তোমার সঙ্গে এক জনম (০৭)
সানা_শেখ
“লামহা, তুমি কি কোনোভাবে আমার উপর চেঁচালে?”
লামহা ঘাড় ঘুরিয়ে হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কেন, আপনি শুনতে পাননি? আরও জোরে চেঁচাতে হবে?”
হিমেল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল লামহার মুখের দিকে। লামহা মুখ ফিরিয়ে নেয়। হিমেলের ফোন বেজে ওঠে।
“বল।”
“বের হচ্ছিস না কেন? আমরা রুমের বাইরেই দাঁড়িয়ে আছি।”
হিমেল কল কে’টে রুম থেকে বের হয়।
গম্ভীর গলায় বলে,
“কোথাও যেতে হবে না এখন, গিয়ে শুয়ে পড়।”
রাতুল অবাক হয়ে বলে,
“মানে? তুইই তো বললি বাইরে যাবি এখন আবার শুয়ে পড়তে বলছিস কেন?”
সোহান বলে,
“ছোট্টো বাবু, বোঝো না কিছু? বউয়ের আদর খাবে তাই যাবে না, চল এখান থেকে। শুধু শুধু আমাদের সময় নষ্ট করল।”
হিমেল কটমট করে তাকিয়ে থাকে তিনজনের দিকে। এই বজ্জাতগুলো ওর বন্ধু এটা ভাবতেও ওর অবাক লাগে।
বেশি কথা না বাড়িয়ে রুমে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয় হিমেল। ওরো ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, গাড়িতে ঘণ্টা খানিকের মতো ঘুমিয়েছিল। গতরাতে তো সারারাত জেগেই ছিল, তার আগের রাতেও ঘুমোতে পারেনি ব্যস্ততার কারণে।
ফ্রেশ হয়ে এসে মেইন লাইট অফ করে ডিম লাইট অন করে তারপর বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। লামহা দুজনের মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে রেখেছে তাতে হিমেলের জন্যই ভালো হয়েছে।
লামহা এখনো ঘুমায়নি, চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে চুপচাপ। মস্তিষ্কে নানান কথা ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
রাত গভীর। গভীর ঘুমে মগ্ন হিমেল আর লামহা। রুমে ফ্যানের শো শো বাতাসের শব্দ। বাইরে থেকে মাঝেমধ্যে শেয়াল আর নেড়ি কু’কু’রের হাকডাক ভেসে আসছে।
লামহার রুমের জানালায় ঢিল ছোঁড়ার শব্দ হয়। প্রথম ঢিল পড়ায় দুজনের একজনেরও ঘুমের বিঘ্ন ঘটে না। দ্বিতীয় ঢিল পড়তেই হুড়মুড় করে শোয়া থেকে উঠে বসে হিমেল। কাঁচ ভাঙার আওয়াজ স্পষ্ট শুনেছে। আবার জানালার কাঁচে ঢিল লাগতেই চমকে ওঠে। ঘুম পুরোপুরি পালিয়েছে এখন। এভাবে ঢিল কে ছুঁড়ছে?
জানালার দিকে তাকালে সেরকম কিছু চোখে পড়ে না, পর্দা টেনে দেওয়া রয়েছে। একের পর এক ঢিল এসে লাগছে জানালায়। লামহার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখে হিমেল বসে আছে। ঘুম জড়ানো গলায় বলে,
“না ঘুমিয়ে এভাবে বসে আছেন কেন? আর এত শব্দ কীসের?”
“কে যেন জানালায় ঢিল ছুঁড়ছে।”
“হ্যাঁ?”
প্রশ্ন করেই হুড়মুড় করে শোয়া থেকে উঠে বসে লামহা। হিমেল বিছানা ছেড়ে নামতে গেলে লামহা হাত টেনে ধরে বলে,
“কো… কোথায় যাচ্ছেন?”
“দেখি কে এভাবে ঢিল ছুঁড়ছে।”
“কোথাও যেতে হবে না, যদি মাথায় লাগে? ওদের কাছে বন্দুকও থাকতে পারে।”
“বন্দুক!”
“ব…. বন্দুক না, বাটাল। আপনি এখানেই বসে থাকুন, আমি আব্বুকে বলে আসছি।”
হিমেলকে আর কিছু বলতে না দিয়ে লামহা তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। হিমেল বিছানা ছেড়ে নেমে লাইট অন করে। পর্দা সরিয়ে নিচের দিকে তাকায় তখনই একটা ঢিল এসে জানালায় লাগে। হিমেল পাশে সরে দাঁড়ায়। সরাসরি দাঁড়িয়ে থাকলে সত্যি সত্যিই ওর মাথায় এসে লাগবে। হিমেলের বুঝতে বাকি নেই এরাই কবীরের সাঙ্গপাঙ্গ। কবীর বারবার কল করছিল বলে ওই সিম কার্ডটাই খুলে রেখেছে হিমেল। সিন কার্ড খুলে রাখার পর আর কোনো কল আসেনি ওর ফোনে।
নিচ থেকে শোরগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। লামহার বাপ, চাচা আর ভাই চোর চোর বলে চিৎকার চেঁচামেচি করছে।
কয়েকজনের পায়ের ধুপধাপ শব্দ শোয়া যাচ্ছে। ছেলেগুলো দৌড়ে পালাচ্ছে বোধহয়।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আশপাশের বাড়ি থেকেও বেশ কয়েকজন মানুষ বেরিয়ে এসেছে বাঁশটাশ হাতে নিয়ে।
নেড়ি কু’কু’রগুলো আগের চেয়েও জোরে জোরে ঘেউঘেউ করছে।
হিমেল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিবেশীরা আর লামহার বাপ, চাচা, ভাই গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়ির মহিলাদের ভেতর থেকে কাউকে দেখা যাচ্ছে না, তারা হয়তো বের হয়নি।
হিমেল হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে রুমে ফিরে আসে। বিয়ে মানুষ করে? বিয়েতে এত শান্তি? না মনে শান্তি পাচ্ছে আর না তো ঘুমিয়ে শান্তি পাচ্ছে। হিমেল এতকাল ভেবেছে ওর জীবনে শান্তি ব্যতীত কিছুই নেই, এখন দুদিন ধরে বিয়ে করে দেখছে অশান্তি ব্যতীত শান্তির ছিটেফোঁটাও ওর জীবনে নেই।
দুদিন পর একটু শান্তির ঘুম দিয়েছিল সেটাও কারো সহ্য হয়নি, ঘুমের রফাদফা করে দিয়েছে।
পানি পান করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে।
লামহা রুমে ফিরে আসে। দরজা লাগিয়ে মেইন লাইট অফ করে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে নিজের জায়গায়। ওর মা আর বড়ো মা ঠেলে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে ওকে।
“চোর চু’রি করতে আসবে দরজা ভেঙে নয়তো নিচের জানালা ভেঙে ওরা দ্বিতীয় তলার জানালা ভাঙছিল কি ভেবে?”
লামহা কিছু না বলে চুপ করে থাকে। হিমেল আবার বলে,
“চোরগুলো কি আমার বউ চু’রি করতে এসেছিল?”
লামহা ফট করে ঘাড় ঘুরিয়ে হিমেলের দিকে তাকায়। হিমেল আগে থেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছু না বলে দ্রুত উল্টো ফিরে শোয়।
গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছে সবাই। আসার সময় লামহা অনেক কেঁদেছে। ও কিছুতেই বাবা-মাকে ছেড়ে আসতে চাইছিল না। একপ্রকার জোর করেই ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকায়।
বিছানার একপাশে গুটিসুটি মে’রে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছে লামহা। হিমেল রুমে নেই, বাড়িতে পৌঁছে রুমেও আসেনি এখন পর্যন্ত।
রাত অনেক হয়ে গেলেও লামহার ঘুম আসছে না। বাবা মায়ের কথা অনেক বেশি মনে পড়ছে।
লামহাকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল, লামহা খাবে না বলেছে। বাড়ি থেকে আসার সময় খেয়েই এসেছে, খিদে পায়নি এখন।
হিমেল রুমে ফেরে প্রায় রাত দেড়টা নাগাদ। আগামীকাল বিকেলে হলে ফিরে যাবে। এতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে ছিল। ওদের বিদায় দিয়েই রুমে ফিরল।
দরজা লাগিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। লামহার দিকে একবার তাকিয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে অন্যপাশে কিনার ঘেঁষে। লামহা গভীর ঘুমে রয়েছে, ভারী শ্বাস ফেলছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয় লামহা। শাড়ীর আঁচল লম্বা করে ঘোমটা টেনে রুম থেকে বের হয়। সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই কনার সঙ্গে দেখা হয়। কনা মিষ্টি করে হেসে বলে,
“আমি তোমাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম।”
সৌজন্য মূলক লামহা-ও একটু ওষ্ঠ প্রসারিত করে। কনার সঙ্গে পা বাড়ায় নিচের দিকে। কনা বলে,
“ছোটো মামি ডাকছে তোমাকে।”
লামহা বলে না কিছু। নিচে নেমে আসতেই শ্বশুর, চাচা শ্বশুর, দাদি শাশুড়ি সহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। সকলকে সালাম দিয়ে কনার সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে আগায়।
লামহা মনে মনে ভয় পাচ্ছে। ওকে কি রান্না করতে বলবে? কিন্তু ও তো রান্না করতে জানে না। রান্না করতে বললে কি করবে?
“মামি।”
শিরিন সুলতানা পেছন ফিরে তাকান কনার ডাক শুনে। লামহাকে দেখে বলেন,
“চা বানিয়ে সবাইকে দিয়ে আসো।”
লামহা মাথা নাড়ায়।
“ওখানে সসপ্যান, ওখানে চিনি আর চা পাতা আছে।”
লামহা সসপ্যানে পানি নিয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়।
“সাত দিনের জন্য চা বানাতে বলিনি, শুধু এখনকার জন্য বানাও।”
শাশুড়ির কর্কশ গলার স্বর শুনে লামহার চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর হয়ে যায়। এভাবে কেউ ওর সঙ্গে কখনো কথা বলেনি। এবাড়িতে আসার পর থেকেই শাশুড়ি আর চাচি শাশুড়ির কাছ থেকে এভাবে কথা শুনছে। বিয়ের পরের দিন দুপুরের আগ দিয়ে জাকিরের মা ওর সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছিলেন, অনেক কথাও বলেছিলেন।
“দাঁড়িয়ে না থেকে পানি কমিয়ে দাও।”
লামহা সসপ্যান থেকে অর্ধেক পানি কমিয়ে দেয়।
শিরিন সুলতানা হাজব্যান্ডের উপর রাগ ঝাড়তে শুরু করেন। শাশুড়ি মায়ের প্রত্যেকটা কথা এসে তীরের ফলার মতো লামহার বুকে গেঁথে যাচ্ছে। শ্বশুরকে বললেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যে ওকেই বলছে সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছে।
চা বানানো হলে চায়ের কেটলিতে ঢেলে নেয় সবটুকু চা। ট্রের উপর কেটলি আর চিনির কাপ তুলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে আসে। ট্রের উপর থেকে টি টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে আবার রান্নাঘরে এসে কাপ নিয়ে যায়।
জাকারিয়া মির্জা লামহার হাতের চা খাবেন না তাই বসা থেকে উঠে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। জাবির মির্জা বড়ো ভাইয়ের যাওয়ার পথে তাকালেও মুখে কিছু বললেন না।
লামহা মলিন মুখে সবাইকে চা দেয়। শাশুড়ি আর চাচি শাশুড়ির জন্য দুই কাপ চা বানিয়ে রান্নাঘরে আসে আবার।
“মা, আপনার চা।”
“রাখো এখানে।”
লামহা আস্তে করে চায়ের কাপটা রেখে দ্বিতীয় কাপটা চাচি শাশুড়ির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“বড়ো মা, আপনার চা।”
“তোমাকে নিষেধ করেছি না আমাকে বড়ো মা বলবে না? তুমি ডাকবেই না আমাকে। তোমার হাতের চা খাব না আমি।”
লামহা টলমলে চোখে কাপটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে।
“সরো আমার সামনে থেকে? আমার সামনে আসবে না তুমি।”
লামহা চোখ মুছে শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকায়। শিরিন সুলতানা রুটি বাজতে বাজতে বলেন,
“আদা, রসুন আর মসলা বেটে দাও। হাজেরা, সবকিছু বের করে দাও ওকে।”
হাজেরা রুটি বেলা বন্ধ করে আদা, রসুন আর মশলার ডিব্বা বের করে নিচে রেখে আবার রুটি বেলতে শুরু করে।
লামহা নিচু একটা মোড়ার উপর বসে আদা, রসুন ছিলতে শুরু করে। একটু পর পর চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখ মুছে আবার রসুন ছিলতে থাকে। হাজেরা লামহার দিকে তাকিয়ে আছে। লামহার জন্য ওর ভীষণ মায়া হচ্ছে। ব্লেন্ডার থাকতে ওকে দিয়ে কেন বাটাতে হবে? ব্লেন্ড করা মসলা তো ফ্রিজে আছেই।
আদা, রসুন আর মসলা বেটে নেয় সময় নিয়ে। আগে তো এসব কাজ করেনি তাই সময় বেশি লেগেছে। দুই হাতের তালুতে ফোস্কা পড়ে গেছে। আদা রসুন বাটার কারণে ডান হাত জ্বলতে শুরু করেছে। রস ছিটে পায়ে লাগার কারণে পাদুটো অনেক বেশিই জ্বলছে।
“পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচগুলোও কেটে রাখো।”
হাজেরা লামহার সামনে থেকে শিলপাটা নিয়ে সরিয়ে রাখে। লামহা পেঁয়াজ ছিলে কাঁচা মরিচের বোটা ছাড়িয়ে ধুয়ে নেয়। পেঁয়াজ কুচি করতে গিয়ে চোখ মুছতে মুছতে লামহার অবস্থা নাজেহাল। চোখমুখ পুরো লাল হয়ে গেছে। হাজেরা বলে,
“ভাবী, এডি দেন, আমি কাডি।”
জাকিরের মা নাজমা মির্জা হাজেরাকে ডেকে বলেন,
“হাজেরা, কফির মগটা জাকিরের রুমে দিয়ে আয়।”
হাজেরা কফির মগটা হাতে নিয়ে জাকিরের রুমে যাওয়ার জন্য রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
নাজমা মির্জা কফির কৌটা সরিয়ে রেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যান। কফির মগটা উনি নিজেই ছেলের রুমে নিয়ে যেতেন কিন্তু হাজেরা লামহার কাজে সাহায্য করতে চাওয়ায় ওকে সরিয়ে দিলেন।
লামহা নিজের কাজ শেষ করে সব গুছিয়ে রেখে রান্নাঘর থেকে বের হয়। কাঁচা মরিচ কা’টার কারণে দুই হাতও অনেক জ্বলছে।
ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘর পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই।
সিঁড়ির দিকে আগাতেই শিরিন সুলতানা পেছন থেকে ডেকে বলেন,
“কোথায় যাচ্ছ? খেয়ে যাও।”
“একটু পরে খাব।”
এখনই খেয়ে যেতে বললেও লামহা আর দাঁড়ায় না, কিছু বলেও না। শিরিন সুলতানা রেগে পেছন থেকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের কি তেজ এখনই, ওনার কথা অমান্য করে কীভাবে চলে গেল। অসভ্য মেয়ে।
ঘুম ভেঙে যায় হিমেলের। চোখজোড়া মেলে আবার বন্ধ করে নেয়। বিছানা হাতড়ে নিজের ফোন হাতে তুলে নেয়। পাওয়ার বাটন চেপে আবার চোখ মেলে তাকায়। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে প্রায় দশটা বেজে গেছে।
ফোন হাত থেকে রেখে শোয়া থেকে উঠে বসে। অলস ভঙ্গিতে দুই হাত দুদিকে মেলে দেয়।
হাত দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতে দিতে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। লামহার কথা স্মরণ হতেই রুমের চারদিকে নজর বুলিয়ে দরজার দিকে তাকায়। নিচে রয়েছে বোধহয়।
বেশি কিছু না ভেবে ওয়াশরুমের দিকে আগায়। লাইট অন করে ভেতরে ঢুকে দেখে লামহা ওয়াশরুমে বসে আছে দুই হাত বালতির পানিতে ডুবিয়ে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছেও।
বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বলে,
“কী হয়েছে? এখানে এভাবে বসে বসে কাদঁছো কেন?”
লামহা একবার হিমেলের দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নেয় আবার। মুখে কিছু না বলে ফোঁপাতে থাকে।
হিমেল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঝুঁকে লামহার হাত বালতির ভেতর থেকে টেনে বের করে। হাত দুটো কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে পানির মধ্যে ভিজিয়ে রাখার কারণে। হিমেল ধরে রাখার পরেও থরথর করে কাঁপছে। দুই হাতের তালুতে দুটো ফোস্কা পড়ে আছে।
“হাতে কী হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন? ফোস্কা পড়লো কীভাবে?”
লামহা কিছু না বলে হিমেলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় জোর করে। পুনরায় বালতির পানিতে ডুবিয়ে দেয়।
“কথা বলছো না কেন? কী হয়েছে হাতে? এমন হয়েছে কেন?”
লামহা কথা বলে না।
“লামহা, আমি জিজ্ঞেস করছি কিছু, উত্তর দিচ্ছ না কেন?”
লামহা তবুও চুপ করে থাকলে হিমেল আবার লামহার হাত ধরতে নেয়। লামহা কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করে কিছুটা রাগী গলায় বলে,
“আপনি ছোঁবেন না আমাকে? দূরে থাকুন আমার কাছ থেকে।”
লামহার কথা আর বলার ধরন দেখে মেজাজ বিগড়ে যায় হিমেলের। তেজ দেখিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। তখনই “ভাবী ভাবী” বলে ডাকতে ডাকতে রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় কনা।
“ভাইয়া, ভাবী কোথায়?”
“কেন?”
“খাবে না?”
“খায়নি এখনো?”
“না।”
“এখনো কেন খায়নি?”
“জানি না তো, মামি খাওয়ার জন্য যেতে বলল।”
“লামহার হাতে কি হয়েছে জানিস কিছু?”
“কেন, কী হয়েছে হাতে?”
“দুই হাত বালতিতে ভিজিয়ে বসে আছে, সম্ভবত হাত জ্বলছে।”
“জ্বলতে পারে।”
“কেন?”
কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে হিমেল।
“আদা, রসুন আর মসলা বেটেছিল। পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচও কে’টে’ছে। মরিচ কা’টার জন্যই মনে হচ্ছে হাত জ্বলছে।”
“ওকে এসব করতে দিয়েছিল কে?”
“ছোটো মামি।”
“তুই যা।”
কনা মাথা নেড়ে চলে যায়। হিমেল কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে। ড্রয়িং রুমে আপাতত কেউ নেই এখন। কোনো জায়গায় না দাঁড়িয়ে সোজা রান্নাঘরে প্রবেশ করে। বেটে রাখা মসলা, আদা, রসুন, পেঁয়াজ কুচি আর কাঁচা মরিচ দেখে নেয়। চোয়াল শক্ত করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গলা ছেড়ে “আম্মু আম্মু” বলে ডাকতে শুরু করে। নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন শিরিন সুলতানা। সঙ্গে কনা, শিশির, হাজেরা, ওর দাদি আর নাজমা মির্জাও চলে এসেছেন হিমেলের এমন গলার স্বর শুনে।
“কী হয়েছে? এভাবে ডাকছিস কেন?”
“লামহাকে মসলা বাটাবাটি আর পেঁয়াজ মরিচ কা’টতে বলেছিল কে?”
“আমি।”
“আক্কেল জ্ঞান কী সব লোপ পেয়েছে তোমার? ওই টুকুন একটা মেয়েকে দিয়ে অত মসলা বাটিয়েছো কোন আক্কেলে? বাড়িতে ব্লেন্ডার আছে কী করতে? এতকাল ব্লেন্ডার দিয়ে কাজ হয়েছে আজকে হতো না?”
“কাজ করিয়েছি তো কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে জিজ্ঞেস করছ? মেয়েটার দুই হাতে ফোস্কা পড়ে গেছে। মরিচ কা’টা’র কারণে হাত জ্বলছে। ওয়াশরুমে বসে কাদঁছে। অতগুলো মরিচ কেন কা’টতে বলেছ? সব কী আজকেই খাবে?”
“দুই দিনের বউয়ের জন্য তুই আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস? এখনই বউ পাগল হয়ে গেছিস?”
“এখানে বউ পাগল হওয়ার কথা কেন আসছে? লামহার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও একই কথা বলতাম। ছোটো একটা মেয়ে, হাত দুটোর কেমন অবস্থা হয়েছে গিয়ে দেখে আসো।”
“এখন কি তোর বউকে দিয়ে কোনো কাজও করানো যাবে না?”
“যাবে না কেন? অবশ্যই যাবে তবে সেটা যেন ওর জুলুম না হয়। আজকে তো তুমি ওর উপর একপ্রকার জুলুম-ই করেছ।”
হিমেলের চেঁচামেচি শুনে জাকির রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
“কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করছিস কেন?”
“আম্মু লামহাকে দিয়ে একগাদা আদা, রসুন, মসলা বাটিয়েছে। পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কা’টিয়েছে। দুই হাতে ফোস্কা পড়ে গেছে, হাত জ্বলছে। ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকে দেখি, ওয়াশরুমে বসে বালতিতে হাত ডুবিয়ে কাদঁছে।”
জাকির শিরিন সুলতানার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এসব কী, ছোটো মা? লামহা ছোটো মানুষ, বাবার বাড়িতে কোনো কাজ করেনি, এসব করতে ওর কষ্ট হবে এতটুকু তো বোঝার ক্ষমতা তোমার আছেই, তুমি তো ছোটো মানুষ নও। জেনে বুঝে এসব ওকে দিয়ে কেন করিয়েছ?”
নাজমা মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগী গলায় বলেন,
“ওই মেয়ের বিষয়ে তোকে কথা বলতে বলেছে কে? যা নিজের রুমে।”
“তুমি চুপ করো তো। সবসময় শুধু বেশি বেশি। তোমরা দুই জা মিলে এখন সো কল্ড শাশুড়িদের মতো ছেলের বউকে অত্যাচার করবে নাকি?”
“জাকির, রুমে যা বলছি।”
“যাব না।”
হিমেল কনার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ফ্রিজে বরফ আছে?”
“আছে বোধহয়।”
“থাকলে রুমে নিয়ে আয় লামহার হাতে দিয়ে দিবি।”
বলেই হিমেল সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরে। পুনরায় রুমে ফিরে এসে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। লামহা এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
“ওঠো এখান থেকে।”
ঝাড়ি দিয়ে হিমেলের হাত সরিয়ে দেয় লামহা। জেদ দেখিয়ে বলে,
“ছোঁবেন না আমাকে।”
“লামহা, জেদ না করে ওঠো এখান থেকে।”
“আপনি যান এখান থেকে।”
“ওই সব করতে গেছো কেন? নিষেধ করতে পারলে না।”
“করতে পারবো না আমি, আপনি গিয়ে করে আসুন।”
“ভালোভাবে কথা বলো।”
“পারবো না। আপনাদের যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে বলবেন, যা ইচ্ছে তাই বলবেন, যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করবেন আর আমি কিছু বললেই দোষ? কী করেছি আমি? বিয়ে করলেন কেন? আমার বাপ ভাই জোর করে আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল আমাকে? আপনার বড়ো ভাই যেমন বিয়ে ভেঙে চলে আসলো তেমন আপনি আসতে পারলেন না? আব্বুরা আর ভাইয়া তো রাজিই ছিল না এই বিয়েতে, আপনারাই তো বলে বলে রাজি করিয়েছিলেন। এখন এমন করেন কেন সবাই মিলে? থাকবো না আমি এখানে, যেখান থেকে এনেছেন সেখানে নিয়ে রেখে আসুন।”
“ঠ্যাকা পড়েনি আমার, যে এনেছে তাকে গিয়ে বলো রেখে আসতে। বা/লের বিয়ে করিয়েছে, দুই দিনেই জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছে।”
মেজাজ দেখিয়ে হিমেল ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে যায় আবার। মেজাজ গরমের উপর গরম হচ্ছে।
চলবে………..
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ১১