হেইসুইটহার্ট___(০৬)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
নাভেদ শেখ খুব মন দিয়ে ছবি আঁকছেন। পেইন্টিং-এর জিনিসপত্রর জন্যে এ বাড়িতে ওনার আলাদা রুম বরাদ্দ। তখনই রোজি এলেন ভেতরে। হাতে সবুজ রঙের স্মুদি। এটা পালং শাক, শসা, আপেল আর লেবুর রস দিয়ে বানানো। নাভেদ একদমই চা-কফি খান না। যা একটু অভ্যেস এই স্মুদিতেই আটকে।
রোজি এসে গ্লাসটা পাশের টেবিলে রাখল। ভদ্রলোক কাজে ব্যস্ত থেকেই এক পল চাইলেন। দেখলেন, রোজির মুখ কালো। চোখেমুখে কোনো আলো নেই । ভীষণ সুন্দরী, লতানো বাঁকের স্বাস্থ্যের নারীটির এই অন্ধকার মুখ তার ভালো লাগে না। রোজি ভীষণ রূপবতী! ৪২ বছর বয়সেও ফরসা ত্বক কুঁচকায়নি। স্বাস্থ্যে বাঁক আসেনি। নাভেদ গতকাল থেকেই খেয়াল করেছেন,রোজির ঠোঁটে হাসি নেই। ভদ্রমহিলা চুপ করে বের হতে গেলে,হাতটা টেনে ধরলেন নাভেদ। ডাকলেন খুব মধুর সুরে,
“ রোজ!”
“ কিছু বলবে হানি?”
“ বসো।”
রোজি বসলেন। নাভেদ বললেন,
“ কিছু নিয়ে আপসেট তুমি?”
রোজি ভণিতা করলেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরাসরি বললেন,
“ কাল স্যাম আমায় কী বলেছে জানো?”
“ ও আবার কী বলল?”
“ বলেছে ওর কথা মতো যে না চলবে ও নাকি তাকে এই বাড়ি থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।”
নাভেদ কপাল কুঁচকে বললেন
“ ওকে রাগানোর মতো কিছু করেছ তুমি?”
“ আমি কিছু করিনি। তোমার পাগল ছেলের মনে হয়েছে তার ঘরে কেউ ঢুকেছিল,আর ব্যস সে নিয়েই হম্বিতম্বি।”
নাভেদ কণ্ঠ চেপে বললেন,
“ শশশ আস্তে…
রোজি নিরুদ্বেগ,
“ কেউ শুনবে না। স্যামও বাসায় নেই। সে যাই হোক,ও আমাকে এত বড়ো একটা কথা বলল হানি! আমার কাল থেকে খুব খারাপ লাগছে। এই বাড়িতে কি আমাদের কোনো অধিকার নেই?”
“ না রোজ। বাড়িটা তো ওর মায়ের,ওর মা ওকে দিয়ে গেছেন। তুমি আমি যে এখানে আছি সেই অনেক!”
রোজির কণ্ঠ ভিজে গেল,
“ কিন্তু এমন তো কথা ছিল না হানি। আমি তো কারো বাড়িতে এমন ভাড়াটিয়া হয়ে থাকতে চাইনি।”
নাভেদ ফোস করে শ্বাস ফেললেন। মন খারাপ করে
বললেন,
“ কী করব হানি! হুট করে যে আমার জীবনটা এভাবে পালটে যাবে আমি কি জানতাম! এখন তো আর কিছু করার নেই। ওর মন জুগিয়ে থাকো। ওকে রাগিও না। ও রাগলে কিন্তু…”
রোজি বিরক্ত মুখে বললেন,
“ বলতে হবে না। আমার মাথা খারাপ নাকি? যে ওই পাগলকে খ্যাপাব। সে নিজের মাকে খ…”
মাঝপথেই গর্জে উঠলেন নাভেদ,
“ রোজ! এই প্রসঙ্গ এখানেই থামবে। এখানেই….” ঐ চিৎকারে রোজের বুক ছ্যাৎ করে উঠল। ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে একটা রহস্যের তীক্ষ্ণ ঝিমঝিমে শব্দ ঘুরল সাথে।
তুহিনের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। একদম পেছনের একটা চাকা পাঞ্চার হয়ে ডেবে আছে রাস্তায়। বেচারা এ নিয়ে মহা মুসিবতে পড়ল। সম্রাট ওকে সময় দিয়েছে দশ মিনিট,যার ৬ মিনিট এখানেই শেষ। বাকি চার মিনিটে এখন ও অফিস অবধি যাবে কী করে? অফিস কাছে হলেও যদি পায়েও হাঁটতে যায়,চার মিনিটে পারবে না। তুহিনের মাথা গরম হওয়ার চেয়েও চিন্তা হলো বেশি। প্রডিউসার হেলেন আসার আগে ওকে পৌঁছাতে হবে। নাহলে বস যে কী করবে ওকে! ছেলেটা গাড়ির ব্যাক সিট থেকে মদের ক্রেট বের করল। এখন যে করে হোক একটা ট্যাক্সি পেলেই চলবে। ও হন্যে চোখে রাস্তার দু পাশে চাইল। হাতঘড়ি দেখল কয়েকবার।
এক সোনালী চুলের সুইডিশ মেয়ে সাইকেলে করে যাচ্ছিল তখনই। যেতে যেতে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো এক চশমা পরা যুবক দেখে ভাঁজ পড়ল কপালে। ছেলেটা ক্রেট দুহাতে নিয়ে এদিক ওদিক দেখছে। পাশেই গাড়ির রাখা। অমনি চট করে সাইকেলে ব্রেক কষল সে।
জিজ্ঞেস করল সুইডিশ ভাষায়,
“ আপনার কি কোনো সাহায্য দরকার?”
তুহিনের হন্যে চোখ থামল। তাকাল সোজাসুজি।
পিঠে ব্যাগ, কানটুপি পরা,সারা পিঠে ছড়িয়ে থাকা সোনালী চুলের সাথে, জ্যাকেট, হাঁটু অবধি শর্ট স্কার্ট আর বুট পায়ে মেয়েটাকে চোখ নামিয়ে দেখল এক পল। তুহিন অপ্রস্তুত হেসে বলল,
“ আমি সুইডিশ ভাষা অত ভালো পারি না,”
মেয়েটি মাথা নাড়ল, এবার পরিচ্ছন্ন ইংরেজিতে বলল,
“ দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনো সমস্যায় পড়েছেন। চাইলে আমি হেল্প করতে পারি।”
“ কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না।”
মেয়েটি বলল,
“ আমি মেহেক, এখানকার একটা ডর্মে থাকি। বয়স ২০, রক্তের গ্রুপ বি-পজেটিভ। সোশ্যাল সাইন্স সেকেন্ড ইয়ার। কাউকে চিনি বা না চিনি বিপদ বুঝলে সাহায্য করা অন্যতম পছন্দের একটি কাজ। চেনার জন্যে আর কিছু দরকার?”
মেহেক যখন কথা বলে,ওর ব্রাউনিশ চোখ দুটো নড়েচড়ে খুব। তুহিনের ব্যাপারটা ভীষণ ভালো লাগল। পরপর গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“ সত্যি বলতে আমার তাড়া আছে। আমার একটু লিফট দরকার।”
“ কতটা পথ?”
“ এইত সামনেই।”
“ ওকে, আসুন।”
তুহিন ইতস্তত করে বলল,
“ সাইকেলটা আমি চালাই?”
দুই ভ্রু উঁচাল মেহেক,
“ কেন, মেয়েদের পেছনে বসতে খুব ইগোতে লাগে?”
তুহিনের মুখটা চুপসে গেল।
“ না মানে…”
মেহেক নেমে দাঁড়ায়,
“ আচ্ছা বসুন।”
সাথে সাথে ক্রেট ওর দিকে এগিয়ে দিলো তুহিন। “ এগুলো নিয়ে বসবেন প্লিজ। যেন ভাঙে না তাও দেখবেন।”
মেহেক ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
“ কী এতে? ওয়াইন মনে হচ্ছে!”
“ জি আমার বসের জন্যে।”
মেহেক আর মাথা ঘামাল না। এসব জায়গায় ওয়াইন জলের মতো সহজলভ্য জিনিস।
তুহিন সাইকেল চালাচ্ছে খুব সাবলীল হাতে। তবে ঠান্ডার হুহু বাতাসে ওর চশমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আবার চশমা ছাড়া সে খুব একটা দেখতেও পায় না। মেহেক তক্ষুনি বলল,
“ রাস্তার একটা সাইনবোর্ডের লেখাও বুঝতে পারছি না। লেন্সও পরিনি,চশমাও আনিনি। কী মুসিবত!”
তুহিন ঝট করে পেছনে তাকাল। অবাক হয়ে বলল,
“ আপনিও চশমা ছাড়া দেখতে পান না?”
“ জি দূরের লেখা বুঝি না। মানুষের মুখ বুঝি তবে মুখের মধ্যে নাক চোখ কোথায় তা বুঝি না।”
তুহিন স্ফূর্ত গলায় বলল,
“ আরে বাহ,আমিও তো তাই। বাই দ্য ওয়ে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মেহেক। আমি এমনিই ভাবছিলাম কীভাবে এত তাড়াতাড়ি যাব। ভাগ্যিস আপনি এলেন। নাহলে এই দেশে কে কাকে যেচে সাহায্য করতে আসে?”
মেহেক বলল
“ আমি তো বললাম আমার অন্যদের হেল্প করতে ভালো লাগে।”
“ আপনি সুইডিশ,তাই না?”
“ কী মনে হয়?”
“ সুইডিশ সুইডিশ লাগছে। কিন্তু নামটা…”
“ ভালো লেগেছে তাই রেখেছে। বিশেষ ইতিহাস নেই।”
“ আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে আপনাদের বাড়িও স্টকহোমে? বাড়ি রেখে ডর্মে থাকেন কেন?”
“ আপনি বড্ড কথা বলেন!”
তুহিনের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। মেহেক রুক্ষ স্বরে বলল,
“ আপনি এত আস্তে কেন চালাচ্ছেন? জোরে চলুন।”
“ আপনার ভয় করবে না?”
“ আমি কার রেস করেছি। ভয় করবে কেন?”
তুহিন চোখ কপালে তুলল। বাপ্রে,এ কোন চিজ বসেছে তার পেছনে। ছেলেটা শ্বাস নিয়ে প্যাডেলে টান বসাল। রীতিমতো হাওয়ার গতিতে একেকটি পাথরের রাস্তা পিষে গেল তাতে। ভীষণ শীতেল হাওয়ায় মেহেক উচ্ছ্বাসে দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে হোওঅঅঅঅ বলে চ্যাঁচাল দুবার। বলল ,
“ আরো জোরে চালান।”
তুহিন মাথা নেড়ে হাসে। একেই বলে বিদেশী! হতো ওর দেশের কোনও মেয়ে, দু চারবার বাপ মা ডেকে মাটিতে ঢলে পড়তো।
গন্তব্য এলো তখনই। ব্রেক কষল সাইকেলে। মেহেক বলল,
“ এখানে থামালেন কেন?”
“ জি মিস,আমি এখানেই আসব।”
তুহিন নামল। ওকে দেখেই গার্ড এলেন,ক্রেট নিয়ে স্বদ্যোগে ভেতরে চলে গেলেন। মেহেক পেছনের উচু কাচের বিল্ডিং এর দিকে ফিরে চাইল। বিস্ময়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল অমনি। তড়াক করে লাফ দিয়ে নামল সে। বিল্ডিং এর ওপরে দুটো গোটা গোটা লেখা, R.Sam দেখে হতবাক হয়ে বলল,
“ এটা, এটা কি স্যামের অফিস?”
“ জি।”
“ আপনার এখানে কী কাজ?”
তুহিন গর্বে বুক ফুলিয়ে বলল,
“ আমি তো ওনার পার্সনাল এসিস্ট্যান্ট।”
মেহেক হাঁ করে ফেলল। পরপরই আর্তনাদ করে বলল,
“ ও মাই গড,আপনি আপনি স্যামের এসিস্ট্যান্ট?”
তুহিনের কান ধরে গেল ঐ চিৎকারের শব্দে। চোখ খিচে আবার খুলল ছেলেটা। মেহেক হড়বড় করে বলল,
“ আমি ওর কত বড়ো ফ্যান জানেন? উঠতে বসতে আমি শুধু ওকেই দেখি। ওর এমন কোনো গান নেই যেটা আমি ঘুমোনোর আগে শুনি না। আমি ওর ডাই হার্ড ফ্যান। প্লিজ ওর একটা অটোগ্রাফ এনে দেবেন প্লিজ!”
তুহিন জিভে ঠোঁট ভেজাল।
“ বস এখন পার্সনাল কাজে ব্যস্ত মিস মেহেক। এখন অটোগ্রাফ হবে না।”
“ প্লিজ প্লিজ না করবেন না। প্লিজ! আমি ওর খুব বড়ো ফ্যান প্লিজ!”
সুন্দরী নারীদের আবদার ফেলা যায় না,সেখানে এত অনুনয়ের পর গলল ছেলেটা। মাথা নেড়ে বলল,
“ ওখেই।”
মেহেক চটপট ব্যাগ থেকে নোটবুক আর পেন বের করে দিয়ে বলল,
“ একটু বড়ো করে দিতে বলবেন, হ্যাঁ?”
“ বস তো ওভাবে অটোগ্রাফ লেখেন না।”
“ আপনি একটু লেখান না প্লিজ!”
তুহিন আবারও না করতে পারল না। মেয়েট এমন মিনতি করছে,ফেরায় কী করে? তাই চুপচাপ রওনা করল ভেতরে।
দরজায় টোকা দিতেই সম্রাট বলল,
“ এসো।”
ছেলেটা ঢুকল দোনামনা নিয়ে। অমনি থতমত খেল এক চোট। সামনের লাউঞ্জে হেলেন বসে আছে। বাবা,এ লোক এত আগে চলে এলো? ভদ্রলোক ওকে দেখেই বললেন,
“ হেই টুহিন, কী খবর?”
“ হ্যালো স্যার!”
লোকটি চমৎকার করে আরো কিছু কথা বললেন। তুহিন নিঃশব্দে বসে থাকা সম্রাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খুব আস্তে ডাকল,
“ বস।”
পাশ ফিরল সে।
ও নোটবুক এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ একটা অটোগ্রাফ দেয়া যাবে?”
“ কার জন্যে?”
“ একটা মেয়ে,আপনার খুব বড়ো ফ্যান।”
“ তোমার চেনা?”
“ নো বস। এমনি রাস্তায় দেখা হলো। আপনার এসিস্ট্যান্ট জানাতে খুব জোর করল একটা অটোগ্রাফের জন্য। প্লিজ বস!”
সম্রাট নোটবুক আর কলম নিয়ে লিখল,
“ গুড উইসেস।”
নিচে হিজিবিজি করে ওর নাম লিখে এক টানে শেষ করল সেটা। তুহিন রয়েসয়ে বলল,
“ বস আরেকটু যদি…”
“ এর বেশি হবে না।”
“ বস,ফর মি প্লিজ?”
সম্রাট না করল না। তুহিন তার প্রিয় পাত্র। জিজ্ঞেস করল,
“ মেয়ের নাম?”
“ মেহেক।”
সম্রাট লিখতে লিখতে বলল
“ তোমার গার্লফ্রেন্ড? “
“ নো বস। চিনি না আমি।”
সম্রাট
গুড উইসেসের ওপরে লিখল
মেহেক,
হ্যাভ আ নাইস ডে।”
তারপর তুহিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ নাও লিভ!”
খুশিমনে নোটবুক নিয়ে বেরিয়ে এলো ছেলেটা। মেহেক তখন ছটফটে চিত্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছে। লেভেল ওয়ান থেকে নেমে যাওয়া বাঁকা সিঁড়িগুলো বেয়ে এসে দাঁড়াল তুহিন।
বাড়িয়ে দিলো – নিন।”
মেহেক ধরল ধড়ফড়িয়ে। নোটবুকে চোখ বোলানোর সময় তুহিন বলল,
“ বস কাউকে এত বড়ো অটোগ্রাফ দেন না। আপনাকে দিলো,আমি বলাতে।”
তার কথা শেষ হলো,তুরন্ত ঝড়ের বেগে দুহাতে জাপটে ধরল মেহেক। আনন্দে উদ্বেল হয়ে বলল,
“ থ্যাংকিউ থ্যাংকিউ। থ্যাংকিউ সো মাচ!”
কিন্তু বরফের ন্যায় জমে গেল তুহিন। একটা স্তম্ভের ন্যায় শক্ত হলো বেচারা। ফ্যালফ্যাল করে মেহেকের দিকে চেয়ে রইল সে। মেয়েটা তখন নোটবুকের অটোগ্রাফ নিয়ে ব্যস্ত। চুমু খাচ্ছে,বুকে নিচ্ছে…
তুহিন তক্ষুনি মৃদূ স্বরে ডাকল,
“ মিস সুইডিশ?”
ফিরে চাইল মেহেক,ও বলল,
“ আমি যদি বসের সাথে আপনার একটা সেলফি তোলার ব্যবস্থা করে দিই,আপনি কি আমাকে আবার জড়িয়ে ধরবেন?”
খুব শান্ত,ঝকঝকে কেবিন। নরম আলো,সফেদ দেওয়াল,তকতকে আসবাব। জানলায় ঝুলানো পাতলা পর্দার ওপর বাইরের লম্বা লম্বা পাইন গাছের ছায়া ভেসে আছে। কামরার ঠিক মাঝের গোল টেবিল ভরতি নানান প্রয়োজনীয় দামি জিনিসপত্র। ঠিক সেখানেই একটা নেমপ্লেট বসানো,লেখা : সাইক্রিয়াটিস্ট শৌর্য শেখ!
সম্রাট পেশেন্ট দেখবে আজ। স্টকহোমের অন্যতম বড়ো হাসপাতাল এটা। যেখানে সপ্তাহের এই একটা দিন বসে ও। কিন্তু বাকি পাঁচজন চিকিৎসকের মতো তার গুরুগম্ভীর হাবভাব কখনোই থাকে না। ও শান্ত,স্থির…তবে চঞ্চল নিজেকে নিয়ে। সম্রাট চেয়ার দুলিয়ে দুলিয়ে ম্যাগাজিন দেখছিল। বেশভূষা একদম আলাদা আজ। ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরনে। ডাস্টি রোজ রঙের শার্টের সাথে মিউটেড নেভি ব্লু প্যান্ট। খুব দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়ি বাম হাতের কব্জিতে। জ্যাকেট নেই,আর না অগোছালো তার ব্রাউনিশ চুল। রকস্টার স্যামের পোশাক-আশাকের সাথে সাইক্রিয়াটিস্ট শৌর্যর যে বিস্তর তফাত তা চোখ বুজে বলে দেয়া যাবে! তক্ষুনি টোকা পড়ল দোরে।
ও গলা তুলে বলল,
“ আসুন।”
এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। দেখতে বেশ ধনাঢ্য লাগলেও চেহারার অবস্থা ভালো নয়। চোখের নিচে কালি,কাঁধটা বেঁকেছে একদিকে। ক্লান্ত হেসে বললেন,
“ হ্যালো ডক্টর।”
চমৎকার করে হাসল সম্রাট, ম্যাগাজিন গুছিয়ে রাখল। চেয়ার দেখিয়ে বলল,
“ হ্যাভ আ সীট।”
বসলেন তিনি। নজর পড়ল সম্রাটের ওই বিরল চোখের রঙে। সুইডেনের আভিজাত্য এই চোখ, যা খুব কম মানুষ পায়। পরপর দেখলেন ওর হাতের সেই তিনটি প্লাটিনামের আংটি। দুটো খোলা বোতাম থেকে চোখটা আটকাল গলার চেইনে ঝুলতে থাকা চাবির মতো লকেটের ওপর। জিভে ঠোঁটটা ভেজালেন ভদ্রলোক।
ঠোঁটে হাসি টেনে বললেন,
“ খুব খাটুনি গেল আপনার এপোয়েন্টমেন্ট পেতে। আমাদের কথা ভেবে অন্তত সপ্তাহের আরেকটা দিন বাড়ান। এমনিই আপনার সিরিয়াল পাওয়া যায় না।”
“ আমি আমার এই পেশাকে এঞ্জয় করি না৷ আর যা এঞ্জয় না করি সেটার জন্যে সপ্তাহের একটা দিনই আমার জন্যে বেশি হয়ে যায়। আপনি আপনার সমস্যা বলুন। পুরোটা বলবেন, কিচ্ছু লুকোবেন না। মেন্টাল ইস্যু, ফিজিকাল সিকনেস কিছু না।”
“ শরীর ভালো আছে। কিন্তু আমি ভালো নেই।”
“ সমস্যাটা কী নিয়ে?”
“ মা!”
তুরন্ত সম্রাটের স্বাভাবিক মুখ পালটে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কেমন জড়ের ন্যায় মুঢ়তা নেমে আসে স্থূল সবুজ দুটো চোখে।
ভদ্রলোক বললেন,
“ বাবা মারা যাওয়ার পর আমার স্ত্রীর কথায় মাকে ওল্ড এজ হোমে রেখে আসি। মা যেতে চাননি। ওখানে গিয়েও খুব কাঁদতেন, বারবার ফোন করতেন বলতেন,ওনাকে নিয়ে যেতে। আমি এতটা বিরক্ত ছিলাম যে ফোনই ধরতাম না। আমার স্ত্রী মাকে পছন্দ করতো না। আমিও সংসারে ঝামেলা চাইনি। মাঝেমাঝে ফোন ধরলেও খুব চেঁচামেচি করতাম। একদিন খবর এলো মা অসুস্থ! তাও দেখতে যাইনি। এরপর পরের খবর এলো মা আর নেই। মারা যাওয়ার আগে আমাকে নাকি খুব করে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেখা হয়নি আমাদের।”
ভদ্রলোক থামলেন। শ্বাস নিলেন একটু।
সম্রাট ওর নির্লিপ্ত চোখ নিচে নামিয়ে রাখল। টেবিলের কাচে ফুটে ওঠা নিজের বিবর্ণ মুখটায় চেয়ে চুপ রইল সে।
ভদ্রলোক হাহাকার করে বললেন,
“ তারপর থেকে এই আফসোস আর এই অনুশোচনায় আমি দিন দিন মরে যাচ্ছি মিস্টার শেখ। শান্তিতে বসতে পারি না। মাকে মনে পড়ে। ঘুমোতে পারছি না। চোখ বুজলেই মা স্বপ্নে চলে আসছেন। আর এসে…”
সম্রাট ঢোক গিলল। মূর্তির ন্যায় ঠোঁট নেড়ে বলল,
“ এসে কিছু বলে না। শুধু চুপ করে চেয়ে থাকে।”
“ এক্সাক্টলি… আপনি, আপনি বুঝতে পেরেছেন মিস্টার শেখ? আমি না বলতেই বুঝেছেন আপনি?
ওই চাউনি সহ্য করা যায় না। মনে হয়, মনে হয় আমিই দোষী। আমিই অপরাধী। আমি মাকে সরি বলতে চাই। কিন্তু.. “
সম্রাট বলল,
“ ঘুম ভেঙে যায়।”
“ জি জি এটাই হয় প্রতিবার। সরি বলতে পারি না। আমি নিজের কাছে পরিচ্ছন্ন হতে চাই মিস্টার শেখ। একটু স্বস্তি চাই আমি। বলুন কোন থেরাপি, কী ড্রাগ কতটুকু চিকিৎসা নিলে আমার কাজ হবে? কতদিন কাউন্সেলিং-এ থাকতে হবে? আপনার নামে আমি অনেক শুনেছি। সেই ভরসাতেই আসা। আপনি প্লিজ আমাকে ভালো করে দিন। আই যাস্ট ওয়ান্ট টু স্লিপ পিসফুল্লি!”
সম্রাট কিছুক্ষণ পাথরের মতো বসে রইল। চোখ দুটো অস্থির। পরপর বড়ো শ্বাস নিলো সে। প্রেসক্রিপশনে কলম ছোঁয়াতে গেল,হুট করে ঐ সাদা পৃষ্ঠায় ভেসে উঠল কিছু ভয়ংকর ছবি। একটা মারবেল মেঝে,মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো রক্তের দাগ,একটা লাশ…
সম্রাটের বুকে চাপ পড়ল। ভেসে উঠল গলার শিরাগুলো। অমনি তড়াক করে উঠে দাঁড়াল সে। চেয়ারটা একটু শব্দ করে পেছনে সরে গেল। সম্রাট জানলার দিকে চেয়ে, খুব শান্ত স্বরে বলল,
“ আপনি নেক্সট উইকে আসুন!”
ভদ্রলোক আশ্চর্য হলেন,
“ কেন ডক্টর? কোনো সমস্যা?”
“ আই হ্যাভ টু লিভ নাউ।”
“ কিন্তু আপনার এখানে তো সিরিয়াল পেতেই দুই সপ্তাহ লেগে যায়।
আবার পরের সপ্তাহ কী করে?”
সম্রাট কিছু বলে না। তার সবুজ চোখ লেগে গেছে দেওয়ালে। সেখানে আর দেওয়াল নেই। আছে একটা মেঝে, আর রক্তের দাগ, যেটা সে নিজ হাতে মুছছিল সেদিন।
ভদ্রলোক অনুরোধ করে বললেন,
“ প্লিজ, মিস্টার শেখ…
আমার অবস্থাটা বুঝুন।
আমার আপনার কাউন্সেলিং দরকার।
আমি ঠিক থাকতে পারছি না।”
সম্রাট সেকেন্ড কয়েক থমকেই রইল। পরপর চাইল ঘুরে। প্রেসক্রিপশন টেনেই দ্রুত,খুব দ্রুত হাতে
দুটা ওষুধের নাম লিখল সেখানে। ডোজ ছোট। কথাবার্তা না বলেই কাগজটা ছিঁড়ে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ ডোজ আজ থেকে শুরু হবে। রিসেপশন থেকে নেক্সট এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে যাবেন।”
ব্যস, আর কোনো নির্দেশনা নেই। কোনো থেরাপি প্ল্যান নেই। তড়বড় করে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
সম্রাট তখন করিডোরে। হাসপাতালে ভিড় নেই। দু চারজন নার্স কাজ করছেন নিজেদের মতো। সম্রাটের চোখমুখ শূন্য,পায়ের গতি অস্থির। খুব দ্রুত হাঁটছে সে।
যেন কোথাও পৌঁছানো বাকি। পালানো বাকি ভয়ানক কিছু থেকে। তক্ষুনি
ড. ইয়োহানের নজর পড়ল এদিকে। ডাকলেন সাথে সাথে,
“ একি ড. শেখ! কোথায় যাচ্ছেন?”
সম্রাট থামল না। শুধু উত্তর ছুড়ে দিলো,
“ আজ আর পেশেন্ট দেখব না। যারা আছে সবাইকে চলে যেতে বলুন।”
“ দেখবেন না! কেন দেখবেন না?”
“ ইচ্ছে করছে না।”
ইয়োহানের মেজাজ চটে গেল,
“ আর ইউ ইনসেন? এটা কি ইয়ার্কি হচ্ছে মিস্টার শেখ? আপনি এমনিতেই এক দিনের বেশি সময় দেন না।
পেশেন্টরা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে থাকে।
এখন আবার মাঝখানে সেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন? আপনি কোথায় যাচ্ছেন? দাঁড়ান আমি কথা বলছি তো।”
করিডোরের বাতাস ভারি,সেই সাথে ইয়োহানের কথাবার্তায় সম্রাটের কাঁধ শক্ত হয়ে গেল। থামল না তাও। হাঁটল সে প্রতাপি পায়ে। ইয়োহানও দমলেন না। পেছন পেছন আসতে আসতে বললেন,
“ এই হাসপাতাল আপনার ব্যক্তিগত চেম্বার না, ড. শেখ। এখানে নিয়ম আছে, সময় আছে, দায়িত্ব আছে। আপনি এটাকে মগের মুল্লুক পেয়ে বসেননি। এসব চলবে না এখানে। হয় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করুন,নাহয় বেরিয়ে যান।”
সম্রাট থমকে দাঁড়াল । নিরেট চিবুক ফুটিয়ে, নিষ্প্রভ চোখ নামিয়ে চাইল পাশের ছোটো টেবিলের দিকে। কয়েকটা কাচের পানির বোতল রাখা তারওপর।
ইয়োহান কানের কাছে দাঁড়িয়ে তখনো গজগজ করছেন। খুব তেজ নিয়ে বলছেন,
“ আপনার সেলিব্রিটি হাবভাব আপনি অন্য কোথাও দেখাবেন। এখানে আপনার ওসব রক ফকের কোনো দাম নেই। আপনি যদি আমার কথা না শোনেন আমি কিন্তু এবার স্টেপ নেবো।”
সম্রাট ওই কাচের বোতলে হাত বোলায়। ইয়োহান বললেন,
“ আপনি শুনছেন আমি কী বলছি? কথা কি কানে যাচ্ছে…”
ঝোড়ো হাওয়ার বেগে টেবিলের শক্ত কাঠে একটা বোতল তুলেই বাড়ি মারল সম্রাট।
এক বাড়িতে বোতলের মাথা ভেঙে গুড়ো হয়ে গেল।
সেই শব্দে কথা আটকে গেল ইয়োহানের। চমকে উঠলেন তিনি। বাকি এব্রোথেব্রো সূচালো মাথাটা চিতার বেগে ঘুরেই ইয়োহানের পেটের ওপর চেপে ধরল সম্রাট। ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে পড়লেন । ভয়ে শ্বাস আটকে গলায় এসে দাঁড়াল।
সম্রাটের সবুজ চোখে রক্ত ভেসে আছে। চোয়ালের হাড় মড়মড় করছে দুপাশে। ইয়োহান জান হাতে নিয়ে, শ্বাস তুলতে তুলতে নিজের পেটের দিকে চাইলেন। ওই ভাঙা বোতলের সূচালো মাথা ঠিক শার্টের সাথে মিশিয়ে ধরেছে সম্রাট। এদিক- থেকে ওদিক হলেই পেটের চামড়া ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে যাবে।
ইয়োহান কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“ মি মিস্টার র শেখ,মিস্টারর শশেখ….
সম্রাটের চোখ ঠান্ডা। অস্বাভাবিক ঠান্ডা। তার চেয়েও বরফ তার গলার স্বরে। বলল,
“ আমি আজ পেশেন্ট দেখব না।”
ইয়োহান ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বললেন,
“ দেখতে হবে না,দেখতে হবে না। আপনি যান,যান আপনি।”
সম্রাট ভাঙা বোতল সরিয়ে নিলো। আগের মতোই নামিয়ে রাখল টেবিলে।
কিছু না বলে ঘুরে হাঁটা শুরু করল পরপর। এবার আর কেউ থামাল না,বলল না কিছু। সবাই চেয়ে রইল নির্বাক হয়ে। করিডোরে ভাঙা কাচ পড়ে রইল একইরকম। ইয়োহান চোখ প্রকট করে চেয়ে রইলেন ওর যাওয়ার পথে। ভয়ে-আতঙ্কে ঘেমে গিয়েছেন তিনি। ঢোক গিলে রুমাল বের করে কপাল মুছলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
“ সা সাইকো একটা!”
হাসপাতালের বাইরে সম্রাটের বডিগার্ডরা ছিল। একজন ছুটে গেল ওভার কোর্ট নিয়ে। পরাতে চাইলে সম্রাট হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলো তাকে। লন থেকে গাড়িটা ছুটে এসে সামনে থামল তখনই। তুহিন নেমে দরজা খুলে দিলো। সম্রাট অধীর পায়ে সীটে উঠে বসে। শার্টের অর্ধেক বোতাম খুলে দেয়। বেরিয়ে আসে ফাঁকা, সাদাটে একটা বুক। তারপর পানির বোতল তুলে ঢকঢক করে পুরোটা খায় সম্রাট। চোখ বুজে শ্বাস নেয় কবার।
তুহিন রয়েসয়ে বলল,
“ আর ইউ ওকে বস?”
“ স্টার্ট দ্য কার।”
ও আর কিছু বলল না। গাড়ি ছুটতে শুরু করল। সম্রাট কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ এগোনিস্টের সামনে দাঁড়াতে বলো তুহিন,আফনানের জন্যে একটা জিনিস নেবো!”
“ ওকে বস।”
সম্রাট সবুজ চোখ ফেলে রাখল বাইরে। স্টকহোমের এই ওলি-গলিতে ওর মায়ের স্মৃতি,ওর মরফার স্মৃতি( নানা)। এই রাস্তা ধরে মা ওকে স্কুলে নিতেন।
সম্রাট পোড়া শ্বাস ফেলল। বলল মৃদূ স্বরে,
“ মেক মি সামথিং স্ট্রং, তুহিন।”
তুহিন বিশাল গাড়িতেই ব্যতিব্যস্ত হলো। বরফ,পানি ছাড়া বোতল দিয়ে ভ্যানিয়েলস ঢালল গ্লাসে। সম্রাট চুপচাপ হাতে নিয়ে গলা ভেজায়,শব্দ করে না। তুহিন বুঝল, বস ঠিক নেই। নির্ঘাত কিছু হয়েছে। উফ, কোথায় ও ভাবল ইনিয়েবিনিয়ে একটু বসের থেকে রবার্টের কথা শুনবে। ও যা ভাবছে কিনা,তা সত্যি কিনা জাভে। কিন্তু যা অবস্থা, এখন মুড সুইং হয়ে আবার হেলেনের অফারই না রিজেক্ট করে দেয়!
তখনই সিগন্যাল পড়ল। রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই,জট নেই। এখন কেবল পথচারিদের হেঁটে পাড় হওয়ার সময়। সম্রাটের গাড়িটাও দাঁড়াল তাতে। হঠাৎ ওর চোখ পড়ল সামনের ভিউ মিররে। কপাল বেঁকে বসল অমনি।
বিড়বিড় করে বলল,
“ সুইটহার্ট না? “
তুহিন ঘাড় ঘোরায় চাকার মত,
“কোথায় বস?”
কুহু খুব দ্রুত হেঁটে আসছিল। মাত্রই ক্যাফের ডিউটি শেষে ডর্মের পথ ধরেছে মেয়েটা। সম্রাটের মাথায় শয়তানি চাপল অমনি। কাছাকাছি আসতেই হুট করে গাড়ির দরজা ঠেলে দিলো সে। মুখের সামনে হঠাৎ ব্যাপারটায় ভড়কে গেল কুহু। এক চোট থতমত খেয়ে কপাল কুঁচকে ফেলল। কী অসতর্ক মানুষ এরা! আরেকটু হলেই তো দরজাটা ওর গায়ে লেগে যেত। কুহু তখনো দেখেনি গাড়ির ভেতরে কে আছে! চুপচাপ মাথা নুইয়ে পাশ কাটাতে গেল,হাস্কি স্বরে ডাকল সম্রাট,
“ হেই সুইটহার্ট!”
বুকটা ছলকে উঠল ওর। পাশ ফিরল হকচকিয়ে। পরপর চমকে গেল ভেতরে সম্রাটকে দেখে। তুহিনও হাসল সাথে,মাথা একটু নুইয়ে বলল,
“ হ্যালো ম্যাম,ভালো আছেন?”
কুহুর ভীষণ মেজাজ খারাপ হলো। রাস্তাঘাটে কেমন ব্যবহার এসব? সেই অসভ্যের মতো সুইটহার্ট সুইটহার্ট করছে। ও একটা শব্দও বলল না। সম্রাটের শার্টের অবস্থা খারাপ। সিক্সপ্যাক কেমন হাঁ করে আছে। অন্য হাতে মদের গ্লাস। কুহু বিব্রত হয়। চোখ নুইয়ে ফের যেতে নিলে,সম্রাটের ইগোতে লাগল এবার। এইটুকু দুই ফুট সাইজের মেয়ের,এটিটিউড দেখো! সহসা ক্ষিপ্ত বেগে মেয়েটার হাত চেপে ধরল সে। চমকে গেল কুহু। চকিতে ফিরে,
হতবিহ্বল চোখে বলল,
“ হাত, হাত ধরেছেন কেন?”
ওর চোখেমুখের ভয় দেখে আরো মজা পেলো সম্রাট। দুষ্টুমি করে বলল,
“ তুহিন এটা-কে গাড়িতে তোলো।”
কুহুর রুহু উড়ে গেল ভয়ে। পাংশুটে মুখের সব রক্ত সরে গেল অমনি। সম্রাট হাত টানল একটু। মেয়েটা ভাবল এক্ষুনি বুঝি টান মেরে গাড়িতে ঢুকাবে। ওই চশমা পরা চামচাটা তো সেদিন বলেছিল ওরা এভাবেই কিডন্যাপ করে! কুহুকেও কিডন্যাপ করবে এবার?
মেয়েটা বাঁচার পথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে হাত মুচড়াল। সম্রাট যখন আরো শক্ত করে ধরল, বোঝাল কিছুতেই ছাড়ানো যাবে না, দুম করে ওর হাতটা কামড়ে ধরল কুহু।
আঁতকে উঠল তুহিন। আর্তনাদ করে বলল,
“ ওমাইগড! ওমাইগড!”
সম্রাট ছিটকে নিজের হাত সরিয়ে আনল। আহাম্মক বনে গেছে সে। তবে কিছু বলার জন্যে কুহুকে আর পাওয়া হলো না। ভো দৌড় দিয়ে বিদ্যুৎ এর গতিতে পালিয়ে গেল মেয়েটা।
সম্রাট হাত ঝাড়ল,ব্যথা করছে, জ্বলছে। ভ্যাম্পায়ারের মতো দাঁত বসিয়ে দিয়েছে পুরো। তুহিন উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ বস আপনি ঠিক আছেন?”
“ কথা না বলে সামনের কোনো এপোটেকে চলো,ডাফার।”
“ ও-ওকে বস। এই চলো চলো। “
গাড়ি ছুটল ফের। কাছাকাছি ফার্মেসিতে যেতে হবে। এক্ষুনি ট্রিটমেন্ট না নিলে সম্রাটের স্বর্নে বাধানো শরীরে সেপটিক হবে নিশ্চিত।
ছেলেটা শক্ত মুখে বাইরে ফিরে চায়। কুহুর ছাঁয়াও কোথাও নেই। তারপর তাকাল ওর হাতের দিকে। জায়গা পুরো লাল হয়ে গেছে। চামড়া ছিলেছে, রক্ত আসছে অল্প। এভাবে কেউ কাউকে কামড়ায়? কত জোর দাঁতে! সম্রাট চোখমুখ খিচে বিড়বিড় করল,
“ বেইবি শার্ক,
মজা দেখাব তোমায়।
যাস্ট ওয়েট এ্যান্ড ওয়াচ!”
চলবে..
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, হেই সুইটহার্ট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২০
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৪