Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬


কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️

খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ১৬

সকাল সকাল সকাল নদী গোসল সেরে রেডি হয়ে নিয়েছে ভার্সিটি যাবে বলে। নীল চুড়িদার, সাথে স্বর্ণের ছোট্ট এক জোড়া কানের দুল ই তার তার সাজের মূল উপাদান। না কোনো প্রসাধনীর প্রলেপ, না কোনো ঠোট রঙিন করার লিপস্টিক। চুল আঁচড়ানো সময় ড্রেসিং টেবিলের সামনে থাকা ছোট্ট লাল রঙের বক্সটি দেখছিলো নদী। তুমুলের কিনে দেওয়া সেই ডায়মন্ড এর লকেটা তাতে।

তুমুলের কথা মনে পরতেই আবার ঝলমলে মুখটা অন্ধকার হয়ে এলো। লোকটা আসলেই পাষান।নিজে থেকে তো কল দিলোই না। নদী নিজেই বোন কে দিয়ে কল দেওয়ালো সেটাও সিরিয়াসলি নিলো না। চিরুনি টা রেখে নদী জুয়েলারি বক্স টা হাতে নিলো।
ছোট্ট লাল বক্সটা খুলে দেখলো লকেটটা একদম জ্বলজ্বল করছে। নদীর চোখও চিকচিক করে উঠলো। আজ ভার্সিটি থেকে ফিরে যত যাই হোক কল দেবেই তুমুল কে। ও যা বলে বলবে। যত গালি দেয় সব শুনবে। কিন্তু এই দূরত্ব আর সহ্য হচ্ছে না তার।

লকেটের সাথে চেইনও ছিলো। চিকন সূক্ষ্ম কাজ করা চেইনটা দিয়ে লকেট টা গলায় পড়লো নদী। আয়নায় নিজেকে দেখলো। বড্ড মানিয়েছে। আপনাআপনিই হাসি ফুটলো ঠোটে। একবারে রেডি হয়ে বেরোলো, খাবার খেয়ে তারপর ভার্সিটি যাবে। ড্রইং রুমে সবাই উপস্থিত আছে। নেই শুধু তুযা।

নদী চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল
” দাদাভাই কোথায়? খেতে আসেনি এখনো? দাড়াও আমি ডাকছি”

আঞ্জুমান খাবার পরিবেশন করছে। সেও সম্মতি দিলো
” হ্যা যা তো। ডেকে নিয়ে আয়।”

” ডেকে লাভ নেই। ও বাড়িতে নেই”

হাবিব চৌধুরী খাবার খেতে খেতে বলল কথাটা। নদী উঠেও পুনরায় আবার চেয়ারে বসে পড়লে।
” নেই মানে? কোথায় গেছে দাদাভাই? “

” বাড়িতে”

আঞ্জুমান অবাক হয়ে বলল
” চলে গেছে মানে? কী যা তা বলছো ছোট ভাই? ও কখন গেলো।”

” সকালে চলে গেছে। বাড়ি থেকে কল এসেছিলো। তাই। সবাই ঘুমিয়ে ছিলো বলে ডাকে নি”

হাসান চৌধুরী চিন্তিত স্বরে বললেন
” সব ঠিক আছে তো?”

” সব ঠিক আছে ভাইজান “

নদী অদিতির পাশে বসেছে। এমনি তে অদিতি এটা ওটা বলে। হাসাহাসির করে। কিন্তু কাল থেকে নদী খেয়াল করছে অদিতি খুব গম্ভীর। কিছু তো নিশ্চয়ই হয়েছে। নদী ভাবনায় ছেদ ঘটে সায়রার কথায়
” তোর গলার নেকলেস টা কবে কিনলি? দেখে তো অনেক দামি মনে হচ্ছে।”

সায়রার কথায় সবাই নদীর দিকে তাকালো। সবার দৃষ্টি ওর গলার লকেটে।

নদী ধরা পরা চোরের মতো কথা লুকাতে লাগলো
” কো….কোথায়? এটা তো…. “

নদীর কথা শেষ হওয়ার আগে আঞ্জুমান বলল
” এটা তো ডায়মন্ড”

নদী কথা ঘুরাতে জোর করে হেসে বলল
” না না মনি মা। এটা তো স্টোন এর”

” কোনটা স্টোন আর কোনটা ডায়মন্ড সেটা তুৃই আমাদের শেখাস না। খুলে রাখ যার জিনিস তাকে ফেরত দিবি”

হাসান চৌধুরীর বলা কড়া কথা গুলো নদীর মনে জমা হওয়া সাহস টুকু ধুয়ে দিলো। হাবিব চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল
” তুই ওই ছেলের দেওয়া লকেটটা গলায় পরে আছিস?আবার মিথ্যেও বলছিস?”

নদী শুকনো ঢোক গিলল। মিথ্যা ধরা পরার মতো লজ্জা আর কিছু হতে পারে বলে নদীর জানা নেই। মাথা নিচু করে ফেললো সাথে সাথে। সাইফ নদীর অবস্থা দেখে হাবিব চৌধুরী কে বলল
” বাবা বলেছে তো খুলে রাখতে। ও খুলে রাখবে। তুমি আর কিছু বলো না”

বাকি সময় টুকু নদী আর মাথা তুলে তাকালো না কারো দিকে। চুপচাপ খেয়ে উঠে গেলো। ভার্সিটি তে যাওয়ার সময় সাইফ আর অদিতিকে দেখলো একবার। সাইফ যত্ন করে খাবার মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে অদিতিকে।
নদী মনে ভাবনা আসে
‘ তুমুলও কি এমন যত্ন করবে তাকে?’

গাড়িতে বসে বসে বসে নদী কয়েকবার তুমুলের নম্বর এ কল করলো। ফোন রিসিভ হচ্ছে না। ফেসবুকে অ্যাড ও নেই তুমুলের সাথে। নদীর চট করে মাথায় আসে ও ফেসবুকে যে সব কথা শেয়ার করে তুমুল সেগুলো জানে। তার মানে তুমুল নদীর ফেসবুক আইডিতে নজর রাখে। নদী গাড়ির জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে, হাতের একটা ছবি তুলল। সেই ছবি পোস্ট করলো পেসবুকে। ক্যাপশনে লিখলো
” কথাগুলো আমার ঠোটে জমে যায়, কিন্তু শব্দ গুলো আটকে রয় ভিতরেই”

পোস্ট করে মোবাইল টা ব্যাগে ভরে রাখলো। ভার্সিটি এসে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভার কে বলে
” আপনি চলে যান আঙ্কেল। আমি ফোন করলে আসবেন”

ড্রাইভার ও নদীর কথা মতো চলে যায়। সিমি আজ ভার্সিটিতে আসেনি। নদীর প্রথমেই দেখা হলো অবনির সাথে। সিমির পর অবনির সাথেই নদীর ভালো সম্পর্ক। অবনি দৌড়ে এসে নদীতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে।
” কেমন আছিস দোস্ত?”

নদী হালকা হেসে জবাব দেয়
” এইতো ভালোই। তুই কেমন আছিস?”

অবনি মন খারাপ এর ভান করে বলে
” সিমি আসলে তো আমার খোঁজ ই নিতি না”

” সেরকম কোনো ব্যাপার না। চল ক্লাসে যাই। ভাগ্যিস তুই বললি আজ ক্লাস টেস্ট আছে। নয়তো আমি মিস করে ফেলতাম। সিমি টা মিস করলো, ওর নানু অসুস্থ সেখানে গেছে”

অবনি খুশিই হলো সিমি আসবেনা শুনে। হেসে বলল
” ইয়ে আজ তো ক্লাস টেস্ট হবে না”

নদী ভ্রু কুচকে ফেললো
” সে কি। কালই তো কল দিয়ে বললি আজ এক্সাম আছে।”

অবনি আমতা আমতা করে বলল
” হ্যা…হ্যা কাল তো হওয়ার কথাই ছিলো। কিন্তু আজ হবে না”

” কি বলছিস? কিছুই তো বুঝতে পারছি না”

অবনি নদীকে জাপটে ধরে বলল
” তোকে পরে সব বুঝিয়ে বলবো। চলতো আগে ক্যান্টিনের দিকে চল। কিছু খেয়ে নেবো।”

নদী অমত প্রকাশ করলো
” না রে। তুই যা। আমি মাত্রই ব্রেকফাস্ট করে এসেছি”

অবনি খুব ভালো করেই জানে, ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে নদীকে খুব ভালো কাবু করা যায়
” সিমি হলে তো ঠিকই যেতিস। আমি বলে যাবি না। বুঝেছি”

নদী অবনির হাত ধরে বলে
” কি বলছিস? আচ্ছা চল”

অবনি খুশি হয়ে নদীর হাত ধরে বলে
“চল”

ফোনে কাওকে টেক্সট করে দেয়।
” রেডি থাকো। আমি ওকে নিয়ে আসছি”

ক্যান্টিনে অল্প সংখ্যক মানুষ। বেশিরভাগই ছেলে। অবনি আর নদী গিয়ে বসলো একটা টেবিলে। অবনি নদীকে বলল,
” তুই বস আমি খাবার নিয়ে আসছি”

নদী ও সম্মত হলো। অবনি খাবার আনতে গেলো। নদী ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে সেই পোস্ট টা চেক করছিলো। তখনই সাইফের নম্বর থেকে ম্যাসেজ আসলো
” বাইরে এসো। অপেক্ষা করছি”

নদী তো খুশিতে গদগদ। এখন তাকে আর পায় কে। ব্যাগটা বগলদাবা করে এক ছুটে বেরিয়ে গেলো বাইরে। প্রথম ভবন টা পেরিয়ে বাইরে আসতেই চোখে পড়লো অবনি অনেকগুলে ছেলের সাথে কথা বলছে। হাত ইশারা করে করে কি যেন দেখাচ্ছে। নদীর একটু খটকা লাগলো। তবুও সেদিকে নজর না দিয়ে চলে গেলো গেটের দিকে। তুমুল বাইকে বসে আছে। মাথায় হেলমেট পড়া। নদী প্রথমে চিনতে পারে নি। এমন ভাবে কখনো দেখেনি তো। নদী তুমুলকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো এমন সময় তুমুল নদীর হাতের বাহু টেনে ধরলো। হেলমেট এর গ্লাস চোখের সামনে থেকে উঠিয়ে বলল
” অন্ধ হয়ে গেছো নাকি?”

নদী তখন খেয়াল করলো এটা তুমুল। নদী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো হঠাৎ। গলা আটকে আসছে। মাথা নিচু করে ফেললো। তুমুল ছেড়ে দিলো নদীর বাহু।নদী একটু পিছনে সরলো।

তুমুল হেলমেট খুলে বাইকের ওপর রাখলো। চুল গুলো পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করলো। কিছু একটা টাইপ করে আবার পকেটে রাখলো। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে নদী হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত মুষ্টি করা। তুমুল নিজের হাতের তালু এগিয়ে দিলো। নদী হাত খুলে দিতেই সেই লকেটটা তুমুলের হাতে পড়লো।

তুমুল ভ্রু গুটিয়ে নিলো। কাছে এনে লকেট টা ভালো করে দেখলো। তুমুল জিজ্ঞেস করার আগেই নদী বলল
” বাবা বলেছে এটা আপনাকে ফেরত দিয়ে দিতে”

তুমুল দেখলো নদীর মুখে আধার নেমে এসেছে কথাটা বলতে গিয়ে। তুমুল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
” পিছন বসো”

নদী টালোমালো চোখে চারিদিকে চোখ বুলায়। তুমুল বিরক্ত ভাব নিয়ে বলল
” ওমন চোরের মতো তাকি তুকি করছো কেন? মনে হচ্ছে চুরি করতে যাচ্ছো। আর এত কান্না পায় কেথ থেকে তোমার বলোতো। উঠবে? না যাবো?

নদী জবাব দেয় না। নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছে। তুমুল ভ্রু নাচিয়ে বলল
” এবার গেলে কিন্তু আর আসবো না”

নদী দ্রুত চোখ মুছে বলল
” যাবো”

তুমুল হাসলো। নদী বাইকে উঠে বসে। তুমুল নিজের হেলমেট খুলে নদীকে দেয়
” পরে নাও “

” আপনি?”

” একটাই এনেছি। আমার লাগবে না। তুমি পরো”

নদী বাধ্য হয়ে পড়ে নিলো হেলমেট টা। তুমুল পিছনে সামান্য মাথা ঘুরিয়ে বলল
” বসেছো?”

” হু “

বাইক স্টার্ট করে চলে গেলো তুমুল নদীকে নিয়ে। অবনি পুরো ভার্সিটি খুজছে নদীকে। ক্যান্টিনে, ওয়াশরুমে সব জায়গায় খুজছে। কোথাও নেই নদী। কল ও ধরছে না। ২০ হাজার টাকা নিয়েছে অবনি সুফিয়ান এর থেকে। কথা ছিলো নদীকে ক্যান্টিতে ছেলেদের মধ্যে দিয়ে ও খাবার আনতে যাবে, এদিকে সুফিয়ান এর বন্ধু রা বাইরে থেকে আটকে দেবে ক্যান্টিনের দরজা। কিন্তু এখন নদীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুফিয়ান কলের পর কল করছে অবনি কে। ভয়ে ফোনটাও তুলছে না অবনি। আজ নদীকে না পেলে বোধহয় রক্ষে নেই।


তুমুল নদীকে নিয়ে চলে এলো একটা নিরিবিলি জায়গায়। অনেক বড় একটা মাঠ। চারপাশে বেশ গাছপালাও। নদী বাইক থেকে নেমে হেলমেট খুলে চারিদিক টাতে চোখ বুলায়। ঢাকার মধ্যে এমন নিরিবিলি শান্তিময় পরিবেশ আছে তা জানতোই না সে।
এলো মেলো হয়ে যাওয়া চুল গুলোও হাত দিয়ে গুছিয়ে নিলো।

” শুকিয়ে গেছে খোপা করে ফেলো”

তুমুলের কথা শুনে নদী পিছন দিকে তাকালো। তুমুল বাইকে হেলান দিয়ে নদীকে দেখছে। চোখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। পরনের লেদার জ্যাকেট টা খুলে নদীর কাছে দিলো
” ধরো”

নদী জ্যাকেট টা হাতে নিলো। তুমুল নদীর কাধ ধরে ঘুরিয়ে দিলো পিছন দিকে। নদী বুঝতে না পেরে আবার সামনে ঘুরলো। গোল গোল চোখ করে বলল
” কি করছেন?”

” খোপা করবো। ঘুরো”

আবারও তুমুলের দিকে পিছন করে ঘুরিয়ে দিলো নদীকে। নদী হেসে বলল
” আপনি খোপা করতে পারবেন? আমিই পারি না”

তুমুল চুল গুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বলল
” দেখোই না। পারি কি না”

সব গুলো চুল হাত দিয়ে টেনে এনে হাতের মধ্যে গোছ করে নিলো তুমুল। তারপর একদম দক্ষ হাতে সুন্দর খোপা তুলল চুলে। নদী খোপায় হাত দিয়ে দেখলো একদম পারফেক্ট। একদম মনি মা করে দেয় সেই রকম হয়েছে।

নদীর মুখ আপনা আপনি হা হয়ে যায়। খোপায় হাত দিয়েই পিছনে ফিরে। অবাক হয়ে বলল
” আপনি খোপা করতে শিখলেন কোথা থেকে?”

তুমুল সামান্য নদীর দিকে ঝুকে শয়তানি করে বলল
” আমার আগে একটা বউ ছিলো। ওকে করে দিতে দিতে শিখে গেছি”

নদী শব্দ করে হেসে ফেললো। সাথে তুমুলও হাসলো। তুমুল হাসলেই নদী হাসি বন্ধ করে, তুমুলের হাসি দেখতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। তুমুল হাসি বন্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।নদীও হাটছে পিছন পিছন।

কয়েকদিন কুয়াশাচ্ছন্ন থাকার পর আজ রোদ উঠেছে। বেলা প্রায় ১২ টার কাছাকাছি। তুমুল একটু রোদে গিয়ে বসে পড়লোঘাসের মধ্যেই। নদী পাশে বসবে কিনা দ্বিধা বোধ করছে। পাশে দাড়িয়ে রইলো চুপ করে। তুমুল নিজেই বলল
” বোসো”

নদী আর বিলম্ব করলো না। বসলো। খোপা টা এখনো খসে নি। তুমুল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশটা আজ খুউব নীল। আকাশের দিকে নজর রেখেই বলল
” খোপায় তোমাকে একদম লক্ষী মন্ত বউ লাগে।”

নদী একটু লাজুক হাসলো নিজের ব্যাপারে বউ এর কথা শুনে। তারপর কেউ কোনো কথা বলল না। অনেকটা সময় দুজনেই নিরব।

তুমুল পকেট হাতরে একটা বেলি ফুল বের করলো। যদিও পকেটের চিপায় পড়ে নেতিয়ে গেছে, কিন্তু সুঘ্রাণ আছে এখনো। সেটুকুই সযত্নে নদীর কানের পিঠে গুজে দিলো।
” নেতিয়ে পড়া ফুলটা এবার প্রাণ ফিরে পেলো”

নদী কানের ফুলটায় হাত দিয়ে হাসলো। তুমুল হঠাৎ করে বলল
” ভালোবাসো?”

নদী কেমন করে যেন চাইলো তুমুলের পাণে। তুমুল চোখ ছোট ছোট করে পর্যবেক্ষণ করলো নদীর ভাবনাকে। ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো বাসে কিনা।

নদী বরাবরের মতো মাথা নিচু করে ওপর নিচ মাথা নাড়লো। অর্থাৎ বাসে। তুমুল এর মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটলো। হাটুতে ভর দিয়ে গালে হাত ঠেকালো
” তাই? তা কেন বাসো?”

নদী এখনো চোখ তুলেনি। শুধু দু’দিকে মাথা নাড়লো। অর্থাৎ কারণ জানে না। তুমুল নদীকে দেখছে বসে বসে। হঠাৎ নদী যেন সাহসী হয়ে গেলো। তুমুলকে প্রশ্ন করে বসলো
” আপনি বাসেন? “

তুমুল ভারিক্কি গলায় বলল
” প্রমাণ চাও?”

নদী দুদিকে মাথা নাড়ে।
“শুধু জানতে চেয়েছি”

” আমি বললেই বিশ্বাস করে নেবে?”

নদী আর কথা বলে না। কথার অতো মার-প্যাচ সে বুঝে না। যেটুকু আজ বলতে পেরেছে তাই ঢেড়। তুমুল মায়ামাখা স্বরে বলল
” ভালোবাসলে বিয়ে করতে হয়। তা জানো কি?”

নদী কথা বলে না। অস্বস্তি এড়াতে ওড়না পেঁচাচ্ছে বারবার আঙুলে। তুমুল আবারও বলল
” বিয়ে করবে আমায়? রোজ খোপা করে দিবো।”

নদীর ভিতরে অজানা এক অনুভূতি সারা দিলো। এমন করে কেউ নলেনি কখনো। তুমুল এখনো আগের মতই গালে হাত দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। নদীর অভিব্যাক্তি বোঝার চেষ্টা করছে।

ফের বলল
“ফুলও গুজে দিবো খোপায়। চোখে কাজল পড়িয়ে দিবো। তুমি তো কখনো শাড়ি পরোনি, শাড়িও পরিয়ে দিবো নিজে হাতে। কাচের চুড়ি ভালোবাসো শুনলাম!”

নদীর হৃদয় যেন শীতল হয়ে যাচ্ছে ভালো লাগায়। আরো মিইয়ে যাচ্ছে লজ্জায়। তুমুল আবারও বলল
” এই লজ্জা লুকাতেও আমার চওড়া বুকটা প্রয়োজন হবে তোমার। নিরদ্বিধায় জায়গা করে নিতে পারবে এখানে। বলো, বউ হবে আমার?”

নদীর চোখের দুই ফোটা পানি গড়িয়ে নদীর হাতেই পড়লো। সেটা দেখলো তুমুল। কি মনে করে উঠে দাড়ালো। নদীরও হাত ধরে টেনে তুলল।

নদী চোখ মুছে প্রশ্ন করলো
” কোথায় যাবেন এখন?”

তুমুল উত্তর দিলো না। জ্যাকেট টা পড়ে বাইকে উঠে বসলো। নদীও বসলো পিছনে। নদী বুঝতে পারছে না তুমুল কি করতে চাইছে। বাইক স্টার্ট করে বেশ গতিতে বাইক চালালো তুমুল। একেবারে কাজি অফিসের সামনে এসে বাইক থামালো তুমুল।

নদী বাইক থেকে নেমে হেলমেট টা খুলল। হেলমেট পরার কারনে খসে গেছে তুমুল এর করা খোপা টা।
” এখানে কেন নিয়ে এলেন?”

তুমুল বলল
” প্রমাণ দাও, ভালোবাসো”

নদীর চোখের কোণে অশ্রুরা জমা হলো। এই ভীত রমণী আজ সব ভয় দূরে ঠেলে দিলো। আজ সে ভালোবাসার প্রমাণ দিবেই। নদীর চোখে সম্মতি দেখে তুমুল নদীর হাত ধরে কাজী অফিসে নিয়ে গেলো। ভিতরে গিয়ে তুমুল বলল
” আমরা বিয়ে করতে চাই।”

লোকটা ওদের দুজনকে একবার দেখে বলল
” এনআইডি আর বিবাহের খরচ আছে?”

তুমুল নদীর দিকে তাকাতেই নদী আশ্বস্ত করলো আছে।
“দুজনের কাছেই আছে”

” আর দুজনের পক্ষ থেকে দুজন সাক্ষী ও লাগবে”

তুমুল ওর দুজন বন্ধু কে ফোন করলো। তারা আসছে। তুমুল লোকটাকে বলল

আপনি কাগজ পত্র রেডি করুন। আমরা পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে আসছি।
নদীকে বলল
” দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে। চলো লাঞ্চ করে আসি”

ওরা পাশের রেষ্টুরেন্টে বসলো। কিন্তু নদী তেমন কিছু খেতে পারেনি। বন্ধু, কাজী সবাই এসে পড়েছে। নদী তুমুলও এসেছে। কাজী জিজ্ঞেস করলো
” দেনমোহর কত বাধবো?”

তুমুল নদীর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল
” সেটা আমার বিবি কেই জিজ্ঞেস করুন”

কাজী নদীর দিকে তাকিয়ে বলল
” বলো মা, দেনমোহর কত বাধবো?”

নদী মাথায় ঘোমটা দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। কপাল পর্যন্ত ঢাকা ওড়নায়। ছোট করে বলল
” যেটুকু না বাধলেই নয়। সেটুকুই বাধুন।”

কাজী হাসলো। তুমুলের দিকে তাকিয়ে বলল
” ৫ লাখ বাধছি “

কাজী বিয়ের খুৎবা পাঠ শুরু করলো। নদীর বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। কবুল বলার মূহুর্ত আসন্ন। তুমুল অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। কবুল বলার মূহুর্তে যে এতটা বুক ধড়ফড় করে, হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায় নদী জানতো নাকি। কাজী বলল
” কবুল বলো মা”

নদী চুপ করে আছে। ঠোট তিরতির করে কাপছে যেন। তুমুল নদীর হাতটা শক্ত করে ধরলো। তুমুলের থেকে আশ্বাস পেয়ে নদী ছোট্ট করে বলল
” আলহামদুলিল্লাহ, কবুল”

তুমুল এর বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেলো। এবার তুমুলের পালা। তুমুল সময় নিলো না। কাজী বলার সাথে সাথেই ফট করে কবুল বলে ফেললো।

” বিয়ে সম্পূর্ণ।”

তুমুল পকেট থেকে চেকবুক বের করে তাতে সাইন করে একটা পাতা নদীকে দিলো। নদী ওটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার তুমুলের দিকে তাকালো। তুমুল বলল
” তোমার মন মতো এমাউন্ট বসিয়ে নিও। আজ থেকে যা আমার তা তোমারও”

নদী নেয় না। তুমুল নদীর ব্যাগের চেইন খুলে তাতে দিয়ে দেয়।
” এটা তোমার অধিকার”

ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। নদী তাড়া দিয়ে বলল
” আমায় এখন বাড়ি ফিরতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

” হ্যা চলো”

নদী কপাল কুচকে বলল
“আপনিও আমার সাথে যাবেন?”

তুমুল বলল
” আমি তোমার সাথে না। তুমি আমার সাথে যাবে”

” কোথায়?”

” কেন আমার বাড়ি”
” এ্যা”

তুমুল বাইকে উঠতে গিয়ে আবার থামলো
” এ্যা মানে কি? বিয়ে পর বউ রাই তো শশুর বাড়ি যায়। জানো না নাকি”

নদী ঢোক চিপে বলল
” শুনুন না। আমি আমার বাড়িতে…..”

” অসম্ভব।”
নদীর কথা শেষ হওয়ার আগেই তুমুল বলল কথাটা
” আমার বউ আমি এক সেকেন্ডও বাপের বাড়ি রাখবো না। আমার বউ আমার সাথে, আমার বাড়িতে, আমার রুমে থাকবে”

নদী তুমুলের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে অনুরোধ করে বলল
” শুনুন না। প্লিজ আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিন। কয়েকটা দিন যাক। বাবা, চাচ্চু সবাইকে বুঝিয়ে…..”

” তুমি বেঝাবে? সত্যিই?”

নদী মাথা নিচু করে বলল
” প্লিজজজ। বিয়ে তো হয়েই গেছে। হারিয়ে যাচ্ছি না তো”

” হারাতে দিলে তো হারাবে”

অবশেষে নদীর আবদারের কাছে তুমুলের জিদ হার মানলো। নদীকে বাইকে করে নিয়ে নদীর বাড়ির আরো খানিকটা আগে নামিয়ে দিলো। নেমে নদী হাটা শুরু করলো তুমুল পিছন থেকে ডেকে বলল
” নদী”

এই প্রথম নদীর নাম ধরে ডাকলো তুমুল।নদী পিছনে ফিরলো। তুমুল মাথা দিয়ে ইশারা করলো এগিয়ে আসতে। নদী এগিয়ে আসলো। তুমুল মুখটা নদীর কাছে এগিয়ে নিতেই নদী চোখ বন্ধ করে ফেললো। তুমুল নদীর মুখে ফু দিয়ে হেসে ফেললো। নদী একটি লজ্জা পেলো।
” আসছি”

তুমুল পিছন চেচিয়ে থেকে বলল
” সাবধানে যেও বউ।”

তুমুল বাইকে উঠে হেলমেট পড়ে নিলো। কিছু হিসাব আছে সুফিয়ানের সাথে। সেগুলোই মেটাতে যাবে….

চলবে?
নাও দিয়ে দিছি দুজনের বিয়ে। এখন আমায় মিষ্টি খাওয়াও 🥲🥹

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply