সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_৭
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে মেজবাহ’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশায় বসে ছিল আকসা। ওর মন খারাপ ছিল কিছুটা। মেজবাহকে এতো ভালোবেসে ফুল দিলো, অথচ ফুলটা নষ্ট হয়ে গেল। ব্যাপারটা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। এমনটা না হলেও পারতো।
এই নিয়েই হা-হুতাশ করছিল ও। যদিও মেজবাহ বলেছে, এই ফুল নষ্ট হয়েছে তাতে কী? আবার দিতে।
কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, প্রথম দেওয়া ফুলের সাথে অন্য কোনো ফুলের তুলনা হয় না। ফুল তো হাজারো পাওয়া যাবে। কিন্তু আকসা যেটা শখ করে মেজবাহ’র জন্য কিনেছে, সেটা কি আর ফিরে আসবে? সবচেয়ে বড় কথা, সময় তো আর ফিরে আসে না। যেই সময়টা কেটে গেছে সেটাকে শত চেষ্টায়ও ফেরানো যাবে না। যদি তাই-ই হতো তাহলে বোধহয় পৃথিবীতে বিশ্বযুদ্ধ হতো না। জার্মান-রাশিয়ার সংঘর্ষ লাগতো না৷ হিরোশিমায় বিস্ফোরণও ঘটতো না।
আকসা এসব ভাবছিল, তখনই ওর ফোনে টুংটাং মেসেজ আসার আওয়াজ পাওয়া গেল। ফোনটা আকসার হাতেই ছিল। ও তুলে নিতেই দেখতে পেল, মেজবাহ’র মেসেজ। মেজবাহ ওর নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করেছে— “স্যরি ফর দ্য লাস্ট মোমেন্ট৷ ফুলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে দিইনি৷ আই নো, তোমার মন খারাপ হয়েছে। তোমাকে মন খারাপ দেখতে ভালো লাগে না। সবসময় হাসি-খুশি থাকবে। বাই দ্য ওয়্যে, ইট ওয়াজ আ বিউটিফুল ডে টুডে। ইউ লুকড্ সো বিউটিফুল।”
মেসেজটা পড়া মাত্রই আকসার সকল মন খারাপ হাওয়ায় উবে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একরাশ হাসি এসে জমা হলো। আকসা মেজবাহ’র মেসেজের রিপ্লাইতে থ্যাংক ইউ লিখলো। মেজবাহ তাতে একটা লাভ রিয়্যাক্ট দিয়ে রাখলো।
আকসা যেন আকাশে উড়ছে প্রজাপতির ন্যায় ডানা মেলে। কিশোরী মেয়েরা যেমন সদ্য জীবনে প্রথমবার প্রেমে পরলে ডানা মেলে ওরে, মনে অজস্র অনুভূতি এসে জমা হয়, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক হাসি ফুটে থাকে; আকসার ক্ষেত্রেও তেমনই হচ্ছে। ও মেজবাহ’র প্রেমে ক্রমশই হাবুডুবু খেতে লাগলো। জীবনে এই প্রথম কারো প্রেমে পরেছে। জীবনের বাইশটা বসন্ত পার হওয়ার পরে আকসার জীবনে বহুল স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত সেই প্রেম এলো৷ সে কি আর যে-সে কথা!
.
.
আজ আকসাকে কলি এসে মেহেন্দি পরিয়ে দিচ্ছে৷ আকসা নিজেও সুন্দর মেহেন্দি পরতে পারে। তবে নিজের বিয়েতে নিজে মেহেন্দি পরা খুবই ঝামেলার কাজ। কলি মেহেন্দি পরাচ্ছিল আর আকসা দুই হাত মেলে বসেছিল। আকসা মেজবাহ’র কথা ভেবে মনে মনে হাসছিল। ব্যাপারটা খেয়াল করে কলি বললো, “কীরে? কী হলো তোর? এভাবে পাগলের মতো হাসছিস কেন?”
আকসা জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো, “প্রেমে পরলেই মানুষ পাগল হয়ে যায় বুঝি?”
কলি প্রথমে আকসার কথা বুঝতে পারলো না। পরমুহূর্তেই ধরতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “তুই প্রেমে পরেছিস?”
“হু।”
“কার?”
“কার আবার? যার সাথে বিয়ে হচ্ছে, তার।”
“মেজবাহ ভাইয়ার?!”
“হু।”
আকসা লাজুক হেঁসে জবাব দিতেই কলির চোখ বড় বড় হয়ে গেল৷ ও অবাক হয়ে বললো, “তুই মেজবাহ ভাইয়ার প্রেমে পরেছিস? কবে? কীভাবে?”
“প্রেমে পরার কোনো সময়কাল হয় না। সৃষ্টিকুলে মানুষ যখন-তখন যে-কারো প্রেমে পরতে পারে। আসলে প্রেমে পরার বিষয়টা নির্ভর করে পরিস্থিতি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার ওপরে। মানুষ বড়ই অদ্ভুত। কারো কারো প্রেমে পরতে বছর দুয়েক সময় লেগে যায়, আবার কারো দু’দিন।”
কলি হা করে তাকিয়ে থাকে। আকসা পুনরায় বলে, “মেজবাহ’র প্রতিটা কাজকর্ম, কথাবার্তা এবং কেয়ার আমাকে উনার প্রতি আকৃষ্ট হতে বাধ্য করেছে। উনি এতো সুন্দর করে কথা বলে! আর উনার ওই হাসিটা! যে-কাউকে সহজে ঘায়েল করে ফেলতে পারে৷ উনার ওই হাসিতেই তো অর্ধেক মরেছি। আমি মেজবাহ’র প্রেমে পরে গিয়েছি কলি। এখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ নেই৷ আর আমি ফিরতেও চাই না।”
“মেজবাহ ভাইয়া তোকে এতো সহজে মেনে নিলো?”
“মানবেন না কেন? উনি তো আমাকে এখনো ভালোবাসেন। উসি নিজে বলেছেন আমাকে।”
আকসা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাটা বললো।
.
.
আজ রাতে আকসার সাথে কলি ঘুমিয়েছে। আগামীকাল গায়ে হলুদ, এরপর বিয়ে। আকসাদের বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন চলছে৷ বাইরে লোক সমাগম অনেক। তবে আকসা কনে বিধেয় ওকে ওর আম্মা তাড়াতাড়ি ঘুমাতে পাঠিয়েছেন। যদিও আকসার এখন ঘুম আসছে না। নানান স্বপ্নে বিভোর ও। মেজবাহকে নিয়ে হাজারটা স্বপ্ন দেখছে ও। ভেবে রেখেছে, বিয়ের পর মেজবাহ’র সাথে ট্যুর দেবে। এটা বোধহয় প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন।
কলি ঘুমিয়ে ছিল। এদিকে আকসা অন্ধকার ঘরময় পায়চারি করছিল। তখনই হঠাৎ ওর মনে হলো, মেজবাহকে একটা কল দেওয়া যাক। লোকটা জেগে আছে নাকি? শুনেছে, আর্মাড অফিসারগণ রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে যান। রাত জাগার অভ্যাস তাদের থাকে না। তবুও মনের মধ্যে একরাশ আশা নিয়ে আকসা মেজবাহকে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট দিলো। লিখলো— “আছেন?”
আকসা একবার ফোনে সময়টা দেখলো। রাত সাড়ে বারোটা তখন। মেসেজ দিয়েছে কেবলই। দুই মিনিট পরেই মেসেজটা সিন হয়ে রিপ্লাই আসলো, “হ্যাঁ বলো।”
“কী করছেন?”
“ল্যাপটপে কাজ করছিলাম কিছু। তুমি?”
“পায়চারি করছিলাম। এখন আপনি ফ্রী?”
“হ্যাঁ, এখন ফ্রী।”
আকসা অনেকক্ষণ দোনামোনা করে ইতস্তত হয়ে টেক্সট লিখলো, “আপনার সাথে কলে কথা বলা যাবে এখন?”
“ইয়াহ, শিওর।”
আকসা খুব খুশি হলো। তৎক্ষনাৎ বেলকনিতে যেয়ে মেজবাহকে কল দিলো হোয়াটসঅ্যাপে। মেজবাহ কল রিসিভ করতেই আকসা বললো, “রাতে খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ খেয়েছি। তুমি?”
“রাতে খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার।”
“কেন?”
“এমনিই। একবেলার বেশি খেতে পারি না। শুধু দুপুরে খাই।”
“এভাবে অনিয়ম করলে চলবে? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করলে তো তুমি অসুস্থ হয়ে পরবে!”
“কিছুই হয় না আমার। একদম স্ট্রং আছি।”
“আচ্ছা আচ্ছা।”
আকসা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাটা বলতেই মেজবাহ বিপরীতে বাক্যটুকু আওড়ালো। আকসা মেজবাহ’র কন্ঠস্বর শুনে ফোনটা কানের সাথে একদম মিশিয়ে নিয়েছে। মেজবাহ’র কন্ঠস্বর এতো সুন্দর! ফোনে আরো মারাত্মক শোনায়। আকসা ফোন দুই হাতে চেপে ধরে রেখে বিরবির করে বললো, “ভয়েসটা এতো বেশি সুন্দর কেন!”
কথাটা খুব একটা জোরে বলেনি আকসা। এমনভাবে বলেছে, যেন ফোনের ওপাশে মেজবাহ শুনতে না পায়। তবে ওকে হতভম্ব করে দিয়ে মেজবাহ ওপাশ থেকে বলে উঠলো, “তাই নাকি?”
“জি?”
আকসা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলো। মেজবাহ বললো, “ভয়েস সুন্দর?”
“হু।”
আকসা লজ্জা পেল। মেজবাহ বললো, “তোমার ভয়েসও সুন্দর। অনেক সফট।”
আকসার লজ্জার মাত্রা বেড়েই চললো। মেজবাহ অপর প্রান্ত থেকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো, “হাতে মেহেদী পরেছো?”
“জি। আপনার নামও লিখেছি।”
“ফটো দাও তো।”
আকসা দৌড়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে আলো জ্বালিয়ে একটা ফটো তুলে সঙ্গে সঙ্গে মেজবাহকে পাঠিয়ে দিলো। মেজবাহ ফটোটা দেখলো। হাতের ওপরে এবং তালুতে মেহেদি দিয়ে সুন্দর করে নকশা করা৷ তালুর মাঝখানে ছোট্ট করে লেখা — “মেজবাহ।”
মেজবাহ ফটোতে একটা লাভ রিয়্যাক্ট দিয়ে ফেলে রাখলো। আকসা কি মনে করে ওকে বললো, “আপনার গানের গলা না ভীষণ সুন্দর। আমাকে শোনাবেন গান?”
“এখন?”
“জি।”
“কীভাবে?”
“ভিডিওকলে।”
আকসা কোনোকিছু না ভেবেই বলে দিলো। ওর মাথায় ভূত চেপেছে, মেজবাহ’র গলায় গান শুনবে এখন। ভীষণ মিস করছে। ওর সেদিনের গানের সুর ভুলতেই পারছে না। মেজবাহ একটু ভেবেচিন্তে বললো, “উহমম. . . ওকে। গিটার নিয়ে আসছি আমি৷ বর্তমানে আমি শার্টলেস রয়েছি। কিছু পড়ে আসছি। তুমি পাঁচ মিনিট লেট করে কল দাও।”
বাবাহ! লোকটা ওর সামনে খালি গায়ে আসবে না। আকসা খনিক হাসলো। ও গুনে গুনে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে এরপর মেজবাহকে ভিডিওকল দিলো৷ মেজবাহ কল রিসিভ করার আগেই আকসা ওড়না ঠিকমতো গায়ে জড়িয়ে নিলো৷ চুলগুলো বেণী করা ছিল। সেগুলো সামনে এনে ফেলে রাখলো। মেজবাহ কল রিসিভ করতেই আকসা দেখলো, লোকটা ঘরের এক কোণে ফ্লোরের ওপরে বসে আছে৷ তার হাতে সেই সুন্দর গিটারখানা। মেজবাহ’র পরনে একটা কালো রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি এবং হালকা জলপাই রঙা পকেট-প্যান্ট। মেজবাহ কোনো কথা না বলে ফোনটা সামনে কিছু একটার ওপরে হেলান দিয়ে রেখে গিটারে সুর তুলতে শুরু করলো। আকসা একধ্যানে তাকিয়ে রইলো ক্যামেরার দিকে। গানের সুরে ঝংকার উঠলো। ধীরে ধীরে মেজবাহ গাইতে শুরু করলো—
আ তুঝহে ইন বাহো মে ভার কে
অর ভি কার লু মে কারিব
তু যুদা হো তো লাগে হে
আতা জাতা হার পাল আজিব
ইস জাহা মে হে অর না হোয়্যাগা
মুঝসা কোয়্যি ভি খুশনাসিব. . .
তুনে মুঝকো দিল দিয়া হে
মে হু তেরে সাবসে কারিব
মে হি তো তেরে দিল মে হু
মে হি তো সাসো মে বাসু
তেরে দিল কি ধারকানো মে
মে হি হু, মে হি হু…
তু হামসাফার তু হামকাদাম তু হামনাওয়া মেরা
তু হামসাফার তু হামকাদাম তু হামনাওয়া মেরা..
মেজবাহ চোখ বুঁজে গিটারে ক্রমাগত সুর তুলে গানটা গাইছে। গলার জোর ক্রমশই বাড়ছে ওর। ফোনের এপাশে আকসা গালে হাত ঠেকিয়ে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখছে মেজবাহকে। এতো সুন্দর করে কীভাবে গাইতে পারে একটা লোক? আকসার মনে হলো, মেজবাহ বুঝি ওকেই ডেডিকেট করে গানটা গাইছে। ও বিমোহিত হচ্ছে বারবার। একদৃষ্টিতে খেয়াল করে মেজবাহ’র গিটারে রাখা অনবরত নড়তে থাকা হাত, ওর বন্ধ করে রাখা চোখ, তিরতির করে নড়তে থাকা ঠোঁট আর গান গাওয়ার ফলে বারবার গলার মাঝ বরাবর উঁচু হয়ে ওঠা অংশটা দেখে ঢোক গিলে ফেললো। আকসা বিরবির করে মুগ্ধ গলায় বললো, “এতো সুন্দর করে গাইতে পারেন কিভাবে মেজবাহ!”
চলবে
নোটবার্তা: আমার কাছে বেশকিছু তথ্য-প্রমাণ এসেছে যে, আমার ‘সীমান্তরেখা’ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আমার নাম সরিয়ে অন্য নাম দিয়ে কপি করা হচ্ছে। এই ব্যাপারটা আমার লেখার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। লোকে তো আমাকে নকল মনে করছে। আপনারা দয়া করে এভাবে কপি করা বন্ধ করুন। আমি অনেকদিন যাবত চুপ আছি। আর থাকতে পারছি না। নিজেকে বড্ড বেশি অসহায় লাগছে। কারণ, এদের জন্য কেমন আইন প্রয়োগ করা হয় জানা নেই। আপনারা এই ছোট বোনটার কথা শুনুন। প্লিজ আমার লেখা কপি করবেন না আর নিজেদের নামে চালাবেন না। নচেৎ, আমি কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৯
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৫
-
সীমান্তরেখা গল্পের লিংক
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৭
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৯
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬