She_is_my_Obsession
পর্ব :০৯
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
প্রতিদিনের তুলনায় আজ রোদ টা ধরনীতে একটু বেশিই তেজ ছড়াচ্ছে। রোদের তাপের শীতের মধ্যেও শরীর ঘেমে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টের সব কাজ শেষ করে সবেই বেরিয়েছে ফারিস। বাংলাদেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় বার বার ঘেমে উঠছে তার ফর্সা মুখমণ্ডল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিলো ফারিস। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কল দিলো কাউকে। কল রিসিভ হতেই ঝরঝরে ইংরেজি ভাষায় সুধালো ফারিস;-
–” দ্য অর্ডার ফর দ্য মার্সেডিজ-মাইবা এক্সেল্যারো কার ওয়াজ কনফার্মড। সেন্ড দ্য কার টু দ্য এয়ারপোর্ট , উইথ ওয়ান অফ ইয়োর সেলসম্যান। আই উইল রিসিভ ইট।”
হাত ঘড়িতে সময় টা দেখে পুনরায় ফোনটা পকেটে রেখে দিলো ফারিস। আধ ঘন্টা পর একজন সেলসম্যান ফারিসের কার টা নিয়ে পৌঁছালো এয়ারপোর্টে। গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে পকেট থেকে এক হাজার টাকার পাঁচটে নোট। সেলসম্যানটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো ফারিস।
অপাতত হোটেলে উঠবে সে। সোমবারের ই সিকদার বাড়ি ফিরবে। এখনো অনেক কাজ বাকি তার। আপাতত আড়ালে থেকেই কাজ গুলো করবে। যখন মুখোশ উন্মোচনের প্রয়োজন পড়বে তখনি ফারিস জাওয়ান দেখা দিবে তার লিটল গার্লের সাথে।
সিট টা আরেকটু পেছনে নিয়ে আরাম করে বসে, চোখে সানগ্লাস টা পরে ; গাড়ি স্টার্ট দিলো ফারিস।
ফারিসের হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পড়ে এসেছিলো। চেকিং শেষে রুমে ফিরেই খাবার অর্ডার দিয়ে, শাওয়ারে গিয়ে ছিলো সে।
বর্তমানে কোমর অব্দি কম্পোটার জড়িয়ে; বিছানার হেডবোর্ডের সাথে বালিশে হেলান দিয়ে, ল্যাপটপ কোলে নিয়ে ইসরাহর ফেসবুক আইডি স্ক্রল করছে ফারিস। ” ইসরাহ মুনতাসীর” নাম দিয়ে ই লগইন করা। আইডি টা নতুন খোলা, একমাস হয়েছে। মাএ আঠারো টা ফেন্ড। তেমন পোস্ট ও করা হয়নি। আঠারো টা ফেন্ডের মধ্যে দুটো ফেন্ড কে ট্যাগ দিয়ে কয়েক টা পোস্ট করা। একটা ছেলের আইডি অপর টা মেয়ের। ফারিস বুঝলো ছেলে মেয়ে দুটো ইসরাহর ক্লোজ ফেন্ড। মেয়ের আইডি টা একটু ঘুরে দেখলো ফারিস। জাইমা আহসান, অর্নাস ফাস্ট ইয়ারে পড়ছে। দুই বোন, জাইমা বড়।
ল্যাপটপ টা রেখে দিলো ফারিস। শরীর থেকে র্টি-শার্ট টা খুলে সোফায় ছুঁড়ে মারলো। বালিশ টা ঠিক করে বেডে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো ফারিস। সারাদিনের জার্নিতে শরীরটা ক্লান্ত। যদিও এতো সহজে ক্লান্ত হওয়ার মানুষ না ফারিস জাওয়ান। তবুও আর জাগলো না সে। কাল অনেক কাজ আছে তার।
সকাল নয়টা বাজে!
বাজারের থলে টা নিয়ে রাস্তার পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছে জাইমা। আকলিমা জাহান সকাল সকাল মেয়ে কে সবজি কিনতে বাজারে পাঠিয়ে ছিলেন। ফুল কপি, সিম, পাতাকপি নেওয়া শেষ জাইমার। এখনো আরো কয়েক পদের সবজি কেনা বাকি। ওড়নার কোনা টা নিয়ে মুখ মুছে নিলো জাইমা। হাতের ব্যাগ দুটো শক্ত করে ধরে। রাস্তার পার হতেই একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়ালো তার সামনে।
জাইমা কিছু বুঝে উঠার আগেই, মূহূর্তেই গাড়ি থেকে হুডি পরা একটা লোক নেমে এসে ; রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরলো তার। ছটপটিয়ে হাতের সবজির ব্যাগ গুলো রাস্তায় ফেলে দিলো জাইমা। দু’হাতে খামছে ধরলো অজ্ঞাত ব্যক্তির হাত। লোকটার শক্তির সাথে পেরে উঠলো না জাইমা। ঢলে পড়লো লোকটার বাহুতে।
জাইমা অজ্ঞান হতেই মুখ থেকে মাস্ক টা খুলে নিলো ফারিস। মাথা ঝাঁকিয়ে চুল গুলো ঠিক করে, বাঁকা হাসলো সে। এতো সহজে জাইমা কে হাতের নাগালে পাবে; ভাবেনি সে। আশেপাশে একবার তাকিয়ে জাইমা কে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে নিজে ও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো ফারিস।
আজ রবিবার। ইসরাহর গায়ে হলুদ।
দুপুর শেষের পথে । সকাল থেকে কোমরে আচঁল বেঁধে কাজ করে যাচ্ছেন আসফা আর আলেয়া। আলেয়া আরহাম সিকদারের ছোটো বোন। স্বামী সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামেই থাকেন তিনি। ঈদ , অনুষ্ঠান ছাড়া সংসার ছেড়ে ভাইয়ের বাড়ি আসা হয় না তার। কিন্তু কাল আরহাম সিকদারের ফোন পেয়ে, ভোর রাতে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছিলো আলেয়া। সকাল সাতটায় এসে পৌঁছে ছিলেন আলেয়া আর ওনার দুই সন্তান , রামিম আর রিতা।
ইতিমধ্যে সিকদার বাড়িতে অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেছে। সায়মা খালা অতিথিদের শরবত, পান – মিষ্টি এগিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে আসফা বেগম ও এসে সবাই কে দেখে যাচ্ছেন। চেয়ার – মোড়া এগিয়ে দিচ্ছেন বসার জন্য। ব্যস্ততায় রান্না ঘর ছেড়ে বেরোতে পারছেন না আসফা। তবুও হাতের কাজের ফাঁকে ফাঁকে মেহমানদের আপ্যায়নে ক্রটি রাখছেন না তিনি। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। কোনো ফাঁক ফোকর রাখতে চাইছেন না আসফা বেগম।
আরহাম সিকদার , বাড়িতে নেই। উনি ছুটে ছুটে বাহিরের দিকটা সামলাচ্ছেন। এতো তাড়াতাড়ি একটা বিয়ের আয়োজন করা চারটে খানি কথা নয়। তবুও সহধর্মিনীর মুখ চেয়ে চুপচাপ সব কিছু করে যাচ্ছেন আরহাম। আরহামের সাথে কাঁধ মিলিয়েছেন আলেয়ার স্বামী মনির সাহেব আর ছেলে রামিম। মনির সাহেব বাজারের দিকটা দেখছেন। তিনি সকাল বেলাতে ফিরেই বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। এখন অব্দি ফেরেননি। রান্নার আয়োজন টা বাড়ির সামনের দিকে করা হয়েছে। আর হলুদের স্টেজ বাড়ির পেছনের বাগানের সাজানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে আজ রমরমা পরিবেশ সিকদার বাড়িতে। বহু বছর পর আবার এমন আনন্দে মেতে উঠেছে সিকদার ভিলা। শেষ বার ফারিসের মায়ের চল্লিশাতে এতো মানুষ হয়ে ছিলো। আর আজ ইসরাহর বিয়ে উপলক্ষে।
রামিম একটু আগেই , রিতা আর ইসরাহ কে নিয়ে পার্লারে গিয়েছে। রওনাফদের বাড়ি থেকে হলুদের শাড়ি আর যাবতীয় সাজ – পোশাক সকাল টানেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আতিফা। পায়ের জুতো থেকে শুরু করে মাথার ক্লিপ সবটাই রওনাফ বেছে বেছে নিয়েছে ইসরাহর জন্য। যদিও আসফা বেগম না করেছিলেন হলুদের শাড়ির জন্য। ওনার ইচ্ছে ছিলো নিজে মেয়ের জন্য হলুদের শাড়ি কিনবেন। কিন্তু আতিফা ভূঁইয়া শুনেননি। ওনার ইচ্ছে একমাত্র ছেলের বউয়ের সব কিছু ছেলের টাকাতেই হবে। মেয়ের পরিবার থেকে কিছুই নিবেন না আতিফা।
সন্ধ্যা হতেই পুরো সিকদার বাড়ি জুড়ে রঙিন বাতির আলোয় জ্বলমল করে উঠলো।
সারা বাড়ি জুড়ে মানুষে গিজগিজ করে। আরহাম সিকদারের বিজনেস পার্টনার সহ অনেক মেহমান হয়েছে। বাগানের জায়গা সহ ড্রয়িং রুম মানুষে ভর্তি।
রিতা ইসরাহর পড়ার টেবিলের উপর ফল , ফুল দিয়ে হলুদের ডালি সাজাচ্ছে। ইসরাহ বিছানায় বসা। কাঁচা হলুদ রঙের শাড়িতে অসাধারণ লাগছে তাকে। মুখে হাল্কা কৃত্রিম প্রসাধনী। কান , গলা, হাত জুড়ে কাঁচা ফুলের গহনা। খোঁপায় বেলী ফুলের গাজরা। কোমরে রজনীগন্ধার বিছা। সব মিলিয়ে ফুলের সুভাষে মৌ মৌ করছে ইসরাহর শরীর থেকে। যেনো সদ্য বাগান থেকে তুলে আনা এক ফুটন্ত র*ক্ত গোলাপ। যার শরীর জুড়ে কেবলই শুভ্রতা আর কোমলতা।
জাইমা আর রবিন এসে ঢুকলো ইসরাহর ঘরে। রবিন হুটোপুটি করে বসে পড়লো ইসরাহর সামনে। ইসরাহ কে দেখে অবাক কন্ঠে বললো;-
–” কিরে ভাই , এতো মেকাপ করেছিস কেনো? আমার কিন্তু ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে রান্না ঘরের আটার ডিব্বা টা ভুল করে তোর মাথায় পড়ে গেছে। তার সাথে কতো গুলো ফুল লাগিয়েছিস।”
রবিনের কথায় কালো হয়ে গেলো ইসরাহর চোখ – মুখ। অসহায় মুখে জাইমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো সে;-
–” একদম মিথ্যে বলবি না বরিন। জাইমা তুই বল, আমাকে বাজে লাগছে?”
ইসরাহর অভিযোগ শুনে হাসলো জাইমা। বিছানার অপর পাশ দিয়ে এসে ইসরাহর পাশে বসলো সে। ইসরাহর হাত জোড়া মুঠোয় নিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো:-
–” রবিন তোকে বাঁদর মুখো লাগছে। আমার ইসু জান কে কতো সুন্দর লাগছে, মাশাল্লাহ।”
–” মিথ্যা কথা বলছিস কেন কাইমা।”
–” রবিন থাম, আজ ইসুর একটা বিশেষ দিন। ওর পিছেনে লাগিস না তো।”
–” তো আমার কি? ও তো আমার বন্ধুই। আমার তো আর বিয়ে লাগেনি, যে চুপ করবো।”
–” পাগলের কথায় কান দিস না ইসু।”
জাইমা মুঠোয় থাকা ইসরাহর হাতের দিকে তাকালো। পর পর অবাক কন্ঠে সুধালো সে;-
–” তোর হাত খালি যে? এদিক দে একটু আলতা পরিয়ে দেই।”
ইসরাহ হাত বাড়িয়ে দিলো জাইমার দিকে। আকস্মিক বদলে গেলো জাইমার মুখের অদল। পিছিয়ে নিলো তার হাত জোড়া। অবাক চোখে ইসরাহ আর রবিন তাকালো তার দিকে। ঠাট্টা করে রবিন বললো;-
–” আলতা পরিয়ে দিবি বলে , হাত সরিয়ে নিচ্ছিস যে?”
চিন্তিত ভঙ্গিমায় ইসরাহ সুধালো;-
–” কিছু হয়ে জাইমা?”
অপ্রস্তুত হাসলো জাইমা। তড়িঘড়ি করে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে আলতার শিশি টা বের করে ইসরাহর হাতটা টেনে নিলো সে।
–” না না, কি আবার হবে।”
একে একে ইসরাহর দু’হাত আলতায় রাঙিয়ে দিলো জাইমা। তার মধ্যেই তার ফোনটা বেজে উঠলো। আলতার শিশি টা বেড সাইড টেবিল রেখে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো জাইমা।
ফারিস কল দিয়েছে। ফারিসের কল দেখেই আঁতকে উঠলো জাইমা। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করলো সে। অপর পাশ থেকে শোনা গেলো ফারিসের গম্ভীর কন্ঠ স্বর।
–” হ্যালো?”
কাঁপা গলায় উত্তর দিলো জাইমা;-
–” ব…লুন।”
–” কাজ হয়েছে?”
–” হ্যাঁ, ইসুর হাতে আলতা পরিয়ে দিয়েছি।”
জাইমার মনে হলো ফারিস কিঞ্চিত হাসলো। কে জানি।
–” ভেরি গুড, চিঠি টা ভাঁজ করে লিটল গার্লের ড্রেসিংএ রেখে দিবে।”
–” ঠিক আ..ছে।”
চলবে
Share On:
TAGS: She is my obsession, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ৭
-
She is my Obsession পর্ব ১১
-
She is my Obsession পর্ব ৬
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ১৩
-
She is my Obsession পর্ব ১৫
-
She is my Obsession পর্ব ৫
-
She is my Obsession পর্ব ২