মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৪৩
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
রাত এগারো টা…!
ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে শায়লা।দু’হাতে শক্ত করে রেলিং আঁকড়ে ধরে সে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে ঠান্ডা বাতাসে,কারও নজরে না পড়া এক নিঃশব্দ কান্না।
ডিসেম্বরের কনকনে শীত চারদিকটাকে আরও নির্দয় করে তুলেছে।আকাশে চাঁদটা আজ যেন লুকোচুরি খেলছে—ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে, ঠিক যেমন শায়লার জীবনের আলোটা হঠাৎ করেই ঢেকে গেছে অন্ধকারে।
তার গায়ে কোনো শাল নেই। ঠান্ডায় শরীর বারবার কেঁপে উঠছে।লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে,দাঁত কাঁপছে তবু সে সেদিকে একবারও খেয়াল করছে না।শীত নয়, তাকে পোড়াচ্ছে ভেতরের শূন্যতা।
মাথার ভেতর শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু কথাই।
ভাইয়া কীভাবে এসব বলতে পারে?কীভাবে ও আমাকে এতটা অবহেলা করতে পারে?
যে ভাইয়াকে সে মনে-প্রাণে ভালোবেসেছে, যার ছায়ায় নিজেকে সবসময় নিরাপদ ভেবেছে—সে কীভাবে তাকে নিজের বোঝা মনে করতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই শায়লার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে। কান্নাটা আর চাপা থাকে না। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে যায় তার হাহাকার।
ঠিক তখনই, হঠাৎ কেউ আলতো করে তার কাঁধ ছুঁয়ে দেয়।
পরক্ষণেই উষ্ণ একটা শাল এসে জড়িয়ে যায় তার শরীরের চারপাশে।
শায়লা চমকে ওঠে।
এই শীতে, এই নীরব রাতে—কে এলো তার ভাঙা মনটাকে ঢেকে দিতে?
শায়লা তাকিয়ে দেখে ফেটিক্স!
কান্নায় ভেজা কণ্ঠে শায়লা প্রশ্ন করল,
আপনি…আপনি এখানে কি করছেন এত রাতে?!
ফেটিক্স কোনো উত্তর দেওয়ার আগে একবার শায়লার দিকে ভালো করে তাকাল। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মেয়েটার মুখটা কান্না করতে করতে একেবারেই এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখ দুটো লাল,পানিতে ভিজে চকচক করছে। ঠোঁট কাঁপছে, মুখটা অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাসে লাগছে।
দৃশ্যটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
ফেটিক্স গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর স্বাভাবিক, কিন্তু নরম স্বরে বলল,
একই বাড়িতে থাকছি যখন,তখন কেউ যদি এভাবে কান্না করে…তাহলে কি আর শান্তিতে ঘুমানো যায়?
শায়লা একটু নিচের দিকে তাকাল। আঙুল দিয়ে শালের এক কোণা চেপে ধরে মিনমিন করে বলল,
কিন্তু…আপনি কিভাবে জানলেন আমি কান্না করবো?
ফেটিক্স হালকা হেসে ফেলল। সেই হাসিতে উপহাস ছিল না, ছিল একরকম বাস্তব বোঝাপড়া।
মেয়েরা আবেগী..!সে বলল,আমার জানা মতে।
একটু থেমে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার যোগ করল,আর তোমার ভাইয়া আজ যেভাবে কথা বলল…ওরকম বড় কথা শোনার পর তুমি কান্না করবে—এটা তো নিশ্চিতই ছিল।
শায়লা আর কিছু বলল না। চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এবার সেই কান্নার ভেতরে একটু হলেও ছিল—কেউ বুঝেছে, কেউ দেখেছে।
ছাদের ঠান্ডা বাতাস তখনও বইছে।
ফেটিক্স কিছুক্ষণ চুপ করে শায়লার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎই ভাঙা নীরবতার ভেতর প্রশ্নটা ছুড়ে দিল,
আচ্ছা,তোমরা মেয়েরা কান্না করে কী পাও বলো তো?তার গলায় কৌতূহল ছিল, কিন্তু কটাক্ষ নয়।
কান্না করলে কি সব সমস্যা মিটে যায়?
শায়লা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ঠোঁটের কোণে একরাশ তাচ্ছিল্য আর ব্যথা মেশানো হাসি ফুটে উঠল।চোখ দুটো তখনও ভেজা।তারপর শান্ত অথচ ভাঙা স্বরে বলল,
“নারীর সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হচ্ছে তার কান্না! কারণ,সে কান্না লুকিয়ে রাখতে পারে না!”
কথাগুলো বলেই সে নিচের দিকে তাকাল। আঙুলগুলো শালের কাপড় মুঠো করে ধরল।
আসলে সত্যি বলতে কি..!তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এলো,আমি ভাইয়াকে অনেক বেশি ভালোবাসি। খুব বেশি। হয়তো সেই জন্যই আজ এসব হচ্ছে।
শায়লার চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এবার সে মুছল না।
আমি মনে হয় কারো ভালোবাসার যোগ্য নই,
সে প্রায় ফিসফিস করে বলল।না হলে আমি যখন ভাইয়াকে এতটা ভালোবাসি আর সে আমাকে বোঝা কীভাবে মনে করে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই—এই সত্যটা প্রশ্ন করার ভঙ্গিতেই লুকিয়ে ছিল।
হঠাৎ করেই ফেটিক্স এমন একটা কাজ করে বসল যার জন্য শায়লার কোনো প্রস্তুতিই ছিল না।এক ঝটকায় সে শায়লাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।শায়লা হতভম্ব হয়ে গেল। শরীরটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে রইল।কান্নায় ভেজা চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।এতক্ষণ যে মানুষটা দূরে দাঁড়িয়ে তার কষ্ট শুনছিল, সে হঠাৎ এত কাছে এতটা কাছাকাছি! কেনো?!
ফেটিক্সের বুকের ভেতর থেকে গভীর একটানিশ্বাস বেরিয়ে এলো। কণ্ঠটা ছিল নরম, কিন্তু দৃঢ়। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
জানো,যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিনই আমার ভালো লেগেছিল।
শায়লার শ্বাস আটকে গেল।কিন্তু আমি বলতে পারিনি,।
ফেটিক্স বলতেই থাকল,
কীভাবে বলবো,কখন বলবো কিছুই বুঝতে পারিনি।তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট আন্তরিকতা।আজ এই সময়ে,যখন তুমি একদম ভেঙে পড়েছো আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে চাই, শ্যামবতী।একটু থেমে প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল,প্লিজ…আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।
শায়লার চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এই কান্নাটা আলাদা এতে ছিল বিস্ময়,ছিল অবিশ্বাস।
আমি জানি তুমি মানসিকভাবে ঠিক নেই।ফেটিক্সের গলা ভারী হয়ে এলো,অনেক বড় একটা আঘাত পেয়েছো।তারপর দৃঢ় স্বরে যোগ করল,
কিন্তু আমাকে একটা সুযোগ দাও।সে শায়লাকে আরো একটু শক্ত করে ধরে বলল,বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে অনেকভালোবাসবো।আগলে রাখবো…মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।শায়লার কাঁধের কাছে মাথা নামিয়ে ফেটিক্স শেষ কথাটা বলল,কে বলেছে তুমি ভালোবাসার যোগ্য না?তুমি রানি হওয়ার যোগ্য।নিজেকে কখনো তুচ্ছ মনে করবে না।
ছাদের ঠান্ডা বাতাস থমকে গেল যেন।
মেঘের আড়াল থেকে চাঁদটা পুরোপুরি বেরিয়ে এলো।
শায়লা তখনও কোনো উত্তর দেয়নি।
কিন্তু ফেটিক্সের বুকের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভাঙা মেয়েটা এই প্রথমবারের মতো অনুভব করল,
সে হয়তো সত্যিই বোঝা নয়।সে হয়তো সত্যিই কারো কাছে অমূল্য।
শায়লার কোনো উত্তর না পেয়ে ফেটিক্স ওকে বুকে থেকে একটু দূরে সরে মুখের দিকে তাকাল।চোখে তখন অনিশ্চয়তা, গলায় চাপা উদ্বেগ।
“শায়লা..!”
নরম স্বরে সে বলল,
আমাকে কি তুমি ফিরিয়ে দেবে?
শায়লা মাথা নিচু করে রইল। তারপর মিনমিনে গলায় বলল,
এভাবে কেউ প্রোপোজ করে?
ফেটিক্স একটু অবাক হলো।
শায়লা চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
হাঁটু গেড়ে বসে,ফুল দিয়ে প্রোপোজ করতে হয়।
আর আপনি?একটু থেমে যোগ করল,আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রোপোজ করছেন! আমি কিভাবে একসেপ্ট করবো?
এই কথাটা শুনেই ফেটিক্স সব বুঝে গেল।
শায়লা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না।এই উপলব্ধিতেই তার বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।হালকা দুষ্টুমি মিশিয়ে সে বলল,
ম্যাডাম,আমি এভাবেই প্রোপোজ করি।
হাসি চেপে রেখে যোগ করল,এখন আপনাকে এভাবেই একসেপ্ট করতে হবে।
শায়লা ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
আর যদি না করি?
ফেটিক্স চোখে-মুখে দুষ্ট হাসি এনে বলল,
তাহলে তোমার ওই দু’ঠোঁটে আমার দেখার অজস্র চিহ্ন পড়ে থাকবে।
এই কথা শুনেই শায়লা ফেটিক্সের বুকে একখানা কিল বসিয়ে দিল।
অসভ্য লোক!
রাগের ভান করে বলল,ঠিকঠাকভাবে প্রোপোজ তো করলেনই না, আবার অন্যরকম কথা ভাবছেন!গাল ফুলিয়ে যোগ করল,
কত বড় অসভ্য!
শায়লার এই রাগ-রাগ ভঙ্গিটা দেখে ফেটিক্স আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শব্দ করে হেসে উঠল সে।আর সেই হাসির মাঝেই শায়লা লজ্জা লুকোতে ফেটিক্সের বুকে মুখ গুঁজে দিল।
মিটিমিটি হাসতে লাগল সে-ও।
ছাদের শীতল বাতাস তখন আর ততটা কনকনে লাগছিল না।মেঘের আড়াল থেকে চাঁদটা যেন হাসছিল।কারণ এই রাতেই একটা ভাঙা মন,
আর একটা অপেক্ষমাণ হৃদয় একসাথে নতুন গল্পের শুরু লিখে ফেলল।
১০০৮+শব্দ
চলবে......!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৯(১ম+২য়+শেষাংশ)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৩
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৮
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৪