পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১১
ঈশিতারহমানসানজিদা
আইশা নড়ছে না নূরের থেকে, তখন থেকে কেমন চোখে যেন তাকিয়ে আছে। কিন্তু নূর যেন অন্যকিছু দেখছে। এই চোখ আইশার নয় বরং আজমাঈনের। স্বয়ং আজমাঈন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শরীর কেমন ঝাঁকি দিয়ে উঠলো নূরের। শুকনো ঢোক গিলে তাড়াতাড়ি কাগজপত্র গুলো তুলে রাখলো। বললো, ‘নামাজের সময় হয়ে গিয়েছে আমি নামাজ পড়ব।’
আশ্চর্য হয়ে গেল আইশা, নিজের বাড়ি নিজের ঘর অথচ এভাবে কৈফিয়ত দিচ্ছে মেয়েটা। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে সবসময় আতঙ্কে থাকে। আইশা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আতর এনে দিয়ে চলে যাচ্ছি।’
আইশা বাইরে বের হলো, আজমাঈনের হাত থেকে আতরের বক্স টেনে নিতেই ভাইয়ের ইশারা পেলো। আইশা মুচকি হেসে সাংকেতিক ভাষায় মাথা নাড়ায়। এ ভাষা ভাই-বোন ব্যতীত আর কেউই বুঝতে পারবে না। আইশা ফের ভেতরে চলে গেল। নূরের হাতে বক্স দিয়ে বললো,’সেইম কিনা দেখে নিন।’
নূর বক্স খুলে দেখলো চারটি বোতল। চমকে উঠে বলে,’এতগুলো কেন? আমি তো একটা বোতল ফেলে এসেছিলাম।’
‘আমার তরফ থেকে বাকিগুলো গিফট, আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আসি হ্যাঁ!’
দৌড়ে বের হয়ে আসে আইশা। আজমাঈনের হাত ধরে দ্রুত নেমে আসে। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে এসে থেমে বলে,’দিয়েছি ভাইয়া!! তবে, তুমি না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না।’
আজমাঈন কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। বোন তার স্পষ্ট কিছু বলছে না। সে বিরক্ত হয়ে বললো,’কি বলেছে তাই বল?’
‘আপুটা ভদ্র খুব, তবে কথা বলে না তেমন। ভারি মিষ্টি, খুব সুন্দর দেখতে। কিন্তু তুমি কি ভাবছ বলো তো?’
‘কিছু না।’ আজমাঈন চলে যেতে নিলে আইশা টেনে ধরে,’ভাইয়া!! সামথিং সামথিং বাট সিক্রেট তাই না? তাই তো বলি তোমার এই বাড়ির প্রতি এতো টান কেন?’
আজমাঈন ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলে, ‘কিছুই না, তোর বাপের ঋণ শোধ করছি। সব আতর মেখে তো শেষ করে দিয়েছিল।’
‘ওহ তাই, কিন্তু বোতল শেষ হলো একটা আর তুমি দিলে চারটা। এক্সপেন্সিভ আতর কিন্তু, আমি গুগল করে দেখেছি। প্রতিটা বোতলের দাম বারো হাজার। তাহলে কত টাকা গেল? আব্বু তো জীবনেও দিবে না এত টাকা।’
‘অতো কথা বলিস না, তোর পছন্দের মেকআপ গুলো কিনে দিব।’
আইশা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো, ভাইয়ের হাত জড়িয়ে ধরে বললো,’তুমি এতো ভালো কেন ভাইয়া।’
অনুভব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। বললো,’আরে ভাইয়া আপনি এখানে। ওদিকে দুলাভাই আপনাকে খুঁজে যাচ্ছে। গ্রুপ ফটো তুলব, তাড়াতাড়ি আসেন।’
আজমাঈন বলে,’ফয়েজ এসেছে!! কখন?’
‘আমাদের জোড়া জুড়িতে এলো। এভাবে হয় নাকি আজকাল? বর বউ একসাথে কাপল পিক না তুললে বিয়ে জমে না।’
আজমাঈন এগিয়ে এসে দেখলো সত্যি সত্যি ফয়েজ এসেছে। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ইশারায় আজমাঈন কে ডাকে। আইশা ভাইয়ের হাত ছাড়ে না। এগিয়ে যায় সেও। ফয়েজের পিঠ চাপড়ে আজমাঈন বলে,’আসতেই তো হলো, আমাদের সাথে এলে ভালো হতো না?’
‘কি করব ভাই, এরা কাপল ছবি তোলার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না এটা লাভ ম্যারেজ নাকি অ্যারেঞ্জ?’
ফয়েজের কাজিন গুলো হারামি আছে বটে। ভাবির বাড়ির লোকজনের সাথে পরিচিত হতে চাইছে। বিশেষ করে বেয়ানদের সাথে। কতগুলো মেয়েদের দেখেছে, তাদের সাথে লাইন মারার ধান্দা। সবাই মিলে গ্রুপ ফটো তুললো। ফয়েজ এবার বেশ কাছাকাছি বসায় অস্বস্তিতে পড়লো সাহারা। এখনও দুজনের মধ্যে তেমন কথা হয়নি, কিভাবে হুট করে মানিয়ে নিবে তাও বুঝতে পারছে না। তবে ফয়েজ নিজেও সহজ হওয়ার চেষ্টা করছে না। এই ছেলের মাথায় কি চলছে কে জানে।
ছবি তোলার পর সবাই আড্ডা দিতে বসলো। জোনাকি বললো,’এ্যাই সাহারা, তোর হাজবেন্ড তো খুব হ্যান্ডসাম! পটালি কিভাবে?’
সাহারা নিচু স্বরে বলে,’অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, পটাব কিভাবে?’
‘আচ্ছা আচ্ছা, অমন একটার সাথে পরিচয় করিয়ে দে? আমরাও একটু লাইন মারি।’
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। সাহারা বললো, ‘একজনই আছে। ওইযে সাদা পাঞ্জাবি পড়ে আছে, সেই লেভেলের হ্যান্ডসাম। চেষ্টা করে দেখ।’
জোনাকি বললো,’আমি পটাব? এসব আমার দ্বারা হবে না। ছেলেরাই আমার পিছনে পিছনে ঘুরে।’
‘দেখা যাবে!! তুই যদি ওই ছেলেটাকে পটাতে পারিস তাহলে যা চাইবি তা পাবি। এবার ভেবে দেখ।’
জোনাকি তুড়ি মেরে বলে,’ওকে ডান, এখন সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দে। নাহলে কথা বলার অযুহাত পাব না।’
সাহারা তার কাজিন দের ঝাঁক নিয়ে আড্ডায় সামিল হলো। ওকে ফয়েজের পাশে বসানো হলো। মূলত সবাই খেতে বসেছে। কিন্তু আজমাঈন বসলো না। ওর কিপটে বাপকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। খেয়েছে কিনা কে জানে। মনটা বড় খচখচ করছে। তিনি এলেই নাহয় খেতে বসবে। এজন্য টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে আঙুল চালাচ্ছ। ফয়েজে এক কাজিন বলে উঠলো,’ভাবি, কাজটা ঠিক হলো না। বেয়ান দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। আলাপ করি একটু।’
সাহারা হাসিমুখে সবার পরিচয় দিলো। তবে ওর কাজিন দের নামগুলো অদ্ভুত। একে অপরের সাথে মিল রয়েছে নাম গুলোর। যেমন জোনাকি, মৌ, পাখি, দোয়েল। এমন নাম শুনে একজন বলে উঠল, ‘এতো কীটপতঙ্গের আবাসস্থল!!’
সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। খাওয়ার মাঝে টুকটাক কথা হলো। মাঝে মাঝে হাসির শব্দ শোনা গেল। জোনাকি ফয়েজ কে উদ্দেশ্য করে বলে,’এই যে হবু দুলাভাই, আপনার বন্ধুকে ছেড়ে খাচ্ছেন। সে রাগ করবে না?’
ফয়েজ ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো আজমাঈন ফোনে ব্যস্ত। ডাকতে যেতেই আইশা বলে উঠলো,’আব্বু কে খুঁজে পাচ্ছে না তো, তাই বসছে না। সমস্যা নাই তোমরা খাও।’
ফয়েজ মাথা নেড়ে সবাইকে বলে,’আমার বন্ধু পাপ্পাস বয়, বাপ ছাড়া নড়ে না। ওকে কেউ জোর করো না।’
জোনাকি ভ্রু কুঁচকে সাহারাকে কনুইয়ের খোঁচা দেয়। নিচু স্বরে বলে,’এ কেমন ছেলে!! বাপ ছাড়া নড়ে না। এটাকে পটানো কি ঠিক হবে?’
সাহারা যথাসম্ভব কন্ঠ খাদে নামায়,’আগে পটিয়ে দেখা তো।’ তারপর ঢকঢক করে পানি পান করে, ‘পটাতে বলেছি, প্রেম করতে বলিনি। এরা দুই বন্ধু সেই লেভেলের বজ্জাত। আমার উনি তো এখন পর্যন্ত কথাই বলে না ঠিকমতো। আল্লাহ জানে কি হবে!!’
হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সাহারা চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো,’এই যাহ, জান্নাত তো আমাকে হলুদ মাখালো না। ইশ্ একদম ভুলে গেছি।’
এতক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলেও জান্নাত নামটা কানে যেতেই মাথা তোলে আজমাঈন। সাহারা চেয়ার ঠেলে সরিয়ে হলুদের বাটি খুঁজে নিয়ে ছুটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আজমাঈন নির্লিপ্ত চোখে দেখতে লাগল। ফয়েজ মনে মনে হা হুতাশ করতে লাগল। বউ তার এখনই লাফালাফি করতেছে। একবার মনে হয় মেয়েটা ম্যাচিউর, আরেকবার মনে হয় বাচ্চা স্বভাবের। অস্বস্তিতে ঠিকমতো কথা বলতেও পারছে না। সাতাশ বছরের জীবনে এখন পর্যন্ত এমন হয়নি তার সাথে। কতশত মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং করেছে। এখন বউয়ের কাছে এসেই সব ফুস।
রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আজমল শিকদার হাজির হলেন। ছেলের দিকে কটমট করে তাকাতেই হেসে ফেললো আজমাঈন। ভ্রু নাচিয়ে মজা নিলো। আজমল শিকদার বলেন,’বাপের সাথে মজা নিচ্ছিস ব্যাটা!!’
‘আরেকটু হলে তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত তাই না, আপনাকে হারাতে হলে আপনার লেভেলের চালাক হতে হবে।’
আইশার খাওয়া শেষ, ও উঠে এসে বলে,’তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ভাইয়া না খেয়ে আছে তোমার জন্য।’
আজমল শিকদার গরম চোখে তাকালেন,’এ্যাহ আদিখ্যেতা, তোদের আগে খাওয়া শেষ আমার।’
অতঃপর ব্যস্ত হলেন আজমাঈন কে নিয়ে। জোর করে টেবিলে বসিয়ে দিলেন। বিরিয়ানি প্লেটে তুলে দিতে দিতে বলেন,’খা খা, বিরিয়ানি টা বেশ ভালো হয়েছে। আলুবোখরা দিয়ে খেতে অনেক টেস্ট।’
লোকজন কমে এসেছে, স্টাফ গুলো এদিকে তেমন আসছে না। হয়তো ভেবেছে সবাই খেয়ে গেছে। আজমল শিকদার শরবত আনতে ছুটলেন। এই ফাঁকে জোনাকি এগিয়ে এলো। এটাই মোক্ষম সুযোগ কথা বলার। সাহারার সাথে বাজি ধরেছে, কিন্তু কিভাবে শুরু করবে তা বুঝতে পারছে না। সে কোনরকমে বললো,’এক্সকিউজ মি! আপনি হবু দুলাভাইয়ের বন্ধু তাই না?’
মাথা তোলে আজমাঈন, জোনাকি এবার ভালো করে দেখে নেয়। বেশি ফর্সা না তবে ফর্সা বলা যায়। মুখ ভর্তি দাড়ি, সুন্দর কাট দেওয়া। মোটা ভ্রু এবং গভীর চাহনি। বসা থাকায় উচ্চতা মাপতে পারলো না। জোনাকি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে, আজমাঈন মৃদু হাসলো। পরপর চোখের পলক ফেলে তাকায়,’জি!!’
নিজেকে শক্ত করলো জোনাকি কিন্তু ভেতরের কথা গোছাতে সময় নিলো বেশ। বললো,’সবার শেষে বসেছেন যে? তখন আমাদের সাথে বসলেই পারতেন। এখন রাত হয়ে গেছে অনেক, তাছাড়া স্টাফ গুলো এপাশে নেই।’
‘সমস্যা নেই!’ আজমাঈন কেমন এড়িয়ে যেতে চাইলো। বাজির নেশায় জোনাকি চেপে ধরল এক প্রকার। চেয়ার টেনে বসার আগেই আজমল শিকদার সেই চেয়ার টেনে বসলেন। শরবত আর পানির বোতল টেবিলে রাখলো। ঘনঘন শ্বাস ফেলে বলেন, ‘তোর জন্য কত ঘুরে এলাম, ছেলেগুলো সব হাওয়া। প্রেশার বেড়ে গেছে। যাওয়ার পথে স্যালাইন নিয়ে যাব।’
আজমাঈন ঠোঁট টিপে হাসে, কারণ হলো জোনাকি। মেয়েটা বসতে নিয়েছিল এটা ও দেখেছে। তবে বাপ যে টান মারলো তাতে নাজেহাল হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। আজমাঈন বলে,’আপনি বসুন, এপাশে এসে বসুন।’
জোনাকি মাথা নাড়ে,’সমস্যা নেই আপনারা খাওয়া দাওয়া করুন।’
কথা শেষ হতে না হতেই হৈচৈ পড়ে গেল। বিষয়টা বোঝার জন্য মাথা উঁচু করলো আজমাঈন। কালো রঙের বোরকা পড়া মেয়েটা দৌড়ে আসছে। তবে ও বুঝে গেল এটা নূর। কিন্তু এভাবে দৌড়ে যাচ্ছে কোথায়? হাত ধুয়ে উঠে পড়লো সে। পেছন ফিরে তাকাতেই আসল কাহিনী বুঝতে পারলো, রাশেদ সাহেব কে ধরে নিয়ে আসছে রাহা ও সাইমন। বোঝা যাচ্ছে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আজমাঈন উঠে দৌড় দিল, নূর গাড়ির দরজায় হাত রাখতেই আজমাঈন বলে উঠলো,’চাবিটা আমাকে দিন, আপনি আঙ্কেলের পাশে বসুন।’
নূর এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল। চাবিটা কোনমতে আজমাঈনের হাতে তুলে দিয়ে পেছনে দৌড়ায়। সাবধানে রাশেদ সাহেব কে বসিয়ে দিয়ে দুই মেয়ে দু’পাশে বসে। রাহার হাজবেন্ড সামনে বসে। দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দেয় আজমাঈন। রাহার হাজবেন্ডের কথামত ওদের চেনা হসপিটালে নিয়ে যায়। ডক্টর ওদের পরিচিত, এজন্য তাড়াতাড়ি চেকআপের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় রাশেদ সাহেব কে।
ইতিমধ্যে সাইমন, ফয়েজ চলে এসেছে। আপাতত আর কাউকে এনে হসপিটালে ভিড় বাড়ানোর দরকার নেই। করিডোরে অপেক্ষা করছে সবাই। রাহা তখন থেকে মুখে আঁচল চেপে কেঁদে যাচ্ছে। এমন একটা শুভ দিনে এই অবস্থা হলো। হঠাৎ করে যে কি হলো!
নূর একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে সে কি অবস্থায় আছে এখন। মেয়েটা কি কাঁদছে? আজমাঈন মাথা ঝুঁকে দেখলো। নাহ, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সবসময় চোখের উপরেও পর্দা ফেলে রাখে। নাহলে চোখের এক্সপ্রেশন দেখে বোঝা যেত। বেশ কিছুক্ষণ পর ডক্টর বের হলেন। সাথে সাথে নূর ছুটলো। এবার সবার আগে ওর গলার স্বর শোনা গেল,’আব্বুর কি অবস্থা আঙ্কেল? সব ঠিকঠাক তো?’
ডক্টর হাসি মুখে বলেন,’সব ঠিকঠাক মামণি, উচ্চ রক্তচাপের কারণে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আগের বার তো বললাম যে চিন্তা না করতে। রাতে ঘুমায় না বুঝি?’
ভালো কথা শুনেও নূর কেমন অসহায় চোখে তাকায়। তা কেউই দেখতে পেলো না। তিনি ফের বলেন,’নাতনির বিয়ে দেখে কি মেয়ের বিয়ের কথা মনে পড়লো নাকি? খবরদার বিয়ে করো না মামণি। করলেও ঘরজামাই রাখবে। নাহলে তোমার আব্বুকে সামলানো যাবে না। প্রতিদিন হসপিটালে ছুটতে হবে। যাও দেখা করে আসো, আর সকালে বাসায় নিয়ে যেও।’
অপেক্ষা করলো না নূর, দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকলো। বাকিরাও পেছন পেছন গেল। আগের চেয়ে সুস্থ বোধ করছেন রাশেদ সাহেব। স্যালাইন চলছে, ডক্টর বলেছেন খানিক বাদে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে যাবেন। তার আগে মেয়ের সাথে কথা বলে নিতে। তবে নূর বসে থাকলো, অভিমানে গলা কাঁপছে ওর। নিশ্চয়ই এই দু’দিন ওষুধ মিস করেছেন। এর আগেও অনিয়ম করার জন্য হসপিটালে ছুটতে হয়েছিল। রাহা চোখ মুছে বলে,’এখন কেমন আছো আব্বু?’
রাশেদ সাহেবের কন্ঠ দূর্বল,’ঠিক আছি যে মা। শুধু শুধু হসপিটালে টেনে আনলি। ওষুধ টা খেলেই ঠিক হয়ে যেতাম।’
নূর এতক্ষণ বাবার হাত ধরে বসে ছিল। এখন অভিমান উগরে দিলো। কান্নার দমকে কথা বলতে পারছে না সে। একটু আগ পর্যন্ত সে স্থির ছিলো। রাশেদ সাহেবকে শুয়ে থাকতে দেখে চোখে পানি চলে আসে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,’এই দু’দিন ঠিকমতো ওষুধ খাওনি তাই না?’ অন্যরকম শোনাচ্ছে কথাগুলো,’প্রেসার ঠিক রাখার জন্য ওষুধ খাওয়া জরুরী এটা আঙ্কেল বলেছিলেন সেদিন। তবুও এমন করলে, আমাকে কাঁদাতে তাই না?’
আর কেউ না বুঝলেও রাশেদ সাহেব বুঝলেন মেয়ে তার কি পরিমানে কান্না করেছে। এখন যে গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলছে এও বুঝতে পারলেন। রাহা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,’কাঁদিস না বনু আর, আব্বু ঠিক হয়ে যাবে।’
রাশেদ সাহেব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। ডক্টর ভেতরে এসে বলেন,’এখন আর কোন কথা নয় সাহেব, এখন আপনি ঘুমাবেন। নাহলে মেয়ে চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাবে। তারপর দু’জনকে একসঙ্গে ভর্তি করে রাখতে হবে।’
রাশেদ সাহেব বলেন,’আমি ছাড়া যে মেয়েটার কেউ নেই ভাই, ওর পরিচয় দিতে সবাই লজ্জাবোধ করে।’
সাইমনের মুখটা কালো হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল সে। ডক্টর বলেন,’সে গল্প কত বার বলেছেন, কিন্তু মেয়ের বিয়ে দিলে তখন কি হবে? তখন তো পর হয়ে যাবে।’ একটু থেমে বলেন,’মেয়ে আপনার খুব আদরের। ওর জন্য শুধু আপনি নন, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আছেন, আপনার মেয়ে খুব ভালো মনের। ওর জুটি আল্লাহ লিখে ফেলেছেন আরো আগেই। আপনার মেয়ে ভালো থাকবে। সুখি হবে খুব, আমি দোয়া করে দিলাম।’
নূর মাথা নিচু করলো, আজমাঈনের চোখ সরলো না সেদিক থেকে। হঠাৎ করেই ওর কি যেন হলো। কেমন টান অনুভব করছে, অথচ মেয়েটাকে এখন পর্যন্ত চোখের দেখা দেখেনি। ও নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা এভাবে কি মন দেওয়া নেওয়া হয়? চেহারা না দেখেও এতটা টান আসে কোথা থেকে? হয়তো হয়, দেখা না পেয়েও মনে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে হয়তো মোহে ভাসা যায়।
নিজের ভাবনায় চমকে গেল আজমাঈন। এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। ডক্টর ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে চলে গেলেন। এবার বাকিদের যাওয়ার পালা, নূরকে বাসায় পাঠানো যাবে না এটা রাহা জানে। তাই কিছু বললো না, উল্টে নূর সবাইকে বাসায় চলে যেতে বললো। বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ। সাইমন আর ওর দুলাভাই না সামলালে হবে না। রাহার নিজেরও বয়স হয়েছে। রাত জাগা ঠিক হবে না।
সবাই চলে গেলেও ফয়েজ ও আজমাঈন রয়ে গেল। ওরাই এখন টগবগে যুবক। ওদের শক্তি সামর্থ্য বেশি। তাছাড়া আত্মীয় তাই না করা গেল না।
রাত বেশ গভীর, ফয়েজ করিডোরে চেয়ার পেতে বসে আছে। চোখে ওর ঘুম। ঘাড় এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলে,’খালি কেবিন দেখ তো, একটু ঘুমাই, সারাদিন দৌড় ঝাঁপ করেছি।’
আজমাঈন রহস্য করে হাসে,’হ্যাঁ তাই তো, কাল তো আবার বাসর রাত। আজ না ঘুমালে কি চলে?’
‘চুপ বেয়াদব, হসপিটালে থাকা টা টাফ। ভালো মানুষ রোগি হয়ে যায়।’
আজমাঈন আয়েশ করে বসে ফয়েজের পাশে। দু’পা তুলে বসে বলে,’আমার তো বেশ ভালো লাগছে।’
‘তা তো লাগবেই, সেদিন থেকে দেখছি তুই দাদুর মেয়ের পিছনে পড়েছিস। কাহিনী কি বলতো?’
‘তেমন কিছুই না, আমার বাড়ির কাজ করছে এই তো।’
ফয়েজ আজমাঈনের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে,’তাহলে ওই দেওয়া নেওয়ার ঘটনা টা কি?’
আজমাঈন ও সেইম কন্ঠে বলে,’বেশ মজার গেইম, প্রথম দেখায় ওর ডায়মন্ডের রিং আমি পেয়েছি। পরের দেখায় আতর। তারপর ভাবলাম সব কি শুধু আমিই পাই! তা তো হতে দেওয়া যায় না। এজন্য ইচ্ছে করেই ওইদিন ঘড়িটা ওর গাড়িতে ফেলে আসি। ভেবেছিলাম যে মেয়েটা নিজ থেকে দিয়ে যাবে। কিন্তু তা হলো কই? তোর শালা বাবু এসে দিয়ে গেল।’
ফয়েজের মুখটা হা হয়ে এলো। এত কাহিনী ঘটে গেল অথচ সে কিছুই টের পেলো না। বন্ধু তার গভীর জলের মাছ। টুপ করে বড়শি থেকে টোপ খেয়ে চলে যাবে কেউ টের পাবে না। আজমাঈন ওর মুখটা বন্ধ করে দিয়ে বলে,’চা খাবি?’
‘নাহ।’
‘কফি?’
‘তাও না।’
তবুও উঠে গেল আজমাঈন, কিছুক্ষণ বাদে দুটো অনটাইম কাপে চা নিয়ে হাজির হলো। ফয়েজ বিরক্ত হয়ে বলল,’খাব না বললাম তো।’
‘তোর জন্য না।’ বলতে বলতে কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আজমাঈন। ফয়েজের বিষ্মিত চেহারা সে দেখতে পেলো না।
নূর চোখের পর্দা সরিয়ে বসে ছিলো। আজমাঈন নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়ায়। গলা খাঁকারি দিতেই ঝটপট চোখের পর্দা টেনে দেয় নূর। পেছন ফিরতেই দেখলো আজমাঈন দাঁড়িয়ে। হাতে চায়ের কাপ, এখনও ধোঁয়া উড়ছে। আশ্চর্য হয় নূর, ওর যে এখন চা দরকার তা ছেলেটা বুঝলো কিভাবে? অতিরিক্ত কান্না করার ফলে মাথা ধরেছে খুব। জেগে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। একই ভঙ্গিতে আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা এবার পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নজরে এলো ওর। সাদা পাঞ্জাবি, হাতা গোটানো। মাথা ভর্তি কালো চুল এবং কিছুটা বিধ্বস্ত চেহারা। হয়তো রাত জাগার কারণে হয়েছে। নিজের অজান্তেই কেমন হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ তুলে নিলো নূর। হঠাৎ করেই যেন হুঁশ ফিরল, কেমন ঘোরে ছিলো সে।
সোজা হয়ে বসে বলে,’আপনারা চলে গেলেই পারতেন। দরকার ছিলো না।’
আজমাঈন বেশ খানিকটা দূরে সরে দাঁড়ায়। মাথাটা সামনের দিকে হালকা ঝুঁকে বলে,’বলছেন? আমি কারো দরকার প্রয়োজন হতে চাই না। বিশ্বাস, ভরসা, অনুভূতি হতে ইচ্ছুক। এখন আপনি দরকার হিসেবে দেখলে মনে দুঃখ পাব।’
চলবে,,,,,,,,,
সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল, কারেন্ট ছিল না। তাই দেরি হলো।
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া গল্পের লিংক
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৩