Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৮


নতুনপ্রেমেরগান (১৮)

সুপ্রভা থামে না। অকষ্মাৎ তার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। চোখের সামনে সবটা ব্লার হয়ে ওঠে। সে অনুভব করে তার দেহটা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একজোড়া শক্ত, বলিষ্ঠ হাত এসে তার কোমর আঁকড়ে ধরে।

পুরুষালী হাতের স্পর্শে সুপ্রভা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠে। অতর্কিত স্পর্শে তার আচ্ছন্ন মস্তিষ্কেও মৃদু বিদ্যুৎ খেলে যায়। সে চায় মাথা তুলে দেখতে, কে তাকে এই অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাল। কিন্তু চোখের পাতা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আসে। তার সমস্ত তেজ, শক্তি নিংড়ে নিয়ে এক নিদারুণ ক্লান্তি তাকে গ্রাস করেছে। লোকটার বুকের ওমে, তার গায়ের মৃদু সুগন্ধের মাঝে সুপ্রভা নিজের শেষ অস্তিত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে। তার শরীরটা পুরোপুরি এলিয়ে পড়ে লোকটার শক্ত, প্রশস্ত বুকে।

সিমি উদগ্ৰীব হয়ে ছুটে আসে।তার সামনে সুপ্রভাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অ্যাপ্রন পরা একজন তরুণ ডাক্তার। ধবধবে সাদা অ্যাপ্রনের ভেতর দিয়েও তার সুগঠিত শরীর বোঝা যাচ্ছে। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলছে। এলোমেলো চুল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর চোয়ালের গড়ন তাকে ভীষণ সুদর্শন করে তুলেছে। ক্লান্তির ছাপ থাকলেও তার চেহারায় এক ধরণের অদ্ভুত সৌম্য ভাব মিশে আছে। আতঙ্কিত কণ্ঠে সিমি শুধায়–
“ প্রভার কী হয়েছে ডক্টর?”

ডক্টর রাশভারী কণ্ঠে বলে–“শি ইজ ফেইন্টিং!
মস্তিষ্কে রক্ত বা অক্সিজেনের সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার কারণে এরকম হয়।বাই দ্য ওয়ে উনি কি পেশেন্টের রিলেটিভ?”

সিমি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে –
“হ্যাঁ ডক্টর। ওই যে ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়েতে যে ছেলেটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, ও তার বোন।”

ডক্টর এক মুহূর্তের জন্য সুপ্রভার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। মেয়েটির দীর্ঘ চোখের পাতায় এখনো কান্নার জল জমে আছে। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে সুপ্রভাকে পাশের একটি খালি বেডের দিকে নিয়ে যায়।সুপ্রভাকে বেডের উপর শুইয়ে দিয়ে একজন নার্সকে উদ্দেশ্য করে বলে, “সিস্টার! একটা সেলাইন আর নার্ভ ইনজেকশন দিন। ব্লাড প্রেশার লো হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।”

নার্স এগিয়ে এলে ডক্টর সুপ্রভার হাতের পালস চেক করে। সিমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, সেই সুদর্শন ডক্টর কেবল ট্রিটমেন্টই করছে না, বরং অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সুপ্রভার কপালে হাত রেখে তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে। তার দৃষ্টিতে পেশেন্টের প্রতি কেবল দায়িত্ব নয়, যেন অবদমিত একধরণের সহানুভূতিও কাজ করছে।

নার্স সেলাইন চালু করে দিলে ডক্টর ধীরস্থির কণ্ঠে বলে, “আপাতত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ও খুব বড় ধরণের শক খেয়েছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিলে জ্ঞান ফিরবে। আর সৌরভ ছেলেটা ও আমাদের আন্ডারেই আছে। আমরা আমাদের বেস্ট ট্রাই করছি।”

ডক্টরের কোন কথাই সিমির কর্ণগোচর হয় না।সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে থাকে।ডক্টর সিমির সামনে তুড়ি মেরে গম্ভীর গলায় বলে– “ কোথায় হারিয়ে গেলেন মিস?”

সিমি হকচকিয়ে যায়। থতমত খেয়ে বলে– “ আমি সিমি, সিমি শেখ।”

ডক্টর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফু kiটিয়ে বলে, “আমি ডক্টর আরিয়ান। আরিয়ান খান।
প্রভা একটু সুস্থ হলে আমি নিজে এসে একবার চেক করব।”

ডক্টর আরিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার পরও সিমি দরজার দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে এখনো সেই গম্ভীর, মন্দ্র কণ্ঠস্বরটা বাজছে— “কোথায় হারিয়ে গেলেন মিস?”

সিমি নিজের অজান্তেই একবার গালে হাত দিল। তার মনে হলো, লোকটার চোখের চাউনিতে এমন একটা সম্মোহন আছে যে কেউ চাইলেও নজর সরাতে পারবে না।


সুপ্রভার জ্ঞান ফিরলে সে নিজেকে হাসপাতালের কেবিনে আবিষ্কার করে। ঝাপসা চোখে প্রথমেই তার নজর পড়ে শ্বেতশুভ্র সিলিংয়ের দিকে। মুহূর্তেই সৌরভের অ্যাক্সিডেন্টের কথা তার মনে পড়ে যায়।সে ছটফট করে উঠে বসতে চায় ,কিন্তু পারে না। সিমি তার তার কাঁধ চেপে ধরে। সুপ্রভা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে – “ আমার ভাইয়া কোথায় সিমি? আমার ভাইয়া ঠিক আছে তো?”

সিমি সুপ্রভাকে আলতো করে শুইয়ে দেয়। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে– “শান্ত হ প্রভা। ডক্টর আরিয়ান নিজে তোর ভাইয়াকে দেখছেন। তিনি বললেন সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই একদম চিন্তা করিস না।”

সুপ্রভা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে সেই শেষ মুহূর্তের কথা‌ সে যখন পড়ে যাচ্ছিল, কেউ একজন তাকে আগলে নিয়েছিল। সেই শক্ত বুকের স্পর্শ আর অচেনা সেই ঘ্রাণ…”

কে ছিল সে? সুপ্রভার চোখের সামনে আবছা একটা পুরুষ অবয়ব ভেসে ওঠে।

ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ডক্টর আরিয়ান। তার হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। সুপ্রভাকে চোখ মেলতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠে। সে এগিয়ে এসে সুপ্রভার চোখের মণি চেক করতে করতে বলে—

“জ্ঞান ফিরেছে তাহলে? আপনার ভাইয়া যেমন লড়াকু, আপনি দেখছি ততটাই ভঙ্গুর। এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না মিস সুপ্রভা।”

সুপ্রভা অবাক হয়ে ডক্টরের দিকে তাকায়।সুপ্রভা ক্ষীণ স্বরে বলে, “ আপনিই কি আমাকে…?”

আরিয়ান সুপ্রভার কথা শেষ করতে না দিয়ে মৃদু গলায় বলে, “আমি আপনার ডক্টর। আর হ্যাঁ, আপনি যখন ফ্লোরে আছাড় খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আমিই আপনাকে ক্যাচ করেছি। থ্যাংক ইউ বলার দরকার নেই, ওটা আমার ডিউটির মধ্যেই পড়ে।”

আরিয়ানের সোজাসাপ্টা কথায় সুপ্রভা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।। আরিয়ান নার্সকে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিয়ে সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে বলে,

“আপনার ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে। তবে এখনই দেখা করা যাবে না।। তাকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। আপনার ফ্যামিলি মেম্বাররা বাইরে ওয়েট করছেন, তারা আপনার জন্য ভীষণ চিন্তিত। একটু সুস্থ বোধ করলে তাদের সাথে দেখা করুন।”

আরিয়ান যাওয়ার আগে সিমির দিকে এক পলক তাকায়। সিমি তখনো ঘোরের মধ্যে।আরিয়ানের প্রতিটি মুভমেন্ট তার চোখের পলক পড়তে দিচ্ছে না। ডক্টর কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই সিমি সুপ্রভার হাত ধরে কেবিনের বাইরে নিয়ে আসে।

করিডোরে পা রাখতেই সুপ্রভার বুকটা ধক করে উঠে।আলেয়া বেগম করিডোরের এক কোণে জায়নামাজ পেতে বসে আছেন, তার চোখে জল। আর একটু দূরেই ঈশিতা চৌধুরী , র‌ওনক চৌধুরী দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

ঈশিতা চৌধুরীকে দেখা মাত্রই সুপ্রভা তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে। ঈশিতা চৌধুরী
সুপ্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। দরদমাখা কণ্ঠে বলেন –কাদিস না মা। আল্লাহ বড় দয়ালু। সৌরভের অপারেশন ভালো হয়েছে। ডাক্তাররা বললেন ও বিপদমুক্ত। সৌরভের কিছু হবে না মা।
তুই শান্ত হ।”

সুপ্রভা ধরা গলায় বলে– “ কিভাবে শান্ত হবো মা? কিভাবে?আমি যে অনেক বড় অপরাধ করেছি মা।আমার অপরাধের শাস্তি আমার ভাইটা পাচ্ছে।আজ আমার জন্যেই ভাইয়ার এই‌ অবস্থা।”

র‌ওনক চৌধুরী পেছন থেকে অভিমানি গলায় বলেন– “ আমাদের বাড়িতে তোমার কিসের অভাব ছিলো মা?আমরা তোমাকে নিজের মেয়ের থেকেও বেশি ভালোবেসেছি। তবুও কেন তুমি আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলে? কিসের কমতি ছিল তোমার?বল সুপ্রভা কেন গেলে? কার জন্য গেলে?”

সুপ্রভা ঈশিতা চৌধুরীর বুক থেকে সরে এসে চোখের জল মুছে নেয়।মুহূর্তেই তার মুখাবয়ব কঠিন হয়ে উঠে ।সে দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন গলায় বলে— “ প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার।”

চলবে ইনশাআল্লাহ।।

[ সুপ্রভাকে ডক্টরের গলায় ঝুলিয়ে দিব কি?]

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply