খাঁচায় বন্দী ফুল
জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব- ২
হাবিবের আদেশে সায়রা খাবারে ড্রা’গস মিশিয়ে দিলো। মনের মধ্যে খুঁতখুঁত করলেও পরে নিজের মেয়ের সুখের কথা ভেবে সায়রা রাজি হলো। প্লেটে খাবার সাজিয়ে সায়রা আরেকটা প্লেট দিয়ে ঢেকে সাইফের ঘরের দিকে রওনা হলো। মনে নানান ভাবনা।
সাইফ ঘুনাক্ষরে টের পেলে সায়রার রক্ষে নেই। স্বামীর আশ্বাস পেয়ে সায়রা খাবার নিয়ে সিড়ি দিয়ে ওপরে গেলো। রাত তখন প্রায় ২ টার কাছাকাছি। হাসান চৌধুরীর প্ল্যান মতো বাড়ির সব লাইট অফ করে যে যার ঘরে শুয়ে পড়েছে।
সিড়ির পাশের নিয়ন আলোয় সায়রা ওপরে কারো অবয়ব দেখতে পেলো। মূহুর্তের মধ্যে সেই অবয়ব দৃশ্যমান হলো। সায়রার পায়ের তলার মাটি যেন নড়বড় করছে। সায়রা আমতা আমতা করে বলল
” স…সা…সাইফ ব…বাবা তুমি?”
” হ্যা আমি”
” ইয়ে মানে তুমি না কোথাও গেছিল?”
সাইফ দুই হাত বুকে ভাজ করে দাড়ালো
“সেসব না হয় বলবো, কিন্তু তুমি আমার ঘরের সামনে কি করছো? আর হাতে কি?”
সায়রা হাসার চেষ্টা করলো
” তোমার বউ এর জন্য খাবার নিয়ে এসেছি”
সাইফ বাকা হাসলো
” বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে গেছে, আর এমন সময় তুমি আমার বউ এর জন্য অন্ধকারে খাবার নিয়ে এসেছো? ব্যাপার টা একদম কু’ত্তার পেটে ঘি হজম হওয়ার মত। আমার ঠিক হজম হলো না। সত্যি টা বলো”
সায়রা শীতের মধ্যেও দরদর করে ঘামতে লাগলো।
” আসলে তখন কেউ তোমার বউকে খাবার দিতে আসে নি। আমিও ভাই জানের ভয়ে কিচ্ছু বলতে পারিনি তখন। তাই এখ…..”
সায়রার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ বলল
” আমি এতবড় একটা কান্ড করে ঘরে ফিরলাম তবুও বাড়িতে সারা শব্দ নেই! এতক্ষণ তো সবার ড্রইং রুমে বসে থাকার কথা ছিলো। তা না করে সবাই ঘুমিয়ে গেছে আর তুমি এসেছো খাবার নিয়ে?”
সায়রা ওপর নিচ মাথা নাড়লো।
সাইফ হেসে বলল
” কাম অন কাকিয়া। তোমরা এতটাও ভালো না। আচ্ছা এনেছোই যখন দাও। আমার বউকে আমিই খাওয়াবো। দাও”
সায়রা দু-পা পিছিয়ে গেলো।
” না না থাক “
” আহা থাকবে কেন? আমার বউ তো না খেয়ে থাকবে না হলে। দাও দাও। “
সায়রা প্লেট সরিয়ে নিলো। উল্টো সিড়ি দিয়ে নামতে নিলে সাইফ এসে সায়রার সামনে দাড়ালো
” কি মিশিয়েছো খাবারে কাকিয়া?”
সায়রার গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। সাইফ হাতের প্লেট টা নিতে গেলে সায়রাও সরিয়ে নিতে যায়, এক পর্যায়ে খাবার শুদ্ধ প্লেটটা সিড়ি দিয়ে ঝনঝন করে গড়িয়ে পড়ে। বাড়ির ড্রইং রুমে আলো জ্বলে উঠে, সবাই যে যার ঘর থেকে ছুটে আসে।
হাসান চৌধুরী চশমা ঠিক করতে করতে বলে
” এতবড় অঘটন ঘটিয়েও কি শান্তি হলো না তোমার? কি অসভ্যতা হচ্ছে কাকিয়ায় সাথে। এবার বাড়িটাকে কি চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলবে নাকি?”
সাইফ চেচিয়ে বলে
“তার আগে তুমি বলো তোমাদের সাহস হলো কি করে আমার বউ এর ক্ষতি করার? ওর খাবারে ক্ষতিকর কিছু মিশানোর সাহস কি করে হলো তোমাদের। “
সাইফ সাইরার সামনে দাড়িয়ে বলল
” বলোনা কাকিয়া। কি মিশিয়ে ছিলে? হয়তো বিশ নয়তো ম’রে যাবে এমন কিছু তাই তো? চেনো মেয়েটাকে তোমরা? না ও তোমাদের কোনো ক্ষতি করেছে? বলো না কাকিয়া। নদী বা দীঘির সাথে তুমি এমন টা করতে পারতে?”
হাবিব চৌধুরী বউ এর অসম্মানে চেচিয়ে উঠলো
” তোমার কাছে কি প্রমাণ আছে যে খাবারে বিষ মেশানো আছে?”
সাইফ এর চোখ র’ক্ত বর্ণ ধারণ করেছে। ধপাধপ সিড়ি দিয়ে নিচে এসে একটা স্পুন দিয়ে ওপর থেকে কিছুটা খাবার প্লেটে তুলল। তারপর নদীর সামনে ধরে বলল
” নে এটা খা”
হাসান চৌধুরী ধমক দিয়ে বলে
” কি যা তা বলছো। ও এটা কেন খাবে?”
” খাবে বাবা ও খাবে। কাকিয়া যখন কিচ্ছু মেশায়নি অদিতির খাবারে তখন নদী আর দীঘি এই খাবার খাবে। “
সায়রা জোরে কেদে ফেলল
” সাইফ। ওদের ওই খাবারটা খাইও না বাবা। দয়া করো। আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কক্ষনও এমন করবো না আমি। “
সাইফ খাবারের প্লেট ধপ করে হাত থেকে ফেলে দিলো। চোখ গুলো যেন জ্বলছে। আপন লোকগুলোও তার সাথে ঘাতকতা করছে। ফোস করে নিশ্বাস ছাড়লো। সোজা সিড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলো। পথি মধ্যে গিয়ে আবার থামলো
” আমি সবার উদ্দেশ্যে বলছি। পরবর্তী যদি কেউ কখনো এমন কিছু করার চেষ্টা করো অদিতির সাথে। আমি এই বাড়ি শুদ্ধ জ্বালিয়ে দেবো।”
হাসান চৌধুরী সায়রার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল
” একটা কাজ যদি এদের দাড়া হয়।”
সবাইকে যে যার ঘরে যেতে বলে নিজেও ঘরে চলে গেলো। এতটা সময় নদী শুধু নির্বাক হয়ে দেখছিলো সাইফ কে। নিজের স্ত্রীর জন্য কতখানি টান তার। কত্ত পজিসিভ হাসবেন্ড। এর এক কোণা নদীকে কেয়ার করলে নদী জীবনে আর কিচ্ছু চাইতো না।
দীঘি বোনকে ঠেলে নিয়ে গেলো ঘরের দিকে। সকলের চোখের আড়ালে নদীর চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে।
সাইফ ঘরে গিয়ে দেখে অদিতি আগের মতই বসে আছে। দরজার সামনে থেকে ব্যাগ গুলো নিয়ে অদিতি কে দিলো।
“তোমার পোষাক আর গরম কাপড়। ফ্রেশ হয়ে পাল্টে নাও “
অদিতি ঠায় বসে রইলো। সাইফ ফ্রেশ হয়ে এসে অদিতি কে এভাবে বসে থাকতে দেখে বেজায় চটে গেলো
” কথা কি কান দিয়ে যাচ্ছে না নাকি? নাকি আমার ভালো ব্যবহার পছন্দ হচ্ছে না?”
অদিতি ভয়ে ভয়ে বলল
” আ….আমার আপননাকে কিছু বলার আছে”
সাইফ শয়তানি হাসি দিলো
” শুনবো তো। সব শুনবো। আগে ফ্রেশ হও”
” না না। আগে শুনুন”
সাইফ শক্ত কন্ঠে বলল
” তুমি ফ্রেশ হয়ে আসবে? নাকি আমি ফ্রেশ করিয়ে দিবো?”
অদিতি চট করে উঠে পড়লো। হাত মুখ ধুয়ে জামা পাল্টে নিলো।
সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে নিলো। সাইফকে কোথাও দেখতে পেলো না। অদিতি উপায় না পেয়ে কম্ফোর্টার জড়িয়ে বসে পড়লো।
নদী জানালা হেলান দিয়ে বসে আছে। এই কনকনে শীতেও গায়ে কোনো শাল বা গরম কাপড় নেই। চোখে এক রাশ শূন্যতা। যে আবেগ কে তীলে তীলে ভালোবাসায় পরিণত করেছে, সেই ভালোবাসা আজ অন্য কারো। কীভাবে সইবে সে?
রান্নাঘরে টুনটান শব্দ। নদীর ঘরের পাশেই কিচেন। আবার কোন নাটক হচ্ছে? এতরাতে রান্না ঘরে কে?
নদী এগিয়ে গেলো কিচেনে।
সাইফ জ্যাকেট এর হাতা খানিকটা গুটিয়ে কি যেন খুজছে। সাইফের মোবাইলের ফ্ল্যাশ গিয়ে পড়ে নদীর মুখে। দু’জনেই চমকে উঠে। নদী গিয়ে কিচেনের লাইট জালায়।
” সাইফ ভাই আপনি এত রাতে রান্না ঘরে কি করছেন?”
নদীর প্রশ্নের জবাব দেয় না সাইফ। কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই বলল
” আমায় একটু সাহায্য করতে পারিস?”
নদী চট করে উত্তর দেয়
” হ্যা বলুন না কি লাগবে? কফি খাবেন? করে দিচ্ছি দাড়ান। “
” না, না”
সাইফ থামায় নদীকে।
” আমার কিছু লাগবে না। অদিতির জন্য কিছু একটা বানাতে হবে। আমি তো কিছুই রান্না পারি না। মেয়েটা কাল থেকে না খেয়ে আছে।”
নদী ছোট করে বলল
” বুঝেছি “
নদী ফ্রীজ থেকে দুটো ডিম বের করে বাটিতে গুলে নিলো। তাতে কিছুটা চিনি দিলো। পাউরুটি ডিমে চুবিয়ে ফ্রাই প্যানে ভেজে দিলো ৭-৮ টা। সকালের জন্য লেচি করে রাখা আটার ডো থেকে কয়েকটা পরোটাও ভেজে দিলো। রাতের ফ্রিজে রাখা মাংসের তরকারি গরম করে বাটিতে দিয়ে ট্রে টা সাইফের দিকে এগিয়ে দেয়।
সাইফ ফোনে কারো সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত। নদী খাবারের ট্রে সাইফকে দিতে চাইলে সাইফ বলল
” তুই একটু দিয়ে আয় না কষ্ট করে।”
নদীর দ্বিধা কাজ করে। রাজি হয় না
” না আপনিই দিয়ে আসুন”
সাইফ ফোন পকেটে রেখে বলল
” তুই বাড়ির অন্য সবার মত না নদী। তোকে আমি চোখ বন্ধ করে ভরসা করি। তুই দিয়ে আসতে পারিস ওকে খাবারটা।”
” তবুও”
সাইফ বাধ্য হয়ে নিজেই নিলো খাবার এর ট্রে টা।
” যা গিয়ে শুয়ে পড়। এই ঠান্ডার মধ্যে এভাবে ঘুরছিস একটা শাল ও তো জড়াতে পারিস গায়ে। যা ঘরে যা।
সাইফ চলে গেলো। নদী একই জায়গায় দাড়িয়ে। কত পরিবর্তন!
বাড়ির সবচেয়ে জেদি ছেলেটা আজ মাঝরাতে রান্না ঘরে এসেছে বউ এর জন্য খাবার বানাতে।
সাইফ খাবার নিয়ে গিয়ে দেখে অদিতি একদম বাচ্চাদের মতো করে কম্ফোর্টার জড়িয়ে বসে আছে। খাবার গুলো সামনে দিয়ে বলল
” বিড়াল ছানা, খেয়ে নাও “
অদিতি ভ্রু গুটিয়ে নিলো মনে মনে ভাবলো, লোকটা মশকরা করতেও জানে?দেখে তো মনে হচ্ছিল না। অদিতির গোল গোল করে তাকিয়ে থাকা দেখে বলল
” কি হলো খাওয়া শুরু করো “
পেটে বড্ড ক্ষুধা । অমত করলো না খেতে। চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো। সাইফ সামনে বসে বসে ওর খাওয়া দেখছে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো। এখন আবার কে এলো।
সাইফ কাবার্ড থেকে রিভলবার টা নিয়ে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই নদীকে দেখে ভড়কে যায়।
” তুই?”
নদীও থতমত খেয়ে যায়। হাতের গ্লাস টা এগিয়ে দিয়ে বলল
” এটাতে পানি গরম করে এনেছি। ঘরের পানি তো অনেক ঠান্ডা। এটা ওকে দিন”
সাইফ গ্লাস টা হাতে নিলো।
” আয় ভিতরে আয়”
নদী ভিতরে একবার তাকিয়ে বলে
” না এখন যাই”
বলতে দেরি নদীর যেতে দেরি নেই। সাইফ দরজা বন্ধ করে অদিতিকে পানিটা দিলো। অদিতি সবটা খাবার খেয়েছে। খুব খিদে ছিলো পেটে। সাইফ প্লেট – গ্লাস সরিয়ে নিয়ে বলল
” ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার সব কথা কাল শুনবো”
অদিতি মিনমিনে গলায় বলল
” এখানে ঘুমাবো?”
“হ্যা”
“আপনি?”
” আমিও এই ঘরেই ঘুমাবো”
অদিতি কাদো কাদো গলায় বলল
” উনি শুনলে আমার ওপর ভীষণ রেগে যাবেন। আমি কোনো পুরুষ মানুষের সাথে এক ঘরে ঘুমাতে পারবো না”
সাইফ কপাল কুচকালো
” কে উনি?”
অদিতি মাথা নিচু করে জবাব দিলো
“যার সাথে আমার বিয়ে হবে কিছুদিন পর”
সাইফ কথাটা শোনা মাত্রই তেড়ে এসে অদিতির গাল চেপে ধরলো নিজের শক্ত পুরুষালী হাতে। দাতে দাত চেপে বলল
” তোর বিয়ে আমার সাথেই হবে। তাও আমার কালকেই। বুঝেছিস?”
অদিতি কে বিছানায় ছুড়ে ফেলে সাইফ গেমিং রুমে চলে গেলো। ওর রুমের ভিতরেই একটা পকেট রুম রয়েছে। যেটা ও সম্পূর্ণ গেমিং সেটাপে সাজিয়েছে।
অদিতি উপায় না পেয়ে শুয়ে পড়লো।
রাত তখন শেষের দিকে। সাইফ রুমে আসলো আবার। অদিতি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কম্ফর্টার ফেলে তার ওপর ঘুমিয়ে আছে। জামা সরে গিয়ে ফর্সা মেদহীন পেটটা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। পায়জামাও নাভির সামান্য নিচে।
সাইফ ঢোক গিলল। এই রাতে নিজের ঘরে একলা সুন্দরী রমনি সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। যে কোনো পুরুষ ঘায়েল হতে বাধ্য। সাইফ ও তার ব্যাতিক্রম হলো না। এগিয়ে গেলো অদিতির কাছে। ঠান্ডা হাতে স্পর্শ করলো অদিতির ফর্সা পেট।
গলায় মুখ ডুবিয়ে লম্বা করে শ্বাস নিলো। কি অপূর্ব সুঘ্রাণ। লালচে আলোয় রক্তজবা ঠোট জোড়া খুব টানছে সাইফকে।
চলবে?
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল গল্পের লিংক