মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব৩০ কলমেতাসনিমতালুকদারবুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
আবরার কুহেলিকে ইউনিভার্সিটির সামনে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা আবার ধীরে ধীরে রাস্তার মোড় ঘুরিয়ে অফিসের দিকে রওনা হয়।গাড়ির রিয়ারভিউ মিররে কুহেলির ছোট্ট হাত নাড়ানোটা শেষবারের মতো দেখে আবরারের মুখে এক ঝটকা হাসি ফুটে ওঠে।
ইতোমধ্যেই সকালটা পুরোপুরি জেগে উঠেছে। ক্যাম্পাসের গাছপালার ওপর সূর্যের আলো নরম সোনালি পর্দার মতো পড়ে আছে। কুহেলি ব্যাগ কাঁধে ফেলে পরিচিত পথ ধরে হেঁটে ক্লাসরুমে ঢোকে।
ঢুকেই তার চোখ খুঁজে বেড়ায়,
শায়লা।
কিন্তু আজ যেন চারদিকে কোথাও তার চিহ্ন নেই। বেঞ্চগুলো ফাঁকা, জানালার ধারে শায়লার চিরচেনা বসার জায়গাটা অদ্ভুত নির্জন লাগছে।
কিছুক্ষণ পরে ফোনের ভাইব্রেশন।
শায়লার নাম জ্বলজ্বল করে ওঠে স্ক্রিনে।
কুহেলি তাড়াতাড়ি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শায়লার নরম কিন্তু ক্লান্ত কণ্ঠ,
আমি আজকে আসতে পারবো না, কুহেলি..!
এক মুহূর্তে কুহেলির মনটা কেমন যেন ম্লান হয়ে যায়।কুহেলি শায়লা কে জিজ্ঞাসা করে
কী আসবি না কি হয়েছে..!?
শায়লা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে,
পরে বলবো তুই ক্লাস কর রাখছি..! বলেই,
কল কেটে দেয়।
কুহেলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা ব্যাগে রেখে দেয়।
ক্লাসরুম ভরে উঠতে থাকে অন্যদের আড্ডা, হাসি, গল্পে—কিন্তু কুহেলির পাশে থাকা ফাঁকা চেয়ারের দিকে তাকালেই যেন একটা কেমন শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরে।
আজকের সকালটা তাই তার কাছে অদ্ভুত ভারী মনে হয়।চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে—
মনে মনে শুধুই ভাবে,
শায়লা ঠিক আছে তো? ও তো এমনি এমনি ইউনিভার্সিটি বাদ দেওয়া মেয়ে না..!
~~
বিকেল পাঁচটা..!
সারা শহরের বাতাসে যেন অঘোষিত উত্তেজনা জমে আছে।মন্ত্রী আকস্মিক মৃত্যুর পর ক্ষমতার চেয়ার এখন শূন্য—আর সেই শূন্যতা পূরণ করতে নামছে দুই পক্ষের দুই হেভিওয়েট নাম।বিপরীত পক্ষ থেকে দাঁড়াচ্ছেন আসিফ সাহেব,আর সাবেক মন্ত্রীর সমর্থক দল থেকে নামছেন তাঁরই ভাগ্নে রিফাত রহমান।
কিন্তু রাজনীতির এই খেলায় জয় শুধু জনপ্রিয়তায় আসে না শক্তি, ক্ষমতা, আর ছায়ার মতো ছড়িয়ে থাকা প্রভাবই আসল অস্ত্র।আর এই দুনিয়ায় আবরার এরিক খান যে কী পরিমাণ প্রভাবশালী—তা পুরো রাজধানী জানে।এত বড় মাফিয়া কিং যার এক কথায় কানাডা থেকে বাংলাদেশের রঙ বদলে যায়—তার কাছে আসিফের যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আবরারের অফিস ভবনের বিশাল মিটিং রুমে এখন দু’জন মুখোমুখি বসে আছে।রুমের ভেতর হালকা নীল আলো, কাঁচের দেয়ালে শহরের ব্যস্ততার প্রতিফলন। লম্বা টেবিলের অপর পাশে বসে আছে আসিফ—চোখে স্পষ্ট টেনশন। আর টেবিলের এই পাশে বসে আবরার, শান্ত, স্থির, ভয়ংকরভাবে নির্লিপ্ত। হাতে দামী ঘড়ির স্ট্র্যাপ নিয়ে খেলা করছে,যেন সব ঘটনার ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আছে তার।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর আসিফ ধীরে বলে উঠলো,
স্যার দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আমি একা এই নির্বাচন জিততে পারবো না যদি আপনি পাশে না থাকেন।
তার কণ্ঠে অনুনয়, চোখে উদ্বেগ—মনে হচ্ছে যেন আবরারের অনুমতি মানেই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
আবরার মাথা একটু কাত করে লাল টকটকে চোখের মনি দিয়ে তীক্ষ্ণ ভাবে আসিফের দিকে তাকালো।চোখে কোনো অনুভূতি নেই—না সমর্থন, না বিরক্তি। তারপরও সেই দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ যে আসিফ অনিচ্ছায় গিয়ে পিঠ সোজা করে বসলো।
তারপর আবরার টেবিলে আঙুল ঠুকঠুক করতে করতে খুব শান্ত গলায় বললেন,
সাহায্য করব তবে কারণসহ।
আসিফ চোখ তুলে তাকালেন।
আবরারের কণ্ঠে এবার চাপা আগুনের কঠোরতা মিশিয়ে বলতে লাগলো,
রিফাতকে আমি আগে থেকেই সরিয়ে দিতে পারতাম। কারণ ঐ কুত্তার বাচ্চা যেভাবে আমার লোকেদের ওপর হামলা চালিয়েছে তার হিসাব আগে মেটাতে হবে।শাস্তিটা সে অনুভব করুক, তারপরই আসল খেলা। আপনি চিন্তা করবেন না জয় আপনার দিকেই যাবে।
আসিফ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, কিন্তু আবরারের চোখে তখনও ঝড় থামেনি। তিনি ঠান্ডা সুরে যোগ করলেন,
কুত্তার বাচ্চা কে আমি বুঝিয়ে দেবো, কার লোককের গায়ে হাত দেওয়া যায় আর যায় না। কেউ যদি আমার মানুষের ক্ষতি করে—ওটা আমার কাছে ব্যক্তিগত হয়ে যায়।
আবরারের গলায় হুমকি ছিল না বরং এমন এক নিশ্চুপ সত্য যা শুনে শিউরে উঠতে হয়।
কথা শেষ হতেই আসিফ যেন দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলেন। মুখে স্বস্তির হাসি নিয়ে বললেন,
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার সত্যি অনেক।
এরপর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তা,এবং ভোট কৌশল নিয়ে আরও কিছু আলোচনা করলেন দু’জনে।সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা ছ’টায় আসিফ বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
তার চলে যাওয়ার পর আবরার ধীর পায়ে নিজের কেবিনে ফিরল। দরজা বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল একদিকে রাজনীতির উত্তাপ, অন্যদিকে নিজের ব্যস্ত সাম্রাজ্য। একটু রেস্ট নিতেই হবে।
চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করতেই রুমের নীরবতা তাকে ছুঁয়ে গেল।
~~
প্রায় বিশ মিনিট কেটে গেছে। আবরার চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমন সময় কেবিনের দরজায় হালকা টোকা,
ঠক ঠক
আবরার চোখ না খুলেই গম্ভীর স্বরে বললো,
— Come in.
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো শায়লা আর ফেটিক্স। দু’জনকে দেখে আবরার ধীরে ধীরে চোখ খুললো। শায়লার মুখে খানিক টা টেনশন,পাশে ফেটিক্স সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আবরার শায়লাকে চেয়ারে বসতে ইশারা করলো। শায়লা শান্তভাবে বসে পড়তেই আবরার গভীর, গাম্ভীর্যে ভরা কণ্ঠে বলল,
আমি তোমাকে এসবের ভেতরে আনতে চাইনি, শায়লা। কিন্তু তোমার ভাইকে আমি কয়েক দিনের মধ্যেই দরকার। ওর সাথে কিছু কথা আছে আমার।
শায়লা মাথা নেড়ে দৃঢ়ভাবে বললো,
সমস্যা নেই ভাইয়া।আপনি যা করছেন ঠিকই করছেন।আমি এখনই ভাইয়াকে ফোন করছি।
তারপর শায়লা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো। কাঁপা আঙুলে ফাহিমের নাম্বারে ডায়াল করলো। দুইবার তিনবার রিং হওয়ার পর অবশেষে ফোনটা রিসিভ হলো।
ফাহিমের কণ্ঠ শোনা মাত্র শায়লার বুকের ভেতর ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল।
ফোনটা শায়লার কাঁপা হাতে কাঁপছিল। নিজের জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর যতটা শান্ত গলায় পারলো, বলল,
ভাইয়া তুমি এখন কোথায়?
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ফাহিমের কণ্ঠ ভেসে এল,
হঠাৎ দেশের বাইরে একটা কাজ পড়েছে। এখনই বেরিয়ে যাচ্ছি।
শায়লার বুকটা ধক করে নেমে গেল।
কিন্তু ভাইয়া মা অসুস্থ তোমাকে দেখতে চাইছে। একবার আসবে প্লিজ,তারপর গিয়ে কাজ করবে।
ফাহিমের কণ্ঠ এবার আরও ঠান্ডা।
না বোন, পরে আসবো। তুই মায়ের খেয়াল রাখ।
এতটা নির্মম অস্বীকারে শায়লা বুঝে গেল ভাইটা ইচ্ছে করেই পালাচ্ছে। তার চোখে হতাশা ফুটে উঠলো, হাতের ফোনটাও কেঁপে উঠলো।
সামনে বসে থাকা আবরার সব শুনছিল। তার চোখ রাগে লাল হয়ে উঠলো।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে শায়লার হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিলো।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই মনে হলো কেবিনের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেছে।
আবরারের গম্ভীর, গভীর, কাঁপন ধরানো কণ্ঠে ফোনের ওপাশে ছুঁড়ে দিলো,
পেছন থেকে ছুরি মারার এত সাহস কোথায় পেলি, ফাহিম?
কেবিনের দেয়াল কেঁপে উঠলো যেন। ফেটিক্স নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো।
আবরার এবার আরও নিচু, কিন্তু শীতল কণ্ঠে বলল,
সাহস থাকলে সামনে আয়। পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেনো..?!
হঠাৎ ফাহিম ফোনের ঐপাশে থেকে উচ্চস্বরে হেসে ওঠা শব্দ যেন ফোনের স্পিকারের ভেতর থেকেই কেবিনের বাতাসটা আরও ভারি করে তোলে। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষ আবরারের কানে কাঁটার মতো বিঁধছিল।
ফাহিম ঠান্ডা, আত্মতুষ্ট কণ্ঠে বলল,
বেচারা আবরার, এত রাগ কিসের?আর কয়দিন পর কুহেলি তো আমারই হবে। তখন তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি চাপ নিস না, আমাদের বিয়েতে তোকে দাওয়াতও দেবো।
শায়লার হাত শিউরে ওঠে তার ভাই সত্যি এসব বলছে ওর বিশ্বাস হচ্ছে না।
আবরারের রাগ হলেও তার গভীর, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে বলে,
কবি হাগেন্দ্রনাথ থাকুর বলেছে:
যে তোমার পিছনে থাকবে সে তোমার পাদের গন্ধই শুকবে কখনো সে তোমার সামনের কিছু ছিঁড়তে পারবে না আর তুমি এমন কেজি কেজি হাগবে যে, যেনো সে গুর তলে পড়ে আর মাথা উঁচু করতে পারে না..!
তাই আমি ভাবছি আমি আরো বেশি করে পটি করবো যাতে তুই মাথা তুলতে না পারিস।
আবরারের কথা শুনে ফাহিম ফুঁসে উঠে বলে, শালা আমি আজকেই দেশে আসছি তারপর কে কার পাদের গন্ধ নেয় দেখা যাবে। বলেই ফোন কেটে দেয়।
শায়লা আর ফেটিক্স অবাক মানে এই কথাই কেউ আসে নাকি..?!
কেবিনটা তখন থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে। ঠিক সেই সময় আবরারের টেবিলের উপরে রাখা ফোনটা হঠাৎ তীব্র কম্পনে কেঁপে উঠল।আবরার একবার বিরক্ত মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকাল বাড়ির মেইডদের প্রধান নিলুফা কল করছে।
আসলেই বাড়িতে প্রায় একশত মতো মেইড আছে তাই তাদের কে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এক জন হেড দরকার ছিলো নিলুফা বুদ্ধিমতী তাই আবরার ওকে হেড করে দিছে।
ফোন ধরতেই আবরারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
হ্যাঁ নিলুফা, বলো। কোনো সমস্যা?
ওপাশে নিলুফার গলা কাঁপছে,
স্যার ম্যাডাম আজকে ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরেননি। আমরা ভেবেছিলাম আপনার কাছেই আছেন। তাই রান্না কি রাখবো আপনাদের জন্য.?!
এক মুহূর্তে আবরারের শরীর শক্ত হয়ে গেল।
তারপর,
কি বললে? পাখি বাড়ি যায়নি? এখন জানাচ্ছো?!
আবরারের বজ্রকন্ঠে পুরো কেবিনই যেন কেঁপে উঠল। ফেটিক্স এবং শায়লা দু’জনেই চমকে গেল। নিলুফা আর কিছু বলতে পারল না তার আগেই আবরার ফোন কেটে দিলো,
এরপর আর এক সেকেন্ড দেরি করল না আবরার। কাগজপত্র, ল্যাপটপ, টেবিল সব কিছু উপেক্ষা করে ঝড়ের বেগে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। দরজা খুলে এমনভাবে বেরোল যেন দেয়াল ভেদ করে চলে যাবে। চোখে রক্তিম আতঙ্ক, নিশ্বাস ভারী
কুহেলি নেই!
ফেটিক্স প্রথমে হতভম্ব হলেও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে উঠল,বস! আমি আসছি!
শায়লাও একই মুহূর্তে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল,
ভাইয়া, ওয়েট করুন!
কিন্তু আবরার তখন কারো কথা শোনার অবস্থায় নেই। গমগমে করিডোর পার হয়ে আবরার দৌড়ে লিফটের দিকে ছুটছে। ফেটিক্স আর শায়লা দু’জন মিলে তার পেছনে দৌড়ে চলেছে,
তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুধু একটাই আতঙ্ক বারবার বাজছে,
"পাখি কোথায়..!?"
চলবে....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫০(১ম+২য়+শেষাংশ)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪