খাঁচায় বন্দী ফুল
জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩
অদিতির কোমল ওষ্ঠদ্বয়ে তর্জনী বুলিয়ে দিলো সাইফ। ঠান্ডা হাতের স্পর্শে নারীটি নড়েচড়ে উঠলো। কপালও কুচকালো ঈষৎ। উল্টোপাশ ফিরে আবার তা মিলিয়েও গেলো ঘুমের ঘোরে।
সাইফ শুকনো ঢোক গিলল। অবাধ্য ইচ্ছে গুলোকে প্রাধান্য দিতে অদিতির পিঠ থেকে জামার ফিতে টা খুলে ফেললো একটানে। সেখানে ঠোট ছোয়ানোর তীব্র বাসনা জাগলো মনে। উন্মুক্ত পিঠের কাছাকাছি ঠোট নিতেই কেন জানি থেমে গেলো সাইফ। মন অবৈধ স্পর্শের জানান দিলো।
কিন্তু কখনো কি বৈধ অবৈধের তোয়াক্কা করেছে সাইফ? অদিতির বেলায় কেন তার ব্যাতিক্রম হবে। তার মস্তিষ্ক অবৈধ স্পর্শে সাই দিলেও মন বলছে কাল তো বিয়ে করবোই। তাহলে একদিন কি ধৈর্য ধরা সম্ভব নয়?
সাইফের মনে ভাবনারা উকি দিলো। এ বাড়িতে সবাই যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছে অদিতি কে তাড়াতে, এই অবস্থায় সাইফ যদি বলে যে এখনো তারা অবিবাহিত। এ বিয়ে হাসান চৌধুরী কখনো হতে দেবে না। এই মূহুর্তে জানানো যাবে না কাওকে। সাইফ মনে মনে ভাবলো
“সুফিয়ানের সাথে কথা বলতে হবে। সুযোগ বুঝে অদিতিকে নিয়ে ওর বাড়িতেই বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে”
মন্ত্রীর ছেলে বলে কথা। আশেপাশের কোনো কাজী অফিসে বিয়ে করলে সেই কথা পাঁচকান হতে সময় লাগবে না। বাবার সম্মান আর নিজের ইচ্ছা দুটোকেই বাচাতে সাইফ এই সিদ্ধান্ত নিলো।
পুনরায় অদিতির জামার ফিতে বেধে দিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেলো গোসল করতে। এমনি তে এমন সময় সে বাড়ি ফেরে।
সকাল সকাল হাসান চৌধুরী আর হাবিব চৌধুরী দরজা আটকে কোনো জরুরি মিটিং এ ব্যাস্ত। করা আদেশ দিয়ে গেছে, কেউ যাতে বিরক্ত না করে। আঞ্জুমান, সায়রা নাস্তা তৈরি করছে। দীঘির সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা। সকালে উঠে টিউশনে চলে গেছে। নদী বোনকে তৈরি করে দিয়ে রান্না ঘরে এলো। আঞ্জুমান নদীকে দেখে বলল
” আরেকটু ঘুমাতে পারতি। বাচ্চাটার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে যেন। তুই যা আরেকটু ঘুমা, আমি আর সায়রা পারবো সবটা”
নদী স্মিত হেসে বলল
” তোমরা যে সব পারো তা আমি জানি মনি মা। আমার তোমাদের হেল্প করতে ভালো লাগে”
আঞ্জুমান খুশিতে গদগদ হয়ে বলল
” দেখেছিস সায়রা, আমাদের বড় মেয়েটা কেমন লক্ষি হয়েছে”
সায়রা মুচকি হাসলো। আঞ্জুমান পরোটা বেলতে বেলতে বলল
” তা আমাদের সাহেব কোন নবাব জাদি কে নিয়ে এলো কাল। সে কোথায়? ওঠেনি? আর সাহেবই বা কোথায়?”
সায়রা বলল
” সাইফ আবার এই সময় ওঠে নাকি?”
আঞ্জুমান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
” না এখন তো বউ এসেছে। এখন তো ব্যাবহারে পরিবর্তন আসার কথা। দেখলি না কাল কেমন তোর সাথে ঝগড়া করলো বউয়ের হয়ে”
নদী শান্ত গলায় বলল
” সাইফ ভাই তো কেবল নিজের স্ত্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কথা বলেছে। এটা তো সব স্বামী দের ই করা উচিৎ।”
” হয়েছে, আর ভাবির হয়ে কথা বলতে হবে না। পারলে যাও গিয়ে ডেকে আনো তোমাদের প্রাণের ভাবি কে।”
আঞ্জুমান এর কথায় নদী চুপ করে রইলো। সায়রা বলল
” কিরে যা “
” না মানে, যাবো তো কিন্তু সাইফ ভাই কি তাকে আসতে দেবে?”
” দিলে দেবে না দিলে নাই। আর এমনিতেও ভাবি, ও এসে করবে টা কি এখানে?”
আঞ্জুমান অবাক হয়ে বলল
” ওমা। বংশ পরিচয়, বাপের নাম, আদৌ বাপের নাম ঠিক আছে কিনা সেসব জানতে হবে না? তার স্বামী উঠলে তো আবার তার সাথে কথাই বলা যাবে না”
নদী গুটি গুটি পায়ে সাইফের ঘরের দিকে গেলো। দরজার সামনে দাড়িয়ে ভীষণ অস্বস্তি কাজ করছে তার। নতুন দম্পত্তিকে এত ভোরে ডাকতে খুব ইতস্তত বোধ করছে।
অদিতি উঠেছে আরো আগেই। সাইফের আদেশে এই সকাল বেলা গোসল ও করে নিয়েছে। সাইফের আনা লাল রঙের একটা থ্রি-পিস পরে গায়ে কালো শাল জড়িয়ে নিলো। চুল গুলো আচড়ে নিলো। আজ কতদিন পর চুল আচড়ালো মনে নেই তার। খুব ফ্রেশ লাগছে অবশ্য। সাইফের কোমড়ে এখনো তোয়ালে জড়ানো। আরেকটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছে আর আরেক হাতে ফোন চাপছে। নদী দরজায় টোকা দিলো। সাইফ অদিতির উদ্দেশ্যে বলল
” দেখো তো কে এলো আবার সাত সকালে আমার বা’ল ছিড়তে”
অদিতি মুখ বেকালো। কথার কি ছিড়ি। দরজার সামনে গিয়ে ছিটকিনি খুলে দিলো। সামনে কালো কূর্তি আর সালোয়ার পড়ে নদী দাড়িয়ে আছে। শ্যামলা গায়ের রং। পিঠ ওবদি চুল গুলো বেণি করা। বেশ পরিপাটি আর মার্জিত।
সাইফ ভিতর থেকে গলা উচিয়ে বলল
” কে এসেছে? ওহহ নদী আয় ভিতরে আয় “
নদী গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকলো। শেষ বোধহয় সাইফের ঘরে এসেছিলো ২ মাস আগে। তখন সাইফের জ্বর ছিলো। আর আজ ঢুকলো। দুজনকে ভিজা চুলে দেখে নদীর বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠলো। নজর মেঝে থেকে সরাচ্ছে না। পাছে কেউ বুঝে যায় তার চোখের ভাষা। সাইফ অদিতি কে বলল
” ও আমার বোন। নদী। আমার ছোট। সম্পর্কে তোমার ননদ হয়। তবে বয়সে তোমার বড়। আপু বলেই ডাকবে”
অদিতি ঘার কাত করলো। নদী আলগোছে চোখের পানি মুছে বলল
” ভাই মনি মা ওনাকে….. মানে ভাবিকে নিচে নিয়ে যেতে বলেছে”
সাইফ কপাল কুচকে বলল
” তোর চোখে কি হয়েছে? কাদছিস নাকি। এই নদী”
নদী চট করে জবাব দিলো
” না না কাদছি না। আসলে পেয়াজ কেটেছি কিচেনে, এজন্যই….. আপনি নিশ্চিন্তে পাঠিয়ে দিন। আমি আছি ওখানে”
” সে না হয় বুঝলাম কিন্তু ও নিচে গিয়ে করবে টা কি?”
নদী বলল
” বাড়ির মেয়ে বউরা সকালে কিচেনে থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
” আচ্ছা নিয়ে যা। তবে তুই ওর সাথে থাকবি”
নদী অদিতি কে নিয়ে বাইরে এলো। কয়েকটা সিড়ি নামার পর অদিতিকে বলল
” মাথায় ওড়না দিয়ে নাও”
অদিতিও প্রশ্ন না করে মাথায় ওড়না টেনে নিলো।
” শোনো রান্না ঘরে ঢুকে মনি মা কে মানে তোমার শাশুড়ী কে আর আমার মাকে মানে তোমার চাচি শাশুড়ী কে সালাম দেবে।আর তারা দু একটা কথা বললে বেশি কথা বলবে না কেমন?”
অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়লো। রান্নাঘরে ঢুকে ছোটো করে সালাম দিলো দুজনকে। আঞ্জুমান অদিতির মুখ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যেন। কি অপূর্ব মুখশ্রী। মনের মধ্যে যত আক্রোশ জমিয়ে রেখেছিলো অদিতির ওপর ঝাড়বে বলে। সব গলে পানি হয়ে যেতে লাগলো। অদিতি মাথা নিচু করে বলল
” দিন মা আমি করে দিচ্ছি”
আঞ্জুমান গলা খাকারি দিয়ে বলল
“তো….তোমার বাড়ি কোথায়? আর বাবা কি করে?”
” মিশকাত জাহান অদিতি। আমার বাবা সার এর ব্যাবসা করে।”
পিছন থেকে সায়রা বলল
” তা আমাদের ছেলের গলায় ঝুললে কি করে?”
নদী মায়ের কাধে হাত দিয়ে তাকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলল
” মা!”
অদিতি মাথা নিচু করে রইলো। আঞ্জুমান বলল
” তা রান্না বান্না কিছু পারো?”
” জ্বি পারি”
” কি কি পারো?”
অদিতি মাথা নিচু করে বলল
” সবই পারি”
আঞ্জুমান বলল
” তাহলে পায়েস করো।”
কোথায় কি আছে সব দেখিয়ে দিয়ে সকলে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। অদিতি পায়েস বানাচ্ছে আর ভাবছে, এ বাড়ির মানুষ কত অদ্ভুত। পায়েস রান্না শেষে একটা বোল এ করে ডাইনিং এ নিলো।
ইতিমধ্যে হাসান চৌধুরী আর হাবিব চৌধুরীও টেবিলে এসে গেছে। সাইফও বসেছে আজ সবার সাথে খেতে। যা সবার কাছে পশ্চিম দিকে সূর্য ওঠার মতো লাগছে। নদী পায়েসের বাটি অদিতির হাত থেকে নিয়ে ইশারা করলো হাসান চৌধুরী আর হাবিব চৌধুরী কে সালাম করতে।
অদিতি সালাম দিলো কিন্তু হাসান বা হাবিব কেউই সারা দিলো না। ইতিমধ্যে সুফিয়ান এলো। হাবিব চৌধুরী হেসে বলল
” আরে বাবা সুফিয়ান। বসো বসো নাস্তা করো”
সুফিয়ান হেসে বলল
” আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। সে তো বসবোই। ভাবির হাতে আজ প্রথম নাস্তা করবো”
সকলে খাবার খেয়ে উঠে গেলো। সাইফ সুফিয়ান কে সবটা খুলে বলল।যদিও কিছুটা কালই বলেছিলো। সুফিয়ান বলল
” আমার বাড়িতে চল অদিতি কে নিয়ে। আমার পরিচিত একজন কাজী আছে। কেউ জানতে পারবে না। “
সাইফ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল
” আজই?”
” না আজ না। আগামী শুক্রবার আয়। উনি একটু শহরের বাইরে গেছেন। বৃহস্পতিবার নাগাদ ফিরবে।”
সাইফের কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো।
” বৃহস্পতিবার আসতে আরো ৪ দিন বাকি।”
সুফিয়ান শয়তানি করে বলল
” কেন কন্ট্রোল থাকে না নিজের ওপর? তা থাকবেই বা কি করে? এমন হুর পরি কে নিয়ে এক ঘরে রাত্রি যাপন……বাই এনি চান্স, সাইফ তুই বাসর টাসর সেরে ফেলিস নি তো আবার?”
সাইফ চোখ গরম করে তাকাতেই শব্দ করে হেসে ফেললো সুফিয়ান। সাইফ বিরক্তির স্বরে বলল
” ভাই সিরিয়াস মোমেন্টে মজা নিস না। এ কদিনের মধ্যে বাবা, কাকা যদি কোনো ভাবে টের পায় কী হবে ভেবে দেখেছিস?
সুফিয়ান সাইফের কাধ চাপড়ে বলল
” চিল ব্রো। তোরা যে স্বামী স্ত্রী না সেটা কেউ কিচ্ছু টের পাবে না। শুধু ভোর বেলা দুজনে গোসল করবি আর রাতে দুষ্টু দুষ্টু শব্দ কর….. “
সুফিয়ান এর কথা শেষ হওয়ার আগে সাইফ দৌড়ানি দিলো। এক দৌড়ে বাড়ির গেট পার। সুফিয়ান চেচিয়ে বলল
” রাতে দেখা হচ্ছে ভাই”
গেট দিয়ে বেরোতেই সুফিয়ান দেখা পেলো চামেলির। পাশের বাড়িতে কাজ করে। বয়স তেমন না ৩০-৩২ হবে। অভাবে স্বভাব নষ্ট জিনিস টা চামেলির সাথে ঘটেছে।
সুস্বাস্থ্যের অধিকারি চামেলি কাজ করতে আসে পেট পিঠ বের করে শাড়ি পড়ে। ব্লাউজের গলা দিয়ে বুকের ভাজ স্পষ্ট দেখা যায়। সুফিয়ান আদুরে গলায় ডাকলো
” আরররে চামেলি ভাবিইইইই”
চামেলি সুফিয়ানের দিকে ফিরে দুষ্টু একটা হাসি দিলো।
” বলো”
সুফিয়ান চামেলির কোমড়ে আলতো করে চাপড় দিয়ে বলল
” আজকাল দেবর দের মধু খাওয়াতে ভুলেই গেছো”
চামেলি নিজের চুল আঙুলে পেচাতে পেচাতে বলল
” তোমরা হইলা কচি ভ্রমর। এই ফুলের মধু কি আর ভাল্লাগবো?”
” একবার খাইয়ে তো দেখো”
চামেলি সুফিয়ানের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল
” যাহহহ দুষ্টু”
কোমড় দুলিয়ে দুলিয়ে হেটে গেলো চামেলি। সুফিয়ানও গাড়িতে চড়ে বাড়ি চলে গেলো।
সাইফ ঘরে ফিরে দেখে অদিতি বিছানায় বসে বসে কাদছে।
চলবে?
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২