Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৫২


#অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

#নুসাইবা_ইভানা

#পর্ব -৫২

“আমি থাকি বা না থাকি, আমার মতো আর কাউকে তুমি ভালোবাসতে পারবে না। আমার অনুপস্থিতিতেও তোমার হৃদয়ের এককোণে ঠিক আমার জন্য ভালোবাসা রয়ে যাবে।”

“তুমি থাকবে না কেন! তোমাকে থাকতেই হবে। আমার মতো তোমাকে এভাবে কে ভালোবাসবে?”

“কেউ বাসবে না।”

“তো এত ভালোবাসা ফেলে পালাতে চাও কেন?”

“মৃত্যু এসে যদি নিয়ে যায় আমাকে?”

তুষির ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে অন্তর বলে, “একদম চুপ! এসব উল্টোপাল্টা কথা মুখে আনবে না। তোমার সাথে আমি যুগ যুগ বাঁচতে চাই। বেঁচে থাকার তাগিদে তোমাকে ভালোবেসে বৃদ্ধ হতে চাই।”

অতীতের কথা মনে পড়তেই অন্তর চিৎকার করে কেঁদে উঠল কবরের মাটি ধরে। “এত ভালোবেসে তারপর কেন নিঃস্ব করে চলে গেলে? আমাকে একা কেন রেখে গেলে, কেন এত নিষ্ঠুর হলে? ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে একদিন আমিও তোমার কাছে চলে আসব। জানি না সেই জার্নিটা কতখানি দীর্ঘ। আমাকে কেন এত ভালোবাসার মায়ায় বেঁধে ছেড়ে গেলে তুষি! আমার মেয়ে হলে তার নাম রাখব তৃষ্ণা—তোমার পছন্দের নাম। তুমি হয়ে থাকো আমার আমরণ তৃষ্ণা।”

অন্তর, নীলাঞ্জনা আর নাবিল—বাহির থেকে দেখলে সবাই ভাববে সুখী পরিবার। নীলাঞ্জনাও অনুভব করতে পারে না অন্তরের হৃদয় এখনো কতখানি পোড়ে তুষির বিরহে। চলমান জীবনধারার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সে হয়ে উঠেছে বাস্তব জীবনের সেরা অভিনেতা। বারবার ভালোবাসা যায় না। আমরা একজনকে এমনভাবে ভালোবাসি যে, এরপর তার সাথে বিচ্ছেদ হলে জীবনের নিয়মে জীবন চলে, তবুও আর কাউকে ওভাবে ভালোবাসা হয় না। এরপর যা থাকে তা হলো দায়িত্ব, মায়া আর সমাজের নিয়ম। সংসার হয়, সুখী জীবনও হয়, কিন্তু ভালোবাসাটা আর হয়ে ওঠে না। মনের সাথে যুদ্ধ করে হেরে গেলে অন্তর চলে আসে আড়াইহাজারের এই ছোট গ্রামে, নিজের ভালোবাসার মানুষের কবরের কাছে। খানিকটা সময় কোলাহল ছেড়ে এই মাটির পানে তাকিয়ে থেকে সে নিজেকে শান্ত করে। মানুষ চলে যায়, অথচ ভালোবাসা রয়ে যায়।

🌿

মাহবুব তালুকদার অনিকেতের হাত ধরে বসে আছেন। অভিমান কিছুটা কমলেও অনিকেতের মনে যে কষ্ট, তা হয়তো কোনোদিন ঘুচবে না। এত সুন্দর একটা পরিবার থাকার পরেও এতিম হয়ে বড় হওয়া, মানুষের কত কটূক্তি শুনে জীবনসংগ্রাম করে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে—সেটা শুধু অনিকেতই জানে। তাই হয়তো সব স্বাভাবিক হলেও তার মন থেকে কষ্টের সেই দাগ কোনোদিন মুছবে না।

মাহবুব তালুকদার পত্রিকায় ছাপিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন অনিকেতের পরিচয়, সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। সে ভাবছে সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষের দেওয়া কষ্ট রুহ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, এরপর তার দাগ হৃদয়ে চিরস্থায়ীভাবে ছাপ ফেলে যায়। চাইলেও তা আর কোনোদিন দূর হয় না হৃদয় থেকে। সুখ ভুলে গেলেও দুঃখ মানুষ ভুলতে পারে না।

মাহি দৌড়ে এসে বলল, “দাদু!”

মাহবুব তালুকদার তাকে কোলে নিলেন।

“দাদু, আমার দাঁত সুন্দর, নাকি পাপার?”

মাহির গাল টেনে তিনি বললেন, “তোমার দাঁত সুন্দর।”

মাহি ‘হিহি’ করে দাঁত বের করে হাসতে লাগল।

অনিকেত উঠে চলে গেল নিজের রুমের দিকে। মাহি খেলতে লাগল তার দাদুর সাথে।

সূচনা টিভিতে জাংকুকের গান শুনছে। জাহানারা বেগম সূচনার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন আর বিড়বিড় করে বলছেন, “এসব কী শুনছিস, কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না! এর চেয়ে একটা বাংলা গান ছাড়।”

“বড় আম্মু, যে ছেলেটা গান গাইছে সে কে তুমি জানো?”

“আমি কীভাবে জানব!”

“তোমাদের বাড়ির ভবিষ্যতে ছোট মেয়ের জামাই! এর জন্যই তো বাবাকে বলেছি আমাকে কোরিয়াতে স্টাডি করতে পাঠাতে। সেখানে যেয়ে ঠিক আমি ওকে পটিয়ে নেব।”

জাহানারা বেগম সূচনার মাথায় একটা গাট্টা মেরে বললেন, “এসব ভূত মাথা থেকে সরিয়ে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কর। তেল দেওয়া শেষ, টিভি বন্ধ করে গোসল করতে যাও। তোমার আম্মু নয়তো তোমাকে লাঠি দিয়ে পেটাবে।”

সূচনা হেসে বলল, “এক আম্মু পেটালে আমি আরেক আম্মুর আঁচলের তলায় লুকাব।”

ইশান গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “কে কাকে পেটাবে?”

সূচনা সোফার উপর কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “এই, আপনি সব সময় হুটহাট আমাদের বাসায় চলে আসেন কেন?”

জাহানারা বেগম সূচনার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশানকে নম্রভাবে বললেন, “কেমন আছো বাবা? এই পাগল মেয়ের কথায় কিছু মনে করো না।”

“নাহ আন্টি, সূচনা তো বাচ্চা মানুষ, ওর কথায় কী মনে করব! ভালো আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো বাবা?”

“এইতো আন্টি, আল্লাহ তাআলা ভালো রেখেছেন আপনাদের দোয়ায়।”

“তুমি বোসো, আমি তোমার জন্য জুস নিয়ে আসি।”

“না না, এসবের দরকার নেই। অনিকেত ভাইয়া আসতে বলেছিল, তাই আসলাম।”

“সমস্যা নেই বাবা, তুমি বোসো, আমি আসছি।”

জাহানারা বেগম চলে যেতেই ইশান সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতে-পায়ে লম্বা একটা পাগল বাচ্চা! এখানে কী? নিজের রুমে যাও।”

“আপনার সাহস তো কম না, আমার বাসায় এসে আমাকে পাগল বলছেন! ডাক নেই, হাঁক নেই, বিনে দাওয়াতের মেহমান! আমাদের বাসায় আপনার কী কাজ, হুম?”

“তুমি আছ বলেই তো আসি, পাগলের চিকিৎসা করতে! যাও, এখন থেকে এভাবে টি-শার্ট পরে কোনো ছেলের সামনে তোমার থাকা অনুচিত। তুমি বড় হচ্ছো।”

সূচনা দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। মনে মনে বকতে লাগল—বজ্জাত লোক!

ইশান মনে মনে ভাবল, ‘এই বাসায় একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে থাকলে বিয়ে করে নেওয়া যেত।’

জাহানারা বেগম শরবতের গ্লাস ইশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি বোসো, একটু পরেই অনিকেত আসবে। এক কাজ করো, গেস্ট রুমে যেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আমাদের সাথে একসাথে দুপুরের খাবার খাবে।”

ইশান শরবত শেষ করে টেবিলের উপর গ্লাস রেখে চলে গেল গেস্ট রুমে। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও কিছু মানুষের সাথে আমাদের মনের একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। ঠিক সেরকমভাবেই এই বাড়ির মানুষগুলো ইশানের আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে।

🌿

সায়না পার্মানেন্টভাবে তালুকদার বাড়িতে চলে এসেছে। দুপুরের রান্না শেষ করে যখন গোসলে ঢুকবে, তখন অনিকেত এসে সায়নাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “পাক্কা গিন্নি লাগছে তোমাকে। আমার পাগলাটে প্রেমিকা থেকে জোর করে হওয়া বউ, আর সেখান থেকে একদম বাঙালি বউ হয়ে ওঠা অর্ধাঙ্গিনী—ভালোবাসি তোমাকে।”

“কী করছ, ছাড়ো! শরীরে ঘাম দেখতে পাচ্ছ না?”

অনিকেত সায়নার ঘাড়ে চুমু দিয়ে বলল, “তো তাতে কী? এই ঘেমে-নেয়ে তোমাকে আরও কত হট লাগছে জানো? ইচ্ছে করছে…”

সায়না অনিকেতের ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে বলল, “এখন আর কিছু ইচ্ছে করতে হবে না। দিনদুপুরে এসব হবে না ডাক্তার সাহেব! আমাকে ছাড়ো, শাওয়ার নেব।”

অনিকেত সায়নাকে কোলে তুলে বেডের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “বউকে ভালোবাসতে রাত-দিন লাগে নাকি! আসো, দুজনে ভালোবাসা করে একসাথে শাওয়ার নিই। বাইরে গরম, বউ গরম, তাকে দেখে বরের মুডও হট হয়ে গেছে।” সায়নার ঠোঁটে চুমু খেতে খেতে বলল, “চলো বেব, সব একসাথে ঠান্ডা করি।”

🌿

জিয়ান নয়নার যত্নে একটুও ত্রুটি রাখছে না।

জিয়ান ঘুমাচ্ছে, আর নয়না জিয়ানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। একটা মানুষ কীভাবে এত ভালো হতে পারে, নয়না ভেবে পায় না। আলতো করে নিজের পেটের উপর হাত রেখে বলল, “তুই সৌভাগ্যবান, কারণ তুই রেজা চৌধুরীর মতো কেয়ারিং আর ভালো মনের একজন বাবা পাবি। আর শোন, তোর মা-ও কিন্তু ভীষণ সৌভাগ্যবতী। নয়তো এত যত্নশীল, বউকে এত সম্মান করা এমন একজন জেন্টলম্যানের অর্ধাঙ্গিনী হওয়া যায় নাকি সৌভাগ্য ছাড়া!”

নয়না জিয়ানের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল, “তুমি হয়তো ভুল সময়ে ভুল করেই আমার জীবনে চলে এসেছিলে, কিন্তু সেই ভুল ফুল হয়ে আমার জীবনটাকে সুরভিত করে তুলেছে। ভালোবাসি জামাইজান।”

জিয়ান হুট করে চোখ মেলেই নয়নার মাথায় হাত রেখে নয়নার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। চুমু খেয়ে ঠোঁট ছেড়ে বলল, “ছিহ বউ! ঘুমন্ত স্বামীর ফায়দা লুটে নিচ্ছ?”

নয়না বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বয়েই গেছে আপনার ফায়দা লুটে নেওয়ার!”

জিয়ান নয়নার হাত ধরে বলল, “আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো, ফায়দা নিচ্ছিলে না?”

নয়না জিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “নাহ, আমার ঘুমন্ত হ্যান্ডসাম বরকে একটু ভালোবাসা দিচ্ছিলাম।” বলেই জিয়ানের গালে একটা চুমু দিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য সামনে পা বাড়াল।

জিয়ান নয়নার দিকে তাকিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল, “বউ, শোনো না! আমাদের মেয়ে বেবি হলে নাম রাখব জায়না।”

নয়না কোমরে হাত দিয়ে বলল, “আমার ছেলের নাম হবে আহিয়াদ অর্ণব নিহান। ছোট করে নিহান চৌধুরী। জায়না আবার কোনো নাম হলো!”

“কী যে ছেলে ছেলে করছ বলতো? মেয়ে হবে, মেয়ে! আমি হব একটা রাজকন্যার বাবা। জায়না বিনতে জিয়ান—কত আদুরে শোনাচ্ছে, তাই না?” জিয়ান উঠে এসে নয়নার পেটের উপর হাত রেখে বলল, “আমাদের রাজকন্যা, তোমার বাবা-মা তোমার অপেক্ষায় আছে। দ্রুত চলে এসো জায়না।”

নয়না রুম থেকে বের হয়ে উঁকি দিয়ে বলল, “ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন, খুব খিদে পেয়েছে।”

“তুমি কেন নিচে যাচ্ছ? রুমে এসে বসো, সার্ভেন্ট উপরে রুমে খাবার দিয়ে যাবে।”

“আমি মোটামুটি সুস্থ, আর এইটুকু হাঁটাচলা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সো মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, দ্রুত আসুন।”

মিতা বেগম নামাজ পড়ে এসে সোফায় বসে তাসবিহ জপছেন। নয়না গিয়ে মিতা বেগমের পাশে বসল। মিতা বেগম তাসবিহ পড়া শেষ করে নয়নার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “কিছু বলবি?”

নয়না মিতা বেগমের হাত ধরে বলল, “আমার যদি মেয়ে বেবি হয়, তাহলে তার সাথে জারিফের বিয়ে দেব।”

মিতা বেগম হেসে বললেন, “আগে হোক, পরে দেখা যাবে।”

“আমার যদি কিছু হয়ে যায় ডেলিভারির সময়, তাই তোমাকে আগেই জানিয়ে রাখছি আম্মু। জারিফের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেবে তো আম্মু?”

“কী উল্টোপাল্টা কথা বলছিস! তোর কিছু হবে না। যদি আল্লাহ তা’আলা মেয়ে দেন, তো তুই নিজেই তোর মেয়েকে জারিফের হাতে তুলে দিবি।”

“আর ছেলে হলে আমি তাকে আপনার ছেলের মতো পাইলট বানাব।”

“আগেই এত কিছু ভাবিস না। আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া কর যেন সুস্থভাবে সন্তান দুনিয়াতে আসে। বাকিটা তার পরে দেখা যাবে।”

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply