পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
ঈশিতারহমানসানজিদা
রাশেদ সাহেবের ডুপ্লেক্স বাড়িটি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, রঙ বেরঙের বাতি জ্বলছে। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, প্রাঙ্গণে বড় স্টেজ সাজানো হয়েছে। বেশ ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। এতসব আয়োজন হচ্ছে অনুপমার ইচ্ছায়, তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিবেন মহা ধুমধাম করে। যত টাকা লাগে লাগুক, তাদের টাকার অভাব আছে নাকি। যদিও সাইমন আয়ের চেয়ে ব্যয় করে বেশি, তার উপর ব্যবসার হাল ঠিকমতো ধরতে পারছে না। কিন্তু মেয়ের বিয়ে তো দিতে হবে। এজন্য জমানো টাকা খরচ করছে। তবে রাশেদ সাহেব নিজেও নাতনির জন্য দুহাত ভরে দিচ্ছেন।
নূরের দেখাশোনার জন্য একটি মেয়ে রেখেছেন রাশেদ সাহেব। মেয়ে তার পর্দা করে, বাড়িতে বহু পুরুষ মানুষের আনাগোনা। নূর তো কিছুতেই রুম থেকে বের হবে না। অনুপমার আত্মীয় স্বজন যাতে নূরকে ডাকাডাকি না করে। তাদের সবার স্বভাব সম্পর্কে রাশেদ সাহেব জানেন। বিয়ের আমেজে সবাই মেতে থাকবে, নূরের খেয়াল কেউ রাখবে না। এজন্য এই ব্যবস্থা করা। বিয়ের ক’দিন সে নূরের সাথে থাকবে।
সাহারার মামা মামী এবং মামাতো খালাতো ভাই বোনেরা এসেছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। অনুপমা চেয়েছিল নূরের ঘরে তার ভাগ্নি দের রাখতে। জায়গার অভাব, কিন্তু রেহানা সাফ সাফ না করে দিলেন। এটা থাকার অভ্যাস নূরের এজন্য তার ঘরে হট্টগোল করা ঠিক হবে না। রাশেদ সাহেব জানতে পারলে রাগ করবেন। অনুপমা তখন মুখ ভেংচে বলেছিল,’বুড়ো বয়সে মেয়ে জন্ম দিয়ে ঢং কত! আল্লাহ জানেন, এই রংঢং কতদিন সহ্য করতে হবে।’
অনুপমার তিক্ত কথাগুলো এখন হজম করা শিখে গেছেন রেহানা। তবুও হয়তো কিছু বলতেন, কিন্তু বাসায় মেহমান। এদের সামনে কথা কাটাকাটি করা যাবে না। অনুপমা আত্মীয়দের পেয়ে বেজায় খুশি। রান্নাঘরে জোর দমে রান্না করছে। সাথে বাসার কাজের লোক এবং তার ভাবি, বোনেরাও রয়েছে। সাহারার মামী জিজ্ঞেস করলেন,’তোমার ননদ দের তো দেখলাম না, কোথায় ওরা?’
অনুপমা বিরক্ত মুখে বলে,’বড়টা কালকে আসবে, কত করে বললাম বড় করে মেহেদীর অনুষ্ঠান করব তাও এলো না। বলে কিনা ছেলের পরীক্ষা আছে। ওটা শেষ করেই আসবে। আসলে আমার মেয়েকে এতো ভালো ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছি তো, তাই সবার হিংসা হচ্ছে।’
অনুপমার বোন বললো,’তোর ছোট ননদ নাকি পর্দা করে শুনলাম, এজন্যই বোধহয় বাইরে বের হয় না।’
‘পর্দা না ছাই, ওটাকে পর্দা বলে? ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে বাপের সাথে ব্যবসা করে। কত পুরুষদের সাথে চলাফেরা করে তার হিসেব নেই। লোক দেখানো পর্দা।’
মামী সায় দিয়ে উঠলো,’আমার বাপের বাড়ির এক ভাবি পর্দা করে, বাপ রে। তুমি তো দেখো নি। ভাই তো ভাবিকে লবণ কিনতেও বাইরে যেতে দেয়না। সবসময় রুমের ভেতর থাকে। ওটাকে বলে আসল পর্দা।’
‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আর কিসব ডিজাইন করে সবসময়, আর ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বলে। কি ভাবে আমি কিছু বুঝি না? সবই বুঝি, রুমের ভেতর দরজা দিয়ে লাইন মারে এসব কি আর জানি না ভাবছে। আমার শ্বশুরের কারণে ধরতে পারি না শুধু।’
মামী কিছুক্ষণ ভেবে বলেন,’বিয়ে দিবে নাকি তোমার ননদ কে? আমার এক আত্মীয় আছে, ছেলে হাফেজ। ত্রিশ পারা কোরআন মুখস্থ, বড় মসজিদের ইমাম এই বয়সেই। পাশেই একটা বড় মাদ্রাসায় চাকুরী করে।’
অনুপমার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠলো। সে বিনয়ী হয়ে বলে,’তাহলে তো খুব ভালো হবে ভাবি! আপনি দেখেন, ছেলেকে বুঝিয়ে আনবেন ভালো করে। নূরকে যাতে ব্যবসা করতে না দেয়। আমি বললে কত হাদিস শোনায়, বলে কিনা নারীদের ব্যবসা করা জায়েয। পর্দা করে ব্যবসা করা যায় আরো কত কি!! আপনি ওই ছেলে নিয়ে আসুন। পরে আমি সব দেখে নিব। ছেলে নামাজি, হাফেজ শুনলে শ্বশুর মশাই আর না করবেন না।’
এমন সময় গলা খাঁকারি দিয়ে কেউ একজন রান্নাঘরে এলো। এই মেয়েটি কে নূরের জন্য রাখা হয়েছে। ওর নাম কাকলি। বেশ চটপটে মেয়েটা। কথায়ও পটু, সে এসেই ঝটপট প্লেটে খাবার বাড়তে শুরু করলো। অনুপমা হই হই করে উঠলো,’এই মেয়ে করো কি? এসব মেহমানদের জন্য।’
কাকলিও বলে ওঠে,’আপার জন্য নিতাছি, বাড়ির মানুষের পেট ভরানো লাগবে তো।’
‘এসব ভাজাপোড়া নূর খায়না, তুমি বরং জন্য ডেজার্ট আইটেম নিয়ে যাও। ও মিষ্টি পছন্দ করে।’
‘বাব্বাহ, ননদের প্রতি এত দরদ তাইলে আমারে রাখছে ক্যান? আপনেই খাবার নিয়ে যাইতেন। বুঝি বুঝি সব বুঝি।’
অনুপমা হতভম্ব হয়ে গেল, পাজি মেয়ে তো। প্রথম দেখাতেই এতো রুঢ় আচরণ!! তবে অনুপমা বুঝতে পারেনি যে মেয়েটা ওদের কথাবার্তা লুকিয়ে শুনে ফেলেছে। সে মুখ বাঁকিয়ে নাস্তা নিয়ে গেল। কড়া হুকুম করেছেন রাশেদ সাহেব, এই বিয়েতে মেহমানরা যা যা খাবে তার মেয়েকেও তা খাওয়াতে হবে। অধিকার থেকে এক চুলও ছাড় দেওয়া যাবে না। কাকলি সেই হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। তবে নূর একটু বিরক্ত বোধ করতেছে। স্ন্যাকস তার পছন্দ নয়, তার উপর কি সব ভাজাপোড়া নিয়ে এসেছে। সন্ধ্যায় সে ফলের জুস এবং ডেজার্ট খায় মাঝে মাঝে। কিন্তু এই মেয়ে তো সবকিছু নিয়ে এসেছে। নূর বলে,’এত কিছু এনেছেন কেন আপু? একা খেতে পারব নাকি? আমাকে কাস্টার্ড দিলেই হবে, আর জুস দিন।’
কাকলি আরাম করে ফ্লোরে বসে। বলে,’না খাইলেন, আমি খাইলাম সমস্যা কি!! দুনিয়ায় আসছি তো খাইতে।’
নূর মাথা নাড়ায়, এই মেয়ে চতুর প্রকৃতির। নিজের ভাগের জিনিস বেশ ভালো বোঝে। তবুও কিছু বলে না। কেননা সে তো আর চুরি করেনি, একটু খেতেই তো চেয়েছে। শত বলেও কাকলি কে বিছানায় বসানো যায়নি। তার অভ্যাস নেই। তবে এসির নিচে বসে থাকতে ভালো লাগে তার। সারাদিন এই ঘরেই থাকে। খাওয়ার সময় বের হয়, তবে কেউ দরজায় টোকা মারলে আগে আগে দরজা খুলে। বাবার এমন কাজে বেশ হতাশ নূর। এমন চটপটে একটা মেয়ের সাথে ওর যায়? সারাক্ষণ বকবক করে মাথা খায়। বেচারি নূর কিছু বলতেও পারে না। বিয়ে হওয়া পর্যন্ত এ অত্যাচার সহ্য করতে হবে ওর।
সাহারার কাজিনরা এসে মাতিয়ে রেখেছে সবকিছু। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু দেখছে। জোনাকি বড় মামার মেয়ে, বেশ স্মার্ট সে। জামাকাপড় খুব বেছে বেছে কিনে এবং সবসময় মুখে প্রসাধনী ব্যবহার করে। স্ক্রিন কেয়ারে সর্বদা সচেতন। একটু আধটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের। বিয়ের শাড়িটা দেখে বলে,’বাহ চমৎকার! শাড়িটা সুন্দর হয়েছে। তোর চয়েজ তো বেশ ভালো।’
সাহারা মৃদু হেসে বলে,’আমি চয়েজ করিনি, জান্নাত করেছে। শাড়ির ব্যাপারে ওর ধারনা ভালো। ওকে নিয়ে শাড়ি কিনলে ঠকার কোন চান্স নেই। একদম পিওর রেশম সুতার শাড়ি।’
‘জান্নাত ওই মেয়েটা না, যে তোর ছোট? সম্পর্কে তোর ফুপি?’
সাহারা মেকআপ গুলো গোছাতে গোছাতে বলে,’হ্যাঁ।’
‘শুনেছি ও খুব সেকেলে টাইপের, এমন পছন্দ ও করতে পারে অবিশ্বাস্য।’
‘সেকেলে ভেবে ভুল করছিস, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সে। চমৎকার সব হাতের কাজ ওর। ওর রুমে গেলেই বুঝতে পারবি কতটা গোছালো টাইপের মেয়ে।’
‘আচ্ছা, আলাপ করিয়ে দিস তাহলে।’
কথা আর আগায় না, গায়ে হলুদের লেহেঙ্গা সহ আরো সবকিছু দেখতে থাকে। অনেক কাজ জমে আছে। সবাই কিভাবে সাজগোজ করবে সেসব নিয়ে আলোচনা করতেছে।
রাহা এলো গাঁয়ে হলুদের দিন, দুপুরে সে এসে পৌঁছেছে। বাড়ির সকলের সাথে আলাপ হলো। অনুপমা ননদকে সাদরে গ্রহণ করলো। যদিও ওর আসা না আসায় কিছু যায় আসেনা। কেননা তার বড় ননদ সবসময় বাবা এবং বোনের পক্ষে থাকে। তাদের ভুল গুলো চোখে পড়ে না রাহার। ছেলে দুটো আসতেই হই হই করে অনুভবের কাছে ছুটেছে। তাদের পাত্তা পাওয়া যাবে না আর। রাহা আস্তে আস্তে নূরের রুমে গেল। দু’জনের বয়সের পার্থক্য ঊনিশ বছরের। তবে বয়স বাড়লেও রাহার সৌন্দর্য তেমন কমেনি। এখনও রূপের জৌলুস ধরে রেখেছে। রুমে টোকা পড়তেই কাকলি দরজা খুললো। মুখ উঁচিয়ে বললো,’কাকে চাই?’
রাহার মুখ কুঁচকে এলো,’কাকে চাই মানে? এটা নূরের রুম না?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?’
‘আমি ওর বড় বোন।’
কাকলি হই হই করে উঠলো,’আচ্ছা আচ্ছা, বড় আপা। আসেন আসেন।’
রাহা ঢুকতেই নূর ছুটে এলো এক প্রকার। হাত দুটো
ধরে বললো,’আপু তুমি এসেছো? গতকাল থেকে অপেক্ষা করছি।’
রাহা বসতে বসতে বলে,’কি আর করব বল? বড়টার কোচিং এ পরীক্ষা ছিলো। আসলাম না দেখে ভাবি মুখটা কালো করে রেখেছে আমাকে দেখে। যাক গে, আমি বাপু এই বয়সে অতো মাতামাতি করে কি করব। তা তুই কেমন আছিস?’
‘আলহামদুলিল্লাহ!! আব্বু তো কাল থেকে আমাকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। যদিও আমি বের হতাম না। দেখো, একজন লোক ও রেখেছে। এমন পাগলামির দরকার ছিলো?’
রাহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রাশেদ সাহেবের থেকে সবকিছু শুনেছে। বাবাকে বুঝিয়েছে, তবুও লাভ হলো না। নূরের ব্যাপারে একটু বেশি ভাবেন কিনা। তবুও নূর যদি জোর করে তাহলে বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে যেতে দিবে। নূরের তো এত মানুষের মধ্যে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। নূর বলে উঠলো,’দুলাভাইয়ের জন্য আতর এনেছি, আগেরবার বলেছিল। ভুলে গিয়েছিলাম, এবার আমার জন্য আর তার জন্য এনেছি।’
নূরের আতর গুলো দুবাই থেকে আসে, ফ্লোরাল আতর নূরের ভীষণ প্রিয়। গোলাপ জেসমিন এবং ভ্যানিলার সংমিশ্রণে তৈরি আতরের ঘ্রাণ অতুলনীয়। গোল্ডেন ক্যাপের বোতলটা দেখতেও আকর্ষণীয়। এক ফোঁটা মাখলেই হলো। নূরের ঘরে সবসময় আতরের ঘ্রাণ থাকে। রাহার মুখে এসব আতরের কথা শুনে ওর স্বামী নূরকে নিজের জন্য আনতে বলেছে। নূর আতরের বক্স নিয়ে রাহার কাছে দেয়।
সন্ধ্যায় আরো জমজমাট হলো বিয়ে বাড়ি। রাহার কাজিনরা সবাই ম্যাচিং শাড়ি পাঞ্জাবি পড়েছে। স্টেজ সাজানো হয়েছে হরেক রকমের ফুল দিয়ে। খাবারের এলাহি আয়োজন সব। বরের বাড়ি থেকে লোকজন এসেছে। তারা সাহারাকে হলুদ দিবে ছবি তুলবে, মজা করবে। যেহেতু বরের বাড়ি কাছেই তাই এটুকু মজা তো করাই যায়।
আজমাঈন সাদা রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে, তাকে সবার চেয়ে আলাদা লাগছে। সবার সাথে তাল মিলিয়ে সে চলতে পারেনা। এসব হলুদের অনুষ্ঠান ভালো লাগে না। ফয়েজের মান রক্ষার্থে ওর কাজিন দের সাথে আসা। আইশা এসেছে ওর সাথে, ভীষণ খুশি সে। বিয়ের বাড়িতে সবার সাথে তাল মিলিয়ে সেও শাড়ি পড়ে ভাইয়ের সাথে ঘুরঘুর করছে। তবে আজকের বিশেষ চমক আজমাঈনের বাবা আজমল শিকদার। তিনিও এসেছেন। ছেলের সাথে ম্যাচিং করে সাদা পাঞ্জাবি পড়ে এদিক ওদিক হাঁটছেন। তবে হাঁটছেন কম ছেলেকে পাহারা দিচ্ছেন বেশি। আজমাঈন পড়েছে মহা বিপদে। সে আইশাকে টেনে একপাশে এনে বলে,’তোর বাপ শুরু করছে কি? আমি কি বাচ্চা যে প্রেম করে বেড়াব? ওনার জন্য দুইবার ব্রেকআপ হওয়ার পর আর প্রেম করিনি!’
‘আমার বাপ তোমার বাপ একই কথা। আমি এখন কি করতে পারি বলো? কথা তো শুনে না। কত করে বললাম আসা লাগবে না।’
আজমাঈন বিরক্ত হয়ে বলে,’যাই হোক, আতরের বোতল গুলো দিয়ে আয়।’
‘ভাইয়া!! এতো বড় বাড়ি, মেয়েটাকে কোথায় খুঁজব?’
‘তাও কথা, এক কাজ করতে পারিস। ওয়াশ রুমে যাওয়ার বাহানায় প্রতিটা রুম চেক করবি, পেয়ে যাবি।’
‘একা যাব না, তুমিও চলো।’
আজমল শিকদার এতক্ষণ ছেলে মেয়েকে খুঁজছিল। দূর থেকে দেখতে পেয়ে দ্রুত কাছে আসেন,’এই তোরা এখানে কি করছিস? বলদ কতগুলো জন্ম দিছি। ওদিকে বিরিয়ানি দিচ্ছে তাড়াতাড়ি চল।’
আজমাঈন দাঁত কটমট করে উঠলো,’তুমি খাও? আমার কাজ আছে।’
‘ভালো কথা তো কানে যাবে না তোমার, এই চল চল।’
আইশা বললো,’উফফ আব্বু, তুমি থামো আমি ওয়াশ রুমে যাব। এই ভাইয়া আমার সাথে চলো তো।’
আজমল শিকদার মুখটা বিকৃত করে বললো,’ছেলে মেয়েগুলো মানুষ করতে পারলাম না, দেখি একটা টেবিলে বসি গিয়ে।’
আজমাঈন, আইশা নূরের রুম খোঁজার মিশনে। তবে আজমাঈন চতুর ছেলে। নূরের রুম যে নিচ তলায় নয় এটা চট করেই ধরে ফেলেছে। শপিং শেষে আসার পর নূরকে দোতলায় যেতে দেখেছে। তাই আপাতত তারা দোতলায় যাচ্ছে। একেবারে কর্ণারের রুম থেকে শুরু করলো। প্রথম দরজায় টোকা দিতেই একজন মহিলা বের হলেন। তবে আইশা বউয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো। এনার কাছে ওয়াশ রুমে যাওয়ার কথা বলা যাবে না। মহিলা সাহারার রুমটা দেখিয়ে দিলেন। দ্বিতীয় রুমটা অনুভবের, কিন্তু এখানে এখন সে একা থাকে না। রাহার ছেলে দুটিও তার সাথে যোগ দিয়েছে। ওরা রেডি হচ্ছিল। সাহারার জন্য কাঁচা ফুল আনতে গিয়েই দেরি হয়েছে। কিছুক্ষণ বাদেই সাহারার মেকআপ আর্টিস্ট বললেন লাল গোলাপ কম আছে। সেগুলো আনতে গিয়েই দেরি হলো। আজমাঈন কে দেখে অনুভব বললো, ‘আরেহ!! আপনারা চলে এসেছেন!’
আজমাঈন হাফ ছাড়ল। বললো,’তোর ফুপির রুম কোথায়?’
‘কেন?’ সন্দিহান চোখে তাকাতেই আইশা বলে উঠলো,’আমার দরকার আছে।’
‘আচ্ছা, শেষের রুমটা ফুপির। তবে সাবধান, সেখানে জাঁদরেল প্রহরী পাহারা দেয়।’
কথার মানে না বুঝলেও দু’জন মাথা নাড়ে। নূরের রুমের দরজায় টোকা পড়তেই কাকলি দরজা খুললো। মাথা বের করে বললো,’কি চাই?’
আইশা মৃদু হেসে বলে,’একটু ওয়াশ রুমে যাওয়ার দরকার।’
কাকলি আজমাঈনকে দেখে নিয়ে বলে,’বেডা মানুষ নিয়ে যাওয়া যাইবো না। পাশের ঘর দেখেন।’
‘আমিই যাব, অন্য রুমে ছেলে মেয়ে সহ অনেকে আছে।’
কাকলি মাথা ভেতরে নিয়ে নূরকে কথাটা বললো। নূর বসে বসে কিছু ডিজাইন দেখছিল। বাহিরে কে আছে তা ওর আন্দাজের বাইরে। ভদ্রতার খাতিরে তাকে ভেতরে আসতে দেওয়া দরকার। অনুমতি দিতেই আইশা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকে। হাসি মুখে বলে,’ আসসালামুয়ালাইকুম আপু! কেমন আছেন?’
নূর চমকে তাকায়, চিনতে পেরেছে আইশাকে। সোজা হয়ে বসে সালামের জবাব দিয়ে তাকিয়ে রইল। আইশা নিজেও কিছুক্ষণ স্থির হয়ে নূরকে দেখলো। পার্পেল কালারের গাউন পড়েছে নূর। ওড়না মাথায় এমনভাবে পেঁচানো যে একটা চুলও দৃশ্যমান নয়। সেদিন মুখ না দেখলেও আজ নূরের চেহারা দেখতে পেলো। ভীষণ মিষ্টি এবং স্নিগ্ধ চেহারা। শান্ত চাহনি, কোন কৌতুহল নেই। আইশা কাছে এগিয়ে এসে বলে,’আপনার সাথে তো আর দেখা হলো না। কিন্তু আজ কি সৌভাগ্য দেখুন।’
নূর কি বলবে তা ভেবে পেলো না। সৌজন্যমূলক হেসে আইশাকে বসতে বললো। আইশা বেশ চঞ্চল, বলার সাথে সাথে বসে পড়ল। নিচু গলায় বললো, ‘আপু, সেদিন আপনি আতরের বোতল টা ফেলে এসেছিলেন। কিন্তু আব্বু আর ভাইয়া মিলে সব শেষ করে ফেলেছে। এজন্য ভাইয়া আপনার জন্য সেইম আতর কিনে এনেছেন। ভাইয়ার এক বন্ধু দুবাই থাকে। তাকে দিয়েই আনিয়েছে।’
আজমাঈন বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। আজমল শিকদার ওদের খুঁজতে খুঁজতে দোতলায় এসে পৌঁছায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে বলেন,’তোরা কী বাথরুমে গিয়ে ঘুমাচ্ছিস? তাড়াতাড়ি চল, বউকে হলুদ দিচ্ছে সবাই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে খাওয়া দাওয়া করি গিয়ে।’
আজমাঈনের মাথা ঘুরে উঠলো, তার কাইষ্ঠা বাপ। বাড়িতে থাকলে ভাত খা ভাত খা বলে বাড়ি মাথায় তুলবে। খাওয়ার টাইম হলে এক মিনিট ও দেরি করা যাবে না। এখন এই বিয়ে বাড়িতে এসেও শান্তি নেই। কিছু বলতেও পারছে না আজমাঈন। কথা বললেই ঝগড়া হয়ে যাবে এক চোট। তবুও যথেষ্ট ঠান্ডা মাথায় বলে,’এটা আপনার বাড়ি নয় শিকদার সাহেব, আপনার টাকার বিরিয়ানিও না। না খেলে আপনার টাকা নষ্ট হবে না।’
আজমল শিকদার কটমট করে তাকালেন,’তুই আমারে এতো কিপটা ভাবিস ছিঃ ছিঃ। আমি অতোটা কিপটা না, তোর বন্ধুর বউকে উপহার হিসেবে কি দিচ্ছি জানিস? একটা স্বর্ণের আংটি।’
আজমাঈন হেঁসে বলে,’জানি আমার মাথা হেট করতে এই কাজটাই করবে তুমি। এজন্য মা আগে থেকেই স্বর্ণের নেকলেস এনে রেখেছে। তাও ফুল সেট, দাম কত জানো?’
আজমল শিকদার হায় হায় করে উঠলেন,’কিহ! তোর মা তো কিছুই বলে নাই। টাকা পাইলো কই? ছেলে জমি বেঁচে খায় আর মা কি চুরি করে!!’
তিনি ফোন হাতে নিয়ে ছুটলেন, এখুনি তাহমিনা কে ফোন করতে হবে। আজমাঈন এটাই চেয়েছিল, এসব কথা শুনলে ওর কিপটে বাপ বিরিয়ানি তো দূর এক গ্লাস পানিও পান করবে না। এখানে যতক্ষণ থাকবে ঝামেলা করবে। বাপকে বিদায় করার জন্য এর চেয়ে ভালো আইডিয়া মাথায় আসেনি।
চলবে,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া গল্পের লিংক
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩