Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯৮


অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৯৮]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

[দ্বিতীয় খন্ড]

স্তব্ধ ন্যান্সির সমগ্র দেহ কাঁপছে।

চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা। কণ্ঠস্বর ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে এলো,

“আপনি… আপনি কি সত্যিই আমাকে মারতে চেয়েছিলেন তখন?”

ভাঙাচোরা রিসার্চ সেন্টারের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো প্রশ্নটা।চারপাশে ধ্বংসস্তূপ।

ভাঙা কাঁচ।জং ধরা লোহার গন্ধ।আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আফরিদ এহসান।এক হাতে সিগারেট।

অন্য হাত পকেটে গুঁজে রাখা।সে মৃদু হেসে সিগারেটে দীর্ঘ টান দিল।ধোঁয়ার ধূসর কুণ্ডলী বাতাসে ভেসে উঠল।

অতঃপর নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল,

“তখন আমার মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল।”

একটু থামল সে।তারপর ধীরে ধীরে ন্যান্সির দিকে তাকাল।

“তুই মিস্টার আলবার্টের র’ক্ত। ওই মানুষটার মেয়ে। যে মানুষটা আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।”

ন্যান্সির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“তাহলে কেন মা’রলেন না? কেন শেষ করে দিলেন না আমাকে? সেদিন যদি মে’রে ফেলতেন, তাহলে আজ আমাকে এইসব দেখতে হতো না!”

ডুকড়ে কেঁদে উঠলো রমণী। অভিযোগ করে বলে,

“আমার নিষ্পাপ শিশুটাকেও ম’রতে হতো না। আমার জীবনটাও এমন হতো না।”

ন্যান্সি দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

রিসার্চ সেন্টারের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।

আফরিদ কিছু বলল না।শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কয়েক সেকেন্ড। তারপর কয়েক মিনিট। মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে।

অবশেষে আফরিদ নিচু স্বরে বলল,

“জানিস, সেদিন আমি সত্যিই ভেবেছিলাম তোকে ঘৃণা করি। কারণ তোর শরীরে আলবার্টের র’ক্ত বইছে। আমি বিশ্বাস করতাম, বেইমানের সন্তানও বেইমান হয়।”

আফরিদের ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটল। চোখ দুটো রক্তিম!

“কিন্তু তারপর তুই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললি আমার চোখগুলো সুন্দর। উহু সুন্দর নয় ভাঙাচোরা বাংলা।”

ন্যান্সি মাথা তুলে তাকাল। আফরিদের দৃষ্টি দূরে কোথাও নিবদ্ধ। যেন বহু বছর আগের সেই রাতটা আবার দেখছে।

“তোর চোখে কোনো ভয় ছিল না। কোনো ঘৃণা ছিল না। শুধু একটা বাচ্চা মেয়ের সরল বিস্ময় ছিল।”

আফরিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ন্যান্সির চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে নির্বাক।আফরিদ সিগারেটের ছাই মাটিতে ফেলে দিল।

অতঃপর ধীর কণ্ঠে বলল,

“আমি তোকে বাঁচিয়েছিলাম করুণা করে নয়। আমি তোকে বাঁচিয়েছিলাম কারণ তোর মধ্যে আমি অপরাধীকে দেখিনি। দেখছিলাম একটা মেয়েকে। যাকে দেখে কয়েক মূহুর্তের জন্য আমার পুরো দুনিয়া থমকে গিয়েছিল।”

*****************

রাত্রির নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎই সিকিউরিটি অ্যালার্মের কর্কশ শব্দ প্রকম্পিত হয়ে উঠল সমগ্র প্রাসাদজুড়ে। লাল সতর্কবাতি একনাগাড়ে জ্বলে-নিভে চারদিকে বিপদসংকেত ছড়িয়ে দিতে লাগল।

ইভেলিনা যেন নিজের প্রাণের সমস্ত সাহস একত্রিত করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই অ্যালার্ম বাটনের উপর।

বিপ… বিপ… বিপ… মুহূর্তেই বাইরে অবস্থানরত সিকিউরিটি গার্ডদের ওয়্যারলেস সেটে সতর্কবার্তা পৌঁছে গেল।এলেনের মুখ থেকে তীব্র বিরক্তি মিশ্রিত গর্জন বেরিয়ে এলো,

“শিট!”

তার চোখে-মুখে তখন বিপদের স্পষ্ট ছাপ।ঠিক সেই মুহূর্তেই আফরিদ বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। তার নীলাভ চোখদুটি অদ্ভুত হিংস্রতায় চকচক করে উঠেছে।

এলেন ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গ্যাস লাইনের ভালভ খুলে দিল সে। শোঁ শোঁ শব্দে দাহ্য গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল চারদিকে।

সমগ্র বাড়ি ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে লাগল।

অপরদিকে আফরিদ ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইভেলিনার দিকে।

“তুই ভুল করেছিস!”

কথাটা বলেই সজোরে একটি চড় বসিয়ে দিল তার গালে।ধপাস!ইভেলিনা মেঝেতে পড়ে গেল।চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো তার।ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো একের পর এক চিৎকার,

“সিকিউরিটি অ্যালার্ট!”

“মুভ! মুভ!”

“চেক দ্য হাউস!”

এলেন দ্রুত ফিরে এসে আফরিদের বাহু চেপে ধরল।

“রান, আফরিদ! রান!”

এলেনের কণ্ঠে জুড়ে তীব্র তাগিদ।

“তুই ইভেলিনাকে নিয়ে বের হয়ে যা। আমি ন্যান্সিকে নিয়ে আসছি!”

আফরিদ একবার তাকাল ছোট্ট ন্যান্সির দিকে।মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। তার নিষ্পাপ দুটি চোখ অশ্রুতে টলমল করছে।

হঠাৎই সে ছুটে এসে আফরিদের জ্যাকেট আঁকড়ে ধরল।

“ডোন্ট লিভ মি… প্লিজ!”

কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল সে।এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গোলাপি গাল বেয়ে। সেই ক্ষণিক মুহূর্তে আফরিদের হৃদয়ের গভীরে যেন কোথাও একটা অদ্ভুত আলোড়ন জেগে উঠল।কিন্তু পরক্ষণেই তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠল মুস্তাক এহসানের বিকৃত, ক্ষতবিক্ষত দেহের স্মৃতি।

তার পিতা,তার পৃথিবী,তার সবকিছু আর সেই স্মৃতির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটাই নাম মিস্টার আলবার্ট।

আফরিদের দৃষ্টি মুহূর্তেই পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল।এলেন আবারও ধাক্কা দিল তাকে।

“গো, আফরিদ! গো!”

অবশেষে আফরিদ ইভেলিনার মুখ চেপে ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল পেছনের ফটক দিয়ে।বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে সে একবার ফিরে তাকাল।

“তুই আসবি তো?”

এলেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আফরিদের কণ্ঠে অদ্ভুত উদ্বেগ।

“প্রমিস?”

এলেনের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। যেন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও লোকটা ভয় নামক শব্দটার অর্থ ভুলে গেছে। বুকের উপর হাত রেখে বলল,

“আই প্রমিস, ব্রাদার।”

আফরিদ আর দাঁড়াল না।দ্রুত গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গর্জে উঠল কালো গাড়িটি।

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। বাড়ির সামনের অংশে অবস্থানরত গার্ডরা বিষয়টি টের পেয়ে গেছে।

দু’জন সশস্ত্র গার্ড ছুটে এলো তার পিছু।

“স্টপ দ্যাট কার!”

“মুভ! মুভ!”

গাড়ি ছুটে চলল অন্ধকার রাস্তা চিরে।অপরদিকে বাড়ির ভেতরে এলেন সম্পূর্ণরূপে ঘিরে পড়েছে। চারদিক থেকে অ’স্ত্র তাক করা।দু’হাত ধীরে ধীরে উপরে তুলে দিল সে।

ঠিক তখনই ছোট্ট ন্যান্সি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এসে গার্ডদের আড়ালে আশ্রয় নিল।‌একজন গার্ড হঠাৎ নাক সিঁটকাল।‌তার মুখমণ্ডল মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল।

গ্যাসের তীব্র গন্ধ! তার চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

সে বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

“এভরিওয়ান আউট!”

“গ্যাস লিক!”

“মুভ! মুভ! মুভ!”

চারদিকে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।গার্ডরা দ্রুত ন্যান্সিকে কোলে তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল।‌এলেন সুযোগ বুঝে নড়তে গিয়েছিল।কিন্তু ধাম! একটি গু’লি এসে বিদ্ধ করল তার কাঁধ।

র’ক্ত ছিটকে বেরিয়ে এলো। প্রচণ্ড অভিঘাতে কয়েক ফুট দূরে ছিটকে পড়ল সে।‌ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল। তবুও তার মনে তখন একটাই চিন্তা‌

আফরিদ। সে কথা দিয়েছিল। বন্ধুকে একা ছাড়বে না।

চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল সবকিছু।

তারপর,

এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ! বুমমমমমম! মনে হলো পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল। আ’গুনের লেলিহান শিখা কয়েকতলা উচ্চতায় আকাশ স্পর্শ করল।

কাঁচ ভেঙে উড়ে গেল চারদিকে।দেয়াল ভেঙে পড়ল। ধোঁয়া, আগুন আর ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেল চারপাশ। বিস্ফোরণের অভিঘাতে অনেক দূর পর্যন্ত বাতাস কেঁপে উঠল। আর সেই অ’গ্নিকুণ্ডের ঠিক কেন্দ্রে পড়ে রইল এলেন।

আ’গুন ধীরে ধীরে গ্রাস করতে লাগল তার পোশাক।

তার চুল,তার রক্তাক্ত শরীর। জ্বলন্ত শিখার মধ্যে শুয়ে থাকা অবস্থায় এলেনের ওষ্ঠে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।

বন্ধুত্বের জন্য মানুষ কতদূর যেতে পারে?হয়তো এতদূরই। চোখ বুজে আসার পূর্বমুহূর্তে তার মনে ভেসে উঠল একটাই মুখ আফরিদ এহসান।তার বন্ধু, তার ভাই।

*****************

চারপাশে তখন বিশৃঙ্খলা।পুলিশের নীল-লাল আলো অবিরাম ঝলসে উঠছে।সাইরেনের কর্কশ শব্দ রাতের স্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। নিরাপত্তারক্ষী, ফরেনসিক টিম, প্রতিবেশী, সাংবাদিক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ছোট্ট ইলহাম ন্যান্সি এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখলেও আর পারল না।হুহু করে কেঁদে উঠল সে।ঠিক তখনই জনতার ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মিস্টার আলবার্ট এবং ইসাবেলা আলবার্ট।ইসাবেলার চুল এলোমেলো।

মুখমণ্ডল বিবর্ণ।চোখ দুটো আতঙ্কে র’ক্তাভ।ভেতরে প্রবেশ করেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন,

“মাই বেবি! ইলহাম! হোয়্যার ইজ মাই ডটার?”

মায়ের কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই ছোট্ট ন্যান্সি ছুটে গেল।পরক্ষণেই ইসাবেলার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

“মম!”

ইসাবেলাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার কপালে চুম্বন আঁকতে লাগলেন।

“ইটস ওকে… ইটস ওকে, মাই এঞ্জেল,,

তার কণ্ঠ কাঁপছে।হাত কাঁপছে।মেয়েকে হারানোর ভয় যেন এখনও তাকে আঁকড়ে ধরে আছে।

*******

অন্যদিকে মিস্টার আলবার্ট দাঁড়িয়ে আছেন স্তব্ধ হয়ে।

চোখের সামনে যেন পুরো পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে গেছে। একজন সিনিয়র অফিসার সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনা ব্যাখ্যা করে চলেছেন।

“মিস্টার আলবার্ট, পরিস্থিতি খুবই জটিল।”

“আমরা ঘটনাস্থল থেকে একজনের দ’গ্ধ মৃ’তদেহ উদ্ধার করেছি। পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। আরেকজন সন্দেহভাজন গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে চারদিকে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।”

“ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। তবে গাড়ির ভেতরে মোট কতজন ছিল, সেটা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।”

আলবার্ট নির্বাক। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে দূরে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মস্তিষ্ক যেন প্রবল গতিতে কাজ করছে।

এদিকে সাংবাদিকরা চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে।

মাইক্রোফোন সামনে ধরে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

“মিস্টার আলবার্ট! আপনি কি কাউকে সন্দেহ করছেন?”

“এটা কি পরিকল্পিত হামলা?”

“আপনার পরিবারের সদস্যদের কি লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে?”

“আপনার ব্যবসায়িক শত্রুদের কেউ জড়িত?”

“আপনি কি কোনো হুমকি পেয়েছিলেন?”

প্রশ্নের পর প্রশ্ন।একটার পর একটা।আলবার্টের মাথার ভেতর যেন হাতুড়ি আঘাত করছে।

অবশেষে কর্কশ কণ্ঠে বললেন,

“আমার ভাই…”

তার কণ্ঠ থেমে গেল।গভীর নিঃশ্বাস নিলেন।

“আমার ভাই, তার স্ত্রী এবং তাদের মেয়ে বাড়িতে ছিল।”

কথাটা শুনেই অফিসারের চেহারা গম্ভীর হয়ে উঠল।

তিনি দ্রুত নোটবুকে কিছু লিখলেন। তারপর বললেন,

“তাহলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। আমাদের ধারণা, তাদের অপহরণ করা হয়ে থাকতে পারে।

“আনফরচুনেটলি ছোট্ট ন্যান্সি বেঁচে গেছে। সম্ভবত সে হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল না। অন্যথায় তাকেও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হতো।”

ইসাবেলা কথাটা শুনেই মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল।

সিনিয়র অফিসার এবার আলবার্টের দিকে সরাসরি তাকালেন।তার দৃষ্টি অনুসন্ধিৎসু। সন্দেহপ্রবণ।

“মিস্টার আলবার্টহআপনি কি সত্যিই কাউকে সন্দেহ করছেন না? কেউ তো এমন করবে না কোনো কারণ ছাড়া। এটা ব্যক্তিগত প্রতিশোধও হতে পারে, দ্বন্দ্বও হতে পারে।”

আলবার্টের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। অতীত,একটা শব্দ। কিন্তু শব্দটা যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করল তার চেতনায়। মুস্তাক এহসান।

মারুফুল হক। মেহমুনা। বার্সেলোনার সেই অভিশপ্ত দিন।

র’ক্ত,বিশ্বাসঘাতকতা, মিখাইল। আর একটি ছোট্ট ছেলের আগু’নভরা চোখ আফরিদ।

এক মুহূর্তের জন্য আলবার্টের শরীর শীতল হয়ে গেল।

না।

অসম্ভব এত বছর পরে? তবুও যদি? যদি সত্যিই সেই অতীত ফিরে এসে থাকে? যদি প্রতিশোধের আগুন এত বছর ধরে নিভে না থাকে?

অফিসার আবার প্রশ্ন করলেন,

“মিস্টার আলবার্ট? আপনি কিছু ভাবছেন?”

আলবার্ট চমকে বাস্তবে ফিরে এলেন। চারদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। মানুষের কোলাহল। পুলিশের আনাগোনা। সবকিছু স্বাভাবিক। তবুও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আশঙ্কা জন্ম নিল।

কারণ তিনি হঠাৎ উপলব্ধি করলেন কিছু ঋণ সময়ের কাছে হারিয়ে যায় না।

কিছু অপরাধ বছরের পর বছর মাটির নিচে চাপা থাকলেও একদিন ফিরে আসে। আর যদি সত্যিই সেই অতীত ফিরে এসে থাকে তাহলে এই রাত কেবল শুরু। সমাপ্তি নয়।

**********************

ঘন্টাখানেক পর..

মানুষের ভিড় ঠেলে উন্মাদের ন্যায় সামনে এগিয়ে এলো আফরিদ এহসান।চারদিকে হাহাকার।

সাইরেনের কর্কশ শব্দ।দমকলকর্মীদের ব্যস্ত পদচারণা।আর তার মাঝখানে দাউদাউ করে জ্বলছে বিশাল অট্টালিকাটি।অগ্নিশিখাগুলো যেন আকাশ স্পর্শ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে রাতের বুক চিরে।আফরিদের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।

চোখদুটো উন্মাদের মতো খুঁজতে লাগল কাউকে।

একজনকে।

শুধু একজনকে। তারপর দৃষ্টি থেমে গেল।সময় যেন আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল।কয়েক গজ দূরে জরুরি সেবাকর্মীদের ভিড়ের মধ্যে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে একটি নিথর দেহ।এলেন,তার বন্ধু।তার ভাই,তার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী। যে ছেলেটা প্রথম দিন বলেছিল,

“বন্ধুর কাজে যদি বন্ধু না আসে, তাহলে কিসের বন্ধুত্ব?”

আফরিদের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।চোখ থেকে নিঃশব্দে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।কোনো চিৎকার নেই। কোনো আর্তনাদ নেই।শুধু এক গভীর শূন্যতা। এলেন নেই।

সত্যিই নেই। আজ থেকে পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।

যে মানুষটা তার অন্ধকার জীবনেও আলো হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে চলে গেছে।চিরতরে। আফরিদ কাঁপা হাতে মুঠো শক্ত করল।হাড়গুলো কটমট শব্দ করে উঠল।

ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আরেক পাশে।

ইসাবেলা। বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে ছোট্ট ন্যান্সিকে। শিশুটি ভীতসন্ত্রস্ত চোখে চারপাশ দেখছে।

কিন্তু আফরিদের চোখে সেই দৃশ্য অন্য কিছু হয়ে ধরা দিল। তার ক্রোধগ্রস্ত মন আর বাস্তবতা আলাদা করতে পারছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে আবারও কেউ তার কাছ থেকে প্রিয় মানুষ কেড়ে নিয়েছে।

আবারও। আবারও। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।নীলাভ চোখদুটি র’ক্তবর্ণ ক্রোধে জ্বলে উঠল।

“মিস্টার আলবার্ট, তুই আবার আমার কাছ থেকে একজনকে কেড়ে নিলি।”

আফরিদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল।

“প্রথমে পাপা, তারপর মমের জীবনটা নরকে পরিণত করলি ,এখন এলেন। আমি তোকে ছাড়ব না।”

🌿

কয়েক মিনিট পর রাতের মহাসড়ক।

গাড়ির ইঞ্জিন গর্জন তুলছে। অস্বাভাবিক গতিতে ছুটে চলেছে কালো রঙের গাড়িটি। স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরেছে আফরিদ। তার চোখ লাল।শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী। মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এলেনের হাসি। এলেনের কথা।

এলেনের মুখ। হঠাৎ সে স্টিয়ারিংয়ে সজোরে আঘাত করল। গর্জে উঠল,

“আবারও। আবারও মিস্টার আলবার্ট আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিল!”

গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা ক্রমাগত উপরের দিকে উঠছে। একশো। একশো বিশ।একশো চল্লিশ। তারপর আরও। বাইরের অন্ধকার দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে ছুটে যাচ্ছে।কিন্তু আফরিদের চোখে এখন আর রাস্তা নেই।

শুধু প্রতিশোধ।

“আমি শেষ করে দেব তোকে, আলবার্ট! এই জীবনে তুই শান্তিতে বাঁচতে পারবি না! খোদার কসম!”

ঠিক তখনই গাড়ির চাকা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। রাস্তার একপাশে জমে থাকা ভেজা কাদায় পিছলে গেল গাড়িটি। আফরিদ দ্রুত স্টিয়ারিং ঘোরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।গাড়ি বেপরোয়া গতিতে ছিটকে গেল রাস্তার বাইরে।সময় যেন ধীর হয়ে এলো। এক সেকেন্ড।দুই সেকেন্ড। তারপর ধামমমম! প্রচণ্ড শব্দে বিশাল এক গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেল গাড়িটি।

লোহা মুচড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সামনের কাচ মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।আফরিদের মাথা সজোরে আ’ঘাত পেল।সবকিছু কেঁপে উঠল।

নিস্তব্ধতা। শুধু কানে একটানা ভোঁ-ও-ও-ও শব্দ।

দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। চারপাশের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। কপালের একপাশ বেয়ে উষ্ণ রক্ত গড়িয়ে পড়ল।আফরিদ কষ্ট করে চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। শেষবারের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মুস্তাক এহসানের মুখ।তারপর এলেন। হাসছে। সেই পুরনো হাসি।

“বন্ধুর কাজে যদি বন্ধু না আসে…

অপূর্ণ বাক্যটা মিলিয়ে গেল।আফরিদের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো।আর পরক্ষণেই গভীর অচেতনতার অতলে তলিয়ে গেল আফরিদ এহসান।

******************

বর্তমান…

“এলেন? লুসিফার এলেন ইদ্রান? উনি ছিলেন ওটা?”

ন্যান্সি প্রশ্ন করে বসলো! আফরিদ হালকা হেসে অসম্মতি জানায়,

“উঁহু,সে নয়। আরো একজন এলেন ছিল আমার জীবনে!”

ন্যান্সি তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ! বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে তার! দমবন্ধ হয়ে আসছে এতকিছু শুনে!

*****************

“তুমি বলেছিলে আমাকে সাহায্য করবে! তাহলে এখন এমন আচরণ করছো কেন?”

মিস্টার আলবার্টের কণ্ঠস্বর ক্রোধে কাঁপছিল। বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়ানো, পরিচয় গোপন করে জীবনযাপন, পুলিশের নজরদারি সবকিছুর ভার যেন একসাথে এসে চেপে বসেছে তার কাঁধে।

ওপাশে বসে থাকা মিখাইল ধীরেসুস্থে সিগারের ধোঁয়া ছাড়ল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে বলল,

“আই সেইড আই উড হেল্প ইউ, আলবার্ট। বাট আনফরচুনেটলি নাউ আই অ্যাম সরি!”

মিখাইলের নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর শুনেই মেজাজ হারিয়ে ফেলল আলবার্ট।

“সরির মানে কি? তোমার কথা শুনেই আমি সব করেছি! তোমার জন্য নিজের জীবন শেষ করেছি! নিজের বন্ধু মুস্তাককে হারিয়েছি! নিজের ভাইকে হারিয়েছি! নিজের দেশ ছেড়েছি! বছরের পর বছর লুকিয়ে আছি!”

মিখাইল এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল।সেই হাসির মধ্যে করুণা ছিল না।ছিল শুধুই বিদ্রুপ।

“নো, মাই ফ্রেন্ড। তুমি আমার জন্য কিছু করোনি। তুমি সব করেছো নিজের জন্য।”

আলবার্ট স্তব্ধ।মিখাইল ধীরে ধীরে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।বিশাল কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।দূরে রাশিয়ার বরফাচ্ছন্ন রাত। আর ভেতরে তার চোখে হিংস্রতার ঝলক।

“তুমি লোভে পড়েছিলে, আলবার্ট। ক্ষমতার,টাকার ,লোভে। ক্ষমতার লোভে। আমি শুধু সেই লোভটাকে একটু উসকে দিয়েছিলাম।”

কথাগুলো ছুরির ফলার মতো গিয়ে বিঁধল আলবার্টের বুকে।সে বুঝতে পারছে।ভয়ংকর এক ফাঁদে পা দিয়েছিল সে।আর এখন সেই ফাঁদ থেকেই বের হতে পারছে না।মিখাইল আবার বলল,

“তাও যদি তুমি কাজটা ঠিকমতো করতে পারতে! যদি ফর্মুলার ফাইলটা আমার হাতে তুলে দিতে পারতে! কিন্তু আফসোস…

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।

“এতগুলো বছর কেটে গেল। তুমি এখনো জানো না মুস্তাক এহসান ফাইলটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল।”

আলবার্ট দাঁতে দাঁত চেপে রইল।তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে।কিন্তু রাগ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।এই মুহূর্তে তার সাহায্য দরকার।প্রচণ্ডভাবে দরকার।

অবশেষে সে নিচু স্বরে বলল,

“প্লিজ, মিখাইল। হেল্প মি। আই অ্যাম হেল্পলেস।”

মিখাইলের চোখদুটো অদ্ভুতভাবে চকচক করে উঠল।যেন ঠিক এই কথাটাই শোনার অপেক্ষায় ছিল।সে ধীরে ধীরে নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,

“ওয়েল… আই ক্যান হেল্প ইউ।”

আলবার্টের চোখে আশার ক্ষীণ আলো ফুটে উঠল।

“রিয়েলি?”

“অবশ্যই।”

মিখাইল ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

“বাট এভরিথিং হ্যাজ আ প্রাইস, মাই ফ্রেন্ড।”

আলবার্টের ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত হয়ে এলো।

“কিসের প্রাইস?”

মিখাইলের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।সেই হাসি দেখে আলবার্টের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জন্ম নিল।

“তোমার কাছে এমন কিছু আছে… যেটা আমার দরকার।”

“কি?”

“তোমার মেয়ে।”

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে মিখাইল আবার বলল,

“তোমার নাকি একটা ছোট মেয়ে আছে? আমি দেখেছি, ভীষণ সুন্দর দেখতে। ছোট হলেও একদম পারফেক্ট।আই ওয়ানা সে’ক্স উইথ হিজ! জাস্ট ওয়ান নাইট!”

কথাটা বলতেই চিৎকার করে উঠল মিস্টার আলবার্ট,

“মিখাইলঅঅঅ! আমি তোকে খু’ন করে ফেলবো।হাউ ডেয়ার ইউ!”

মিখাইল ফের তীর্যক হেসে বলল,

“তাহলে বাংলাদেশেই পচে মরো মাই ফ্রেন্ড! তবে হ্যাঁ চাইলে ভেবে দেখতে পারো। এতে তোমারো লাভ, সেইভলি সবকিছু সামলে নেবো আমি। আর আমিও ফিজিক্যাল শান্তি পেলাম।”

আলবার্টের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ হচ্ছে।সে বুঝতে পারছে আজকের পর আর পিছু হটার কোনো পথ নেই। মিখাইল এবার শেষবারের মতো বলল,

“মনে রেখো, যারা আমার কাজে লাগে না, তারা বেশিদিন বেঁচেও থাকে না।”

টুট,টুট,টুট ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।ধপাস করে বিছানার উপর বসে পড়লেন মিস্টার আলবার্ট। তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে।

হাত কাঁপছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অতীতের প্রতিটি দৃশ্য। মুস্তাক এহসানের মুখ। মেহমুনার মুখশ্রী।ল্যাবরেটরির সেই র’ক্তা’ক্ত দিন।অভ্রের মৃ’ত্যু। স্পেন থেকে পালিয়ে আসার রাত। সবকিছু। ঠিক তখনই দরজার বাইরে ছোট্ট পদধ্বনি শোনা গেল।

“পাপা?”

কণ্ঠস্বর শুনেই চমকে উঠলেন তিনি।দরজার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে তার মেয়ে।ইলহাম ন্যান্সি। নিষ্পাপ।

অজ্ঞ। পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার থেকে দূরে থাকা একটি শিশু।

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল আলবার্টের। কারণ বহুদিন পর প্রথমবারের মতো তিনি উপলব্ধি করলেন যে আগুন তিনি নিজে জ্বা’লিয়েছিলেন,

সেই আগুন এখন ধীরে ধীরে তার নিজের পরিবারকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে।

*****************

সময়ের প্রবাহ কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। সে নিজের গতিতে বয়ে চলে, আর তার স্রোতে ভেসে যায় মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক, স্বপ্ন এবং বিবেক।

কিন্তু আফরিদ এহসানের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন ছিল।

সময় তার ক্ষত শুকিয়ে দেয়নি, বরং প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস, প্রতিটি বছর সেই ক্ষতকে আরও পচিয়ে তুলেছে। হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত প্রতিশোধের বিষবৃক্ষ ক্রমেই শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে।

হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যেন দ্বিতীয়বার জন্ম নিল সে।তবে এই জন্ম কোনো সাধারণ মানুষের জন্ম ছিল না।এ ছিল এক অন্ধকার সম্রাটের উত্থান।

এলেনের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় নিজেকে নিঃসঙ্গতায় আবদ্ধ রেখেছিল আফরিদ। চারপাশের প্রতিটি শব্দ তাকে স্মরণ করিয়ে দিত সেই বন্ধুটির কথা, যে বিনা স্বার্থে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। যে তাকে বলেছিল,

“একদিন তুই জিতবি, ভাই।”

কিন্তু বিজয়ের পথ যে এত রক্তা’,ক্ত হবে, তা হয়তো এলেন নিজেও কল্পনা করেনি।

ক্রমে ক্রমে বার্সেলোনার আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ দৃঢ় হতে শুরু করল। যারা একসময় তাকে শুধুই একজন উন্মত্ত প্রতিশোধপরায়ণ যুবক ভেবেছিল, তারাই পরে উপলব্ধি করল ছেলেটার মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে।

অস্বাভাবিক ধৈর্য,অসাধারণ পরিকল্পনা। আর সর্বোপরি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা। এই তিনটি গুণই তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে তুলেছিল।

একসময় বার্সেলোনার কুখ্যাত গডফাদার পর্যন্ত তার প্রতি বিশেষ আস্থা পোষণ করতে শুরু করল।আফরিদ অর্থের বিনিময়ে কাজ করত।ক্ষমতার বিনিময়ে আনুগত্য কিনত।

আর ভয়ের বিনিময়ে শাসন করত। তার চারপাশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এক বিশাল সাম্রাজ্য।

বৈধ ব্যবসা। অবৈধ ব্যবসা। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ।গোপন লেনদেন। কালোবাজারি যোগাযোগ।সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল তার প্রভাব। বিশ্বের বহু দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তার নাম ফাইলভুক্ত করল। পুলিশ তার সন্ধানে অভিযান চালালো।‌কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা।

যেন লোকটা ধোঁয়ার মতো। ধরা যায় না।ছোঁয়া যায় না। অস্তিত্ব আছে, অথচ নেই। গডফাদারের আকস্মিক মৃ’ত্যুর পর ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হলে বহু গোষ্ঠী সেই সিংহাসন দখলের জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল।

কিন্তু শেষ হাসি হেসেছিল আফরিদ এহসান।কারণ সে যুদ্ধ করেনি।‌সে প্রতিপক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করতে দিয়েছিল।‌অ’তঃপর যখন সকলে দুর্বল হয়ে পড়ল, তখন সে আঘাত হানল।

একটি মাত্র আ’ঘাত। আর সেই আঘা’তই যথেষ্ট ছিল।

সিংহাসন তার হয়ে গেল। আন্ডারওয়ার্ল্ড নতুন রাজা পেল। মাফিয়া কিং। আফরিদ এহসান। নামটা উচ্চারণ করতেও মানুষ দু’বার ভাবত।

কারণ এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আতঙ্ক।মৃত্যু। ধ্বংস। আর সীমাহীন ক্ষমতা।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সবকিছু পাওয়ার পরও তার ভেতরের শূন্যতা পূরণ হলো না।

প্রতিটি গভীর রাতে যখন একা থাকত, তখনও মস্তিষ্কে ভেসে উঠত একটি দৃশ্য।একটি ল্যাব।র’ক্ত।‌চিৎকার।‌আর তার পিতা মুস্তাক এহসানের মুখ।

সেই মুখ, যা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও পরাজয় স্বীকার করেনি।‌আর তখনই আফরিদের বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন পুনরায় প্রজ্বলিত হয়ে উঠত।

মিস্টার আলবার্ট।‌এই নামটাই যেন তার জীবনের অভিশাপ। বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালিয়েছে সে।‌লোক নিয়োগ করেছে।টাকা ছড়িয়েছে। গোয়েন্দা লাগিয়েছে।কিন্তু ফলাফল শূন্য।মিস্টার আলবার্ট এবং তার পরিবার যেন পৃথিবীর বুক থেকে হঠাৎ করেই বিলীন হয়ে গেছে।কোনো ব্যাংক রেকর্ড নেই। কোনো সরকারি ফাইল নেই।

কোনো ভ্রমণ তথ্য নেই।কিছুই নেই।‌যেন মানুষগুলো কখনো অস্তিত্বই রাখেনি।এই ব্যর্থতাই আফরিদকে আরও উন্মত্ত করে তুলল।

আর সেই উন্মত্ততার সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি জিনিস।

লোভ। অদম্য, অতৃপ্ত, সর্বগ্রাসী লোভ।যে মানুষ একসময় শুধু প্রতিশোধ চাইত, সে এখন ক্ষমতাও চায়।আরও ক্ষমতা।আরও অর্থ।আরও আধিপত্য।বিশ্বের মানচিত্রের যতখানি অংশ নিজের দখলে আনা সম্ভব, সবটাই চাই তার।

কারণ সে উপলব্ধি করেছে‌ ক্ষমতা একবার মানুষকে স্পর্শ করলে, মানুষ আর কখনো তার মোহ থেকে মুক্ত হতে পারে না।

এবং আফরিদ এহসান সেই মোহে সম্পূর্ণরূপে বন্দী হয়ে গেছে।

*******************

মিখাইলকে খুঁজতে গিয়ে আফরিদ এহসানের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে প্রবেশ করল এক অদ্ভুত, প্রায় অবিশ্বাস্য চরিত্র‌ লুসিফার এলেন ইদ্রান।

নামটি প্রথম শুনেই থমকে গিয়েছিল আফরিদ।

এলেন। আবারও সেই নাম।মনে হলো যেন অতীত নিজের ছায়া ফেলে বারবার ফিরে আসছে, নতুন কোনো রূপে, নতুন কোনো অভিশাপ হয়ে।

স্পেনের এক পরিত্যক্ত শিল্পাঞ্চলের ভেতর সেই সাক্ষাৎ ঘটেছিল। চারপাশে ধ্বংসপ্রাপ্ত ফ্যাক্টরি, মরচে ধরা লোহা, আর বাতাসে ভেসে থাকা ধুলোর গন্ধ‌সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল একেবারে নিস্তব্ধ অথচ ভয়ঙ্কর।

আফরিদ সেখানে পৌঁছেছিল মিখাইলের তথ্যের সূত্র ধরে। কিন্তু মিখাইল ছিল না। ছিল শুধুই অপেক্ষা।আর সেই অপেক্ষার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিল লুসিফার এলেন ইদ্রান।‌কালো কোট, অর্ধ-আলোতে ঢাকা মুখ, আর চোখ দুটো যেন নিঃশব্দ আগুনের মতো জ্বলছিল।

সে ধীরে বলেছিল,

“তুমি আফরিদ এহসান, তাই না?”

আফরিদ এক মুহূর্ত তাকিয়ে ছিল। তারপর ঠান্ডা গলায় জবাব দিয়েছিল,

“Who are you?”

একটা হাসি ফুটে উঠেছিল লোকটার ঠোঁটে। সেই হাসি ছিল না কোনো আনন্দের, বরং ছিল এক ধরনের নিশ্চিত আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

“নামটা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো তুমি কী হারাতে এসেছ।”

এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আফরিদের ভ্রু কুঁচকে উঠেছিল। তখনই প্রথমবার বোঝা গিয়েছিল এই মানুষটা সাধারণ কোনো ইনফরমার বা মধ্যস্থতাকারী নয়। এটা একেবারে ভিন্ন স্তরের কেউ।

অন্যদিকে লুসিফার এলেন ইদ্রান জানত আফরিদের শক্তি, জানত তার সাম্রাজ্যের বিস্তার, জানত তার প্রতিশোধের ইতিহাস।

আর তাই সে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিল,

“মিখাইলকে তুমি একা পাবে না। তার পেছনে আছে পুরো সিস্টেম। কিন্তু আমি সেই সিস্টেমের ভেতরে ঢুকতে পারি।”

আফরিদের চোখ তখন আরও সংকুচিত হয়েছিল।

“কেন সাহায্য করবে?”

এলেন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলেছিল,

“কারণ এই খেলায় আমি শুধু খেলোয়াড় নই আমি বোর্ডের নিয়ম লিখি।”

সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় এক নতুন জোট।আফরিদের কালো সাম্রাজ্যের ভিতরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে লুসিফার এলেন ইদ্রান। প্রথমে তথ্য, তারপর অস্ত্র, এরপর আন্তর্জাতিক সংযোগ সবকিছুতেই সে হয়ে ওঠে এক অপরিহার্য ছায়া-চরিত্র। কেউ তাকে বিশ্বাস করত না।

কিন্তু সবাই তার ওপর নির্ভর করত। তার উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু প্রভাব ছিল বিস্ফোরক।

আফরিদের সাম্রাজ্যের ভেতরে সে এমনভাবে মিশে গেল, যেন সবসময়ই ছিল।

কেউ তাকে ‘কনসালট্যান্ট’ বলত, কেউ ‘ঘোস্ট লিঙ্ক’ কেউ আবার ফিসফিসিয়ে বলত “লুসিফার”।

আর আফরিদ বুঝে গিয়েছিল এই মানুষটা বন্ধু না হলেও, শত্রুও নয়। সে এক ধরনের অপরিহার্য বিপদ।

যে বিপদ ছাড়া তার প্রতিশোধ অসম্পূর্ণ। এভাবেই লুসিফার এলেন ইদ্রান ধীরে ধীরে হয়ে উঠল আফরিদ এহসান নামের কালো সাম্রাজ্যের এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী স্তম্ভ। আর মিখাইলের খোঁজে শুরু হলো আরও গভীর, আরও বিপজ্জনক এক যুদ্ধের প্রস্তুতি।

চলবে……………।

(আর মাত্র কয়েকটি পর্ব এরপর #আফরিদ_এহসান এর জার্নি এখানেই শেষ….🙃)

(সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করবেন এবং আগের পর্ব গুলো মানে ৯০ থেকে আবার পড়বেন। আমি কয়েকটা জায়গা এডিট করেছি। খুব শীঘ্রই বড়সড় একটি নোটিশ ঘোষণা করা হবে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply