Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯৯


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা [পর্ব ৯৯]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

[দ্বিতীয় খন্ড]

“আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি, মিখাইল। তুমি যা চাইছ তাই হবে!”

মিস্টার আলবার্টের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। পরাজিত মানুষের মতো শোনাচ্ছিল তাকে।

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে এসে থমকে গেলেন ইসাবেলা। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।

স্বামীর জন্যই এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েকটি বাক্য তার সমগ্র পৃথিবীকে তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

“আমার পরিবার নিরাপদ থাকবে। নতুন পরিচয় লাগবে। আর পুলিশ যেন আর কখনো আমার পিছু না নেয়। তাহলে তুমি ইলহামকে পাবে।”

ওপাশে মিখাইলের কর্কশ হাসি ভেসে এলো।

“বছরের পর বছর পরে অবশেষে তুমি স্বীকার করলে, আলবার্ট। তুমি সত্যি এক নিকৃষ্ট!”

“আমার আর কোনো উপায় নেই। উপায় ছিল না। যেদিন তুমি মুস্তাক এহসানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলে, সেদিনও উপায় ছিলনা। আজকেও নেই। অবশ্য তোমার থেকে কম মিখাইল। তুমি ঠিক যতটা নিকৃষ্ট তার থেকে বহু গুণে কম আমি!”

কথাটা শুনেই ইসাবেলার শরীর জমে গেল।

মুস্তাক? বিশ্বাসঘাতকতা?

তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল।

ওপাশে মিখাইল আবার বলল,

“তুমি লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে। একটা ফর্মুলার ফাইলের জন্য নিজের বন্ধু, নিজের বিবেক সব বিক্রি করে দিয়েছিলে। আর এখনো নিজেকে বাঁচাতে নিজের মেয়েকে আমার কাছে রাত কাটাতে পাঠাতে রাজি হয়েছো ।”

ঠাস! ইসাবেলার হাত থেকে কাপটা মেঝেতে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।

শব্দটা শুনে মিস্টার আলবার্ট ঘুরে দাঁড়াল।

চোখের সামনে ইসাবেলাকে দেখে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

“ইসাবেলা?”

ফোনটা হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

ইসাবেলার চোখদুটো রক্তাভ।

বিস্ময়, ঘৃণা আর অপমানের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

“মিথ্যুক। জানোয়ার!”

একটা শব্দ। মাত্র একটা শব্দ।

কিন্তু সেই শব্দটাই যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল আলবার্টকে।

“ইসাবেলা, আমার কথাটা শোনো।”

“না!”

চিৎকার করে উঠলেন তিনি।

“এত বছর ধরে আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি!”

রমণীর বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।

“তুমি বলেছিলে পুলিশ তোমাকে ফাঁসাচ্ছে। তুমি বলেছিলে তুমি নির্দোষ।”

কণ্ঠস্বর ভেঙে এলো।

“কিন্তু আজ বুঝলাম তুমি শুধু অপরাধী নও, তুমি একজন কাপুরুষও। বিকৃত মস্তিষ্কের পুরুষ।”

আলবার্ট কয়েক কদম এগিয়ে এলো।

“আমি সব ব্যাখ্যা করতে পারি।”

“কি ব্যাখ্যা করবে?”

ইসাবেলার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

“ব্যাখ্যা করবে কেন মুস্তাক মারা গেল? ব্যাখ্যা করবে কেন মেহমুনা মারা গেল? ব্যাখ্যা করবে কেন আমার মেয়েকে তুমি একট পুরুষের কাছে রাত কাটাতে পাঠাবে? আমার বাচ্চা মেয়ে? তুমি না ওর পিতা? ছিহ্!”

ইসাবেলা শিলামূর্তির ন্যায় স্থবির হয়ে গেলেন।

কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল মিস্টার আলবার্টের সেই জঘন্য স্বীকারোক্তি। মুহূর্তের ব্যবধানে যেন তার সমগ্র অস্তিত্ব ভেঙেচুরে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। যে পুরুষটিকে তিনি এতকাল জীবনসঙ্গী ভেবেছেন, যার কাঁধে মাথা রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছেন, আজ সেই মানুষটির অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা বিভীষিকাময় রূপ প্রত্যক্ষ করলেন।

অতঃপর তিনি আর অভিনয়ের প্রয়োজন বোধ করলেন না।

মুখোশটা যেন নিজেই খুলে ফেললেন।ওষ্ঠে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক বিকৃত, ভয়ংকর হাসি।

“তোমার কি মনে হয়, ইসাবেলা, আমি যা করেছি তা ভুল?”

ইসাবেলা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।আলবার্ট ধীরস্বরে বলতে লাগলেন,

“ভুলে যেও না, আমি যদি ওসব না করতাম তাহলে আজ আমরা জেলের অন্ধকার সেলে পচে মরতাম।”

কথাটা শুনেই ইসাবেলা যেন অগ্নিশিখার ন্যায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠলেন।

“সেটাই তোমার প্রাপ্য ছিল!”

নারীর কণ্ঠে ঘৃণার ঝড়।

“খু”নি! বিশ্বাস’ঘাতক! জানোয়ার!”

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেইঠাস! সপাটে এক চড় এসে পড়ল তার কোমল গালে।প্রচণ্ড অভিঘাতে কাত হয়ে গেলেন ইসাবেলা।দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ন্যান্সি ভয়ে মুখ চেপে ধরল। তার ক্ষুদ্র হৃদপিণ্ডটা যেন আতঙ্কে কেঁপে উঠল।

ইসাবেলা বিস্ফারিত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।আলবার্ট গর্জে উঠলেন,

“চুপ! একদম চুপ!”

কিন্তু ইসাবেলা থামলেন না। বরং আরও দৃঢ় হয়ে উঠলেন।

“আমি তোমার মতো পিশাচের সাথে এক মুহূর্তও থাকব না! আমার মেয়েকে নিয়ে চলে যাব! তুমি একজন অভিশপ্ত মানুষ!”

মিস্টার আলবার্টের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।

তিনি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসাবেলার গলা চেপে ধরলেন। ইসাবেলার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।

চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল। তিনি ছটফট করতে লাগলেন। আলবার্ট দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বললেন,

“শুনে রাখো! নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমি সব করতে পারি। সব!”

শীতল নিষ্ঠুর কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,

“যদি আমার হাতে মরতে না চাও, তাহলে চুপ থাকবে। আর যদি মুখ খোলার চেষ্টা করো…

সে আরও ঝুঁকে এলো।

“তাহলে ভুলে যাবো তুমি আমার স্ত্রী।”

অতঃপর নির্মমভাবে ধাক্কা দিয়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দিল। প্রচণ্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন ইসাবেলা।

আর দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ন্যান্সির চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুবিন্দু।

সেদিন প্রথমবারের মতো সে তার বাবার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে অনুভব করল।

আর ইসাবেলা বুঝলেন তিনি কোনো মানুষের সাথে নয়, লোভে উন্মত্ত এক দানবের সাথে একই ছাদের নিচে বসবাস করে এসেছেন।

********************

“বস, খোঁজ পাওয়া গেছে!”

কথাখানা কর্ণগোচর হতেই আফরিদ এহসানের নীলাভ নেত্রযুগল শিকারি বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বহু বছরের অনুসন্ধান, অসংখ্য ব্যর্থতা, অগণিত গুপ্তচরের তথ্য আর রক্তমাখা প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই মানুষটার সন্ধান মিলেছে! সেই মানুষ যার জন্য এক শিশুর শৈশব ছিন্নভিন্ন হয়েছিল। যার জন্য মুস্তাক এহসানের র’ক্ত ঝরেছিল। যার জন্য মাইমুনা এহসানের জীবনে নেমে এসেছিল অন্তহীন অন্ধকার।

যার জন্য আফরিদ এহসান নামের ছেলেটি ধীরে ধীরে মানবিকতার পথ হারিয়ে প্রবেশ করেছিল অন্ধকার সাম্রাজ্যের গোলকধাঁধায়। আফরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হাতে ধরা স্ফটিক গ্লাসটি ধীরে ধীরে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল তার মুঠোর চাপে।

তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধাল,

“লোকেশন?”

সম্মুখে দাঁড়ানো যুবক দ্রুত ট্যাবলেট এগিয়ে দিল।

“বাংলাদেশের বাইরে নয়, বস। গত তিন মাস ধরে একই জায়গায় আত্মগোপন করে আছে। পরিচয় বদলেছে, চেহারায় পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু আমাদের লোকেরা নিশ্চিত সে-ই মিস্টার আলবার্ট।”

নিস্তব্ধ হয়ে গেল কক্ষ। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। আফরিদ ধীর পদক্ষেপে কাঁচঘেরা জানালার কাছে এগিয়ে গেল। নিচে বিস্তৃত নগরী আলোর মালায় সজ্জিত। অথচ তার চোখে কেবল একটাই মুখ ভেসে উঠছে মুস্তাক এহসান।

র”ক্তাক্ত। অসহায়। ধীরে ধীরে আফরিদের ওষ্ঠে এক শীতল হাসি ফুটে উঠল। এমন হাসি, যা দেখে অনেকেরই মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বয়ে যায়।

“অবশেষে, এত বছর পর অবশেষে তোমাকে খুঁজে পেলাম, মিস্টার আলবার্ট।”

তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই। কোনো ক্রোধও নেই। শুধু এক ভয়ংকর স্থিরতা।যেন বহুদিনের হিসাব মেলানোর সময় উপস্থিত হয়েছে। সম্মুখে দাঁড়ানো লোকগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

তারা জানে আফরিদ যখন এমন শান্ত থাকে, তখনই সে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আফরিদ ধীরে ধীরে কোটটা তুলে কাঁধে চাপাল।

অতঃপর গম্ভীর স্বরে আদেশ দিল,

“গাড়ি বের করো।”

লোকগুলো মুহূর্ত বিলম্ব না করে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই আফরিদ আবার ডাকল।

“শোন।”

সবাই থমকে দাঁড়াল। আফরিদের দৃষ্টি তখনও জানালার ওপারে।

“আজ কোনো ভুল চাই না।”

আফরিদের কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল।

“বহু বছর ধরে যে মানুষটা ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল, আজ তাকে আমার সামনে চাই। জীবিত।”

“ইয়েস, বস।”

দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আফরিদ একা দাঁড়িয়ে রইল।

মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।

চোখের গভীরে জ্বলছে প্রতিশোধের বহু বছরের দাবানল। আজ তার সামনে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি নেই।

********************

মুখে আতঙ্কের ছাপ। আলবার্টের মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।

“ইলহাম?”

কন্যাটি ভয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল। ইসাবেলার হৃদপিণ্ড যেন থেমে গেল।

“ইলহাম! মা, এদিকে আসো!”

কিন্তু ন্যান্সি নড়ল না। তার ছোট্ট চোখদুটো শুধু বাবার দিকে স্থির।যে বাবাকে সে এতদিন পৃথিবীর সেরা মানুষ ভেবেছে।আজ সেই মানুষটাকেই অচেনা লাগছে। আলবার্ট ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।

“প্রিন্সেস… তুমি ভুল বুঝেছো।”

ন্যান্সি মাথা নাড়ল।

“নো…

কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করল সে।

“ইউ মেড মম ক্রাই!”

কথাটা শুনে ইসাবেলার বুক ভেঙে কান্না এলো।

আর আলবার্টের মুখটা অদ্ভুতভাবে কঠিন হয়ে উঠল।

সেই রাতেই প্রথমবারের মতো ইসাবেলা উপলব্ধি করল যে মানুষটি একদিন তার স্বপ্ন ছিল, আজ সেই মানুষটিই তার এবং তার কন্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।

********************

গভীর রাতের এই নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঘুমন্ত ইলহাম ন্যান্সিকে কোলে নিয়ে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো ইসাবেলা! মেয়েটাকে বাঁচাতে হলে এখান থেকে পালাতে হবে! এই মূহুর্তে! ন্যান্সি ছোট কন্যা মায়ের সাথে লেপ্টে আছে। তাকে গাড়ির পিছনে বসিয়ে দিল ইসাবেলা! ন্যান্সির ঘুম ছুটে যেতেই নিজেকে গাড়িতে দেখতে পেয়ে শুধোয়,

“মম আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

কথাটা শুনতেই ইসাবেলা মেয়ের স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে আদুরে চুম্বন এঁকে দিতে দিতে বলল,

“আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি ইলহাম!”

ন্যান্সি ফের শুধোয়,

“কিন্তু ড্যাড?”

“ড্যাড আমাদের সাথে যাচ্ছেনা সোনা। আমরা ড্যাডের থেকে পালাচ্ছি। তুমি দেখলে না ড্যাড আমাদের কিভাবে কাঁদিয়েছে?’

ন্যান্সি উপর নিচে মাথা দোলায়!অতঃপর ইসাবেলা দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল!গাড়ি স্টার্ট দিতেই বাড়ির ভেতর থাকা মিস্টার আলবার্টের ঘুম ভেঙ্গে গেল! মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠে! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো! অতঃপর দ্রুত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল

দ্রুত পদে এগিয়ে গেলেন! একটা গাড়ি দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে,ওটায় ইসাবেলা রয়েছে চিনতে ভুল হলো না মিস্টার আলবার্ট ক্ষিপ্ত গতিতে দ্রুত এগিয়ে গেলেন। এই মূহুর্তে ওদের ধরতেই হবে! কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে তার পূর্বেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ইসাবেলা!

মিস্টার আলবার্ট আর অপেক্ষা করলেন না, তিনিও অন্য একটা গাড়ি নিয়ে এগোতে লাগলেন!

**************

নিশীথ রাতের গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলেছে গাড়িটি।

স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে আছেন ইসাবেলা। তার শুভ্র ললাটজুড়ে উৎকণ্ঠার স্বেদবিন্দু চিকচিক করছে। বারংবার রিয়ার-ভিউ মিররে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই হৃদপিণ্ড যেন হিমশীতল হয়ে এলো।পেছনে ধেয়ে আসছে চারটি কৃষ্ণবর্ণ এসইউভি।দূর থেকে দেখলে মনে হবে, ক্ষুধার্ত নেকড়ের একটি দল তাদের শিকারকে ঘিরে ফেলেছে।

ইসাবেলার করোটির ভেতর অশুভ আশঙ্কা তীব্রতর হয়ে উঠল। ওষ্ঠদ্বয় কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করে উঠলেন,

“নো… নো… এরা কারা?”

পাশের সিটে বসে থাকা ছোট্ট ইলহাম ন্যান্সি নিষ্পাপ বিস্ময়ে মায়ের মুখপানে তাকালো।

“মম? হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

কিন্তু ইসাবেলা উত্তর দেওয়ার অবস্থায় নেই।মৃত্যুভয় মানুষের বিবেককেও অবশ করে দেয়।পরমুহূর্তেই তিনি হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলেন।চাকার বিকট ঘর্ষণে কেঁপে উঠল সমগ্র পথ।গাড়িটি প্রধান সড়ক ত্যাগ করে প্রবেশ করল অরণ্যের অন্তঃস্থলে অবস্থিত এক নির্জন, দুর্গম পথে।দুই পার্শ্বে মহীরুহ বৃক্ষরাজি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের বিস্তৃত শাখাপ্রশাখা আকাশকে ঢেকে দিয়েছে।

চারপাশে এক বিভীষিকাময় নৈঃশব্দ্য।শুধু ইঞ্জিনের গর্জন আর হৃদস্পন্দনের শব্দ।কিন্তু ভাগ্য যেন আজ তাদের প্রতি নির্মম।অরণ্যের অন্ধকার চিরে হঠাৎই বজ্রপাতের ন্যায় একটি কালো গাড়ি এসে প্রচণ্ড বেগে আঘাত হানল তাদের গাড়ির পেছনে।

ধাম!

বিকট শব্দে কেঁপে উঠল সমগ্র পরিবেশ।ইসাবেলার হাত থেকে প্রায় ছিটকে গেল স্টিয়ারিং।গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেপরোয়াভাবে দুলতে লাগল।ছোট্ট ন্যান্সি সামনের দিকে ছিটকে পড়ে আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল,

“মমমম!”

ইসাবেলার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।তিনি প্রাণপণে গাড়ি সামলানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু পরবর্তী আঘা’তটি এলো আরও ভয়াবহভাবে।

আরেকটি গাড়ি পাশ থেকে এসে সজোরে ধাক্কা দিল।

সময় যেন স্থবির হয়ে গেল।

সবকিছু ধীরগতিতে ঘটতে লাগল।গাড়িটি কয়েকবার পাক খেয়ে সামনে থাকা একটি বিশাল বৃক্ষকাণ্ডে সজোরে আছড়ে পড়ল।ভেঙে চুরমার হয়ে গেল কাঁচ।

চারদিকে উড়ে গেল অসংখ্য কাঁচের টুকরো।

একইসঙ্গে বিকট বিস্ফোরণের ন্যায় শব্দ তুলে খুলে গেল পিছনের দরজা।আর সেই মুহূর্তেই ছোট্ট ইলহাম ন্যান্সির ক্ষুদ্র দেহটি ভারসাম্য হারিয়ে বাইরে ছিটকে গেল। একবার।দু’বার। তিনবার।পাথুরে ঢালে আছড়ে পড়তে পড়তে সে গড়িয়ে নিচের গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

যেন রাত্রির অতল গহ্বর তাকে গ্রাস করে নিল।

ইসাবেলার বুক বিদীর্ণ হয়ে গেল।

“ন্যান্সিঈঈঈ!”

তার আর্তচিৎকার সমগ্র অরণ্যকে প্রকম্পিত করে তুলল। তিনি উন্মাদের ন্যায় হাত বাড়ালেন।কিন্তু আঙুলের ডগাও স্পর্শ করতে পারলেন না নিজের কন্যাকে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।মাতৃত্বের সবচেয়ে নির্মম অসহায়ত্বের সাক্ষী হলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির সম্মুখভাগে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল আগুন।

ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল চারপাশ।ইসাবেলা মরিয়া হয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলেন।বারবার।অসংখ্যবার। কিন্তু দরজাটি ভেতর থেকে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। তিনি বন্দি। অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে বন্দি। নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসছে।আর ঠিক তখনই তার চক্ষুদ্বয় স্থির হয়ে গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি গাড়ির উপর।সেখানে বসে আছে একজন পুরুষ।অচঞ্চল।নির্বিকার।নির্দয়। মিস্টার আলবার্ট।তার দৃষ্টি শীতল। হিমবাহের চেয়েও শীতল।

যেন সামনে কোনো মানুষ নয়, কোনো দৃশ্য নয় কেবল একটি প্রয়োজনীয় কাজের সমাপ্তি দেখছে।ইসাবেলার সমগ্র অস্তিত্ব কেঁপে উঠল।এই প্রথম নয়।

কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করলেন এই মানুষটি কখনোই তাকে ভালোবাসেনি ভালোবেসেছিল কেবল নিজেকে।নিজের লোভকে।নিজের অস্তিত্বকে।

অন্য সবাই ছিল তার কাছে কেবল ব্যবহারযোগ্য বস্তু।

ইসাবেলার চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল।

কম্পমান ওষ্ঠে ফিসফিস করে বললেন,

“তুমি… তুমি আমাকে মেরে ফেলতে এসেছো…

আলবার্ট কোনো উত্তর দিল না।দিল না কোনো অনুশোচনার চিহ্নও।কেবল কয়েক মুহূর্ত নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল। অতঃপর ধীরে ধীরে গাড়ির কাচ তুলে দিল। ইঞ্জিন গর্জে উঠল। গাড়িটি ঘুরে দাঁড়াল।

আর অরণ্যের গাঢ় অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।একবারও পিছনে ফিরে তাকাল না।একবারও না।

ইসাবেলা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার চারপাশে তখন অগ্নিশিখার উন্মত্ত নৃত্য।ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নিশ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ।আর এক মায়ের হৃদয়ভাঙা আর্তনাদ। শেষবারের মতো তিনি আকাশপানে তাকিয়ে ফিসফিস করে উচ্চারণ করলেন,

“ন্যান্সি… মা আমার…হে ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করো,,, আমার মেয়েকে বাঁচাতে হবে!”

ইসাবেলা ডুকড়ে কেঁদে উঠলেন,কণ্ঠ ভেঙে গেল। আর রাতের নিস্তব্ধতা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল এক অসহায় মায়ের বুকচেরা বিলাপ।

টিকটিক নিশীথের স্তব্ধতা ভেদ করে সময় যেন নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে চলেছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই দূর অরণ্যপথ কাঁপিয়ে একে একে আরও তিনটি কৃষ্ণবর্ণ গাড়ি এসে থামল দুর্ঘটনাস্থলের নিকটে।

ব্রেকের কর্কশ ঘর্ষণে চারপাশের নিস্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। প্রথম গাড়ির দরজা খুলতেই দীর্ঘদেহী এক পুরুষ বেরিয়ে এলো।আফরিদ এহসান। তার নীলাভ নেত্রযুগল মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল সম্মুখের বিভীষিকাময় দৃশ্যের উপর।

উল্টে থাকা গাড়িটি ইতোমধ্যেই অগ্নিদগ্ধ হতে শুরু করেছে। দাউদাউ করে জ্বলছে ধাতব কাঠামো।অগ্নিশিখাগুলো যেন উন্মত্ত রাক্ষসের জিহ্বার ন্যায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

কৃষ্ণবর্ণ ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশের বুকে উঠে যাচ্ছে। আফরিদের সমগ্র দেহ মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল।

“ড্যামিট!”

এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে সে ছুটে গেল গাড়িটির দিকে। পিছন পিছন দৌড়ে এলো তার গার্ডরাও। আফরিদ উল্টে থাকা গাড়িটির দরজা টানতে লাগল।একবার।দু’বার। বারবার।

কিন্তু লক সিস্টেম সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেছে।ভেতর থেকে আটকে রয়েছে। অগ্নিশিখার উত্তাপ ইতোমধ্যেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার হাতের চামড়া পর্যন্ত ঝলসে যাওয়ার উপক্রম।

পাশ থেকে তার লোকেরা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।কিন্তু আগুন ততক্ষণে গাড়ির ইঞ্জিন অংশে পৌঁছে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।ঠিক তখনই আফরিদের দৃষ্টি পড়ল ভেতরে আটকে থাকা নারীর উপর।ইসাবেলা। র’ক্তা’ক্ত।

অর্ধচেতন। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসহায় মা। আফরিদের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

সে সজোরে চিৎকার করে উঠল,

“মিস ইসাবেলাআআ

তার কণ্ঠস্বর অরণ্যের বুক কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

ইসাবেলা কষ্টে কষ্টে চোখ মেললেন।অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকালেন অপরিচিত পুরুষটির দিকে।তার ওষ্ঠদ্বয় কাঁপছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন মৃত্যুর সাথে সংগ্রাম।

অতঃপর ভাঙা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,

“আ… আমার… মেয়ে…

শেষবারের মতো গলা বুজে আসছে।

“আমার… ন্যান্সি…

আফরিদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।সে কিছুই বুঝতে পারছে না।ইসাবেলা আবারও কাঁপা হাতে ইশারা করলেন।বারবার।একই দিকে।পিছনের দিকে।

আফরিদ দ্রুত ঘুরে তাকাল।তার মনে হলো হয়তো ইলহাম ন্যান্সি গাড়ির পিছনে কোথাও আটকে আছে। হয়তো এখনো বেঁচে আছে।হয়তো কিন্তু ঠিক তখনই অভিজ্ঞতার তীব্র সতর্কবার্তা তার মস্তিষ্কে আ’ঘাত হানল।ইঞ্জিন অংশে আগুন পৌঁছে গেছে।আর কয়েক সেকেন্ড।শুধু কয়েক সেকেন্ড।তারপর বিস্ফোরণ।

আফরিদের চোখ হঠাৎ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

সে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,

“রান! রান! এভরিবডি রান!”

অতঃপর নিজেও পিছিয়ে আসতে শুরু করল।

তার নিরাপত্তারক্ষীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ধ্বাআআমমমম!পৃথিবী কেঁপে উঠল।

এক বিকট বিস্ফোরণে আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের ন্যায় ছিটকে উঠল অগ্নিশিখা।গাড়িটির ধাতব কাঠামো ছিন্নভিন্ন হয়ে আকাশে উড়ে গেল। চারদিকে ছিটকে পড়ল জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ।অগ্নি’কু’ণ্ডের তীব্র অভিঘাতে মাটি পর্যন্ত কম্পিত হয়ে উঠল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য সমগ্র অরণ্য লালাভ অগ্নিরশ্মিতে আলোকিত হয়ে উঠল। আফরিদ থমকে দাঁড়িয়ে রইল।তার নীলাভ নেত্রযুগল স্থির হয়ে আছে সেই দৃশ্যের উপর। সময়ের গতি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

সে শুধু দেখল জ্ব’লন্ত গাড়িটির বিকৃত অবশেষ কয়েকবার ঘুরপাক খেয়ে রাস্তার কিনারা ভেঙে নিচের অতল খাদে গড়িয়ে পড়ল।

একবার। দু’বার। তিনবার। তারপর অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল। শুধু শোনা গেল ধাতব সংঘর্ষের দূরবর্তী প্রতিধ্বনি। তারপর নিস্তব্ধতা। এক বিভীষিকাময়, শবাধারের ন্যায় নিস্তব্ধতা।আফরিদ এহসান পাষাণমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।তার চারপাশে ধোঁয়া।আগুনের গন্ধ।

পোড়া ধাতুর তীব্র দহনগন্ধ। আর তার কর্ণকুহরে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল এক মৃ’ত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ বাক্য,

“আমার… ন্যান্সি…

সেই শব্দ যেন রাতের অন্ধকার ভেদ করে সরাসরি গিয়ে বিদ্ধ করল তার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে।

**************

পিটপিট করে চক্ষু উন্মোচন করতেই ন্যান্সি দেখতে পেল উপরে সাদা-ধূসর সিলিং, নিস্তব্ধ আলোয় ঢাকা এক অচেনা কক্ষ। দৃষ্টির পর্দা তখনো ঝাপসা, চারপাশের জগৎ যেন কুয়াশার আবরণে আচ্ছন্ন।

নড়ার চেষ্টা করতেই শরীর প্রতিবাদ করল।পা দুটো ভারী, অবশপ্রায়; মাথার ভেতর তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার সঞ্চার যেন কেউ ধারালো কাঁটা ঢুকিয়ে বারবার ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

নরম কোমল মুখমণ্ডলটি ক্ষতবিক্ষত নয়, তবে রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে গালে দুর্বলতা ও আঘাতের সম্মিলিত চিহ্ন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর অস্থির ঢেউ।

সে ধীরে ধীরে চারপাশ বোঝার চেষ্টা করল।

“আমি… কোথায়?”

অতঃপর ক্ষীণ, ভাঙা কণ্ঠে ডাকল,

“ম,,মম!”

ঠিক সেই মুহূর্তেই কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এক পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“এই যে বাচ্চা! আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”

ন্যান্সি চমকে উঠল।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল।কণ্ঠস্বরটি অপরিচিত, অথচ স্থির ও কর্তৃত্বপূর্ণ।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক পুরুষ মামুন হায়দার।

তার মুখাবয়বে উদ্বেগের ছায়া, চোখে মানবিক সহানুভূতি।

কিছুটা দূরে আরেক নারী আফিয়া হায়দার নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ন্যান্সি স্তব্ধ হয়ে রইল।কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, শুধু স্থির দৃষ্টি।মামুন ধীরে ধীরে তার শয্যার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন,

“ব্যথা করছে, মা?”

ন্যান্সি উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি যেন শূন্যতার গভীরে হারিয়ে গেছে। আফিয়া এগিয়ে এসে নরম স্বরে প্রশ্ন করলেন,

“তোমার নাম কী, মেয়ে? তোমার পরিবার কোথায়?”

প্রশ্নটি যেন তার চেতনায় ভারী পাথরের মতো আঘাত করল।ন্যান্সির ঠোঁট কেঁপে উঠল।নাম?পরিবার? এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল।মনে পড়ছে না কিছুই।শুধু এক অস্পষ্ট অনুভূতি কেউ যেন ছিল।খুব কাছের কেউ।তার হৃদয় হঠাৎ সংকুচিত হয়ে উঠল। সে কাঁপা গলায় বলল,

“মাই নেইম,,ইলহাম,,ন্যান্সি। ইলহাম ন্যান্সি, মেইবি আই থিঙ্ক।

নাম উচ্চারিত হলেও পরিচয়ের পূর্ণতা সেখানে অনুপস্থিত। আফিয়া ও মামুন একে অপরের দিকে তাকালেন। দৃষ্টি বিনিময়ে জন্ম নিল উদ্বেগ।

মামুন ধীরে বললেন,

“কোথায় থাকো তুমি? কী হয়েছিল তোমার সাথে?”

ন্যান্সি চেষ্টা করল উত্তর দিতে। কিন্তু স্মৃতির দরজা যেন বন্ধ।মস্তিষ্কে কেবল অন্ধকার, ভাঙাচোরা ছায়া।

কোনো দৃশ্য স্পষ্ট নয়। শুধু এক নারীর কণ্ঠস্বর অদূর অতীতের ভেতর থেকে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সে কেঁপে উঠল।

“আই,,, আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড,,

এই বাক্যটি শেষ হতেই কক্ষের সবকিছু স্তব হয়ে গেল। আফিয়া চমকে উঠলেন। মামুন গম্ভীর হয়ে গেলেন। গত চারদিন ধরে তারা এই কন্যাটিকে আশ্রয় দিয়ে আসছেন অচেতন অবস্থায়, পাহাড়ি খাদসংলগ্ন ঝোপঝাড়ে পাওয়া এক রহস্যময় পরিচয়হীন শিশু।

আজই প্রথম তার চেতনা পূর্ণভাবে ফিরে এসেছে।

কিন্তু স্মৃতি?

স্মৃতি যেন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত। আফিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার কপালে হাত রাখলেন।

“চিন্তা কোরো না মা। ধীরে ধীরে সব ফিরে আসবে।”

ন্যান্সি কিছু বলল না। তার চোখে জমে উঠছে অনির্বচনীয় শূন্যতা। কারণ ভেতরে কোথাও একটা অনুভূতি ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছে সে কাউকে হারিয়েছে।

অপরিসীম আপন কাউকে।কিন্তু কে?মম?মম কে?চোখের সামনে বারবার এক নারীর অবয়ব ভেসে উঠছে অস্পষ্ট, ভাঙা, কুয়াশাচ্ছন্ন।আর প্রতিবারই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে অজানা বেদনা।

ন্যান্সি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করল। আর সেইঅন্ধকারের ভেতরেই হারিয়ে যেতে লাগল তার নিজেরই বিস্মৃত অতীত।

“মাই মেমোরি,,, ইজ ব্রোকেন।”

**************

অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষখানা যেন কোনো পরিত্যক্ত সমাধির প্রতিরূপ। স্যাঁতসেঁতে প্রাচীর বেয়ে ঝরে পড়ছে জলের ক্ষীণ ধারা, আর কোথাও কোথাও জমে থাকা আর্দ্রতা থেকে ভেসে আসছে এক বীভৎস গন্ধ। হাত-পা শক্ত রশিতে আবদ্ধ অবস্থায় শীতল মেঝেতে পড়ে আছেন মিস্টার আলবার্ট। জ্ঞান ফিরতেই সমগ্র দেহে যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ল।

তিনি চোখ মেলে চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু চারিদিকে কেবলই ঘন কৃষ্ণ অন্ধকার। এমন অন্ধকার, যেখানে নিজের হাতটাও দেখা যায় না।

কিয়ৎক্ষণ স্মৃতির ভগ্নাংশগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলেন তিনি।

শেষ যা মনে আছে তিনি গাড়িতে ছিলেন।ইসাবেলাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছিলেন। তারপর কয়েকটি গাড়ি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। তিনি গতি বাড়িয়েছিলেন। পালানোর চেষ্টাকরেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় সেদিন তার প্রতি করুণা প্রদর্শন করেনি।যেভাবে তিনি ইসাবেলার গাড়িকে আ’ঘাত করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই একটি গাড়ি এসে তার গাড়িকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয়।

তারপর শূন্যতা। সম্পূর্ণ অন্ধকার।মিস্টার আলবার্ট কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন,

“কেউ আছো? কে আছো এখানে?”

কোনো উত্তর এলো না। শুধু দূরে কোথাও টিক টিক,টিক ঘড়ির কাঁটার শব্দ।মনে হচ্ছিল প্রতিটি শব্দ তার মৃত্যুর কাউন্টডাউন।হঠাৎ খস খস,খস জুতোর শব্দ। ধীর,স্থির।ভয়ংকর।

মিস্টার আলবার্টের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

“কে তুমি?”

তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন।

“কে?”

অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে এলো এক শীতল কণ্ঠস্বর।

“ওয়েলকাম, মিস্টার আলবার্ট।”

কণ্ঠস্বরটা শুনেই তার সমগ্র শরীর অবশ হয়ে গেল।

“ওয়েলকাম টু দ্য ব্লাড ওয়ার্ল্ড।”

পরমুহূর্তে কক্ষের এক কোণে ক্ষীণ লাল আলো জ্বলে উঠল। আর সেই আলোয় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলো এক পুরুষের অবয়ব।সুদীর্ঘ দেহ।কালো পোশাক।

চোখ দুটো চশমার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে । অদ্ভুত নির্মমতা মাখানো হাসি।আফরিদ এহসান।

মিস্টার আলবার্টের মুখ থেকে আতঙ্কিত স্বর বেরিয়ে এলো,

“কে তু… তুমি?”

আফরিদের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

“অবাক হচ্ছেন?”

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

“আমাকে চিনতে পারছেন না?ওহহ শিট!।”

কথাটা শুনতেই আলবার্টের মুখের রক্ত যেন মুহূর্তে শুকিয়ে গেল।

আফরিদ ঝুঁকে তার চোখের সমান্তরালে এসে দাঁড়াল।

অতঃপর ফিসফিসিয়ে বলল,

“মৃত্যু খুব সহজ শাস্তি, মিস্টার আলবার্ট। আমি আপনার জন্য সহজ কিছু চাইনি।”

তারপর শুরু হয় বন্দিত্ব।একদিন।দুইদিন।এক সপ্তাহ।এক মাস।এক বছর।তারপর আরেক বছর।এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ দশটি বছর। দশ বছরের সেই বন্দিত্বে আলবার্ট সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেন।তিনি জানতেন না বাইরে সূর্য উঠেছে নাকি অস্ত গেছে।

জানতেন না কোন মাস চলছে।কোন বছর চলছে। জানতেন না তার স্ত্রী জীবিত নাকি মৃত। তার কন্যা বেঁচে আছে নাকি হারিয়ে গেছে পৃথিবীর কোথাও। কিন্তু এই পাষন্ড আগুন্তক বলেছে তার কন্যা জীবিত।তার কাছে রয়েছে।

শুধু জানতেন তিনি বন্দী। আর তার প্রতিটি নিশ্বাস আফরিদ এহসানের অনুমতিতে চলছে।প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার আসত। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পাহারাদার আসত। কিন্তু কেউ কথা বলত না।

কেউ উত্তর দিত না। কেউ করুণা দেখাত না। কথা বলার সঙ্গি ছিলেন মিস্টার কামাল!

একসময় যে মানুষ অর্থ, ক্ষমতা আর লোভের নেশায় নিজের বিবেক বিক্রি করে দিয়েছিল, সে মানুষটিই ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতার কারাগারে ভেঙে পড়তে শুরু করল।

তার চুল শুভ্র হয়ে গেল। মুখজুড়ে বয়সের গভীর রেখা ফুটে উঠল। চোখের দীপ্তি নিভে গেল।কিন্তু আফরিদ? সে প্রতিবার আসত একইভাবে।নীরবে। ঠান্ডা দৃষ্টিতে।

চলবে………….।🔥

(আফরিদ, আফরিদ, আফরিদ ঠিক এখানটায় আটকে গেছি। আফরিদের অতীত এতটাই নৃশংস ছিলো যে সে যাই করুক,কখনো অপরাধী বলতে ইচ্ছে করে না।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply