She_is_my_Obsession
পর্ব সংখ্যা:০৩
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
দুপুর গড়িয়ে এসেছে।
বেলা তিনটে বাজে। ঢাকা শহরের জ্যাম কাটিয়ে ক্লান্ত শরীরে মাথা ঝুঁকিয়ে রাস্তার পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছে এক বালিকা। ক্লান্তিতে তার সমস্ত শরীর নুইয়ে এসেছে। কাঁধের ব্যাগ টা চেপে ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে আসা মেয়েটার হঠাৎ ধাক্কা লাগলো কারো সাথে। পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো সে। তবে আলগোছে ধরে রাখা ব্যাগটা পড়ে গেলো পিজ ঠালা রাস্তায়। বিরক্তিতে চোখ তুলে সামনে তাকালো ইসরাহ। কাঁধে অফিসের ব্যাগ ঝুলিয়ে কাঁচুমাচু মুখে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কথা না বাড়িয়ে ঝুঁকে ইসরাহ ব্যাগটা তুলে নিলো। তড়িৎ বেগে ছেলেটা বললো;-
–” আমি তুলে দিচ্ছি দাঁড়ান।”
–” প্রয়োজন নেই।”
নিরট মুখে উত্তর দিয়ে আবার পা টেনে হাঁটা ধরলো ইসরাহ। ছেলেটাও ছাড়ার পাএ নয়। সে ইসরাহর পেছনে হাঁটা দিলো। ইসরাহর কাছে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে গদ গদ কন্ঠে বললো:-
–” মিট মাই সেলফ। আই’ম রওনাফ ভূঁইয়া। সন অফ শাহজাহান ভূঁইয়া।”
বিরক্তিতে তেতো হয়ে উঠলো ইসরাহর মুখ। এমন ছ্যাচড়া ছেলে পেলে তার একদম পছন্দ না। একে তো ধাক্কা দিয়ে ব্যাগ ফেলে দিয়েছে। এখন আবার পরিচয় দিতে যাচ্ছে। হাঁটার গতি বাড়ালো ইসরাহ। এক প্রকার দৌড়েই সে রিকশায় উঠে পড়লো। রওনাফ হতাশ চোখে চেয়ে দেখলো ইসরাহর প্রস্থানের দিকে। মেয়েটার আত্মসম্মান বোধ একটু বেশিই। ভালো লেগেছে তার।
কিচেনে চা করছেন আসফা বেগম। লিকার করা শেষ। এখন দুধ ঢেলে কাপে ঢেলে নেওয়া বাকি। আরহাম সিকদার বাগানে বসে আছেন। একটু আগেই আসফা কে ডেকে চা চেয়েছিলেন। চা টা কাপে ঢালতেই কিচেনে ঢুকলো ইসরাহ। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আসফা বেগম কে। মেয়ে কে জড়িয়ে ধরতে দেখে আহ্লাদি কন্ঠে আসফা বেগম সুধালেন;-
–” তোকে চা দিবো আম্মু?”
মায়ের জিজ্ঞাসু প্রশ্নে ক্ষণিক নীরবতায় নিমগ্ন থেকে ইসরাহ সুধালো;-
–” না, জানো আম্মু?”
–” কিছু বলবি ইসু?”
–” হুমম।”
ব্যস্ত হাতে কাজের ফাঁকে আসফা বেগম বললেন:-
–” দাঁড়া তোর বাবা কে চা টা দিয়ে আসি। পরে এসে তোর কথা শুনছি।”
উদাসীন দৃষ্টিতে সামনের পুকুরের দিকে তাকালো ইসরাহ। পাশা পাশি দুটো রাজহাঁস পুকুর জুড়ে সাঁতার কাটছে। ফের একটা হাঁস থেমে ছোটো একটা পুঁটি মাছ ধরে মুখে পুরে নিলো। অন্য সময় হলে দৃশ্য টা মুগন্ধ করতো ইসরাহ কে। মুগন্ধ হয়ে সোনালী রোদ পড়া পুকুর টা চোখ ভরে দেখতো সে। কিন্তু এখন কিছুই তার চোখে ভালো লাগছে না।
চোখ ফিরিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে সামনের খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো ইসরাহ। বিকেলের নরম রোদ এসে মেঝে জুড়ে বিছিয়ে আছে। ইসরাহ দাঁড়াতেই এক টুকরো রোদ এসে তার ফর্সা মুখশ্রী জুড়ে পড়লো। রোদ পড়তেই চিকচিক করে উঠলো ইসরাহর বাদামি চোখ জোড়া। মিষ্টি বাতাসে উড়িয়ে দিলো কাঁচা হাতে করা খোঁপার এলো চুল গুলো। দোতালার এই জায়গাটাতে দাঁড়ালে সামনের বাগান টা স্পষ্ট দেখা যায়।দোতলা বিশিষ্ট সিকদার ভিলার। নিচ তলায় লাইভ কিচেন, ড্রয়িং , ডাইনিং সহ গেস্ট রুম আর আরহাম সিকদারের বিশাল কনফারেন্স রুম।
উপর তলার পূর্ব দিকটাতে আরহাম সিকদার আর আসমা বেগমের ঘর। তার পর লম্বা একটু বারান্দার মতো জায়গা। তার পাশেই রান্না ঘর। পরের ঘরটা ইসরাহর। একেবারে শেষের কর্ণারের ঘরটা ফারিসের। যা আজ বারো বছর ধরেই ফাঁকা পড়ে আছে।
মাঝে সাজে সায়মা খালা ঘরটা সাজিয়ে গুছিয়ে ধূলো ঝেরে আবার দরজা দিয়ে রাখে। ইসরাহ যায় না ওই ঘরে। তার যাওয়া বারণ। এক বার আসফা বেগমের চোখ ফাঁকি দিয়ে রুমটাতে প্রবেশ করাতে তিনি ইসরাহর সাথে পাক্কা তিন দিন কথা বলেনি। সেই থেকে ইসরাহর শিক্ষা হয়েছে। ওই রুমের দোর আর সে মাড়ায়নি।
ভাবনা ছেড়ে নীল আকাশে চোখ রাখলো সে। আকাশ টা মেঘ শূন্য হলেও। মন খারাপের বিষন্নতায় ঢেকে আছে ইসরাহর মন আকাশ। শরীর টা কিঞ্চিত খারাপ। আজকাল হঠাৎ হঠাৎ কাউকে স্বপ্ন দেখে শেষ রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। মানুষটার মুখটা ঝাপসা। তারপর পুরো রাত আর ঘুম আসে না। মনে হয় যেনো কেউ তাকে ডাকছে। পশ্চাতে ভোরের সূর্য উঠতেই সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। আবার চোখ লেগে আসে ইসরাহ।
হাতের কাজ সেরে ধীর পায়ে আসফা বেগম এসে মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন। আঁচলে হাতটা মুছতে মুছতে ডাক দিলেন ইসরাহ কে;-
–” কি বলবি বলেছিলি তখন? এইবার বল আম্মু।”
মায়ের কথায় ধ্যান ভাঙে ইসরাহর। পাশ ফিরে একবার দেখলেন আসফা বেগমের বয়সের ছাপে নুইয়ে পড়া ফর্সা মুখশ্রী খানা। বয়সের আগেই বুড়িয়ে যাচ্ছে তার মা টা। তার মধ্যে এই কথা শুনলেই আবার চিন্তা করা শুরু করবে। এর থেকে ভালো ঘুম ভেঙে গেলে সে আজ থেকে বই নিয়ে পড়তে বসবে। ঠোঁট এলিয়ে হাসার চেষ্টা চালালো ইসরাহ। রিনঝিনি সুরে আসফা বেগম কে বললেন;-
–” কালকে তুমি আমি আর বাবা মিলে বড় কোনো রেস্টুরেন্টে যাবো। অনেক দিন হয়েছে আমরা কোথাও যাই না।”
–” এই কথা বলবি বলে এতো সিরিয়াস মুখ করে আমাকে ডেকে ছিলি?”
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো ইসরাহ। আগের থেকে এখন একটু হালকা লাগছে। এমনিই হয়তো রোজ এক সময় ঘুম ভেঙে যায়। আর সে কিনা কি ভেবে মাথা ব্যথা করছিলো।
–” বাবা কে বলে রেখো।”
–” আচ্ছা বলবো।”
–” আমাকে এক কাপ চা করে দিবে? মাথাটা খুব ধরেছে।”
–” তুই রুমে যা আমি নিয়ে আসছিক্ষণ।”
কথা বাড়ালো না ইসরাহ। মিষ্টি হেসে মায়ের পাশ কাটিয়ে রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। সন্ধ্যা পড়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান পড়বে। রুমে গিয়ে ওযু সেরে নিলো ইসরাহ।
জুনোর একটি বিলাস বহুল অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর গোপন কক্ষে হাত – পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে স্টিফেন। পুরো শরীর জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া র*ক্তের চিহ্ন। নরকিও মৃত্যু যন্ত্রণার সব পদ্ধতি ব্যবহার করা শেষ তার উপর। একটু আগেই কিছু কালো পোশাকধারি গার্ড এসে চিকেন মেরিনেট করার মতো তার শরীরে ও লবণ – মরিচ মাখিয়ে গেছে। বিভৎস আর্তনাদে উন্মাদের ন্যায় চিৎকার করে ছিলো স্টিফেন। কিন্তু চিৎকারের শব্দ গুলো গলা ছাড়িয়ে গার্ডদের কান অব্দি ও পৌছায় নি। তারা প্রফেশনাল হাতে কাজ সেরে বেরিয়ে গিয়েছিলো ঘরটা থেকে।
না জেনে করে ফেলা ভুলটার জন্যই এতো আয়োজন করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে স্টিফেন কে। তার একমাত্র দোষ সে ফারিস জাওয়ানের পিছনে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োজিত ছিলো তার শক্র পক্ষের হয়ে।
সুইজারল্যান্ড থেকে বেশ কিছুদিন আগেই স্টিফেন নিউইয়র্কে এসেছিলো। সপ্তাহ খানেক হয়েছে স্টিফেনের আমেরিকা আসার। এসেছে বললে ভুল হবে তাকে হায়ার করে আনা হয়েছিলো। সুইজারল্যান্ডে একটি গোয়েন্দা সংস্থা আছে স্টিফেনের। শ্যাডো ইন্টেল ব্যুরো। সবে কয়েক মাস হয়েছে তার সংস্থার। খ্যাতি, নাম, যশ তেমন নেই বললেই চলে। যার দরুণ এতো বড় পেইন্টারের বিরুদ্ধে প্রমাণ খোঁজার অফার আসায় লোভ সামলাতে না পেরে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছিলো সে।
অন্ধকার ঘরে হঠাৎ কারো দানবীয় পদ শব্দে চমকে উঠলো স্টিফেন। চারদিকে হন্তদন্ত হয়ে চোখ বুলাতেই দরজার পাশে দেখতে পেলো বিশাল দানবীয় এক ছায়া। তার বুঝতে বাকি রইলো না। যে তার মৃত্যু খুব সন্নিকটে। তার মৃত্যুর পর তার পরিবার জানবে কিনা বা ডেট বডিটাও দেখবে কিনা সন্দেহ। এই এক সপ্তাহে তা ভালোই বোঝা হয়েছে স্টিফেনের।
পদশব্দের মালিক এসে থামলো। স্টিফেনের থেকে ঠিক গুণে গুণে এক হাত দূরত্বে। লম্বা চওড়া গড়নের মানবকে দেখেই গা হিম হয়ে আসলো স্টিফেনের। এসি ঘরে ও ধর ধর করে ঘামছে সে। চুলের ফাঁক গলিয়ে সেই ঘাম কপালে পৌঁছেছে। হাত – পা বাধা থাকা শর্তেও চটপট শুরু করলো স্টিফেন। তার অঙ্গ ভঙ্গি যেনো এই জানান দিচ্ছে যে ক্ষমা করে দেও। এমন ভুল আর জীবনে হবে না।
বাদামি চোখের অধিকারী সেই মানব ইশারায় গার্ডদের স্টিফেনের মুখ খুলে দিতে বললো। দীর্ঘক্ষণ পর ছাড়া পেয়ে প্রাণ ভরে দম নিলো স্টিফেন। কাতর কন্ঠে ঝরঝরে ইংরেজি গুটিকয়েক শব্দে আর্জি জানালো সেই ছায়া মানবকে।
–” ছে……ছেড়ে দাও…… প্লিজ আমার প্রাণ ভিক্ষা দাও ফেরিস।”
স্টিফেনের কথায় সমস্ত ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে সেই মানব। হালকা আলো আঁধারিতে ঘেরা ঘরটাতে হাসির শব্দটা ভয়ংকর অদ্ভুতুড়ে শোনালো। ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে কপালের মাঝ বরাবর ঘর্ষণ করলো ফারিস। মূহুর্ত পর গম্ভীর কন্ঠে সুধালো ;-
–” ফারিস জাওয়ানের ডিকশেনারিতে ক্ষমা নামক কোনো ওর্য়াড নেই।”
কথা শেষে অন্ধকার হাতরে বডিগার্ড থেকে নিজের রিভলভার টা হাতে নিলো ফারিস। রিভলভার টা লোড করা আছে আগে থেকেই। তারপর ও আরো একবার দেখে নিলো তা।
পরক্ষণেই , এক গগণ বিদায়ী চিৎকারে কেঁপে উঠে সেই কক্ষ। সাউন্ড প্রুফ থাকায় সেই চিৎকার রুমের দেওয়াল ভেদ করে বের হতে পারেনি। স্টিফেনের কপালের মাঝ বরাবর গুলিটা করেছে ফারিস। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে স্টিভেন এর কপাল থেকে। তড়পাতে তড়পাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে। রক্তের ছিটে গুলো ছিটকে এসে পড়লো ফারিসের সাদা শার্টটাতে। বিরক্তির সহিত সরে গেলো ফারিস। জানোয়ারের রক্ত তার গায়ে পড়েছে। অসহ্য কর। ফারিস হাত বাড়াতেই একটা গার্ড টাওয়াল টা বাড়িয়ে দিলো। টাওয়াল দ্বারা শরীর থেকে যতোটা সম্ভব রক্ত মুছে নিলো ফারিস।
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু? যারা পড়বেন রেসপন্স করবেন প্লিজ। সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। সন্ধ্যা থেকে লিখে এখন দিলাম। হ্যাপি রিডিং , ধন্যবাদ ।)
Share On:
TAGS: She is my obsession, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ৯
-
She is my Obsession পর্ব ৮
-
She is my Obsession পর্ব ৭
-
She is my Obsession পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ১১
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ১৩