Golpo কষ্টের গল্প নদীর ওপারে সুখ

নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৩


#নদীর_ওপারে_সুখ
#সিমরান_মিমি
#পর্ব_০৩

ট্রাকচালক রেগে গেছেন। রাস্তার উপর জমায়িত হওয়া লোকদের সঙ্গে চিৎকার করে বললেন,

“ দেখছেন আপনারা? আরেকটু হইলেই চাকার নিচে পিষে যাইতো। এরপর দোষ হইতো ড্রাইভারের। এরা সেধে সেধে মরতে আসে গাড়ির নিচে, অথচ দিনশেষে আমরাই দোষী। ”

কয়েকজন লোক বিরক্ত চোখে নিভিকে আগাগোড়া পরোখ করলো। একসাথে এতোজনের নজর পড়ায় অসস্তিতে মুড়িয়ে উঠলো মেয়েটা। দ্রুত রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে হাঁটা শুরু করলো অন্যপাশে। তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। আরেকটু হলেই কি অঘটন টাই না ঘটে যেতো। ঘোরের মধ্যে মেইন রোডের মাঝখানে এসে সে দাঁড়িয়েছিলো। নেহাত, ট্রাকচালক ব্রেক কষেছেন ; নাহলে!

দূর থেকে লোকগুলোকে আরেকবার দেখলো নিভি। ভীড় কিছুটা কমেছে, কিন্তু ট্রাকচালক এখনো যায়নি। তিনি কথা বলছেন। লজ্জায়, অসস্তিতে সে আরো সামনে এগিয়ে গেলো। রাস্তার পাশে কয়েকটা সান বাঁধানো বেঞ্চ দেখে, সেখানে গিয়ে বসলো। আলতো হাতে ব্যাগের চেইন খুলে টাকা গুণতে লাগলো। চার হাজার টাকা নিয়ে রওনা দিয়েছিলো। এখন আছে দু হাজার একশো পঞ্চাশ টাকা। প্রায় অর্ধেক খরচ হয়ে গেছে। নিভি খেয়াল করে দেখলো কাপড়ের ব্যাগের মধ্যে একটা বনরুটি এবং দুটো কলাও হয়েছে। খুশিতে চকচক করে উঠলো চোখ। দীর্ঘ বিরতির পর সকল দুঃখ ভুলে সে খেয়ে নিলো। তাকে লড়তে হবে। পৃথিবীতে হাজার হাজার অনাথ ছেলেমেয়ে রয়েছে। তারা কি খেয়েপরে বেঁচে নেই? তাহলে নিভি কেনো এতো ভয় পাচ্ছে? সেও বাঁঁচবে। নিজের জন্য বাঁচবে।

নিভি খাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ ভাবতে লাগলো। কাগজটাতে ঠিক কি কি লিখেছিলো, তা মনে করতে চাইলো। কিন্তু অনেক ভেবেও মিরপুর ১১, চৌধুরী নিবাস, বখতিয়ার মাহমুদ চৌধুরী ছাড়া আর কিছু মনে করতে পারলো না। গ্রাম হলে কারোর নাম বললেই, লোকে তার চৌদ্দ পুরুষের তথ্য দিতে পারতো। কিন্তু শহরে কি তা আদৌ সম্ভব। এতোটা এলোমেলো ঠিকানা নিয়ে সে কি শেষ আশ্রয় খুঁজতে পারবে? নিভি সাহস হারালো না। বুক ফুলিয়ে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে রাস্তা পার হলো। শহরের রাস্তা এখন আগের চেয়ে জমজমাট। বাস, ট্রাক, রিকশা এবং ব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি লক্ষ করা যাচ্ছে। এই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ দেখে নিভি কিছুক্ষণ পূর্বের নিরিবিলি দৃশ্যটুকু কল্পনা করলো। মুহুর্তেই গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। হাতে বইয়ের ব্যাগ নেই। এতো শখের, প্রিয় বইগুলো সে শেষ পর্যন্ত হারিয়েই ফেললো। মায়ের মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের পরিক্ষা দিয়ে এসেছে। ভেবেছিলো, যেখানেই আশ্রয় পাক না কেনো সারাবছর পড়ে গ্রামে এসে বোর্ড পরিক্ষা’টা দেবেই। কিন্তু পারলো না। শেষমেশ বইগুলোই হারিয়ে ফেললো।

বাসের সেই ভদ্রলোক বলেছিলো রিকশায় যেতে হবে। তার কথা স্মরণ করে নিভি পুণরায় সাহস সঞ্চয় করে একটা রিকশায় উঠলো। গতবার এতোকিছু না বুঝেই ঠিকানার কাগজ রিকশাওয়ালার হাতে দিয়ে ফেলেছিলো। ভেবেছিলো, এতো প্যাঁচানো ঠিকানা – সে বললে যদি বুঝতে না পারে। কিন্তু এটাই সবচেয়ে কাল দাঁড়িয়েছিলো তার জন্য। নিভি এবার আর বোকামি করলো না। আত্মবিশ্বাসী হয়ে বললো,

“ মিরপুর ১১ ,চৌধুরী নিবাসে যাবো। চলুন। ”

রিকশাওয়ালা কিঞ্চিৎ আপত্তি করে বললেন,

“ কত নাম্বার রোডে যাইবেন? ”

নিভি ঘাবড়ে গেলো। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই দ্রুত কাপড়ের ব্যাগ খুলে ডায়েরি বের করলো। বইয়ের ব্যাগে ওতোগুলো বই, গাইড, সাজেশন রাখার পর আর জায়গা হয়নি বলেই সে কাপড়ের ব্যাগে ডায়েরী রেখেছিলো। যতদুর মনে হচ্ছে ঠিকানা এই ডায়েরিতেই লিখেছিলো। লেখা কাগজ’টা ছিড়ে হাতে নিলেও অপর পৃষ্ঠায় নিশ্চয়ই লেখার ছাপ পড়ে থাকবে। নিভি উদ্ভ্রান্তের মতো পৃষ্ঠা উল্টে দেখলো। হঠাৎ বেশ কয়েকটি শব্দের ছাপ দেখে খুশিতে চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। তার হাত কাঁপছে। পৃষ্ঠাটা তুলে আস্তেধীরে লেখাগুলো বোঝার চেষ্টা করলো। এরপর পাশেই লিখলো নতুন ভাবে। এতোসব বাহানা দেখে বিরক্ত হলেন রিকশাচালক। বললেন,

“ আপনি কি যাইবেন? নাইলে আমি যাই। ”

“ না না, যাবো। আমি ঠিকানা বলছি, আপনি নিয়ে চলুন। ”


চৌধুরী নিবাস। আভিজাত্যে পরিপূর্ণ ডুপ্লেক্স বাড়িটির প্রকান্ড গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিভি সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ছোটো ছোটো কদম ফেলে আরেকটু সামনে এগিয়ে দারোয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,

“ আসসালামু আলাইকুম। এটা কি বখতিয়ার মাহমুদ চৌধুরীর বাড়ি। ”

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, আপনি কে? ”

“ আমার নাম নিভি রহমান। একটু গেট’টা খুলবেন, আমি বখতিয়ার মাহমুদ আংকেলের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ”

দারোয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরে সন্দেহের চোখে নিভিকে লক্ষ্য করছেন। বাড়ির সামনে এসে প্রায় দু মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন আবার পরিচয় না দিয়েই গেট খুলতে বলছে, বিষয়টা সন্দেহজনক। কড়া কন্ঠে বললেন,

“ না, গেট খোলা যাবে না। আপনার পরিচয় বলেন। ”

নিভি একটু তটস্থ হয়ে ভাবলো। মা পালিয়ে বাবাকে বিয়ে করায় তাকে ত্যাগ করেছিলো পরিবার। নিশ্চয়ই অনেক রেগে আছেন। সেখানে হুট করে দারোয়ানকে যদি জানায়, সে তাদের ভাগ্নি — আর এটা গিয়ে বাড়িতে বলার পর মামারা রেগে গেট থেকেই অপমান করে বের করে দেয়, তবে ভীষণ লজ্জা পাবে সে। এর চেয়ে একাকী বসে পরিচয় দেওয়াই সমুচিত হবে৷ অন্তত সকলের সামনে অপমানিত হওয়ার চেয়ে একাকী দুটো বাজে কথা শোনাও ভালো। ভেবে পুণরায় নিজের পরিচয় দিতে দ্বিধা বোধ করলো। বললো,

“ আপনি তাকে গিয়ে বলুন, লক্ষীপুর থেকে একটা মেয়ে এসেছে কথা বলতে। তাহলেই হবে। ”

দারোয়ান চলে গেলেন ভেতরে। কিছুক্ষণ পর তার সঙ্গে আরো দুজন মেয়ে এগিয়ে এলো। একজন লম্বা, ফর্সা, গোলগাল চেহারার সুন্দরী নারী। বয়স আনুমানিক তেইশ-চব্বিশ হবে। অন্যজন নয় বছরের কিশোরী। পরনে লাল ফ্রক। ছোটো মেয়েটা নখ কামড়াতে কামড়াতে নিভি’কে দেখলো। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলো,

“ তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়? কোন জায়গা থেকে এসেছো? বড় আব্বুর কাছে কি চাই? ”

নিভি ভড়কে গিয়ে বড় মেয়েটার দিকে তাকালো। এরপর নিচু কন্ঠে জবাব দিলো,

“ আমি নিভি৷ আমার বাড়ি পিরোজপুর। ”

মুহুর্তেই ঝট করে প্রশ্ন ছুড়লো বড় মেয়েটা। বললো,

“ কিন্তু দারোয়ান তো বললো তুমি নাকি লক্ষীপুর থেকে এসেছো? ”

“ জি! আমি লক্ষীপুরেও গেছিলাম দেখা করার জন্য। কিন্ত দরজায় তালা লাগানো। ”

“ আব্বুর সাথে কি এমন কথা তোমার, যার কারনে এতোটা ঘুরেছো? ফোন দিলেই পারতে। ”

“ আমার কাছে ফোন নাম্বার নেই। ”

নয় বছরের মেয়েটির ডাকনাম পান্না। সে নিগুঢ় দৃষ্টিতে নিভির হাতের ব্যাগ’টা দেখলো। বললো,

“ এ্যাই, তোমার ব্যাগের কি আছে? বন্দুক। ”

মুখ চেপে ধরলো অনামিকা। চোখ গরম করে বললো,

“পান্না, চুপ। ”

এরপর নিভির উদ্দেশ্যে বললো, “ তুমি কিছু মনে করো না। এসো, আব্বু বাড়িতেই আছে। ”

পান্না কি তবুও থামার পাত্রী? সে পুণরায় চেঁচিয়ে উঠলো। বললো,

“এটা তো অনেক বড় ব্যাগ। এ্যাই, তুমি কি এখানেই থাকবে? ”

নিভি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো। মুখে কিছু বললো না। চুপচাপ এগিয়ে গেলো অনামিকার পিছুপিছু।


বড়সড় ড্রয়িংরুম। দুটো ডবল এবং একটা সিংগেল সোফা। একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা উৎসুক হয়ে বসে আছেন। তার নাম সিনিওরা মাহমুদ। নওশাদ মাহমুদের স্ত্রী। শখ করে তার মামাই তাকে এই বিদেশী নাম দিয়েছেন। দেখতেও ভিনদেশীদের মতো। গায়ের রঙ চড়া ফর্সা হলেও চুলগুলো এখনো বেশিরভাগ কালো। যার কারনে বৃদ্ধ বয়সে এসেও অত্যন্ত সুন্দরী তিনি। চিরচেনা ভিটে লক্ষীপুর থেকে একটা মেয়ে এসেছে শুনে তিনি উদগ্রীব। এই কংক্রিটের শহরে খুব কম মানুষকেই আপন লাগে। সেখানে হুটহাট দু-চারজন গ্রামের মানুষ পেলে আনন্দের সীমা থাকে না।

বখতিয়ার মাহমুদ চৌধুরী চায়ে চুমুক দিয়ে সদর দরজার দিকে তাকালেন। অনামিকা এবং পান্নার পেছনে নতমস্তকে একজন অল্পবয়সী মেয়ে ঢুকলো। পড়নে সুতির থ্রিপিস, মাথায় ওড়না টানা। তিনি বসতে বললেন। স্ত্রীকে বললেন আরেক কাপ চা দিতে। নিভি ধীর পায়ে সোফায় মুখোমুখি বসলো। উৎসুক দৃষ্টিতে আরো একজন ভদ্রমহিলা তাকিয়ে আছে তার দিকে।

নিভি ভেবেছিলো একাকী কথা বলা যাবে। কিন্তু এই মুহুর্তে তার আশেপাশে প্রায় পাঁচ-ছয়জন লোক। এমনকি দোতলায় সিড়ির রেলিং ধরে একজন যুবক তাকিয়ে আছে। তিনি থেমে থেমে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন, আর নিভিকে দেখছেন। বিষয়টা বেশ বিব্রতকর। বখতিয়ার মাহমুদ বললেন,

“ তুমি নাকি লক্ষীপুরেও গেছিলে, আমার সঙ্গে কথা বলতে? ”

“ জি। ”

“ কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনতে পারলাম না। তোমার বাবার নাম কি? ”

নিভি চোখ তুলে আরেকবার সবাইকে দেখে বিব্রত হলো। এতোগুলো লোকের সামনে আশ্রয় চাইতে ভীষণ লজ্জা লাগছে। হয়তো সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলে, এতোটা অসস্তি হতো না। কিন্তু যাকে চেনেই না, কখনো কথাই হয়নি — তার কাছে হুট করে কিভাবে ভাগনি হিসেবে থাকার আবদার করবে?

“ একটু আলাদা কথা বলা যাবে? ”

বখতিয়ার মাহমুদ মৃদু হাসলেন। বাড়ির বাকিদের দিকে তাকিয়ে নিভি’কে বললেন,

“ এরা আমার বাড়ির’ই লোক। এদের সামনে বললে কোনো অসুবিধা হবে না। সংকোচ করছো কেন? বলে ফেলো। তোমার কি কিছু লাগবে? ”

এ পর্যায়ে দ্বিগুণ বিব্রত হলো নিভি। সবাই তাহলে ইতোমধ্যেই বুঝে ফেলেছে, সে কিছু চাইতে এসেছে। অসস্তিতে মাথা নিচু করে ফেললো। ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“ আমার মায়ের নাম সায়মা মাহমুদ। ”

থমকে গেলেন সিনিওরা মাহমুদ। বখতিয়ার আচমকা বুঝে উঠতে পারলেন না। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন,

“ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। তোমার পরিচয় কি? ”

“ আমার নাম নিভি। আপনাদের ব্যাপারে খুব একটা জানি না। মা কখনো বলেননি। শুনেছি, বাবার সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। আপনারা রাজি ছিলেন না বলে যোগাযোগও রাখেননি। মামা, মা পাঁচদিন আগে মারা গেছেন ক্যান্সারে।

নিভি’র চোখ বেয়ে টুপটাপ করে জল পড়ছে। উপস্থিত সকলে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বখতিয়ার মাহমুদ কাঁপা কন্ঠে আরেকবার জিজ্ঞেস করলেন,

“ সায়মা মারা গেছে? ”

হাহাকার করে উঠলেন সিনিওরা। সোফা থেকে উঠে এসে নিভি’কে জড়িয়ে ধরলেন। আর্তচিৎকার করে বললেন,

“ আমার মেয়েটা মারা গেলো! আর আমি জানলামও না। তোদের এতো রাগ, মেয়েটার খোঁজ ও নিলি না। এবার খুশি তো, আমার মেয়ের লাশটাও দেখতে হয়নি। কত করে বললাম, সায়মাকে খোঁজ। ওকে নিয়ে আয়, আনলি না । বাবার মৃত্যুর খবরটাও দিলি না। আমার মেয়ে কতটা কষ্টে মরলো। মরার সময় মা, ভাই কাউকে একনজর দেখতেও পেলো না। ”

জ্যোতি মাহমুদ এগিয়ে এসে শাশুড়ীকে ধরলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,

“ মা, কাঁদবেন না। আপনি অসুস্থ , প্রেশার উঠবে। থামুন, যা ভাগ্যে ছিলো তাই হয়েছে। ঘরে চলুন, আসুন। বিকেলে কথা বলবেন। ”

বখতিয়ার মাহমুদের চোখদুটো লাল হয়ে গেছে। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। বুকে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। তিনি ধীর পায়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলেন। জ্যোতি মাহমুদ শাশুড়ীকে ধরে নিয়ে গেলেন ঘরে। নিভি সিক্ত নয়নে বসে রইলো সোফায়। অনামিকা তার পাশে এসে বসলো। গালে আলতো করে হাত ছুইয়ে বললো,

“ তুমি সায়মা ফুপির মেয়ে? ”

উত্তর দিলো না নিভি। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ফ্লোরের দিকে। তার যে আশ্রয় নেই, এ বাড়িতে থাকতে এসেছে — একথা এখনো জানানো হয়নি কাউকে। এক্ষুণি বলা উচিত বলেও মনে হচ্ছে না।

সেজুতি মাহমুদ চায়ের ট্রে নিয়ে রান্নাঘরে গেলেন। মলিন কন্ঠে বললেন,

“ অনামিকা, নিভি’কে নিয়ে তোমার ঘরে যাও। আমি ইখতিয়ার’কে জানাচ্ছি। ”

“ জি, ছোটমা। ”

সবাই চলে যাওয়ার পর বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে রইলো পান্না। দোতলায় তাকাতেই বড় ভাইকে দেখতে পেলো। মুহুর্তেই ছুটে গেলো সেখানে। চঞ্চল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“ ভাইয়া, সায়মা ফুপি কে? ”

“ বাবার বোন। ”

“ সে কি বড় আব্বুর ও বোন? ”

“ হ্যাঁ। ”

“ তাহলে আমাদের বাড়িতে আগে আসেনি কেন? ”

অন্যসময় লিখন বিরক্ত হলেও আজ উত্তর দিলো। সায়মা ফুপিকে তার মনে আছে। ভীষণই সুন্দরী ছিলেন তিনি। ঠিক দাদীর মতো। তার যখন নয় বছর, তখন বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এরপর কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহস পাননি। বাবা, চাচা, দাদু কেউ ফুপির নাম শুনতেই পারতেন না। শুধু একাকী বসে সিনিওরা মাহমুদ কাঁদতেন। লিখন এতোকিছু পান্নাকে বললো না। শুধু বললো,

“ ঝগড়া হয়েছিলো, তাই আসেনি।

লিখন চলে গেলো। অথচ আরো কতশত প্রশ্ন ছিলো পান্নার মাথায়। সে রেগে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। এরপর চঞ্চল পায়ে অনামিকার রুমের দিকে গেলো। দীর্ঘ দেড়দিন পর শোবার বিছানা দেখে শরীর নুয়ে এলো নিভির। তবুও সে কিছু বললো না। চুপ করে একপাশে বসে রইলো। অনামিকা নরম কন্ঠে বললো,

“ অনেক দূর থেকে এসেছো। তুমি বরং গোসল করে নাও। জামা-কাপড় এনেছো না? ”

“জি। ”

নিভি চলে যাবে সেই মুহুর্তে পান্না রুমে ঢুকলো। অভিমানী কন্ঠে বললো,

“ ও তোমার রুমে থাকবে? ”

“ হ্যাঁ। ”

“ তাহলে আমি কোথায় ঘুমাবো? ”

অনামিকা মৃদু হাসলো। পান্নাকে বুঝিয়ে বললো,

“ এমন বাজে কথা বলে না পান্না। ও তোমার আপু হয়৷ আমি যেমন আপু, ও তেমনই। বুঝেছো? আর তুমি আমাদের মাঝখানে শোবে। আমরা অনেক গল্প করবো, মজা করবো।”

“ কিন্তু ও তো কথাই বলে না। চুপ করে থাকে। ”

অনামিকা পান্নার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। এরপর ধীর কন্ঠে বললো,

“ তোমার ছোটো আপুর মা মারা গেছে। তাই ও কষ্ট পাচ্ছে। দুদিন পর অনেক গল্প করবে। ”

নিভি’র মা মারা গেছে শুনে পান্না ভীষণ দুঃখ পেলো। সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো ওয়াশরুমের দিকে। ঝিরঝির করে পানি পড়ার আওয়াজ আসছে। হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে বললো,

“ ওর তো ক্ষুধা লেগেছে, আমি তাহলে খাবার নিয়ে আসি? ”

“ ওকে, এসো। ”


প্রায় ত্রিশ মিনিট পর একপ্রকার ছুটে বাড়িতে ঢুকলো ইখতিয়ার মাহমুদ। ড্রয়িংরুমে ঢুকে সোজা চলে গেলো বখতিয়ারের রুমে। আর্তনাদ করে বললো,

“ ভাইজান, সেঁজুতি বললো – সায়মা নাকি মারা গেছে? কিভাবে হলো এসব? ”

বখতিয়ার মাহমুদ কাঁদতে পারেন না। অথচ কষ্টে বুক ফেঁটে যাচ্ছে। তার চোখ দুটো বিষাদে রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। বললেন,

“ক্যান্সার হয়েছিলো। আমি নিশ্চিত, ওর চিকিৎসা জোটেনি। যে অমানুষটার হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছে, সে তো বেকার। চিকিৎসা ছাড়াই আমার বোন মারা গেছে। ”

ইখতিয়ারের চোখ বেয়ে অশ্রুঁ নামছে। দু ভাইয়ের একমাত্র আদরের বোন। অথচ পাঁচদিন হয়েছে মারা গেছে, তারা তা জানেও না। জানাজা তো দূর কবরে একমুঠো মাটিও দিতে পারেনি। সে আগ্রহ নিয়ে বললো,

“ ভাইজান, সায়মার মেয়ে এসেছে নাকি? আমি একটু দেখবো। ”

বখতিয়ার আগ্রহ দেখালো না। ধীর পায়ে বিছানায় বসলো। অশ্রুপাত করে উত্তর দিলো,

“ আমি যাবো না। আমি ওর মেয়ের সামনে যেতে পারবো না। আমরা তো যোগাযোগ রাখিনি। ওইটুকু মেয়ে পিরোজপুর থেকে লক্ষীপুর, লক্ষীপুর থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছে আমাদের কাছে। শুধুমাত্র মায়ের মৃত্যুর কথা জানাতে। কি ভাবছে বল, ওর মামারা এতো বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে, আর ওর মায়ের একটু চিকিৎস টুকুও জোটেনি। চিকিৎসা বিহীন মরে গেছে। ”

চলমান…….

পাঠক, ঠিকানা বা ভাষার ক্ষেত্রে কোনো ভুল পেলে দয়া করে মানিয়ে নেবেন। আমি চেষ্টা করছি, নির্ভুল তথ্য দেওয়ার। তবুও ভুল-ভ্রান্তি হয়েই যায়। উপন্যাসের প্রয়োজনে নানা জায়গার কথা উল্লেখ করলেও, সে সমস্ত জায়গা আমি চিনি না। ভাষাও জানি না। গুটিকয়েক সময়, গুগল বা এ আই এর সাহায্য নিলেও লক্ষ্য করেছি তা অনেকাংশেই ভুল৷ তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নিজের ভাষাতেই লিখবো। আপনারা কাল্পনিক হিসেবে একটু মানিয়ে নিবেন। ❤️❤️❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply