Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৯


#নতুন_প্রেমের_গান

#পর্ব_২৯

“দেখছো না চুমু খাচ্ছি।”

সিয়াদাতের এই অকপট স্বীকারোক্তিতে সুপ্রভার ভেতরটা যেন ওলটপালট করে দিল।সিয়াদাতের চোখের নেশাক্ত দৃষ্টি আর মাতালো স্বর তাকে এক অজানা ঘোরর মধ্যে ফেলে দিল। সে অস্ফুটস্বরে বলতে চাইল, ছাড়ুন আমাকে…!কিন্তু শব্দগুলো গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল।

সিয়াদাত সুপ্রভার হাতের বাঁধন একটুও আলগা করল না, বরং আরও খানিকটা ঝুকে এল। সুপ্রভার কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পাচ্ছো? নাকি বিরক্ত হচ্ছো লাল চমচম? তোমার এই কম্পন বলে দিচ্ছে তুমিও এই মুহূর্তটার জন্য প্রস্তুত ছিলে।”

সুপ্রভা চোখ বুজল। নোনা জল তার গাল বেয়ে টুপ করে সিয়াদাতের হাতের ওপর পড়ল। সেই তপ্ত অশ্রুবিন্দু সিয়াদাতের মত্ততাকে মুহূর্তেই এক ঝটকায় কমিয়ে দিল। সে সুপ্রভার চিবুক ধরে আলতো করে মুখটা উঁচু করল। সুপ্রভার ভেজা চোখের পাতায় সিয়াদাতের দৃষ্টি স্থির হলো।একটু আগের সেই উদ্ধত সিয়াদাত হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। সে নরম স্বরে বলল, “ তুমি আমার সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করো আমি জানি না। কিন্তু জোর করে তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।যদি থাকতো , এতো দিনে তুমি প্রেগন্যান্ট হয়ে যেতে।আমি তোমার বমির কারণ , মাথা ঘোরার কারণ হতাম। কিন্তু আমি সেটা চাই নি , আর এখনো চাই না। আমি চাই তুমি আমাকে অনুভব করো। এই যে হাতের ছোঁয়া, এই যে হৃৎস্পন্দনের শব্দ, এগুলো কি তোমার কাছে শুধুই নাটক মনে হয়? তুমি কি আমাকে ফিল করতে পারো না?”

সুপ্রভার কান ঝিনঝিন করে উঠল। সিয়াদাতের মুখে এমন কথা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।সিয়াদাতের বলা কথাগুলো তার মস্তিকে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। সিয়াদাত কি তবে তার নিরবতাকে দুর্বলতা ভেবে নিয়েছে? নাকি এই রূঢ় সত্যের আড়ালে সে নিজের অধিকারের দাবি জানাচ্ছে?

সুপ্রভা এক ঝটকায় সিয়াদাতের হাত থেকে নিজের চিবুক ছাড়িয়ে নিল। চোখের পানি মুছে ধরা গলায় বলল, “ফিল করা? আপনি ফিল করানোর যে ভাষা বেছে নিয়েছেন, তা কোনো সুস্থ মানুষের ভাষা হতে পারে না প্রফেসর সাহেব। আপনি কি মনে করেন সম্মতির বাইরে কোনো ছোঁয়াকে ভালোবাসা বলে? আমার জন্য আপনার চোখে ভালোবাসা ,নেশা থাকতে পারে, কিন্তু আমার চোখে শুধুই ঘৃণা আর আতঙ্ক রয়েছে।”

সিয়াদাত স্তম্ভিত হয়ে গেল।তার শান্ত চোখের কোণে এবার এক চিলতে বিষাদ খেলা করে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, “ঘৃণা? এতটাই ঘৃণা করো আমাকে?”

সুপ্রভা হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে নিলো।দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ হ্যাঁ এতোটাই।আপনি আমাকে জোর করবেন না বলেছেন, অথচ আপনার প্রতিটি কথা আমাকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করছে।”

সিয়াদাত আর কথা বাড়াল না। নিঃশব্দে সুপ্রভার থেকে সরে এলো। জানালার বাইরে দৃষ্টি রেখে অভিমানী গলায় বলল,

“আমি হয়তো ভুল উপায়ে তোমাকে বুঝতে চেয়েছি সুপ্রভা, কিন্তু আমার অনুভূতিগুলো মিথ্যে ছিল না। সময় হলে তুমি নিজেই সেটা বুঝবে।”

সিয়াদাতের অভিমানী কণ্ঠস্বর গাড়ির নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করল। সে আর সুপ্রভার দিকে তাকাল না। তার নিঃশব্দে সরে যাওয়াটা সুপ্রভার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সিয়াদাতকে ওভাবে অপমান করার পর সুপ্রভার নিজের ভেতরেও একটা হাহাকার দলা পাকিয়ে উঠল।সে জানালার বাইরে দ্রুতবেগে পিছিয়ে যাওয়া গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার সিয়াদাতের সেই বিষাদগ্রস্ত মুখটা ভেসে উঠতে লাগল। সিয়াদাতকে ওভাবে কথাগুলো বলা কি ঠিক হলো?

সুপ্রভার নিজের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।সে মনে মনে অস্ফুট স্বরে বলল, “আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন। আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্পর্শে সেই আকুলতা আমি টের পাই। কিন্তু আমার এই দগ্ধ হৃদয় যে বড় দোলাচলে দুলছে।

আপনি তো সাধারণ কেউ নন।আপনি বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। একদিকে এতো বড় একটা কোম্পানির চেয়ারম্যান, অন্যদিকে একজন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর।দেখতেও নায়কের থেকে কোনো অংশে কম নন। আপনার এক ইশারায় হাজারো রূপবতী মেয়ে সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত।তবুও কেন বারবার এই সামান্য মেয়েটার কাছেই ফিরে আসেন আপনি?কেন আমার মতো একজন বিধবা মেয়েকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিলেন? এটা কি শুধুই ক্ষণিকের মোহ, নাকি সত্যিই পবিত্র কোনো ভালোবাসা? সমাজ যাকে অপয়া ,অলক্ষী বলে তকমা দিয়েছে, তাকে আপনি কেন সম্মানের সিংহাসনে বসাতে চাইছেন?

যতক্ষণ না আমি নিশ্চিত হচ্ছি যে আপনার এই টান কেবল শারীরিক মোহ নয় বরং আত্মার টান, ততক্ষণ আমি নিজেকে আপনার হাতে সঁপে দিতে পারব না সিয়াদাত। এই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার ওই প্রেমাতুর চোখের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারছি না। মাফ করবেন আমাকে!!”

সুপ্রভা আড়চোখে একবার সিয়াদাতের পাথরের মতো জমে যাওয়া মুখটা দেখল। লোকটা কি তবে সত্যিই খুব আঘাত পেয়েছে? সুপ্রভার নিজের গলার কাছে একটা কান্নার দলা পাকিয়ে এল, কিন্তু সে তা গিলে নিল।

গাড়ির এসি চলছে পুরোদমে, কিন্তু সুপ্রভার মনে হলো বাতাসের অক্সিজেনে টান পড়েছে। চারপাশটা যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সিয়াদাতের নীরবতা তার কাছে ওই কর্কশ কথাগুলোর চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে হতে লাগল। সে জানালার কাঁচের ওপাশে রাতের শহরের ঝাপসা আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে নিজেকে বারবার শাসন করল সে কেন সিয়াদাতের মতো একজন নক্ষত্রের পাশে সে নিজেকে ধূলোর কণা ভেবে গুটিয়ে নিচ্ছে? কেন সমাজ আর বৈধব্যের দেয়ালটাকে সে ভাঙতে পারছে না?

রাস্তার দুপাশের নিয়ন আলো গাড়ির ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, যা মাঝে মাঝে সিয়াদাতের গম্ভীর মুখটাকে আলোকিত করে দিচ্ছিল। সিয়াদাতের দৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে স্থির হয়ে আছে।মনে হচ্ছে যেন সুপ্রভা এই গাড়িতে বসে নেই, সে একাই এই রাতের যাত্রী।

প্রায় বিশ মিনিট পর গাড়ির গতি মন্থর হয়ে এল। বড় গেটের ওপর খোদাই করা নামটা রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শেখ মঞ্জিল। শেখ মঞ্জিল নামটা দেখে সুপ্রভা বুঝতে পারল তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।

গাড়ি থামার সাথে সাথেই সিয়াদাত কোনো কথা না বলে দরজা খুলে নেমে গেল। সে চেয়েছিল নিজে এসে সুপ্রভার জন্য দরজা খুলে দিতে, কিন্তু সুপ্রভার তিক্ত কথাগুলো মনে পড়তেই সে সোজাসুজি বাড়ির ভেতর পা বাড়াল। সুপ্রভা অপরাধবোধে কুঁকড়ে গিয়ে ধীরপায়ে গাড়ি থেকে নামল।

সিয়াদাতের কথা ভাবতে ভাবতে সুপ্রভা খেয়ালই করেনি যে তার শাড়ির কুঁচিগুলো পায়ের সাথে জড়িয়ে গেছে। গাড়ি থেকে নেমেই কয়েক পা এগোতেই সে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। শাড়ির পাড়ে পা আটকে যাওয়ায় শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে সজোরে সামনের দিকে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। আতঙ্কে সুপ্রভার চোখ দুটো আপনাআপনি বুজে এল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক অস্ফুট আর্তনাদ।কিন্তু মাটির কঠোর স্পর্শ তাকে ছোঁয়ার আগেই, দ্রুতগতিতে একজোড়া শক্ত পুরুষালী হাত তাকে শূন্যে থাকা অবস্থাতেই আঁকড়ে ধরল। একটি হাত তার পিঠের ওপর আর অন্যটি তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।

চলবে!!!

[ আবার কোন পুরুষ এলো? মোতালেব নয় তো? আপনাদের কি মনে হয়??]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply