তুষারিণী—– ৫
সানজিদাআক্তারমুন্নী
দেখতে দেখতে চারটি দিন স্মৃতির পাতায় ধূসর হয়ে গেছে। সেদিন রাতের পর নূশার জ্বরটা এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে, বিছানা ছেড়ে উঠে বসার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না ওর শরীরে। তবে এই অসুস্থতার মধ্যেও সবচেয়ে স্বস্তির নাকি কষ্টের বিষয় হলো, এরপর থেকে ইথান আর নূশার ছায়াও মাড়ায়নি। নূশার খোঁজ নেওয়া তো দূর, প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলেনি সে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে নূশার মনে অদ্ভুত এক হাহাকার জেগেছিল । ইথানের এই আচরণ তাকে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ করছে। মনের কোণে বারবার একই প্রশ্ন উঁকি দেয় তার বারবার তাদের সম্পর্কটা কি কেবলই শরীরকেন্দ্রিক? এর বাইরে কি কোনো অস্তিত্ব নেই? শুধুই কি শারীরিক চাহিদার প্রয়োজনে তাদের এই কাছে আসা? যদি তাই না হবে, তবে এত ক্ষত, এত আঘাত সে কার জন্য, কিসের আশায় সহ্য করছে? ইথানের এই নিস্পৃহতা নূশার অসুস্থ শরীরটাকে আরও বেশি অবশ করে দেয়েছিল।
যাইহোক, নূশা এখন অ্যাভিনিউ আনাতোল ফ্রান্স রাস্তায় হাঁটছে। জীবনটা তার কাছে সব সময়ই এক দুর্গম পথ, আজও সেখানে নতুন এক বাধার পাহাড় এসে দাঁড়িয়েছে। যে রেস্টুরেন্টে সে কাজ করে, সেখানে গত একমাস ধরেই গুঞ্জন চলছে এর মালিকানা পরিবর্তন হবে। নূশা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে অন্য কোথাও কাজ খোঁজার, কিন্তু পায়নি। আগামীকালই তার এখানে শেষ কাজ। এরপর নতুন মালিক আসবেন। তিনি চাইলে তাকে রাখবেন, নয়তো নির্মমভাবে ছাঁটাই করে দেবেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় নূশার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।সন্ধ্যার প্যারিস। আলোয় ঝলমলে শহরের বুকে একবুক হতাশা নিয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটছে নূশা। গত পাঁচ মাসে প্রায় ছয় লাখের মতো টাকা দেশে পাঠিয়েছে সে। কিন্তু ঋণের বিশাল গহ্বর সেই সব টাকাই গিলে খেয়েছে। গত একমাস ধরে বাড়িতে একটা পয়সাও পাঠাতে পারেনি নূশা। অথচ দেশে ভাই-বোনদের স্কুলে ভর্তির সময় হয়ে গেছে, ঘরে বাজার নেই, হাত একদম খালি। কী এক ভয়াবহ পরিস্থিতি!
কারো কাছে ঋণ চাইবে, সে উপায়ও নেই। সবাই ভাববে, মেয়ে বিদেশে থাকে, নিশ্চয়ই গাড়ি গাড়ি টাকা কামাচ্ছে। আর তার বাবা? তিনি না খেয়ে মরে যাবেন, তবু কারো কাছে হাত পাতবেন না। নূশার এখানে আসার জন্য সেই ঋণ করা ছয় লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, তারা সবটা তো আর ইথানের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে শোধ হবে না বিয়ে নিয়ে আসা নিয়ে অল্প হলেও খরচ তে করতে হবে। আর খরচ কিভাবে করবেন? ঝণ ব্যাতীত উপায় নেই। বাবার সেই ঋণের বোঝা নূশাকেই বইতে হচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতেই নূশার চোখ ভিজে আসে। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আড়াল করে, চোখের পানি মুছতে মুছতে এক ধার দিয়ে হাঁটতে থাকে।
ঠিক তখনই, মাস্ক পরা এক ভদ্রলোক তার পাশে এসে দাঁড়ান এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। নূশা প্রথমে খেয়াল করে না, কিন্তু খানিক বাদেই কৌতূহলী হয়ে আড়চোখে লোকটির দিকে তাকায়। লোকটার চোখের দিকে তাকাতেই নূশার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে, “এজার ভাইয়া না?”
মাস্কের আড়ালে থাকলেও লোকটির কালচে নীল চোখ দুটো চিনতে নূশার ভুল হয় না। পরক্ষণেই অবশ্য মনে হয়, এই দেশে তো অনেকেরই এমন চোখ থাকে, হয়তো এ অন্য কেউ। কিন্তু নূশার দ্বিতীয় ধারণাটাই ভুল প্রমাণিত হয়। ওটা এজারই। বিলাসবহুল রাজকীয় জীবন আর পরিচিতির বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে মাঝে মাঝে এভাবেই সাধারণ মানুষের মতো মাস্ক পরে শহরের রাস্তায় হাঁটতে বের হয় সে।এজার নূশার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, “জি। তা চোখে পানি কেন তোমার, নূশা মণি?”
নূশা তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁটের কোণে একটা মিথ্যা হাসির রেখা টেনে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে বলে, “না… না, ওই এমনি… বাড়ির কথা মনে পড়ল হঠাৎ।”
এজার অবশ্য সেই মিথ্যাটুকু ধরে ফেলে কি না বোঝা যায় না, তবে সে প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন করে, “তা শরীর ঠিক আছে তো এখন? মন খারাপ বেশি?”
নূশা অবাক হয়ে এজারের দিকে তাকায়। মানুষটা কত আলাদা! কী শান্ত, কী ভদ্র তার ব্যবহার! তার কথায়, চলনে-বলনে কী ভীষণ এক পরিপক্বতা। ইশ! ইথান যদি তার সাথে অন্তত এর অর্ধেক ভালো ব্যবহারও করত!দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নূশা মুচকি হেসে জবাব দেয়, “ঠিক আছি এখন, আলহামদুলিল্লাহ। মনটা ভালোই আছে এই একটু হালকা খারাপ আরকি!”
এজার মাথা নেড়ে সায় দেয়। তারপর জিজ্ঞেস করে, “ওহ। তা এখন কি ফ্রি আছো?”
“হ্যাঁ, এই তো বাড়ি ফিরব। আপনি ফিরবেন না?”
“ফিরব, ফিরব। আচ্ছা চলো, একসাথেই বাড়ি যাই।”
“আচ্ছা!”
প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে থাকে দুজন। টুকটাক কথা হয়, কথার ফাঁকে ফাঁকে নূশা অনুভব করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাড়ি ফিরে নূশা নিজের ঘরে চলে যায়, আর এজার পা বাড়ায় তার নিজের কক্ষের দিকে। নূশার মনের ভেতর জমে থাকা মেঘটা এজারের সামান্য সান্নিধ্যে কিছুটা হলেও হালকা হয়ে যায়।
নূশা ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করতেই থমকে যায়। সোফায় বসে আছে ইথান সে খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ফাইল চেক করছে। নূশার চোখে বিস্ময় ইথান কে দেখে। সাধারণত রাত তিনটে-চারটের আগে যার টিকিটিও দেখা যায় না, আজ সন্ধ্যা সাতটা না বাজতেই সে ঘরে হাজির! বাহ্, কী পরিবর্তন! এ ভেবে নূশা অবশ্য ইথানের দিকে বেশিক্ষণ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন মনে করে না। সে সোজা ড্রেসিংরুমে চলে যায়। বোরকা আর হিজাব পাল্টে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বেছে নেয় হাঁটুর নিচ অবধি ঝোলানো একটা কালো ওয়ান পিস আর সাদা সালোয়ার। পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে সে। ঝরঝরে একটা গোসল সেরে ধীরপায়ে বেরিয়ে আসে নূশা। সে বেরোতেই ইথান ফাইল থেকে মুখ তুলে এক পলক তাকায় তার পানে। পরমুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে আবারও ফাইলের দিকে তাকায় কিন্তু কিন্তু মন মানতে চায় না মন বলে আরো একটিবার তাকাই তো দেখি তো কেমন সুন্দর লাগছে। ভেতর থেকে এক অদম্য কৌতূহল ইথানকে বাধ্য করে আবারও নূশার দিকে তাকাতে তাই অবাধ্য অন্তরের বাধ্য হয়ে সে নূশার ন্যায় তাকায়। সদ্য গোসল করে আসা নূশাকে দেখে ইথানের চোখ আটকে যায়। তার মুখে-চোখে এখনো পানির বিন্দু লেগে আছে। হাঁটুই ছুঁইছুঁই কৃষ্ণবর্ণ ভেজা কেশরাশি কিছুটা এলোমেলো হয়ে কাঁধে আর গলায় লেপটে আছে। নূশার বাঁ চোখের কোণে একটা ছোট্ট লাল তিল আছে সেই তিলটা পানির ছোঁয়ায় আরও বেশি চকচক করছে। কালো-সাদা পোশাকের আবরণে এই সাধারণ নূশাকেও ইথানের চোখে অমায়িক অসম্ভব অসাধারণ লাগছে।
ইথানের এই মুগ্ধ দৃষ্টি নূশার নজর এড়ায় না, কিন্তু সে এই চাওয়া কে পাত্তা দেয় না। ওড়নাটা মাথায় টেনে নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। একবারের জন্যও ইথানের দিকে তাকানোর প্রয়োজন সে বোধ করে না। আর করার যথেষ্ট কোনো কারণ বা কার্য তার কাছে নেইও।
রুম থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমে আসতেই গ্রেনীর সঙ্গে দেখা হয় নূশার। নূশাকে দেখেই তিনি আবদার করে বসেন, “নূশা বইন, এক কাপ চা দে তো। একদম খাঁটি সিলেটি চা, ওইসব হাবিজাবি টি-কফি না।”
নূশাও মূলত চা খেতেই নিচে নেমেছিল। এই মিষ্টি আবদার শুনে সে মৃদু হেসে উত্তর দেয়, “আচ্ছা গ্রেনি, দিচ্ছি।”
বাঙালি মাত্রই চায়ের প্রেমে মশগুল, কিন্তু ধমনীতে যাদের সিলেটি রক্ত, তাদের কাছে চা কেবল একটি পানীয় নয় এটি এক আজন্ম ধ্যানের নাম, এক বাঁধনহারা ভালোবাসা। সাধারণের চেয়ে দ্বিগুণ নয়, বরং শতগুণ আবেগ মিশিয়ে তারা চুমুক দেয় চায়ের কাপে। সিলেটের কুয়াশাঘেরা সকাল মানেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের সুবাস, আর সন্ধ্যা নামার আগেই নাস্তার টেবিলে চায়ের অপরিহার্য আবাহন। দুপুর গড়িয়ে অলস বিকেল কিংবা অকারণে কিছু খেতে চাওয়া জীবনের সব সমীকরণের একটাই উত্তর: তা হলো এক কাপ কড়া লিকারের চা। ঘন দুধ-চায়ের স্বাদ ছাড়া সিলেটিদের দিন শুরুই হতে চায় না, আবার শেষও হয় না।
মাথা ধরা হোক কিংবা মন খারাপ, অথবা আড্ডার ঝড় তোলা কোনো বিকেল সিলেটি জীবনে চা ছাড়া সবই বড় পানসে, বড়ই বেরসিক। আজ সাত সমুদ্র আর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে গ্র্যানি সুদূর ফ্রান্সে। কিন্তু ভিনদেশি হাওয়া কি আর মাটির টান কিংবা চায়ের নেশা ভোলাতে পারে?আ্যাশার পরিবারের তিনজন মানুষ নূশা, ইথানের মা এবং ইথানের গ্র্যানি চায়ের প্রেমে মগ্ন এক ‘তিনমূর্তি’। এই তিন প্রজন্মের তিন সিলেটি রমণী প্রবাসের যান্ত্রিকতার মাঝেও বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন চায়ের প্রতি চিরায়ত ভালোবাসা। দু-কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে নূশা গ্রেনির পাশে এসে বসে। এক কাপ তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও গ্রেনি।”
তাদের পাশেই বসে ছিল এভা সে বসে বসে টিভিতে সু দেখছে। এভা ইথানের ছোট বোন, বয়স একুশ। বয়সে নূশা এভার চেয়ে দু-বছরের বড় হলেও তাদের সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। এভা অবাক হয়ে টিভি থেকে নজর সরিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “কী রে, তোদের কি শুধু চা-ই খেতে ইচ্ছে করে? এত চা কেমনে খাস তোরা?”
চায়ের কাপে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে নূশা দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে, “আমাদের জন্ম থেকেই চা খেয়ে অভ্যাস। চা মানে কী জানিস? চা হলো এক টুকরো ভালোবাসা। সে তুই বুঝবি না।”
এভা এ শুনে মুখটা ভেংচি কেটে বলে, “হয়েছে, আর জ্ঞান দিতে হবে না।”
এরই মধ্যে এজার এসে সেখানে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে পকেট থেকে একটা লিন্ট চকলেট বের করে নূশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও নূশা, চকলেট খাও। মন আরও ফ্রেশ হবে।”
নূশা সরল মনেই হেসে চকলেটটা হাতে নেয় আর কৃতজ্ঞচিত্তে বলে, “ধন্যবাদ ভাইয়া।”
এজার নূশার হাসি মুখ দেখে নিজেও আলতো হেসে এভার পাশে বসতে বসতে বলে, “আরে না, ধন্যবাদের কী আছে!”
এভা এবার এজারকে ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে, “এই! আমারটা কই?”
“তুই আবার কে?”
এজার খুনসুটি করে এভাকে কথাটা বলে। এভাকে সে নিজের বোনের মতোই স্নেহ করে, আর এভাও সারাদিন তার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকে। এভা এবার এজারের পেটে কনুই দিয়ে হালকা গুঁতো দিয়ে বলে, “আমি তোমার পাতানো সতিন!”
তাদের কাণ্ড দেখে গ্রেনি নূশার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, “দেখ, এত বড় ধামড়া-ধামড়িগুলো কেমনে বাচ্চাদের মতো মারামারি করে!”
নূশা হেসে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপর তলা থেকে একজন মেইড দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “নূশা ম্যাম, আপনাকে ইয়াং মাস্টার ডাকছেন। এক্ষুনি রুমে যেতে বললেন।”
ডাক শুনেই নূশার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে যেতে চায় না তার মন তার প্রাণ তার অস্তিত্ব ইথানের ছায়াও মাড়াতে চায় না, কিন্তু সে এটাও জানে এখন না গেলে পরিণতি ভালো হবে না। ইথানের অবাধ্য হওয়ার মাশুল তাকে কড়ায়-গণ্ডায় দিতে হবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও চা-টা দ্রুত শেষ করে রুমের দিকে পা বাড়ায় সে। হাতে ধরা থাকে এজারের দেওয়া সেই চকলেটটা।
রুমের অভ্যন্তরে পা রাখতেই নূশা এক আদিম ও নিরেট অন্ধকারের সম্মুখীন হয়। সেই অন্ধকার শুধু মাএ আলোর অনুপস্থিতি নয়, বরং এক ভারি ও নিশ্চল স্তব্ধতা যা পুরো ঘরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। পুরো রুমটা অন্ধকারে ডুবে আছে আর এই ঘনঘোর আঁধারের বুক চিরে এক স্ফুলিঙ্গ জন্ম নিয়েছে। সোফার ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে ইথান। তার হাতের লাইটার থেকে নির্গত এক চিলতে শিখাই এখন এই বিশাল শূন্যতার একমাত্র সাক্ষী। ইথান তার অধরে রাখা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে আর সেই ক্ষণস্থায়ী আগুনের আভা ক্ষণিকের জন্য তার তীক্ষ্ণ নাসিকা আর বিষণ্ণ চোখের ওপর আলো ফেলে আবার মিলিয়ে যায়। ইথান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় ক্ষুদ্র আগুনের দিকেই, নূশা দরজার চৌকাঠে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে এসবে দেখে আঁতকে উঠে ইথান কে ভয়ংকর মনে হচ্ছে এই অবস্থায় দেখে।
নূশা কাঁপা কাঁপা পায়ে দু-কদম এগিয়ে গিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “ক… কী হয়েছে? এত অন্ধকার কেন?”
ইথান কোনো উত্তর দেয় না। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোনো এক ভয়াবহ ঝড়ের মতো নূশার দিকে এগিয়ে আসে। কাছে এসেই খপ করে নূশার হাতটা টেনে ধরে, অন্য হাতে তার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের পাজরের কাছে টেনে নিয়ে তীব্র শ্বাস ফেলে ইথান হিসহিসিয়ে বলে, “তোমার কী প্রয়োজন? কী চাই তোমার, বলো আমাকে? এক্ষুনি বলো! আমি সব এনে দেব, সব রেডি করব!”
কথাটা বলেই ইথান নূশার কোমর খাবলে ধরে তাকে হালকা করে শূন্যে তুলে নেয়। ইথানের এমন উন্মাদ আচরণে নূশার গলা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে তীব্র ভয় ওর মনে দাগ কাটতে শুরু করে। হঠাৎ এসব কেন জিজ্ঞেস করছে সে? ইথানের স্পর্শে নূশার গা ঘিনঘিন করে ওঠে। সে ছটফট করতে করতে বলে, “আ… আমার কিছু প্রয়োজন নেই। আপনি ছাড়ুন আমাকে!”
একথা শুনে ইথান হাতে থাকা সিগারেটটা আরেকবার টানে। তারপর নূশার মুখের ওপর ভকভক করে ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলে, “যদি কিছুই না লাগে, তাহলে এজারের কাছ থেকে চকলেট নিলে কেন? ওর সাথে একই গাড়িতে বাড়ি ফিরলে কেন?”
ক্রোধে ইথানের চোখ জ্বলছে। সে জ্বলন্ত সিগারেটটা পাশেই অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলে দিয়ে। ইথান হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে মানি গানটা তুলে নেয়। তারপর যন্ত্রটা সরাসরি নূশার মুখের সামনে তাক করে ট্রিগার চেপে ধরে। চেপে ধরতেই মুহূর্তের মধ্যে গান থেকে কাঁচা ডলারের নোটগুলো নূশার মুখে এসে আছড়ে পড়তে থাকে। সাথে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মাঝে ইথানের যান্ত্রিক অথচ কঠোর কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে,
“তোমার টাকার প্রয়োজন? এই নাও টাকা! আর ওই চকলেটটা এক্ষুনি আমার হাতে দাও।”
এই তীব্র অপমানে নূশার দুচোখ ফেটে কান্না আসতে চায়, বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে তার। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয় যথাসম্ভব সামলে নেয়। এই অপমান সে কিছুতেই ইথানকে জিততে দেবে না। ইথানের চোখের দিকে তাকিয়েই সে এজারের দেওয়া চকলেটটা ইথানের মুখের সামনে ধরে দাঁত চেপে এক টানে প্যাকেট ছিঁড়ে ফেলে। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে চকলেটটা নিজের মুখে পুরে নিয়ে চিবোতে চিবোতে স্থির দৃষ্টিতে ইথানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি খাব! আপনি কী করবেন করুন। কন্ট্রাক্টে তো স্পষ্ট লেখা আছে আমরা একে অপরের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাবো না। আমাকে কে কী দিল, আর আমি কার জিনিস রাখব, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আপনার তো কেবল আমার শরীর প্রয়োজন, সেটা নিয়েই থাকুন।”
কিছুক্ষণ পর…
ঘরের ভেতর এখন আবছা আঁধার, এক ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। নূশা বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে, তবে স্বাভাবিকভাবে বসে নয়। তার দুহাত একসঙ্গে শক্ত করে বাঁধা, সেই দড়ির অপর প্রান্ত বাঁধা বেডের এক কোণে। একইভাবে তার দুই পা-ও একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। নূশা ছটফট করছে, শরীর মুচড়ে এই বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনোপ্রকার লাভ-টাব হচ্ছে না। ইথান তাকে ছাড়বে না। ইথান ঠিক তার সামনেই বসে আছে, চোখেমুখে এক কঠিন প্রশান্তি ইথানের। মুখে মুখে তর্ক করা আর অবাধ্য হওয়ার এই শাস্তিই সে নির্ধারণ করেছে নূশার জন্য। নূশা ইথানের নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, “আমাকে এভাবে বেঁধে রেখে কী লাভ আপনার? ছেড়ে দিন না! আমার কষ্ট হচ্ছে!”
ইথান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “হলে হোক, তাতে আমার কী? আমি তো বলেছিলাম চকলেটটা আমাকে দিতে। যদি দিতে, তাহলে এত কিছু হতো না সিলেটি সুইটহার্ট।”
কথাটা বলেই ইথান গা থেকে নিজের টি-শার্টটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলে। তারপর ধীরলয়ে নূশার দিকে এগিয়ে আসে। নূশা ভয়ে কুঁকড়ে যায়, ভাবে হয়তো এখনই ইথান তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কিন্তু ঘটে ঠিক উল্টোটা।ইথান নূশাকে ওভাবে অসহায় অবস্থায় বন্দি রেখেই তার পাশ কাটিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। নূশা বিস্ময় আর আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে, “ইথান! এমন করবেন না দয়া করে ছেড়ে দিন! দয়া করুন একটুখানি!”
ইথান বালিশে মুখ গুঁজে আরাম করে শুতে শুতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয়, “আমার অবাধ্য হওয়া আমি একদম পছন্দ করি না। তাই এই শাস্তি যাতে সারাজীবন মনে থাকে। সারারাত এভাবেই থাকো, তাহলেই ইথানের কথার অবাধ্য হওয়ার ফল হাড়েমজ্জায় টের পাবে।”
রাত এখন চারটে। নূশার ঘুম ভাঙে, কিন্তু সে চোখ মেলতে পারছে না। জোর করে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলে যেমন যন্ত্রণা হয়, ঠিক তেমনই এক তীব্র মাথাব্যথা আর আচ্ছন্নতা অনুভব করছে নূশার মন মস্তিষ্ক । অনেক কষ্টে চোখের পাতা টেনে ধরে সে তাকানোর চেষ্টা করে। খেয়াল করে, তার পা এখন আর বাঁধা নেই, কিন্তু সারা শরীরে আঠার মতো চটচটে কিছু একটা লেগে আছে। সাথে নাকে এসে বারি খাচ্ছে এক তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ।
নূশা ভালোমতো চোখ খুলে চারদিকে তাকায়। নিজের অবস্থা আর পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখে তার হুঁশ উড়ে যাওয়ার জোগাড়! সে এখন আর তাদের আগের ঘরে নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা রুমে তাকে রাখা হয়েছে। তারচেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সে একটা বাথটাবের ভেতর শুয়ে আছে, আর তার গলা অবধি ডুবে আছে ঘন গলানো লিন্ট চকলেটে। শুধু তাই নয়, বাথটাবের ঠিক ওপরে সিলিং থেকেও টপ টপ করে তার শরীরের ওপর আরও চকলেট পড়ছে।
এসব কী? নূশা প্রথমে ভাবে হয়তো সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন থেকে বের হওয়ার জন্য সে পাগলের মতো চারদিকে তাকাতে থাকে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে ইথানের দিকে। বাথটাবের ঠিক পাশেই একটা চেয়ারে বসে ইথান বেশ আয়েশ করে একটা আপেল খাচ্ছে আর নূশার এই নাজেহাল অবস্থা দেখছে। ইথান কে দেখেই আতঙ্কে নূশার গলা দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে আসে, “এসব কী করছেন আপনি ইথান?”
ইথান আপেলে কামড় বসিয়ে শান্ত গলায় বলে, “কেন মিস সিলেটি? তোমার পছন্দ হয়নি? তুমি তো চকলেট খেতে চেয়েছিলে, যার জন্য এজারের কাছ থেকে চকলেট নিয়েছিলে। তাহলে এখন এসব জিজ্ঞেস করছ কেন?”
ইথানের কথা শুনে নূশা নিশ্চিত হয়ে যায়, এই লোকটা সাধারণ কেউ নয় ইথান পুরোদস্তুর একটা সাইকোপ্যাথ। এর মাথা আর ভাবনা কোনোটিই স্বাভাবিক নয়। সামান্য একটা চকলেটের জন্য কেউ এমন কাণ্ড করতে পারে! নূশার গা গুলিয়ে আসছে, ছিঃ! কী জঘন্য একটা পরিস্থিতি!
নূশা অসহায় গলায় ইথানকে বলে, “আমাকে এখান থেকে তুলুন না, প্লিজ! আমি আর পারছি না। আমি কথা দিচ্ছি, জীবনেও আর কারও কাছ থেকে চকলেট নেব না।”
ইথান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নূশার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বলে, “সিলেটি সুইটহার্ট, তুমি না বড্ড বোকা! কেন নেবে না? নিও, আরও বেশি করে নিও।”
ইথানের এই বিদ্রূপাত্মক কথা শুনে নূশা তার মুখের দিকে শুধু চেয়ে থাকে। তার অসহায়ত্ব এখন রাগে পরিণত হচ্ছে। ভীষণ রাগে! অনেক সহ্য করেছে সে, আর নয়। এবার নিজের পক্ষ থেকে কিছু একটা করতেই হবে। আজ ইথান যা করল, তা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
এই ভেবে নূশা আচমকা দুই হাতে ইথানের কলার চেপে ধরে। সর্বশক্তি দিয়ে হ্যাঁচকা টান মেরে তাকে বাথটাবের ভেতর টেনে নেয়। ইথান এমন কিছু হবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, তাই টাল সামলাতে না পেরে সে হুমড়ি খেয়ে বাথটাবে নূশার ওপর এসে পড়ে।
চলবে,,,,,
2k রিয়েক্ট হবে কোনোদিন 🙂
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE