ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
২৩
রাত তিনটা দশ। নিস্তব্ধ আধার নগরীতে বেশ উত্তেজনা। চারপাশে হৈচৈ আর কলঙ্কের দাগ। সম্মানিত চেহারার মানুষগুলো অসম্মতিতে মাথা নুইয়ে বসে থানা ওসির সামনে। তনিমার বাবা জাবেদ শেখ, মা হাফেজা, বড় ভাই তুহিন—সকলেই থানায় অপমানিত আর কলঙ্কে মাথা নুইয়ে বসে। তুহিনের বউ আসেনি, সে বাড়িতে সন্তানকে নিয়ে। রাফিন ঢাকার বাইরে হওয়ায় সেও নেই। জাবেদের পাশাপাশি আরও তিনটা মানুষ উপস্থিত। মারিদের বাবা সৈয়দ মাহবুব আলম, ছোট চাচা সৈয়দ মকবুল আলম আর রিফাতের বাবা মোশাররফ খন্দকার—সকলেই ভিড় জমিয়ে বসে উত্তরা থানায়।
আসামির কাঠগড়ায় রিফাত আর তনিমা দাঁড়িয়ে। দুজনের মাত্রই বিয়ে শেষ হলো। মসজিদের একজন মৌলবি বিয়ে পরিয়েছেন। কাবিন দেওয়া হয়েছে বিশ লাখ। তনিমা কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। রিফাত অতিরিক্ত রাগে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষছে বারবার। চঞ্চল রিফাতের চোখে এই মূহুর্তে যেন অগ্নি লাভা ঝরছে। সেই অগ্নিতে রিফাত পারছে না থানার সবকিছু লন্ডভন্ড আর তছনচ করে দিতে। সবচেয়ে বেশি রাগ রিফাতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তনিমার ওপর হচ্ছে। এই মেয়ের জন্য রিফাতের জীবনে প্রথমবার এত অসম্মতি আর অপমান সইতে হয়েছে। রিফাতের সুন্দর ক্যারিয়ারও নষ্টের পথে। সে একজন মেডিকেল ডাক্তার হয়ে নিজের ছাত্রীকে নিয়ে অনৈতিক কাজে ধরা পড়েছে। আর এজন্য পুলিশ রিফাত ও তনিমাকে থানায় আটকে দুজনের পরিবার ডেকে এই মধ্যরাতে বিয়ে দিয়েছে।
রিফাত এতবার করে বলেছে সে তার ছাত্রীর সঙ্গে কিছু করেনি, কোনো অনৈতিক কাজে জড়ায়নি, মেয়েটার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কও নেই। অন্য কারও কথায় সে তনিমা মেয়েটার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। অথচ তনিমা পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে ভিন্ন। তনিমা বলেছে রিফাতের সঙ্গে নাকি তার একবছর আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল, আর আজকে দুজনের প্রথম সাক্ষাৎকার ছিল। সেখান থেকে পুলিশ ভুল বুঝে দুজনকে বেআইনি কাজের জন্য থানায় ধরে এনেছে। রিফাত ও তনিমার দুই রকম জবানবন্দি হওয়ায় পুলিশ ভাবছে দুজন ধরা পড়ে মিথ্যা বলছে। রিফাত বলছে মেয়েটি তার ছাত্রী, প্রেমের সম্পর্ক নেই। আর তনিমা বলছে রিফাতের সঙ্গে চার মাস ধরে প্রেম ছিল। যখন প্রেমের সম্পর্ক ছিল তখন তনিমা জানত না রিফাত তার স্যার হয়। আজকে প্রথমবার দেখায় শিওর হয়েছে রিফাত তার স্যার হয়। তনিমার মা হাফেজা মেয়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অস্থির। যুবক-যুবতী ছেলেমেয়েরা বেআইনি কাজে আটক হলে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের পরিবার ডেকে, থানায় বিয়ে দেওয়ার যে প্রচলন আছে, তা প্রায়শই দেখা যায়।
রিফাত কাবিননামায় সই করেই রেগেমেগে বেরিয়ে যায় থানা থেকে। পেছন থেকে তনিমার হু হু কান্নার শব্দ শোনা যায়। রিফাতের ছোট মামা মকবুল বারবার রিফাতকে পেছন থেকে ডাকছেন না যেতে। রিফাত সবাইকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে যায়। থমথমে পরিবেশে মারিদের বাবা সৈয়দ মাহবুব আলম জাবেদ শেখের দিকে তাকালেন। জাবেদ মাথা নুইয়ে গম্ভীর মুখে বসে। থানায় আসার পর থেকে তেমন কিছু বলতে শোনা যায়নি উনাকে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দুই-তিনবার চোখের পানি মুছে এখন গম্ভীর মুখে চুপচাপ বসে আছেন। মাহবুব জাবেদের মনের অবস্থা বুঝে বললেন—
‘বাবা হিসেবে আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি জাবেদ সাহেব। আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছি না তবে এতটুকু বলতে পারি, আপনার মেয়ের অমর্যাদা আমার ভাগ্নের ঘরে হবে না। বিয়েটা যেভাবেই হয়ে থাকুক আমরা আমাদের ভাগ্নের বউকে সসম্মানে ঘরে তুলব ইনশাআল্লাহ। মন ছোট করবেন না জাবেদ সাহেব। আপনারা এখন বাসায় যান, রেস্ট নিন। কাল সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি থেকে লোকজন যাবে আপনার মেয়েকে দেখতে। সময় নিয়ে দুই পরিবার আলোচনা করে নাহয় একটা আনুষ্ঠানিক বিয়ের তারিখ ঠিক করলাম।
হাফেজা কালো বোরকা আর নেকাব পরে ছিলেন। তিনি নত মাথা উঁচিয়ে তাকালেন মাহবুব আলমের কথায়। রিফাতের বাবা জাবেদ শেখও সম্মতি দিলেন তাতে। তুহিন তনিমার পাশে দাঁড়িয়ে। বয়স্ক জাবেদের নত মাথা আরও নত হয়ে গেল। তিনি খুব কষ্টে ভেজা গলায় আওড়ালেন—
‘আপনাদের যা ভালো মনে হয় সেটাই করুন। আমার কোনো কিছুতে আপত্তি নেই।
জাবেদের হার্টে ৭৫% ব্লক। দুবার হার্ট অ্যাটাক করেছেন। এই অবস্থায় উনার আদুরে মেয়েকে মধ্যরাতে কলেজের টিচারের সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুলিশ ধরেছে—এই বদনামটা উনি সহজভাবে নিতে পারছেন না, সেটা উনার ভারী গলা আর অসুস্থ ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে। হাফেজা ভয় পাচ্ছেন জাবেদ মেয়ের শোকে আবার না হার্ট অ্যাটাক করে বসেন। তিনি একদিকে মেয়ে, অন্যদিকে স্বামীর—চিন্তায় দিশেহারা। থানায় হাউমাউ করে চিৎকার করতে পারছেন না, নয়তো এই মুহূর্তে চিৎকার করে কাঁদতেন তিনি। তনিমার খবরে এই নিয়ে দুবার হাফেজা অজ্ঞান হয়েছেন। একবার থানা থেকে কল পাওয়ার সাথে সাথে, অন্যবার যখন সবাই মিলে ঠিক করল থানায় তনিমা আর রিফাতের বিয়ে পড়ানো হবে তখন।
রিফাত থানা থেকে বেরিয়ে গাড়ির ইঞ্জিনের বোনটের ওপর রাগে গর্জনের সাথে সাথে ঘুষি বসাল। মারিদের নাম চিৎকার করে ডাকল গলা ফাটিয়ে—
‘মারিদ! মারিদ! কি করেছিস এটা তুই? শিট! শিট! শিট!
হাতের উল্টো পিঠের চামড়া ছিঁড়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুলো। রিফাত পকেট থেকে দ্রুত হাতে ফোন বের করে ফের মারিদকে কল করল। বরাবরই মতোই মারিদের নম্বরটা বন্ধ পেল। রাত দশটা থেকে মারিদ ফোন বন্ধ করে রেখেছে। রিফাত রাগে হাতের ফোনটা আছাড় মারল। মুহূর্তে ফোনের পার্টস এদিক-সেদিক ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল। রিফাত দুহাতে নিজের চুল টেনে চিৎকার করে বলল—
‘মারিদ কেন করলি এটা তুই? কেন? আআআ!
হিংস্র রিফাত রেগেমেগে গাড়ি ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল কোথাও। কোথায় গেছে কারও জানা নেই। রিফাত এই রাতে বাড়িতেও যায়নি। রিফাতের মা শান্ত ছেলের বিয়ের খবর শুনে হাহাকার করে কাঁদছেন আবার বারবার অজ্ঞানও হচ্ছেন। ওদিকে মারিদ, রাদিল, হাসিব কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না কেউ। আজ মারিদের ঢাকা ফিরে আসার কথা। মারিদ ফোন করে জানিয়ে ছিল ওরা সন্ধ্যায় থানচি জেলা থেকে বেরিয়ে গেছে অথচ রাত দশটার পর থেকে সকলের ফোন বন্ধ। মাহবুব আলম রিফাতের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে মারিদের খবর নেওয়ার সময় পাননি। তারপরও মাঝে দু-তিনবার কল করেছিলেন রিফাতের বিষয়টা মারিদকে জানাতে কিন্তু মারিদের নম্বর বন্ধ পাওয়ায় আর খোঁজ করার সময় পাননি উনি। মারিদের মেজো চাচা সৈয়দ রবিউল আলমও ঢাকায় নেই। তিনি আছেন বান্দরবান জেলায় প্রশিক্ষণ কাজে। সেজন্য রিফাতের বিয়ের সময় তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি।
~~
১ মার্চ ২০১৫ই
নিস্তব্ধ নিশিরাত। ধরণী জুড়ে বসন্তের বাতাস আর হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আকাশে চাঁদটা ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা। অন্ধকার রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নিশিরাতের নিস্তব্ধতা বাড়িয়ে তুলছে, সেই সাথে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কারও হাহাকারের চিৎকার। কী ভয়ংকর সেই চিৎকার! টিনের চালের ওপর বড় করই গাছের ডালে বসে আছে দুটো দমকুলি পাখি। মানুষের কান্নার শব্দের সাথে পাখি দুটোর ‘কু কু’ ডাক মিশে ভয়ংকর মৃত্যুর ধ্বনি শোনাচ্ছে। গ্রাম্য মানুষ বলে দমকুলি পাখি মানুষের আঙিনায় মৃত্যুর সংবাদ নিয়ে আসে। এই পাখি ততদিন সেই বাড়ির আঙিনায় মৃত্যুর গান গাইবে যতদিন না সেই বাড়ির বিপদ কাটছে বা মৃত্যু হচ্ছে। বিপদ কেটে গেলে ধূমকেতুর ন্যায় সেই দমকুলি পাখিকেও আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আজ সিকদার বাড়ির আঙিনা মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধ প্রাণীহীন হয়ে আছে এই বাড়ির সদস্য। উঠানে, বারান্দায়, দরজায়, কলপাড়ে যে যেখানে ঠাঁয় পেয়েছে সেখানে বসেছে একেকজন ছন্নছাড়া হয়ে। একেক জনের নিঃশ্বাস ভারী। চোখে জল। শরীর কাদামাটি আর রক্তে লেপ্টে। কিছুক্ষণ আগে বয়ে যাওয়া রণযুদ্ধের তাণ্ডবে ধ্বংসস্তূপের উপর বসে সবাই। কারও মাঝে উত্তেজনা, ভয় কিংবা হাহাকার নেই। আছে ক্লান্ত শরীর আর ভারী নিঃশ্বাস। তারানূর সাজিদ মাঝের ঘরের বারান্দার দুয়ারে বসে মাথায় হাত দিয়ে। আশনূর তারানূরের পা জড়িয়ে নিশ্চুপ কান পেতে শুনছে সেই কান্নার শব্দ। মারিদ তাদের থাকার ঘরের বারান্দার দুয়ারে বসে দুহাতে চুল টেনে। হাসিব, রাদিল দুজনেই মারিদের পাশে দাঁড়িয়ে। তিনজনের শরীর কাদামাটিতে লেপ্টে। যেন যুদ্ধ শেষ করেই নিস্তেজ শরীর তাদের।
রাদিল-হাসিবের চেয়ে মারিদ বেশ আহত। মারিদের পরনের সাদা শার্টটা সামনে-পিছন দুইদিক থেকে ছিঁড়ে ভাগ হয়ে আছে। রক্ত আর কাদামাটি মেখে একাকার অবস্থা। শরীর ফেটে আহত স্থান থেকে এখনো রক্ত ঝরছে। কিন্তু মারিদের মাঝে চিকিৎসা নেওয়ার তাড়াহুড়ো নেই। সবাই নিস্তব্ধ।এই রাতে তারানূরের সখী ফুলবানু রয়েছে সিকদার বাড়িতে। তিনি বাড়ির উঠানে বসে কাঁদছেন। শাহানা কোথায় আছে কারও জানা নেই। হাসানের দ্বিতীয় ছেলে সাজিদও বাড়িতে, তবে সে এই যুদ্ধের তামাশায় নিজেকে জড়াতে চায় না বলে ঘরে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে। মাজিদের বউ নদী নিজের ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে স্বামীর পিছনে দাঁড়িয়ে। সকলেই কান পেতে শুনছে নূরজাহানের হাহাকার চিৎকার।
রাত ৩:২২। মারিদের থাকার কাঠগোলাপের ঘরটা একটা সময় নূরজাহানের মা আয়েশার ছিল। আয়েশার মৃত্যুর পর তাকে সেই ঘরের উত্তর পাশে সুপারি গাছের নিচে কবর দেওয়া হয়। নূরজাহান এখন মায়ের কবরের মাটি আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার করছে। হাসান রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে হাত-পা ছেড়ে ঘরের ভিটের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসে। হাসানের থেকে কয়েক কদম দূরে নূরজাহান মায়ের কবরের মাটির দু’হাতে কুঁড়ে আয়েশাকে ডাকছে আর বলছে…
‘ আম্মা! এই আম্মা? এই? উঠো? চাইয়া দেখো আমি তোমার পরী। তোমার মাইয়া। আমারে তোমার লগে লইয়া যাও। এই আম্মা, এই? এ দুনিয়াটা আমার লাইগা না আম্মা। এইহানে আমার আপন কেউ নাই। এক আকাশের নিচে তুমি আর আব্বা ছাড়া কেউ আমারে ভালোবাসে নাই আম্মা। আমার এতো কলঙ্ক গায়ে সই না আম্মা। আমারে তুমি মুক্তি দেও। লইয়া যাও তোমার কাছে। এই আম্মা। আম্মা। উঠো না। উঠো না আম্মা। অ আম্মা। আম্মারে। একটু হোনো আমার কথা। চাইয়া দেখো তোমার পরী ভালা নাই। আমারে মুক্তি কবে দিবা আম্মা? কবে আমার অভিশাপের জীবন শেষ হইব? অ আম্মা কও না। আম্মারে। অ আম্মা। চুপ কইরা থাইকো না আম্মা। কথা কও। একটু কথা কও। একটু। আম্ম। আম্মা।
সন্ধ্যা থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে থানচিতে। চারপাশে শীতল হাওয়া। কারেন্ট নেই। শেফালী আর মান্না উঠানের দুপাশে দুটো হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে। অল্প আলোয় মারিদদের আবছা দেখা যাচ্ছে। আয়েশার কবরের ওপর নূরজাহান সিজদায় লুটিয়ে দুহাতের মুঠোয় মায়ের কবরের কাদামাটি পিষে নূরজাহান রাগে জিদে আওড়াতে লাগল—
‘একটা অনিশ্চিত জীবন আর পাহাড় সমান কলঙ্কের বোঝা আমার কাঁধে চাপাইয়া দিয়া ক্যান একা কইরা চইলা গেলা আম্মা। দায়িত্ব যদি নিতে না পারো তাইলে ক্যান জন্ম দিলা আমায়? এই আম্মা? এই? আমি কইছিলাম তোমারে আমারে দুনিয়াতে আনো? কইছিলা? তাইলে ক্যান জন্ম দিলা আমারে? এতো কলঙ্ক আর গায়ে সয় না আম্মা। আমারে লইয়া যাও তোমার কাছে। মুক্তি দাও আমারে এই কলঙ্কিত জীবন থেইক্কা। আমি আর পারছি না আম্মা। আমারে মুক্তি দাও। এইখানে পদে পদে মিথ্যা বানোয়াট আর ছলনা। কাছের মানুষ দোষী কই, মনের ব্যথা কেউ বুঝে না আম্মা। একটা অন্ধকার জীবনের কারাগারে দিনদিন তলাই যাইতাছি আম্মা। এই এক জীবনে আমারে কেউ ভালোবাসেনি আম্মা। আমারে ক্যান তুমি একলা কইরা রাইখা গেলা এই অনিশ্চিত জীবনে। কত কথা, কত স্বপ্ন ছিল আম্মা, আমার স্বপ্নগুলা ভাঙা কাঁচের টুকরোর ন্যায় ছড়িয়ে আছে আমার চারপাশে। আমি পা বাড়ালে সে কাঁচের টুকরো আমারে অসংখ্য আঘাত করে আম্মা, রক্তাক্ত করে প্রতিনিয়ত। এক আকাশের নিচে আমার কোথাও ঠাঁই নাই আম্মা। আমি একটা অভিশাপ। আমি মুক্তি চাই এই অভিশপ্ত জীবন থেইক্কা। মুক্তি দেও আমারে তুমি। মুক্তি দেও আম্মা।
নূরজাহানের প্রতিটা চিৎকারের ধ্বনি মারিদের মস্তিষ্কের নিউরনে কিলবিল করছে অসহ্য যন্ত্রণায়। জীবনের এই প্রথম কোনো নারীর চিৎকার হাহাকারে মারিদ পাগল হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা করছে সবকিছু ধ্বংস করে মিলিয়ে দিয়ে এই নারীর জন্য সুখ কিনে আনতে। নূরজাহানের সকল কলঙ্কের ইরেজার হতে। মারিদ নিজের হাতে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করত নূরজাহানের সকল কলঙ্কের দাগ। মারিদ মাথা নুইয়ে দুহাতে চুল টানছে। নূরজাহানের চিৎকারে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে অসহ্য যন্ত্রণায়। বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তীব্র। নূরজাহান চিৎকার থামছে না, আর না কেউ জায়গা ছেড়ে উঠছে নূরজাহানকে থামাতে।
মারিদ হঠাৎ একটা অভাবনীয় কাজ করে বসল। খালি পায়ে হাসানকে পাশ কাটিয়ে নূরজাহানকে আয়েশার কবরের ওপর থেকে টেনে তুলতে চাইল। মারিদের ছুঁয়ায় নূরজাহান গর্জে উঠল। অন্ধকারে হাসানও মারিদকে ঠাহর করতে পারেনি। নূরজাহানের হাত-পা ছড়িয়ে দাপাদাপিতে হাসানও গর্জে উঠে পাশের রামদা-টা হাতে নিল। মারিদ নূরজাহানকে কাদামাটিসহ দুহাতে ঝাপটে জড়িয়ে কোলে তুলতে নূরজাহান এলোমেলোভাবে কিল-ঘুষি আর নখ বসিয়ে আঘাত করতে লাগল মারিদকে চিৎকার করে—
‘ছাড় আমারে! ছাড় শয়তানের দল। ছাড়। আমারে মুক্তি দে তোরা। মুক্তি দে আমারে। মুক্তি দে।
হাসান রামদা নিয়ে পথ আটকাতে চাইলে মারিদ হাসানকে থামিয়ে বলল—
‘আমি আপনার মেয়েকে ছুঁইনি আঙ্কেল। আমি আমার বউকে ছুঁয়েছি। আজকের পর আপনি আমাকে বাধা দিবেন না। সরে দাঁড়ান।
হাসান ভারী অবাক চোখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাতের দা-টা মাটিতে পড়ে গেল। নূরজাহান আর হাসানের চিৎকার শুনে সকলে দৌড়ে এসেছিল। মারিদের কোলে নূরজাহান আর নূরজাহানকে নিয়ে মারিদের কথাগুলো সকলের কানে গেল। কেউ প্রতিবাদ করল না, বরং কিছুক্ষণ আগে বয়ে যাওয়া তাণ্ডবের একটা অংশ ছিল মারিদ-নূরজাহানের বিয়ে। মারিদ যে এত সহজে নূরজাহানকে নিজের বউ বলে স্বীকার করে নেবে সেটা কেউ ভাবেনি। সবাই তো ভেবেছিল নূরজাহানের দ্বিতীয় বিয়েটাও ভেঙে যাবে প্রথম বিয়েটার মতো। কলঙ্কিত নূরজাহানকে বউ হিসেবে কেউ চাইবে না জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। মানিক সওদাগর এখন অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে আছে, কিন্তু জ্ঞান ফিরে সে যে নূরজাহানের স্বামী মারিদকে প্রাণে মেরে ফেলতে চাইবে সেই কথা সকলের মনে আছে।
সবাই অবাক চোখে মারিদের দিকে তাকিয়ে। মারিদ নূরজাহানকে কোলে নিয়ে সোজা বাড়ির পিছনের পুকুরঘাটে চলে যায়। মারিদের পিছন পিছন সবাই পুকুরঘাটে এসে দাঁড়াল। রাত তিনটা পয়তাল্লিশ । সিঁড়ি বেয়ে নিস্তব্ধ নিশি পুকুরের পানিতে নেমে গেল মারিদ। নূরজাহান তখনো এলোমেলো হাত-পা ছড়িয়ে মারিদকে আঘাত করছে ছাড়াতে। মারিদ নূরজাহানকে কোলে নিয়ে বুক-সমান পানিতে নেমে পরপর ডুব দিল। একটা, দুইটা, তিনটা, চারটা—তারপর অসংখ্য। ততক্ষণ পর্যন্ত মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে পানিতে ডুব দিতে থাকল যতক্ষণ পর্যন্ত নূরজাহান ক্লান্ত না হচ্ছে। একটা সময় যখন নূরজাহান শরীর ছেড়ে দিল, তখন মারিদ নূরজাহানকে বুকে জড়িয়ে পিঠে আদুরে হাত বুলিয়ে শান্ত করে বলল—
‘ এই আপনাকে পবিত্র করে দিলাম। আজ থেকে আপনি আমার পবিত্র চাঁদ। আপনার সকল কলঙ্ক আমার। এক জীবনে ভালো থাকার জন্য আমাদের সকলের ভালোবাসা প্রয়োজন হয় না অপরিচিতা। ভালোবাসার মতো একটা মানুষ আমাদের জীবনে থাকলেই হলো। এইতো আমি। আপনার সূর্য।
নূরজাহান জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় মারিদের কথাগুলো শুনতে পায়নি। শরীরে অসংখ্য মারের দাগ আছে। দু’হাতে শিকল দিয়ে বাঁধায় চামড়া ছিলে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে আছে। মারিদ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে আরও কিছুক্ষণ পানিতে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অজ্ঞান নূরজাহানকে কোলে নিয়ে পানি থেকে উঠে আসল। সকলে মারিদের মুখের দিকে তাকিয়ে। মারিদ খুবই শান্ত স্বরে হাসানের উদ্দেশ্যে বলল—
‘রাত যত গভীর হয় সকাল তত নিকটে। গভীর রাত কেটে গেছে এবার সকাল হবে। আমি নূরজাহানকে বউ হিসেবে গ্রহণ ও স্বীকৃতি দুটোই দিলাম। এই এক জীবনে আমি জীবিত অবস্থায় নূরজাহানের অমর্যাদা হতে দিব না আঙ্কেল। কথা দিলাম।
~~
৩ দিন আগে~
সবকিছুর শুরু মারিদের গাড়ির পুড়ানোর রাতের পর থেকে….
চলবে…
[ যারা এই গল্পটা পড়তে পছন্দ করেন তাদের অবশ্যই এই গল্পটার বেশি বেশি প্রচার করার অনুরোধ রইল।
বিয়ের কাহিনি গুলো কিভাবে এসেছে সেটা পরবর্তী পর্ব ধাপে ধাপে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ ]
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ১ গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১