Golpo romantic golpo এক টুকরো মেঘ

এক টুকরো মেঘ পর্ব ১


⛔প্রাপ্ত বয়স্ক এলার্ট⛔


—“আহ্ আস্তে। ব্যথা পাচ্ছি রায়হান।”

—“কেনো? এতোদিনে তো তোমার অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা।”

—“অভ্যাস হবে কিভাবে? প্রতিবার তুমি এমন হায়েনার মতো আচরণ করো।”

—“তুমি এতো বেশি হট নিলু। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না।”

নিষিদ্ধ শব্দগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই কান দুটো জ্বলে উঠলো মেঘার। হাতে ধরে রাখা ফোনটা শব্দ করে ফ্লোরে পড়ে গেলো। ফোনের স্ক্রিনে এখনও সেই অপ্রীতিকর দৃশ্য রঙিন সিনেমার মতো চলছে। যেখানে দুটো নগ্ন দেহ লেপ্টে আছে একে অপরের সাথে। মুহুর্তেই চোখ ছাপিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো মেঘার। ফোনে যে দুজন মানব মানবির অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তারা আর কেউ নয়, মেঘার হবু স্বামী রায়হান এবং তারই বেস্ট ফ্রেন্ড নিলুফা। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিয়ের সাজানাই বাজতে চলেছে মেয়েটার। অথচ শেষ সময়ে এসে এতবড় ধাক্কা।

আলতো করে মেঘার কাঁধে হাত রাখলো নুরি। হঠাৎ কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ অনুভব হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মেঘা। নুরি মলিন কন্ঠে বললো,

—“তোকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য ছিলো না মেঘা। কিন্তু সত্যিটা জানানোও জরুরি ছিলো। নিলু আর রায়হান তোকে ঠকাচ্ছে। তোর অগোচরে ওরা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। ওরা নিয়মিত হোটেলে গিয়ে দেখা করে। এই ভিডিওটা ওই হোটেলের একজন স্টাফকে দিয়ে করানো।”

মেঘা শান্ত নদীর মতো চুপ হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। কণ্ঠনালী ভেদ করে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। ভরসাযোগ্য মানুষদের থেকে আচমকা ধাক্কাটা পায়ের নিচের মাটি কাঁপিয়ে তুলেছে মেঘার। সে লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করলো। পার্স থেকে ফোন বের করে একটা ম্যাসেজ পাঠালো রায়হানের নাম্বারে। এরপর চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে লাগলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটার।

প্রায় মিনিট দশেক পর সেখানে আগমন ঘটলো রায়হানের। বর্তমানে কফিশপটা পুরোপুরি ফাঁকা। খুব বেশি সকাল হওয়ায় এখনও লোক সমাগম শুরু হয়নি। রায়হান লম্বা লম্বা কদম ফেলে চলে গেলো একদম কর্ণারের টেবিলে মেঘার কাছে। চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসতেই একজন ওয়েটার এনে দুজনের সামনে দুটো কফি দিয়ে গেলো। গরম গরম কফিতে চুমুক দিয়ে রায়হান স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

—“এতো সকাল সকাল জরুরি তলব যে? শপিং বাদ আছে এখনও?”

—“আমাকে তোমার কেমন লাগে রায়হান? অনেস্টলি এন্সার দেবে। আমি কোনো ভনিতা চাই না।”

হঠাৎ মেঘার কাঠকাঠ কন্ঠের প্রশ্ন শুনে ভড়কে গেলো রায়হান। আমতা আমতা করে বলল,

—“কেমন লাগবে? অবশ্যই ভালো লাগে। এজন্যই তো বিয়ে করতে চাইছি।”

—“তাহলে আমার অগোচরে, আমারই বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে অবৈধ সম্পর্কে কেনো জড়ালে রায়হান? নিলুই কেনো? আমি কেনো নই?”

আচমকা মেঘার এহেন প্রশ্নে থমকে গেলো রায়হান। ধরা পড়ে গিয়ে চোরের মতো নজর লুকাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। মুহুর্তেই কোনো জবাব মাথায় সাজিয়ে উঠতে পারলো না। রায়হানকে এভাবে চোরের মতো নজর লুকাতে দেখে ফিক করে হেঁসে দিলো মেঘা। ঠোঁটের কোণে হাসি, অথচ চোখ ভর্তি তপ্ত নোনাজল। মেঘা বিদ্রুপ স্বরে বললো,

—“ইসস…. চুরি এভাবে ধরা পড়ে গেলো? অবশ্য ধরা পড়ে ভালোই হয়েছে। নাহলে আজকের এই কঠিন সিদ্ধান্ত কিভাবে নিতাম?”

এটুকু বলেই থামলো মেঘা। চেয়ারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে কাঠকাঠ কন্ঠে বললো,

—“তো মিস্টার রায়হান খান। আমি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইসহাক তালুকদারের একমাত্র মেয়ে ইনায়া আফরোজ মেঘা, ঢাকা শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়িক আফতাব খানের ছোটো ছেলে রায়হান খানের সাথে এই বিয়ে ভেঙে দিলাম। আজ এই মুহুর্ত থেকে তুমি মুক্ত।”

এই পর্যায়ে রায়হানের চেহারার নকশা বদলে গেলো। ভদ্র সভ্য চেহারার মুখোশ খুলে পড়ে গিয়ে বেরিয়ে এলো একটা ভিন্ন রুপ। রায়হান কটমট করে বলে উঠলো,

—“নিজেকে কি মনে করো তুমি? কোন দেশের বিশ্ব সুন্দরী? কি আছে তোমার মাঝে, যায় জন্য আমি রায়হান আকর্ষন বোধ করবো? আয়নায় নিজেকে দেখেছো কখনো? নারীর দেহের আকর্ষনীয় ফিগারেই পুরুষ আটকে যায়। সেখানে তুমি? নিজের দিকে তাকাও একবার। এই পাতলা ছিপছিপে গড়ন দিয়ে কোনো পুরুষের মন ভরানো যায় না মেঘা। সো নিজেকে বড়ো কিছু ভাবা বন্ধ করো।”

—“বুঝলাম। তবে কোনো প্রেমের সম্পর্ক তো ছিলো না আমাদের মধ্যে। বিয়েটা পারিবারিক ভাবে ঠিক করা হয়েছিল। তোমার অমত থাকলে আমাকে সরাসরি বলতে।”

—“ও হ্যালো। ইচ্ছে করে রাজি হইনি বিয়েতে। শুধু মাত্র বাবার জোরাজুরিতে বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য হয়েছি। নাহলে তোমার মতো একটা আনফিট মেয়েকে কোনো ছেলেই স্বেচ্ছায় গ্রহন করবে না। কি হবে তোমাকে দিয়ে? ধরার মতো কোনো জায়গা আছে তোমার দেহে? তোমাকে দিয়ে তৃপ্তিই তো পাওয়া যাবে না। তাই সময় থাকতেই নিজের জন্য বেটার অপশন বেছে নিয়েছি। নিজের ভবিষ্যত নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছি। এটা দোষের কিছু নয়।”

মেঘার কান দুটো জ্বলে উঠলো এই পর্যায়ে। বডি শেমিং ভাইরাসের মতো একটা সংক্রামন ব্যাধি। যেটা মন থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কক আক্রান্ত করে ফেলে। যার ফলাফল, নিজের প্রতি হীনমন্যতা এবং আত্নবিশ্বাস কমে যায়। মেঘার সাথেও ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। তার এই ছিপছিপে নিরেট স্বাস্থ্যই সবচেয়ে বড় অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। একবুক ঘৃণা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো মেঘা। আর এক মুহুর্তও দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে।


“কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ইনচেওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি। অনুগ্রহ করে আপনারা নিজেদের সিট বেল্ট বেঁধে নিন।”

আচমকা মাইকে ক্যাপ্টেনের আওয়াজ শুনে কল্পনা থেকে বেরিয়ে এলো মেঘা। খুব শিঘ্রই প্লেন ল্যান্ড করবে ইনচেওন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। চলন্ত প্লেনে বসেই তিক্ত স্মৃতি আরও একবার স্বরণ করছিল সে। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা মেঘাকে আঘাত করলেও পুরোপুরি ভাঙতে সক্ষম হয়নি। বরং রাগে, জেদে সেই দিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। রায়হানের চেয়ে বড়ো কিছু হয়ে এই অপমানের যোগ্য জবাব দেবে। সেই রেশ ধরে এক সপ্তাহের মধ্যেই বিদেশের পথে রওনা হয়েছে মেয়েটা।

তবে কোরিয়াতে এটাই মেঘার প্রথম যাত্রা নয়। মেঘার মামা পরশ এহসান পুরো পরিবার সমেত দক্ষিণ কোরিয়াতে সেটেল্ড। সেই সুবাদে বেশ কয়েকবার মেঘা কোরিয়াতে গেছে। অবশ্য লেখাপড়া সহ, নানান ব্যস্ততায় গত আট বছরে একবারও যাওয়া হয়নি সেখানে। জীবনের এই মুহুর্তে এসে চূড়ান্ত ঠকা ঠকে গিয়ে মেঘা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে মামার কাছে গিয়ে কোরিয়াতে থাকবে। লেখাপড়া করে নিজের ক্যারিয়ার গড়বে। সেই উদ্দেশ্যেই পাড়ি জমিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার পথে।

ভাবনার মাঝেই প্লেনটা ল্যান্ড করলো এয়ারপোর্টে। মেঘাকে রিসিভ করতে সেখানে অপেক্ষা করছিল তার মামাতো বোন আয়রা। বর্তমানে এই বিদেশের মাটিতে ওরাই মেঘার একমাত্র সম্বল। এতোগুলা বছর পর পরিচিত মুখ দেখে খুশিতে আপ্লুত হয়ে গেলো আয়রা। যদিও আয়রা বয়সে মেঘার চাইতে ছোটো। কিন্তু আচার আচরণের দিক দিয়ে মেয়েটা খুবই চঞ্চল স্বভাবের। আয়রা ছটফটে কদমে এগিয়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেঘাকে। টুকটাক কুশল বিনিময় করে মেঘাকে নিয়ে বসে পড়লো নিজেদের ব্যাক্তিগত গাড়িতে।

মুহুর্তেই সাদা রঙের দামী গাড়িটা সাই-সাই করে ছুট লাগালো বুসানের উদ্দেশ্যে। গাড়িটা চলতে শুরু করতেই মেঘা সিম কার্ড পাল্টে ফোন লাগালো নিজের বাবাকে। দুই বার রিং হতেই সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করলেন ইসহাক তালুকদার। ভদ্রলোকের কন্ঠে চিন্তার রেশ,

—“আম্মা! কতদূর গেছো তুমি?”

—“এয়ারপোর্ট থেকে মাত্রই গাড়িতে উঠলাম বাবা। চার পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই বাসায় পৌঁছে যাবো।”

—“তোমার মামা নিতে এসেছে?”

—“মামা আসেনি, তবে আয়রা এসেছে।”

ভদ্রলোক একটু চুপ হয়ে গেলেন। কথার মাঝে সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে বললেন,

—“আর একবার ভেবে দেখলে হতো না আম্মা? এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া কি ঠিক হলো?”

—“আমি ঠিক বেঠিক কিছু বুঝি না বাবা। ওই লোকটা আমাকে ঠকিয়েছে। প্রতারণা করেছে আমার সাথে। এমন জঘন্য মানুষের চেহারাও আমি দেখতে চাই না।”

ওপাশ থেকে শোনা গেলো এক অসহায় বাবার বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। একমাত্র সন্তানকে নিজের থেকে এতদূরে পাঠাতে কোনো বাবারই মন সায় দেয় না। কিন্তু জেদি মেয়েটার জেদের কাছে বরাবরই হার মেনে নেন ইসহাক তালুকদার। মেয়েটা বাবা মায়ের থেকে বহু কিলোমিটার দূরে চলে গেছে। কষ্ট শুধু এটুকুই। এর বাইরে, মেয়েটা বিদেশে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই বা কম কিসে? মনকে সাত পাঁচ বুঝ দিয়ে মানিয়ে নিলেন ইসহাক তালুকদার। ছোট্ট করে বললেন,

—“সাবধানে থেকো। নিজের খেয়াল রেখো। তোমার মা খুব চিন্তায় আছে তোমাকে নিয়ে। ওকে গিয়ে খবর দেই। রাখছি তাহলে।”

নিঃশব্দে কলটা কেটে দিলো মেঘা। কান থেকে হাত নামিয়ে মাথাটা পেছনে এলিয়ে দিলো। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য এখনও চোখের পাতায় ছবির মতো ভাসছে। কাছের মানুষ থেকে পাওয়া এতো বড় ধোঁকা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মেঘা। রায়হান নাহয় পর, কিন্তু নিলু? ওর নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কিভাবে পারলো এমন জঘন্য কাজ করতে? একবারের জন্যও কি বিবেক বাঁধা দেয়নি? ভাবতে ভাবতে চোখ থেকে গলগল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো মেঘার। ছটফটে আয়রাও মেঘার শুকনো মুখ দেখে থমকে গেছে। সে আলতো করে মেঘার কাঁধে হাত রেখে বলল,

—“লোকটাকে তুমি খুব ভালোবাসতে তাই না আপু?”

চকিতে মাথা তুলে তাকালো মেঘা। মুহুর্তেই চোখের পানি শুকিয়ে গেলো যেনো। মেঘা কঠিন গলায় জবাব দিলো,

—“প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক ওনার সাথে আমার ছিলো না আয়রা। বিয়েটা ঠিক করা হয়েছিল পারিবারিক ভাবে।”

—“তাহলে তুমি এতো ভেঙে পড়ছো কেনো?”

—“ভেঙে পড়িনি আমি। ভেঙে পড়লে আজ কোরিয়া পর্যন্ত এসে পৌঁছাতে পারতাম না। তবে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের থেকে পাওয়া ধোঁকা মেনে নিতে পারছি না। ব্যাস এতটুকুই।”

আয়রা আর কোনো কথা বললো না। সম্পর্কটা প্রেম ভালোবাসার হোক বা অন্য কিছু। বিয়ে তো ঠিক হয়েছিল। ওই মানুষটাকে নিয়ে মেয়েটা কল্পনায় একটা অদৃশ্য সুখের সংসার সাজিয়েছিল। হুট করেই সেই সাজানো গোছানো স্বপ্ন ভেঙে গেলে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং মেঘাকে একটু সময় দেয়া উচিত। কিছুদিন গেলে নিজে থেকেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারবে।

ব্যাস্ত রাস্তার কোণ ঘেঁষে চলতে থাকা গাড়িটা দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা লম্বা জার্নির পর, অবশেষে নিজ গন্তব্যে পৌঁছালো। গাড়ি থেকে নেমে একবার ক্লান্ত চোখে চারিদিকে নজর বুলালো মেঘা। শহরের চারিদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া। বহুতল ভবনগুলো আরও বেশি আকর্ষনীয়। বাংলাদেশের তুলনায় শহরটা অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক। ক্লান্ত নজর জোড়া চারিদিকে বুলাতে বুলাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করলো মেঘা। বড়ো গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সবার আগে নজরে পড়লো বড়ো একটা এ্যাকুরিয়াম। তাতে অসংখ্য রঙিন মাছের মেলা বসেছে। চলতে থাকা ছোটো ছোটো মাছগুলো দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো মেঘার। যাক, এখানে নিজের মনের মতো কিছু বন্ধু তো খুঁজে পাওয়া গেলো। অবসরে এই রঙিন মাছের সাথেই না হয় সুখ দুঃখ ভাগ করে নেবে সে।

বাড়িতে প্রবেশ করতেই মেঘাকে নিয়ে দোতলার দিকে হাঁটা দিলো আয়রা। যেতে যেতে বললো,

—“আপাতত বাড়ি ফাঁকা। বাবা, মা দু’জনেই অফিসে গেছেন একটা জরুরি মিটিংয়ে। যদিও আজ যাওয়ার কথা ছিলো না, কিন্তু হঠাৎ করে মিটিং পড়ে যাওয়ায় যেতেই হলো। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। বাবা মা তাড়াতাড়ি চলে আসবে।”

মেঘা মুখে কোনো জবাব দিলো না। বরং নিঃশব্দে পা মেলালো আয়রার সাথে। সিঁড়ি পেরিয়ে খানিকটা যেতেই আচমকা আয়রার ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে পরিচিত নাম্বার দেখে তড়িঘড়ি করে রিসিভ করলো আয়রা। মেঘাকে আঙ্গুলের ইশারায় রুম দেখিয়ে দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে উল্টো দিকে চলে গেলো। ছোট্ট করে একটা দম নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো মেঘা। দোতলার এদিকে মোট চারটা রুম দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে একটা রুম বাদে বাকি তিনটাই লক করা। খোলা রুমটা নিশ্চয়ই মেঘার জন্য। নিজের মনে আন্দাজ করে নিয়ে রুমের ভেতর ঢুকে পড়লো মেঘা।

কৌতুহলী চোখে একবার পুরো রুম জুড়ে নজর বুলালো। রুমটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই বড়। চারিদিক একদম ঝকঝকে তকতকে পরিস্কার। কোথাও বিন্দু মাত্র ধুলোর চিহ্ন নেই। হাতের লাগেজটা খাটের একপাশে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো মেঘা। নরম তুলতুলে বিছানায় শরীর ছোঁয়াতেই প্রশান্তিতে চোখ বুজে এলো। দীর্ঘ যাত্রার সকল ক্লান্তি এক নিমেষেই উবে গেলো যেনো। অলস ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করলো মেঘা। আহ্, মনে চাইছে সবকিছু ভুলে একটা লম্বা ঘুম দিতে। ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো আরও আটঘাট করে বন্ধ করলো মেঘা। ঠিক এমন সময় স্ট্রং একটা পারফিউমের গন্ধ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নাকে এসে ধাক্কা খেলো। স্মেলটা মেঘার অপরিচিত। তবে ঘ্রাণটা পাগল করে দেওয়ার মতোই অদ্ভুত সুন্দর। পারফিউমের গন্ধের উৎস খুঁজতে ফট করেই চোখ মেলে চাইলো মেঘা। শোয়া থেকে তড়িৎ উঠে দাঁড়ালো। এরপর সামনে তাকাতেই চোখ দুটোতে বিস্ফোরণ ঘটলো যেনো।

নিজের রুমে অপরিচিত একজন পুরুষকে দেখে ভড়কে গেলো মেঘা। তারচেয়ে বেশি আশ্চর্য হলো লোকটার অবস্থা দেখে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে বের হওয়া সুদর্শন যুবকটির দেহের উপরিভাগ সম্পুর্ন উন্মুক্ত। সুঠাম দেহের প্রতিটি কোণায় বিন্দু বিন্দু পানিকণা বিদ্যমান। ভেজা চুলগুলো কপাল ছাড়িয়ে চোখ পর্যন্ত ঢেকে দিয়েছে। যার ফলে চেহারাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মাথার পানি না মোছায় মসৃণ চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখা টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মোছায় ব্যাস্ত ব্যাক্তির আশেপাশে কোনো দিকে খেয়াল নেই। সে আপনমনে ড্রেস চেঞ্জ করায় ব্যাস্ত। স্বাভাবিক ভাবেই সে কাবার্ড থেকে নিজের জন্য একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার বের করে নিলো। এরপর কোমরে জড়িয়ে রাখা টাওয়ালটা একটানে খুলে টাইলসের ফ্লোরে রেখে দিলো। আচমকা এহেন দৃশ্যে তাজ্জব বনে গেলো মেঘা। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য মাথায় জং ধরিয়ে দিলো। একেই লং জার্নিতে কাহিল দেহ। তারওপর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। সব মিলিয়ে শরীরটা আর শক্ত থাকতে সায় দিলো না মেয়েটার। মুহুর্তেই অচেতন হয়ে ঢলে পড়লো নরম তুলতুলে বিছানায়।

কিছু একটা পড়ার শব্দে হকচকিয়ে পেছন ফিরে তাকালো ছেলেটা। এরপর বিছানার দিকে তাকাতেই চোয়াল জোড়া শক্ত করে ফেললো। বাজপাখির ন্যায়ে তীক্ষ্ণ নজরে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো অচেতন মুখটার দিকে। চোখে মুখে তার চরম বিরক্তি। এরপর তড়িৎ গতিতে চেঞ্জ করে দাঁতে দাঁত চেপে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।

মেঘার হুঁশ ফিরলো আয়রার ডাক শুনে। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই, দেখলো ওর পাশে দাঁড়িয়ে আয়রা সমানে ডেকে যাচ্ছে। চোখ দুটো মেলে খানিক্ষন মটকা মেরে পড়ে রইলো মেঘা। মাথাটা কেমন যেনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কি হয়েছে বোঝার জন্য কিছুক্ষণ চুপচাপ পড়ে রইলো। এরপর জ্ঞান হারানোর আগ মুহুর্তের কথা মনে পড়তেই হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো মেঘা। আয়রা চিন্তিত কন্ঠে বললো,

—“আরে আপু, তোমাকে বলেছিলাম তিন নাম্বার রুমে ঢুকতে। তুমি চার নাম্বার রুমে ঢুকেছো কেনো?”

—“এটা কার রুম আয়রা?”

—“প্রেম ভাইয়ার রুম এটা। তুমি আর কোনো রুম খুঁজে পেলে না? ভাগ্যিস ভাইয়া বাসায় নেই। জলদি চলো এখান থেকে। ভাইয়া চলে আসলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।”

এদিকে মেঘা পুরোই হতভম্ব। আয়রার কোনো কথাই যেনো কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। “প্রেম ভাইয়া” নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই শরীর জমে বরফ হয়ে গেছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। প্রেম নামটা মেঘার জন্য আতঙ্ক। সেই ছোটোবেলা থেকে কোনো কারণ ছাড়াই মেঘার সাথে একটা শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে প্রেম নামক এই মহা মানব। সম্পর্কে নিজের মামাতো ভাই হলেও মেঘার মনে হয় এই লোকটা ওর জাত শত্রু। অবশ্য শত্রু সে এমনি এমনি ভাবে না। এর পেছনেও বেশ কিছু কারণ আছে। মেঘার মনে পড়ে গেলো সেই ছোটোবেলার কথা। প্রেম নিজের বাবা মায়ের সাথে বাংলাদেশ বেড়াতে গেছিলো। মেঘা তখন খুবই ছোটো। এই আনুমানিক ছয় কি সাত বছরের হবে। বিদেশ থেকে আসা মামাতো ভাইকে দেখার জন্য প্রেমের আগে পিছে সবসময় ঘুরঘুর করতো। প্রেম একা ঘরে থাকা অবস্থায় মেঘা দড়জায় উঁকি দিলে হাতের ইশারায় “কাছে আয়” বলে ডাকতো। ছোট্ট মেঘা কাছে আসলেই চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে দিতো। মার খেয়ে মেঘা যখন ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতো, তখন সেই কান্না আবার ভিডিও করে নিতো প্রেম।

মেঘার ভাবনায় আবারও ছেদ ঘটলো আয়রার ডাকে। আয়রা সামান্য ধাক্কা দিয়ে বলল,

—“এতো কি ভাবছো তুমি? তাড়াতাড়ি চলো আমার সাথে। নিজের ঘরে কারোর প্রবেশ ভাইয়ার একদম পছন্দ নয়। সেখানে কেউ তার বিছানায় শুয়েছে দেখলে চিৎকার চেচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলে নেবে। হয়তো আজকেই ব্যাগপত্র নিয়ে রওনা হবে শিউলের পথে।”

আয়রার কথায় মেঘা আরও বেশি চিন্তায় পড়ে গেলো। যার ঘরে কেউ ঢুকলে বাড়ি মাথায় তুলে নেয়। তার প্রাইভেট পার্ট দেখার অপরাধে কি করবে সে? এবার কি ছোটোবেলার মতো দুটো চড় থাপ্পড় দিয়ে সে ক্ষান্ত হবে? নাকি আরও কঠিন কোনো শাস্তি দেবে? বিদেশের মাটিতে প্রথম দিনেই কি সাপের লেজে পা দিলো মেঘা?”

একটুকরোমেঘ

সূচনা_পর্ব

লেখনিতেসোনালিকাআইজা

চলবে?

(নোটঃ নতুন কাজিন রিলেটেড গল্প। নায়কের বিষয়ে একটু সাসপেন্স রেখেছি। মানে তার বিষয়ে পুরোপুরি কিছুটা পরে জানানো হবে। ভালো লাগলে লাইক করবেন। কমেন্টে নিজেদের মন্তব্য জানাবেন। কোথাও কোনো ভুল থাকলে নির্দিধায় ভুলটা ধরিয়ে দেবেন।

নোটঃ গল্পটা যোজন বিয়োজন করে নতুন করে পোস্ট করা হলো।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply