আদিল মির্জাস বিলাভড
— ২৩
বাইরের মৃদু বৃষ্টির শব্দ শোনাচ্ছিল গানের সুরের মতো। সেই সুর ভাঙল বিশ্রীতম এক বিকট শব্দে। পরপর ভাঙচুরের শব্দে বৃষ্টির সুরও মিলে গেলো প্রকৃতির চাদরে। বাড়ির বাইরেটা যতো শান্ত, সুরেলা —ভেতর ততটাই অশান্ত, অবিস্মরণীয় যে। তাণ্ডব চলছে ড্রয়িংরুমের ভেতর। টেলিভিশন, টি-টেবিল, আলমারি ভাঙচুরের বিশ্রী শব্দে দু-কান চেপে ধরে ভয়ে কয়েক কদমই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছেন কাজল বেগম। ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলো উড়ে উড়ে এসে ফ্লোরে পড়ে কয়েকটি টুকরোতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। কিছু টুকরো ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে, পায়ের ওপরে এসেও পড়েছে। জয়নাল সাহেব কয়েকবার ধমকে ছেলের হুশ আনার চেষ্টা করেছেন। তবে কাজের কাজ কিছু হলো না। জিহাদ যেন পা’গল হয়ে গিয়েছে। ও কিছুই শুনছে না। ওর শ্রবণেন্দ্রিয়তে যেন একটা কারও শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। নিজের মতন বিলাপ জুড়েছে চাপা গলায়। ক্রমান্বয়ে ছুটে এটা-ওটা ভাঙতে ব্যস্ত পুরুষালী হাত দুটো। অন্যদিকে ছেলের চিন্তায়, আতঙ্কে কাঁদছেন কাজল বেগম। অসহায় তিনি পারছেন না একটা কদম এগুতে। মিহি গলায় ডাকলেন শুধু –
‘জিহাদ, বাবা আমার! শোন! মায়ের কথা শোন, বাবা! থাম..থাম। পাগলামি থামা।’
জিহাদ শোনে না। এলোপাথাড়ি সব ভেঙে তছনছ করছে তখনো। হিসহিস করছে ক্ষ ত বিক্ষ ত হওয়া বাঘের মতো। হাতও কেটেছে অনেকটা। র ক্ত পড়েছে ফ্লোরে। আর্ত নাদ করেন কাজল বেগম –
‘থাম, বাবা! থাম, থাম। এমন করিস না।’
জিহাদ থামল না, অনেকটা সময় ধরে। পুরো ড্রয়িংরুমের জিনিসপত্র পিটিয়ে ভেঙেচুরে যখন ক্লান্ত হয়, ততক্ষণে ড্রয়িংরুম মৃ’ত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হয়ে আছে। জিহাদ দু হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে কাঁচ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফ্লোরেই। কাজল বেগম ফ্লোরে থাকা কাঁচের তোয়াক্কা করলেন না। ব্যাকুল ভাবে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন একমাত্র ছেলেকে। র ক্তা ক্ত হাতটা ধরে অসহায়ের মতো কাঁদলেন। ডুকরে বলে গেলেন –
‘শান্ত হো, বাবা! কেনো বাচ্চাদের মতো করছিস!’
আচমকা বাচ্চাদের মতোই ঠোঁট ভেঙে, শব্দ করে কাঁদল জিহাদ। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে গেলো –
‘আমি দায়িত্ব এড়াতে চাই না, মা। কিন্তু.. কিন্তু, রিধিমাকে আমি কখনো ওমন নজরে দেখিনি। না এমন কিছু আমার দ্বারা হওয়ার কথা ছিলো। কেনো সেদিন তোমরা গ্রামে গিয়েছিলে ওকে বাসায় রেখে? কেনো আমাকে জানাওনি ও একা বাসায় ছিলো? আর কেনো ও আমার রুমে এসেছিলো? কেনো সবাই মিলে আমার সাথে এমন করলে মা? আমি যে রোযাকে হারিয়ে ফেললাম। তুমিতো জানতে ওকে আমি কতটা চেয়ে এসেছি! পাগলের মতো ভালোবেসেছি। বছরের পর বছর ওর পিছু লেগে থেকে এতদূর এসেছিলাম মা! ও আমার হবে এমন সময় এটা কেনো হলো! কেনো এমন হলো! আমিতো এসব চাইনি! ওর তো আমার হওয়ার কথা ছিলো! স্বার্থপরের মতো এমন এক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও আমি ওকে ছাড়ার কথা কল্পনাতেও আনতে পারিনি। যেই রাস্তায় ওকে পেতে পারি আমি ওই রাস্তায় হাঁটা ধরেছিলাম। সবটা লুকিয়ে হলেও ওকে পেতে চেয়েছিলাম। আই ওয়াজ দ্যাট ডেসপারেট, মা!!’
কাজল বেগম শুধু অসহায়ের মতো ছেলেকে শান্ত করতে ব্যাকুল হয়ে আছেন। ছেলের এমন অবস্থায় যে তিনি পাগল প্রায়। দিশেহারা তার নজর যখন রিধিমার ওপর পড়ে তিনি দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়েন যেন। চোখের পলকে উঠে এসে খামচে ধরেন মেয়েটার চুল। সজোরে গালে চ ড় মে রে বসেন। বিলাপ জুড়েন পাগলের মতো –
‘এইজন্যই আমাদের পছন্দ করা প্রস্তাবে বিয়ে করতে চাসনি! আমার ছেলের কপালে ওঠার জন্য! খা** মা**, আমরা এতো করলাম তোর মতন অনাথের জন্য। আর এই দিছিস তার প্রতিদান! আমার ছেলে তো তোকে নিজের বোনের মতো আগলে রেখেছিল। বেইমান!’
রিধিমা কোনোরকমে নিজেকে বাঁচাতে পিছুতে চেয়ে দুর্বল গলায় বলে গেলো, ‘আমি ইচ্ছে করে করিনি। তুমি অন্তত বিশ্বাস করো।’
‘বিশ্বাস! আর তোকে!’
কাজল বেগম পুনরায় হাত তুললেন। চ’ড়ের প্রভাবে কয়েক কদম পেছাতে বাধ্য হলো মেয়েটা। কোনোরকমে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলাল। কাজল বেগম তখনো রাগে ফুঁসছেন। তেড়ে গিয়ে ধরলেন মেয়েটার চুলের মুঠি। মা রার জন্য হাত তোলেন ফের। অথচ হাত ছুঁতে পারে না উদ্দেশ্যপূর্ণ গাল। তার হাতটা কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে। এতে হতবাক হলেন কাজল বেগম। চমকে যখন চাইলেন দেখলেন রিধিমা কেমন কঠিন, দৃঢ় চোখে চেয়ে আছে। শক্তপোক্ত এক মুষ্টিতে ধরে রেখেছে তার হাত। যেন মুষড়ে ভেঙে ফেলবে। অনবরত কেঁপে ওঠে কাজল বেগমের ঠোঁট –
‘এতো বড়ো স্পর্ধা তোর!’
রিধিমা জবাবে ধরে রাখা হাতটা ছুঁড়ে ছেড়ে দিলো। দু-হাতে ঠেলে সরিয়ে দিলো কাজল বেগমকে। কিছুক্ষণ আগের অসহায়, অঝোরে অশ্রু ফেলা মেয়েটির সাথে এই মেয়েটির আকাশপাতালের ব্যবধান। নিজের বড়ো পেটখানা ধরে রিধিমা তাচ্ছিল্যের চোখে তাকাল জিহাদের দিকে, এরপর কাজল বেগমের চোখে। অসন্তুষ্ট জয়নাল সাহেব কিছু বলার জন্য মুখ খুলবেন এরপূর্বেই রিধিমা চিৎকার করে বলে উঠল –
‘আমারে আশ্রয় দিছো, আমারে খাওয়াইছো-পড়াইছো দেইখাই বাঁইচা আছো। আমি তোমাদের বাঁচাইছি। হো, আমিই বাঁচাইছি তোমার ছেলেরে। তোমার ছেলে আমার জন্য এতো করছে দেইখাই আমি তারে বাঁচাইছি বেহায়ার মতো। তোমরা জানোও না, আমি কতটা সেক্রিফাইস করছি তোমাদের লইজ্ঞা! আমি কি তোমার ছেলের বাচ্চা নেয়ার জন্য বইসা ছিলাম? আরে আমি ভালোবাসতাম অন্য কাউকে। আমি আমার ভালোবাসার মানুষ ছেড়ে দিছি তোমাদের লইজ্ঞা। এই… এই জিহাদ ভাইয়ার লইজ্ঞা। আমি ভাবছি শুধু তার কথা। তার কিছু হইলে তোমরা কী বাঁচতা? বাঁচতা না। আমি বাঁচাইছি। এই আমি!’
জিহাদ হতবিহ্বল চোখে চেয়ে আছে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় কাজল বেগমও। তিনি হাওয়ার বেগে গিয়ে ধরলেন রিধিমার দু-কাঁধ। ওকে একরকম ঝাঁকুনি দিয়ে চেঁচালেন –
‘কাহিনী ঘুরাচ্ছস এখন? দোষ অন্যদিকে চাপাস? ক…ক তাইলে! কীভাবে বাঁচাইছস। আমিও শুনিইই!’
রিধিমা একটা কথাও বলতে পারে না। কপাল চেপে ধরে। ওর মাথাটা ঘুরছে। ইতোমধ্যে জিহাদ উঠে এসেছে। কেমন হন্তদন্ত ওর কদমের গতি। হাত থেকে তখনো র ক্ত গড়িয়ে ফ্লোরে পড়ছে। এসেই রিধিমার চোখের দিকে চেয়ে ঢোক গিলল। কেমন কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল –
‘পরিষ্কার করে খুলে বল। কীভাবে বাঁচিয়েছিস আমাকে? চুপ থাকিস না। বল!’
রিধিমা তাকাল কঠিন চোখে। পেটে চিনচিন ব্যথা হতেই জাপ্টে ধরল পেট। পড়ে যেতে নিলে ওকে দু-গাতে আগলে নিলো জিহাদ। রিধিমা প্রায় জ্ঞান হারানোর পথে।
‘ভু– ভুলে যাও ওই মেয়েকে জিহাদ ভাই। ভুলে যাও। যতো দ্রুতো সম্ভব। তু– তুমি মা রা পড়বে। তুমি শেষ হয়ে যাবে। তোমাকে মে রে ফেলবে।’
গা কাটা দিয়ে ওঠে জিহাদের। কাজল বেগমও আতঙ্কে কয়েক কদম পেছনে চলে এলেন। জয়নাল সাহেব তাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন একের পরে এক প্রশ্ন। সেসবের উত্তর দেয় না রিধিমা। নিভু নিভু শুধু চেয়ে থাকে জিহাদের র ক্তিম চোখজোড়ায়। জিহাদের ঠোঁট কাঁপে। এক নাম, সন্দেহ ওর ভেতরে ইতোমধ্যে বাসা বাঁধে যে। ফিসফিস করে প্রশ্ন করে –
‘কে?’’
রিধিমা কোনোরকমে দুটো শব্দ আওড়ে জ্ঞান হারালো –
‘আ—আদিল মির্জা।’
সন্দেহ হলেও যখন ওই নাম উচ্চারিত হলো কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতায় আবদ্ধ হলো চারপাশটা। জিহাদের পায়ের নিচের থেকে মাটি সরে গেলো। ফাঁকা লাগল মস্তিষ্ক। সব কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগছে। মনে হচ্ছে, অনেক বড়ো কিছু তার থেকে লুকানো আছে। অনেক বড়ো কিছু! আর যা সে জানে না।
—
আদিল মির্জা বিয়ে করেছে বলে কথা! তার স্ত্রীর দেনমোহর কোটি ব্যতীত মানায় নাকি? মানায় না যে! আদিল যখন বলেছিলো দেনমোহর কোটি নির্ধারণ করতে রীতিমতো বাজ পড়ে রোযা সহ ওর পরিবারের ওপর। কাজি সাহেব আমতাআমতা করে জানিয়েছিলেন –
‘দেনমোহরের টাকা সাথে সাথে পরিশোধ করতে হয়।’
তার বাক্য পড়তে দেরি, আদিলের একটা ছোটো ব্রিফকেস শান্তর থেকে নিয়ে রোযার কোলে রাখতে দেরি হয়নি। যেন সে পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। ছোটোখাটো সাদা রঙের একটা ব্রিফকেস কোলে নেয়া রোযা অনেকক্ষণ যাবত হতবিহ্বল। ভারি জিনিসটার দিকে কেমন অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে আছে ও। মস্তিষ্ক ফাঁকা। এযাত্রায় ভাসাভাসা চোখ তুলে তাকায় পাশে বসা শরীরটার দিকে। এই পুরুষ সম্পর্কে তার কিছুই ছিলো না। কিচ্ছু না! অথচ রাতারাতি তার পুরো জীবনের অধিকার নিয়ে ফেলল! ভয়ংকর বিষয় যে! রোযার হাত কাঁপে, বুকের ভেতরটা ভয়ে মিইয়ে যায়। এমন স্বামী, এমন একটা অকল্পনীয় ভবিষ্যত কী কখনো সে চেয়েছিলো? চোখের পলকে তার স্বাভাবিক জীবনে যেন ঝড় নামল! নিজেকে খাঁচাবন্দী এক আহ ত পাখি মনে হলো! নিজের জীবন যে স্বাভাবিকভাবেই আর কল্পনা করতে পারছে না। দমবন্ধ হয়ে আসছে। অস্থির লাগছে। মাথা কাজ করছে না।
আদিল উঠে দাঁড়িয়েছে। তার ডান হাতের ঘড়ির সাথে অনামিকা আঙুলে চিকচিক করছে একটি সাধারণ দেখতে আংটি। কিছুক্ষণ আগেই প্রায় জোরপূর্বক ভাবেই রোযাকে দিয়ে পরানো হয়েছে ওটা। আদিলের পরনে কালো রঙের শার্ট। শার্টের বুকের দিকের বেশ কিছু বোতাম খোলা। ঢিল হয়ে ঝুলে থাকা কালো টাই-টা একটানে খুলে —না তাকিয়েই ছুঁড়ে ফেলল শান্তর দিকে। শান্ত সাবলীলভাবে ক্যাচ করেছে। শার্টের হাতা দুটো এলোমেলো ভাবে কনুইতে তুলে, আদিল ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলো রোযার দিকে। পিনপতন নীরবতা ভাঙল তার দাম্ভিক স্বরে –
‘ওঠো!’
ওই বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে তাকায় না রোযা। যেন শোনেনি কিছু। থম মেরে বসে রয় একইরকম ভাবে। আদিল আর ওর সম্মতির তোয়াক্কা করল না। আদেশ ছুঁড়ল নিজের লোকেদের জন্য –
‘গাড়ি স্টার্ট দে।’
পরমুহূর্তেই এগিয়ে গিয়ে থাবা দিয়ে ধরল ওর কব্জি। টেনে নিজের সাথে নিতে চাইলে রোযার যেন সম্বিত ফেরে। ও দ্রুতো টেনে ধরল আদিলের শার্ট। মুহূর্তে অনিশ্চিত চোখের দৃষ্টি মেলে ধূসর মণি জোড়ায়। ওই চোখের দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। রোযার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে ও মানতেই পারছে না। তারওপর আবার এক্ষুণি! আদিল মাথা নুইয়ে ভীষণ গম্ভীরমুখে আওড়ায় –
‘কী! চোপার জোর এখনো আছে? থাকলেও, হাইড দেম ওয়েল। আমার পেসেন্সের আর নি’র্যাতন করো না। ফলাফল ভালো হবে না কিন্তু।’
রোযার দু-গাল বেয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে সমানে। জলে টুইটুম্বুর চোখ দুটোর দৃষ্টি তখনো কঠিন। বিড়বিড় করে কেমন –
‘পেসেন্স? আর আপনার? আছে তা?’
আদিল শোনে। জবাব দেবার প্রয়োজনবোধ করে না। রোযার কণ্ঠে তখনো তেজ, জেদ… শেষের দিকে অসহায়ত্বতা –
‘আপনি শপথ নিয়েছেন আমার জীবন নষ্ট করার জন্য, তাই না?’
আদিল ডান ভ্রু তুলে বলে, ‘তোমার জীবন কি ডায়মন্ডের খনি? নাকি তেলের গুপ্তস্থান? যা নষ্ট করার জন্য আমাকে—এই আদিল মির্জাকে শপথ নিতে হবে?’
রোযা রাগে কাঁপল। সাপের মতো হিসহিসিয়ে ওঠে, ‘আপনার লজ্জা নেই তাই না?’
‘সেটা কী?’
রোযা বড়ো করে শ্বাস টেনে নেয়। এই ফালতু একটা পুরুষের সাথে কথা বাড়ানোর কোনো মানে নেই। আগে একটা শব্দ অপচয় করতো না। আর এখন মুখে মুখে জবাব দেয়! আদিল পুনরায় হাত টেনে এগুতে চাইলে রোযা চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে –
‘আ- আমি কোথাও যাবো না।’
আদিল প্রত্যুত্তরে শুধু নির্বিকার চোখে তাকিয়ে থাকল। একটু টু শব্দ করল না। অথচ তার চুপ থাকাটাই যেন তীব্র চাপ প্রয়োগ করছে। পেছনে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম। নিপা বেগম অবশ্য চাপা গলায় কাঁদছেন। চেয়েও যে তারা এগুতে পারছেন না। পারছেন না মেয়েকে সাহায্য করতে। তারা অসহায়! সামনেই যে সবগুলো বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে! রাজু একফাঁকে খুব ধীরেসুস্থে এসে টেনে ধরেছে রোযার আঁচল। ভয়ে ওর মুখটা এইটুকুন হয়ে আছে। রোযা এযাত্রায় আত্মসমর্পণ করে ধরে আসা গলায় –
‘আমা– আমাকে আজ রাতটুকুর সময় দিন। ‘
এতটুকু বলে রোযা থামে। ওর গলা রোধ হয়ে আসছে। চোখের জলে দৃষ্টিরা ঝাপসা হচ্ছে। দৃষ্টি নামিয়ে অনুনয় করে ফের বলে –
‘প্লিজ।’
আদিল জবাব দেয় না। পিনপতন নীরবতা বয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। রোযা নীরবে মাথা নুইয়ে রাখে। অনেকটা সময় গড়ায়। অথচ কোনো জবাব শুনতে পায় না। বাধ্য হয়ে যখন মাথা তুলে তাকায়, থমকায়। আদিল নিঃশব্দে এগিয়ে এসেছে একদম তার কাছে। মাথাটা নুইয়ে গম্ভীর মুখটা এনে রেখেছে তার মুখ বরাবর। এযাত্রায় এমনভাবে আঙুল ডুবিয়ে ধরল চোয়ালটা, যে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেলো। ব্যথায় ককিয়ে উঠল রোযা। চোখ বুজে, ঠোঁটে ঠোঁট টিপল। আদিল সময় নিয়ে দেখল সুন্দর মুখখানা। ওর সরু নাকের ডগায় নিজের নাক স্পর্শ করিয়ে ধীর গলায় বলল –
‘দেওয়া হচ্ছে। এবং সাথে এটাও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোনো রঙঢঙ যেন না করা হয়। নিজের পরিণতি ভেবে শুধু রাতটুকুই যেন থাকা হয়… ভদ্রভাবে —’
দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে বাকিটুকু কথা ফিসফিস করে বলে গেল আদিল, ‘মিসেস মির্জা! আই ঢিপলি হোপ ইউ ওন্ট নিড মাই পার্সোনাল থেরেপি। সহ্য করতে পারবেন না।’
রোযা চমকে ওঠে। ওমন অজানা সম্বোধনে শিউরে ওঠে। ঘাবড়ে ওঠে ওর পুরো অস্তিত্ব! দোটানায় ভোগে। চোখ বড়ো বড়ো করে যখন চায় ততক্ষণে আদিল ছেড়ে দিয়েছে ওর চোয়াল। বড়ো কদমে বেরিয়ে যেতে যেতে হুকুম ছোড়ে শান্তর উদ্দেশ্য –
‘তোর ম্যাডামকে নিয়ে সকাল সকাল রওনা হবি। কোনো ঊনিশ-বিশ দেখলে তার আশেপাশের কারও মাথায় সোজা দুটো বুলেট ঢুকিয়ে দিবি।’
শান্ত বাধ্য সৈনিকের মতো বসের আদেশ মোতাবেক রয়ে গেলো। তার সাথে থাকল স্বপণ, ক্লান্ত। ওরা দাঁড়িয়ে থাকল দরজার কাছে। দৃষ্টি নামানো। পিস্ত লটা পেছন পকেটে ঢোকানো। রোযা নির্জীব চোখে চেয়ে আছে শূন্যে। ঘর ফাঁকা হতেই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন যেন নিপা বেগম। ত্বরান্বিত কদমে এসে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। রোযাও মায়ের বুকে মিশে গিয়েছে। নিপা বেগম সমানে কাঁদছেন। আওড়াচ্ছেন –
‘কোন শকুনের নজর লাগল আমাদের হাসিখুশি পরিবারের ওপর!’
শান্তর মুখটা দেখার মতো হলো। কোনোভাবে কি তাদের শকুন বলা হচ্ছে? ডাকলে কোনো শক্তিশালী নামে ডাকুক। শকুন শব্দটা তাদের সাথে মানায় না! কোনোদিক দিয়ে না। এতো ডাকার ইচ্ছে হলে, ডাকুক না… বাঘ আর তাদের বসকে সিংহ।
.
আজিজুল সাহেব এলোমেলো ভাবে বসেছেন রোযার পাশে। চোখ দুটো র ক্তিম। চাপা গলায় প্রশ্ন করলেন –
‘কী করবা এখন? কিছু ভাবছো? রাতারাতি বাড়ি বিক্রি করে… ‘
নিপা বেগমের কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েক। তবে কিছু বলেন না। শোনেন রোযার জবাব –
‘সম্ভব না, বাবা।’
‘সম্ভব না মানে! তাহলে কি এমন চলবে? মেনে নেব এসব? কোনো উপায় নেই প্রতিবাদ করার?’
রোযা শান্ত চোখে চেয়ে আছে বেডের সাইড টেবিলের ওপরে রাখা হৃদির ফ্রেমের দিকে। রোযার কোলে মিশে গিয়ে কেমন খিলখিল করে হাসছে। ওর ওই চোখ দুটোর ভাষা যে স্পষ্ট। ওই চোখে রোযা অনেক কিছু। রোযার হাত দুটোর মুষ্টি গাঢ় হয়। দৃষ্টি গাঢ় হয়। মেয়ের দৃষ্টি নিপা বেগম লক্ষ্য করেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আজিজুল সাহেব আরও কিছু বলতে নিচ্ছিলেন তখুনি কথারমধ্যে বাঁধ সাধেন ভদ্রমহিলা –
‘বারবার একই প্রশ্ন করো না তো। কী করবে.. কী ভাববে মানে? সংসার করবে। বিয়ে হয়ে গেছে।’
আজিজুল সাহেব মুহূর্তে সতর্ক ভঙ্গিতে ধমকে ওঠেন, ‘মাথা খারাপ নাকি! ওই স ন্ত্রাসের সাথে আবার কীসের সংসার?’
‘কী সুন্দর কথা! তো তখন ঝামেলা করলেন না কেনো? আটকাতে পারলে্ন না কেনো মেয়ের বিয়ে? আপনার চোখের সামনেই তো জোরপূর্বক বিয়ে করে ফেলল। কী ঘোড়ার ডিম করলেন থরথর করে কাঁপা ছাড়া?’
আজিজুল সাহেবের আত্মসম্মানে লাগল বড়ো। অপমানে মুখটা চুপসে গেলো। বিনাবাক্যে উনি ক্রাচের সাহায্যে উঠে দাঁড়ালেন। যেন এক্ষুণি বেরিয়ে একটা হেস্তনেস্ত তিনি করবেনই। নিপা বেগম ভেঙচি কাটলেন। রোযা অসহায় ভাবে নিঃশব্দে হাসে এযাত্রায়। শান্ত করে নিয়েছে নিজেকে। হাত টেনে ধরল বাবার। বিছানায় টেনে বসিয়ে দিলো। দু-হাতে কোমর জড়িয়ে মাথাটা বুকে রাখল। চোখ বুজল। আজিজুল সাহেবের চোখ দুটো ফের জ্বলছে। অসহায়ের মতো শুধু হাতটা মেয়ের মাথায় রাখলেন। নিপা বেগম হঠাৎ চিন্তিত গলায় আঁতকে উঠলেন –
‘জিহাদের কি হ…’
রোযার চেহারায় অমাবস্যার ন্যায় অন্ধকার নামে। সে তো এই ঝামেলাতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল এতো বড়ো প্রতারণার কথা! তার জীবনটা হঠাৎ কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো না? একটার পর একটা ঝামেলা কেমন লেগেই আছে। অতঃপর বাবা-মাকে খুলে বলল সবটা। সব শুনে আজিজুল সাহেব আরেক দফায় ক্রাচ ধরে দাঁড়াতে চাইছেন। এখুনি হেস্তনেস্ত একটা করবেনই ওই ছেলের। এতো বড়ো স্পর্ধা!
—
এলেন ছাঁদের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে। ঝুম বৃষ্টি আর নেই। ঝিরিঝিরি পড়ছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে পাশাপাশি। সুইমিংপুলে পড়া একেকটি বৃষ্টির শব্দে মুখরিত আশপাশ। এলেন কিছুটা স্বচ্ছ আগ্রহ নিয়ে তাকাল ছাঁদের ওই নিরালায় গোপনে থাকা রুমটির দিকে। আদিল মির্জার পার্সোনাল বডিগার্ড হিসেবে এমন কিছু নেই তারা জানে না, এমন কোনো স্থান নেই যেখানে তাদের পা পড়েনি… শুধুমাত্র এই রুমটি বাদে। আদিল মাঝেমধ্যে ওখানে বিশ্রাম করে। ভেতরে তাদের প্রবেশ একরকম নিষেধই বলা যায়। এলেন কখনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি ভেতরে ঢোকার। আজ আগ্রহ কাজ করছে! ভীষণ ভাবে!
এলেন কদম বাড়ায়। এগুতে থাকে রুমটির কাছাকাছি। ইলেকট্রনিক ডোরটা লকড না। অল্প মেলে রাখা। এলেন হাত বাড়িয়ে খুলতে চেয়েও শেষমেশ খোলে না। হাত নামিয়ে আনে। কণ্ঠ তোলে –
‘বস!’
আদিল জবাব দেয় না। এলেন পুনরায় ডাকে ঢোকার অনুমতির আশায়। তখনো কোনো জবাব আসে না। এবারে আর আগ্রহ নয়, সতর্ক হয় এলেন। চিৎকার করে –
‘বস, বস! আর ইউ দেয়ার? বস!!’
জবাব না পেয়ে তার চিৎকারে বডিগার্ডস সব তৃতীয় তোলা থেকে উপরে উঠে এসেছে। এলেন দেরি করে না। দরজা ঠেলে প্রবেশ করে পি স্তল নিয়ন্ত্রণে রেখে। বাকিদের না ঢোকার নির্দেশ করে। নিজে…একাই ঢোকে। কুচকুচে অন্ধকার প্রবেশের পথ। এলেন সাবধানে এগুতে এগুতে ফের ডাকে –
‘ব…বস!’
এযাত্রায় জবাব আসে ভেতর থেকে। নাকমুখে উচ্চারণ করা ছোটো শব্দ মাত্র, ‘হুম!’
আদিলের জবাব পেয়ে শান্ত হয় এলেনের তটস্থ হৃদয়। পি স্তল পকেটে ঢুকিয়ে খোঁজে সুইচবোর্ড। পেয়েই লাইট জ্বালিয়ে দেয়। পাশাপাশি শুনতে পায় ক্রমান্বয়ে বাজতে থাকা ফোনের রিংটোন। আদিলের পার্সোনাল ফোন বাজছে। ধিমি আলোয় অস্পষ্ট রুমের ভেতরটা। পিনপতন নীরবতা আশপাশ জুড়ে। গদিতে বসা শরীরটা নড়ে না দীর্ঘসময় হচ্ছে। একধ্যানে চেয়ে আছে সামনে। দৃষ্টি অনড়, দৃঢ়। এলেন ঘুরতে ঘুরতে বলতে নিয়েছিল –
‘বস ভয় পাইয়ে দিয়েছিল….’
এলেনের কণ্ঠ হারিয়ে যায়। থমকায় কদম। চোখদুটোতে অবিশ্বাস। মুখ সামান্য হা হয়ে আসে ওর অজান্তেই । আদিল ইতোমধ্যে বাজতে থাকা কল রিসিভ করেছে। তবে ফোন হাতে নেয়নি। পড়ে আছে টেবিলের ওপর। একাই উঠে দাঁড়িয়েছে নগ্ন পায়ে। গায়ে শার্ট নেই। উদোম শরীরের একেকটি মাংশপেশী চেয়ে আছে কেমন! প্যান্ট লুজ হয়ে কোমরে পড়ে আছে। নির্বিকার ভাবেই আদিল এসে দাঁড়াল জানালার সামনে। ম্যানেজার বলে যাচ্ছে –
‘স্যার, কী করব এখন? উড়িয়ে দেবো? টাকা তো নিয়েছিলো মেয়েটা। কাজটা নিজেই করতে চাইল। এরপরও মুখ খুলে বসে আছে। এই ছোটোলোক গুলোর জবানের ঠিক নেই। জানিয়ে দিয়েছে আপনার নাম। যদি এনিহাউ ম্যাডামের কানে পৌঁছা…’
আদিল চুপচাপ শুনল শুধু। অনেকটা সময় বইল পিনপতন নীরবতা। ফিরে যখন তাকাল তার র ক্তিম অবসেসড চোখ দুটো মিলল এলেনের হতবাক দৃষ্টি। এলেন হতবিহ্বল নয় শুধু! আউট অব মাইন্ড হয়ে আছে। দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার তাকায় ওই বড়ো দেয়ালে। দেয়ালে টানানো ওই বিশাল সাইজের ছবির ফ্রেমের মানুষটিকে চিনতে এক সেকেন্ড লাগে না। রোযা, আয়াত তালুকদার রোযা! ছবির রোযা কয়েকটি বছর আগের। সম্ভবত তখন নতুন নতুন ন্যানি হয়ে প্রবেশ করেছে মির্জা বাড়িতে। পরনে সিল্কের কালো রঙের শাড়ি। ক্যামেরায় তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে। সম্মোহন হওয়ার মতন সৌন্দর্য!
এলেন দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে। ঢোক গিলল। একে-দুইয়ে অনেক কিছু মস্তিষ্ক রি-প্লে করল। অনেক প্রশ্নের উত্তর আজ কেমন পরিষ্কার হয়ে গেলো। তার প্রথম থেকে একটা সন্দেহ কাজ করছিল, মন বলছিল বারেবারে… আদিল মির্জা আগে থেকেই এই মিস রোযাকে পছন্দ করে। কিন্তু পছন্দ যে মনে হচ্ছে ছোটো শব্দ! এই রীতিমতো অবসেশন! এলেন নিজেকে স্বাভাবিক করে ফেলল নিমিষে। এগিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে নিলো। ফোন হাতে এসে দাঁড়াল আদিলের সামনে। ম্যানেজার তখনো আদেশের অপেক্ষায়। আদিল ক্ষীণ গলায় বলল এযাত্রায় –
‘মুখ বন্ধ রাখার ডোজ দিতে কি আমার বলা লাগবে?’
ম্যানেজারের কণ্ঠ স্থির, ‘ওই ছেলে সত্য জেনে এসে ঝামেলা করতে পারে। ভয় না পাওয়ার হাই চান্স আছে। বেশ…ডেসপারেট বলে মনে হলো!’
শেষের দিকে ভদ্রলোক বিড়ালের মতো মিউমিউ করে বলল। আদিলের রাগটা মাথা চড়ে। আদেশ ছুঁড়ে, ‘কি’ল হিম দেন।’
এলেন মুখ খুলল এবার। শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘ওদের গ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করি?’
আদিলের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘কর। আর হৃদি কোথায়? ঘুমিয়েছে?’
বলতে বলতে আদিল হাঁটা ধরে কাউন্টারে। ড্রিংকের গ্লাসটা পুনরায় ভরে মদ দিয়ে। ম দের গ্লাসে ঠোঁট ছুঁতেই তার দৃষ্টি পড়ল দেয়ালের ছবিটির ওপর। তখন কী বলল? তার ধৈর্য নেই! এই আদিল মির্জার! হাহ! বিড়বিড় করে আদিল –
‘সবার জন্য আমার ধৈর্য্য শুন্যতে হলেও তোমার জন্য হিমালয় ছুঁয়ে গেছে। ইউ’ভ নো আইডিয়া…মিসেস মির্জা।’
চলবে ~~~
® #নাবিলা_ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৫
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬