তুষারিণী —— ৪
সানজিদাআক্তারমুন্নী
নূশা রুমে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে সোফায় বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে ইথান। টি-টেবিলের ওপর একটি কন্ট্রাক্ট পেপার রাখা। নূশাকে মূলত এই কন্ট্রাক্টের জন্যই ইথান এতটা তাড়া দিয়ে রুমে নিয়ে এসেছে।
ইথান ইশারা করে নূশাকে পেপারটা হাতে নিয়ে দেখতে বলে। নূশা তীক্ষ্ণ চোখে ইথানের দিকে তাকাতে তাকাতে পেপারটা হাতে নেয়। পেপারে চোখ বুলাতেই তার চোখ কপালে উঠে যায়! এমা, এটা কী? এতো একটা ম্যারেজ কন্ট্রাক্ট পেপার! যেখানে লেখা হয়েছে ইথান আর নূশা ছয় মাসের জন্য স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকবে। এটা দেখে নূশা কিছুই বুঝতে পারে না। সে পেপারটা টেবিলের ওপর রেখে বলে, “এটা কী? এসব কী?”
ইথান তার স্বভাবগত ভঙ্গিতে ঠোঁটে একটা স্মার্ক ফুটিয়ে নূশার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় আর বলে, “বোঝোনি?”
নূশা উত্তর দেয়, “বোঝার মতো হলে বুঝতাম!”
এটা শুনে ইথান বাঁকা হেসে বলে, “মুরগির ব্রেন নিয়ে চলো তো, তাই বুঝবে না। আচ্ছা বলছি শোনো। তুমি আর আমি আমরা তো এক পথের পথিক নই, তাই আমাদের জীবনও একসঙ্গে কাটবে না। এই সম্পর্কের ইতি নিশ্চিত হবেই। তাই আমি চাই তুমি আমার সাথে ছয় মাস স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকো। দ্যান আমি তোমায় ডিভোর্স দিয়ে দেব। ডিভোর্সের বিনিময়ে আমি তোমায় একটা ভিলা দেব, তোমার ফ্যামিলিকে এখানে আনার ব্যবস্থা করে দেব, লিগ্যাল স্ট্যাটাস দেব, রেস্টুরেন্ট দেব, শপ দেব। হবে এতে?”
নূশা এগুলো শুনে স্থবির হয়ে হাতে থাকা পেপারের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী সুন্দর অফার! ইথান বিয়েকে মনে হয় খেলনাই মনে করে। তবে এটা নূশার জন্য একটা ভালো সুযোগ বটে। ইথানের সাথে তো তার বনবে না, ডিভোর্স নিতেই হবে। এভাবে যদি সেটা হয়, ক্ষতি কী? লোভ করবে এটুকুর? করবে লোভ? করে নিক! এতে তো তার পরিবার একটা ভালো জীবন পাবে।
নূশা পেপারে দেখে আরও শর্ত আছে। সেখানে লেখা তাদের দুজন ছাড়া এ সম্পর্কের আসল সত্য কেউ জানবে না। নূশা ছয় মাসের ভেতর এটা ভাঙতে পারবে না। নূশা ইথানের জীবনে ইন্টারফেয়ার করবে না, ইথানও করবে না। কিন্তু কিন্তু ইথানের কাছে নূশাকে আসতে হবে, যখন সে ডাকবে তখন।
ইথান নূশাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে, “তুমি চাইলে তোমার মতো শর্ত অ্যাড করতে পারো, তবে আমারগুলো অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। আর কন্ট্রাক্ট না মানলে ডিরেক্ট দেশে পাঠিয়ে দেব কিন্তু।” নূশা ইথানের দিকে পেপারটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “আমি মেনে নিলাম। কিন্তু শর্ত আছে।”
”কী শর্ত?”
”আপনি দিনের বেলা আমার কাছে আসতে পারবেন না। রাতে যা ইচ্ছে করতে পারবেন। রাজি শর্তে?”
ইথান পেপারটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আর হাসতে হাসতে বলে, “চাহিদা তো রাতেই জাগে, তাই মেনে নিলাম।”
নূশা ইথানের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, “আপনার কাছে কি সত্যি এই চাহিদাটাই সব? এত নিষ্ঠুর কেন আপনি?”
ইথান মুচকি হেসে নূশার দিকে পেপার আর কলম এগিয়ে দিতে দিতে বলে, “তিতা হলেও খাঁটি কথা হলো এই পৃথিবীতে শারীরিক চাহিদার চেয়ে বড় কোনো চাহিদা নেই।”
এটা বলে নূশার হাতে কলম ধরিয়ে দিয়ে সে বলে, “নাও, সাইন করো।”
নূশার হাত কাঁপছে এমন করতে, কিন্তু করতেই তো হবে। তাই দ্বিধা কাটিয়ে সাইনটা সেরে নেয়। সাইন শেষ করে ইথানের সেই বিষাক্ত কথার উত্তর দেয়, “যারা আপনার মতো ইমোশনলেস, যারা আপনার মতো রোবট তাদের কাছেই এমন।”
কথাটা বলে ইথানের দিকে পেপারটা এগিয়ে দেয়। ইথান সেটা নিতে নিতে কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়ে, ঠিক তার আগেই এজার তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, “আসতে পারি? নূশা, একটা প্রয়োজন ছিল আমার।”
নূশা এজারের আওয়াজ শুনে পিছন ফিরে তার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “জি ভাইয়া, বলুন?”
এজারের চালচলন বেশ বিশৃঙ্খল, কিন্তু গত পাঁচ মাসে সে নূশাকে কখনোই কোনো ধরনের অসম্মান করেনি। এজার দরজায় দাঁড়িয়েই বলে, “একটু এদিকে আসো না, প্রয়োজন ছিল।”
নূশা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “আচ্ছা।”
এ কথা বলে যেই না নূশা এজারের দিকে এগোতে যাবে, তার আগেই ইথান হাতের পেপারটা রেখে তার হাত টেনে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। এজারের সামনেই এক হাতে নূশার কোমর চেপে ধরে, অন্য হাতে এজারকে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করে। এজার যায় না, সেও দাঁড়িয়ে থাকে।
নূশা ইথানকে নিজের কাছ থেকে সরাতে পারছে না। পুরুষের শক্তির কাছে তার মতো ছিপছিপে গড়নের কেউ পারবেও না। তারপরেও অনেক ধস্তাধস্তি করে নূশা ইথানের থেকে মুখ ছাড়ায়। ইথান যেন আঠার মতো লেগে আছে। নূশা ইথানকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আপনার সমস্যা কী? ইতা কিতা? আপনার ছোট ভাইয়ের সামনে এসব কী করছেন?”
ইথান নূশার চুলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলে, “তোমার আমার থেকে ওর এক্সপেরিয়েন্স আছে বেশি।”
এটা বলে ইথান নূশার চুলের এক গুচ্ছ খাবলে ধরে এবং নিজের বাঁ পাজরে নূশার মুখ চেপে ধরে। তার অ্যামিথিস্ট বরণ চোখে বজ্রকঠিন কঠোরতা নিয়ে এজারের দিকে তাকিয়ে বলে, “এজার, তুই এখন এখান থেকে যা। আমি ওর সাথে ইন্টিমেট হবো। পরে কথা বলিস। না গেলেও প্রবলেম নেই, তোর সামনেই কন্টিনিউ করব।”
এটা শুনে নূশার কানে মনে হয় কেউ গরম লাভা ঢেলে দিয়েছে। এজার আর কিছু বলে না, চুপচাপ বেরিয়ে যায়।
নূশা ইথানকে ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে বলে, “আপনি এমন করছেন কেন? আপনি আপনার ভাইকে এসব কী বলছেন? ইন্টিমেট এটা ডিরেক্ট বলার কী? আর আমি আপনার কাছে আসব নাকি এখন? কী কন্ট্রাক্ট হয়েছে ভুলে গেছেন?”
ইথান নূশাকে এক টানে সোফায় ছুড়ে মারে। তারপর নিজে তার ওপর ঝুঁকে গিয়ে বলে, “ইন্টিমেট হই বা না হই, আমি সোজাসাপ্টা উত্তর পছন্দ করি। আর কন্ট্রাক্টটা মনেই আছে, রাতে তেল বের করব। এখন যা উড়তে পারো উড়ে নাও।”
এটা বলেই ইথান নূশার কাছ থেকে সরে যায়। সে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নূশা উঠে বসে, তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এই ছয় মাস কী করে করবে এই উন্মাদের সংসার? কী করে মানিয়ে নেবে? ইথান নূশার সাথে রাতে কী যে করবে, আল্লাহই ভালো জানেন। এই ডিলে রাজি না হয়েও উপায় নেই। এত বড় একটা সুযোগ, পরিবারকে আনতে পারবে! একটু কষ্ট করে নিক, নিজেকে স্যাক্রিফাইস করে হলেও পরিবার খুশি থাকুক। বড় মেয়ে সে, দায়িত্ব তো তারই সব।
ইথান একটি চার্চের কবরস্থানে এসেছে। সে মুসলিম হয়েও এসেছে চার্চে, কারো একজনকে দেখতে। ইথান ‘এলিসন’ নামের একটি কবরের সামনে একটা ফুল রেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তৃষ্ণার্ত চোখে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ইথান ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করে, “বয়স যখন ঠিক একুশ, তখন তোমার প্রেমে পড়লাম। দেখো, এক যুগ পার হতে চলল, আমি সেই আগের মতোই তোমাতে বিমোহিত রইলাম। জানো, আমি আর মানুষ নেই। আমি একটা পশু হয়ে গেছি। তুমি চলে গেলে, সাথে আমার ইমোশনও নিয়ে গেলে। জানো, আমার যে মেয়েটার সাথে বিয়ে হয়েছে, তাকে আমি টর্চার করি অতিরিক্ত টর্চার করি। ওই ওরা তোমাকে যেমন টর্চার করত, আমিও কিছুটা তেমনি করি। জানো, আমি না পশু হয়ে গেছি। আস্ত একটা পশু! ওর কষ্ট হয়, সে আমার কাছ থেকে ছুটতে প্রাণ পর্যন্ত ভিক্ষা চায়, কিন্তু আমি ছাড়ি না। ওর চিৎকারগুলো আমার কাছে অমৃতের মতো শোনায়।”
এতটুকু বলে ইথান হাঁসফাঁস করতে করতে শ্বাস ছেড়ে চারদিকে তাকায় আর বলে, “তুমি কি রাগ করছ? তুমি জেলাস? অন্য মেয়েকে নিয়ে বলছি। আচ্ছা আর বলব না, ঠিক আছে? এত কথা বলি, একটাবার উত্তর দিলে না? এত পাষাণ কেন তুমি?”
ইথান অনেকক্ষণ মৃত এলিসনের কবরের সাথে বকবক করে চার্চ থেকে বেরিয়ে আসে। বেরোতেই তার ম্যানেজার লিওনার্ড দ্রুত এসে বলে, “স্যার, প্রেস মিটিং শুরু হয়ে গেছে। চলুন!”
ইথান গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে, “তাড়াতাড়ি চলো, আমার আবার আজ রাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে।”
”ওকে স্যার।”
রাত এগারোটা।
নূশা সোফায় শুয়ে আছে, গায়ে ব্লাংকেট জড়ানো। কান্নায় তার চোখের পানি আর নাকের পানি এক হয়ে গেছে। জ্বরের কবলে পড়ে শুভ্র মুখটা লালবর্ণ ধারণ করেছে। আজ রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল, কিন্তু এমন জ্বর উঠেছে যে জ্বরের তীব্রতায় নূশা মহাবিশ্ব ভুলতে বসেছিল। তার অবস্থা দেখে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার তাকে বিকেলের দিকেই ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। নূশা বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে সোফায় ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কারণ ইথানের বেডে সে এমনি শুতে পারবে না, শুধু ইথানের প্রয়োজন হলেই সেখানে যাওয়ার অনুমতি আছে।ঘুম ভাঙতেই এক মগ কফি আর এশার নামাজ নিত্যকার এইটুকু কাজ শেষ করতেই নূশার যেন জান বেরিয়ে গেল। শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে, অসম্ভব রকমের খারাপ। ইথানের পৈশাচিক অত্যাচারে মাত্র একদিনেই সে যেনো একেবারে নুইয়ে পড়েছে। ক্লান্ত দেহটা তাই আবারও এলিয়ে দিল বিছানায়।
ভাবনার এই ঘোর কাটতে না কাটতেই ঘরে প্রবেশ করে ইথান। নূশা বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। কি মারাত্মক সুন্দর এই পুরুষ! পরনে তার স্টুয়ার্ট হিউজ ডায়মন্ড এডিশনের কালো স্যুট, পায়ে এক জোড়া চকচকে লুই ভিতোর জুতো। হাতে শোভা পাচ্ছে পাবলো রায়েজের ঘড়ি, আর ডান হাতের অনামিকা আঙুলে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে আছে ‘কিং উইল’ টাংস্টেন কার্বাইড রিং। সুগঠিত দেহের সাথে মানানসই তার ওয়েভি কার্টেন কাট চুলগুলো, যা কপালে সামান্য এলোমেলো হয়ে আছে। তার চোখের মণি এক টুকরো নিখাদ অ্যামিথিস্ট মনে হয় সদ্য ফোটা অপরাজিতা ফুলের নীল রঙ গুলিয়ে কেউ নিপুণ হাতে তার চোখে এঁকে দিয়েছে। ফর্সা চেহারায় দাড়ির লেশমাত্র নেই, একদম ক্লিন শেভড। ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি, আর গা থেকে ভেসে আসছে রোজা পারফিউমের তীব্র মাদকতাময় ঘ্রাণ।
নূশা তার থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। যে মানুষটা তাকে পশুর মতো ট্রিট করে, তার দিকে তাকানোর কোনো মানে নেই। নূশার নাক-মুখ লাল দেখে ইথান ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “মিস সিলেটি, কী হলো তোমার? কালকের ডোজগুলো হজম করতে পারোনি? উফস, জ্বর উঠে গেছে তাই না?”
নূশার গায়ের চামড়া জ্বলে যায় এসব শুনে। দাঁত চেপে নূশা উত্তর দেয়, “নির্লজ্জের মতো বলবেন না। আমি না দিলেও আমার হাড়-হাড্ডি আপনাকে বদদোয়া দেবে।”
ইথান কোট খুলতে খুলতে বলে, “সে তুমি নিজেই দাও, কারো বদদোয়ায় আমার কিছু যায় আসে না।”
এটা বলে ইথান নূশার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে। নূশা এটা দেখে আঁতকে উঠে বলে, “আজ আমি অসুস্থ… থাক না প্লিজ, থাক না!”
ইথান নূশার সামনে গিয়ে তার ওপর থেকে ব্লাংকেট সরিয়ে নিতে নিতে বলে, “ডিল হয়েছিল রাতে তুমি আমার। এখন প্লিজ-ক্লিজ বলে কোনো কাজ হবে না। চলো বেডে, কয়েক ম্যাচ শেষ করি। সকালে তো অনেক উড়ছিলে, ডানাটা কাটি।”
এটা বলে নূশাকে ইথান বেডে নিয়ে আসে। নূশা রাগে ও কষ্টে চিৎকার করে ওঠে, “সমস্যা কী আপনার? আমি পারব না আজ, সরুন আমার কাছ থেকে!”
এটা বলে নূশা নামতে যায়, কিন্তু তার আগেই ইথান তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। তার দুই হাত নিজের এক হাত দিয়ে বেডে চেপে ধরে বলে, “রাতে তুমি আমার সেটা তুমি নিজেই বলেছ।”
এটা বলে ইথান নূশার গলায় ও ঠোঁটে এলোপাতাড়ি চুমু খেতে শুরু করে। নূশা কান্না করেও হেরে যায়। এই তীব্র জ্বরের মধ্যেও ইথান নূশাকে ছাড়ে না। নূশা বেশি চিল্লালে ইথান তার গাল বা ঠোঁট কামড়ে ধরে। নূশা ইথানের কাছ থেকে নিজেকে সরাতে না পেরে শান্ত হয়ে যায়, নীরবে অশ্রু ঝরাতে শুরু করে আর বলতে থাকে, “এখন তো ছেড়ে দিন… জ্বর এসেছে।
” নো ছাড়াছাড়ি সিলেটি সুইটহার্ট! “
চলবে……
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE