Born to be villains Golpo romantic golpo

born to be villains পর্ব ১৭


born_to_be_villains

methuburi_মিথুবুড়ি

পর্ব_১৭

❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌

‘মলের নিকটবর্তী একটি আটপৌরে কফিশপে মুখোমুখি বসে আছে অফিসার মাহেশ আর ইমামা। পাশের টেবিলে শঙ্কিত অন্তঃকরণ আর থমথমে মুখে বসে আসে ইবরাত, হিয়া। সেই তখন থেকে ওদের জবান বন্ধ। উচ্ছ্বলমনা, চঞ্চলচিত্ত আর দুরন্ত স্বভাবের জন্য যাকে অস্থিরমতি বলা হয়, সেই ইবরাত আজ বোবা বনে গেছে। আতঙ্কের দাবানল এখনও সুকোমল শরীরের প্রতিটি রক্তকোষে প্রবাহিত হচ্ছে। রক্তহিম করা সেই বিভীষিকাময় মুহুর্ত থেকে এখনও পরিত্রাণ পায়নি নাজুক মস্তিষ্ক দু’টো। ছিন্নভিন্ন সেই প্রলয়, ধ্বংসের প্রলেপ হয়ে তুলট সাদা মেঘাচ্ছন্ন দিনেও দেহ হতে নির্গত করছে শীতল ঘাম।

‘তখন মলের প্রধান প্রবেশপথ সীমিত সময়ের জন্য জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও ছাদের দরজা ছিল খোলা। আর সেই অবারুদ্ধহীন দরজার ফায়দা লুটে আততায়ীর সহচর। যখন নিস্তব্ধ মৃত্যুঘন্টা রণক্ষেত্রের গর্জন দিয়ে উঠবে, বুলেটের তীক্ষ্ণ ঝাঁঝ গিয়ে ম্যাডবিস্টের খুলি বির্দীণ করে দিয়ে দীর্ঘদিনের শাণিত বিদ্বেষ গর্জনমূখর চিৎকার দিয়ে উঠবে, ঠিক সেই ঝাঁঝালো উত্তেজনাময় মুহুর্তে অকস্মাৎ একটি গ্যাসবোম এসে পড়ে রণক্ষেত্রের ময়দানে। মুহুর্তেই ধূসররঙা ধোঁয়া ডিসেম্বরের ঘন কুয়াশার মতো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল সকলকে। কৃত্রিম ধোঁয়ার উপস্থিতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলে দেখা যায় ম্যাডবিস্ট নেই! তার চিহ্ন হিসেবে ছিল শুধু গাঢ় খয়েরী রঙের তাজা র-ক্ত।

‘তাৎক্ষণিকভাবে পাশের বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখা যায় ম্যাডবিস্ট কারোর সহযোগিতায় দড়ির সাহায্যে ছাদ থেকে নামছে। পালানোর সুব্যবস্থা হিসেবে নিচে আগে থেকেই গাড়ি রাখা ছিল৷ ফুটেজের সাহায্যে তারা কোন পথ ধরেছে, সেটা শনাক্ত করে দ্রুত মিশনে নেমে পড়ে র-ক্তপিপাসু বাহিনী। পরবর্তীতে তাদের ফেলে যাওয়া ডাটা সংগ্রহ করে খুনির পিছন ছুটে অফিসার মাহেশের ট্রিম। যদিও সকলের আগেই শিকারের পিছু নিয়েছিল ব্ল্যাকহক৷

‘আকাশের রাজা হার্পি ঈগল। দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটার। ওজন ছয় থেকে নয় কেজি সহজেই ছাড়িয়ে যায়। দুই–তিন কিলোমিটার দূর থেকেও শিকারের নড়াচড়া ধরতে পারে। শিকারের ভয়ংকরত্ব আর শক্তির দিক দিয়ে যেমন হার্পি ঈগল সবচেয়ে শক্তিশালী, তেমনি মাথার ওপর মুকুটের মতো পালকে রয়েছে রাজকীয় আভিজাত্য। মানুষের তুলনায় আট গুণ বেশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর প্রায় দুই মিটার ডানার বিস্তার।

‘এই ঈগলটিকেই রিচার্ড কিনে আনে আফ্রিকার জঙ্গল থেকে। যদিও আনার সময় সে ছিল বাচ্চা। পরবর্তী যত্ন আর লাগনপালনের সঙ্গে সঙ্গে তার নামকরণ করা হয়—ব্ল্যাকহক। পাঁচ থেকে সাত ইঞ্চি গ্রিজলি ভাল্লুকের নখের মতো দানবীয় নখের এক চাপেই ভেঙে দিতে পারে যে কারো হাড়। অহেতুক আক্রমণ নয় নিশ্চিত মৃত্যু করাই তার স্বভাব। (হার্পি ঈগল বাস্তবে কখনোই পোষ মানানো সম্ভব নয়। কারণ এটা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। সুতরাং, আপনারা বিষয়টি কাল্পনিক চরিত্রের মতো কাল্পনিক ভাবে গ্রহণ করুন। বাস্তবতা না খোঁজার অনুরোধ।)

‘রিচার্ড প্রথমে ব্ল্যাকহককে কিনেছিল নিছকই শখে। আর তার শখ যেমন ছিল ভয়ংকর, তেমনি ছিল বিকৃত রুচির প্রতিফলন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শখই হয়ে ওঠে তার মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হয়ে। আক্রমণ না করেও ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ব্ল্যাকহক। তার উপস্থিতিটাই নিস্তব্ধ হুমকি। আজ যদি গার্ডরা ধৈর্যচ্যুত হয়ে ফিরেও আসে, ব্ল্যাকহক ব্যর্থতা নিয়ে ফিরবে না। আগেরবার যেমন কয়েকশো কোষ উড়ে গিয়ে গভীর জঙ্গলের গুপ্ত আস্তানায় নিয়ে গেছিল, এবারও হয়তো ঠিক তেমনটাই করবে। কারণ ব্ল্যাকহক অসম্ভব ধৈর্যশীল। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে জানে।

“মিস ইমামা, আমি আপনাকে একটা শকিং নিউজ দিতে চাই।”

‘ইমামা নির্জীব মুখে তাকাল অফিসার মাহেশের দিকে। বিজয়ের অট্টহাসির পরিবর্তে তার মুখে ঠাঁই পেয়েছে বিষন্ন আত্মসিঃসঙ্গতা। ভাই হত্যার প্রতিশোধের তাড়নায় এতোদিন যে নিরবধি যন্ত্রণা করুণ দীর্ঘশ্বাসের সাথে বহন করছিল,আজ শয়তানটার বুকভাঙা হাহাকারে সেই ব্যাথা অজান্তেই অন্তর্হিত কান্নায় রূপ নেয়। ছোট্ট মস্তিষ্কে এতো এতো প্রশ্ন জমেছে যে, মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে এই মুহুর্তে। সে হয়তো কখনোই কল্পনাও করেনি ছদ্মহাস্যের আড়ালেও যে এতো গভীর ঢেউহীন যন্ত্রণা থাকতে পারে। থাকতে পারে এতো চাপা দীর্ঘশ্বাস, নিঃশব্দ ক্ষত আর গুমরে উঠা যন্ত্রণা থাকতে পারে—যা কারোর অভ্যন্তরীণে তোলপাড় তুলবে।

‘ইমামা ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,”কি?”

‘অফিসার মাহেশ যেন অপেক্ষায় ছিল উত্তর দেওয়ার জন্য। বিলম্ব না করে গুরুগম্ভীরভাবে শুরু করল,

“Te amo Rozabeth—বইটার প্রথম মুদ্রুন সম্পূর্ণ ফ্রি-তে দেওয়া হয়েছে। এক মুদ্রনে কয়েক হাজার বই ছাপানো হয়েছে।” (ILOVEYOU RoZabeth— পরিবর্তন করে এটি দেওয়া হলো। চ্যাপ্টার টু এই নামেই শুরু হবে)

“পঞ্চান্ন হাজার।”

‘অফিসার মাহেশ থমকালো, চমকালো। দৃষ্টি গাঢ় হয়,”আপনি জানতেন?” তারচেয়ে বেশি গাঢ়ত্ব প্রকাশ পায় কণ্ঠে।

‘ইমামা নিঃশব্দে মাথা নাড়ায়, “হুমম। এজন্যই এতো রিউমারস ছড়িয়েছিল। স্টিল এখনো আলোচনার শীর্ষে আছে বইটা৷ কিছু তো একটা রহস্য আছে বইটাতে।”

‘অফিসার বিস্ময়ে বিবর্জিত হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিষন্নসুন্দুরীর দিকে। অস্পষ্ট এক উৎপীড়ন স্পষ্ট দেখতে পেল ইমামার মাঝে। বিজ্ঞা চোখে শব্দহীন নিরীক্ষণ শেষে সন্দিহান গলায় জানতে চাইল,”ইজ’ন্ট ইট হিজ রিয়েল লাভ স্টোরি?”

“আই থিংক সো।” এবারও শুধু কলের পুতুলের মতো মাথা নাড়ায় ইমামা।

‘হঠাৎই গভীর ভাবনার অতলে তলিয়ে গেল অফিসার। যেন পার্থিব দুনিয়া সম্পর্কে বিন্দুবৎ হুঁশ নেই। ইমামা লক্ষ করল৷

“আপনি হঠাৎ এই বইয়ের ব্যাপারে এতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন কেন?”

‘নড়ে-চড়ে বসল অফিসার৷ নিপতিত ভাবনার সুতোয় টান পড়ল ইমামার গম্ভীর কণ্ঠে। কলি কোমল জিভের ডগা দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে ভাবুক কণ্ঠে বলল,

“আমি বই না, লেখকের ব্যাপারে দেখাচ্ছি।”

“রিজন?” ইমামার দৃষ্টিতে প্রশ্ন।

“জানি না। তবে, বিষয়টা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। এক কপি বই হাতে পেলে অনেককিছুই ক্লিয়ার হয়ে যেতো।”

“পাবেন না। আমি বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেছিলাম। রিসেলার গ্রুপগুলোতেও খোঁজ নিয়েছি। কেউ এটা হাত ছাড়া করতে রাজি নয়। একমাত্র মেক্সিকোতে গেলে যদি পাওয়া যায় এক কপি।”

‘অফিসার মাহেশ নিঃশব্দে সম্মতি জানাল। চেষ্টার কোনো কমতি সে-ও রাখেনি৷ কিছু বলার অভিপ্রায়ে দুই ঠোঁট ফাঁক করতেই হঠাৎ অফিসারের ফোনে একটু নিষিদ্ধ সাইড থেকে ক্ষুদ্র এক বার্তা আসে। ফোনের নীল পর্দায় তাকাতেই ঠোঁটের কোণ বেঁকে হেলে পড়ল বিকৃত এক হাসিতে। অফিসার উঠতে গিয়েও থেমে গেল৷ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিজুগল ইমামার দিকে স্থির করে ফের জানতে চাইলো,

“আচ্ছা মিস ইমামা, আপনি শিওর তো আপনার কোনো জমজ বোন নেই?”

‘বাসি ফুলের মতো মলিন মুখে হাসল মৃদু ইমামা৷ ঠোঁটের কোণে নিজের প্রতি করা তাচ্ছিল্যের হাসির রেখা অক্ষত রেখেই আওড়ালো,

“যেখানে নিজের জন্মপরিচয় নিয়েই এখনও অনিশ্চিত আমি, সেখানে…..


‘আজ ৩০শে ডিসেম্বর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অপূরণীয় শূন্যতার দিন। ২৯-১২-২৫—এই তারিখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিএনপির আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই যিনি এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাহস, দৃঢ়তা আর আপসহীনতার সাথে এবং ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার পতনের লক্ষ্যে গঠিত সাতদলীয় জোটের কারিগর সেই নারীর প্রয়াণে রাষ্ট্র ঘোষণা করে জাতীয় শোক।

‘মৃত্যু চিরন্তন এক সত্য। সেই সত্য মানার পরও মুহূর্তের মধ্যেই দেশজুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা। কোলাহলমুখর ঢাকা শহর হঠাৎ রূপ নেয় শোকে মোড়ানো নীরব এক জনসমুদ্রে। তার জানাজাকে কেন্দ্র করে মানুষের ঢল নামে। রাস্তা, অলিগলি, প্রান্তর সবই শোকাহত মানুষের ভারে উপচে পড়ে। নেত্রীকে জাতীয় সংসদ ভবনে সমাহিত করা হবে এই সংবাদে গোটা দেশ ছুটে যায় সেই দিকেই। পিঁপড়ার সমান জায়গাও ফাঁকা থাকে না। মানুষের মাথার উপর আরেক মানুষের মাথা, শোক, অশ্রু আর ইতিহাসের ভারে দমবন্ধ করা এক মুহূর্ত এক অধ্যায়, এক ইতিহাস।

‘আর এই সুযোগেই কাজ চালায় ম্যাডবিস্ট আর তার সহকারী। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। রক্তপিপাসু সৈন্যরা বহু খুঁজেও আর তাদের খোঁজ পায়নি। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হয় ব্ল্যাকহককেও। তবে সে একেবারে শূন্য হাতে ফেরেনি। ফেরার সময় তার সঙ্গে ছিল ম্যাডবিস্টের রক্তমাখা ছদ্মবেশী পোশাক।

‘ঘটনার ঠিক তিন ঘণ্টা পর রিচার্ডকে ট্রেস করতে পারে ন্যাসো। রিচার্ডের ফোনটা ধরতেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ন্যাসো বলে ওঠে,”বস, ম্যামকে নানাভাবে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে।”

‘কথাটা তখনও বাতাসে ঝুলে ছিল। পরমুহূর্তেই সেই বাতাস চূর্ণ হয়ে যায় ওপাশের গর্জনে। বিপরীত পক্ষ যেন আঘাতপ্রাপ্ত কোনো হিংস্র প্রাণী নয়, বরং হিংস্রতারই এক উন্মত্ত রূপ গর্জে উঠেছে।

“কুত্তার বাচ্চারা! তোদের ওখানে রাখা হয়েছিল কেন? কেন? কেন….কেন…..কেন? ওর চোখ থেকে ঝরা প্রতিটা অশ্রু গুনে রাখ। একটাও বাদ যাবে না। রিচার্ড কায়নাত আসছে তার এলিজানের জন্য। এবার সব অশ্রুফোঁটা চাপা পড়বে রক্তের নিচে।”

‘ফনা তোলা সাপের মতো ফুঁসতে থাকে রিচার্ড। পেশিবহুল ন্যাসোর শরীরেও কাঁপন ধরে সেই গর্জনে। বুঝতে আর বাকি থাকে না রিচার্ড সব দেখে ফেলেছে। হঠাৎই ফোনের ওপাশ থেকে ভাঙচুরের শব্দ ভেসে আসে। যেন কোনো বন্য পশু নিজের রাজ্যে প্রলয় নামিয়েছে। চূর্ণবস্তুর শব্দের ফাঁক গলে ভেসে আসে রিচার্ডের ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত কণ্ঠস্বর,

“ন্যাসো… ন্যাসো… ন্যাসো…তুমি এতটা বোকা হলে কী করে? তোমার কাছ থেকে অন্তত এটা আশা করিনি। কত বড় রিস্ক নিয়ে শিকারকে টোপে ফেলেছিলাম—ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া অ্যাবাউট দ্যাট। তোমাদের উচিত হয়নি বাস্টার্ডটার চোখের দিকে তাকানো। হি ওয়াজ হিপনোটাইজিং ইউ অল গাইজ।”

‘আশ্চর্যের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল ন্যাসোর। বিস্ময়ের ঠোঁটে কোণে ঝরে পড়ল,”হিপনোটাইজড!

‘পরমুহূর্তেই ইবরাতের ঘটনাটা মনে পড়ে যায়। তারপর ইমনের কথাও মনে পড়ে। ইমন বলেছিল লোকটার চোখের দিকে তাকাতেই নাকি তার ভেতরে কী যেন ভেঙে পড়েছিল। সে আপনাআপনি চলতে শুরু করেছিল। তার মানে শয়তানটা সত্যিই মানুষকে হিপনোটাইজ করতে পারে। নিজেকে ধাতস্থ করে ন্যাসো ব্যগ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“আপনি টোপে ফেলেছেন মানে?”

‘তীব্র আক্রোশে কাঁপতে কাঁপতে রিচার্ড দাঁতে দাঁত চাপে,

“আমার ইশারা ছাড়া কারোর হিম্মত ছিল না, ড্রাগন কুইনের ছায়া মারানোর।”

‘ন্যাসো নৈঃশব্দ্যে সম্মতি জানায়। শিকারী টোপ না ফেললে শিকার কখনো কাছাকাছি আসে না। নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে সে নিচু স্বরে বলল,”স্যরি, বস।”

‘ওপাশ থেকে বিস্ফোরণের মতো চিৎকার ছুটে আসে,”স্যরি বলছো? বাঘ জঙ্গল থেকে একবারই বেরোয়। অ্যাট এনি কস্ট আই ওয়ান্ট দ্যাট বাস্টার্ড।”

‘রিচার্ড দু’হাতে খামচে ধরে নিজের চুল। সমুদ্র-নীল চোখে আগুনের ঘনঘটা। স্বচ্ছ নীল মনির পাশে সাদা অংশ আগ্নেয়গিরির লাভার মতো রক্তিম হয়ে উঠেছে। ল্যাপটপ ভেঙে দুমড়েমুচড়ে ফেলেও সে দৃশ্য মন থেকে মুছতে পারছে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে জানোয়ারটা তার এলিজানের পেটে হাত দিয়েছে।

“আহহহহহহহহ!”
‘আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর মতো আর্তচিৎকার করে সামনে রাখা মনিটরের দিকে একটি চেয়ার ছুঁড়ে মারে রিচার্ড।

‘শান্ত, ক্রিমিনাল মস্তিষ্কের স্বল্পভাষী ন্যাসো রিচার্ডকে শান্ত করতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,”এক বনে কখনো দুই বাঘ থাকতে পারে না, বস। তার মুখোমুখি আপনি আবার হবেন। আপনাকে হতেই হবে।”

‘ন্যাসো কম কথা বলে। কিন্তু যা বলে, তা সরাসরি লক্ষ্যে আঘাত করে। এই মুহূর্তে তার কথাগুলো কাজ করে। রিচার্ডের শ্বাসের গতি ধীর হয়ে আসে। ভাঙচুর থেমে যায়।

‘একটু থেমে ন্যাসো আবার বলে,

“বস, আমার মনে হয় এবার থামা উচিত। ছেলেটাকে সবটা জানিয়ে দিলে..

“থেমে যাব?” রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে রহস্যের ঘন ছায়া জমে। রাগের তেজ ছাড়াই সে হিসহিস করে,”এবারের পরিকল্পনা যে আগের চেয়ে ভয়ংকর।”

“ডু ইউ ওয়ান্ট টু কিল হিম?”

“এতদিন সে শুধু গোলকধাঁধায় ছিল বলেই সিমপ্যাথি ছাড়া কিছু দেওয়ার ছিল না। কিন্তু আজ সে স্পর্ধা দেখিয়েছে। তার পরিণতি হবে ভয়ংকর। ভয়ংকর, ন্যাসো… ভয়ংকরহহহহহ।”

“ইট ডাজেন্ট মিন, আমি ছেলেটাকে সাবস্ক্রাইব করছি। কিন্তু এখানে তো ছেলেটার কোনো দোষ নেই, বস। আ….

“ন্যাসো!” চাপা হুশিয়ারি।

‘ন্যাসো ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। একজন বডিগার্ড হয়ে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার আছে, আদেশ দেওয়ার নয়। আর আজ ম্যাডবিস্ট যে সাহস দেখিয়েছে, তার পর অভার-পসেসিভ রিচার্ড কায়নাতের হাত থেকে তার রক্ষা পাওয়ার কোনো প্রশ্নই থাকে না।

‘হঠাৎ ন্যাসোর মনে পড়ে যায় রিচার্ডের বলা প্রথম কথাটা। টনক নড়ে ওঠে তার। কিছু একটার আচঁ পেয়ে যে ব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“বস, আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”

‘রিচার্ড তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে,”ফাদারের কাছে।”

‘ন্যাসোর কপাল কুঁচকে যায়,”আপনার কথার মানেটা ঠিক বুঝলাম না, বস। আমি কি যেটা ভাবছি… সেটাই?”

“আই হ্যাভ অলরেডি মেড মাই মাইন্ড, ন্যাসো।”

‘শিউরে উঠে চিৎকার করে ওঠে ন্যাসো, বস নো।”

‘রিচার্ড নিশ্চুপ। তার এক চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি, অন্য চোখে জমাট ক্লান্তি। ন্যাসো ঘন ঘন নিঃশ্বাস নেয়। উত্তেজিত কণ্ঠে আবার জানতে চায়,”বস, ড্রাগন হুক?”

‘ভারি নিঃশ্বাস ফেলে রিচার্ড, হ্যান্ডওভার ইট।”

“বস নো, প্লিজ নো।”

‘রিচার্ড শান্ত। কণ্ঠ দৃঢ়, অটল,”Trust me nesho. I can be against the whole world—just for her”


‘অন্ধকারে ডুবে থাকা মধ্যরাত। পরিবাগের এই পুরোনো ব্রিজটায় মানুষজনের আনাগোনা এমনিতেই কম। কুয়াশা-লেপা বাতাসের ভেতর ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক যৌনকর্মী। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একটি বাইকের হেডলাইট ভেসে এলো। ব্রেক কষে বাইকটা থামল তার সামনে। চালক হেলমেট খুলতেই আলোয় ভেসে উঠল পরিচিত মুখ—অফিসার মাহেশ!

‘মেয়েটি লাস্যময়ী হাসিতে বাইকে উঠে পড়ল। গন্তব্য বিলাসবহুল কোনো হোটেল এমনটাই ধারণা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাইকটি হোটেলের দিকে না গিয়ে থামল শহরের প্রান্তে পড়ে থাকা এক পরিত্যক্ত ল্যাবের সামনে। ভেতরে ঢোকার পর দরজা বন্ধ হলো। রাতের নীরবতা আবার জায়গা নিল। তারপর যথারীতি তাই হল, আগের মেয়েগুলোর সাতে যা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেল মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই সাইকোপ্যাথটা কি আসলে আর কেউ নয়, এই অফিসার মাহেশই?

‘হাতের রক্ত ধুয়ে মেয়েটির নিথর দেহটাকে ল্যাবের ঠান্ডা মেঝেতেই ফেলে রেখে বেরিয়ে এলো অফিসার মাহেশ। ল্যাবের পেছনটায় অন্ধকারে ডুবে থাকা এক জঙ্গল নিষ্ঠুর সাক্ষীর মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে। জঙ্গলের ভেতর পা বাড়াতেই হঠাৎ গুনগুন করে উঠল তার গলা,

❝এলোমেলো চুল, যত্ন নিয়ে সরিয়ে
চুমু দিয়ে খুব, চেপে বুকে জড়িয়ে
আঙ্গুলে, আঙ্গুলে ধরে রেখে জানাতে বিদায়
আকাশে জ্বলে থেকে…
চেয়ে দেখো খুব, বড় হয়ে গেছি আমি
উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট, আকাশে তাকিয়ে থামি
তবুও কত দিন, স্পর্শে পাই না তোমায়…❞

‘গলার সুর ভাঙল। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বটবৃক্ষের নিচে বসে সে তাকাল চাঁদের দিকে। নিস্তব্ধ আকাশ তার বুকের ভেতর ঝড় তুলে। আরেক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। হঠাৎ ফুপিয়ে উঠল মাহেশ,,

“এতো বছর ভেবে এসেছি, তোমার খুনিদের শাস্তি দিতে পারলে বুঝি বুকের যন্ত্রণা কমবে। কিন্তু দেখো মা, ওরা কেউ আর নেই… তবুও আমার ভেতরের যন্ত্রণা দিন দিন বেড়েই চলেছে।”

‘সেই বেপরোয়া আর সবসময় হাসিমুখে থাকা মানুষটার মুখোশ আজ খুলে না পড়লে হয়তো কখনোই জানা হতো না সে যে কতটা ভঙ্গুর। চাঁদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে। টপটপ করে অশ্রু ঝরে। নিঃশব্দ আকাশের দিকে তাকিয়েই ফিসফিস করে বলে,

“আমার থেকে কিছু আয়ু তোমার হলো না কেন, মা?”

‘হঠাৎ কারো পায়ের শব্দে মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠল তার মস্তিষ্ক। চোখের পানি মুছে রিভলবার বের করে পেছনে ঘুরতেই বিদ্যুৎগতির এক লাথি এসে বসলো নাক বরাবর। বিকট শব্দে ছিটকে পড়ে গেল অফিসার মাহেশ। মাথার ওপর ছায়া ফেলে দাঁড়াল সুগঠিত দেহের এক নারী। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে পিছনের পকেট থেকে আইডি বের করে ভ্রু নাচাল সে। তারপর ভারি, নির্দয় কণ্ঠে বলে,

“পিবিআই!”

‘মাটিতে পড়ে থাকা মাহেশ ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। কাঁধ ছুঁই ছুঁই চুল সেই মুখটা দেখেই বিস্ময়ের সঙ্গে অবিশ্বাস মিশে গেল তার গলায়। অস্পষ্টতা বলে উঠল,

“লাড়া স্ট্রোন!”

রেসপন্স করা না করা সম্পূর্ণ আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম আজ। বলাবলি খুবই বিরক্তিকর এক জিনিস!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply