মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৪৭ (বার্থডে স্পেশাল পর্ব)
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
“আবরার আজকে বেঁচে গেছি কিন্তু এরপর আর বাঁচতে পারবি না!”
কাগজের টুকরো হাতে নিয়েই কুহেলির বুকটা হঠাৎ করে ধক করে উঠল। কাগজের পাতাটা যেন অস্বাভাবিকভাবে ভারী—এক টুকরো কাগজ, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা ভয়।
এত রাতে কে দিলো? আর তার চেয়েও ভয়ংকর প্রশ্ন—কে আবরারকে মারতে চাইছে? হাতের আঙুল কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠছে, নিঃশ্বাস ঠিক মতো নিতে পারছে না। করিডোরের নিস্তব্ধতা হঠাৎ করে কুহেলির কাছে ভীষণ ভয়ানক মনে হলো। দ্রুত পা বাড়িয়ে রুমে ঢুকে পড়ল সে।
রুমের ভেতর নরম আলো। বিছানায় আবরার গভীর ঘুমে—শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত, মুখে ক্লান্তির ছাপ। এই দৃশ্যটা দেখেই কুহেলির চোখে জল এসে গেল।
আপনাকে কিছু হতে দেবো না মনে মনে বলল সে।
কিছু না বলে চুপচাপ ঢুকরো ভাঁজ করে ড্রয়ারের ভেতর রেখে দিল। আবরারকে এখনই জাগানো যাবে না—তার ঘুম দরকার। কিন্তু কুহেলির নিজের ভেতরটা আর শান্ত নেই। দ্রুত কাপড় বদলে সে বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
ফোন বের করে নাম্বার ডায়াল করল।
রিং… রিং…
রুমের ভেতর, ঘুম ভাঙা বিরক্তি নিয়ে আবরার ফোনের শব্দে নড়েচড়ে হাত বাড়িয়ে ফোন টা হাতে নিলো।
— “এত রাতে কে আবার!”
বিরক্ত গলায় বলে ফোনটা কানে তুলল!
কুহেলি ফোনটা কানে রেখেই শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আপনার জন্য লাল রঙের একটা শার্ট রেখে আসছি। ওটাই পড়ে সাদে চলে আসুন।
এর বেশি কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দিল সে।
ওপাশে আবরার মুহূর্তে সোজা হয়ে বসল। কপাল কুঁচকে গেল—এই সময়ে, এই নির্দেশ! এতক্ষণে তার ঘুম পুরোপুরি উধাও। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে মাথার ভেতর প্রশ্নের ভিড়। তবু কুহেলির কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা অমান্য করার সাহস তার হলো না।
চুপচাপ উঠে পড়ল। কুহেলি রেখে যাওয়া লাল শার্টটা হাতে নিল। কাপড়টার উষ্ণতায় যেন কুহেলির ছোঁয়া লেগে আছে। শার্টটা পরে দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই থমকে গেল সে।
দরজার সামনে—একটা সাদা গোলাপ।
আবরার ধীরে ধীরে ফুলটা তুলে নিল। করিডোর পেরোতে পেরোতে আরেকটা, তারপর আরেকটা যেন নিঃশব্দ কোনো পথচিহ্ন। সাদা গোলাপের সারি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে উপরের দিকে। সিঁড়ির ধাপে ধাপে ফুল—হাতে নিতে নিতে এক সময় তার বুকভরা হয়ে গেল সাদা গোলাপে। অবাক হয়ে হেসে ফেলল সে; অদ্ভুত এক শান্তি বুকের ভেতর নেমে এলো।
শেষ ধাপ পেরিয়ে ছাদের দরজাটা খুলতেই বাতাস এসে মুখে লাগল। আর তখনই চোখ আটকে গেল সামনে।
ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কুহেলি। সাদা টা ডেকোরেশন করে হয়েছে অনেক সুন্দর করে।
আর কুহেলি লাল টকটকে শাড়িতে তাকে যেন অন্যরকম লাগছে—রাতের অন্ধকারের ভেতরেও উজ্জ্বল, আত্মবিশ্বাসী। বাতাসে শাড়ির আঁচল নড়ছে, খোলা চুল কাঁধ ছুঁয়ে দুলছে। চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি, অথচ গভীরে লুকানো একরাশ আবেগ।
আবরার এক মুহূর্তের জন্য কিছু বলতে ভুলে গেল। হাতে ধরা সাদা গোলাপগুলো যেন আরও সাদা হয়ে উঠল লালের পাশে।
কুহেলি ধীরে ধীরে আবরারের সামনে এসে দাঁড়াল। ছাদের ঠান্ডা বাতাসে শাড়ির আঁচলটা হালকা দুলছে, চোখে মুখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। আবরারের চোখে তখনো বিস্ময়—সাদা গোলাপের স্তূপ বুকে চেপে ধরা, লাল শার্টে সে যেন নিজেকেই চিনতে পারছে না।কুহেলি নরম গলায় বলল,
— “হ্যাপি বার্থডে, মাই ক্রিমিনাল হাসব্যান্ড।”
একটু থেমে গভীরভাবে তাকাল তার চোখে। অনেক ভালোবাসি আপনাকে। বছরের প্রথম শুরুটাই হলো আপনার সাথে—আপনার জন্মদিন দিয়ে। আমি সত্যিই কখনো ভাবিনি, এত সুন্দর করে একটা বছর শুরু করতে পারবো।তারপর হাসিটা আরও মোলায়েম হয়ে এলো।
— “লাভ ইউ সো মাচ।”
শব্দগুলো যেন বাতাসে ঝুলে রইল। আবরারের বুকের ভেতর কোথাও একটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত বছর ধরে জন্মদিন মানে ছিল ক্যালেন্ডারের আরেকটা তারিখ—কোনো উষ্ণতা নেই, কোনো অপেক্ষা নেই। কেউ কখনো তাকে এভাবে মনে করে বলেনি, তোমার জন্মদিন।
হঠাৎই আবেগ সামলাতে না পেরে সে কুহেলিকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। যেন এই মুহূর্তটা হাতছাড়া হয়ে যাবে—এই ভয়ে। কুহেলি প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরম মমতায় তার বুকের সঙ্গে নিজেকে মেলাল। আবরারের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
— “জানো, পাখি…”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
আমাকে কেউ কখনোই এভাবে উইশ করে নি। আমি এতো বেশি খুশি হয়েছি তা কখনোই তোমাকে বুঝাতে পারবো না।
আবরারের কথাটা শুনে কুহেলির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জল জমে উঠলেও সে জোর করে হাসিটা ধরে রাখল। আজ কান্নার দিন নয়—আজ ভালোবাসার দিন।
কুহেলি আলতো করে আবরারের বুক থেকে সরে এসে বলল, হয়েছে, ছাড়ুন। আজ একটা সুন্দর দিন। এভাবে কান্না করলে চলবে নাকি? তারপর আঙুল তুলে হালকা ধমকের ভঙ্গিতে যোগ করল, কেক কাটতে হবে। আপনার জন্য নিজের হাতে বানিয়েছি। আর একটু থেমে রহস্যময় হাসি হাসল সে। আর আপনাকে একটা বড় সারপ্রাইজ দেবো।
আবরার কুহেলিকে ছেড়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কুহেলির এই হাসিটা মানেই ভেতরে ভেতরে কোনো কাণ্ড লুকিয়ে আছে—এটা সে ভালোই জানে।
— “আর কি সারপ্রাইজ?”
তার কণ্ঠে কৌতূহল, চোখে শিশুর মতো উচ্ছ্বাস।
কুহেলি চোখ নামিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
— “এখনই বললে সারপ্রাইজ থাকে নাকি?”
কুহেলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
আচ্ছা আগে চলুন, কেক কাটবেন। দেখুন তো, বারোটারও বেশি বেজে গেছে।
আবরার আর কিছু বলল না। কুহেলির হাত ধরেই এগিয়ে গেল। মোমবাতির নরম আলোয় কেকটা যেন আরও সুন্দর লাগছিল। দু’জনের হাত একসাথে ছুরিতে পড়তেই কুহেলির চোখ ঝলমল করে উঠল, আর আবরারের ঠোঁটে ফুটে উঠল সেই বিরল, নিখাদ হাসিটা—যেটা খুব কম মানুষই দেখার সুযোগ পায়। কেক কাটা শেষ হতেই কুহেলি হঠাৎ করে হাতে আলস বাজি ধরিয়ে দিল।
— “এইটা ফাটান!”
আবরার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— “না, এসব আমার পছন্দ না।”
কুহেলি ঠোঁট বাঁকিয়ে শিশুসুলভ অভিমানের ভান করল।
— “প্লিজ! আজ আপনার বার্থডে!”
শেষমেশ কুহেলির চোখের অনুরোধের কাছে হার মানল আবরার। একটার পর একটা আলস বাজি ফাটল, আলো ঝলমল করে উঠল ছাদের আকাশ। কুহেলি হাততালি দিয়ে হাসছিল, আর আবরার শুধু তাকিয়ে ছিল—এই হাসিটার দিকেই, যা তার সব অন্ধকার মুহূর্তকে ঢেকে দিচ্ছে।
এরপর দু’জনে মিলে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে বসলো। ছোট্ট টেবিলে নরম আলো, বাতাসে মোমের গন্ধ। কুহেলি নিজের হাতে খাবার তুলে আবরারের মুখে দিল, আর আবরারও পাল্টা করে খাইয়ে দিল তাকে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো কথা বলারও দরকার নেই—নীরবতাটাই তখন সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
ডিনার শেষে কুহেলি দোলনায় বসতেই আবরার ধীরে এসে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ছে, হালকা বাতাসে দোলনা দুলছে। কুহেলি আবরারের লম্বা সিল্কি চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগল, যত্ন করে চুলগুলো আঙুলে পেঁচিয়ে আবার ছেড়ে দিচ্ছে।
আবরার চোখ বন্ধ করেই নরম গলায় বলল,
জানো জানো পাখি আজকে আমার জীবনের প্রথম রাত, যেখানে আমি নিজেকে স্পেশাল মনে করছি!
কুহেলি হালকা হেসে আবরারের চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল,
আপনি জানেন তো, আপনি সব সময়ই আমার কাছে স্পেশাল, আবরার। আপনি আমার সব।
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠটা একটু নরম হয়ে এলো। দোলনাটা ধীরে ধীরে দুলছিল, বাতাসে শাড়ির আঁচল নড়ছিল। কুহেলি এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
হয়তো আমাদের শুরুটা সুন্দর ছিল না। জোরাজোরি ছিল, অভিমান ছিল, রাগ ছিল তবু আজ মনে হয়—আপনি জোর করেই ভালো করেছেন।
আবরারের বন্ধ চোখের পাতায় হালকা ভাঁজ পড়ল। কুহেলি একটু দৃঢ় কন্ঠে বললো,
নয়তো আমি এমন একজন হাসব্যান্ড কোথায় পেতাম বলুন তো? যে এতটা নিজের, এতটা আলাদা!
হঠাৎ করেই কুহেলির হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি উঠল।
কখনো কখনো ভাবি যদি আপনি আমার জায়গায় অন্য কোনো মেয়েকে পছন্দ করতেন?
তাহলে সে আপনার এই সবকিছু পেত।আপনার নাম, আপনার যত্ন, আপনার শক্ত হাতের নিরাপত্তা এই মুহূর্তগুলো।
আবরার ঠোঁটের কোণে বাকা একটা হাসি টেনে নিয়ে বলল,
এই জন্যই তো বলা হয়, বেডি মানুষ দুই লাইন বুঝে—কোথা থেকে কোথায় চলে যায়, নিজেও জানে না!
কুহেলি সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে গাল ফুলিয়ে বলল,
একদম না! আপনি আবার ভুল করছেন। মস্ত বড় ভুল করেছেন!
আবরার এবার ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকার ভঙ্গি ছেড়ে সোজা হয়ে বসে পড়ল। চোখে মজা আর কৌতূহলের ঝিলিক।
আচ্ছা, শুনি। আর কী কী ভুল করছি আমি?
কুহেলি গম্ভীর মুখ করে, যেন খুব বড় কোনো মামলা তুলতে যাচ্ছে, বলল,
আমি যখন জন্ম নিয়েছি, তখন আপনি হাঁটতে পারতেন। মানে আপনি তখন অনেকটাই বড় ছিলেন। অথচ আমাকে দেখতে যাননি! এইটা কি ঠিক? এখন বলেন তো, এমন মানুষের সাথে আমার সংসার করা উচিত?
কুহেলির এই আজব যুক্তিতে আবরার এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর হঠাৎ করে হেসে উঠল—উঠল—খোলা, শব্দ করা হাসি। মাথা একটু কাত করে বলল,
আচ্ছা এখন আমার ঠিক কী রিয়্যাকশন দেওয়া উচিত?
কুহেলি গাল ফুলিয়ে, চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
জানি না! আগে বলেন তো—যাননি কেন?
এক সেকেন্ড থেমে আবার হঠাৎ সন্দেহের সুর,
এক মিনিট আপনি তখন অন্য কোনো মেয়েকে দেখতে যাননি তো?
আবরার একদম হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ কপালে তুলে বলল,
বউ! এসব কী বলছো! তখন আমি নিজেই তো ছোট ছিলাম—এইসব বুঝতাম নাকি?
কুহেলি নাক সিঁটকে, ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
কে জানে! আপনার রোমাঞ্চ আর আত্মবিশ্বাস দেখে তো মনে হয়, আপনি জন্ম থেকেই এসব শিখে এসেছেন।
কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকোতে পারল না। আবরার তার সেই হাসিটা ধরে ফেলল। ঠোঁটে বাকা একটা দুষ্টু হাসি টেনে নিয়ে বলল,
আচ্ছা আচ্ছা তাহলেই তো বুঝছি। আমার পারফরম্যান্স নাকি খুব ভালো, তাই না বউ?
কুহেলি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
— “ছিঃ! কত নির্লজ্জ কথা বলেন!”
আবরার হেসে আবার ওর কাছেই ঝুঁকে পড়ল।
তুমি যখন এমন করে গাল ফুলিয়ে কথা বলো না, তখন নিজেকে খুব সিরিয়াস ভাবলেও দেখতে কিন্তু ভীষণ কিউট লাগো।
কুহেলি হঠাৎ করেই বুঝে গেল—সে কী থেকে কী বলে ফেলেছে। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না, উঠে দৌড়ে গিয়ে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠান্ডা বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে, বুকের ভেতরটা ধকধক করছে—লজ্জা আর অদ্ভুত এক সুখের মিশ্রণে।
ওর এই অবস্থা দেখে আবরার হেসে উঠল। ধীরে ধীরে এসে কুহেলির পাশেই দাঁড়াল। কণ্ঠটা ইচ্ছে করেই একটু নরম, একটু দুষ্টু।
তা ম্যাডাম কী যেন বলছিলেন? আমাকে নাকি একটা সারপ্রাইজ দেবেন?
কুহেলি চাঁদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল। চোখে চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। সে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ করেই রাতটা ছিঁড়ে গেল..! একটা তীক্ষ্ণ শব্দ, যেন আকাশ ফেটে গেল। আবরারের মাথার পাশে ঝাঁঝালো একটা আঘাত লাগল। শরীরটা এক সেকেন্ডের জন্য শক্ত হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই বুকে পরপর গুলি এসে বিঁধল। শব্দগুলো একটার পর একটা—নির্দয়, ঠান্ডা, সিদ্ধান্ত নেওয়া। আবরারের শরীর কেঁপে উঠল। শ্বাস আটকে এলো। মাথা আর বুকের ভেতর একসাথে আগুন জ্বলে উঠল, এমন যন্ত্রণা—যেন শরীর আর মগজ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও মুহূর্তে ছিনিয়ে নিল সেই আঘাত। সে ধীরে ধীরে পেছনে হেলে পড়ল। ছাদের শক্ত মেঝেতে আছড়ে পড়ার শব্দটা কুহেলির বুকের ভেতর ভেঙে পড়ল বজ্রপাতের মতো।
— “আবরার!”
কুহেলির চিৎকারটা রাতের বাতাস কাঁপিয়ে দিল। সে দৌড়ে এসে আবরারকে শক্ত করে ধরে ফেলল। আবরারের শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে, নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। তার শাড়ি ভিজে যাচ্ছে, হাত ফসকে যাচ্ছে—সবকিছু এলোমেলো, ভয়ংকর বাস্তব।
কুহেলির হাত কাঁপছে।
না… না… চোখ খুলো… আমার দিকে তাকাও!
আবরারের চোখ আধখোলা। শ্বাস ভারী, ভাঙা ভাঙা। মুখে সেই চেনা শক্ত ভাবটা নেই—আছে কেবল ক্লান্তি আর যন্ত্রণার ছাপ। ছাদের মেঝে জুড়ে লাল ছোপ ছোপ ছড়িয়ে পড়ছে। ফেয়ারি লাইটগুলো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু আলোটা আর সুন্দর নয়—নির্মম, বিদ্রূপের মতো লাগছে। কুহেলি আবরারের বুকের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
এইটা সারপ্রাইজ ছিল না প্লিজ উঠো আজকে আপনার জন্মদিন..!
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। হাত দিয়ে আবরারের মুখ ছুঁয়ে দেখছে, যেন বিশ্বাস করতে চাইছে—এই মানুষটা এখনো তার কাছেই আছে। কিন্তু আবরারের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে।
শক্ত, অদম্য যে মানুষটা গোটা শহর কাঁপাতো—এই মুহূর্তে সে শুধু রক্তাক্ত, নিস্তেজ এক শরীর।
কুহেলির চিৎকারটা এবার আর শুধু শব্দ না ওটা যেন বুক ছিঁড়ে বের হওয়া একরাশ আর্তনাদ।
সে আবরারের নিথর বুক ঝাঁকিয়ে ধরে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
আপনি এভাবে আমার সাথে বেইমানি করতে পারেন না, আবরার! আমাদের তো সংসার করা এখনো বাকি! আপনার সাথে ফুটপাতের রাস্তায় হেঁটে চা খাওয়া বাকি! ফুচকা খাওয়া বাকি!
আপনি তো কথা দিয়েছিলেন!বলেছিলেন আমাকে ছেড়ে যাবেন না! তাহলে এখন এভাবে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন কেনো?
তার হাত দুটো আবরারের রক্তে ভিজে যাচ্ছে, তবুও সে আঁকড়ে ধরে আছে—যেন ছেড়ে দিলেই মানুষটা চিরতরে হারিয়ে যাবে। কুহেলির চোখ লাল, মুখ বিকৃত হয়ে গেছে কান্নায়। সে আবরারের বুকে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে, উঠুন! চোখ খুলুন!আপনি এমন হতে পারেন না! হঠাৎ করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার,আপনি একটা বেইমান! রক্তে ভেজা ছাদের মেঝেতে কুহেলির কান্না ছড়িয়ে পড়ে। ফেয়ারি লাইটগুলো তখনও জ্বলছে নির্লজ্জের মতো, নির্বিকার। জন্মদিনের সাজ, চাঁদের আলো, সবকিছু যেন এই মুহূর্তে এক ভয়ংকর ঠাট্টা। আবরার কোনো উত্তর দেয় না।
না রাগ, না হাসি, না শক্ত কণ্ঠ। শুধু নিঃশব্দতা।
কুহেলি বুঝে যায়—এই নীরবতাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।
সে ফিসফিস করে বলে, কণ্ঠ প্রায় নেই,
আপনি যদি চলে যান আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো, আবরার? রাতটা তখন আর রাত নেই।
ওটা একটা রক্তাক্ত সমাপ্তি—যেখানে ভালোবাসা হেরে গেছে,আর বেইমানি জিতে গেছে
চলবে....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৮
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫০(১ম+২য়+শেষাংশ)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১০
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫১(সমাপ্ত)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৩
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৮
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪১