কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১২
সুফিয়ান দৌড়ে বাড়ির ভিতরে গেল। হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকতেই দেখল ড্রয়িং রুমে সবাই জড় হয়ে আছে। হাসান চৌধুরী এক গাল হেসে বলল
” কি ব্যাপার সুফিয়ান এত হাপাচ্ছো কেন?”
সুফিয়ান কোন দিকে না তাকিয়ে বলল।
” সাইফ আয় তো আমার সাথে একটু। খুব জরুরী কথা আছে ভাই।”
অদিতির দিকে সুফিয়ানের চোখ পড়তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। যাক ঠিক আছে অদিতি। সাইফ এগিয়ে আসলে বলল
” আচ্ছা সমস্যা নেই পরে বলবো নে”
আঞ্জুমান চৌধুরী সুফিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল
” বাবা মিষ্টিমুখ করো এসো।”
সুফিয়ান হেসে সেদিকে এগিয়ে গেল
” হঠাৎ মিষ্টি মুখ?”
হাসান চৌধুরী আঞ্জুমান বেগমকে বলল
” ওকে দুটো মিষ্টি খাইয়ে দিও। বন্ধুর বিয়েরও তো একটা পাওনা আছে।”
সুফিয়ান বড় বড় চোখ করে তাকালো সাইফের দিকে। হাসান চৌধুরী বলল
” কি ভেবেছিলে দুই বন্ধু প্ল্যান করে আমাদের ছেড়ে একা একাই বিয়ে করে নেবে। তা আমি হতে দেইনি হুমম।”
সুফিয়ান একটা মিষ্টি মুখে দিয়ে সাইফকে জড়িয়ে ধরে বলল
” কংগ্রাচুলেশন ভাই। ভাবি কংগ্রাচুলেশন”
অদিতি মুচকি হাসলো। আঞ্জুমান বেগম কাটা চামচের মাথায় আরেকটা মিষ্টি সুফিয়ানের মুখের কাছে ধরল। সুফিয়ান আগের মিষ্টি খাওয়া শেষ করে বলল
” এটা আবার কিসের জন্য? “
সাইফ এসে বলল
” আরে নদীর বিয়ে ঠিক করলাম তো আজ। ১০ তারিখে এনগেজমেন্ট।”
সুফিয়ানের মিষ্টির গলায় আটকে গেল। মিষ্টিমুখে নিয়েই হা করে তাকিয়ে রইল সাইফের দিকে। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। মুখের হাসি খুশি রঙটা মুহূর্তে বদলে গেল বিষন্নতায়। টালোমালো চোখে চারিদিকে তাকালো। নদীর বিয়ে? বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। এটা কি বলছে ওরা। আঞ্জুমান সুফিয়ানকে পানি এগিয়ে দিল। ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল সুফিয়ান। সাইফকে বলল
” সব কি একদম পাকাপোক্ত হয়ে গেছে নাকি? “
হাসান চৌধুরী বললো
” হ্যাঁ সব একদম ঠিকঠাক। শোনো এই বিয়ের সব দায়িত্ব কিন্তু তোমাদের। সাইফের সাথে তোমাকেও সবটা করতে হবে। দশ তারিখে এংগেজমেন্ট। ঢাকার সবচেয়ে নামকরা বড় এবং ভালো কমিউনিটি সেন্টার বুকিং করো। আমাদের বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা”
সুফিয়ানের মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। তার চারিদিক যেন থমকে গেছে। তার পুরুষালি অক্ষি যুগলে বিন্দু বিন্দু পানি জমল। সবার থেকে আড়াল করতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো সুফিয়ান
” আঙ্কেল আজ আসি তবে? “
সাইফ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল
” এখনই চলে যাবি? আরেকটু বস “
সুফিয়ান শুধু মাথা দিয়ে না করল। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। তখনই নদী আসলো ড্রয়িং রুমে। গলা করে বলল
” মনি মা খাবার দাও, খিদে পেয়েছে বড্ড”
পাত্রপক্ষ আসবে বলে সকাল থেকে কিছু খায়নি নদী। নদীর গলা পেয়ে সুফিয়ান পিছনে তাকিয়ে দেখলো।
নদী হেঁটে এসে কুশনটা কোলে নিয়ে সোফার উপর বসলো। সুফিয়ানের চোখ দুটো র’ক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। নাকের ডগায় জমেছে লাল যে আভা। অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি দিয়ে নদীকে দেখল। নদী ও সুফিয়ানের দিকে তাকালো
” আরে ভাইয়া কখন আসলো? চলে যাচ্ছেন নাকি ভাইয়া? “
সুফিয়ান জবাব দিল না। উল্টো ঘুরে হাটা শুরু করল। নদী ভ্রু কুচকে আবার হাতে ফোনের দিকে নজর দিল। অদিতি গিয়ে নদীর পাশে বসে নদীকে আলতো জড়িয়ে ধরে বলল
” ভাইয়াকে কিন্তু আমার খুব পছন্দ হয়েছে আপু। তোমাদের খুব সুন্দর মানাবে দেখে নিও”
নদী সাইফের দিকে তাকালো।
মুচকি হাসলো।
” সেকি সাইফ ভাইয়ের থেকেও বেশি সুন্দর? “
অদিতি অবাক হয়ে বলল
” ওমা সে কি? তুমি তাকে দেখনি? “
নদীর উপর নিচ মাথা নাড়ালো। অদিতি নদীর হাত ধরে বলল
” তুমি অনেক ভালো আপু। দেইখো তুমি অনেক সুখি হবে।”
সাইফ সিড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় চোখ দিয়ে অদিতিকে ইশারা করলো রুমে আসতে।
বিষয়টা অদিতি খেয়াল না করলেও নদী করলো। সাইফ চলে যাওয়ার পরও অদিতি বসে আছে দেখে নদী বলল
” তোমাকে সাইফ ভাই ডাকছে। যাও”
অদিতি অবাক হয়ে বলল
” কখন ডাকলো আপু? কই আমি তো শুনলাম না “
নদী ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
” সব ডাক বুঝি চিৎকার করে শুনিয়ে দিতে হয়? ভালোবাসার বুঝি আলাদা কোনো ইশারা থাকে না?”
অদিতির মাথায় এত কিছু ঢুকে না। নদীর কথা মত শুধু ঘরে গেলো। আসলেই কি সাইফ ডেকেছে। অদিতি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সাইফ এক হেচকা টানে অদিতিকে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। কোমড় জড়িয়ে ধরে বলল
” সেই কখন আসতে বললাম তোমায়, এতক্ষণ কি করছিলে শুনি?”
অদিতি মনে মনে ভাবছে
” তার নদী আপু ঠিকই বলেছে। উনি সত্যিই ডাকছিলো আমায়? কিন্তু নদী আপু শুনলো আমি শুনলাম না কেন?”
” কি ভাবছো?”
অদিতি জবাব দিলো না। সাইফ অদিতির মুখে উড়ে আসা চুল কানের পিঠে গুজে দিয়ে বলল
” যেটার জন্য এতকিছু, সেটাই এখনো হলো না”
” মানে?”
সাইফ অদিতির নাক টেনে দিয়ে বলল
” এই কথার মানে তুমি বুঝলে তো অনেক কিছুই বুঝতে। আমার কষ্ট টাও বুঝতে”
অদিতির থুতনি ধরে আদুরে কন্ঠে বলল
” একটা চুমু দাও”
অদিতি সাইফের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে
” ছাড়ুন, মা একা একা কাজ করছে”
সাইফ অদিতি কে আরো বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল
” মায়ের যে কাজ সেটা মা একা একা চাইলেও করতে পারবে, কিন্তু আমার যেই কাজ সেটা তো তোমাকে ছাড়া হবে না”
কানের কাছে ফিসফিস করে বলল
” সেটা করতে তোমাকে লাগবে”
এবার অদিতি বুঝতে পেরেছে। লজ্জায় মাথা নিচু করলো আরো। সাইফ হাত দিয়ে অদিতির গাল চেপে ধরে ঠোট নিজের ঠোটের কাছাকাছি আনতেই ফোন বেজে উঠলো।
সাইফ বিরক্তে উফফ শব্দ করে উঠলো অদিতি হেসে সাইফ এর থেকে সরে দাড়ায়। পকেট থেকে বের করে দেখে আননোন নাম্বার। ফোন রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে মেয়ে গলা শোনা যায়
” হাই বেয়াই কি অবস্থা?”
সাইফ কপাল কুঁচকে বলে
” অবস্থা অত্যন্ত বাজে,জঘন্য। কিন্তু আপনি কোন হরিপদর মাসি? আর আমি আপনার কোন জনমের বেয়াই?”
নিশি মুখ বাকিয়ে বলল
” চেহারা তো মাশাল্লাহ, ব্যবহার এত বাজে কেন? আমার ভাইয়ের সাথে আপনার বোনের বিয়ে হচ্ছে। তাহলে তো আমরা বেয়াই – বেয়াইন ই হই তাই না।”
সাইফের তখন স্মরণ হলো নিশির কথা
” ও আচ্ছা, আজকে পাত্রপক্ষের সাথে হলুদ চুল ওয়ালা যে কক মুরগিটা এসেছিল সেটা তাহলে আপনি?”
নিশির আগে ফুসতে ফুসতে বলল
” কি বললেন আপনি আমায়? আরেকবার বলুন “
” বলবো না আমার লজ্জা করে “
নিশি রাগে খট করে ফোন কেটে দিল।
” কি অসভ্য লোক রে বাবা। একটা মেয়ে তাকে নিজে থেকে কল করলো, আর সে তার সাথে এরকম ব্যবহার কি করে করতে পারে?”
তাই হাসতে হাসতে ফোন কেটে অদিতির দিকে তাকিয়ে দেখল, অদিতি বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চট করে মুখ বন্ধ করলো।
” কার সাথে এত হেসে হেসে কথা বলছিলেন? “
সাইফ মাথা চুলকে বলল
” ওই যে নদীর হবু ননদ”
অদিতি একটা কথাও না বলে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সাইফ আহাম্মক এর মত তাকিয়ে থেকে বলল
” আরে চুমুটা তো খেয়ে যাও”
অদিতি সিঁড়ি থেকে চেচিয়ে বলল
” খাবোনা”
সায়রা বলল
” কি খাবে না অদিতি?”
অদিতি বড় বড় চোখ করে তাকাই সায়রার দিকে। কথাটা বেশিই জোরে বলে ফেলেছে
” পাপ….পা..পানি। পানি ছোট মা। পানি খেতে বলছে”
সাইরা স্মিত হেসে বলল
” আচ্ছা নিচে এসো নাস্তা করে নেবে”
বিকেল হয়ে এসেছে। সুফিয়ান গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে সামনে কিছু দেখতে পারছে না, চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে নোনা জলে। কোথায় যাচ্ছেন নিজেও জানেনা। সে থেকে গাড়ি চালিয়ে চলেছে। কোন পথ দিয়ে কোথায় যাচ্ছে নিজেও জানে না। সেই যে নদী নতুন কলেজে উঠলো। নবীন বরণে শাড়ি পড়া নদীকে দেখে সুফিয়ানের চোখ আটকে ছিল। সেই অনুভূতি এত বছর ধরে সুফিয়ান বুকের মধ্যে পেলে পুষে বড় করেছে।
বাবার খায় বাবার পরে বেকার একটা ছেলে। কি করে নদীর বাবাকে বা হাসান চৌধুরীকে বলতো, যে আমি নদীকে বিয়ে করতে চাই। সাইফ কেই বা কিভাবে বলতো ।
যদি সাইফ তার ওপর রাগ করে বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিত। নানান বিরম্বনা ও ভাবনার মধ্যে বলাই হয়ে ওঠেনি, নদীর জন্য তার মনে কি অনুভূতি কাজ করে। বাবাকে বলেছে সামনের মাস থেকে ফ্যাক্টরি খুলবে। বাবা রাজি হয়েছিল। তারপরে গিয়ে আগে সাইফ কে বলবে ভেবেছিল সুফিয়ান। তারপর সাইফকে সাথে করে যাবে হাসান চৌধুরীর কাছে।
কিন্তু, এখন যে পরিস্থিতিতে এসেছে সম্পর্কটা। সুফিয়ান কোনভাবেই বলতে পারবে না তার মনের অনুভূতির কথা। শান্ত স্বভাবের সেই মিষ্টি রমণীকে বুঝি আর ঘরে তোলা হলো না। কেবল মনের ঘরেই বন্দী হয়ে রইল সে। ঠিক যেন খাঁচায় বন্দি থাকা ফুলের মত।
তুযা ওয়াশরুমে গোসল করছে আর গান গাইছে।
“বিয়ের পড়ে হানিমুনে যাবো কক্সবাজার। সেই খানে সাগরে আমরা পাড়ি দিবো সাতার, করবো প্রেমো আলিঙ্গন”
ওর গানের শব্দ নিচ তলা ওবদি আসছে। মেহেরজান গলা করে বলল
” তোরে মাইয়া দিবো কিডা রে গোলাম। তোর যে মা*গি নাচাইন্না স্বভাব। আবার তুই করবি বিয়া হেই বউ নিয়া যাবি কক্সবাজার। হুহহ”
“মনেরই ঘরে, আলেক শহরে, আল্লাহর রাসূল বিরাজ করে রে “
তুযা কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে গান গাইছিল। মেহেরজান বেগম ভেংচি কেটে বললেন
” হনুমানের মুখে আবার আল্লাহর নাম। বলি সূর্য কোন দিক থেকে উঠল, আজ সকাল সকাল গোসল করছেন সাহেব। তা কয়দিন পরে গোসল করা হইল?”
তুযা বেহায়ার মতো হেসে বলল
” বেশি না মাত্র তিন রাত চার দিন”
তুযা মেহেরজানের গা ঘেঁষে বসে বলল
” বুঝলে, অনেক ভেবেচিন্তে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। তোমার জন্য একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দিব”
মেহেরজান বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল
” মরণ! আমি কি কোন ফকিন্নির ঘরের মাইয়া? না কোন ফকিন্নির বউ? আমি হইলাম সাবেক গ্রাম প্রধানের বউ, বর্তমান গ্রাম প্রধানের মা। ভাতা হইল গরিব-দুঃখীদের জন্য।”
তুযা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বড় বড় চোখ করে তাকালো মেহেরজান এর দিকে। ফিক করে হেসে দিয়ে বলল
” এ ভাতার সে ভাতার নয় লা। এই হল ইস্পিশাল ভাতার। যাকে সোয়ামী বলে।”
মেহেরজান বেগম তুযাকে ধরার জন্য খপ করে হাত বাড়ালো।
” গোলামের ঘরের গোলাম আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।”
কিন্তু মেহেরজান ধরার আগেই তুযা মেহের জানের হাত ফসকে পালালো। মেহেরজান জিদে ফুসতে ফুসতে বলল
” আইজ আসুক আমার ছেলে। এই বাড়িতে হয় আমি থাকমু। নয় এই বান্দর ডায় থাকবো। এই বুইড়া বয়সে এত জ্বালা যন্ত্রণা আমার সইবো না।”
তুযা রুমে গিয়ে রেডি হয়ে নিল। খেয়ে বেরোবে ফরেস্ট হাউসে যাওয়ার জন্য। হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে নিচে নামছিলো। গলা উঁচিয়ে মাকে ডাকল
” ওমা নাস্তা হয়েছে? “
তুযার মা, জবাব দিল
” আরেকটু বস বাপ, সময় লাগবে আর একটু “
তুজা মেহেরজান কে চুমু ইশারা করল। বাইকের চাবি পকেটে ভরতে ভরতে মাকে বলল
” আচ্ছা মা যাচ্ছি “
” সে কি নাস্তা না করেই যাচ্ছিস কেন? দশটা মিনিট বস হয়ে গেছে “
” আমার সময় নেই মা বাইরে কোথাও নাস্তা করে নেব “
” মনে করে খেয়ে নিস কিন্তু না খেয়ে থাকিস না”
মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে বলল
” আসছি মেহের টাটা বাই বাই”
মেহেরজান তসবি পড়ছিল। পিছন থেকে ডাকলো
” ও তুযা শোন “
তুযাকে গেটের সামনে দেখা গেল না।মেহেরজান মুখ ভাড় করে বলল
” গেল গা মনে হয় “
তুযা ফিরে এসে হাসিমুখে বললো
” জীবনের প্রথম ভালো করে ডাক দিলে, না এসে পারি। আজকে তোমার জন্য এই জান কুরবান।বলো মেহের কি চাই তোমার”
মেহেরজান বেগম কপাল কুঁচকে বললেন
” ওই যে তোরা কেমনে কল দেস না? দেহন যায় আবার কোথাও কওন যায়। হেই রকম কল দিয়া দেস না ওই বাড়িতে। আমার ছুডো নাতির বউডারে দেখার লাইগা মনডা কেমন আঁকুপাকু করে। ওহাব কইল বউটা নাকি হেই রহমের সুন্দরী। সাইফরে একটু কল দেস না কথা কই।”
তুযা গাল চুলকে বলল
” আচ্ছা এই ব্যাপার। তাইতো বলি এত ভালো করে ডাকলে আমারে “
মেহেরজান বেগম মুখ কালো করে বললেন
” তোরে ভালো কইরে ডাকতাম, খারাপ কইরা ডাকি তোর স্বভাবে “
তুযা সাইফের হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল দিল। সাইফ রিসিভ করে একগাল হেসে বলল
” দাদাভাই আসসালামু আলাইকুম কেমন আছো”
তুযা ফোস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল
” হ রে ভাই ভালই আছি । এই যে মেহের তোর বউরে দেখব। ডাক দে তোর বউরে।”
সাইফ হেসে বলল
“আগে দাদীর কাছে দাও”
তুযা ফোনটা মেহের জানের সামনে ধরে বলল।
” এই নাও তোমার ছোট নাতি।”
মেহেরজান বেগম খুব খুশি হয়ে গেল। সাইফ বলল
” আসসালামু আলাইকুম দাদি। কেমন আছো।”
মেহেরজান বেগম আবেগপ্লুৎ হয়ে বলল
” ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি ভালো আছি দাদুভাই তোমরা কেমন আছো? আমার নাত বউ কই?”
তাই হেসে বলল
“দিচ্ছি দাঁড়াও”
মেহেরজান বেগম আবেগে ফোনের মধ্যেই সাইফের মুখ ছুঁয়ে দিতে গেলে কল কেটে যায়। তুযা তখন মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপেল খাচ্ছে। মেহেরজান বেগম ডাকলো
” কিরে আর দেখন যায় না কেন বন্ধ হইয়া গেল “
তুযার ফোনে এমবি কম ছিল। আপেল খেতে খেতে এগিয়ে এলো
” দাও নেট শেষ হয়ে গেছে “
মেহেরজান বেগম বুঝতে না পেরে মুখ কালো করে জিজ্ঞেস করল
” এ আবার কি? “
তুযা ফোন হাতে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে বলল
” ও তুমি বুঝবানা, তোমারে আবার কাঁচা ওয়ানে ভর্তি কইরা দেওন লাগবো।”
মেহেরজান বেগম মুখ বাংলা পাঁচের মত করে বসে রইল। তুযা বেরিয়ে গেল ফরেস্ট হাউজের উদ্দেশ্যে। বাইক স্টার্ট দেওয়ার সময় সাইফ আবার কল দিল। তুযা রিসিভ করে বলল।
” বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি রে ভাই বাড়ি যাইয়া আবার কল দিমু নি”
” আচ্ছা দাদাভাই “
কল কেটে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল তুযা।
ফরেস্ট হাউসে চারিদিকে কড়া পাহারা বসিয়েছে তুযা। বাইক এসে থামলো ফরেস্ট হাউসের গেটের দিকে। অজ পাড়া গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও পুরা আমেরিকান স্টাইলে বানানো এই ফরেস্ট হাউস। তুযা নিজে ডিরেকশন দিয়ে বানিয়েছে সবটা।
মানিক বাইকের পেছন থেকে নেমে বলল
” আচ্ছা ভাই তাইলে আপনি ভিতরে যান “
দুজা চোখের সানগ্লাস খুলে শার্টের বোতামের জায়গায় আটকে বলল
” আরেকজন আছে “
মানিক কপাল কুঁচকে বলল
” কিডা ভাইজান? “
তুযা ভ্রু উচিয়ে সামনের দিকে ইশারা দিলো। মানিক তাকিয়ে দেখলো জম কালো একটা লেহেঙ্গা পরিহিত সুন্দরী একটা মেয়ে। গায়ে ভারি ভারি গয়না। গারো সাজসজ্জা। তুযা হাত ইশারা করতে মানিক সরে গেল।
মেয়েটা চারিদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে তুযার কাছে এগিয়ে আসলো। আশ্চর্য হয়ে বলল
” এটা কি? “
তুযা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল
” খাঁচা “
” খাঁচা? “
” হ্যাঁ খাঁচা। এই খাঁচায় কত কত ফুল বন্দী”
তুযা ভেতরে গেল। মেয়েটাও গেল পিছন পিছন। তুযা যেতে যেতে বলে
” এই খাচায় ফুল ফোটে। কিন্তু খাচায়ই বন্দি হয়ে থাকে সেই ফুল।”
মেয়েটা চারিদিকে তাকিয়ে দেখে বলল
” কিন্তু আমাকে তো বলা হয়েছিল কোন অনুষ্ঠান আছে, সেখানে আমার নাচার কথা ছিল। কিন্তু এটা আপনি আমাকে কোন জায়গায় নিয়ে আসলেন ছোট সাহেব “
মেয়েটার ভিতরে ঢুকতেই মেনগেট খট করে বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ে ছিটকে উঠল মেয়েটা। তুযা বাঘের ন্যায় হিংস্র রূপ নিয়ে পিছন দিকে তাকালো। খপ করে মেয়েটার গলা টিপে ধরল।
” নাচ গানের নামে মেয়ে পাচারের ব্যবসা করিস, না? বল অদিতি কোথায়? “
মেয়েটা শ্বাস আটকে মরার জো। কাশতে কাশতে বলল
” কে অদিতি? কার কথা বলছেন আপনি?”
তুযা মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ছিটকে ফেললো। মেয়েটা ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো, ওপরে তাকাতেই দেখতে পারলো একটা চেয়ারের সাথে অদিতির সৎ বাবা কে বেঁধে রাখা হয়েছে।
তুযা শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলল
” বেইশ্যা মাগি। এবার কি বলবি বল।”
মেয়েটার আত্মা যেন ভয় শুকিয়ে গেল। তুযা দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা একটা মোটা লোহার লাঠি তুলে নিল। মেয়েটার মাথায় বারি দেওয়ার উদ্দেশ্যে উঠাতেই, মেয়েটা চিৎকার করে উঠে বলল
” বলছি বলছি, আমি সবটা বলছি ছোট সাহেব। দয়া করে আমার প্রাণ ভিক্ষা দিন”
তুযা হাত নামালো
” বল “
মেয়েটার গলা শুকিয়ে আসছে বারবার। ভয়ে ভয়ে বলল
” একটা কুঠিতে বেচে দিয়েছি অদিতিকে।”
তুযা আবার মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল
” কোথায় সেই কুঠি? চল নিয়ে চল আমায়। চল মা*গি”
মেয়েটা ব্যথায় কুকিয়ে উঠে বলল
” কিন্তু সেখানে ওকে পাবেন না। এতদিনে ওকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ ওরা এখান থেকে মেয়ে নিয়ে বেশি দিন নিজেদের কাছে রাখে না। আর অদিতি তো সুন্দরী, ওকে তো মনে হয় সেই দিনই দেয়া হয়েছে পাঠিয়ে”
তুযা লোহার দন্ডটি দিয়ে এক বারিতে মেয়েটার মাথা কয়েক টুকরো করে ছিটকে ফেলল মেঝেতে। র’ক্ত ছিটকে লাগলো দেয়ালে, সামনে বেঁধে রাখা ২ মানুষের গায়েও লাগলো। তুযা লোহার টুকরো কে আছাড় মেরে অদিতির বাবার মাথায় পিস্তল ঠেকালো।
” বল কোন কুটিতে বেঁচে ছিলে অদিতিকে? ও পাতালে থাকলে ওরে পাতাল থেকে আমি ধরে আনমু, ওরে আইনা টুকরা টুকরা কইরা কা’ইট্টা নদীতে ভাসাই দিমু। তা ওরে আমি আনমু। ও একশো পুরুষের বিছানায় যাক। তাও ওরে আমি আইনা আমার খাঁচায় আটকামু। জিদের ভাত আমি কু’ত্তা দিয়ে খাওয়ামু। তাও আমি ওরে খুঁজে বের কইরা আমার সামনে আনমু।”
বাইরে থেকে শোনা যায় পরপর দুইটা গুলির আওয়াজ। তুযা বাইরে এসে মানিক কে বলল,
” হাকি রে খবর দে। আইজ বাইজি খানায় আসরের আয়োজন করতে বল। আর লা’শ তিনটা সরাই ফালা।”
তো যা আমার স্টার্ট দিয়ে চলে যায় সোজা এমপির বাড়িতে। এমপি শাহাদত আলম তখন সন্ধ্যার নাস্তা করছিলেন। তুযা গেটের সামনে বাইক রেখে গটগট করে ভিতরে ঢুকে পড়ল। একজন এমপির সাথে সাধারণত সম্মানের সাথে কথা বলা উচিত। কিন্তু তুযা আবার সম্মান অসম্মানের কথা পরোয়া করে না।
শাহাদত সাহেব তুযাকে বলল
” আরে বাপজান, কতদিন পর তোমার চাঁদমুখ খানা দেখলাম। বসো বসো, এই কে আছিস আমার বাপ জানের জন্য নাস্তা নিয়ে আয়।”
তুযা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো।
” আমি নাস্তা খাইতে আসি নাই চাচা।”
” তাইলে কি করতে আইছো?”
” কোন কুঠির লোকজন এই গ্রামে যাতায়াত করে?”
শাহাদত সাহেব চশমা ঠিক করে বলল
” কি কইতাছো? এসব আমি কেমনে কমু? “
” নাটক করবেন না চাচা, আপনার অগোচরে এই গ্রামের একটা পাতাও নড়ে না। সব খবর আপনার কাছে থাকে। সৃষ্টির টিউশন শেষ হওয়ার আগেই বলুন। আমার ছেলেরা কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে কোচিং সেন্টারের সামনে “
শাহাদত তড়িঘড়ি করে বলল
” দে দে দেখো বাবা, তুমি এর মধ্যে এমন মেয়ে কে আইনো না। আমি কইতাছি দাঁড়াও।”
একবার শুকনো ঢুকলে সাহাদত সাহেব বলল
” তোমার বাপ দাদারা খুব কঠোর গ্রাম প্রধান। আমি তাদের সম্মানও করি। তোমাগো গ্রাম থেকে সচরাচর মাইয়া বাহির হয় না। যার পাশের গা থেকে। একজন নর্তকী আছে, মালতি নাম। ওর সাথে এই ব্যবসার সংযোগ আছে। ঢাকায় একটা বড় কুঠিতে মেয়ে পাঠায়।”
” মালিককে ওই কুঠির? কোথায় পাবো তাকে?”
” এই কুটির মূল হোতারা সবাই ভারতবর্ষের। এখানে যে আছে সে একজন মহিলা। তার নাম গুলাবো।”
তুযা উঠে দাঁড়ায়
” ধন্যবাদ চাচা। সৃষ্টি একটু পরেই বাড়ি চলে আসবে। আমার ছেলেরা ওকে পৌঁছে দিয়ে যাবে।”
রাত 11:30 বাজে তুযাউন বাড়িতে ফিরে। বাড়িতে ফিরে গলা ছেড়ে ডাকে
” ওমা খাবার দাও “
মেহেরজান বেগম খাবার বেড়ে নিয়ে টেবিলে বসে
” তোর মায় ঘুমায় গেছে। খাবার বাইরা দেওন ই। আছে খালি খেয়ে নে।”
তুযা গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে বলল
” এই শীতের মধ্যে তুমি এখনো এখানে বসে আছো কেন? শুয়ে পড়তে পারোনি”
মেহেরজান বেগম রেখে বললেন
” আইসা যদি দেখতে এখানে কেউ নাই, খাবার দেওয়া থাকলেও তো খাইতি না।”
তুযা চট করে তাকালো মেহেরজানের দিকে। তার ঠোটে আপনাআপনি হাসি খেলে গেলো। মেহেরজান বলল
” নে খা। জলদি কইরা খায়া শুইয়া পড়।”
তুযা চেয়ারে না বসে মেহেরজানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল
” তুমি আমার জন্য এত রাত জেগে এই শীতের মধ্যে বইসা আছো?”
” তা কি করুম। বিয়া সাদি তো করবা না। মাইয়াগো লগে ফষ্টিনষ্টি করার জন্য মনে ধরে। বিয়ার জন্য তো তোমার কোন মাইয়ারে মনে ধরে না।”
তুযা মেহের জানের কাছে এসে বসে বলল
” একটারে মনে ধরেছিল দাদি। বা ল পাকনামি করতে যাইয়া ভাগছে। এখন যাইয়া পড়ছে কুটিতে। ম*** কোথাকার “
” থাক বাদ দে। যা যা খাওন ঠান্ডা হয়ে গেল।”
তুযা নিজের মত খাবার খাচ্ছে। মেহেরজান বেগম বলল
” তোর বড় বোনের বিয়ে ঠিক হইছে”
“তাই নাকি। কবে? বললে নাতো”
” তোর কি আর শোনার সময় আছে? ঠিক হয়েছে তো আজকে। দশ তারিখে আংটি পড়াইবো। তার ফিরে সপ্তাহে বিয়া। আমগো হগলরে কালকেই যাইতে কইছে। তা ওয়াহাব কইয়া বুঝাইয়া, গায়ে হলুদের আগের দিন যাইবো কইছে।”
তুযা খাবার চিবোতে চিবোতে বলে
” তোমরা যাইও”
” কেরে তুই যাইতি না? “
” আমি কি করতে যাইতাম? “
মেহজান বেগম তেতে উঠে বলল
” হ্যাঁ তা তো ঠিকই। তোর আবার কোন কাম আছে নাকি। তুই হলি বংশের বড় পোলা। মাইয়ার বড় ভাই। তুই কইতাছোস তোর হেনে কি কাম?”
তুযা হাত ধুয়ে উঠে পড়ল। জ্যাকেট পড়তে পড়তে বলল
” যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
” তুই আবার কোথায় চললি? “
” আসর আছে আজ”
মেহেরজান বেগম উঠে যেতে যেতে বলল
” তুই আর ভালো হইতি না। তোরে খাওয়ান ডি আমার বিফলে গেল।”
তুযা নির্লজ্জের মত হো হো করে হাসতে লাগলো।
” এই নদী! নদী? আরে এই নদী। কিরে উঠ”
সকাল বেলা মায়ের চেচামেচি তে ঘুম ভাঙলো নদীর। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল
” কি হয়েছে? এভাবে ডাকছো কেন মা?”
সায়রা বেগম নদীর মাথার ওপর থেকে কমফোর্টার উঠিয়ে বলল
” আরে তুমুল এসেছে। তোর সঙ্গে দেখা করতে। ওঠ।”
নদী চোখ পিটপিট করে বলল
” কে এসেছে? “
” তুমুল, তুমুল”
ব্যাস নদীর ঘুম উধাও। চট করে উঠে বসলাম।
” ওই লোকটা আজ কি করতে এসেছে তাও আবার এত সকালে?”
সায়রা বেগম রেগে বললেন
” ঘড়িতে দেখেছিস? নয়টা টা বেজে গেছে। এত সকাল কোথায় পাচ্ছিস?”
নদী চোখ ডলতে ডলতে বিছানা থেকে নামলো। সায়রা বলল
” হাত মুখ ধুয়ে আয়। ও ড্রইং রুমে অপেক্ষা করছে।”
নদী ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ছুয়ে চুল আঁচড়ে মাথায় ওড়না দিয়ে ড্রয়িং রুমে গেল। আজ তুমুল পাঞ্জাবি পড়ে আসেনি। এসেছে ফরমাল পোশাকে। কাল ফরমাল প্যান্ট সাথে ইন করার সাদা শার্ট। উপরে কালো কোট পড়েছে। আর যেন একটু অন্যরকম লাগছে তুমুল কে। চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে জেল দিয়ে সেট করা সেদিনের মতো এলোমেলো নয়।
নদী গিয়ে দাঁড়াতেই তুমুল সালাম দিল
” আসসালামু আলাইকুম “
নদি ছোট্ট করে বলল
” ওয়ালাইকুম আসসালাম “
তুমুল আঞ্জুমান কে উদ্দেশ্য করে বলল
” আঙ্কেলকে দেখছি না যে।”
” উনি সংসদে গেছেন। তোমরা গল্প করো আমি নাস্তা নিয়ে আসছি”
আঞ্জুমান যেতেই নদী আর অস্বস্তিতে পড়ে গেল । তোমার মৃদু কাশি দিয়ে বলল
” বসুন”
নদী সোফার শেষ প্রান্তে গিয়ে বসলো। দুজনেই চুপচাপ বসে আছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। সংকোচ কাটিয়ে বলেই ফেলল
” কিছু কি বলবেন?”
” কেন? “
নদী আমতা আমতা করে বলল
” না মানে আজ এসেছেন তাও আবার সকাল সকাল “
তুমুল মুচকি হেসে বলল
” কেন এমনি এমনি হবু শ্বশুরবাড়িতে আসতে পারি না?”
নদীর ভ্রু উঁচিয়ে বলল
” এমনিই এসেছেন? “
” হ্যাঁ আজ ঢাকাতে একটা মিটিং আছে। তাই ভাবলাম ঢাকাতে এসেছি যখন সবার সাথে দেখা করে যাই। দেখে যাই সবাই কেমন আছেন।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তোমার আবার বলল
” এমনিতে সবার সাথে দেখা করা তো বাহানা মাত্র। আমি তো এসেছি আপনাকে দেখতে”
নদীর অবাক হয়ে তাকালো তুমূলের দিকে। তুমুল একপাশের ভ্রু উঁচা করে বলল
” সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য সরি ম্যাডাম”
তুমুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল
” আজ ঘুম ভাঙিয়ে দেখে গেলাম, আই উইশ খুব শিগগিরই ঘুম ভাঙলেই আপনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখবো।”
” আসি ম্যাডাম?”
নদী নির্বাক। কোন কথা বলতে পারেনা। এই লোকটা ধাপে ধাপে তাকে আশ্চর্য করে দিচ্ছে। এমন ভাবে কথা বলছে যেন কতকালের চেনা। অথচ কালকেই দেখা দুজন দুজনের। আঞ্জুমান বেগম তুমুলকে দাঁড়াতে দেখে বলল
” বাবা নাস্তা করে যাও “
” আজ না আন্টি। অন্য কোন দিন করব। আজ আসি, ভালো থাকবেন আসসালামু আলাইকুম “
” ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা সাবধানে যেও “
আঞ্জুমান নদীর হাতে চায়ের কাপ দিয়ে বলল যাও ভাইকে চা দিয়ে এসো। নদী একবার চায়ের দিকে তাকিয়ে আরেকবার আঞ্জুমানের দিকে তাকালো।
” ভাবি থাকতে আমি কেন?”
” ও পরোটা বানাচ্ছে তুমি দিয়ে এসো “
নদী বাধ্য হয়ে চায়ের কাপটা নিল। ছেড়ে দিয়ে উপরে উঠে সাইফের ঘরে গেল। দরজা নক করে বলল
” আসবো ভাইয়া? “
সাইফ একটু থমকালো। দীঘি সাইফ কে ভাইয়া ডাকলেও নদী সবসময় সাইফ ভাই বলেই ডাকে। আজ হঠাৎ ভাইয়া ডাকছে।
” আয়, নদী।”
” আপনার চা”
চায়ের কাপটা সাইফের হাতে দিয়ে নদী চলে আসছিল। সাইফ পেছন থেকে ডাকলো
” নদী শোন “
নদীর দাড়ালো কিন্তু পিছনে ফিরল না। সাইফ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল
” তুই কি আজ ফ্রি আছিস?”
” কেন? “
” তুমুল ঢাকায় এসেছে তাই ও বলছিল এনগেজমেন্ট এর সব শপিং যাতে করে আসিস আজই। আর যদি তোর কোন কাজ থাকে তাহলে কাল যাবে বলেছে।”
” কিন্তু এখনো তো আরো চার দিন বাকি “
” * আগের কাজ আগে মিটিয়ে রাখাই ভালো না?”
নদী সাইফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
- কে কে যাবে?”
- তুই ওর তুমুল। আর কে যাবে আবার?”
নদীর চটকরে মাথায় আসলো সিমির কথা।
- আমি কিন্তু আমার একজন বান্ধবীকে নিয়ে যাব”
‘আচ্ছা যাস”
নদী এক দৌড়ে ঘরে গিয়ে সিমির নাম্বারে কল করল। দুইবার রিং হওয়ার পর তিনবারের মাথায় সিমি কল রিসিভ করো।
- হ্যাঁ নদী বল।’
- আমার এনগেজমেন্টের ডেট ঠিক হয়ে গেছে”
- কংগ্রাচুলেশন’
- তোর ফাজলামো রাগ আজ ওই লোকটা…… আমাকে নিয়ে শপিংয়ে যাবে বলছে। আমি কিন্তু তোকে ছাড়া যাব না।”
- ওই লোকটা আবার কে”
নদীর সংকোচ নিয়ে জবাব দিল ‘ওই যার সাথে আমার বিয়ে হতে চলেছে
সিমি সাফ সাফ না করে দিল
*সরি রে দোস্ত, আমার নানু খুব অসুস্থ। আমাকে এক্ষুনি নানু বাড়ি যেতে হবে।”
সিমির পাশে বসে মুচকি মুচকি হাসছে তুমুল। নদী মন খারাপ করে বলল। * তাহলে আর কি করার? আমার একলাই যেতে হবে ওই লোকটার সাথে
সিমি ফোন কেটে দিয়ে তুমুলের সাথে হাত মিলালো। তুমুল হ্যান্ডশেক করে বলল * গ্রেট জব মাই সিস্টার”
- থ্যাংক ইউ ভাইয়া। ট্রিট দিতে হবে কিন্তু।”
- নিশ্চয়ই “
- ভাইয়া জানো ও খুব লাজুক। কারো সাথে সেভাবে মেশেনি তো, আর জানোই তো সাইফ ভাই……”
“বাদ দে”
- ও নিজের পছন্দের অপছন্দের কথা সহজে মুখ ফুটে বলে না। আযই উইশ তুমি ম্যানেজ করে নিতে পারবে ভাইয়া। তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।”
- ওকে মাই সিস্টার খালামণিকে ডাক আমার বেরোতে হবে।”
সিমির মা এসে বলল
- সে কিরে মাত্রই তো এখনই চলে যাবি। নাআআআ আমি তোকে এখন যেতে দিবো না।”
সিমি কে বলল * আম্মু ভাইয়া একটা ইম্পরট্যান্ট কাজে যাচ্ছে। প্লিজ আটকিও না।’
তোমার খালামণিকে হাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। নদী বোরখা পড়ে খাটের উপর বসে আছে। এর মধ্যে ফোনে কল আসে। অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ
করে ফোন কানে নিতে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠস্বর * আপনার বাড়ির সামনে গাড়ি নিয়ে ওয়েট করছি”
নদী কিছু না বলে ফোন কেটে দেয়। মনিমা এবং মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে যায়।
তুমূল ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। নদীকে বেরোতে দেখে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। নদী কাছাকাছি আসতে
পাশের সিটের দরজা খুলে দিল। নদীর ছোট্ট করে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। তুমুল গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল
- আপনার পছন্দের শপিংমল কোনটা? আই মিন কোন শপিং মল থেকে কেনাকাটা করেন?”
- আমার পছন্দের আলাদা কোন শপিংমল নেই যেখান থেকে যে জিনিসটা ভালো লাগে সেখান থেকে নিই।”
তোমার বারবার লুকিং মিররে দেখছে নদীকে। নদী খুব অস্বস্তি বোধ করছে। কিছুক্ষণ পর তুমুল বলল * হিজাব পরে আপনাকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে মাশাল্লাহ”
নদীর জবাব দেয় না। কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে। তুমুল নদীকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গাউন ম্যাচিং জুয়েলারি আরো যা যা লাগে
কিনলো। নদীর বেশি কথাই বলতে হয় নি।
যেন নদীর পছন্দ অপছন্দ সব তুমূলের মুখস্থ। তুমুলের কেনা কাটা, পছন্দ, দর দাম করার ধরণ, সব কিছু এত স্মার্টলি মেইনটেইন করার ট্যালেন্ট দেখে নদী সত্যিই মুগ্ধ। ভিতর চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসলো * এমনটা যদি সাইফ ভাই হতো!”
একটা একটা করে কেনা শেষে সেগুলো গাড়িতে নিয়ে রাখছে তুমুল। নদী খুবই সিম্পল জুয়েলারি পছন্দ করে তাই ডায়মন্ড এর শপে নিয়ে গেলো তুমুল চেইন এর সাথে লকেট কেনার জন্য। নদী ডিজাইন গুলো একটা
একটা করে দেখছে। তুমুল খেয়াল করলো। একটা ছেলে ইচ্ছা করে নদীর গা ঘেষে দাড়িয়েছে। তুমুল নদীর বাহু ধরে টান দিয়ে নদীকে সরিয়ে আনলো। তারপর নিজে ওই পাশে গিয়ে নদীকে বলল * আমার মনে হচ্ছে আপনাকে এটাতে ভালো মানাবে
নদী দেখলো তুমুলের হাতের লকেটটা আসলেও সুন্দর। সেটাই নিয়ে নিলো। তুমুল নদীকে টাচ করায় নদী অবাক হয়েছে অনেকটা।
এমন কেন করলো। তখন নদী খেয়াল করলো তুমুলের ওইপাশে কয়েকটা ছেলে দাড়িয়ে আছে। বিষয়টা বোধগম্য হতেই নদী কৃতজ্ঞতার চোখে তাকালো
তুমুলের দিকে।
তুমুল মানি ব্যাগ থেকে কার্ড বের করতে করতে বলল * এভাবে তাকাবেন না প্লিজ। এখনো অধিকার পাইনি আপনার ওপর”
দুজনে বেড়িয়ে আসলো। তুমুল জানালো * চলুন কোনো রেস্টুরেন্টে বসি।”
নদী বলল
- সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। আপনার ফিরতে রাত হয়ে যাবে। চলুন এখন
তুমুল আবদার করে বলল * আরেকটু থাকি না একসাথে”
নদী আসলেই আশ্চর্য হচ্ছে। তুমুল নদীকে স্বাভাবিক
রাখতে বলল
- আচ্ছা চলুন সমস্যা নেই”
নদীকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলো। নদী ব্যাগ গুলো দারোয়ান কে কিছু দিলো। সে সবকিছু ভিতরে নিয়ে গেলো। নদী আসছি বলে হাটতে শুরু করলো। তুমুল পিছন থেকে বলল
- নদী”
নদী পিছনে ফিরলো। তুমুল কিছু বলল না। মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট করলো। এবার নদীও হাসলো। “লোকটা একদম পাগল।”
নিজের কথায় নিজেই লজ্জা পেল নদী। কি বলল সে নিজে। বাড়িতে ঢুকার পর সব জিনিস সবাই দেখছে আর এটা ওটা নদীকে জিজ্ঞেস করছে। নদীর কান দিয়ে কিচ্ছু যাচ্ছে না। যে যেটাই দেখাচ্ছে সেটাই তুমুল
পছন্দ করেছে। সকলে তুমুলের চয়েসের প্রসংশা করতে ব্যাস্ত।
সাইফ হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামলো। সকলে সাইফের দিকে তাকায়। আঞ্জুমান বলল * কিরে কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছিস এভাবে?”
- সুফিয়ান গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা খুবই সিরিয়াস। আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে
চলবে?
এই গল্পের মানুষগুলো খালি ভুলভাল মানুষকে পছন্দ করে বসে থাকে কেন, আজব
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫