Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১


“এই পতি’তালয়ের সবচেয়ে সুন্দরী আর নতুন মেয়ে কে? যে এখনো ভা/র্জিন। যাকে কেউ ছোয়নি”

সাইফ চৌধুরির এক নাগাড়ে বলা কথা গুলো শুনে দর দর করে ঘামতে লাগলো গুলাবো। এই কুঠির মালকিন। চিলঞ্চি তে পানের পিক ফেলে এক গাল হেসে আমতা আমতা করে বলল “ইয়ে, আসলে হয়েছে কি স্যার….”

সাইফ এর র’ক্তচক্ষুর দিকে তাকাতেই ছ্যাৎ করে উঠলো তার বক্ষপট। চট করে বলে ফেলল
” আছে তো। আছে, আছে।”

গুলাবো হাক ছাড়ে
” রজনি! বিন্দিয়া, কই তোরা কাল যে মেয়েটাকে তার বাপ দিয়ে গেলো ওকে নিয়ে আয় জলদি।”

সাইফের দিকে তাকিয়ে বলল
” আ…আপনি বসুন না সাহেব। ওরা এক্ষুনি এসে যাবে। হে হে তা আপনও কষ্ট করে আসতে গেলেন কেনো? আমায় বললেই ত আমি পাঠিয়ে….. “

গুলাবোর কথা শেষ হওয়ার আগেই কুঠির ভিতর থেকে মেয়ে কান্নার শব্দ ভেসে এলো। গুলাবো ভিতরের দিকে তাকিয়ে আবার সাইফের দিকে তাকালো। এই শীতেও ঘামছে লোকটা। মারাত্মক সাইকো। একবাট এক মেয়েকে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো। সুন্দর মুখশ্রী লাল হয়ে আছে। কঠোর চক্ষুদ্বয় যেন তৃষ্ণার্ত শকুনের মতো দেখছে ভিতরে যাওয়ার গলির দিকে। গুলাবো তারা দিলো
” কিরে মুখপুরির দল। এতসময় লাগে ওই টুকু মেয়েকে আনতে? “

টেনে হিচরে নিয়ে আসলো ১৬ বছরের এক কিশোরি কে। পরনে টকটকে লাল থ্রিপিস। টানা হিচরার দরুন চুলের খোপা টা খসে গেলো সাইফের সামনেই।

ঝলমলিয়ে ছড়িয়ে পড়লো কুচকুচে কালো মেঘের মতন এক রাশ লম্বা চুল। মেয়েটা এমন ভাবে হাত পা ছড়াছড়ি করছে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে তার মুখ, গ্রীবা আড়াল করে রেখেছে। সাইফ দেখতে পারছে না ঠিক করে। সাইফ নিজের ভ্রুদ্বয় গুটিয়ে নিলো। গুলাবো তরিঘরি করে উঠে গিয়ে চুলের মুঠি টেনে ধরতেই সোজা হয়ে দাড়ালো মেয়েটি।

তার ক্রন্দনরত মুখশ্রী লোলুপ দৃষ্টিতে দেখছে সাইফ। এমন অপূর্ব রমনি এর আগে দেখেনি সে। কমে এলো তার চোখের রক্তিম আভা। রাগে টগবগ করতে থাকা র’ক্ত যেন এবারে শীতল হয়ে এলো। আপনা আপনি ফাকা হয়ে গেলো দুটি ঠোট। মেয়েটির কান্নারত লাল চোখ মুখ যেন জলে ভাসা পদ্মের ন্যায় ফুটফুটে। ওমন ফুটফুটে চাঁদের টুকরো কে এই নোংরা জায়গায় কে আনলো। সাইফের মুষ্ঠি আবারো শক্ত হয়ে এলো।

চুলে টান লাগতেই ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো মেয়েটি।
সাইফ হুংকার দিয়ে উঠলো। কোমর থেকে পি’স্তল বের করে তাক করলো গুলাবোর দিকে
” ছাড়ো ওকে। হাত লাগাবেনা ওর গায়ে”

গুলাবো ভয়ে দ্রুত মেয়েটিকে ছেড়ে সরে এলো। মেয়েটি ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে গেলো। কিন্তু নড়চড় নেই। বোধহয় জ্ঞান হারালো। সাইফ পুনরায় পি’স্তল টা কোমরে গুজে এগিয়ে গেলো মেয়েটার দিকে। হাটু মুড়ে বসে মুখে থাকা চুল গুলো সরালো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে আরেকবার দেখলো

” তুমি সিউর যে ওকে এখনো ওবদি কেউ ছোয়নি?”

গুলাবো ভয়ার্ত গলায় বলল
” কালই এসেছে সাহেব। দেখছেন না বাড়ির পোষাকটা ওবদি বদলানো হয়নি। এখনো ওবদি কিচ্ছু খায়নি পর্যন্ত।”

সাইফ বাকা হাসলো। সামনে এগিয়ে গিয়ে গুলাবোর মুখোমুখি দাড়ালো। পিস্তল টা গুলাবোর থুতনি তে ঠেকিয়ে বলল
” আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি। আমি এই মেয়েটিকে নিয়ে যেতে চাই। কত দিতে হবে?”

গুলাবোর প্রাণ ভয়ে শুকিয়ে গেছে
” কি যে বলেন না সাহেব। আপনি নেবেন তাতে টাকা দেবেন কেন? আপনার জায়গায় ব্যাবসা করছি। আপনার দয়ায় বেচে আছি। ওওওও আপনি নিয়ে যা…..”

” সাইফ চৌধুরী কারোর দান গ্রহণ করে না ওকে”

” শামীম?”

সাইফ চেচাতেই শামীম ছুটে এলো চেকবই নিয়ে। সাইফ তাতে ১০ লাখ টাকার অংক বসিয়ে সাইন করে দিলো। গুলাবোর হাতে ধরিয়ে দিয়ে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে। গাড়ির ব্যাকসিটে শুইয়ে দিলো মেয়েটাকে।

গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে এলো একেবারে। গাড়ি বাড়ির ভিতর প্রবেশ করতেই থামালো এক ছুটে বেড়িয়ে এলো নদী। সাইফ এসেছে। তার অপেক্ষাতেই ছিলো এতক্ষণ। কিন্তু এই বদমেজাজি দেমাগি লোকটা কখনো দেখেই না নদীর দিকে। সম্পর্কে নদী সাইফের আপন চাচাতো বোন।

সদর দরজা পার হতেই চোখে পড়লো সাইফের কোলে কোনো মেয়ে। সাইফ মেয়েটাকে কোলে নিয়ে হনহনিয়ে হেটে আসছে এদিকেই। নদীর পা থমকে গেলো। এ কাকে নিয়ে এলো সাইফ ভাই। নদীর ভাবনার মধ্যেই নদীর সামনে দিয়ে ভিতরে ঢুকলো সাইফ।

ড্রইং রুমে তখন পরিবারের সবাই সাইফেরই অপেক্ষায়। রাত বেশ হয়েছে, খেতে বসবে সকলে। এমন সময় সাইফ সেখানে উপস্থিত হলো কোলে একটি অপরিচিত মেয়ে নিয়ে। সবার চোখ যেন ছানাবড়া।

সাইফের মা আঞ্জুমান চৌধুরী চেচিয়ে ডাকলো
” দাড়া সাইফ”

সাইফের পা থামলো। এগিয়ে এলো আঞ্জুমান। সাইফের মুখোমুখি দাড়িয়ে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল
” কে এই মেয়ে? কাকে নিয়ে এসেছিস তুই?”

সাইফ নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দিলো
” তোমাদের বউ মা “

ব্যাস! ড্রইংরুমে বড়সড় একটা বাজ পড়লো। হাসান চৌধুরী যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না। মিনিস্টার হাসান চৌধুরীর একমাত্র ছেলে কিনা একা একা বিয়ে করে বাড়ি ফিরেছে। আঞ্জুমান চেচিয়ে উঠলো।
” কি যা তা বলছিস তুই? পাগল হয়ে গেছিস? কাকে না কাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসে বলছিস……”

আঞ্জুমান এর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ হুংকার দিয়ে উঠলো
” ও কোনো রাস্তার মেয়ে নয় মা। ও আমার বউ। বুঝেছো তোমরা?”

হাবিব চৌধুরী উঠতে নিলে হাসান চৌধুরী থামিয়ে দিলো। হাবিব ক্রোধের সাথে বলল
” আমাকে থামালেন কেন ভাইজান? ও যা করেছে এতকাল সব মেনে নিয়েছি। কিন্তু এটা আর মানা যায় না। আপনি ছাড়ুন আমায়”

হাসান চৌধুরী ধমক দেয়
” আহহহ থামো হাবিব। এভাবে ওর সাথে পারা যাবে না। চেনো না নাকি ওকে। জানোই তো ওর জিদ।”

হাসান চৌধুরী খুবই বিচক্ষণ মানুষ। জেদি ছেলের সাথে তর্ক করলে হিতে বিপরীত হবে। সে এই কাজটা কৌশলে ঠান্ডা মাথায় করতে চায়।

সকল কে খেতে বসার নির্দেশ দেয় হাসান চৌধুরী। যে যার মতো টেবিলে খেতে বসলেও নদী নেই টেবিলে। আঞ্জুমান চৌধুরী ছোট জা কে তারা দিলো নদীকে ডাকতে।

” সায়রা দেখতো নদী কোথায় গেলো।”

সায়রা বেশ ভালো করেই বুঝেছে নদী কেন আসেনি। ফোস করে নিশ্বাস ছাড়লো। নিজে না গিয়ে ছোট মেয়ে কে পাঠায় নদীর কাছে।

” দীঘি! বোনকে ডেকে নিয়ে এসো”

দীঘির বয়স ১৫ বছর নদীর থেকে ৫ বছরের ছোট। দীঘি মায়ের কতা মতো নদী কে ডাকতে গেলো।

সাইফ ফ্রেশ হয়ে পোষাক পাল্টে এসে দেখে মেয়েটা খাটের এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। চোখে মুখে আতঙ্ক, ভয়। সাইফ এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার পাশে বসলো। সাইফ বসতেই মেয়েটা কিছুটা পিছিয়ে গেলো।

” নাম কি তোমার?”

সাইফের ভারিক্কি গলা যেন অদিতির মনে আরো সংশয় তৈরি করছে। ছোট করে বলল
” অ..অদিতি”

সাইফ ভ্রু গোটালো
” শুধু অদিতি? আগে পরে কিচ্ছু নেই?”

” মিশকাত জাহান অদিতি”

সাইফ উঠে দাড়ায়। অদিতির দিকে সামান্য ঝুকে বলে।
” শোনো। সাধারণত আমি পতিতলয়ে যাই না। আজ গেছিলাম এক প্রকার জিদের বসেই। গিয়ে তোমাকে ভালো লেগেছে তাই কিনে নিয়ে এসেছি। কাল তোমাকে বিয়ে করবো।”

কথা গুলো বলেই সাইফ গটগট করে চলে গেলো। দরজা ওবদি গিয়ে আবার পিছনে ফিরলো
” আর শোনো। যতক্ষণ না আমাদের বিয়ে হচ্ছে, বাইরে বেরোবে না তুমি। আর কারো সাথে কথাও বলবে না। খাবার তোমায় ঘরেই এনে দেওয়া হবে। বুঝেছো?”

অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়ে। রোগা পাতলা গড়নের মেয়েটি টুকটুকে ফর্সা একেবারে। ঠোট দুইটা রক্তজবার ন্যায় লাল। কান্না করার ফলে নাক থুতনিও লাল বর্ণ ধারণ করেছে।

সাইফের কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। সাইফ নিজেকে সংযত করতে গলা খাকারি দিলো। মনে মনে ভাবলো ভালো লেগেছে তাই পারমানেন্টলি নিয়ে এসেছি। যাতে আমি ছাড়া কেউ ছুতে না পারে। তাই বলে ভালোটালো আমি বাসবো নাকি।

সাইফ হাতের আঙ্গুলে চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে সিড়ি দিয়ে নেমে গেলো। সিড়ি থেকে নামতেই নদীর মুখোমুখি হয় সাইফ। এমনিতে রোজ নদী আগ বাড়িয়ে এটা ওটা জিজ্ঞেস করলেও আজ কিচ্ছুটি বলল না। সাইফ কে পাশ কাটিয়ে দু-বোন ডাইনিং এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অগত্যা সাইফ পিছন থেকে ডাকলো।

” নদী! “

নদীর পা থামলো। কিন্তু পিছনে ফিরলো না। সাইফ পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলল

” তোর ভাবির খাবারটা রুমেই দিয়ে আয়। ও নিচে আসবে না”

নদীর কানের পাশে বড়সড় একটা বাজ পড়লো। যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিলো সাইফ। চোখের টইটুম্বুর হয়ে থাকা পানি গুলো আর বাধ মানলো না। আলগোছে গড়িয়ে পড়লো দুই গালে। দীঘি দুই হাতে ঠেলে বোনকে নিয়ে চেয়ারে বসালো। নদী নির্বাক বসে আছে। দীঘি আঞ্জুমান চৌধুরী কে বলল
” বড় মা, দাদাভাই বলেছে ভাবির……মানে ওই মেয়েটার খাবার ঘরে দিয়ে আসতে”

হাসান চৌধুরী ছেলেকে ডেকে বলল
” কোথায় যাচ্ছো?”

সাইফ নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দিলো
” বার এ “

“আর তোমার বউ……”

বাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ বলল
” আমার বউ দিয়ে তোমার কি কাজ? নিজের বউ আছে না? তার চিন্তা করো “

সাইফ বেড়িয়ে গেলো নিজের মতো। হাসান চৌধুরী হাবিব কে বলল
” ভোরের আগে আর ও বাড়ি ফিরবে না। এক্ষুনি সরিয়ে ফেলো মেয়েটাকে। ও এলে বলবে পালিয়ে গেছে হয়তো “

নদী বড় বড় চোখ করে তাকায় বড় বাবার দিকে…
চলবে?

#খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১

জান্নাতুল_ফেরদৌস

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply