অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪৩
তানিশা সুলতানা
রাত প্রায় দুটো বাজতে চললো। সিফাত নিজ কক্ষের বারান্দায় বসে আছে। দৃষ্টি আসমানে অবস্থিত থালার মতো চাঁদের পানে। ধবধবে সাদা রংয়ের চাঁদের গায়ে কালো কালো কিছু দাগের দেখা মেলে। জমিন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় না সেটা আসলে কিসের দাগ।
হবে হয়তো কলঙ্কের।
আসমানের চাঁদও বোধ হয় আনুর মতো কলঙ্কিনী।
কলঙ্কের দাগ নিয়ে দিব্যি মানুষকে আলোকিত করছে। তাহলে আনু কেনো বাঁচতে পারলো না?
চাঁদের মতো সেও তো পৃথিবীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, কলঙ্ককে শক্তি বানিয়ে বাঁচতে পারতো।
তাদের ছোট্ট একটা সংসার হতো, সেখানে অভাব থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি থাকতো না।
আনু কেনো পারলো না?
যদি নাইবা পারবে, নাইবা বাঁচবে
তাহলে এতো যত্ন নিয়ে ভালবাসতে কেনো শেখালো? বেইমানি করলো আনু।
শিমলী বেগম সিফাতের কাঁধে হাত রাখে। মায়া মেশানো স্বরে বলে
“বাজান ঘরে চলো।
সিফাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে
“মা তোমার মনে আছে
বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরে কোনো একটা বিষয় নিয়ে প্রচন্ড রেগে ছিলে তুমি। আমি একা একা রান্না করতে গিয়ে ভাত ফেলে দিয়েছিলাম। সেটা দেখে তোমার রাগ আরও বেড়ে যায়। তখন তুমি অভিশাপ “জীবনেও শান্তি পাবি না। জ্বলে পুরে মরতে হবে তোকে”
দেখো না মা তোমার অভিশাপ লেগে গিয়েছে। আমি জ্বলছি,আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেছে। হয়ত আর বেশি দিন বাঁচবোও না। এই যন্ত্রণা নিয়েই দুনিয়া ছাড়বো।
সেইদিনটার কথা মনে পড়ে শিমলী বেগম হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ছেলের মাথা খানা নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে।
“রাগের মাথায় বলেছিলাম আব্বা। মন থেকে বলি নি।
” বলেছিলে মা। মন থেকেই বলেছিলে।
আমার জীবনডা ছারখার হয়ে গেলো। বেঁচে থেকেও মরে গেলাম আমি।
বেওথা ব্রিজের উত্তর পাশে একটা বাড়ি রয়েছে। সেটা বল্টুর। সে নিজ কক্ষের জানলা দিয়ে এতক্ষণ নওয়ানের উপর নজর রাখছিলো। কেনো জানি তাকে এক সেকেন্ডের জন্য চোখের আড়াল করতে ইচ্ছে করে না বল্টুর। মন চায় সারাক্ষণ আঠার মতো নওয়ানের পেছনে লেগে থাকতে। কিন্তু পারে না। তাই চেষ্টা করে দূর থেকে হলেও নজর রাখার। ফুল দিয়ে সাজানো ঐ নৌকা খানা অনেকক্ষণ আগে থেকে দেখছে সে। এবং চিন্তা করছে কে রেখেছে এখানে ওটা? আর কেনোই বা এতো সুন্দর করে সাজিয়েছে? কোন শত্রু পক্ষের কাজ নয় তো?
বল্টুর চিন্তা এ ভাবনা আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে নৌকায় উঠে পড়ে নওয়ান এবং নুপুর।
উঠেছে তো উঠেছে একদম ভেতরে চলে গিয়েছে। অসহায় বল্টু দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে গভীর ভাবনায় বিভোর হয়।
নরম এক খানা বালিশ দেখে তাতে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে নুপুর। তাকায় নওয়ানের মুখ পানে। লাল নীল ফেইরি লাইটের আলোতে লোকটার চেহারার আদল একদম পাল্টে গিয়েছে। পাল্টায় নি শুধু টকটকে লাল চোখ দুটো। কিছু মুহুর্ত হবে সে সিগারেট খাচ্ছে না তবুও চোখ দুটো লাল কেনো? তারপর কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগছে তাকে।
“আর ইউ ওকে নওয়ান?
নওয়ান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আঁখি পল্লব বন্ধ করে ফেলে। এবং হাঙ্কি স্বরে বলে
” এ’ম নট ডান।
নুপুর কেঁপে ওঠে। নওয়ান সাধারণত এভাবে কথা বলে না। তবে আজকে কি হলো? শরীর খারাপ করছে কি? তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ে। নওয়ানের কপালে হাত রেখে চেক করে জ্বর এসেছে কি না। কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক দেখে হাত খানা সরিয়ে নিতে চাইলে নওয়ান হাত ধরে এবং সেটা বুকের বা পাশে এনে চেপে ধরে।
“ইটস হার্টস হেয়ার।
আই নিড ইউ। উইল ইউ বি ইন্টিমেন্ট উইথ মি?
নুপুর শুকনো ঢোক গিলে এবং নিজের হাত খানা সরিয়ে আনার চেষ্টা চালায়। তবে নওয়ান ছাড়ে না। সে জবাবের আশায় তাকিয়ে থাকে নুপুরের মুখ পানে। তবে বেশিক্ষণ না। কিছু মুহুর্ত পড়েই সে নুপুরকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। পরপরই নিজ কার্য হাসিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ভালোবাসার অতল সাগরে ডুবে যায়।
চরম উম্মাদনার মুহুর্তে নওয়ান শুধু একবার জিজ্ঞেস করে “আর ইউ ওকে?”
নুপুর জবাব দিতে পারে নি। কথা বলার শক্তি কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই ছিলো না তার।।
তিনটে বেজে চল্লিশ মিনিটে নুপুরকে নিয়ে বাসায় ফেরে নওয়ান। গেইট খোলাই ছিলো। দারোয়ান দুজনই বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। ঘুমানোরই কথা। রাত তো আর কম হলো না।
ঘুম নেই শুধু স্নেহার। সে এখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। নওয়ান বাসায় নেই। চারিদিকে শত্রু। কখন কে বদলা নিয়ে ফেলবে কে জানে? মানুষটা এসব বুঝলে তো?
সে নিজের মতোই চলাফেরা করবে। কাউকে পরোয়াই করে না।
অথচ তার বোঝা উচিত কেউ একজন তার চিন্তায় ঘুমতে পারে না।
এখন নওয়ানকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে স্নেহা। কোলে নুপুরকে দেখে একটু জেলাস হলেও নিজেকে সামলে নেয়। এবং চলে যায় কক্ষে। এখন একটু ঘুমাতে হবে। নাহলে আবারও হাসপাতালের ছুটতে হবে।
তবে ঘুম যে বড্ড স্বার্থপর। সহজে ধরা দিতে চায় না।
নওয়ান নুপুরকে নিয়ে নিজ কক্ষে চলে আসে। তাকে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে নিজে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। নুপুর আধো চোখ মেলে নওয়ানের চলে যাওয়া দেখে। এবং বিরবির করে বলে
“মানুষ ম/রে গেলে তো বেঁচে যায়।
বেঁচে থেকে প্রতি মুহুর্তে মৃ/ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার মাঝেই রয়েছে সমস্ত পাপের শাস্তি।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২
-
অন্তরালে আগুন গল্পের লিংক
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১০