে হয়। লিখন নিভি’র সঙ্গে সহজ হতে চাচ্ছে। যেনো মেয়েটা তার যে কোনো চাহিদা নিঃসংকোচে তার কাছে বলে দেয়। এসব ব্যাপারে সে পটু। দুষ্টুমি করে অপর পক্ষকে জ্বালাতে জ্বালাতে একসময় ভেতরের অপরিচিত দেয়াল ভেঙে ফেলে। তেমনটাই ঘটাতে চাচ্ছে নিভি’র ক্ষেত্রে। কিন্তু কতদূর সফল হতে পারবে, সে চিন্তা এখনো করেনি। খাবারের এক লোকমা মুখে নিয়ে লিখন আবারো চাপা কন্ঠে দুষ্টুমি করে উঠলো,
“ ভেবেছিলাম, আমি বলার পর ডাইনিং এ এসেছো। খুশিও হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি এক হাত ঘোমটা দিয়ে খাচ্ছো। এর কারন কি নিভি, লজ্জা পাচ্ছো? ”
“আপনি অনেক বেশি কথা বলেন। এতো কথা বলা উচিত নয়। ”
নিভি সকলের অগোচরে ফিসফিস করে উত্তর দিলো। দৃষ্টি নিজ প্লেটেই নিবদ্ধ, যেনো কেউ বুঝতে না পারে। হঠাৎ পান্না চিৎকার করে উঠলো৷ বিরক্ত হয়ে বললো,
“ জোরে বলো, আমি কিছু শুনতে পাই নি। ”
একে একে প্রত্যেকের নজর এখন পান্নার উপর। অনামিকা আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ কে জোরে কথা বলবে পান্না? ”
“ওরা ” — বলে লিখন এবং নিভির দিকে আঙুল তুললো । সঙ্গে বিস্তারিত ভাবে বললো,
“ ওরা এভাবে, আস্তে আস্তে কথা বলছে। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। ”
নিভি’র মাথাটা ভনভন করে উঠলো। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে ৪৫°। সে ঘামছে। লজ্জায়, অসস্তিতে হাসফাস করে উঠছে। সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। নিশ্চয়ই অশ্লীল, অস্বাভাবিক কিছু ভাবছে। নিজের উপর সে অসন্তুষ্ট হলো। কেনো কথা বলতে গেলো এই বাঁচাল লোকের সাথে? এবার হয়তো সবাই তাকে জড়িয়ে সন্দেহ করবে।
নিভি’র এই অস্থিরতা লিখনকে ছুতে পারলো না। সে স্বাভাবিক’ই রইলো। মুখের ভাত টুকু খেয়ে ধীরে সুস্থে বললো,
“ আসলে পান্না, নিভি তোমার চেয়েও পড়াশোনায় বেশি ফাঁকিবাজ। বাড়ি’টা তো বরিশালে। তাই ঢাকা অবধি কাপড়ের ব্যাগ শক্ত করে আনতে পারলেও বইয়ের ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছে। আচ্ছা তুমি বলো, এটা কি সত্যিই অনিচ্ছাকৃত। নাকি তোমার মতো ইচ্ছে করে হারিয়ে এসেছে। ”
পান্না হঠাৎ সবার সামনে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো। খিলখিল করে হেসে একপ্রকার ভাইয়ের গায়ে হেলিয়ে পড়লো। বললো,
“এ্যাই ভাইয়া, আমি একদমই ইচ্ছা করে নোটখাতা হারাইনা। ”
এরপর নিভি’র দিকে তাকিয়ে খানিকটা পক্ষপাতিত্ব করে বললো,
“নিবিও ইচ্ছে করে হারায়নি। বইখাতা হারিয়ে ও আমার মতোই দুঃখ পায়, তাই না? ”
বখতিয়ার চিন্তিত হলো। নিভি’র দিকে তাকিয়ে বললো,
“ সে কি মামণি! বই হারিয়ে ফেলেছো, আগে বলবে না? পড়াশোনা তো বন্ধ করা যাবে না। ”
ইখতিয়ার বললো,
“ খাওয়ার পর বইয়ের নাম আমাকে লিস্ট করে দেবে। বুঝেছো? ”
নিভি মাথা তুললো না। ওভাবেই উপরনিচ নাড়ালো। বাঁধ সাধলো লিখন। বললো,
“ তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আমার পরিচিত এক লাইব্রেরিতে কথা বলেছি। সন্ধ্যার মধ্যে বইগুলো পাঠিয়ে দেবে। ”
খাবার টেবিলে বিষয়টাকে কেউই অস্বাভাবিক ভাবে দেখলো না। প্রত্যেকে লিখনের বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট। শুধু দৃষ্টি নড়চড় হলো দুজনের। নিভি অবাক ভঙ্গিতে কয়েক সেকেন্ড লিখনের মুখের দিকে তাকালো। কৃতজ্ঞতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো দুচোখ। পরক্ষণেই মাথা নামিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। অন্যদিকে হিমাদ্রি মাহমুদের চোখেমুখে বিস্তর বিরক্তি। এতো আদিখ্যেতা তার পছন্দ হচ্ছে না। হঠাৎ খাবার টেবিলে গাম্ভীর্যতা ছড়িয়ে লিখনকে প্রশ্ন করলো,
“ গত এক সপ্তাহের মধ্যে একদিনও কি ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলি? ”
লিখন মাথা চুলকালো। বাড়িতে নতুন অতিথি। এর মধ্যে কাজের কথা না তুললেই কি হতো না। এক্ষুনি বখতিয়ার মাহমুদ এবং ইখতিয়ার মাহমুদ ও শুরু করবেন বকাঝকা। নিভি’র সামনে এগুলো না তুললে কি পেটের ভাত হজম হতো না? সে পানি খেয়ে গলা পরিস্কার করলো। এরপর নিভি’র মতোই মাথা নত করে কোনোভাবে অস্পষ্ট স্বরে বললো,
“ হুম। ”
“ কি হুম? ”
“ গেছিলাম তো। ”
“কবে গেছিলি? ”
“ পরশুর তিনদিন আগে। ”
পরক্ষণেই কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে বললো,
“তুমি তো সারাক্ষণ’ই ভার্সিটিতে থাকো। দেখবে কিভাবে, আমি ফ্যাক্টরিতে যাই কি-না? ”
লিখনের বাড়াবাড়ি’তে ইখতিয়ার মাহমুদ চোয়াল শক্ত করে ফেললেন। চাপা হুমকি দিয়ে বললেন,
“ এতো বড় বড় কথা বলো না। যা অঘটন করে এসেছো, তা ঠিক করতে আগামী দু সপ্তাহ লাগবে। ”
হিমাদ্রি কপাল কুঁচকে ফেললো। বলল,
“ কি করেছে ছোটো চাচ্চু? ”
“ হিসেবে গড়মিল। কোনো ঠিক ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিনা। ওকে জিজ্ঞেস করো, কদিন আগে ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে বান্দরবানে ট্যুর দিয়ে এলো — সেই টাকা টার সোর্স কি? ”
নিভি’র সামনে এসব অবান্তর প্রশ্নে মেজাজ গরম হয়ে গেলো লিখনের। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে জবাব দিলো,
“ সোর্স বলতে কি বুঝাচ্ছো? ট্যুরের টাকা যারটা সে দিয়েছে। ”
ইখতিয়ার তাচ্ছিল্য করে হাসলো। “ তুমি ট্যুরে যাবে, আর সেই টাকা দেবে তোমার বন্ধুরা? হাসালে। যত টাকা খরচ তো তুমিই করো। দাদা’র জমিদারি পেয়েছো কি-না! ”
নিভি অসস্তিতে পড়লো৷ পারিবারিক ব্যাপারে বসে থাকা সমুচিত নয় বলে সে দ্রুত উঠে পড়লো। নিভি চলে যেতেই হিমাদ্রি পরিবেশ শান্ত করলো। চাচাকে বুঝিয়ে বললো,
“ এতো রিয়াক্ট করো না। বিকালে ওকে নিয়ে ফ্যাক্টরিতে যাচ্ছি। একটা ট্যুরে আর কতই বা খরচ হয়! ওটা মেটানো যাবে। ”
লিখনের এতোসব প্রশ্নপর্ব ভালো লাগলো না। তার মেজাজ তুঙ্গে। নিভি তো নতুন। তার সামনে বাবা- ভাই মিলে তাকে চোর বানালো। লজ্জায় মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে আর খেলো না। হাত ধুয়ে ধুপধাপ পায়ে উঠে গেলো দোতলায়। যেতে যেতে বললো,
“ ষাট হাজার নিয়েছি। এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দিবো। ”
নভেম্বরের শুরু। সন্ধ্যা নামলেই ধরণীতে মৃদু শীতল হাওয়া বয়। অল্পস্বল্প শীত, তার মধ্যে ঠান্ডা বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে নিভি’র। সে ওড়না’টা আরেকটু ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে নিলো। অনামিকা’র বারান্দা’টা সুন্দর, বড়সড়। তবে একপাশে দুটো ফুল গাছ থাকলে মন্দ হতো না। কেমন মরা মরা লাগছে বারান্দা’টা। নিভি উঁকি দিলো রুমের মধ্যে। অনামিকা একনাগাড়ে লিখে যাচ্ছে। দরজা বন্ধ করে রেখেছে পান্নাকে ঠেকাতে। কাল সকালের মধ্যে জমা দিতে হবে৷ নাহলে ভীষণ ক্ষতি। নিভি একবার চাইলো অনামিকা’কে বিরক্ত করবে না। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলালো। কতক্ষণ’ই বা এভাবে চুপ করে থাকা যায়? একই সঙ্গে থাকলে দুটো কথা তো বলাই উচিত। সে মৃদু স্বরে ডাকলো,
“ আপু! ”
একইভাবে লিখতে লিখতে অনামিকা জবাব দেয়,
“হু, বলো। ”
“ আপনার বারান্দা’টা অনেক সুন্দর, বড়ও। ”
“হু। ”
“ কয়েকটা বন্যফুলের গাছ লাগালে আরো সুন্দর লাগতো। ”
“ উহু, আমার এলার্জি আছে। ফুলের ঘ্রাণ নিতে পারিনা। ”
“ওহহ। ”
ভীষণ অদ্ভুত লাগলো নিভির। এ যাবৎ কত এলার্জির নাম সে শুনেছে। এটা খেলে এই হবে, ওটা খেলে সেই হবে। কিন্তু ফুলের ঘ্রাণ নিলেও যে কারোর এলার্জি হয় – এটা প্রথম শুনলো। সে চুপ করে দেখতে লাগলো বাগান। হঠাৎ অনামিকা নিজে থেকে বললো,
“ তোমাকে যে ঘরটা দিয়েছে, ওটাতেও বারান্দা আছে। পছন্দ মতো ফুল গাছ লাগিয়ে নিয়ো। মালি কাকাকে বললেই এনে দেবে। ”
নিভি সামান্য লজ্জা পেলো। তাকেও আলাদা ঘর দেওয়া হয়েছে ভাবতেই কেমন কেমন লাগছে। যদিও সে খুব একটা ইচ্ছুক না। এমনকি ও ঘরে এখন অবধি যাওয়াও হয়নি। কিন্তু সেখানে একটা বারান্দা আছে, নিজ ইচ্ছামতো গাছ লাগানো যাবে, ভাবতেই মনটা আনন্দিত হলো। হঠাৎ মায়ের কথা ভেবে মন খারাপ হয়ে গেলো তার। এতো আভিজাত্যপূর্ণ বংশীয় মেয়ে সে। কত শখ, আহ্লাদ ত্যাগ করে আবার টিনের চালায় আশ্রয় নিলো। অথচ ফুলের বাগান করার কতই না শখ তার। কিন্তু মেঝো চাচির জন্য সফল হয়নি। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় চাচী সারাক্ষণ ঝগড়ায় লেগে থাকতেন। কোথাও একটা ফুলগাছ লাগাতে গেলেই চেঁচিয়ে বলতেন, এ জায়গা তিনি দেখে রেখেছেন লাউশাক লাগাবে বলে। কতশত বার গাছে ফুল হওয়ার পর ছাগল দিয়ে খাইয়েছেন। খামখেয়ালি করে বলেছেন, গাছে বেড়া দাও। ছাগল বাঁধতে পারবো না। এসব ভেবে নিভি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হঠাৎ ভেতর থেকে অনামিকার কন্ঠ শোনা গেলো,
“ এ্যাই নিভি, দ্রুত নিচে যাও তো। তোমার বইয়ের পার্সেল এসেছে। ”
চলমান…….
আসসালামু আলাইকুম পাঠক, আমার পেইজ এবং আইডি ছাড়া কোথাও এই উপন্যাস দেখলে সরাসরি রি/পো/র্ট মেরে দেবেন।
( যদি সুশিক্ষার অভাব থাকে, তাহলে বারবার বারণ করার পরেও এই পর্ব কপি করে নিজেদের পেইজে ছাড়বেন।)
Share On:
TAGS: নদীর ওপারে সুখ, সিমরান মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নদীর ওপারে সুখ গল্পের লিংক
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৩
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৪
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ১
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৬
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৭
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৫
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ২