মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৫০ (১অংশ)
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
কুহেলির গলা কাঁপছে, শব্দগুলো ঠিকভাবে বেরোচ্ছে না। চোখে জল জমে আছে, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে, তবু সে প্রাণপণে কথা বলার চেষ্টা করে কাঁপা কন্ঠে বললো,
তু… তুলবেন না উপরে….প্লিজ। আমার মাথা ঘুরছে… দেখুন তো আমি কোথায় ঝুলে আছি..!
আমি তো পিচ্চি একটা মানুষ এভাবে কেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন? আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
তার আঙুলগুলো অজান্তেই আবরারের কবজিতে আঁকড়ে ধরেছে, যেন ওই শক্ত হাতটাই এখন তার পৃথিবীর শেষ ভরসা। নিচে তাকানোর সাহস আর নেই, শুধু শূন্যতার ভয় বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।
আবরারের চোখে কোনো করুণা নেই, কিন্তু রাগের আগুনটাও যেন একটু স্থির হয়েছে। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
আর কী বলবি এসব?
কুহেলি দ্রুত মাথা নাড়ল। একবার না, দু’বার না—বারংবার। যেন মাথা নাড়লেই বেঁচে যাবে।
না… না সামি আর কিছু বলবো না। কখনোই না। প্লিজ আমাকে তুলুন।
তার চোখের জল গালে গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শরীরটা বিশ্বাসঘাতক—ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
আবরারের কণ্ঠটা নিস্তব্ধ, অথচ সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর চাপ,
“যদি বলিস তাহলে?”
কুহেলির ঠোঁট কাঁপতে লাগল। চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে গেছে, শরীরটা ঝুলে থাকার ক্লান্তিতে অবশ। কান্না আর কথার মাঝখানে আটকে গিয়ে সে হেঁচকি তুলে বলল,
তাহলে তাহলে আমি একটা পাগল। তারপর প্রায় চিৎকারের মতো ফিসফিস করে যোগ করল, প্লিজ তুলুন না। আমার সত্যিই খুব ভয় লাগছে। এই কথাটুকু যেন বাতাসে ঝুলে রইল কয়েক সেকেন্ড। নিচে শহরের আলো ঝিলমিল করছে, ওপরে আকাশ নিঃশব্দ।
হঠাৎ করেই আবরার এক ঝটকায় কুহেলিকে উপরে তুলে নিল। শক্ত হাতে টেনে এনে ছাদের ভেতরের দিকে নিয়ে এলো, কিনারা থেকে বেশ খানিকটা দূরে।
কুহেলির পা সাদের ফ্লোরে ছোঁয়া মাত্রই সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় বসেই পড়ল। বুকটা উঠানামা করছে অস্বাভাবিক গতিতে, মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা যেন বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। গলা শুকিয়ে গেছে, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। আর একটু হলেই আর একটু হলেই সব শেষ হয়ে যেত—এই উপলব্ধিটাই তাকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে
দিচ্ছে। সে দুই হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল, গভীর শ্বাস নেবার চেষ্টা করল। শরীরের প্রতিটা কোষ এখনো ভয়ে কাঁপছে। মাথার ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—কি ভয়ংকর ছিল! কতটা কাছ দিয়ে মৃত্যু ছুঁয়ে গেল! কুহেলি চোখ নামিয়ে নিল। আবরারের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই।
আবরার এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে কুহেলিকে বসা অবস্থা থেকে তুলে দাঁড় করাল। মুহূর্তেই তার শক্ত বাহু কুহেলির কোমর জড়িয়ে ধরল—এমন শক্ত করে, যেন ছেড়ে দিলে সবকিছু ভেঙে পড়বে। লাল টকটকে চোখের মনি দুটো দিয়ে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকিয়ে, কণ্ঠটা দমবন্ধ করা রাগে কাঁপছে।দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
তোর সাহস দেখে আমি জাস্ট অবাক হচ্ছি!
জানিস, তুই যখন মরার কথা বলেছিলি—আমার কতোটা খারাপ লেগেছিলো? হ্যাঁ, আমি জানি আমি রাগী, আমি ছন্নছাড়া, আমি বেপরোয়া। কিন্তু তাই বলে কি তুই মরার কথা বলবি? কেনো বলবি? বল!
কুহেলির চোখ ভিজে উঠল। আবরারের বুকে ধাক্কা খেয়ে তার শ্বাস আটকে আসছে। আবরার থামল না।
আমি যদি ঐদিন মরে যেতাম তাই ভালো হতো অনন্ত তর মুখ থেকে এই কথা শুনতে হতো না। বল আমি ম…
এইবার কুহেলি আর সহ্য করতে পারল না। কাঁপা হাতে সে হঠাৎ আবরারের মুখ চেপে ধরল আঙুলগুলো ঠোঁটের ওপর শক্ত হয়ে বসে গেল। চোখে পানি টলমল করছে, গলা ভেঙে আসছে, তবু সে জোর করে বলল,
চুপ… চুপ করুন।
তারপর কুহেলি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আবরারের বুকের ওপর হাত রেখে সে একটু দূরে সরে গেল—চোখ দুটো লাল, ভেজা, জমে থাকা কষ্টে টলমল করছে। কণ্ঠটা প্রথমে কাঁপছিল, তারপর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিলো। কাঁপা কন্ঠে বললো,
আপনি কি সব বুঝতেছেন? আপনি জানেন আমি কতোটা কষ্ট পেয়েছি? আপনি অসুস্থ ছিলেন গুলিবিদ্ধ হয়ে বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন। আর ঠিক তখনই—আমাদের বেবি আমাদের বেবিটা চলে গেলো। কথাটা বলেই সে একবার চোখ বন্ধ করল। যেন ওই শব্দগুলো আবার বুকের ভেতর ছুরি চালিয়ে দিল। আমার অবস্থা টা আপনি একবারও উপলব্ধি করতে পারছেন? কুহেলির কণ্ঠ উঁচু হলো, ভাঙা অভিমানে। আমি ঠিক কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, জানেন আপনি?
আবরারের দিকে তাকিয়ে সে তিক্ত এক হাসি হাসল—যেটা হাসি না, বরং অসহায়তার ছাপ।
না আপনি তো শুধু সারাজীবন আপনার রাগ, আপনার জেদ নিয়েই থাকবেন। আমাকে আপনি কখনোই বুঝবেন না। কুহেলির চোখ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়তে লাগল। আমারও তো মন চায়, অন্য মেয়েদের মতো স্বামীর সাথে রাগ করতে। অভিমান করতে। একটু আবদার করতে। হঠাৎ কণ্ঠটা ভেঙে গেল। কিন্তু না আমার তো কপালই খারাপ। তাই আমার স্বামী সারাজীবন রাগ আর জেদ নিয়েই থাকবে—আর আমাকে সব চুপচাপ সহ্য করতে হবে।
সে দু’হাতে নিজের বুক চেপে ধরল, যেন ভেতরের ব্যথাটা বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি এসব বলতে চাইনি,ফিসফিস করে বলল কুহেলি।পরিস্থিতি আমাকে ঐসব বলিয়েছে। আর আপনি…. আপনি সেটা কোনোদিন দেখলেন না বুঝবেন না।
কথাগুলো বলে কুহেলি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী কষ্টটা নিয়ে সে ঘুরে হাঁটা দিল—একটা দূরত্ব দরকার ছিল, নইলে হয়তো আবার ভেঙে পড়বে। ঠিক তখনই আবরার হঠাৎ করে ওর হাত ধরে ফেলল। শক্ত একটা টান—আর পরমুহূর্তেই কুহেলি নিজেকে আবরারের বুকে আটকে থাকতে দেখল।
আবরারের কণ্ঠ রুক্ষ, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আতঙ্কটা স্পষ্ট
“মরার কথা কেন বললি, বল!”
এই প্রশ্নটা যেন কুহেলির ভেতরের সব বাঁধ একসাথে ভেঙে দিল। রাগ, কষ্ট, অভিমান—সব একসাথে মাথায় উঠে এলো। আর ঠিক তখনই, নিজের অজান্তেই, সে ফিক করে হেসে ফেলল। সেই হাসিটা আনন্দের না—ওটা ছিল ক্লান্তির, অসহায়তার, ভেঙে পড়ার আগের এক অদ্ভুত হাসি।
আবরার ভরু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
“আমি কি হাসার মতো কিছু বলেছি?”
কুহেলি ওর বুকের মুখ গুঁজে বললো,
আপনি যে ভীষণ ঘাড় ত্যাড়া, সেটা জানেন তো?
এক নিশ্বাসে বলে গেল,
আমি এত কিছু বলে বুঝালাম,আর আপনি
এখনো ওই এক কথাই বলছেন!
আবরার ঠোঁট বাঁকিয়ে, চেনা জেদি ভঙ্গিতে বলল, “আমি এরকমই। কী করবে?”
এই কথায় কুহেলির সব শক্তি যেন হঠাৎ নিভে গেল। রাগটা আর টান ধরে রাখতে পারল না। সে একরকম হতাশার শ্বাস ফেলল—লম্বা, ভারী। তারপর নরম কঠে বললো,
কি করবো আর…! ঘাড় ত্যাড়া হলেও তো আপনি আমারই।
এই শেষ কথাটায় আর কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল না রাগ। ছিল শুধু এক অদ্ভুত মেনে নেওয়া—ভালোবাসার সেই ক্লান্ত স্বীকারোক্তি, যেখানে সব কষ্ট জেনেও মানুষ থেকে যায়। আবরার চুপ করে রইল। শক্ত করে কুহেলিকে জড়িয়ে ধরল—এই প্রথম, কোনো কথা ছাড়া। আর সেই নিঃশব্দ আলিঙ্গনে, দু’জনেই বুঝে নিল—সব ক্ষত হয়তো আজই সারবে না, কিন্তু ছেড়ে যাওয়ার সাহস কারো নেই।
কুহেলি আবরারকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এই আলিঙ্গনটাই ওর একমাত্র নিরাপদ জায়গা। আবরারের বুকে কান লাগিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
আপনি কি জানেন! আপনাকে কে গুলি করেছিল?
আবরার এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ দুটো হালকা সংকুচিত হলো। তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, না। একটু থেমে যোগ করল, কে আর হবে? হয়তো কোনো শত্রু। আমার তো শত্রুর অভাব নেই। কেউ না কেউ সুযোগ খুঁজছিল—এই যা।
কুহেলির বুকটা কেমন করে উঠল। সে মাথা তুলে আবরারের দিকে তাকাল। চোখে ভয়, উদ্বেগ আর অনুরোধ একসাথে। তারপর কাঁপা কন্ঠে বললো,
আপনি এই সবকিছু থেকে বেরিয়ে আসুন না!
আর কতদিন এভাবে? গুলি, রক্ত, শত্রু—আমি আর পারছি না।
আবরার গভীর নিঃশ্বাস নিল। এই প্রথম তার কণ্ঠে দৃঢ়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসহায়তা বেরিয়ে এলো। আমি চাই বেরিয়ে আসতে, পাখি। সত্যি চাই। কুহেলির চুলে আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বলল,
কিন্তু পারবো না। আমি সরে গেলেই ওরা ভাববে আমি দুর্বল। তখন সুযোগ নেবে। আর প্রথম টার্গেট হবে তুমি। কুহেলির শরীরটা কেঁপে উঠল। “আমি তোমাকে হারাতে পারবো না,” আবরার নিচু গলায় বলল, “এই একটাই ভয় আমাকে আটকে রেখেছে।”
কুহেলি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা হতাশা বের করে দিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে আওড়ালো,
তার মানে আপনি কখনোই এসব ছাড়বেন না?
আবরার কুহেলির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। উত্তরটা স্পষ্ট না, আবার একেবারে অস্বীকারও নয়। “জানি না, শুধু”
তারপর হঠাৎ বিষয় ঘুরিয়ে দিল দিয়ে বললো,
তবে একটা কথা ঠিক—আমরা হসপিটাল থেকে বাড়ি যাবো না।
কুহেলি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শুধালো,
“তাহলে কোথায় যাবো?”
আবরার বাকা হাসলো সে হাসিটা ছিল অদ্ভুত, অর্ধেক মজা আর অর্ধেক রহস্যে মোড়া। তারপর নিচু কন্ঠে বললো,
“আমার আরেক রাজ্যেই!”
কথাটা শেষ হতেই হঠাৎ কুহেলির মুখের সামনে একটা নরম রুমাল এসে পড়ল। কুহেলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাকে ভেসে এলো একধরনের তীব্র গন্ধ। চোখ বড় করে কিছু বলতে চাইছিল, প্রতিবাদ করতে চাইছিল—কিন্তু শব্দটা গলায় আটকে গেল। চারপাশটা কেমন ঝাপসা হয়ে এলো, শক্তি যেন ধীরে ধীরে শরীর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আবরার কুহেলিকে কোলে তুলে নিল। তারপর শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
“চলো” তোমাকে আমার আরেক রাজ্যে নিয়ে যাই।
সেখানে কোনো হাসপাতালের গন্ধ নেই, নেই কান্না, নেই এই দমবন্ধ করা ভয়।
কুহেলির চোখ আধখোলা, দৃষ্টিটা অস্পষ্ট। আবরারের বুকের ধুকপুক শব্দটা সে আবছা শুনতে পাচ্ছিল। ভয়ের মাঝেও কোথাও একটা অদ্ভুত ভরসা কাজ করছিল—এই মানুষটাই ভয় দেখায়, আবার এই মানুষটার বুকেই সে নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে।আবরার ধীরে ধীরে সাদ পেরিয়ে লিফটের উঠলো লিফলেটের বন্ধ হতেই আবরার কুহেলির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ঘুমাও পাখি…!”
একটু থেমে…!
যখন জাগবে, তখন তুমি এমন এক জায়গায় থাকবে—যেখানে শুধু তুমি আর আমি। আর আমার রাজ্যে আমার পাখিকে কেউ কষ্ট দেওয়ার সাহস পায় না।
লিফট নামতে থাকল নিচের দিকে, আর কুহেলি ধীরে ধীরে অচেতনতার গভীরে হারিয়ে গেল—এক অজানা রাজ্যের পথে, যেখানে ভালোবাসা আর ভয়ের সীমানা বরাবরের মতোই!
চলবে….!!
#মাই_টক্সিক_হাসব্যান্ড
#পর্ব_৫১ (২অংশ)
#কলমে_তাসনিম_তালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
কানাডা টরন্টো শহর….!
শীতের কুয়াশা, কাচের ওপর জমে থাকা পানি, আর আকাশজুড়ে সাদা ধোঁয়ার মতো মেঘ। প্রাইভেট জেটের চাকাগুলো যখন রানওয়েতে ছুঁয়ে থামলো, তখন ঘড়িতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত। এই দীর্ঘ যাত্রায় কুহেলির জ্ঞান ছিল না দেহে ছিল নিথর নরমতা আর মুখে যেন কোনো অদৃশ্য ঘুমের মোহর। শায়লা আর ফেটিক্সকে বাংলাদেশেই রেখে এসেছে আবরার। জেট থেকে নেমেই একদম গুপ্তভাবে শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা একটি বিশাল কাচের প্রাসাদের মতো ভিলায় নিয়ে যাওয়া হলো কুহেলিকে। কোনোমতে শরীরের উষ্ণতা ঠিক রাখতে মোটা কম্বল দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছিল। সেই রুমে হালকা নীল আলো, কোমল কার্পেট, আর জানালার বাইরে ঝরে পড়া বরফ—সবই কুহেলির অজান্তে ঘটে গেল।
আবরার গোসলের জন্য ওয়াশরুমে ঢুকতেই কুহেলির চোখের পাতায় হালকা কাঁপুনি হয়। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে অচেনা ছাদের দিকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড সে বোঝার চেষ্টা করে—এটা স্বপ্ন না বাস্তব? হঠাৎ শরীরের ওপর থাকা কম্বলটা ফেলে দিয়ে উঠে বসে। চারিদিকে তাকায়
নরম সাদা সোফা, অদ্ভুত কিছু আধুনিক ছবির ফ্রেম, আর জানালার বাইরে বরফ—সবই যেন বলে দেয় এটা কোনো সাধারণ জায়গা নয়। তার আগে কখনও সে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কোথাও যায়নি এমন দৃশ্য চোখে দেখা তার কাছে প্রায় অসম্ভব স্বপ্নের মতো। কুহেলি নিচু স্বরে বললো,
“আমি…. কোথায়?”
তার কণ্ঠে একধরনের আতঙ্ক, সঙ্গে বিস্ময় ও সন্দেহ।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল।
ধোঁয়া আর বাষ্প ভেসে আসে প্রথমে। তারপর বেরিয়ে আসে আবরার—চুল থেকে পানি ঝরছে, কোমর পর্যন্ত তোয়ালে পেঁচানো, চোখে সেই চিরচেনা ঠাণ্ডা ভাব। কিন্তু আজকে যেন তা আরও গভীর, আরও রহস্যময়।
কুহেলি কে ওর দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবরার বাকা হাসলো। সেই হাসি যেন বলে— আমি জানি তুমি কি ভাবছো। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় কুহেলির দিকে। খুব কাছে গিয়ে থামে। কুহেলির নিশ্বাস আটকে যায়। কিছু বলার আগেই এক টানে কুহেলিকে কোমর থেকে ধরে একটু উপরে তুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসিয়ে দেয়। কুহেলি চমকে উঠে বললো,
“আরে কি করছেন! এখানে তো জিনিসপত্র আছে পড়ে যাবে!”
আবরার ভ্রু তুলে হালকা গম্ভীর স্বরে বললো,
পড়ে যাক। এতে সমস্যা নেই। বউ একটা আবদার করেছে তা রাখবো না?
তার গলা তীক্ষ্ণ কিন্তু শান্ত। যেন পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে তার মধ্যে উদাসীনতা, একমাত্র কুহেলি ছাড়া।
কুহেলি বুঝে পায় না ব্যাপারটা কোথায় যাচ্ছে। সে কপাল কুঁচকে বললো,
কেন সমস্যা নেই? আর আমি কি আবদার করলাম যে বলে ফেললেন?
আবরার ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো—সেই পরিচিত ব্যঙ্গ-রহস্যের হাসি।
আবদার তো করেছো।
কুহেলি চোখ বড়ো করে তাকিয়ে বলে,
আমি? কি আবদার করলাম?
আবরার এক হাত তুলে কুহেলির থুতনিটা আলতো করে ধরলো। তার কণ্ঠ নিচু, ধীরে টেনে উচ্চারিত, যেন কথার মধ্যেই আগুন।
এই যে আমাকে দেখতে হা করে তাকিয়ে ছিলে।
কুহেলি রীতিমতো গলতে থাকে লজ্জায়,
আমি তো… সেই মানে… আমি তো….!
আবরার আরো কাছে ঝুঁকে আসে।
তাই দেখার সুযোগ দিলাম। চাইলে আমি তোয়ালে খোলে দেই! তাহলে সুবিধা হবে।
কুহেলি চিৎকার করে বললো, অসভ্য লোক চুপ করুন! নয়তো মেরে বালিশ চাপা দিয়ে দিবো!
আবরার বাচ্চাদের মতো ইনোসেন্ট ফেইস করে বলে কিন্তু আমার তো তোমার শরীরের সব কিছু মুখস্থ! তারপর আবরার বলতে শুরু করলো,
তুমি ছোট পাতলা গড়নের মানুষ, যেন দেখলেই বোঝা যায় কতটা নরম আর ভঙ্গুর। তার কাঁধ দুটো খুব চওড়া না, কিন্তু শৈল্পিক—যেন মিহি রেখা দিয়ে আঁকা। ঘাড়ের বাঁকটা এমন সুন্দর যে আমি মাঝে মাঝে শুধু সেই বাঁকটা দেখেই হারিয়ে যায়। সেখানেই একগুচ্ছ নরম চুল এসে জমে থাকে।
পিঠটা মসৃণ, দুধ-সাদা আর শান্ত যেন কেউ ক্যানভাসে একটুও তুলি চালায়নি। কোমরের জায়গাটা এতটাই সরু যে দু’হাতে পুরোটা ধরতে গেলে আমার মনে হয়, তোমার বোধহয় জন্মই নিয়েছে আদর করার জন্য, নয় চেপে ধরলে ফেটে যাওয়ার জন্য। হাতদুটো ক্ষুদ্র, আঙুলগুলো লম্বাটে কোনো কাজের জন্য না, শুধু ছোঁয়ার জন্য বানানো। কব্জিতে এক ধরনের শিশুসুলভ ভঙ্গুরতা আছে, কিন্তু একই সাথে লুকোনো শক্তি যেন কেউ যদি শুধু দেখে তবে ভুল করবে, কিন্তু ছুঁলে বুঝবে কতটা যন্ত্রণা আর স্মৃতি সঞ্চিত আছে। বুকের উপরের অংশে কোনো বাড়তি জৌলুস নেই, বরং নিখুঁত সরলতা—পরিষ্কার রেখা, নরম টান আর নিস্তব্ধতা। শ্বাস নিলে পুরো বুক ওঠানামা করে, সেই ওঠাপড়া দেখে কখনো কখনো আমি মনে মনে ভাবি—এই ওঠাপড়া যদি থেমে যায়, তাহলে সে আমিই বাঁচবে কিভাবে? তলপেটের দিকে চামড়াটা আরো পাতলা, যেন রক্তের রঙ পর্যন্ত হালকা দেখা যায়। নাভিটা ছোট আর গোল—দৃষ্টির এক অদ্ভুত কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ঠিক ডান পাশেই একটা লাল লালচে রঙের তিল, খুব গভীর না, কিন্তু এমন দৃশ্যমান যে চোখ একবার পড়লে আর সরাতে ইচ্ছে করে না। উরুদুটো পাতলা কিন্তু শালীন রেখাযুক্ত যেন চলার সময়ও এক ধরণের লজ্জা কাঁপে। হাঁটুর নিচে পায়ের কাঠামোটা বাচ্চাদের মতো সরল পাতলা পায়ের পাতায় নরম আঙুল, যেন সবসময় কারো হাত খোঁজে। সব মিলিয়ে তুমি কোনো আগুন নয় ধীর জল। ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছো আমাকে, আবার ধীরে ধীরে পুড়ায়, আবার কখনো ধীরে ধীরে আমাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট ফেলে।
কুহেলি কিছুক্ষণ হা করে আবরারের দিকে তাকিয়ে রইলো এমনভাবে যেন জীবনে প্রথমবার কারো চোখে নিজের অস্তিত্ব দেখছে। আবরারের সেই নিপুণ, খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ সবকিছু কুহেলির কানে গেলেও বুঝে উঠতে তার কয়েক সেকেন্ড লেগে গেলো। তারপরই সে তড়িঘড়ি করে নিজের ভঙ্গিটা ঠিক করলো, আবরারের চোখ এড়িয়ে মুখ গম্ভীর করলো—যেন এতক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকার কোনো প্রমাণই নেই। কুহেলি কাঁপা ঠোঁট সামলে বললো,
আপনি এরকম ভাবে বলছেন, যেনো ক্লাস ফাইভের বাচ্চা তার মুখস্থ পড়া স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে শুনাচ্ছে!
আবরার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বললো,
বউ বলে কথা! তার সবকিছুই মনে রাখতে হয়, না হলে বিয়ে করার মানে কি?
কুহেলির মুখ লাল হয়ে গেলো। খানিকটা লজ্জা, খানিকটা বিরক্তি আর খানিকটা অবাক—যেটা ঠিক কী ছিলো সে নিজেও বলতে পারলো না। চোখদুটো কৌতূহলী হয়ে উঠলো, যেন ভিতরে হাজারটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
—হু, আচ্ছা আমরা এখন কোথায়?
আবরার গম্ভীর না হয়ে, স্বাভাবিকভাবেই বললো,
কানাডা।
কিহ্!!!
শব্দে বিস্ফোরণ ছিলো, চোখে তো আরো বেশি।
আবরার দুষ্টু দৃষ্টিতে তাকালো এবার। নিজের কাজের ব্যাখ্যা দেয়ার মতো কোনো অস্থিরতা তার চোখে নেই, বরং ওর মধ্যে সেই বেপরোয়া স্বভাবটা স্পষ্ট ঝলক দেয়।
কুহেলি বিস্মিত হয়ে বললো,
তাহলে আমাকে অজ্ঞান করে আনলেন কেনো?
আবরার কাঁধ ঝাঁকালো বললো, কারণ তুমি সজাগ থাকলে আমার সাত পাঁচ করতে মন চাইতো তাই অজ্ঞান করে নিয়ে আসছি!
আবরারের কথা বুঝতে কুহেলির একটু সময় লাগলো যখন বুঝলো তখন আবরারের মাথার চুল ধরে টানতে টানতে রাগি কন্ঠে বললো,
অসভ্য লোক! এসব কিছু খালি আপনার মাথায় ঘুরে? আজকে আপনার চুল সব টেনে ছিঁড়ে দিবো।
আবরার হাসতে হাসতে বলে আরে বউ ভালোবাসে আমার ছোট ভাই আর চুল ছিঁড়তেছো আমার মাথার!
কুহেলি রাগে গজগজ করতে করতে বললো,মন চাচ্ছে তো আপনার সব কেটে দিতে অসভ্য বেহায়া ইতর বান্দর লোক!
আবরার ভুরু কুঁচকে বললো,
আচ্ছা ঠিক আছে, এবার চুল তো ছাড়ো!
কুহেলি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
নাহ! ছাড়বো না!
বলার সাথে সাথেই আবরারের চোখে রাগের ঝিলিক দেখা দিলো। সে-ও এবার কুহেলির চুল ধরে টান দিলো। দু’জনের মধ্যে আচমকা এক অদ্ভুত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো—মাফিয়া ও পাখির নয়—বরং ক্লাস ওয়ানের দুই বাচ্চার চুল টানাটানি যুদ্ধ! ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসা কুহেলি টানাটানির ধাক্কায় নিচে নেমে দাঁড়ালো, আবরারও সামনে এগিয়ে এলেও কেউই চুল ছাড়লো না। দুইজন রুমের এক কোণা থেকে আরেক কোণা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে চুল টানতে টানতে ঘুরছে যেন যুদ্ধের রণক্ষেত্র।
শেষে ধপাস!
দু’জনেই বেডের উপর গিয়ে পড়লো। এইবার দুইজনই চুল ছেড়ে দিলো। কুহেলি হাঁপাতে হাঁপাতে আবরারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
—“লুচ্চা মাফিয়া!”
আবরার মুখ খুলতেই পারেনি কুহেলি পলকের মধ্যে উঠে দাঁড়ালো, চটপট পা চালিয়ে দরজার দিকে ছুটলো। রুম থেকে বের হতে না হতেই পিছনে আবরারের কণ্ঠ ভেসে এলো,
দাঁড়াও কুহেলি! আজকে তোমার এক দিন হলে আমার শশুরের বিশ দিন!
কুহেলি দৌড়াতে দৌড়াতে হাসলো, উড়ন্ত চুলগুলো সিঁড়ির আলোয় ঝলমল করছিলো পেছনে পেছনে আসতে থাকে আবরার।
চলবে…!!
মাইটক্সিকহাসব্যান্ড
পর্ব_৫০ (শেষ অংশ)
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
নিচে নামার পরও দু’জনের দৌড় থামলো না। বিশাল হলরুম—ঝুলন্ত ঝাড়বাতি, চকচকে মার্বেল মেঝে, আর বিশাল কাঁচের দেয়াল—সব মিলিয়ে যেনো টরন্টোর সেই রাজ্য সাক্ষী হয়ে রইলো এক মাফিয়া আর তার পাখির খুনসুটি। কুহেলি একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ছুটে যাচ্ছিলো—আর আবরার পেছনে পেছনে লম্বা পা ফেলে তাড়া করছে। দু’জনের হাসির শব্দ দেয়ালগুলোতে প্রতিফলিত হয়ে আরো জোরে বেজে উঠছিলো—যেন এই বিশাল বাড়িটাই বহুদিন পর প্রাণ ফিরে পেলো। হঠাৎ দৌড়াতে দৌড়াতে আবরারের রুমাল খানা খুলে নিচে পড়ে গেলো। সাথে সাথে খেয়াল করতেই কুহেলির মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। সে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে অন্যদিকে ঘুরে গেলো। আবরার থমকে দাঁড়িয়ে কুহেলির প্রতিক্রিয়া দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো দুষ্টামি নিয়ে বললো,
আরেহ্ বউ, তাতে কী! তাও তো তুমিই তোমার হক আছে তো দেখার!
কুহেলি চোখ শক্ত করে বন্ধ করলো, চিৎকারটা বের হয়ে এলো অপ্রস্তুত লজ্জায়,
উফফ! আপনি কি রুমে গিয়ে কাপড় পরবেন! অসভ্য লোক কোথাকার!
আবরারের হাসি আরো গভীর হলো, যেনো তাকে খেপানোয় তার আলাদা সুখ আছে। তারপর বললো, আচ্ছা আচ্ছা যাচ্ছি!
হু! দয়া করে তাড়াতাড়ি যান! কুহেলি এবার হাত নেড়ে নির্দেশ দিলো।
আবরারও আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে নামলো আবরার। গায়ের কালো টি-শার্টে ভেজা চুল গড়িয়ে পড়ছে! নিচে এসে দেখে কুহেলি চুপচাপ সোফায় বসে আছে—পা দু’টো মুঠোর মতো করে গুটিয়ে, ঠোঁট কামড়ে, যেনো এখনো লজ্জাটা কাটায়নি। আবরার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই কুহেলি মাথা তোললো। দুই চোখেই লাজের অবশিষ্ট আর দুষ্টুমি লুকোচুরি খেলছে।
আবরার হালকা ভ্রু তুলে বললো,
পাখি… বাইক রাইডে যাবে?
শব্দটা যেনো আচমকা কুহেলির ওপর ঝড় হয়ে এলো। মুহূর্তেই সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো রীতিমতো চোখ চকচক করছে,
অবশ্যই! চলুন!
আবরার বললো,
আমি কিন্তু বাইক অনেক জোরে চালাই, বুঝলে?
কুহেলি বুক ফুলিয়ে বললো,
প্রবলেম কি? আমি আপনাকে শক্ত করে ধরে বসবো!
আবরারের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটলো। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
আচ্ছা তাহলে চল। যাওয়া যাক।
কুহেলি নিজের চুলটা ঠিক করলো, নাক টেনে বললো,
কানাডায় এসে বাইক রাইড—কি সুন্দর না ব্যাপারটা?
আবরার মাথা নেড়ে হালকা গম্ভীরভাবে বললো,
আমার পাখির সাথে হলে সবই সুন্দর।
বাইরের দরজা খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাস ধাক্কা দিলো। টরন্টোর আধা-মেঘলা আকাশ, দূর থেকে গাড়ির শব্দ, আর ড্রাইভওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কালো ম্যাট বাইক—যেনো অপেক্ষায় ছিলো এই দুই মানুষ আর তাদের অদ্ভুত প্রেম-বাঘামি খুনসুটির।
~~
বাংলাদেশ….!
বিকেলের নরম রোদটা আঙিনার সাদে গায়ে পড়ে সোনালি হয়ে আছে। বাতাসে পাতার মৃদু খসখস শব্দ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি শায়লার মনে নেই।
চুপচাপ বসে আছে সে—হাঁটুতে চিবুক রেখে। দেখলে মনে হবে বসে থাকা শুধু সময় কাটানো, কিন্তু চোখদুটো বলে দিচ্ছে তার ভেতরে ঝড়।
ভাইয়া ফাহিম কোথায়—জানে না। কুহেলি বিদেশ চলে গেছে—তাও আবরারের সাথে, মানে নিরাপদে, কিন্তু তবুও একা লাগছে। বাড়ি টা ফাঁকা, উঠানটা ফাঁকা, মনটা আরও ফাঁকা।
ঠিক সেই সময় সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ। ফেটিক্স এসে শায়লার পাশে বসে। কিছুটা দূরে, আবার কিছুটা কাছে—যেনো অস্বস্তিও না হয়, আবার ফাঁকাও না থাকে। ফেটিক্স শান্ত কণ্ঠে বললো,
এভাবে মন খারাপ করে বসে আছো কেনো?
শায়লা আস্তে আস্তে নড়েচড়ে গা ঠিক করে বললো,
ভাইয়ার কোনো খবর নেই। কুহেলিও চলে গেলো। আমার একদম ভালো লাগছে না।
ফেটিক্স শায়লার মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বোঝার চেষ্টা করলো—শায়লা যে শুধুই মন খারাপ না, সে ভয়েও আছে, শূন্যতাতেও আছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফেটিক্স বললো, ঘুরতে যাবে?
শায়লা ভ্রু কুঁচকালো,কোথায়?
ফেটিক্স শান্ত কন্ঠে বললো,
চলো। গেলে দেখতে পাবে!
ফেটিক্স গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে চুপচাপ রাস্তার দিকে চোখ রেখে চালাচ্ছিল। বিকেলের রোদটা নরম হয়ে এসেছে, শহরের গলিগুলো এখন ধুলো আর কোলাহলের মাঝেও একটু বিশ্রামের মতো লাগছে। পাশের সিটে বসে থাকা শায়লা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল—হাওয়ায় চুল উড়ছিল, তবু তার মন ছিল অনেক দূরে কোথাও।
শহরের ভিড়, পথচারী, দোকানের সাইনবোর্ড—কোনো কিছুকেই যেন চোখে ধরা দিচ্ছিল না তার। ফাহিম আর কুহেলিকে হারানোর শূন্যতা তাকে চেপে ধরেছিল নিঃশব্দে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ফেটিক্স ব্রেক চাপলো। গাড়ি ধীরে ধীরে থামল রাস্তার পাশে। শায়লা চমকে তাকালো একটা ছোট ফুচকার দোকান। দোকানের সামনে একটা টিনের ছাউনির নিচে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার, পাশে কৌটায় চকচক করছে ফুচকা আর টক পানি। ফেটিক্স গাড়ি থেকে নেমে এসে দরজা খুলে শায়লার হাত ধরলো।শায়লা বিস্ময়ে ফেটিক্সের দিকে তাকালো—এতক্ষণ নীরব থাকা মানুষটা যেন একদম আলাদা। ফেটিক্স হালকা হাসলো,
আমি শুনেছি মেয়েরা নাকি ফুচকা খুব পছন্দ করে তাই ভাবলাম তোমার মনটা একটু ভালো হোক।
শায়লা কিছু বললো না—চোখে লাজুক বিস্ময়, ঠোঁটে একচিলতে নীরবতা। ফুচকাওয়ালা এগিয়ে গেলেই বললো,
“আপা কেমন ফুচকা দিবো?”
শায়লা চোখ উঁচু করে বললো,
অনেক ঝাল দিবেন!
ফেটিক্স ভুরু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
এতো ঝাল খেতে পারবে?
শায়লা তাকালেও হাসল না, শুধু বললো,
পারবো ঝালই ভালো লাগে।
ফেটিক্স আর কিছু বলার চেষ্টা করেও থেমে গেল—শায়লার চোখে এমন একটা ভার ছিল, যেন কোনো কথাই তাকে ছুঁতে পারবে না। পরিবেশটা হালকা হলেও তার মন ছিল ভারি, ভিজে, কোথাও আটকে থাকা। শায়লা ফুচকা খেতে থাকলো—প্রতিটি ফুচকার ভেতর ঝালের সঙ্গে কোথায় যেন কষ্টের স্বাদ মিশে ছিল। পাঁচটার মতো ফুচকা গিলেই তার চোখ দু’টো জ্বালা করে উঠলো। অশ্রু আর ঝাল মিলে কাঁচের মতো চকচক করছিল তার চোখের কোণা। ফেটিক্স বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো,
এতো ঝাল খেতে পারো না তাহলে খেতে গেলে কেনো?
কথার সুরটা শাসন না—বরং একটা দুশ্চিন্তা।
কিন্তু শায়লা উত্তর দিলো না, শুধু চোখের পানি মুছলো কাঁধ দিয়ে। হঠাৎ ফেটিক্স যেন বললো,
“এক মিনিট।”
তারপর সে প্রায় দৌড়ে দোকান ছেড়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে একটা আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো—মেল্ট হয়ে যাওয়ার ঠিক আগে।
এই, এটা খাও নাহলে এখনই তোমার চোখে আগুন জ্বলবে।
শায়লা একটু চমকে তাকালো—অপ্রস্তুত। তারপর ছোট্ট একটা কামড় নিল। আইসক্রিমের ঠাণ্ডা মিষ্টি তার মুখ ভরিয়ে দিতে লাগলো—ঝালটা ধীরে ধীরে নেমে আসলো, শ্বাসটা কিছুটা হালকা হলো।
ফেটিক্স ফুচকাওয়ালাকে টাকা দিলো।
এরপর ফেটিক্স চুপচাপ গাড়ির দরজা খুলে ধরলো। শায়লা উঠে বসলো নিঃশব্দে। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই শহরের শব্দ যেন বাইরে রয়ে গেল—ভেতরে শুধু নরম নিস্তব্ধতা। ফেটিক্স স্টার্ট দিলো!!!
চলবে...!!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৮
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৩
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৭